ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ০৩ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          বাহিরের মৃদু আলোয় জোহরা দেখতে পেলো বাবাকে। বারান্দার ইজি চেয়ারটায় বসে আছেন তিনি। চেয়ারটা দুলছে ধীরে ধীরে। দোতালায় একটি দেয়াল ঘড়িতে টিকটিক শব্দ হচ্ছে। সেখানে একবার তাকিয়ে সময়টা দেখে নিলো সে। এখন রাত ঠিক তিনটা সাতাশ। এত রাতেও বাবা সজাগ। বুকের ভেতর একটা চাপা ভয়ও কাজ করছে। বাবা যেহেতু সজাগ সেহেতু নির্ঘাত কথা শুনে ফেলেছেন। তবে কি বাবা জেনে ফেললেন সে যে টেলিফোনটা বাবার অগোচরে ব্যবহার করে? বাবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও সে কাউকে খুব আগ্রহ নিয়ে ফোন করে! এবং সে কেউটা একজন পুরুষ! অপরিচিত অথচ বহু সাধনার মানুষ জোহরার।
জোহরা ঢোক গিলল। দরজায় দাঁড়িয়েই বারান্দার দিকে তাকিয়ে কিছুটা তোতলানোর মতো করে ডাকল,
 “জি.. জি বাবা। বলো?”

 যাবের শিকদারের চেয়ারের দুলুনি থেমে গেলো। ঘরটি হয়ে গেলো আরও নিরিবিলি। এরপর সেই আবছায়া অন্ধকার থেকে ভেসে এলো যাবের শিকদারের ভরাট স্বর,
 “এত রাতে এখানে কী করছিলে?”
 
  যেই ভয়টা পাচ্ছিলো এতক্ষণ জোহরা সেটাই ঘটলো। বাবা তবে শুনেছেন কিছু। তবে জোহরা ভয় পেলেও চালাকি ছাড়ল না। ঢোক গিলতে গিলতে হাত নাড়িয়ে উত্তর দিলো, “ঘুম আসছিলো না তাই হাঁটছিলাম।”

 “হাঁটতে হাঁটতে দোতালায় চলে এলে?”

জোহরার কপালে দেখা দিয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে কপালটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিলো খানিক। 
“নিচে তো টুইটুবানি আর প্রেমা ঘুমুচ্ছিলো। তুমিতো জানো আমার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলার স্বভাব। যদি ওরা জেগে যেত! তাই উপরে চলে এসেছিলাম।”

  “ওহ্! তাই বলো। আমিতো ভাবছিলাম তুমি কথা বলছো কার সঙ্গে। বারান্দা থেকেতো আর বুঝতেও পারছিলাম না তেমন। তাই ডাকলাম।” যাবের শিকদারের ম্লান কণ্ঠের কথাগুলো জোহরার ভয়ার্ত হৃদয়ে এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তির ছোঁয়া দিলো। তার মানে বাবা তার কথা শুনেননি! শুনলে আজ একটা কেলেঙ্কারি বেঁধে যেত নির্ঘাত। তাকেও না আবার ঘর ছাড়া হতে হতো! বাবার এসব বিষয়ে যা রাগ! 

  জোহরার মন এক নিমিষেই প্রফুল্ল হয়ে উঠল। ভয়ের পাথর সরতেই হালকা হয়ে গেলো বুকটা। সে চপল স্বরে বলল, “তুমি ঘুমাওনি কেন, বাবা? রাততো অনেক হলো। কাল তো অফিস আছে আবার।”

  “এমনিতেই ঘুমোইনি। তুমি কি সন্ধ্যায় কষ্ট পেয়েছিলে আমার আচরণে?”
 বাবার বিষণ্ণ মুখটি অন্ধকারেও জোহরার মুখের দিকে নিবদ্ধ হলো। আলো না থাকায় জোহরা দেখতেও পেলো না কেমন রক্তজবার রঙ ধরে আছে সেই চোখে। তবে অসহায় সেই কণ্ঠের জানতে চাওয়াটা তার বুকে বিঁধল। দু'কদম ঘরের দিকে এগিয়ে ব্যতিব্যস্ত স্বরে বলল, “না, না, বাবা। কী বলো! তুমি তো আমার বাবা। তুমি রাগ করলে সেই রাগটাও কেন করো, তা বুঝি আমি জানি না?”

