ঢাকায় এখন সময় ঠিক সাড়ে এগারোটা। ঘুমিয়ে গিয়েছে হয়ত শহরতলি। বাহির থেকে তেমন কোনো শব্দও আসছে না। ছোটো ডাইনিং এর টিমটিমে আলোটা জ্বলছে। সেই আলো এসে পৌঁছাচ্ছে প্রেমার উজ্জ্বল শ্যামলাটে গায়ে, মুখে। সে টেলিফোন কানে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থির। চোখের মণিগুলো জ্বলজ্বল করছে খানিক,
“কে বলছেন?” নিরেট গাম্ভীর্য-ঘেঁষা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে উত্তরের আশায় দাঁড়িয়ে রইল। সে এর আগে তেমন কখনো টেলিফোনে কথা বলেনি। হয়তো ছোটোতে বলেছিলো তার মনে নেই কিন্তু বড়ো হওয়ার পর প্রায় নিষিদ্ধ ছিলো বলেই সে জানতো না টেলিফোনে কণ্ঠ আসে কেমন ভারী ভারী।
অস্থির মেজবাহ্'র ভ্রু কুঁচকে এলো। একবার টেলিফোনটা নামিয়ে আবার কানে ধরল। সে কি ভুল শুনল? তাকে নাম জিজ্ঞেস করল মেয়েটা? কণ্ঠটা একটু অন্যরকম লাগল না?
ওর কণ্ঠতো চেনার কথা মেয়েটার। তবে চিনল না কেন? না-কি অন্য কেউ ধরল?
অন্য কেউ ধরলেও মেজবাহ্'র ভয় নেই। তাকে টেলিফোনের ওপাশ কেন, সামনে দাঁড়িয়েও কেউ কিচ্ছুটি করতে পারবে না। কিন্তু ভয়টাতো অন্য জায়গায়! সুচরিতার না আবার সমস্যা হয়। মেয়েটাতো সেদিন বাবার ডাক পেয়ে টেলিফোন ছেড়েই পালিয়ে ছিলো। কথা বলার সময় চোরের মতো ফিসফিসিয়ে কথা বলে। আজ যদি তার জন্য জেনে যায় কেউ কিছু তবে ওর না আবার সমস্যা হয়! ভীতু মেয়ে একটা।
মনে খচখচানি রেখে আচমকা কল কাটা যায় না। তাহলে ওপাশের সন্দেহ আরও বাড়বে। তাই মেজবাহ্ পুনরায় আরেকটু সংকোচ মোচনের জন্য ধীর স্বরেই ডাকল, “সুচরিতা..?”
একই নাম এই নিয়ে দু'বার শুনল প্রেমা। তার কপালের ভাঁজ শিথিল হলো না। এই নামেতো তোদের বাড়িতে কেউ থাকে না। তাছাড়া টেলিফোন তুলে কেবল বাবা। বাবাকে নিশ্চয় কেউ সুচরিতা বলে ডাকবেন না। তাহলে ডাকলটা কাকে?
সে নির্বোধের মতো জবাব দিল, “এখানে সুচরিতা বলেতো কেউ থাকে না। আপনি খুঁজছেন কাকে?”
একদম একইরকম কণ্ঠ, একই বলার টান শুধু পার্থক্যটা বলার ভঙ্গিতে। সুচরিতা কথা বলে মিষ্টি ভাবে, অধিকার দেখিয়ে অথচ ফোনের ওপাশে মেয়েটার কথা কাঠ কাঠ। আলাদা মায়া নেই। তাহলে সুচরিতা নয় ফোনের ওপাশে অন্য কেউ!
অন্যকারো কণ্ঠ এত মিল মেয়েটার সাথে? কার কণ্ঠ? বোন হবে কি? যমজ বোন? নয়ত এত মিল কী করে? মেজবাহ্ শেখ অব্দি দ্বিধায় পড়ে গিয়েছে এই কণ্ঠের জন্য! এত মিলও হয়?
