সমুদ্রের গর্জন, বাতাসের ফিসফিস শব্দে মুখরিত চারিপাশ। আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করছে অর্ধখণ্ডিত চাঁদ। রোযা মাথাটা ডান পাশে ঘুরিয়ে ফেলল। লজ্জায় চোখ বন্ধ করল একমুহূর্তের জন্য। শ্বাসও নিলো না অনেকক্ষণ। স্পর্শ ব্যতীতও যে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত হতে পারে তা বুঝি সে আজই অনুভব করল। নৈকট্যে আদিলের উপস্তিতি যেন ঘনিষ্ঠতার অন্তিম স্তর। কাঁপতে চাওয়া কণ্ঠকে স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন ছুড়ল -
‘বাজে কথা বলে আমাকে এড়াতে চাইছেন?’
রোযার ঘাড়ের কাছে আদিলের মাথাটা ছিল। কানের খুব কাছে মৃদুস্বরে হাসায় তা তার হৃৎপিণ্ডে গিয়ে বাড়ি খেলো যেমন। কানে বাজল উত্তরটুকু -
‘আপনাকে এড়ানোর সাধ্য কিংবা স্পর্ধা দুটোর একটাও এই আদিল মির্জা নেই।’
রোযা আড়চোখে তাকাল। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট দেখা গেল আদিলের ধূসর চোখের উত্তপ্ত দৃষ্টি। ব্যস, চোখে চোখ পড়তেই সম্মোহন হওয়ার মতোই চেয়ে রইল সে। কী ভীষণ জোরে বিট করতে থাকল তার হৃৎপিণ্ড। যেন হৃৎপিণ্ড গলায় চলে আসবে। অথচ বরাবরই হেরে যাওয়ার পাত্রী রোযা ছিলো না -
‘আপনার মুখে স্পর্ধা শব্দটা মানাচ্ছে না। বরং এটা বলুন আপনার ডিকশিনারিতে স্পর্ধার কয়েকরকমের স্তর আছে। যার সবগুলোতে আপনি এ-প্লাস পাওয়া একজন। আমার সাথে কি কি করেছেন, ভাবুন!’
আদিল মাথাটা আরও নোয়াল। রোযার ধারালো মুখে চেয়ে ডান ভ্রু তুলল, ‘কী করেছি?’
‘লিস্ট করতে বসলে পুরো রাত লাগবে।’
‘তাই? আচ্ছা। লিস্ট তোলা থাক। অন্য এক রাতে শুনব। আজকের রাতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।’
‘কী কাজ?’
বলতে বলতে রোযার চোখ গেল অদূরেই। এদিকটায় আলো নেই, চাঁদের আলো ব্যতীত। সেই আলোতেই অস্পষ্ট ভাবে যেই শরীর দেখল, চিনতে ভুল হলো না তার। ঋণা সওদাগর দাঁড়িয়ে আছে। রাগে ফুঁসছে নিশ্চয়ই? রোযা দেখতে পারছে, কল্পনা করতে পারছে। ওই রাগ হিমালয় ছোঁয়াতে চাইল সে। মুহুর্তে স্বেচ্ছায় খানিকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়াল আদিলের। মাথাটা এমন কোণ করে রাখল যেন ওখান থেকে দেখে মনে হয় চুমু খাচ্ছে দুজন। সেসব অবশ্য আদিল লক্ষ্য করেনি। শান্তর ইশারা দেখে বলল -
‘আপাতত গাড়িতে উঠে বসুন।’
রোযা চকিতে তাকাল, ‘আর আপনি?’
আদিল রোযার শাড়ির আঁচল আগলে নেয় প্রথমেই। গাড়ির ব্যাকসিটে বসিয়ে দিয়ে সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বলে -
‘ফিরতে একটু দেরি হবে।’
রোযার চোখমুখ, কণ্ঠে রাজ্যের চিন্তা, ‘কিছু হয়েছে? আগের গাড়িগুলো ব্যবহার করছেন না যে? হেলিকপ্টারে কিছু হয়েছে?’
‘তেমন কিছু না। যাও তুমি।’
গাড়ির দরজার লাগিয়ে আদিল ইশারা করল ক্লান্ত, ধ্রুবকে গাড়ি টেনে বেরুতে। অথচ রোযা কাঁচ নামিয়ে তাকাল ফের, ‘সাবধানে থাকবেন।’
গাড়ি চলে যাচ্ছে অথচ আদিল থমকে রইল। মস্তিষ্কে রোযার ফেলা যাওয়া কথাটুকু বারংবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকল। তার গলার অ্যাডামস অ্যাপল ওঠানামা করল। চোখের পাতায় ভাসল রোযার সুন্দর মুখের একেকটি অভিব্যক্তি!
—————
আব্দুল মান্নান ঘাড়টা সামনে বাড়িয়ে আদিলের পেছনে চেয়ে কাউকে একটা খুঁজতে খুঁজতে ফট করে বলে বসলেন -
‘ম্যাডামরে এতো তাড়াতাড়ি পাঠাইয়া দিলা কেন? রাত তো কেবলই শুরু। থাকতো তোমার পাশে পাশে। দু ঢোক খেতো আমাদের সাথে।’
দিকপাল চ্যাটার্জি হতাশ হলেন। আব্দুল মান্নানও ততক্ষণে নিজের ভুল বুঝে শুকনো কণ্ঠে হেসে এড়াতে চাইলেন অন্যকিছু বলে। সুযোগ পেলে তো! ততক্ষণে আদিল সোজা তার পাশে এসে বসল। শান্তকে ইশারা করতেই শান্ত টেবিলে সাজানো গ্লাসে লাল রঙের মদ ঢালল ভরতি করে। আদিল মদের গ্লাস মন্ত্রীর হাতে ধরিয়ে শুধাল -
‘কেনো মন্ত্রী সাহেব? আমার সাথে খেয়ে মজা পান না?’
আব্দুল মান্নান ইতোমধ্যে ভালোরকমই গিলেছেন মদ। তাইতো মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন। সজ্ঞানে আর যাইহোক আদিল মির্জার গর্তে হাত ঢোকাবেন না। কোনোরকমে ফাঁকা হেসে পরিস্থিতি সামলাতে যা পারলেন বললেন -
‘রাগ করেন কেন বাপজান! ম্যাডাম তো আমার মা। ফাজলামো করছি।’
আদিল সে কথা কানে তুলল না। উল্টো বলল, ‘আসেন দু ঢোক খাবেন আমার সাথে। এতো শখ যেহেতু আপনার। মিটিয়ে দিই।’
আব্দুল মান্নান আড়চোখে তাকালেন আশেপাশে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর উরুর ওপরে সদ্য বিবাহিত স্ত্রী বসে চেয়ে আছে এদিকে। এদিকে বলতে, শুধুমাত্র আদিল মির্জার শক্তপোক্ত, থমথমে মুখের দিকে চেয়ে আছে। এতে খানিক আহত অনুভব করলেন তিনি। বয়স হলে বুঝি মূল্য থাকে না? আদিলের আর তাড়া দেয়ার প্রয়োজন পড়ল না। আব্দুল মান্নাব গিলে নিলেন গ্লাসের পুরোটা। শান্ত পুনরায় ভরল গ্লাস। আব্দুল মান্নান চোখ রাঙালেন -
‘আদিল! তুমিও খাইবা সাথে।’
আদিল মানল সে কথা। পাশের গ্লাসের মদটুকু গিলল সে। নীরবতা ভাঙল বাকিরা। বাহবা দিচ্ছে, আস্কারা দিচ্ছে তাদের ড্রিংক কম্পিটিশনে। একপর্যায়ে আব্দুল মান্নান সাহেব মদ গিলতে গিলতে নেশায় বুদ হয়ে মাথাটা এলিয়ে দিলেন সোফায়। আদিলের চোখমুখে নেশার ‘ন’ও নেই। রীভা আরও গাঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাহু, বলল -
‘মির্জা সাহেব তো দেখছি চমৎকার ড্রিংকার।’
বিপরীতে আদিল নির্বিকার। দৃষ্টি তুলে তাকায়নি অবধি। গ্লাভস পরিহিত হাতে থাকা মদের গ্লাসেই দৃষ্টি আবদ্ধ থাকল। সোফায় মৃ ত লা শের মতন পড়ে থাকা আব্দুল মান্নান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঘোলা ঘোলা চোখে তাকালেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দিকে -
‘এই মিঁয়া, শুধু নিজেরটা ভাবলে হইব? আমাগো লইগা কোনো এন্তেজাম করেন নাই নাকি? আমরা একটু সোহাগ কি পাইতে পারি না?’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চোখ রাঙালেন তবে দ্বিমত করলেন না। তার হাতের ইশারায় নাইট ক্লাবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রমণীরা হাজির হলো। বাজল মৃদু গতিতে রোমাঞ্চকর গান। শুরু হলো রমণীদের কোমর দোলানো। ওতে পোষাল না আব্দুল মান্নানের। আধবুড়ো ততক্ষণে একজনের কোমর ধরে দুলতে দুলতে বললেন -
‘ঝাকানাকা গান।’
শান্তর চোখমুখ একমুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেল। এলেন আবার বরাবরই নির্বিকার। ততক্ষণে গান বেজে উঠেছে -
‘গোলাপি চোখে জাদু, আকাশী গাল আমার…
অলরেডি বসে আছি, হবো রানি তোমার।’
—————
আন্ডারওয়ার্ল্ডের কে না জানে আদিল মির্জার ক্ষমতার কথা? কে না জানে তাকে ঘিরে থাকা বডিগার্ডরা কতটা ধারালো, তীক্ষ্ণ আর বিশ্বস্ত হয়? বিশেষ করে তার ডান হাত আর বাম হাত—শান্ত আর এলেন। আদিল মির্জার এই দুজন বডিগার্ডকে একসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিশ্বস্ত পনেরোজন বডিগার্ডের সমান বলা হয়। কথাটা এতদিন ছিল কেবলই গুঞ্জন। আজ, সেই গুঞ্জনই প্রমাণ হয়ে গেল সবার চোখের সামনে।
ভরা মজলিস চলাকালীন হঠাৎ কোথা থেকে ছুটে এলো একটা গু লি। নিশানা ছিল সোজা আদিল মির্জার বুক। পুরোপুরি মে রে ফেলার যেন অদম্য জেদ, পরিকল্পনা। কিন্তু আদিল মির্জাকে ছুঁতে হলে তো আগে শান্তকে পেরোতে হবে! গু লি ছুটে আসার আগেই বিপদ টের পেয়ে শান্ত ঝাঁপিয়ে পড়েছে সোফায় পায়ের ওপরে পা তুলে বসে থাকা আদিলের ওপর। মুহূর্তের মধ্যে সোফাসহ দুজন উল্টে পড়ল মেঝেতে। পরের সেকেন্ডেই শান্ত সোফাটাকে টেনে নিজেদের সামনে ঢাল বানিয়ে ফেলল।
প্রথম গু লিটা এসে গেঁথে গেল সোফার নরম ফোমে। এরপরে আর থামাথামি নেই, ক্রমান্বয়ে গু লি চালানো হয় অপর প্রান্ত। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে গেল সোফার ফোম। তুলোর মতো সাদা ফোম ছিটকে পড়তে লাগল ফ্লোরে। রুমের প্রত্যেকে তখন হতবিহ্বল, সচেতন। দিকপাল চ্যাটার্জি চিৎকার করে ছুটে আসতে আসতে বলে উঠলেন -
'আদিল! আদিল! ঠিক আছো তুমি?'
শান্ত একটুও নড়ল না আদিলের সামনে থেকে। ঠাঁই হয়ে আছে। বিপরীতে আদিল হাত বাড়িয়ে ছেলেটার কাঁধ মৃদু ভঙ্গিতে থাপড়ে আশ্বস্ত করল। সরতে ইশারা করল। শান্ত তবুও নড়ে না, তখনো সচেতন -
'বস, এখন নয়। এলেন ক্লিয়ার করুক আগে।'
অন্যদিকে এলেন ইতোমধ্যে এগিয়ে গিয়েছে। পাল্টা ছুড়েছে গু লি। শরীর জানালার পাশে আড়াল করে মাথাটা সামান্য উঁচু করে ওপাশটা পর্যবেক্ষণ করে গেল। অন্ধকারে সবকিছু অস্পষ্ট। তবে এটা যে কোনো আকস্মিক হামলা নয় তা স্পষ্ট। এটা ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো, পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ। এলেন ফিরে আসতে আসতে ততক্ষণে আদিল উঠে দাঁড়িয়েছে -
‘জিন্দা হোক কিংবা লাশ, আমার সামনে চাই ওদের।’
আদেশটা শুনেই শান্ত আর এলেন নিজেদের লোকজন নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বারো তলা ভবনের নয় নম্বর ফ্লোরের মিটিং রুমে তখন আদিলের সঙ্গে উপস্থিত দিকপাল চ্যাটার্জি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুল মান্নান, তার ছোটো ভাই জয়নাল আবেদীন এবং আলমগীর সওদাগর সহ আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেকেই।
আজ ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিয়ে। বিয়ের প্রোগ্রাম বাহানা মাত্র! মূল উদ্দেশ্য ছিলো সবাইকে হাতের কাছে রাখা, সামনে নির্বাচন তো। এইসময়ে এমন কাজের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কিংবা আব্দুল মান্নানের কেউই জড়াবে না। তারা জড়িত থাকার সম্ভাবনা কম। আদিলের শক্ত চোখমুখের অভিব্যক্তির আহামরি পরিবর্তন এলো না। তখনো সদ্য ঘটে যাওয়া হামলায় সবাই স্তব্ধ। কেউ দেয়ালের আড়ালে, কেউ টেবিলের পাশে, প্রাণ বাঁচাতে যে যেখানে পেরেছে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। আদিলের দৃষ্টি গিয়ে থামল জানালার দিকে। কাঁচে স্পষ্ট গু লির গর্ত।
আদিল ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। গু লির চিহ্নটা একবার ভালো করে দেখল। দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফেলল মিটিং রুমে উপস্থিত প্রত্যেকের মুখের ওপর। দিকপাল চ্যাটার্জি আপাদমস্তক আদিলকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর কঠিন মুখে বললেন -
‘শুধু তোমার ওপর হামলা নয়, আদিল। এটা একেবারে প্রিপ্ল্যানড অপারেশন।'
দিকপাল চ্যাটার্জির কথা শেষ হতেই ঘরজুড়ে নেমে এলো থমথমে নীরবতা। পরপরই সেই নীরবতা ভেঙে শোনা গেলো মৃদু হাসির শব্দ। কৌতুকমিশ্রিত। অস্বাভাবিক রকমের শান্তও। আদিল হাসতে হাসতেই সামনে এগিয়ে গেল। তার চোখ প্রথমে গিয়ে থামল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা জয়নাল আবেদীনের ওপর, কয়েক সেকেন্ড অব্যাহত থাকল। বিপরীতে জয়নাল ভীষণ শান্ত, অতিমাত্রায় শান্ত। পাল্লা দিয়েই চেয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ততক্ষণে লোকজন পাঠিয়েছেন। তিনি আদিলের দিকে চেয়ে দৃঢ় গলায় বললেন -
'যেহেতু তুমি আক্র মণ হয়েছো আমার প্রোগ্রামে এসে, তাহলে দাঁড়াচ্ছে সিকিউরিটির সমস্যা আমার তরফ থেকে এসেছে। এর সমাধানও আমি করব। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এই আক্রমণের মাস্টারমাইন্ডকে নিয়ে আসব তোমার সামনে।'
আদিল প্রত্যুত্তরে নীরব। তার দৃষ্টি থেমেছে আলমগীর সওদাগরের দিকে। ঠোঁটের কোণে হাসিটা তখনও লেগে আছে। সচরাচর তাকে হাসতে দেখা যায় না বলেই হাসিটা খুবই ভয়ংকরী দেখাল। আদিলের কণ্ঠ গম্ভীর শোনাল পূর্বের চেয়েও -
‘আমিও জানতে আগ্রহী।’
এক মুহূর্ত থামল সে, 'মন্ত্রী সাহেব, আমিও জানতে আগ্রহী কার এত বড় কলিজা হলো!’
আদিল পিস্তলটা হাতে ঘোরাল, 'আমার গাড়িতে হাত দিয়েছে। আমার হেলিকপ্টারে ঝামেলা করেছে। আজ সরাসরি আমার বুকের দিকে গুলি ছুড়েছে।’
এইপর্যায়ে এসে আদিলের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো হয়ে উঠল বরফশীতল -
'ভুলটা একটা জায়গাতেই করেছে। আমাকে মেরে ফেলতে পারেনি।’
আদিলের কদম গিয়ে থামল জয়নাল আবেদীনের সামনে -
‘ওরা টার্গেট মিস করলেও, এই আদিল মির্জার টার্গেট কখনো মিস হয় না।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি তাকালেন ছোটো ভাইয়ের দিকে এরপর আদিলের দিকে। জয়নালের তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। আব্দুল মান্নানের নেশা কেটেছে। ভদ্রলোক নিজের গার্ডের উদ্দেশ্যে বললেন -
‘এহানে আর থাকা যাইব না রে কাল্লু। আমার মাথা ঘুরাচ্ছে। আমারে বাড়ি নিয়া যা। কে কোন দিক দিয়ে পু ট কি মারব বুঝমু না। আমি যাই, তোমরা আড্ডা দাও।’
বলতে দেরি, তার পালাতে দেরি হলো না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর চোখমুখ অন্ধকার হয়ে আছে। শান্ত আর এলেন ফিরে এলো কিছুক্ষণ পরেই। শান্ত আদিলের কানের কাছে বলে -
‘একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’
আদিল অনুমান করেছিল। তার নিজস্ব হেলিকপ্টার, গাড়ির আশেপাশে বাইরের মানুষ ঘেঁষতে পারবে না সহজে। সেখানে ঝামেলা করা তো দূরের বিষয়! ভাবভঙ্গির কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হলো তার। সোজা বেরিয়ে এলো রুম থেকে।
—————
রাগান্বিত ঋণা ভাঙল হাতের কাছে যা পেলো। ভাঙচুরের আওয়াজ ভেসে বেড়াল চারপাশে। চোখের পাতায় যতবার দৃশ্য গুলো ভেসে উঠছে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে বুকের ভেতরটা। শ্বাস নিতেও যে কষ্ট হচ্ছে! কীভাবে দাঁড়িয়ে দেখেছিল ওই নাচ তা শুধু সে নিজে জানে! র ক্ত গলেগলে পড়ছিল হৃৎপিণ্ড থেকে। ওটা কোন আদিল মির্জা ছিলো? ঋণা যে চিনতেই পারল না। এতো পরিবর্তিত! এতো! আলমগীর সওদাগর চোখ রাঙালেন -
‘থামবি তুই!!’
ঋণা থামল। পরমুহূর্তেই নিজের চুলগুলো দু-হাতে খামচে ধরে বসে পড়ল। পাগলের মতো বিড়বিড় করল -
‘ড্যাড, ওই মেয়েকে আমি ধ্বংস করে দেব। ও বেঁচে থাকতে পারবে না। কোনো ভাবেই না। ওকে মে রে ফেলব আমি।’
আলমগীর সওদাগর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন -
‘সময় লাগবে, বললাম তো! কড়া গার্ডে থাকে। দেখিস না আদিল কীভাবে আগলে রেখেছে? লোক লাগিয়েছি তো। চেষ্টা করছে তো! আদিল ওর স্ত্রীকে বেরুতেই দেয় না। আমার ক্ষম তা ওত নেই যে টেনে বের করে মে রে ফেলব। উল্টো দেখা যাবে আমি মা রা পড়েছি। আমারই ক্ষ তি হবে। সময় বুঝে কো প বসাতে হবে।’
হিংস্র হয়ে উঠেছে ঋণা, ‘ওই মা ** ধরতে না পারলে ওর ফ্যামিলি আছে না? মে রে ফেলব প্রত্যেকটাকে।’
‘আহ! মাথা ঠান্ডা কর। ওখানেও আদিলের বিশ্বস্ত গার্ড আছে। ওর গার্ডদের পাওয়ার জানিস না?’
থামলেন আলমগীর সওদাগর। ঋণা উত্তেজিত হয়ে উঠবে দেখে পুনরায় বললেন। যা বললেন তা শুনে ঋণার আজহারি থেমে গেল হঠাৎ। দুহাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখমুখ মুছে বলে -
‘তবেই তাই হোক।’
—————
সমুদ্রের পাশের নির্জন রাস্তা পিষে, কুয়াশা মাড়িয়ে ছুটছে গাড়ি তিনটে। কনকনে শীত পড়েছে সেন্ট মার্টিনে। গাড়ির ভেতরে বসেও রোযা কাঁপল সামান্য। কিছুক্ষণ আগেই মরিয়ম বেগমের সাথে ভিডিওকলে কথা বলল। ভদ্রমহিলা ঘুমন্ত হৃদিকে দেখালেন। পুতুল জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। এতে কিছুটা শান্ত হলো তার হৃদয়। গাড়ি তিনটে এসে থেমেছে একটি কটেজের সামনে। রোযা বেরুল না সাথে সাথে। রাত এখানে কাটাবে! বাইরের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে ফেলল ড্রাইভিং সিটে বসা ক্লান্তর ওপর। ক্লান্ত ততক্ষণে বেরিয়ে এসে ব্যাকসিটের দরজা মেলে ধরেছে। রোযা জিজ্ঞেস করল -
‘ফিরব না আজ, তাইতো?’
‘জি ম্যাডাম।’
রোযা বেরিয়ে এলো। এই জায়গাটা বেশ নির্জন প্রান্তে। সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর নারকেল-সুপারি গাছের ঘন সবুজের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কটেজটি। বাইরে থেকে দেখে খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ মনে হয়নি। অথচ ভেতরে এসে বুঝল কতটা রুচিসম্মত ভাবে বানানো হয়েছে! দোতলা কাঠ-পাথরের সুন্দর স্থাপনা। চারপাশে ছায়াঘেরা বাগান, সরু পাথরের পথ আর অসংখ্য নারকেলগাছ। কটেজের সামনের প্রশস্ত কাঠের বারান্দা পেরোলেই চোখ চলে যায় একেবারে নীল সমুদ্রের দিকে। জোয়ারের সময় চলছে। ঢেউয়ের শব্দ কানে এসে লাগছে এই নির্জন রাতে। রোযা চারিপাশটা আগ্রহ নিয়ে দেখতে দেখতে শুধাল -
‘এটাও বুঝি আমাদের সম্পত্তি?’
ক্লান্তর চোখের পাপড়ি কাঁপল। ধ্রুবের নির্বিকার মুখও চকচক করল চাঁদের আলোয়। ক্লান্ত স্বস্তি, হাসি চেপে স্বাভাবিক থেকে বলে -
‘জি ম্যাডাম। আরও আছে।’
মাথার ওপরে চাঁদ, চারিপাশে হলদে আলো, মৃদু বাতাস আর শীতল রাতের তীব্র কুয়াশায় — এই যেন চাঁদের বাড়ি। মুগ্ধ হলো রোযার মন। ভরে এলো প্রাণ। ভেতরটা এমনিতেও ভীষণ হালকা হয়ে আছে। কোনো কিছুর চিন্তা নেই বলেই হয়তোবা। হৃৎপিণ্ডে যেই ভারি ভাবটা থাকতো সদা তা তো সরে গিয়েছে।
প্রফুল্লচিত্তে রোযা আশপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখল, পিছু পিছু ঘুরল ক্লান্ত, ধ্রুব। রোযা যখন বাইরেটা ঘুরে ভেতরে প্রবেশ করল, ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল দুয়ারের কাছেই। রাজকীয় ভাবেই সাজিয়ে রাখা সবটা।
সামনের রুমটাতেই প্রবেশ করল সে। বিশাল বড়ো একটা রুম। একপাশের সোফায় শপিং ব্যাগ রাখা। রোযা হাতে তুলে নিলো সেটা। কাপড়চোপড় বলতে সেই শাড়ি আনিয়ে রেখেছে। রাতেও কি শাড়ি পরবে? আশ্চর্য! কে শাড়ি পরে ঘুমায়? লোকটা তো চায়ই চব্বিশঘণ্টা যেন সে শাড়ি পরেই থাকে। শপিং ব্যাগটা রেখে রোযা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাতের এই সমুদ্রের দৃশ্য মুগ্ধ করল তাকে। রেলিঙে হেলান দিয়ে উপভোগ করল অনেকটা সময় যাবত। একপর্যায়ে শীতে রীতিমতো বরফ হয়ে এলো শরীর। দ্রুতো ভেতরে চলে এলো। হাতমুখ ধুয়ে শাড়িটা পরিবর্তন করে ফেলল। দরজায় করাঘাত পড়ল -
‘ম্যাডাম, আমি চাঁদনী। এই কটেজের দেখভাল করি। আমি কি আসতে পারি?’
রাতের দুটো বাজছে দেয়াল ঘড়িতে। রোযা প্রবেশ করতে বলল না। নিজেই বেরিয়ে এলো দরজার কাছে বেরুবে বলে। অল্পবয়সী এক রমণী তার সামনে। আনুমানিক চব্বিশ, পঁচিশ হবে বয়স। রোযাকে দেখে মেয়েটা মুগ্ধ চোখে চেয়ে সামান্য ভড়কেছে। পুনরায় দৃষ্টি নুইয়ে রাখল। জিজ্ঞেস করল স্বচ্ছ কণ্ঠে -
‘ডাইনিংয়ে খাবার লাগাব, ম্যাডাম?’
রোযার কণ্ঠ ভাবুক শোনাল, ‘উহুঁ, উনি আসুক।’
ম্যাডাম ‘উনি’ বলে কাকে বুঝিয়েছে, বুঝল চাঁদনী। তাই আর কথা বাড়াল না। বেরিয়ে গেল। রোযা এসে বসল সোফায়। ক্লান্ত লাগছে, তাই আর ইচ্ছে করল না দোতলাটা ঘুরে দেখার। সোফায় মাথাটা এলিয়ে এম্নিতেই চোখ বুজে রাখল। মন খচখচ করছে। তখন ওমন একটা কথা বলে রোযাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। এতো ব্যস্ত! কিছু বোধহয় হয়েছে। ভাবতে ভাবতে কখন সত্যিকার অর্থে ঘুমিয়ে পড়ল জানা নেই। ঘুম ভাঙল হঠাৎ। লম্বা একটা ছায়া তার ওপরে। বাল্বের আলো ঢেকে গিয়েছে সামনে দাঁড়ানো লম্বাচওড়া, সুঠামদেহি মানুষটার জন্য। রোযা সদ্য ঘুম ভাঙা ভাসা চোখে চেয়ে হেলানো থেকে উঠতে চেয়ে আওড়াল -
‘কখন এলেন? ডাকলেন না ক্যানো?’
আদিলের জবাব এলো না। তবে তার সামনে দু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সেদিনের মতোই মাথাটা রাখল রোযার কোলে। রোযার ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল এতে। খেয়াল করল মানুষটার গায়ে কোট নেই, হাতে গ্লাভস নেই। উষ্কখুষ্ক চুলের অবস্থা। ম দের গন্ধ, পারফিউমের গন্ধ মিলিয়ে গিয়েছে কেমন! রোযার হাতটা চলে গেল আদিলের চুলের ভাঁজেভাঁজে। তাতে কেমন স্বস্তির শ্বাস ফেলল আদিল। চোখ বুজল। রোযার হাত চলে এল তার কপালে। রোযা কপাল মাসাজ করতে করতে অসন্তুষ্ট হয়ে বলে গেল নিজের মতন -
‘ক্লান্ত লাগছে? লাগবেই তো। আপনি মানুষ, কোনো রোবট নন। আমি খেয়াল করেছি আপনি রেস্ট করেন না। পর্যাপ্ত ঘুমান না অবধি। আর খাওয়াদাওয়ার কোনো শৃঙ্খলা নেই। এইভাবে মানুষ বাঁচে?’
বিপরীতে নীরবতা বইল কিছুক্ষণের। রোযা ফের কিছু বলবে তার আগেই তার নামের ডাক পড়ল -
‘রোজআ…..’
‘হু? খারাপ লাগছে? ড্রিংক করেছেন কেনো এতো? সবকিছুর তো একটা লিমিট আছে নাকি! এগুলোর কতো বাজে প্রভাব পড়তে পারে শরীরে জানেন?’
কোল থেকে মাথা তুলে তাকাল আদিল। চিন্তিত মুখটা তার মুখের ভীষণ কাছে। সুন্দর মুখের সর্বত্রে চোখ বুলাল। চোখে চোখ পড়তেই রোযার শ্বাস কণ্ঠনালিতে আটকে গেল। ওই চোখে যে তার সর্বনাশ লেখা। আদিল ফিসফিস করে শুধাল -
‘ইউ’র নট আ ড্রিম, আর ইউ?’
রোযা প্রথমেই বুঝল না। আদিল আওড়ে গেল, ‘তুমি স্বপ্ন হলে আদিল মির্জা ভেঙেচুরে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।’
ধক করে উঠল রোযার হৃৎপিণ্ড। ব্যথায় টনটন করে উঠল তা। আদিলের মাথাটা ততক্ষণে তার ঘাড়ের কাছে চলে এসেছে। ড্রাগ নেবার মতোই ঘ্রাণ টেনে নিলো তার শরীরের। স্পর্শ ব্যতীতই রোযার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল, জমে গেল জায়গায়। সমুদ্রের অতলে ডুবতে বসা নাবিকের মতোই হাহাকার করে উঠল তার ভেতরটা। অস্থির ভঙ্গিতে দুহাতে ঠেলল আদিলের শক্তপোক্ত বুক। বাহানা দিয়ে উঠে দাঁড়াল বিদ্যুৎ গতিতে -
‘হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিবেন। পানি এনে দিই আগে এক গ্লাস।’
রোযা কদম বাড়াল চটজলদি। পালাতে ব্যাকুল হয়ে পড়ল সে। প্রত্যেকটা এগুনো কদমের সাথে জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিচ্ছিল ভেতরে। অথচ চার কদমের পড়ে আর একটি কদমও বাড়াতে পারল না। টান পড়ল আঁচলে। রোযা জমে গেল সাথে সাথে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল আদিল দু-হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই আঁচল টেনে ধরে প্যাঁচিয়ে নিচ্ছে তার ডান হাতের মুঠোয়। তা ধীরে ধীরে টেনে জড়ো করছে মুঠোতে। প্রত্যেকটা টানে রোযা না এগুলে আঁচল সহ শাড়ি খুলে পড়তে সময় নেবে না যে! রোযা বাধ্য হয় প্রত্যেকটা টানে পিছুতে, ক্রমশ তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে।
‘আঁচল ছাড়ুন–’
ততক্ষণে আদিল উঠে দাঁড়িয়েছে। লম্বাচওড়া শরীরটার ছায়া নিজের ওপরে পেতেই রোযা চোখ বুজে ফেলল। আকাঙ্খা মোতাবেক কোনো স্পর্শ পেলো না। শুধু ঘাড়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করল। শিউরে উঠল তার শরীর। অনেকক্ষণ নীরবতা বয়ে গেল শুধু। রোযার হৃৎপিণ্ড ধীরে ধীরে গলায় এসে বসল। ফিরে না তাকিয়েই আঁচলটা ছাড়াতে টানল সামান্য।
অথচ পরমুহূর্তেই আঁচলে বিশ্রী এক টান পড়ল। রোযা সে টানে নড়ে উঠল, আঁতকে উঠল। নিজেকে আবিস্কার করল আদিলের শক্তপোক্ত বুকের ভাঁজে ভাঁজে। শাড়ি সামনে থেকে সরে লুটিয়ে পড়েছে ফ্লোরে। মুহূর্তে রোযা চোখমুখ বুজে আরও মিশে গেল আদিলের সাথে। নিজেকে লুকোনোর শেষ প্রয়াস মাত্র। পরমুহূর্তেই যে কেঁপে উঠল উষ্ণ সান্নিধ্য পেয়ে। অনুভব করতে পারল আদিলের বুকের অস্বাভাবিক, বেগতিক অবস্থা! বিপরীতে আদিল তখনো ছুঁলো না তাকে। শুধু তার উষ্ণ শ্বাসপ্রশ্বাসের স্পর্শ ঘাড়ে পড়তে থাকল -
‘তোমার প্রেম মোবারকের সাথে আরেকটা মোবারক যোগ হবে আজ!’
রোযা বুকে মুখ গুঁজে রেখেই আওড়াল, ‘কী?’
‘আমার হক পাওয়ার মোবারক। মোবারকবাদ দিবে না?’
রোযার গা কাঁটা দিয়ে উঠল লজ্জায়। ওভাবে বুকে লুকিয়ে বলে গেল, ‘কে বলল হক পাবেন?’
আদিলের ঠোঁট এসে ছুঁয়েছে রোযার কানে লতি, ‘আদায় করে নিতে জানি।’
রোযা দুর্বল হয়ে পড়ছে ক্রমশ, ‘অপেক্ষা করেছেন কেন তবে? করে নিতেন আদায়! জোর খাটাতে তো আপনি ওস্তাদ।’
খসখসে, শক্ত পুরুষালি হাতটা রোযার নগ্ন কোমর জড়িয়ে ধরতেই থরথর করে কেঁপে উঠল সে। খামচে ধরল হাতটা। শরীর জুড়ে বিচরণ করা হাতটা কোনোভাবেই দমিয়ে রাখতে পারল না। আদিল আচমকা রোযার চোয়াল ধরে মাথাটা তুলল ওপরে। চোখে চোখ পড়তেই মিইয়ে এলো রোযা। আদিল ফিসফিস করে বলল -
‘জোর খাটিয়েছি সেখানে যেখানে জোর খাটালেও ছাড় পাওয়া যাবে। জোরপূর্বক হক আদায় করে নিলে আমায় এতো যত্ন করে প্রেম মোবারক কে জানাতো? এতো যত্ন, এতো প্রেম কি আমি পেতাম? আল্টিমেটলি, মাই পেইশেন্স ইজ দ্য কি টু দিস সাকসেস, ডোন্ট ইউ থিংক সো মাই বিলাভড?’
রোযা উত্তর করতে পারে না। দৃষ্টি নামায়। অনুভব করে ক্রমশ পাজোড়া শক্তি হারাচ্ছে। অগত্যা প্রত্যুত্তরে হঠাৎ দু-হাতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জাপ্টে ধরল আদিলের কোমর। শক্ত বুকের ভাঁজে গুঁজল মুখ। নিজের জবাব এতেই পেয়ে গিয়েছে আদিল। সঙ্গে সঙ্গে একহাতে তুলে ফেলল পাতলা শরীরটা। হাঁটা ধরল বেডরুমের দিকে। শাড়িটার অর্ধেকটাই লুটোপুটি খাচ্ছিল মেঝেতে।
মৃদু আলোয় ঘরটা নিভুনিভু হয়েছিল। বারান্দার দরজা খোলা বলে সমুদ্রের গুঞ্জন কানে এসে পৌঁছাল। রুমের দরজাটা শব্দ করে লাগানো হলো, যেই শব্দে বিছানার এককোণে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া রোযাও কেঁপে উঠল। আদিলকে বিছানার দিকে আসতে দেখেই রোযা ছটফটিয়ে উঠল। আদিল কালো শার্টটা ততক্ষণে খুলে ছুড়ে ফেলেছে শূন্যে। রোযা ওই দৃশ্যে আরও পিছুল।
যেই আদিল বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে কাঠের বিছানার এককোণ ভেঙে পড়ল শব্দ করে। পিনপতন নীরবতা ভাঙল খাট ভাঙার কটমটে শব্দে। একমুহূর্তের জন্য রুমের বাতাসও মনে হয় থমকেছিল। এমন ঘটনায় আদিল মির্জা তখনো তাজ্জব, ভ্যাবাচেকা খেয়েছে বেশ। রোযা লজ্জায় হতভম্ব হয়েছিল। পরমুহূর্তেই আদিলের ওমন চোখমুখ দেখে ফিক করে হেসে ফেলল। পরমুহূর্তেই ক্রমশ হাসতে হাসতে খিলখিল করে হেসে উঠল। তার রিনরিনে হাসির আওয়াজ ভেসে বেড়াল রুমের আনাচে কানাচে। সেই সৌন্দর্যের দিকে স্তব্ধ আদিল বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন আশেপাশে, জগতসংসারে আর কেউ নেই। কিচ্ছু নেই!
খাট ভাঙার শব্দটুকু বাইরেও এসে পৌঁছেছে। কটেজের বাইরের দুয়ার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আলাপে মজেছিল শান্ত, এলেন, ক্লান্ত আর ধ্রুব। ভয়ংকর ওই শব্দে হকচকিয়ে উঠল তিনজনই। কীসের শব্দ? শান্ত বস ডেকে হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করতে চাইলে এলেন বাহু টেনে ধরে থামাল বলদটাকে। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কাঠে টোকা মার ল -
‘বস, ইউ অলরাইট?’
বিপরীতে কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে শান্তর কণ্ঠ হিমালয় ছুঁলো, ‘বস ভেতরে আসছিইই।’
এবারে খসখসে কণ্ঠের জবাব এলো, ‘লাথি খাবি। গেট লস্ট!’
শান্তর ফটাফট জবাব, ‘ওকে।’
তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপসে গেল। তারা বোধহয় বুঝতে পারল এবং যা বুঝতে পারল তা ভীষণ অশ্লীল পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বুঝল।
আদিলের নগ্ন বুকে ছটফট করে উঠল রোযা। আদিল টলল না তাতে। সে কাঠের সিঁড়ি গুলো বেয়ে উঠে এসেছে দোতলায়। চাঁদের আলো দোতলার এই রুমে সোজা এসে পড়েছে। অন্ধকারেও কেমন জ্বলজ্বল করছে সব চাঁদের আলোয়। কুয়াশারাও জানালা, বারান্দা দিয়ে প্রবেশ করে বানিয়ে রেখেছে মেঘের বাড়ি। এতো কনকনে শীতেও আদিল অস্থির, ঘামছে রীতিমতো। রোযাকে বিছানায় ফেলে পালানোর আর পথ দিলো না এবার। নিজের ভারি শরীরের নিচে পিষে ফেলল। উন্মাদনার শীর্ষে পৌঁছাল তার প্রত্যেকটা কর্মকাণ্ড। অস্থির ভাবেই দুহাতে পালাক্রমে স্পর্শ করে গেল ছটফটিয়ে পালাতে চাওয়া শরীর। নিজের সিলমোহর বসাতে মরিয়া হয়ে উঠল। রোযার সংবেদনশীল ঘাড়ে দাঁত বসাতে বসাতে আওড়াল -
‘তোমার জন্য উন্মাদ এই আমাকে সামলে নাও, বিপরীতে তোমার হয়ে পুরো পৃথিবী আমি সামলে নেব।’
রোযা বিপরীতে শুধু শক্ত করে খামচে ধরল আদিলের পিঠ। ভাসা ভাসা চোখ মেলে চাইতেই আদিলের ধূসর দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল। র ক্ত পিপাসুদের মতোই লাগল চোখদুটো। পরপরই ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো তিরতির করে কাঁপতে থাকা গোলাপি ঠোঁটজোড়ায় নিজের উষ্ণ ঠোঁটজোড়া চেপে বসাল আদিল। ফিসফিসিয়ে বলা কথাগুলো ভেসে বেড়াল জোড়ালো শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে সাথে -
‘আফসোস করতে পারবে না আর।’
রোযা উত্তর করে না। আদিল তাকে বাধ্য করল সংবেদনশীল এই সময়ে, ‘উত্তর দাও…’
রোযা সমুদ্রে ডুবতে বসা নাবিকের মতো বলে, 'আফসোস করব না।’
‘বলো, আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না।’
‘যাবো না…কখনো যাবো না।’
আদিলের রগ ভেসে ওঠা পুরুষালি হাত নরম শক্তিতেই রোযার গলাটা চেপে ধরল। গলা ধরে মাথাটা তুলে আনল নিজের মুখের কাছে। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে গেল উদভ্রান্তের মতো -
‘রোজ-আ, আমাকে ছাড়তে পারবে না তুমি। এই জীবনে না। আফসোস করতে পারবে না কখনো। স্বাধীনতা বিহীন, চার দেয়ালের ভেতরেই থাকতে হবে সারাজীবন। সাধারণ মানুষের ন্যায় বিস্তৃত আকাশে পাখি হয়ে উড়তে পারবে না তুমি। তোমার উড়ার জায়গা শুধু আমার সান্নিধ্য! আমার বানিয়ে দেয়া আকাশেই শুধু উড়বে।’
রোযার চোখের কোণ ঘেঁষে নামক একফোঁটা চোখের জল…..
·
·
·
চলবে……………………………………………………