 যাবের শিকদার মেয়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শরীরের ঝাঁকুনিতে সেই দীর্ঘশ্বাসের খোঁজ ঠিক পেলো জোহরা। মেজবাহ্ শেখের কথা ভাবতে গিয়ে সে প্রায় ভুলেই বসেছিলো তার বাবার কথা। চিঠির দিনগুলোতে যে বাবা ঘুমান না! রাত জেগে থেকে ভাবেন কেবল। ভাববেন না-ই বা কেন? বাবার জীবনের জীবন্ত পুতুল ছিলো যে সেই চিঠির প্রাপক! জীবন্ত পুতুল একদিন সব তছনছ করে, বাবার সাজানো বাগান ভেঙে দিয়ে যাযাবর হয়েছিলো। বাবা কি আর সেই শোক কাটাতে পেরেছিলেন! পারেননি তো। সে তা ভালো করেই জানে। 

 “তোমরা সবই জানো, বোঝো তবুও যে কেন বাবাকে দুঃখ দাও কে জানে! তবে জেনে ভালো লাগলো এই পৃথিবীতে আমার জন্য কেউ ভাবছে। ক'দিন ভাববে তা-ও ভাবনার বিষয়!”

  “যতদিন প্রাণ, ততদিনই ভাববো, বাবা।”

“কথা দিলে?”

 জোহরা বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, “দিলাম।”

যাবের শিকদার এরপর তেমনে কিছু আর বললেন না। দু একবার জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে মেয়েকে বিদায় দিলেন।
 জোহরা বাবার দরজাটা আবার আলগোছে ভিজিয়ে বেরিয়ে এলো। বাবার জন্য তার মন খারাপ হচ্ছে। ভীষণ মন খারাপ। বাবাকে তার মায়া করতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝেই। কিন্তু বাবা এতটা নিকটে ঘেঁষতে দেন না। কোনো এক অভিমানে তাদেরকে সবসময় বুক থেকে এক হাত দূরেই রাখেন। বুকের সাথে লাগান না পাছে যদি আবার বুকছাড়া হওয়ার কষ্ট পেতে হয়! জোহরা সব জানে, বুঝে। তবুও ওর সাধ জাগে বড়ো, বাবা যদি আগের মতো আদর করতেন! তার বড়ো সাধ সেই আদর পাওয়ার।

 বিস্তর ভাবনায় মগ্ন জোহরার চোখ গিয়ে পড়ল টেবিল থেকে নিচে ঝুলতে থাকা টেলিফোনের দিকে। বাবার ডাক পেয়ে এমন করে ও ফোন রেখেই ছুটেছিলো যে বেমালুম ভুলে গিয়েছে লোকটা যে অপরপাশে কথা বলছিলো! নিশ্চয় এতক্ষণে রেখে দিয়েছে কল টা। জোহরা যে বাবার ডাকে ফোন ছেড়েই সাড়া দিয়েছিলো তা কি মানুষটা শুনেছে! ইশ্ ওকে না আবার ভীতুর ডিম ভেবে নেয়!
 টেলিফোনের সামনে যেতে ভয় করছে জোহরার। যেহেতু বাবা জেগে আছেন সেহেতু টেলিফোন ধরাই এখন তার জন্য সবচেয়ে বিপদজ্জনক বিষয়। তাছাড়া মানুষটা কি আর তার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করে আছে? তার যে জীবন খুব গতিময়। জোহরার জন্য গতি থামিয়ে অপেক্ষা করা তাকে সাজে? সাজে না। 
 ছোটো শ্বাস ফেলে জোহরা এগিয়ে গেলো। ঝুলন্ত টেলিফোনটাকে জায়গামতো রাখতে হবে নয়ত বাবা দেখলে ঠিক ধরে ফেলবেন ওর মিথ্যেটা। 