মেজবাহ্ শ্বাস ফেলল। চিন্তা বাড়ল তার। কী করে সে এমন উদ্ভট কথা বলে ফেলল বিপরীতের মানুষটাকে না চিনেই? এমন বোকামো সে কস্মিনকালেও কখনো করেছে কি? আজ করল কেন তবে? সব দোষ ঐ মেয়ের। ফোন করে-করে ওর অভ্যেস বদলে ফেলেছে।
প্রেমা অধৈর্য হলো, “হ্যালো? বললেন না তো কাকে চাচ্ছেন? সুচরিতা নামেতো কেউ নেই!”
ফোনের ওপাশ থেকে মিনিট খানেক গড়াতেই ভেসে এলো একটি উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠ। এটি আগের পুরুষটির কণ্ঠ নয়। নতুন একটি কণ্ঠ। বেশ উৎফুল্ল স্বরে বলল,
“ম্যাম, সুচরিতাকে আমরা খুঁজছি না, পরামর্শ চাচ্ছি। আমরা রেডিও স্টেশনের আরজে। প্রতি জেলায় আমাদের শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিচ্ছি।”
এবার যেন প্রেমা ভড়কালো। এত রাতে রেডিও স্টেশনের ফোন এসেছে? পরামর্শ নিতে? তা-ও তাদের বাড়িতে? ফাজলামো হচ্ছে?
“ইয়ার্কি করছেন রাত-বিরেতে? একটু আগেই বললেন বুকের মাঝে তাণ্ডব না কী ঝড়, শান্ত করতে! এখন বলছেন পরামর্শ চাচ্ছেন? কী এমন পরামর্শ দিবো? বুকের ঝড় কমানোর? আমি কি আপনার বুকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের অফিস খুলে বসেছি? টর্নেডো হবে নাকি বন্যা সেটা জানাবো? নাকি পরামর্শ দিবো, বন্যা হলে কীভাবে ভেসে বেড়াতে পারেন, সেটা?”
“আহা, ম্যাম, রাগছেন কেন? আমরা নতুন একটি গান বের করব। গানটির টাইটেল হবে, শান্ত করো সুচরিতা বুকের ভেতর তীব্র ঝড়… কেমন হবে বলুনতো? আপনারাই তো শ্রোতা আমাদের। আপনাদের পরামর্শ নিয়েই আমরা সিদ্ধান্ত নিবো।” ছেলেটির কণ্ঠ ভরসাযোগ্যই। উৎফুল্ল ও গোছানো। আরজেদের যেমন হয় তেমনটিই। প্রেমার রাগে কিঞ্চিৎ ভাঁটা পড়ল। সুন্দর কণ্ঠ শুনে সারাদিনের ক্লান্ত মনটাও যেন ভালো হলো। কিছুটা ভালো। সে কণ্ঠে আর অমন গর্জন রাখল না। কোমল গলায় কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল,
“এটা গান হবে? সুন্দরতো! কিন্তু তখন যেন কেমন করে বললেন..’
প্রেমার কথা শেষ করতে দেয় না অপরাপাশের ছেলেটি। খুব বেশিই আন্তরিক ভঙ্গিতে জবাব দেয়, “ধন্যবাদ ম্যাম, ধন্যবাদ। আপনার মূল্যবান সময়টি দিয়ে সাহায্য করার জন্য। গানটি শুনতে পাশেই থাকবেন আমাদের। শুভরাত্রি ম্যাম।”
“কিন্তু আপনাদের চ্যানেলটা..” প্রেমার কথা শেষ হওয়ার আগে বিচ্ছিন্ন হয় যোগাযোগ। ফোনটা কেটে যায় দু'টো শব্দেই। প্রেমা বোকা বোকা চোখে টেলিফোনটার দিকে তাকায়। তার জীবনে এরচেয়ে অদ্ভুত ফোন এর আগে কখনোই পায়নি হয়ত। যাও প্রথম একবার ফোন উঠালো তা-ও কি-না রেডিও স্টেশনের। অথচ নামটা অব্দি বলল না। এ কেমন আরজে! গানের পরামর্শ নিলো অথচ নামটাই জানালো না। তাছাড়া এর প্রথম কণ্ঠ কেমন গম্ভীর ও আকুলতা মিশ্রিত ছিলো অথচ এখনের কণ্ঠ পুরোই ভিন্ন, উৎফুল্ল ছিলো। সে কি একটু বেশিই ভাবছে? না-কি সারাদিনের ক্লান্তিতে ভুল শুনল? নাকি কেউ তার সাথে ফাজলামো করল?
