“এভাবে কেন মনমরা হয়ে বসে আছেন? সবার বিয়ে দেখে আপনারও বিয়ের সাধ জেগেছে নাকি? বললেই পারেন, পাত্র দেখা শুরু করি।”
কথাগুলো বলেই দুষ্টুমি মেশানো হাসিতে হেসে উঠল জায়ান। তারপর সাফার পাশেই বসে দুই হাত বেঞ্চের ওপর ভর দিয়ে সামান্য ঘাড় বাঁকিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল।কিন্তু সাফা তখনও মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।হঠাৎ কী হলো মেয়েটির?
জায়ানের মুখের হাসিটুকু মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। কণ্ঠে নেমে এলো উদ্বেগ,
—সাফা, কী হয়েছে আপনার?
হুট করেই সাফা মুখ তুলে তাকাল জায়ানের দিকে।
চোখ দুটো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে জলে। সেই জল যেন আর এক মুহূর্তও চোখের পাতার আড়ালে থাকতে চাইছে না।প্রায় দশ মিনিট ধরে এই নির্জন উদ্যানের এক কোণে বসে আছে সে। হঠাৎ করেই জায়ানকে ফোন করে বলেছিল, তার সঙ্গে দেখা করবে। সাফার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা শুনে জায়ান এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করেনি। ফোন পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছে তার কাছে।
কিন্তু এসে সাফার এই বিধ্বস্ত, বিষণ্ণ মুখটা দেখবে—এটা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না জায়ান। তার চোখের দিকে তাকিয়েই জায়ান দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, একেবারে মুখোমুখি। দুশ্চিন্তায় কঠিন হয়ে উঠেছে তার মুখাবয়ব।সাফার হাতটা ধরতে গিয়েও থেমে গেল সে।
কী হয়েছে, তা না জেনে তাকে স্পর্শ করার সাহস হলো না।
আর ওদিকে চোখ বেয়ে অনবরত ঝরে পড়ছে অশ্রু। একবার গড়িয়ে পড়া সেই অশ্রুধারা যেন থামার কোনো নামই নিচ্ছে না।সাফার অঝোর কান্না দেখে জায়ান ক্রমশই অস্থির হয়ে উঠছে। বুকের ভেতরটা কেমন অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠছে—মেয়েটা এভাবে কাঁদছে কেন? কী এমন হয়েছে, যার ভারে সাফার চোখের বাঁধ ভেঙে গেছে?
একপর্যায়ে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সাফা হঠাৎ করেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
জায়ান কী করবে, কীভাবে তাকে সামলাবে—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না। অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে শেষমেশ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল—
—সাফা, বলুন… কী হয়েছে আপনার? এভাবে কাঁদছেন কেন? বাসায় কিছু হয়েছে কি?
পার্কের আশপাশে থাকা কয়েকজনের দৃষ্টি ইতোমধ্যেই তাদের দিকে আটকে গেছে। কেউ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে।অথচ সাফার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে যেন চারপাশের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল নিজের অশ্রুর স্রোতেই ডুবে আছে।
জায়ান আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল।
—আরে সাফা… আপনি না বললে আমি বুঝব কীভাবে? প্লিজ, বলুন আমাকে। কী হয়েছে? এভাবে কাঁদবেন না। আমি সত্যিই আপনার কান্না সহ্য করতে পারছি না।
কণ্ঠটা ক্রমশ নরম হয়ে এলো তার।
কিছুক্ষণ থেমে আবার অসহায় স্বরে বলল—
—আপনাকে ছোঁয়ার অধিকার তো আমার নেই… তাই হাত বাড়িয়েও ধরছি না। কিন্তু প্লিজ, এভাবে কাঁদবেন না। আপনার চোখের পানি আমাকে ভেতর থেকে অসহায় করে দিচ্ছে।
জায়ানের ভীষণ ইচ্ছে করছে সাফাকে এক মুহূর্তে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে তার সমস্ত কষ্টটুকু নিজের মধ্যে শুষে নিতে। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে, বুকের কাছে আগলে রেখে জানতে—কী এমন হয়েছে, যে এতটা ভেঙে পড়েছে সে?
কিন্তু সেই অধিকারটুকু যে তার নেই।
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তাই হাত দুটো মুঠো করে নিজের কাছেই আটকে রাখল জায়ান। শুধু অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল সাফার অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে।
অবশেষে তার অব্যাহত কান্নার সামনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না জায়ান। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় কণ্ঠে বলল—
—আপনার কান্না দেখার জন্যই যদি আমাকে ডেকে থাকেন, তাহলে আমি চলে গেলাম।
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল জায়ান। তারপর কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আবারও পেছন ফিরে তাকাল।দেখল, সাফা এখনও আগের ভঙ্গিতেই বসে আছে। চোখের পানি থামার কোনো লক্ষণ নেই।
জায়ান এবার একটু জোরেই বলল—
—আমি কিন্তু সত্যিই গেলাম!