 জোহরা ফোনটা হাতে নিয়ে রাখার সময়ই তাকে চমকে দিয়ে ওপাশের পুরুষালি রুক্ষ কণ্ঠটি ভেসে এলো কাঁপিয়ে দিলো বুক। 
   “বাবার ধমকে টেলিফোন ছেড়ে পালানো মেয়ে মেজবাহ্ শেখকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করছে? তা সুচরিতা, আপনি তো ফুলের আঘাতেই মূর্ছা যান কাঁটাকে সহ্য করবেন কীভাবে?"

 জোহরা হতবিহ্বল হয়ে গেলো। সেই কণ্ঠ গিয়ে বাজলো সোজা মস্তিষ্কে আর হৃদয়ের। এতটা সময় ধরে লোকটা ফোন ধরে বসেই ছিলো? তার জন্য? কেন? আর তাকে কী নামেই বা ডাকল? সুচরিতা? 

 জোহরার খুশিতে বুক কাঁপল। চিৎকার দিতে ইচ্ছে হলো। চিৎকার করে পৃথিবীকে জানাতে ইচ্ছে হলো তার একটি নাম হয়েছে নতুন। বিশিষ্ট নেতা মেজবাহ্ শেখ কিছু সময় ব্যয় করে তাকে একটি নাম দিয়েছে। এরচেয়ে আর বড়ো পাওনার কী আছে তার? এতটাও কি ভেবেছিল সে?
 জোহরার আনন্দে কথা আসছিলো মুখ ফুটে। অস্ফুটস্বরে প্রশ্ন করল,
 “কী নামে ডাকলেন আমায়?”

   মেজবাহ্ চেয়ারে আরাম করে বসে আছে। হাতের উপর একটি বই। চোখ দু'টো সেখানে নিবদ্ধ থাকলেও মনোযোগটা ফোনের ওপাশের অপরিপক্ব কণ্ঠটিতে। 
ল্যাম্পের আলোটি আরেকটু ঘুরিয়ে দিলো মেজবাহ্। ধৈরজ স্বরে বলল, “ডাকনাম আপনার। নিজের নামটি তো বললেন না কখনো তাই আমিই আপনার পরিচয় দিয়ে দিলাম, নাম দিয়ে দিলাম।”

 “নাম? ডাকনাম? আমার!” ফোনের ওপাশের আনন্দে আত্মহারা কণ্ঠটির আনন্দ ছোঁয়াচে রোগের মতোই ছড়িয়ে পড়ল মেজবাহ্ অব্দি। তার ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু বড়ো হলো,
“এই যে নামটি পেয়ে আপনি হাসছেন এবং এটি বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও নান্দনিক দৃশ্য হবে তাই ফিলোসফির ভাষায় এটাকে বলা হবে নন্দনতত্ত্ব।”

 “ফিলোসোফির ভাষায় প্রেমতত্ত্ব কী?”
জোহরা প্রশ্নটি করেই চোখ দু'টো বন্ধ করে ফেলল। ইশ, একদম বেফাঁস প্রশ্ন! বাবা শুনলে জিভটাও রাখবে না।
   মেজবাহ্ শেখের হাসিটি বন্ধ হয়ে গেলো। গম্ভীর হয়ে গেলো মুখটি। সেই গাম্ভীর্যতা এতটাই স্পষ্ট ছিলো যে জোহরাও বুঝতে পারল।