ওপাশের টেলিফোন রাখতেই হাঁফ ছাড়ল মেজবাহ্। এতক্ষণ যেন চেপে রেখেছিল শ্বাস। দু-হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলো সিকান্দারের মুখের দিকে। ভাগ্যিস ছেলেটা ঠিক সময়ে এসেছিলো, সে-ও বিশ্বাস করে প্রেমিকার ধরা খাওয়া সামলানোর দায়িত্বটা এর হাতে বুঝিয়ে দিয়েছিল! নয়ত একটা কেলেঙ্কারি হতো ঠিক। মেয়েটার না জানি কী হতো! ধরা পড়ে গেলে মেয়েটাতো আর তাকে ফোনও করতে পারত না। তখন তারও বা কী হতো?
সিকান্দার বুক হাত দিয়ে শ্বাস নিলো টেনে টেনে। ধপ করে বসল চেয়ারটায়। মুখ দিয়ে দু'বার শ্বাস নিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“ভাই, এরচেয়ে বন্দুক হাতে ধরিয়ে বলতেন দুটো গু লি চালাতে, আমার জন্য সেটা সহজ হতো। এ কাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন? মনে হচ্ছিলো যেন বোর্ড পরীক্ষা দিচ্ছি আর প্রশ্নকর্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে। একটা উত্তর ভুল হলে ফোনের এপাশে এসেই জিহ্বা ছিঁড়ে দিবেন ভুল বলার অপরাধে।”
সিকান্দার হড়বড়িয়ে বলে থামল। আবারও শ্বাস নিলো টেনে টেনে। মেজবাহ্ সিকান্দারের এই নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে দাঁড়িয়েই হেসে ফেলল। সিকান্দারের কাঁধে চাপড় দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“রং নাম্বার, সিকান্দার। ঠিক সময়ে এসেছিস আজ তুই।”
“রং নাম্বার? রং নাম্বারে কল দিয়ে আবার বুকের আগুন নিভাতে বলেছিলেন কেন ভাই? মেয়েটাতো বলল আপনি না-কি এমন অশালীন প্রস্তাব দিয়েছেন। আপনাকে দিয়েতো এমন আশাই করিনি!” সিকান্দার কথা বলে থামল। এমন কথাই বলেছে যে আর সরাসরি তাকানোর সাহস জোগাতে পারল না সে। তাই কিছুটা আড়চোখেই তাকাল। ভাই না এখন একটা চড় বসিয়ে দেয় এমন বেফাঁস কথা বলার জন্য।
সিকান্দারকে অবাক করে দিয়ে আজ মেজবাহ্ বকলও না অব্দি, চড় তো দূরে থাক। বরং হেসেই গেলো।
“চুপ কর তো, সিকান্দার। বুকের আগুন বলিনি, তাণ্ডবের কথা বলেছিলাম। ভাগ্য ভালো ঝড় বলেছিলাম, আগুন বললেতো সেই মেয়ে এতক্ষণে চুল ছিঁড়ে ফেলত আমার।”
সিকান্দার মুখ নামাল। মেজবাহ্’র হাসিতে আশকারাও পেলো খানিক। মিনমিন করে তাই জানতে চাইল, “কিন্তু ভাই সুচরিতাই বা কে? কাকে খুঁজছিলেন?”