বলে আবারও কয়েক কদম এগিয়ে গেল।যেই না আবারও পিছনদিকে ফিরবে
ঠিক তখনই পেছন থেকে আচমকা ছুটে আসা কারও উপস্থিতি টের পেল সে। পরমুহূর্তেই সাফা ছুটে এসে তার বুকে আছড়ে পড়ল।
জায়ান যেন মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল।
পুরো শরীর থমকে গেছে তার। এমনভাবে, এমন আকস্মিকতায় সাফা তাকে জড়িয়ে ধরবে—এটা তার কল্পনারও অতীত। একবারও ভাবেনি, মেয়েটা এভাবে সমস্ত সংকোচ, দ্বিধা আর অভিমান ভুলে ছুটে এসে তার বুকে আশ্রয় নেবে।
হঠাৎ ধাক্কায় জায়ান সামান্য পেছনের দিকে হেলে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
কিন্তু নিজের হৃদয়কে সামলাতে পারল না।
বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এতটাই দ্রুত হয়ে উঠেছে, মনে হচ্ছে পাঁজরের ভেতর কেউ যেন অবিরাম হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে।
ধুক… ধুক… ধুক…
জায়ান কয়েক মুহূর্ত নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
এটা কি সত্যিই ঘটছে?নাকি এতদিনের লুকিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষার মতোই এটাও নিছক কোনো স্বপ্ন?
সাফা সত্যিই কি তাকে জড়িয়ে ধরেছে?
অবিশ্বাসে জমে থাকা চোখ নামিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা সাফার দিকে তাকাল জায়ান। মুহূর্তটা যেন তার কাছে বাস্তবতার চেয়েও অবাস্তব—অপ্রত্যাশিত, অথচ ভীষণ কাঙ্ক্ষিত।
সাফা এবার নিজ থেকেই জায়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। দুই হাত তার পিঠের পেছনদিকে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে এমনভাবে কাঁদছে, যেন এতক্ষণ বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা সমস্ত যন্ত্রণা একসঙ্গে অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসছে। তার অঝোর কান্নায় জায়ানের শার্ট পর্যন্ত ভিজে যাচ্ছে।
সাফার এমন কান্না আর সহ্য করতে না পেরে এবার জায়ানের কণ্ঠে সামান্য রাগ মিশে গেল। কঠিন স্বরে ধমক দিয়ে বলল—
—সাফা, জাস্ট স্টপ ইট! কেন কাঁদছেন আপনি? কখন থেকে জিজ্ঞেস করে চলেছি, তবুও কিছু বলছেন না!
কথাগুলো বললেও জায়ানের হাত তখনও সাফার শরীর স্পর্শ করেনি। যেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই সে সেই সীমারেখাটা আঁকড়ে ধরে আছে।
সাফা সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারল।
হেঁচকি তুলে কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করল—
—আমি কি এতটাই খারাপ, জায়ান? আমাকে ধরলে কি আপনার হাত খসে পড়বে?
জায়ান বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
—মানে?
সাফা এবার অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে অভিমানে ভেজা কণ্ঠে বলল—
—এই যে… আমাকে ধরছেন না। এতক্ষণ ধরে আমি আপনাকে জড়িয়ে আছি, অথচ আপনি একবারও হাত বাড়াচ্ছেন না। আচ্ছা, আর ধরতে হবে না। আপনি চলে যান।
বলেই নিজেকে জায়ানের বুক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সাফা।কিন্তু জায়ান এবার তাকে সরে যেতে দিল না। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত আটকে দিয়ে থামিয়ে দিল।
দৃষ্টি স্থির হলো সাফার চোখে। কণ্ঠ আগের তুলনায় শান্ত,
—এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর নয়, সাফা। কী হয়েছে আপনার, সেটা আগে বলুন।
সাফা কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল তার দিকে। চোখের কোণে তখনও অশ্রু জমে আছে। ঠোঁট কাঁপছে, যেন বহুক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে আটকে থাকা একটি প্রশ্ন অবশেষে বেরিয়ে আসার জন্য পথ খুঁজছে।
অবশেষে খুব ক্ষীণ, কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
—আপনি আমাকে বিয়ে করবেন..জায়ান?
—হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত?
জায়ানের প্রশ্নে সাফা একটু থেমে গেল। চোখের কোণে তখনও অশ্রুর রেশ।
—আপনি তো একটা সুযোগ চেয়েছিলেন!