 “প্রেমতত্ত্ব বলতে আমার কাছে কোনো শব্দ নেই। দেশের জন্য দাঁড়ালে প্রেমের জন্য দাঁড়ানো যায় না।” কর্কশ কণ্ঠে কথাগুলো বলেই কেটে দিলো ফোনটা। এরপর আলগোছে নিজের মাথাটি এলিয়ে দিলো চেয়ারটায়। একটা অল্পবয়সী মেয়ের কেমন আস্পর্ধা তার কাছে প্রেম নিয়ে জানতে চায়! মাস পেরুলেই তার বয়স পড়বে বত্রিশে আর মেয়েটার বয়স কতই বা হবে? আঠারো-উনিশ! সেই মেয়ে তার কাছে প্রেমতত্ত্ব জানতে চায়! 
পরক্ষণেই মেজবাহ্’র রুক্ষ মেজাজ শান্ত হয়ে যায়। মেয়েটারও বা দোষ কী? গত দেড় বছর ধরে সে-ও তো মেয়েটাকে কোনো না কোনো ভাবে সম্মতি দিয়ে গিয়েছে। সে না চাইলে কি আর মেয়েটা ফোন করার সাহস পেতো? না এমন আবদারের গলায় প্রশ্ন করতে পারতো? 

 জোহরা এখনও ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা এমন করে রেগে যাবে সে কি বুঝেছিলো? বুঝলেতো বলতো না মোটেও। এবার যদি তার কলটি আর না ধরে? অত বিরাট মানুষ, তাকে নিশ্চয় এসব প্রেম-ভালোবাসার কথা সকলেই বলে তাহলে সে কেনই-বা জোহরার কথায় মজবে? শুধু শুধু ও আশা বেশি করে ফেলল!

  টেলিফোনটা আগের জায়গায় রাখতেই আচমকাই তা বেজে উঠল পুনরায়। জোহরা চমকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলো ফোন। বাবা শুনে নিলেন না তো! 
জোহরা ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে একটি ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে এলো। অনর্গল বলল, “প্রেমতত্ত্ব জানার আগে জীবনতত্ত্ব জানা দরকার আপনার। আর হ্যাঁ, মেয়েটি কেন নীল শাড়ি পরেছিলেন তা তো আমি জানি না। তবে এতটুকু জানি, পুরো সময়টাতে আমি তাকাইনি মেয়েটির দিকে দু'বারের বেশি। আমিতো তাকিয়ে ছিলাম ক্যামেরায়। আমার মনে হচ্ছিলো টেলিভিশনের ওপারে একটি বাচ্চা মায়া আমায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে। সে যদি দেখতে পায় আমি সুন্দরী উপস্থাপিকার দিকে তাকিয়ে আছি তাহলে হয়ত দুঃখ পেতে পারে। পৃথিবীতে এমনিই তো যুদ্ধের শেষ নেই, শুধু শুধু নতুন করে আর সুচরিতার বুকে যুদ্ধ বাঁধিয়ে লাভ কী!”
এরপরই আবার কেটে গেলো ফোনটা।

  জোহরা হতবিহ্বল হলো। আহম্মকের মতো তাকিয়ে রইল কেটে যাওয়া টেলিফোনের দিকেই। লোকটা কি পাগল? একটু আগেই কেমন কঠিন ভাবে কথা বলে কল কাটলো এখন আবার কল করে কী বলল? সে কষ্ট পাবে বলেই কি পুনরায় কল করল? কল করে এসব বলল? ওর কষ্টের কথাও কি ভাবে মানুষটা?

—————

   আজ দিনটি রৌদ্র তপ্ত। মাথা ঝা ঝা করে উঠবে এত পরিমাণ রোদ উঠেছে। ঘামে নাজেহাল অবস্থা। সেই ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে ইমন বসে আছে একটি অফিসে। অপেক্ষার মতো জিনিসটি তার বিশেষ পছন্দ নয়। অথচ তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সাধারণ বেকার ঘুরে বেড়ানো যুবক সে। রাজনীতি ও দেশের প্রতি ঝোঁক থেকে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন আর্টিকেল লিখে। সেই আর্টিকেলের খবর জোগাতেই আসতে হয়েছে সিলেট। এবং গত তিনদিন ঘুরে অবশেষে আজ পেয়েছে মেজবাহ্ শেখের সাথে দেখা করার সুযোগ। লোকটা ইচ্ছে করেই তাকে ঘুরিয়েছে তা সে বেশ ভালো করেই জানে। তবুও সে ঘুরেছে। তার জানার বেশ ইচ্ছে একজন নেতা হয়ে মেজবাহ্ শেখ নিজের ওষুধের ফ্যাক্টরিতে এমন অসাধু কার্যক্রম কীভাবে হতে দিলো? না-কি ইচ্ছেকৃত হতে দিয়েছে। এই দেশের রাজনীতিতে তো ঐ একটা দোষ। অর্থলোভে এরা সব ভুলে যায়।