সিকান্দার অপেক্ষা করছে আজ একটা চড় ঠিক তার গালে পড়বে বলে। যেহেতু কবির শেখের কাছ থেকে সে শুনেছিলো মেজবাহ্ শেখের মেজাজ অত্যন্ত উগ্র আজ তাই ছুটেই এসেছিলো। কিন্তু এসেতো দেখল ভিন্ন কাহিনি। মেজবাহ্ শেখ ফোন কানে নিয়ে বসে আছে উজবুকের মতো। সিকান্দারকে দেখেই ফোন হস্তান্তর করে যেন বেঁচে ছিলো। সিকান্দারতো প্রথমে ভেবেছিলো কোনো মন্ত্রী-আমলাদের কল হবে। মাঝে মাঝে ভাই তাদের পাশ কাটাতে সিকান্দারকে দিয়ে ফোন তোলায়। কিন্তু আজতো একদম ভিন্নই হলো ঘটনা। সিকান্দারের এত কৌতূহল জাগছে যে চড়ের ভয়ও এখন তার কাছে কিচ্ছু নয়। সে জেনেই ছাড়বে তাদের বেরসিক নেতা কোন মেয়েকে বুক শান্ত করার জন্য এত রাতে ফোন করে ধরা খেয়েছে।
“তুই-ই বলে কাকে খুঁজছিলাম। কী মনে হয় তোর?”
“আমিতো ভেবেছিলাম যেভাবে আপনি ফোন এগিয়ে দিয়েছিলেন কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার হবে হয়ত।”
“মিনিস্টারকেই দিয়েছিলাম কল।”
মেজবাহ্'র হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় চমকে ওঠল সিকান্দার। কোন মিনিস্টারের নাম আবার সুচরিতা হলো সে ঠিক মনে করে ওঠতে পারল না। সবতো দেখে টাক মাথার, ভুঁড়িওয়ালা মিনিস্টার। এমন সুন্দর নামে মেয়ে কবে এসব রাজনীতিতে এলো?
“মিনিস্টার, ভাই! কোন মিনিস্টার?”
“হবে হয়ত, আমার আগাম হোম মিনিস্টার। মন কাকে শান্ত করতে বলে মানুষ? ঘরণীকেই তো নাকি? ঘরণী মানে, হোম মিনিস্টার। মেজবাহ্ ব্যক্তিগত হোমের মন্ত্রী হবে সে। এতটুকুও বুঝলি না? এজন্য তো বলি তুই একটা রামবলদ। শরীরটাই দিয়েছে ব্রেইনটা উপরে রয়ে গিয়েছে।”
মেজবাহ্'র সহজ সরল এই স্বীকারোক্তি সিকান্দারের জন্য ছিলো বি স্ফো রণের মতো। ভাই কি ঠিক বলছে? হোম মিনিস্টার? মানে, ভাইয়ের কোনো ব্যক্তিগত নারী? এ-ও সম্ভব? কোথায়, আগে তো কখনো এভাবে খোলামেলা বলেনি ভাই!
বিস্ময়ে চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম তার। অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভাবীইইই!” শব্দটা কিছুটা টেনেই বলল।
মেজবাহ্ বসে গিয়েছে পুনরায় তার চেয়ারটায়। সিকান্দারকে আর উত্তর দেওয়ার ভাব তার ভেতর দেখত পাওয়া গেলো না। সিকান্দার তখনও তাকিয়ে আছে আহাম্মকের মতো। তাদের ভাই এই বয়সে এসে প্রেম করছে! আবার বুক শান্ত করতেও বলছে! শয়তানে না আবার অভিশাপ ছুঁড়ে দেয়। এই লোকের দ্বারা এসবও হয়! আবার অশালীন কথাও বলে? মনে মনে এসব ভেবেই তার হাসি পাচ্ছে। লাজুক হয়ে ওঠেছে তার মুখ।
মেজবাহ্ চোখ উল্টিয়ে মিটমিট করে হাসা সিকান্দারের দিকে কয়েকবারই তাকালো। এই ছেলে যেন নিজের মধ্যেই নেই। কীসব আজগুবি কথা ভেবে এমন হেসেই যাচ্ছে। মেজবাহ্ ধমক ছুঁড়ল,
“এভাবে আহাম্মকের মতো হাসছিস কেন, সিকান্দার? চড় খাবি?”