জায়ান কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল—
—ওহ্… এই জন্য?
—নাহ্।
—তাহলে?
সাফা চোখ তুলে তাকাল। কণ্ঠে লজ্জা, ভয় আর অপ্রকাশিত আবেগ একসঙ্গে মিশে আছে।
—আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আর আপনার কথা আমি আমার পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছি। এটাও বলেছি, আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করি।
একটু থেমে আবার বলল—
—তারা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
জায়ানের মুখে এবার হালকা হাসি ফুটে উঠল।
—ওহ্… তাহলে এই ব্যাপার! কিন্তু এর জন্য এত কান্না করার কী আছে?
সাফা সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে তাকিয়ে ফেলল। কণ্ঠটা কেমন ক্ষীণ হয়ে এলো,
—ভয়ে… যদি আমাকে ফিরিয়ে দেন? বাবা অন্য কোথাও আমার বিয়ে দিয়ে দিতেন।
কথাটা শুনতেই জায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে সাফাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে এনে একেবারে সামনাসামনি দাঁড় করাল। তারপর গভীর, দৃঢ় দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কি আমার মতো এই অধমের আছে?আমি জায়ান বেঁচে থাকতে আপনার মনে হয়, আপনার অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হতে পারে?
সাফা আর কোনো উত্তর দিল না। নীরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
জায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে মৃদু বিরক্তির সুরে বলল—
—চুপ করে আছেন কেন? আর এই সামান্য একটা ব্যাপারে কেউ এভাবে কাঁদে নাকি? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছিল, আমি মরে গেছি আর আপনি আমার শোকে বিলাপ করছেন!
সাফার চোখে আবারও পানি চিকচিক করে উঠল।
জায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
—সত্যি বলছি, আপনার এই কান্না দেখে আমারই মনে হচ্ছিল, জীবনে বোধহয় কোনো মহাপাপ করে ফেলেছি!
মরে যাওয়ার কথা শুনতেই সাফা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে জায়ানের দিকে রাগে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল।
সাফার সেই দৃষ্টি দেখেই জায়ান মুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পারল। মুখে সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠল ভীত-সন্ত্রস্ত ভঙ্গি। দুহাত সামান্য তুলে আত্মসমর্পণের সুরে বলল*
—আর বলব না, ম্যাডাম! ভুল হয়ে গেছে। এবার থেকে একদম মুখ বন্ধ।
সাফা তবুও রাগী চোখে তাকিয়ে রইল।
জায়ান আর কথা না বাড়িয়ে এবার দৃঢ় স্বরে বলল,
—এখন একদম সোজা বাসায় চলে যান। বিকেলে আমি আসছি। সঙ্গে আমার মা-বাবাকেও নিয়ে আসব। রেডি থাকবেন। আজ কিন্তু কোনো অজুহাত চলবে না—একেবারে পাকা কথা সেরেই যাব।
একটু দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
—আর বাসায় গিয়ে বলে রাখবেন, তাদের হবু জামাই আসছে।
কথাটা বলেই জায়ান হঠাৎ একটু ঝুঁকে নিজের কপালটা আলতো করে সাফার কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে দিল।
কণ্ঠে তখন বিজয়ের উচ্ছ্বাস—
—চলুন, আপনাকে ড্রপ করে দিই।অবশেষে আমার সিঙ্গেল লাইফেরও মিঞ্জেল হয়ে যাবে!
কথাটা বলেই নিজের অজান্তেই হেসে উঠল জায়ান। আর সাফা লজ্জা, অভিমান আর চাপা হাসির মিশেলে চোখ নামিয়ে ফেলল।
—————
খান বাড়িতে পা রাখতেই একে একে সবাই এগিয়ে এলো রাহাকে অভ্যর্থনা জানাতে। কিন্তু রাহার সাজসজ্জা দেখেই সবার চোখ আটকে গেল তার দিকে।
রিসোর্ট থেকে বের হওয়ার আগে শাড়ি বদলে চুড়িদার পরেছিল সে। তার ওপর একেবারে গলা পর্যন্ত টেনে ঘোমটা দিয়ে রেখেছে। উদ্দেশ্য একটাই—অভ্রের রেখে যাওয়া দাগগুলো যেন কোনোভাবেই কারও দৃষ্টিগোচর না হয়।
সবাই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—এত গরমের মধ্যে এভাবে ঘোমটা দিয়ে রেখেছিস কেন, রাহা?
রাহা এক মুহূর্তও দেরি না করে সরাসরি বলে দিল,
—শীত শীত লাগছে।
কথাটা শুনেই শিফা এগিয়ে এলো। সন্দেহভরা দৃষ্টিতে রাহার কপালে হাত রাখতেই টের পেল, শরীরটা সত্যিই কিছুটা উষ্ণ।
শিফা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তোর তো অলরেডি জ্বর আছে মনে হচ্ছে!
রাহা দ্রুত মাথা নেড়ে সামলে নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
—না না, কিছু হয়নি। এটা এমনি। আমি একটু রুমে যাব।
এরই মধ্যে আফসানা বেগম এগিয়ে এসে স্নেহভরে রাহাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
সাথী বেগমও কাছে এসে মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
—একটু খেয়ে তো যা, মা। আর অভ্র কোথায়?
রাহা স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে উত্তর দিল,
—খেয়ে এসেছি, মা। উনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে অফিসে গেছেন। কিছুক্ষণ পর নাকি আসবেন।
—আচ্ছা, তুই তাহলে শিফার সঙ্গে যা।
শিফার সঙ্গে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে রাহা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু রুমের দরজার কাছে পৌঁছে যেই না ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়াবে, অমনি শিফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—এইদিকে কোথায় যাচ্ছিস?
রাহা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
—কেন? রুমে।
শিফা সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হেসে বলল,
—কেন, ভাবি সাহেবা? এখন তো আপনি আর একা নন যে এই রুমে থাকবেন!
তারপর হাত তুলে পাশের দিকটা দেখিয়ে বলল,
—ওইদিকে যান। ভাইয়ার রুমে আপনার সবকিছু শিফট করে দেওয়া হয়েছে।
কথাটা শুনেই রাহার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
এখন থেকে সবাই কী ভাববে?
সকাল হলেই অভ্রের ঘর থেকে বের হতে হবে, আবার রাত নামলেই সেই ঘরেই ফিরে যেতে হবে—ভাবনাটা মাথায় আসতেই লজ্জায় তার কান পর্যন্ত গরম হয়ে উঠল।
রাহার এমন লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা দেখে
শিফার ঠোঁটে দুষ্টুমি মেশানো হাসি ফুটে উঠল।
সে আরও খোঁচা দিয়ে বলল,
—আরও বেশি করে লজ্জা পা! তোকে কিন্তু বেশ মানাচ্ছে। যা যা, ওইদিকে যা।
বলেই রাহাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে অভ্রের ঘরের দিকেই এগিয়ে দিল শিফা।
—————
—এই বেডা, ছাড়ুন আমাকে! যে আমাকে চেনে না, আমিও তাকে চিনি না। সারারাত আমার সঙ্গে কাটিয়ে সকালে এসে চিনেন না! বাহ্ বাহ্, বেশ ভালো তো!
মাহাদী দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—আর একটা কথা বলবি, একদম তুলে আছাড় মারব!
আয়াত সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে বলল,
—এহ্! বললেই হয় নাকি, আছাড় মারবেন? নাচ না জানলে উঠান বাঁকা, আর বউ সামলাতে জানে না—মেহেদি পাতা!
কথাটা বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল আয়াত।
আয়াতের এমন নির্লজ্জ দুষ্টুমিতে মাহাদীর ধৈর্যের বাঁধ যেন মুহূর্তেই ভেঙে গেল।
বাড়ির দিকে না গিয়ে হঠাৎই মাহাদী সোজা বাগানের পাশের সুইমিং পুলের দিকে এগিয়ে গেল। আয়াত কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে পুলের কিনারায় এনে এক হাত দিয়ে ধাক্কা দিল।
—আআআআ!
আয়াত চিৎকার করে ভারসাম্য হারিয়ে সামনের দিকে পড়তে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে মাহাদী আবারও এক হাত বাড়িয়ে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।ফলে আয়াতের শরীরটা পুলের দিকে বেঁকে ঝুলে রইল।একটুখানি হাতের মুঠো আলগা হলেই সরাসরি পানিতে পড়ে যাবে সে!
আয়াতের মুখের হাসি নিমেষেই উধাও। নিচে তাকিয়ে পুলের পানি দেখে তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আর মাহাদী? ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে শীতল, রহস্যময় হাসি।
—আর বেশি কথা বলবি?
মাহাদীর কণ্ঠে এবার স্পষ্ট হুমকির সুর।
আয়াতের মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দ্রুত মাথা নেড়ে ভয়ার্ত স্বরে বলল,
—না না! তাই বলে সত্যিই ফেলে দেবেন না। আমি আর ভিজতে পারব না। এমনিতেই আপনার জন্য সকালে শাওয়ার দিয়েছি। চুলগুলো এখনও কিছুটা ভেজা!
মাহাদী কয়েক সেকেন্ড নির্বিকার চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তিতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
—শালীর বেটি, তুই আর ভালো হবি না!
কথাটা বলেই কোনো সতর্কতা না দিয়ে আচমকা তার হাতের মুঠো আলগা করে দিল।
পরমুহূর্তেই—
ছপাৎ!
ঠাস করে পানিতে পড়ে গেল আয়াত।
—আআআআ!
পানির ঝাপটা চারদিকে ছিটকে উঠল।
অন্যদিকে মাহাদী একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে হাসতে হাসতেই সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।পানির ভেতর থেকে রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে ফুঁসতে মাথা তুলল আয়াত। ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে, চোখেমুখে স্পষ্ট প্রতিশোধের আগুন।
দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল,
“আমি আপনাকে দেখে নেব, মাহাদী! জাস্ট ওয়েট… এবার বুঝবেন, আয়াতকে নিয়ে মজা করার পরিণতি কী!”
বাড়িতে ঢুকেই মাহাদী সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তার ঠিক পেছন পেছন ভেজা শরীর আর টপটপ করে ঝরতে থাকা চুল নিয়ে আয়াতও এসে হাজির হলো।
আয়াতের এমন অবস্থা দেখে মাহাদীর মা বিস্মিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলেন।
—কী রে মা! তুই এভাবে ভিজলি কীভাবে?
আয়াত এক মুহূর্তও দেরি না করে অভিযোগের সুরে বলে উঠল,
—আসলে মা, আপনার ছেলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পুলে ফেলে দিয়েছে!
কথাটা শুনেই মাহাদীর মায়ের চোখ কপালে উঠল।
—কী বলছিস তুই? মাহাদীর এত বড় সাহস হয়েছে যে তোকে পুলে ফেলে দেয়?
বলেই তিনি আয়াতের ভেজা শরীরের দিকে ভালো করে তাকালেন। ভেজা পোশাকের কারণে রাতের রেখে যাওয়া দাগগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাছে এসে মেয়েটার গায়ে চোখ বুলিয়ে তিনি যেন হতবাক হয়ে গেলেন। কোথাও কোনো আঘাত লেগেছে কি না, কেমন অবস্থায় আছে—সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন।
তারপরই রাগে গলা চড়িয়ে ডাকলেন,
—মাহাদী!
কয়েক মুহূর্ত পর মাহাদী ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল।
—কী হয়েছে মা? এভাবে ডাকছ কেন?
মাহাদীর মা এবার এমন এক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন, যাতে রাগ, হতাশা আর অবিশ্বাস একসঙ্গে মিশে আছে।
—দিন দিন তোর এত অধঃপতন হচ্ছে যে, সত্যি বলছি, আমি আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না!
মাহাদী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
—মানে? কী বলছ তুমি?
মাহাদীর মা এবার আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করে ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন,
—মেয়েটার কী হাল করেছিস, একবার দেখ তো! এতটা বেপরোয়া কেউ হয়? তোরই তো বউ, নাকি? কেউ কি এসে তোকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে?
মাহাদী ভ্রু কুঁচকে আয়াতের দিকে তাকাল।
এই মেয়েটা আবার মাকে কী বলে দিয়েছে?
মাহাদীর দৃষ্টি নিজের ওপর পড়তেই আয়াত তড়িঘড়ি করে দুই হাত দুদিকে নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারা করল,
“আমি কিছু বলিনি!”
মাহাদীর মা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টা বুঝে ফেললেন। ছেলের দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—আয়াত কিছুই বলেনি। তার দিকে অমন করে তাকাচ্ছিস কেন? আমি কি কানা নাকি? কী হচ্ছে, সবই কিন্তু দেখতে পাচ্ছি!
মাহাদী আর কিছু বলার আগেই তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সুরে বলে উঠলেন,
—আজ থেকে আয়াত আমার সঙ্গেই থাকবে। এটাই তোর শাস্তি।
কথাটা শুনে মাহাদীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন দীর্ঘদিন পর কাঙ্ক্ষিত কোনো সুখবর শুনেছে।
—আলহামদুলিল্লাহ! মা, অবশেষে একটা কাজের মতো কথা বলেছ! এই আপদটাকে তুমি তোমার সঙ্গেই রাখো। আমার কোনো আপত্তি নেই।
মাহাদীর মা এবার প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন।ছেলের মুখে এমন স্বস্তি দেখে সন্দেহটা আরও ঘনীভূত হলো।মায়ের সেই দৃষ্টি বুঝতে পেরে মাহাদী সঙ্গে সঙ্গে মুখে মেকি হাসি টেনে বলল,
—আমি যাই!
বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পা বাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
তখনই আয়াত দ্রুত বলে উঠল,
—না না মা, আমি ঠিক আছি। আর আমি আপনার ছেলেকে ছাড়া কীভাবে থাকব বলুন তো? সে তো আমার জান, প্রাণ—কলিজা, ফুসফুস, নাড়িভুঁড়ি, সবকিছু!
মাহাদীর মা আয়াতের কথা শুনে হেসে ফেললেন। মেয়েটার এমন বাড়াবাড়ি ভালোবাসার প্রকাশে মুখে ফুটে উঠল মায়াভরা হাসি।
—যা, সর! তোর জামাইয়ের কাছে যা। যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর!
আয়াত মাথা নুইয়ে ফেলল। মুখে ফুটে উঠল মিষ্টি হাসি, কিন্তু মনের ভেতর তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন হিসাব চলছে।
আমিও তো থাকতে চাই! কিন্তু এই মেহেদি পাতাটাকে শিক্ষা দেব কীভাবে? আমাকে পানিতে ফেলে দিয়েছে, তাই না? এবার বুঝবে, আয়াতকে নিয়ে মজা করার পরিণতি কী!
মনে মনে কথাগুলো আওড়াতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময় এক বাঁকা হাসি।
এরপর আয়াত এগিয়ে গিয়ে নিজের শাশুড়ি মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আদুরে কণ্ঠে বলল,
—মা, তোমার সঙ্গেও থাকব। আগে তোমার ছেলেটাকে একটু শিক্ষা দিয়ে আসি।
মাহাদীর মা মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।
—ঠিক আছে।
কথাটা দুজনের মধ্যে ফিসফিস করেই হলো, যেন গোপন কোনো ষড়যন্ত্রের চুক্তি সেরে ফেলল তারা।
তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
—যা, আগে রুমে গিয়ে কাপড় পাল্টে নে। নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে।
—————
অভ্র, রাহা, অবন্তিকা, জারিফ, জায়ান এবং জায়ানের বাবা-মা সবাই মিলে পৌঁছে গেছে সাফাদের বাড়িতে।
এদিকে অবন্তিকা আর রাহা দুজন মিলে মুখ ভার করে সাফাকে সাজিয়ে তুলছে। দুজনের মুখেই স্পষ্ট অভিমানের ছাপ। আর মাঝখানে বসে থাকা সাফার মুখটা কেমন যেন করুণ, বিষণ্ণ। চোখেমুখে অপরাধবোধের ছায়া।সে তো রাহা আর অবন্তিকাকে সবকিছু জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, নিজেই তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। তার ওপর এত দ্রুত, এতটা হঠাৎ করে সবকিছু এমনভাবে এগিয়ে যাবে—সেটাই বা কে জানত!
সাফা কতবার যে সরি বলেছে, তার কোনো হিসাব নেই। কিন্তু রাহা আর অবন্তিকা কিছুতেই তার ক্ষমাপ্রার্থনা গ্রহণ করছে না। বরং প্রতিবারই মুখ আরও গম্ভীর করে ফেলছে।
একপর্যায়ে সাফার চোখের কোণে পানি টলমল করে উঠল। আর একটু হলেই বোধহয় সত্যিই কেঁদে ফেলবে সে।
ঠিক তখনই রাহা আর অবন্তিকা আড়চোখে একে অপরের দিকে তাকাল।
পরক্ষণেই দুজনের মুখে ফুটে উঠল দুষ্টুমি-মাখা প্রশস্ত হাসি।সাফা অবাক চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।আসলে এতক্ষণকার সমস্ত অভিমানই ছিল নিছক অভিনয়। সাফা আর জায়ান দুজন দুজনকে পছন্দ করে—এই সত্যিটা জানার পর থেকেই ভেতরে ভেতরে তারা যে কতটা আনন্দিত, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
প্রিয় বান্ধবীর জীবনে ভালোবাসার এমন সুন্দর অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে—এই আনন্দে তাদের মুখে হাসি থামারই নাম নেই।
সাফাকে সুন্দর করে সাজিয়ে এনে তাদের সামনে বসানো হলো। সে মৃদুস্বরে সালাম দিয়ে বসতে উদ্যত হতেই জায়ানের মা সস্নেহে তার হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে নিলেন।
তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে সাফার দিকে তাকিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে বলে উঠলেন—
—মাশাআল্লাহ! আমার ছেলের পছন্দ যে এত সুন্দর হবে, সেটা তো ভাবতেই পারিনি। একেবারে লক্ষ্মী বউয়ের মতো লাগছে তোমাকে। আল্লাহ তোমাদের দুজনকে সবসময় সুখে রাখুক।
সাফা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
জায়ানের মা তার থুতনিতে আলতো করে হাত রেখে বললেন,
—এই যে মুখটা এমন লজ্জায় লাল হয়ে গেল! আর লজ্জা পেতে হবে না মা। আজ থেকে তুমি আমাদেরও মেয়ে। আমাদের বাড়িতে নিজের মেয়ের মতোই থাকবে। কোনো কিছু নিয়ে সংকোচ করবে না, কেমন?
কথাগুলো শুনে সাফার চোখেমুখে ফুটে উঠল একরাশ আবেগ।জায়ানের মা ব্যাগ থেকে একজোড়া স্বর্ণের চুড়ি বের করে সাফার হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বললেন,
—এগুলো আমার কাছে অনেকদিন ধরে রাখা ছিল। আমার শ্বাশুড়ি মায়ের স্মৃতি।জানতাম না কার হাতে পরাব। আজ বুঝলাম, এগুলো আসলে তোমার হাতের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
চুড়ি পরিয়ে তার হাতদুটো মুগ্ধ হয়ে দেখলেন তিনি।
—মাশাআল্লাহ! কী সুন্দর মানিয়েছে! একদম আমার ঘরের নতুন বউয়ের মতো লাগছে।
এরপর একটি স্বর্ণের চেইন বের করে সাফার গলায় পরিয়ে দিয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বললেন,
—এটাও রাখো মা। দাম দিয়ে এসবের মূল্য হয় না। মায়ের ভালোবাসা মনে করে রেখো। আর জায়ানকে নিয়ে সুখে থেকো—এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।
সাফা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুটা দ্রুত মুছে নিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
আর দূর থেকে জায়ান চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে। নিজের মায়ের মুখে সাফার জন্য এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা শুনে তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে উঠল।
জায়ানের বাবা সাফার দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হেসে বলে উঠলেন,
—আমার ছেলের পছন্দ আছে বেশ! বলতে হবে, পছন্দ করার ব্যাপারে ছেলের রুচি মন্দ নয়। তাহলে আর দেরি কেন? পাকা কথা শুরু করা যাক।
কথাটা শুনতেই রাহা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। মুখ টিপে হেসে সাফার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—
—তোর কী কপাল, সাফা রে! তোকে দেখতে আসছে, তোর জন্য এত আয়োজন হচ্ছে! আর আমার তো সেটাও হলো না।
কথাটা বলেই রাহা আড়চোখে অভ্রের দিকে তাকাল।
অভ্র তখন ভ্রু কুঁচকে স্থির দৃষ্টিতে রাহার দিকেই তাকিয়ে আছে। মুখভঙ্গি গম্ভীর তবে আপাতত কোনো মন্তব্য করল না।
এদিকে সাফার বাবা-মায়ের কাছেও জায়ান ও তার পরিবারকে বেশ পছন্দ হয়েছে। তাঁদের ব্যবহার, আন্তরিকতা আর সাফার প্রতি মমতায় তাঁরা সন্তুষ্ট।
জায়ানের মা এবার হাসিমুখে সাফার বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমাদের তো মেয়েটাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আল্লাহর রহমতে যদি সবকিছু এভাবেই সুন্দরভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে আজকেই একটা শুভ কাজ সেরে ফেলতে চাই। আমরা আজই বাগদানটা সম্পন্ন করতে চাই।আজ আমাদের ছেলে নিজের হাতে সাফাকে আংটি পরিয়ে দেবে। আপনাদেরও যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!
কথাটা শুনে ঘরজুড়ে মুহূর্তেই আনন্দের আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। সাফা লজ্জায় মাথা নত করে ফেলল, আর জায়ানের মুখেও ফুটে উঠল সংযত অথচ স্পষ্ট এক তৃপ্তির হাসি।সেই মোতাবেক সবকিছুই সম্পন্ন হলো। হাসি-আনন্দ আর শুভকামনার আবহে সাফা ও জায়ানের বাগদানও শেষ হলো।
আগামী শুক্রবার তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক কাজ সম্পন্ন হবে ঘোষণা হলো।এরপর একে একে সবাই যে যার মতো নিজ নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
এদিকে রাহা বাড়িতে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াল।
ড্রয়িংরুমে দুপাশে তার পরিবারের লোকজন মুখোমুখি হয়ে এমন ভঙ্গিতে বসে আছে, যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সভা বসেছে। চারপাশের পরিবেশ দেখে রাহা কিছুতেই কিছু বুঝে উঠতে পারল না।
ভ্রু কুঁচকে একবার এদিক, একবার ওদিক তাকিয়ে মনে মনে ভাবল,
এসবের মানে কী?
ঠিক তখনই শিফা তড়িঘড়ি করে উঠে এসে রাহার হাত ধরে বলল,
—তোকে সাজাতে হবে। জলদি চল!
রাহা চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে বলল—
—কী বলছ এসব? কিসের সাজানো?
রাহার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই অভ্র ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল আত্মতৃপ্ত এক চিলতে হাসি।
—সাজানোর কোনো দরকার নেই।
কথাটা বলে সে রাহার দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় যোগ করল,
—আমার বউ এমনিতেই মাশাআল্লাহ!
রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভ্র তার হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিল।
এরপর পকেট থেকে এক বান্ডিল টাকা বের করল। টাকার বান্ডিলটা হাতে নিয়ে রাহার চারপাশে একবার ঘুরিয়ে নিল—যেন কোনো অশুভ নজর থেকে তাকে রক্ষা করার আনুষ্ঠানিকতা।
তারপর ঘরের হেল্পিং হ্যান্ডের হাতে সেই টাকার বান্ডিলটা ধরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবার দিক তাকিয়ে বলল,
—নিন। দেখা-শোনার পর্ব শুরু করুন।
কথাটা শুনে রাহা হতভম্ব হয়ে অভ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।আর চারপাশে থাকা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে উঠল।
শিফা গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে উঠল—
—আমরা যেহেতু ছেলে পক্ষ, তাহলে প্রশ্নপর্ব শুরু করা যাক। তো, তোমার নাম কী?
রাহা হতভম্বের মতো শিফার দিকে তাকিয়ে রইল। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছে না।রাহার এমন নির্বাক অবস্থা দেখে শিফা এবার আরও কড়া সুরে বলল—
—কী হলো? আপনাদের মেয়ে কি বোবা নাকি? কথা বলতে পারে না?
রাহা এবার অসহায় দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকাল।
অথচ অভ্র দিব্যি নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি-মাখা হাসি, আর দৃষ্টি শুরু থেকেই নিবদ্ধ রাহার ওপর।
রাহা বিরক্তিতে উঠে চলে যেতে উদ্যত হতেই অভ্র হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে মৃদু হেসে বলল,
—তোর না শখ ছিল, তোকে এভাবে দেখতে আসবে? নে, পূরণ করে দিলাম। বলেছিলাম না, তোর কোনো শখই আমি অপূর্ণ রাখব না, জান?
অভ্রের কথা শুনে রাহা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।এবার যেন আচমকাই পুরো বিষয়টা তার মাথায় পরিষ্কার হয়ে গেল।
তাহলে একটু আগের মজা করে বলা কথাটাকেই অভ্র এতটা গুরুত্ব দিয়ে মনে রেখেছিল!
আগেই বাড়িতে ফোন করে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে সে। রাহাকে কিছু না জানিয়েই নিজের পরিবারকে বলে রেখেছিল—আজ তারা রাহাকে দেখতে আসবে। আর সেই অনুযায়ী আফসানা বেগম ও আমান খানও একেবারে পাকা আয়োজন করে দই-মিষ্টি নিয়ে হাজির হয়েছেন।
রাহা আর কী-ই বা বলবে!
সে তো নিছক মজা করেই কথাটা বলেছিল। কে জানত, অভ্র তার সেই সামান্য আবদারটুকুকেও এতটা গুরুত্ব দিয়ে সত্যি করে ফেলবে!
রাহা যখন হতবাক হয়ে বসে আছে, তখন শিফা তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল—
—কালকে বাসর সেরে আজকে মেয়ে দেখা! কী লজিক, ভাই?
রাহা চোখ বড় বড় করে শিফার দিকে তাকাতেই শিফা মুখ চেপে হাসতে লাগল।
মেয়ে দেখা, প্রশ্নপর্ব—সবকিছু শেষ হওয়ার পর এবার শিফাই আবার গম্ভীর মুখ করে বলে উঠল—
—তাহলে পাকা কথা হবে না?
অভ্র সঙ্গে সঙ্গে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল,
—আমার বউ যদি চায়, তাহলে আবার বিয়ে করব।
রাহা এবার দুই হাত তুলে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
—এবার থামো তোমরা, প্লিজ! আমার শখ পূরণ হয়ে গেছে। আর বিয়ের দরকার নেই!
কথাটা শেষ হতেই ঘরজুড়ে একসঙ্গে হাসির রোল পড়ে গেল।আর অভ্র? সে শুধু ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দুষ্টু হাসিটুকু ফুটিয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে রইল।
—————
—তোর শান্তির ঘুম ছুটাচ্ছি, দাঁড়া!
কথাটা শেষ করারও অবকাশ দিল না। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে সকাল-সকালই এক বালতি ঠান্ডা পানি সজোরে ছুড়ে দিল মাহাদীর ওপর।
·
·
·
চলবে……………………………………………………