  মেজবাহ্ চায়ের কাপে চুমুক শেষ করেছে সবে। তখনি সিকান্দার বেশ ব্যস্ত পায়ে তার অফিসরুমে প্রবেশ করল। বুক টানটান ছেলেটার। শার্টের প্রথম বোতামটি খোলা। তামাটে বর্ণ গায়ে, চওড়া দেহে ওকে কোনো অংশে কম লাগে না। 
  “ভাই, ঐ ছেলেতো বাহিরে অনেকক্ষণ যাবত বসে আছে। মনে হচ্ছে না যাবে।”

  মেজবাহ’র চোখের সামনে একটি খোলা ফাইল। সেদিকে দৃষ্টি রেখে সে স্বাভাবিক স্বরে বলল, “বসে থাকুক। এসব অল্পবয়সী ছেলেদের ঝোঁক বেশি। আমার নিষেধের পরও যেহেতু ওর আগ্রহ তাই ওকে হাড়ে হাড়ে টের পেতে হবে কেন আমি নিষেধ করেছি।”

  সিকান্দার মেজবাহ্ শেখের মুখের দিকে তাকালো। আমতা-আমতা করে বলল, “কিন্তু ভাই, জানলাম ও গত তিন মাস লাগিয়ে নাকি এসেছিলো। অফিস থেকে বার বার নিষেধ করায় এ মাসে বাড়ি অব্দি পৌঁছে গেলো।”

 মেজবাহ্ আগের মতোই দৃষ্টি কাগজে স্থাপন রেখেই কপাল কুঁচকালো, “এই ছেলের এত সময়! দেখি ডাকোতো তাকে। শুনি কী বলতে চায়।”

 সিকান্দার এবার হাঁফ ছাড়ল। ছেলেটা এতক্ষণ ধরে তাকে জ্বালিয়ে মেরেছে প্রশ্ন করে করে। যাক অবশেষে ভাই সবাটা সামলে নিবে। 
 
 ঠিক মিনিট তিন পরেই দরজা খুলে প্রবেশ করল ইমন। সিকান্দার দরজাটা ভিজিয়ে এসে দাঁড়ালো মেজবাহ্ থেকে কিছুটা দূরেই তবে পাশাপাশি। 
 ইমন সালাম দিলো বেশ নম্র স্বরে। মেজবাহ্ ভেবেছিলো রাগে, উত্তপ্ত একটি ছেলে হবে হয়ত। এসেই একটা হম্বিতম্বি করবে। কিন্তু ইমনের শান্ত স্বরে সে কিছুটা অবাকই হলো। একরোখা ছেলেরা সচারাচর নম্রতা দেখাতে পারে না। 

  সালামের উত্তর দিয়েই বসতে বলল মেজবাহ্। ইমন বসলোও। 
“তা, কী যেন নাম আপনার? ইমন, ইমন শিকদার, তাই তো?”

 ইমন মাথা নাড়ালো, “হ্যাঁ। বলেছিলামতো। আপনার বোধহয় ভুলে যাওয়ার স্বভাব। বয়স হয়েছে কি-না!”
 এমন ভাবে কথাগুলো বলল সে যেন ষাট বছরের কোনো বৃদ্ধ বসে আছে তার সামনে। মেজবাহ্ ভ্রু দু'টি কুঞ্চিত করে ফেলল। ইমনের দিকে শীতল চোখে তাকাল। 

সিকান্দার ধমকে ওঠল, “এই, আপনি কীভাবে কথা বলছেন? কার সাথে কথা বলছেন ভুলে যাচ্ছেন?”