সিকান্দারের হাসি আজ বন্ধ হওয়ার নাম নেই। উল্টো সে করে বসল অদ্ভুত কাণ্ড। শার্ট দিয়ে নাক অব্দি ঢেকে লাজুক স্বরে উত্তর দিলো,
“ভাবিকে আপনি এসব অশ্লীল কথা বলেন ভাই? আমারতো ভেবেই শরম করছে। আপনার করছে না?”
সিকান্দারের এই মেয়েলি, আড়ষ্ট ভঙ্গি দেখে মেজবাহ্'র শরীর গুলিয়ে এলো। এই ছেলে তাকে নির্ঘাত লজ্জা দিতেই এসব করছে। এই ছেলেকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। আস্ত ফাজিলের ডিম।
মেজবাহ্ হাতের কাছের ফাইলটা দিয়ে বারি লাগালো সিকান্দারের মাথায়। চটে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“এই কথা যেন ভুলেও বাহিরে না যায়। তোর মুখ ভেঙে দিবো।”
“ভাই, শান্ত হন। এমনিতেই আপনার বুকে ঝড় হচ্ছে। নড়লে চড়লে বন্যার পানিতে ভাবি ভেসে যেতে পারে।”
মেজবাহ্ আশ্চর্য হলো ছেলেটার লাগাম ছাড়া কথায়। এ ছেলে এখন থেকে এসব বলে তার হাড়মাস জ্বালিয়ে খাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মেজবাহ্ যেই না ‘সিকান্দার’ বলে গর্জন করে ওঠল, সিকান্দার ছেলেটা ষাঁড়ের মতো হাসতে হাসতে ছুট লাগলো। তার যেন আজ আনন্দের সীমা নেই। তাদের নেতা প্রেম করছে লুকিয়ে। আবার সেই প্রেমিকার বাড়িতে ধরা খাবে বলে তার সাহায্য নিয়েছে। ভাই ধরা পড়ে গিয়েছে অবশেষে।
মেজবাহ্ শেখ সেই যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। ঐ পুচকি একটা মেয়ের জন্য আজ তার এই হাল। সিকান্দার অব্দি মজা উড়াচ্ছে। মেয়েটাকে যেদিন টেলিফোনে পাবে সবার আগে সে ধমক দিবে। বুক কাঁপানো ধমক। মেজবাহ্ শেখের ধমকতো খায়নি তাই জানে না। মেপে মেপে ফোন করার হিসেব চুকাবে সে এবার। অনেক হয়েছে লুকোচুরি, ছয়দিন উপোস থেকে একদিনের মন ভরানো। এসব আর হবে না। তাছাড়া ওরও কি আর এসবের বয়স আছে! দু'বছর তো না দেখেই কাটিয়ে দিলো।
—————
শুক্লা আপুদের বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গা আছে। সেখানে গাছ লাগানো টুকটাক। খালা যে বাড়িটার কম যত্ন করেন না তা বাগানটা দেখলেই বোঝা যায়।
দিনটি আজ বৃহস্পতিবার। সিলেটের আবহাওয়া বেশি ঠান্ডা। বৈশাখেও এত শান্ত আবহাওয়া সচারাচর দেখা যায় না। বিকেলের ড্রয়িং রুম জুড়ে বসেছে সকলে। বাহিরে টুকটাক কথার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইমন আধ শোয়া হয়ে বসে আছে। তার পেটের কাছটায় বসা টুইটুবানি। গরম গরম স্যুপ ফু দিয়ে যত্ন করে করে এক চামচের পর এক চামচ তুলে দিচ্ছে ইমনের মুখের সামনে। ইমন পরম আনন্দেই খাচ্ছে। টুইটুবানির হাতের রান্না বেশ মজা। এতটুকু মেয়ে এত দারুণ রান্না করে! যে কেউ পছন্দ করবে। ইমনও করে।
“ইমন ভাই, আপনি এইখানে আসার কী দরকার ছিলো বলেনতো? আজ যদি ঢাকাতে থাকতে তাইলে কী আর এমন হইতো বলেন?” চামচ ভর্তি স্যুপ ইমনের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে বিরস মুখে কথাটি বলল টুইটুবানি। এই নিয়ে সে কত বার একই প্রশ্ন করেছে তার হিসেব হয়ত নেই। ইমন গুনেছিলো। মনে হয় ঠিক তেইশবার হলো।
ইমন স্যুপটা মুখে নিয়ে ধীরে ধীরে গিলল। অসুস্থ, রুগ্ন কণ্ঠে উত্তর দিলো, “কতবার বলবি আর? তেইশবার তো জিজ্ঞেস করলি!”
“তেইশ মানে?”
“বিশ আর তিন মিলে তেইশ। আরও স্কুলে পড়িস না। সিনেমাগুলো মুখস্থ করিস টেলিভিশন গলায় ঝুলিয়ে। তেইশই জানিস না এখনো!” ইমন অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল।
ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো মুখ নামিয়ে নিজের ভুলটাকে বিশেষায়িত করতে টুইটুবানি বলল,
“আপনাদের বাজার আমিই কিন্তু বেশিরভাগ করি। পাঁচশ, হাজাে টাকারও কোনো কোনো দিন বাজার কিনে আনি। হিসেব কিন্তু টাকার বেলা ঠিকই পারি।”
“ঐ তো, চিনিসই তো সিনেমা আর বাজার করা। কত করে বলি স্কুলে আবার ভর্তি হয়ে যা, পড়াশোনা কর, শুনবিতো না।”
“ধুর, আমি পড়ালেখা করলে ঘরের কাম করবো কে?” টুইটুবানির অবুঝ প্রশ্নে ভারি বিস্মিত হলো ইমন,
“তুই ঘরের কাজ করার জন্য পড়াশোনা করবি না? আমরা কি বলেছি তোকে ঘরের কাজ সব নিজের কাঁধে নিতে? তুই পড়াশোনা করলে না-হয় কাজগুলো ভাগাভাগি করে করা যেত! কিছু আমি, কিছু জোহরা, প্রেমা সাথে বাবাও করতো।”
“আল্লাহ্! ইমন ভাই! কী বলেন এগুলা? আপনেরা কাজ করবেন? তাইলে আমি কী জন্য আছি?”
“শোন টুইটুবানি, তোকে কাজ করার জন্য আমাদের বাড়িতে রাখা হয়নি। তাই এসব কথা বলে আমাদের ছোটো করিস না।” ইমনের কণ্ঠে রাখার আভাস। ছেলেটা মাঝে মাঝে এত অকারণে রেগে যায়।
টুইটুবানি আর কথা বাড়াল না। ইমন ভাই তাকে পড়াশোনা নিয়ে এমনিতেই কথা শোনায়। কিন্তু তার ওসব যে ভালো লাগে না। সিনেমার প্রতিই তার সকল ভালোবাসা। মাঝে মাঝে তার মনে হয় যদি অভিনেত্রী হতে পারত! শুক্লা আপু বলেছেন টেলিভিশনের কোনো কাজ টুইটুবানির জন্য পেলে জানাবে। টুইটুবানির গায়ের রঙটা চাপা হলেও মুখটাতো সুন্দর! শুক্লা আপু ওর মুখের প্রশংসাও করেছে।
ড্রয়িং রুমে টুকটাক যা কথা হচ্ছে তা জোহরার ফুপি ও খালাদের মাঝে। জোহরা ঘুমিয়ে ছিলো। উঠে এসে বসেছে এখানে মিনিট তিনেক আগে। এখানে আসতো না যদি না কাল শুক্রবার হতো। বাবাকে কাল সকালেই রওনা হওয়ার কথাটা আবার মনে করিয়ে দিতে হবে। কাল শুক্রবার! তার সাথে মানুষটার কথা বলার দিন। এই দিনে যদি সে না যায় তাহলে আরও একটা সপ্তাহ বাদ পড়ে যাবে। এ অব্দি কখনোই তা হয়নি।
জোহরা বাবার পাশেই বসেছিলো। এখনো ঘুমে চোখ টানছে তার। যাবের শিকদার এক হাত ছড়িয়ে মেয়েকে টেনে নিলেন বুকের পাশে। বাবার উষ্ণ বুক পেতেই যেন জোহরার ভারি চোখগুলো লেগে আসার উপক্রম। তবুও মনের কথাটি তাকে ঘুমাতেও দিচ্ছে না ঠিকঠাক। তাই নিদ্রামগ্ন স্বরেই বিড়বিড় করে বলল,
“বাবা, কাল ফিরবে না?”