 ইমন এবার গা জ্বালানো একটা হাসি দিলো। গায়ের সাথে ঘামে লেপ্টে থাকা শার্টটাকে টানতে টানতে বলল, 
 “কার সাথে? জনগণের আদর্শ ন্যাতার সাথে। যে শীতল রুমে বসে সাধারণ মানুষকে অকারণে ঘুরাতে থাকে। জনগণের ভোটে জয়ী হয়ে জনগণকেই মূল্য দেন না, ব্যাপার কী বলুন তো?”
 কথাগুলো বলছে বেশি আনন্দ মনে। যেন কত মজাদার কথা বলছে সে। 

 সিকান্দার কিছুটা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে। এই ছেলে যে আস্ত ফাজিল তা তো চেহারা দেখে বোঝারই উপায় নেই!
 মেজবাহ্ সিকান্দারকে চোখের ইশারায় কিছু বোঝালো। হয়ত চুপ থেকে দেখতে চাইল ইমনের মতি গতি। সে নিজের দু-হাত এবার নিজের থুতনির নিচে রাখল। বেশ শান্ত, শীতল স্বরে বলল, 
“ব্যাপার কিছু নয়। আপনি বলুন, আপনি না-কি কোনো সাক্ষাৎকার নিতে চাচ্ছেন। সেই বিষয়টা নিয়ে তো কথা বন্ধ করে দিতে বলেছিলাম!”

 “কেন? সেটাই জানতে চাচ্ছি।”

“কৈফিয়ত না আগ্রহ সেটা আগে পরিষ্কার করুন, এরপর দেখছি।”
 কথা শেষ করেই চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল মেজবাহ্। ইমনের মুখটির হাসিটা এখন সরতে দেখা গেলো,
 “কৈফিয়ত হলেও তো তা দিতে আপনারা বাধ্য। জনগণের সেবার জন্যই তো পদ নিয়ে বসে থাকেন। আপনার বাবা চেয়ারম্যান। আপনি গণ্যমান্য রাজনৈতিক নেতা। আপনারা এই স্থানে কীসের জন্য এসেছেন? জনগণের সঠিক জীবন নিশ্চিত করতেই তো! তাহলে সেখানে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে কি আপনাদের উচিত নয় তা আমাদের জানানো?”

  “একদম উচিত। তবে, দুর্ঘটনায় যদি কারো কোনো বড়ো ক্ষতি না হয়ে থাকে তাহলে সেই ঘটনা না জানালেও তো চলে, তাই না?”
মেজবাহ্ শেখ শান্ত থাকলেও শান্ত থাকল না ইমন। সে রেগে গেলো। এত শান্তশিষ্ট ছেলেটা রেগে অগ্নিশর্মা হলো। টেবিলের উপর এক হাত দিয়ে শব্দ করে উঠে দাঁড়ালো,
 “আপনাকে সবাই আদর্শ মানলেও আপনার ভেতরও ছল আছে। সেই দুর্ঘটনা অসাবধানতার জন্য হয়নি, হয়েছিলো ইচ্ছেকৃত। মেজবাহ্ শেখ, জীবনও যেতে পারতো এতে। নকল ওষুধ বানানো হচ্ছিলো সেখানে! আপনার নীতি কথা কোথায় এখন? এমন অন্যায়কে ধামাচাপা দিতে নীতিতে বাঁধেনি?”

  “আমার নীতিকে আমি বোধহয় ঠিকমতোই রাখতে পারছি। আপনি উত্তেজিত হচ্ছেন!” 