যাবের শিকদার কথা বলছিলেন টুকটাক নিজের বোন জামাইয়ের সাথে। মেয়ের নিভু নিভু কথাটি কানে আসতেই হাসলেন তিনি। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ফিরব, আম্মু।”
জোহরার ফুপা বাঁকা চোখে সম্বন্ধীর এই বাড়াবাড়িটা দেখলেন। ঠিক পছন্দ হলো না বোধহয় তার। মেয়েদের এত আহ্লাদ দিয়ে ভদ্রলোক মাথায় তুলেন বলেই ভাগ্যের এই দুর্গতি।
বাঁকা স্বরে বাবা-মেয়ের কথায় ফোঁড়ন কাটলেন তিনি,
“ভাইজান, আপনি কন্যাকে স্নেহ করেন তা ভীষণ ভালো বিষয়। কিন্তু সন্তান যখন সেই স্নেহের মুখে চুনকালি লাগিয়ে দেয় তখন আসলে মানা যায় না, তাই না বলেন? আপনার জন্য তো আমার মায়া-ই লাগে।”
রহমান খান ইচ্ছেকৃত কথাটি যেন পৌঁছাতে চাইলেন জোহরার খালু- ইকবাল হোসেনের কানে। এবং তিনি সক্ষমও হলেন। টেলিভিশনের পর্দায় তাকিয়ে থাকা ইকবাল হোসেনের কান এদিকটায় ছিলো বলেই তিনি সহজেই কথাটি শুনে বাঁকা হাসলেন। খুব তাচ্ছিল্য হাসি যাকে বলা হয়। যেন যাবের শিকদারের কন্যাদের প্রতি ভালোবাসা এই তাচ্ছিল্যেরই যোগ্য।
জোহরার নিদ্রা জড়ানোর চোখের নিদ্রা উড়ে গেলো এক লহমায়ই। সকলের চোখ গিয়ে একবার পড়ল তাদের দিকে আরেকবার রহমান খানের দিকে।
যাবের শিকদারের কণ্ঠ হলো গম্ভীর,
“তুমি চিরকাল ভেড়া-ই থেকে যাবে, রহমান? কখন, কোথায়, কী বলতে হয় তা আর শিখলে না।”
রহমান খান নিজের হয়ে প্রতিবাদ করার আগে প্রতিবাদ করলেন ইকবাল হোসেন, “কেন, ভাইজান? উনাকে ভেড়া বললেন কেন? আপনিতো খুব নীতিবান লোক। সত্য কথা পছন্দ করেন। এই সত্যটা পছন্দ হলো না তবে?”
“কোন কথাটি সত্য আর কোনটি মিথ্যে তা নিশ্চয় আপনার চেয়ে আমি ভালো জানি। বয়সতো একেবারে কম হলো না।”
“তা কোনটি মিথ্যে, ভাইজান? আপনার সন্তানরা চুনকালি মাখায়নি?”
যাবের শিকদার অত্যাধিক শীতল রইলেন। শীতল চোখে তাকালেন ইকবাল হোসেনের দিকে। বলার অনেককিছু থাকলেও তিনি বলতে পারলেন না। একটি অসময়ের আষাঢ়ি ঝড়ে তার গর্ব করে বলবার মতো কথাগুলো উড়ে গিয়েছে। তাই এমন ভরা মজলিসে শাস্তি হিসেবে পয়েছে কেবল অপরাধীর মতো চুপ করে শ্রবণ করার ধর্ম।
জোহরার রাগে মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। বড়োদের মাঝে তর্ক করার অভ্যাস তার নেই। সে পারেও না তর্ক করতে। কিন্তু বাবার অপমান সহ্যও করবে কীভাবে? তাই না চাইতেও শান্ত কণ্ঠে বলল,
“খালু, ইমন ভাইয়ের এ অবস্থা না হলে হয়ত আমরা কখনোই আর একত্রিত হতাম না। তাই এই কথাগুলো না বললে হয় না?”
“তুমি শেখাবে এখন আমি কী বলব? তোমাদের মতো অসভ্য, ছেলেদের হাত ধরে পালানো…”
“খবরদার! বাকি কথাটুকু যেন আপনি আর না বের করেন।” যাবের শিকদার শীতল অথচ ধারালো স্বরে কথাটি বলেই দাঁড়িয়ে গেলেন। মেয়ের হাত ধরে টেনে তুলে আদেশের ভঙ্গিতে বললেন,
“টুইটুবানি, ইমনকে সব গুছিয়ে বের হতে বলে আসো। এখনই আমরা ঢাকার জন্য বের হবো।”
শাহানা বেগম আঁতকে উঠলেন। স্বামীকে বোঝানোর ক্ষমতা তার নেই। এ লোক ছেলের শোকে উন্মাদ। তাই বোঝাতে এলেন যাবের শিকদারকেই,
“দুলাভাই, এমন করবেন না। আপাটার স্মৃতি এই ছেলেমেয়েগুলো। অথচ আপার সাথে সাথে এদেরও আমি হারিয়ে ফেললাম। যাও কোনো এক ইশারায় এদের পেলাম অথচ সেই আবার মান-অভিমান পুষে রেখেই চলে যাবেন?”
যাবের শিকদার একদম শীতল রইলেন। কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। বরং কোমল কণ্ঠে বললেন,
“তোমার আপাতো বেঁচেই গিয়েছেন চলে গিয়ে। তাকে আর ছোটোবড়ো মানুষদের থেকে অপমান সহ্য করতে হচ্ছে না। জ্বালাতো হয়েছে আমার। না সন্তান ফেলতে পারলাম, না সন্তানদের নিয়ে খারাপ কথা শুনতে পারলাম। বাপ হওয়ার অনেক জ্বালা, বুঝলেতো শাহানা।”
—————
সন্ধ্যে গড়িয়েছে। যাবের শিকদার সত্যি সত্যি অসুস্থ ছেলেকে নিয়েই বেরিয়ে গিয়েছেন। শুক্লা, শাহানা বেগম বলেও আটকাতে পারেননি তাদের কাউকেই।
শেষমেশ তাদের জন্য মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করে দিলো শুক্লা তা-ও অনেক অনুনয়, বিনয় করে। যাবের শিকদার রাজিই হচ্ছিলেন না। শেষমেশ অসুস্থ ছেলের কথা ভেবেই নিজের সামান্য অহং দমিয়ে ফেলতে হয়েই ছিলো। ঐ যে বাবা হওয়ার জ্বালা এখানেই!
শুক্লা বেশ কয়েক জায়গায় ফোন করে অবশেষে ব্যবস্থা করতে পারল। মাইক্রোবাসটি নিয়ে এলো সিকান্দার।
·
·
·
চলবে……………………………………………………