ইমন দাঁত কিড়মিড় করল। মেজবাহ্ শেখের এই লুকোচুরি তাকে অধৈর্য করে তুলেছে আজ। 
“ঠিক মতো রাখতে পারছেন? নীতি ঠিক থাকলে আজ দেশের প্রতিটা মানুষ জানতো শেখ কোম্পানির জন্য কী হতে যাচ্ছিলো! আপনি কাকে লুকাতে চাচ্ছেন? নিজেকে? না কাছের কাউকে। আপনি মেজবাহ্ শেখ হলে আমিও ইমন শিকদার। আমি যেহেতু এই বিষয়টাকে একবার ধরেছি শেষ অব্দি না দেখে ছাড়ছি না। আর মেজবাহ শেখ, আপনাকে অবগত করে যাচ্ছি, ইমন শিকদারের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। শেখ কোম্পানিকে ডুবাতে আমি ইমনই যথেষ্ট।”

  “ঠিক আছে। গুড লাক ইমন সাহেব। আমিও দেখব বিষয়টা।”
ইমন ক্রোধান্বিত দৃষ্টি নিয়ে একবার মেজবাহ্ শেখ আরেকবার সিকান্দারকে দেখে বেরিয়ে গেলো। বেরিয়ে যাওয়ার সময় ধাক্কা খেলো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজনের সাথেও। কিন্তু সেদিকে তার হুঁশ কোথায়? বসে আছেতো সব হুঁশ হারিয়ে।

—————

  শিকদার বাড়িতে মাঝে মাঝেই রাত জেগে পড়ে প্রেমা। টুইটুবানি তখন টেলিভিশন ছেড়ে সিনেমা দেখে। সিনেমা না থাকলে ক্যাসেট লাগিয়ে সিডিতে সিনেমা ছেড়ে বসে আয়েশ করে দেখে। যতক্ষণ না এই বাড়ির সকলে ঘুমাচ্ছে ততক্ষণ ওরও ঘুম আসে না। ওকে এই সিডি গুলোও এনে দেয় ইমন ভাই আর মোঝো আপা। 
 
 রাত বাজছে তখন এগারোটা। খাওয়া দাওয়ার পার্ট চুকেছে সেই কখন। জোহরা নিজের ঘরের দরজা আটকে কিছু একটা করছে। তখনই দোতালার টেলিফোনটা বেজে ওঠল। 

 টুইটুবানি একবার দোতালায় তাকিয়ে আবার মন দিলো টেলিভিশনে। ঐ টেলিফোন ধরার নির্দেশ নেই তাদের। তাই যতই বাজুক ধরতে পারবে না। তাছাড়া এখন আব্বা বাড়িতে। তিনিও বেরিয়ে আসবেন। 
 টুইটুবানি পুনরায় তাকাতেই দেখল আব্বা বেরিয়েছেন। টেলিফোন তুলে দাঁড়িয়ে আছেন ঠাঁই। মুখ চোখ যে পাল্টে গিয়েছে মানুষটার। হতভম্ব ভাব! 

 খটকা লাগলো টুইটুবানির। নিচ থেকেই ডাকল সে, “আব্বা, ও আব্বা, কিছু হইলো কি? অমন দাঁড়ায় আছেন কেন? আব্বা, কে ফোন দিলো?”

 যাবের শিকদারের তখন হাঁটু কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। টেলিফোন রেখে রেলিং ধরে দাঁড়ালেন শক্ত করে। যেন তার দুনিয়াটা ঘুরছে। পড়ে যাবেন এখনই। 

 টুইটুবানি ঠিক খেয়াল করল এই অস্বাভাবিকতা। দৌড়ে এলো সিঁড়ির কাছে, 
 “আব্বা কী হইছে আপনার? বেতাল লাগতেছে? আব্বা?”

 বলতে বলতে মেয়েটা সিঁড়িতেও পা দিয়ে ফেলেছে। 
টুইটুবানির সেই হেঁড়েকন্ঠ ঠিক পৌঁছালো জোহরার কানে। ও নিজেও বেরিয়ে এলো দরজা খুলে। ছুটে এলো প্রেমাও। 

 যাবের শিকদার কোনোমতে বললেন, “সি, সিলেট থেকে কল এসেছে। দ্রুত তৈরি হও সকলে। সিলেট যেতে হবে…”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp