বাইরে আলো ফুরিয়েছে। রাতের চাদর আকাশ জুড়ে। ঠিক কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সেটা খেয়াল নেই শাওলিনের। চোখ খুলে যখন তাকাল তখন দেখল নিঃসঙ্গ নিভৃত শূন্য ঘর। কোথাও মনুষ্য পদছাপের নমুনা নেই। তার মানে দুপুরের সেই শীতল যুদ্ধের পর মানুষটা আসেনি। কেমন হু হু করে উঠল বুকের ভেতর, যেন আশা করেছিল মানুষটা এখানে আসবে। শোয়া ছেড়ে উঠে দীর্ঘ চুলগুলো খোপা করে শাওলিন বাইরে বেরোল। সাবধানে বাঁশের মই বেয়ে নিচে নামল। সমুখে নদী, আকাশে মেঘে ঢাকা সূর্য। নিঃশব্দ চরাচর কেমন শান্ত, নির্জীব দেখাচ্ছে। বাড়ি ফিরতে তেমন অসুবিধা হলো না, কারণ সরু আলপথ ধরে অগ্রসর হলেই বাংলার সীমানায় পৌঁছে যায়। দুপাশে ঝুপসি আঁধার, ঘন ঝোঁপ, বুনো ঘাসের আস্তরণ মাড়িয়ে শাওলিন একপর্যায়ে দূর থেকে রোকেয়াদের বাহির বাড়িটা দেখতে পেল। বিদ্যুৎ নেই, হারিকেন জ্বলছে। অন্ধকারে নিঃশব্দে হেঁটে যেতেই রাবেয়া নিচুস্বরে ডাকল,
- ভাবীজান!
একটু প্রশ্নাত্মক চাহনিতে ডানের বাড়িটায় তাকাল শাওলিন। রাবেয়া হুড়মুড় করে উঠোনে নেমে এল। আগের চেয়েও প্রচণ্ড নিচুস্বরে বলল,
- এহন ওইদিকি যাইয়েন না, ভাবীজান।
শাওলিন অদ্ভুত বিস্ময়ে বলল,
- কেন?
- কিছু লোক আইছে, ভাবীজান। এহন যাইয়েন না। পরে যান।
- এখন গেলে কী সমস্যা? কে এসেছে? তোমার ভাইজান ভেতরে না?
রাবেয়া দোনোমনা করছিল। বাংলোর সদরপথের দিকে চেয়ে সাবধানী গলায় বলল,
- গুলজার সাবের লোক। পরে যান ভাবী। এহন যাইয়েন না।
শাওলিন এমনিতেই দুপুরের ঘটনায় মেজাজ রুক্ষ করে আছে। একটা মানুষ সর্বত্র অন্ধকারে ওকে রাখছে। তার কোনোরকম নিষেধাজ্ঞা এই মুহুর্তে প্রচণ্ড জেদ শাওলিনকে ঘটনা দেখার প্রতি কৌতুহলী করল। শাওলিন পরিষ্কার ভাবে জানাল,
- তোমার ভাইজানের খেপা নিয়ে আমি মোটেও ভাবি না। উনি আমার দিকটা বিবেচনা করেন না, আমারও কথা উচিত না। আমি গেলাম।
একরোখা উত্তরে শাওলিন পা বাড়াল সামনে। পেছন থেকে রাবেয়া প্রচণ্ড বাঁধা দিয়ে গেল, কিন্তু দুপুরের সেই ক্রোধ মাথা থেকে নামেনি শাওলিনের। দমকা বাতাসে কানের দুপাশে কিছু চুল খোপা খুলে এসেছিল। নিখুঁত কপালে রাগের দৃঢ়তা, যা ওই মুহুর্তে লালচে আভায় অদ্ভুত শ্রী ফুটিয়ে তুলছিল পবিত্র মুখে। শাওলিন সদর দরজায় পা দিতেই বাইরে জলো হাওয়া খোপার বাঁধন খুলে ঝরঝর করে কোমরের কাছে চুল নামিয়ে দিল। কারো আগমনী পদশব্দে একযোগে চারজোড়া চোখ ওই মুহুর্তে দরজায় চাইল। তিনজোড়া ধূর্ত চোখ স্থির বিদ্ধ হলেও একজোড়া চোখে শুধু অপ্রস্তুত ছায়া ঘনাল। সেই চোখে চোখ বিঁধিয়ে হলঘরটা অতিক্রম করছিল শাওলিন। ঠিক তখনই বিস্মিত গলাটা ভেসে এল,
- সে কী ট্যূরিস্ট মেয়েটা?
সোফায় বসে থাকা গুলজার আজিজ প্রশ্নটা হঠাৎ করে বসলেন। সেই প্রশ্নের বাতাসে কালো স্যূটধারী দুটো লোক কেমন ক্ষীপ্র দৃষ্টিতে তাকাল। যেন পৃথিবীতে মঙ্গলগ্রহ থেকে কোনো জীব এসেছে, তাকে দেখছে চরম বিষ্ময় ও কৌতুহল নিয়ে। শাওলিন কারো দিকে ভ্রুক্ষেপ করছিল না। ওর কালো দুটো চোখ শীতল, কঠোর, খেপাটে নীল চোখে বিদ্ধ হয়ে গেল। ক্যাপাচিনো কফির মতো বাদামি রঙে যে শার্টটি পরা, সেটি যেন এই মুহুর্তে বাহুর প্রতিটি খাঁজ ফুটিয়ে তুলছিল। ডানহাতে ধরা পোর্সেলিন শ্বেত মগটা এমন দৃঢ়তায় ধরল, আঙুলগুলো যেন মারণ ছোবল দিয়েছে। শাওলিন আরেকদফা প্রশ্নে সংবিৎ ফিরে পেতেই শীতল চাহনি থেকে রেহাই পেল। ফোনে কথা শেষ করে ফিরে এসেছে রাফান। চকিতে পরিস্থিতি বুঝে শাওলিনকে আড়াল করে বলল,
- ম্যাম, আমাকে এককাপ কফি দেয়া যাবে? দুধ চিনি মিক্সড। স্যারের মতো র কফি চাচ্ছি না।
শাওলিন চট করে রাফানের দৃঢ় মুখ দেখে সম্মতি জানিয়ে বলল,
- নিশ্চয়ই। আপনি একটু বসুন। আমি কফি করে আনছি।
রাফান মাথা নেড়ে মৃদু সৌজন্যতা প্রকাশ করল।সোফায় বসা লোকগুলো সভ্য দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না। আড়চোখে ব্যাপারটা মেয়েলি প্রখর ইন্দ্রিয়ে বুঝে গেছে শাওলিন। রান্নাঘরে ঢুকলে ওর স্নায়ুমন শুধু শীতল চোখদুটোকে স্মরণ করল। কেন বারবার দুজনের ভেতর মালিন্য তৈরি হচ্ছে? এমনিতেই কী মানুষটার ভেতর দেয়াল পাচ্ছে না? যে দেয়াল ডিঙোতে গেলেই লোকটা বন্য প্রকৃতির মতো ক্রুদ্ধ হয়ে যায়। দ্রুতহাতে এক কাপ কফি বানিয়ে ফেলল শাওলিন। পিছু ঘুরতেই রান্নাঘরের চৌকাঠে রাফানকে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ভ্রুঁ দুটোর মাঝখানে খাঁজ করে শাওলিন বলল,
- কিছু বলবেন, রাফান সাহেব?
রাফানের পরনে সাদা টিশার্ট। বুকের কাছে বড়ো বড়ো ইটালিক কালোবর্ণে 'NO MAN'S LAND' ছাপা। ডানহাতটা বুকের কাছে স্লিং দিয়ে ঝুলোনো, ডান গালে ক্রস করা সাদা ব্যাণ্ডেজ। রাফান শালীন ভাবে দৃঢ়তাপূর্ণ স্বরে বলল,
- বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য দুঃখিত, ম্যাম। আপনি অনুমতি দিলে কিছু কথা বলতাম।
রাফানের রগচটা উগ্র স্বভাবটা পরিশীলিত হয়ে এসেছে। শোয়েবের বিয়ের পর শাওলিনের প্রতি উগ্রপন্থী আচরণ মোটেও নেই। শাওলিন বড়ো ট্রের ওপর কালো কফিমগ রেখে বলল,
- রান্নাঘরে গরম। চলুন, অন্য কোথাও বসে কথা বলি।
শাওলিন ট্রের ওপর ছোটো পিরিচে চিনির মিশ্রণে ডোবা নিমকি, কিছু ঝালপিঠা, রকমারি বিস্কুট সাজিয়ে নিচতলার একটি ঘরে প্রবেশ করল। ঘরটা উত্তর মুখো। জানালা ও বারান্দা দিয়ে নির্জন অরণ্যের টুকরো পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। বেতের একটি সোফায় শাওলিন বসতেই রাফান বিপরীতমুখী একটি সোফায় সম্ভ্রম ভাবে বসলো। শাওলিনই মৌণতা ভেঙে বলল,
- কফিটা খেতে খেতে বলুন। আপনার স্যার নিশ্চয়ই এখানে আসার মতো অবসর নন।
রাফান বাঁহাতে কফির মগ তুলে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল,
- আপনাকে কিছু কথা বলার জন্য বেশ কদিন ধরে চিন্তা করছিলাম। একবার ঢাকা যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানেন নিশ্চয়, স্যারকে একপাল জানোয়ারের ভেতর রেখে যাওয়া যায় না।
কথাটা শুনে শাওলিন নিজের চায়ের কাপে চুমুক থামাল। চোখে অপার কৌতুহল নিয়ে বলল,
- আপনি এমনটা বলছেন?
- অস্বীকার করব না, স্যার চাকরিতে জয়েন করে অনেকের তক্তা সরিয়ে দিয়েছে। এই যে দেখছেন গুলজার আজিজ এসেছে, ইনিও এসেছেন কিছু উদ্দেশ্য পূরণ করতে।
শাওলিন অদম্য কৌতুহল দমাতে পারল না। সাথে সাথে প্রশ্নটা করে বসলো,
- কী উদ্দেশ্য, রাফান সাহেব? আমাকে এই ব্যাপারে বলা যাবে?
রাফান একবার খোলা দরজা দিয়ে তাকাল। বাইরে শূন্য আঁধার দেখে চোখ ফিরিয়ে বলল,
- আপনি নিশ্চয়ই জানেন খাগড়াছড়ির সীমান্তে ভারতের বর্ডার।
- জ্বী। কিন্তু এর সঙ্গে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের কী সম্পর্ক?
- আপনার কী মনে হয়নি উনি কেবল ডিভিশনের আণ্ডারে বনবিভাগটাই দেখেন না?
শাওলিন বুঝতে পারল না কথাটা। চোখেমুখে দ্বিধান্বিত ছাপ রেখে বলল,
- ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা। আমি যদি ভুল না হই, বাইরে যিনি এসেছেন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। তাহলে আপনার স্যারের অথরিটি পাওয়ার কীভাবে লাগবে?
রাফান মুচকি হাসলো। কেমন রহস্যময় লাগল সেই ভঙ্গি। হাতের মগটায় বাড়তি দুটো চুমুক দিয়ে বলল,
- আপনাকে এসব জানানো ঠিক না। স্যার চান না আপনি এসবে জড়ান।
আঁধার ঘনালো শাওলিনের শান্ত মুখে। রাফান আবারও দরজার বাইরে নজর বুলিয়ে কথাগুলো সাবধানে উচ্চারণ করল,
- দেখুন, স্যারের এই চাকরিটা না করলেও চলে। উনার অর্থবিত্তের প্রার্চুয্যতা হয়ত এখনো জানেন না।
শাওলিন চকিতে মনে করল, মির্জা এন্টারপ্রাইজের যে ব্যবসা, সেটার হালনাগাদ সমস্ত কিছুই এই মানুষটার পকেটে। সেক্ষেত্রে বনবিভাগের চাকরিটা অবশ্যই মূখ্য পেশা হবে না। শাওলিন ভাবনা বুনে রাফানের সমুখে রাখল,
- আপনি বলুন তো, এই পারিবারিক ব্যবসাটা কীসের? আমার ঠিক জানা নেই উনারা কেন বাংলাদেশ ছেড়ে আমেরিকায় থাকেন।
- ম্যাম, আপনি দরকারি অনেক কিছুই জানেন না। তাই আমিও এমন কিছু জানাতে চাচ্ছি না যেটা আপনাদের ভেতর ভুল বোঝাবুঝি আনবে।
- দেখুন, আপনাকে জোর করার অধিকার আমার নেই। আপনি বসের অনুগত হবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বসের স্ত্রী যদি জানার জায়গা থেকে কিছু প্রশ্ন করে, সেটা সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলাটা অবশ্যই কর্তব্য।
- শাওলিন ম্যাম, আপনি ভীষণ চমৎকার। তাই আমার রিকোয়েস্ট থাকবে দয়াকরে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনাকে চাইলে এখুনি সবটা জানাতে পারি। কিন্তু প্রসঙ্গটা আপনার জানাজানির চাইতে ওই মানুষটার বিশ্বস্ততা এখানে যুক্ত।
- শুধু এটুকু বলুন, ব্যবসাটা কীসের? সিনেমা বা স্টার জলসা নাটকের সেই ঘটনার মতো বলবেন না যে উনি নারী পাচারে সম্পৃক্ত!
রাফান হেসে দিল। কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে মগটা কাঁচের টেবিলে ঠক করে রেখে বলল,
- আপনি ঔষুধ খান?
গুরুতর আলোচনায় এমন প্রশ্ন শুনে প্রচণ্ড ভড়কায় শাওলিন। ভড়কানো চোখে হতভম্ব গলায় বলল,
- জ্বী, তা নিশ্চয়ই। কিন্তু কেন?
- ঔষুধের কারখানাকে কী বলে?
চরম আশ্চর্য হলেও শাওলিন বলল,
- ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি অথবা ড্রাগ সাইট।
- স্যারের ব্যবসাটা ফার্মাসিউটিক্যাল ইণ্ডাস্ট্রি বা ড্রাগ সাইট। মোদ্দাকথা ঔষুধ নিয়ে। যে ঔষুধ বাইরের কান্ট্রি থেকে তিন থেকে চারগুণ দামে কেনা হয়, এরপর দেশের বাজারে বিক্রি হয় ভয়ংকর দামে। সেই ঔষুধ বাইরে থেকে দেশে আনছেন। দামও করে দিচ্ছেন একদম সুলভ মূল্যে।
শাওলিন চায়ের প্রতি মনোযোগ দিতে পারল না। চারপাশ অর্থশূন্য মনে হলো। রাফান সেই উদগ্র কৌতুহলকে ঠাওর করে ফের বলতে লাগল,
- উনার ভাইরা চেয়েছিলেন এই দেশে মোটা অংকের ব্যবসা দাঁড় করাতে। কারণ এদেশে ঔষুধ এমন জিনিস যেখানে সবাই ক্রেতা।
রাফান কিছুক্ষণ মৌণ অবস্থা পালন করল। কেমন যন্ত্রণাময় চোখে তাকাল শাওলিনের দিকে। বাতাসে রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে করুণ সুরে বলল,
- সবচেয়ে বড়ো সত্যি কী জানেন? এই দেশে পদে পদে দুর্নীতি। এইযে গরীব মানুষ। এখানে ধণীদের সংখ্যা কত? নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটা সবচেয়ে অবহেলিত। কখনো দেখেছেন টাকার জন্য চিকিৎসা করাতে না পেরে রোগী বাড়িতে বসিয়ে রেখেছে?
শাওলিন উত্তর করতে পারল না। চায়ের স্বাদ মুহুর্তেই বিস্বাদ ঠেকতে লাগল। রাফান জানালার বাইরে গাঢ় অন্ধকারে চোখ রাখল। কণ্ঠে আঁধার ঘনানো শান্তভাব, খুব ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল,
- বিদেশী ঔষুধের দাম তিন টাকা। কেনা হয় পাঁচ টাকায়। সবখানে সরবরাহ হয় দশ টাকায়।
রাফান বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে শাওলিনের দিকে তাকাল। চায়ের কাপ টেবিলে রেখে শাওলিন চুপ করে শুনছে।
- দেখুন, আপনি হয়ত ভাবছেন উনি অসাধু মানুষ। আপনাকে অনেক কিছুই জানান না। কিন্তু ভেবে দেখুন, আপনি জীবনে যে যন্ত্রণাগুলো কাটিয়ে এসেছেন উনি কী চাইবেন উনার সমস্যাগুলো আপনার ঘাড়ে আসুক?
শাওলিন দুটো স্বচ্ছ, সরল, শান্ত চাহনি দিয়ে রাফানের কথাটুকু মর্মোদ্ধার করে নেয়। খানিকটা সময় নিশ্চুপ থেকে বলে,
- মানুষের প্রচণ্ড আবেগ, রাফান সাহেব। যেদিন বুঝবেন আপনার জীবনে অজান্তে কারোর হস্তক্ষেপ এসে গেছে, তখন আর নিজের চিন্তা করতে পারবেন না। সবসময় মনে হবে তাকে নিয়ে ভাবি। আর এই ভাবনাটুকু এমন যে, কিছু না করতে না পারার আফসোস আপনাকে অস্থির করে তুলবে।
সামান্য কথাটুকুতে রাফান চোখ সরু করে তাকিয়েছিল। যেন মস্তিষ্কের কোষে গভীর কিছু উদঘাটন চলছে। কিছুক্ষণ শান্তভাবে তাকিয়ে সহজ গলায় বলল,
- এই অস্থিরতা আপনার জন্য মঙ্গল। আপনি বুঝতে শিখবেন উনি আপনার জন্য কতটা মূল্যবান।
সোফা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল রাফান, হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় বেতের আসনে বসল। শাওলিনের অর্থপূর্ণ চোখে স্বাভাবিক চাহনি রেখে বলল,
- কখনো যদি সুযোগ হয় উনার ছোটোবেলার কথা জিজ্ঞেস করবেন। দেখবেন উনি অন্যরকম। যতটা বাহির থেকে প্রকাশ করছেন, ভেতর থেকে সম্পূর্ণ কোমল। তবে, একটা অনুরোধ করব। ধৈর্য হারাবেন না। উনাকে সময় দেবেন একটু।
শাওলিন মন্থন চোখে কাঁচের গোল টেবিলে তাকিয়ে রইল। শব্দশূন্য ঠোঁট দুটো মৃদু বাতাসে কম্পমান ফুলের মতো কাঁপছিল। আঙুলে বিয়ের একমাত্র স্মৃতিস্বরূপ হীরের আংটিটা অন্যহাতের আঙুলে নাড়াচাড়া করছে। রাফান আর কিছু না বলে নিঃশব্দে উঠে গেল। ধীর পায়ে ঘরের বাইরে যেতেই একবার পিছু ফিরে দেখল। জানালা দিয়ে ঢোকা উত্তুরে হাওয়ায় ভাবুক মুখটায় সরল ছবি দেখে রাফান বেরিয়ে পড়ল।
—————
সেসময় ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। রাত সোয়া নটা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাসানী হলে তিন বন্ধু বিছানায় বসেছিল। সমুখে অনেকগুলো রহস্যের টুকরো। প্রতি টুকরোতে কিছু ঘটনা আছে। নাযীফ ক্যামেরা হারালেও ক্যামেরার বিষয়বস্তু সবকিছু মোটামুটি রিং প্যাটার্ন নোটপ্যাডে লিখে রেখেছে। সেলিমের সেলফোনে একটা বৈদেশিক পত্রিকার প্রতিবেদন স্ক্রিনজুড়ে দৃশ্যমান। যেখানে স্পষ্ট অক্ষরে বোঝা যায় পত্রিকাটি জার্মান ভাষায়। গুগল ট্রান্সলেটে বাংলা করা। জিদান দুজনের মুখ থেকে বিশদ ঘটনা শুনে থমথমে মুখে নিশ্চল। পাথরের মূর্তিতে টোকা মারলে যেমন প্রাণের দেখা মিলবে না তেমনি দেখাচ্ছে জিদানের অবয়ব। সেলিম নিঃশব্দ ফুঁড়ে গম্ভীর মুখে বলল,
- ব্যাপারটা প্রথম ধরা পড়ে ২০১৭ সালে। কোনো নিউজপোর্টালে এই খবর ছাপতে দেয় নাই। মোটামুটি গোপনেই ঘটতেছে।
সেলিমের বয়ানে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে কেউ। শ্বাস ফেলা ব্যক্তি নাযীফের দিকে তাকায় সেলিম। প্রশ্নটা সঙ্গে সঙ্গেই করে,
- তুই যদি সেদিন গুরুত্ব দিতি, আজকে এই ঝামেলাটা হতো না। তোকে বারবার মানা করতেছিলাম ওই জায়গাটায় ঢুকিস না।
নাযীফ বুকে দুহাত ভাঁজ করল,
- এসবের ভেতরে শোয়েব স্যার কীভাবে জড়িয়ে আছে?
সেলিমের মুখে অদ্ভুত রং ফুটল। কারো চোখে না পড়লেও সেলিম জানে এই প্রশ্নটার উত্তর দেয়া যাবে না। দ্রুত অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে বলল,
- ওখানে নিশ্চয় কোনো না কোনো খারাপ কুকর্ম ঘটায়। নাহলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এসব সেটাপ করতো না।
বেশ খানিকটা সময় পর জিদান মৌণতা ছাড়ল। কাগুজে ম্যাপের গোলাকার চিহ্নে তর্জনী বসিয়ে বলে,
- এখানে কাজ করার অনুমতি কারা দিল? মাস্টারমাইন্ড কে হতে পারে? গভমেন্ট?
সেলিম আর নাযীফ দৃষ্টি বিনিময় করল। দুজন জিদানের দিকে তাকালে জিদান ওদের দিকে চোখ তুলে বলল,
- বিরাট অঙ্কের ফাণ্ডিং বরাদ্দ। কয়েকশো কোটি তো হবেই। সরকারি লোক মনে হয় না।
নাযীফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের বাঁধন খুলে বলল,
- এখানে 'ওরা' কে, কেউ জানি না। গভমেন্ট বা ছদ্মনামে কেউ চালাচ্ছে। ফাণ্ডিংয়ের ব্যাপারটা চিন্তা করলে মনে হয় বাইরের কেউ যুক্ত। তাছাড়া কয়েকশো কোটি টাকার ইনভেষ্টমেন্ট, আসলেই এটা মুখের কথা না।
সেলিম আঙুলের ফাঁকে মালবোরো সিগারেটের গোলপ্রান্ত টেনে নিচ্ছে। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
- ম্যাগনেটিক ফিল্ড। পুরোই অবাস্তব সাইন্স ফিকশন মুভির ফিল দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশেই কেন? সব জায়গা থাকতে খাগড়াছড়িতেই কেন? চট্টগ্রাম ছিল, রাঙ্গামাটি ছিল! ইভেন ঢাকারও কিছু কিছু এরিয়া এখনো পরিত্যক্ত!
নাযীফ প্রশ্ন দুটোর সম্ভাব্য কিছু উত্তর সাজিয়েছিল। সেগুলো গোছগাছ করে বলল,
- হতে পারে সরকার সবকিছু জানে। কেউ গভীরভাবে সন্দেহ করলেও আজ পর্যন্ত উদঘাটন হয়নি কিছু। তাছাড়া লক্ষ কর, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য স্যাটেলাইটেও অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়বে না।
অকস্মাৎ জিদান হুট করে প্রশ্নটা করল,
- জানা এই ব্যাপারে কিছু জানে?
নাযীফ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
- কিচ্ছু জানে না।
ভ্রুঁ দুটো খিঁচিয়ে জিদান অতর্কিতে ভাবতে লাগল। ইতস্তত করে অধর কামড়ে বলল,
- কিছু তো বলা দরকার। তোরা অনেক বেশি সময় নিচ্ছিস। যদি লোকটা খারাপ কিছুর নেতা হয়? ওকে তো মেরে--
নাযীফ মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
- তোর মাথায় কী গু? কোনো ক্ষতি করলে প্রথমদিনেই করতো না? ওকে সাজিয়ে গুছিয়ে বিয়ে করতো?
সেলিম তীব্র অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকাল। চোখের সামনে শাওলিনের কিছু ঘটনা ভেসে উঠেছে। খাগড়াছড়িতে থাকাকালীন ফাঁকা গাড়িতে শাওলিনকে পেয়েছিল সে। সেলিম সেসময় বুদ্ধি আঁটলেও একটা নাম শুনে পিছিয়ে যায়। শাওলিন ফোন করেছিল আর কাউকে নয়, শোয়েব ফারশাদকে। তার মানে তখন থেকেই অনুভূতির সূচনা চলছিল। সেলিম জোরে সিগারেটে টান দিয়ে ভুরভুর করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল,
- আচ্ছা একটা কথা বল তো! এমন কী হতে পারে না জানা আগে থেকেই জানে? কিন্তু আমাদের সামনে না জানার ভং ধরছে? ও আমাদের আগে ওই বাড়িতে ঢুকেছে। ওই লোকের বেডরুমেই শুয়েছিল!
চরম রাগে নাযীফের মুখ বিকৃত হলো। শেষের শব্দটা এতো কটু! দুটো জ্বলন্ত চাহনি ছুঁড়ে ঝাঁঝিয়ে বলল,
- তোর মতো অন্যদের নোংরা ভাবতে শরম করে না? রেসোর্টে ওইদিন একলা ফেলে আসলি কেন? লজ্জা করল না? শালা, কত বড়ো মুখ নিয়ে কথা বলোস।
নাযীফের হুংকার শুনে জিদান আড়চোখে তাকাল। সেলিমের ভেতর ভাবান্তর ঘটছে না। একমনে সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে সে। কিন্তু লক্ষ করলে বোঝা যাবে, শাওলিনের নাম শুনতেই কপালের কোণে রগগুলো দপদপ করে কাঁপছে। ভেতরে ফুটছে ক্রোধের লাভা।
—————
গাঢ় বাদামি শার্ট পড়ুয়া লোকটার জন্য দোতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকাচ্ছে শাওলিন। কালো স্যূটধারী লোক দুটো বেশ খানিকক্ষণ হলো চলে গেছে, বসে আছে কর্ণেল গুলজার আজিজ। ঘড়িতে সাড়ে নটা। অতিথি নিয়ে ঠিক রাত সাড়ে আটটা বাজে খেয়ে নিয়েছে মানুষটা। ওকে ডাকেনি। খাবার টেবিলের সমস্ত কিছু দেখেছে মতিন লাল। টুকটাক মোখলেস। কিন্তু কোনো নারীকে কাছে ভিড়তে দেয়নি। এটা রহস্যজনক অবশ্য। শাওলিনের চোখগুলো সোফায় বসে অনুভব করছিল শোয়েব। একবার চশমার আড়াল থেকে তাকাল সে। মুখে অস্থিরতা। চোখে ব্যাকুল ভাব। সুন্দর নখগুলো রেলিংয়ে খুঁটে খুঁটে বসছে। সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে কর্ণেল গুলজারকে মন্থর করল। হাতঘড়িতে নজর রেখে বলে চলল,
- কর্ণেল, আজ ক্লান্ত। আপনার যদি অসুবিধা না হয় বাকি আলাপ অন্যদিন করি?
কর্ণেল গুলজার চতুর বুদ্ধিসম্পণ্ন। তিনি চোখের কোণে দোতলায় নারী মূর্তিকে দেখেছেন। শোয়েবকে চশমার কাঁচ দিয়ে অন্যত্র তাকাতে দেখে তখুনি প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। সৌজন্য হাসিতে সোফা থেকে উঠতে উঠতে বলেন,
- তুমি সদ্য বিয়ে করেছ, আমার এটা বোঝা উচিত ছিল। খুব দুঃখিত। বেশি সময় নিশ্চয় নেইনি।
- নিলেও কিছু করার থাকবে না। আপনি কাজের আলাপে এসেছেন। চলুন, এগিয়ে দিই।
শোয়েব দ্রুত বিদায় জানাতে উৎসুক। মনে টান কাজ করছে। দুপুরের পর একমুহুর্তও কাছে যায়নি। নদীর কাছে ছোট্ট ঘরে যাওয়ার কথা শুনেও মনকে কষে লাগাম পড়িয়ে রেখেছে। জেদের জন্য পা বাড়ায়নি সে। হঠাৎ গুলজার সাহেব বাইরে এক কদম দিয়ে বললেন,
- ইলহামের বিয়ে ঠিক করতে চাচ্ছি। কিন্তু মেয়েটা রাজি হচ্ছে না।
শোয়েব কথাটায় প্রত্যুত্তর করল না। নীরবতাটা দীর্ঘ করে দিল। গুলজার সাহেব ব্যাপারটা বুঝে নিজ থেকেই বললেন,
- মা মরা মেয়েটাকে দুঃখ পেতে দেখলে কষ্ট হয়। পৃথিবীতে যারা বাবা, তারা এই আক্ষেপগুলো ঠিক বুঝে যাবে।
মাটির দিকে চশমা পরা চোখ দুটো রেখেছে শোয়েব। প্যান্টের দু পকেটে হাত। পদক্ষেপ সংযত। কিছুক্ষণ ভেবে প্রশ্নটার মাপা উত্তর দিল,
- আমি বাবা হলে আমার সন্তানদের দুঃখ বোঝাব। যন্ত্রণা কেমন, কীভাবে সহ্য করতে হয় এগুলো তারা জানবে। তবে, সন্তান আমি অনেকগুলো চাই। ম্যাডামকে বলব একটু কষ্ট করে কিছু সন্তান উপহার দিতে।
শোয়েবকে এরকম কিছু বলতে দেখে ভারী আশ্চর্য হলেন গুলজার। তিনি যে মেয়ের জন্য শোয়েবকে ভেবেছিলেন, সে ধারণায় নতুন করে পানি ঢেলে দিল শোয়েব। বুঝিয়ে দিল ইলহাম তার জন্য উপযুক্ত মেয়ে নয়, তার চিন্তার ক্ষেত্রেও নয়। গাড়িতে চড়ে বিদায় জানালেন গুলজার। সংক্ষিপ্ত হাসি দিয়ে শোয়েব ফিরতি পথে পা ঘুরাল। পেছনে দুটো চোখ না থাকলেও শোয়েব কিছু টের পাচ্ছিল। সদর দরজায় পৌঁছে হঠাৎ পিছু ফিরল। তাকাল সোজাসাপ্টা লোহার গেটের বাইরে। ফাঁকা অন্ধকার। দূরবর্তী একঝোঁপে পাতা নড়ছে। শোয়েব চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখল, বাতাস নেই!
সদ্যস্নান সেরে রুমে প্রবেশ করল শাওলিন। শূন্য রুম। কেউ নেই। জানালা দিয়ে সুগন্ধি ফুলের মিষ্টি হাওয়া ঢুকছে। পড়ণে তাঁতী কাপড়ের সুন্দর ল্যাভেণ্ডার রঙা শাড়ি। চুলের পানিতে পিঠ ভিজে ব্লাউজের কাপড়টা আঁটোসাঁটো। জানালার কাছটায় নিঝুম রাতের অমাবস্যা দেখতে দাঁড়াল শাওলিন। হাতদুটো গ্রিল আঁকড়ে সুদূরপ্রসারী আকাশপানে বিমুগ্ধ নয়ন মেলে তাকিয়ে ছিল। এমন সময় ধীর পদক্ষেপে কেউ একজন দাঁড়াল ওর পেছনে। পিঠের ওপর থেকে ভেজা চুলের বহর কঠোর-দৃঢ় পুরুষালি বাঁহাতে আস্তে আস্তে বাঁদিকে সরিয়ে নিল। গ্রিল আঁকড়ে ধরা শাওলিন আচমকা চমকে ওঠে পিছু ফিরতে চাইল, কিন্তু পারল না সে। ততক্ষণে গ্রিলের সঙ্গে চাপ প্রয়োগ করে ওর পিঠে সেঁটে শোয়েব দাঁড়িয়েছে। ঘাড়ের কাছে তপ্ত নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস মৃদু স্পর্শে কুঁকড়ে ওঠেছে শাওলিন। কপালটা গ্রিলের সাথে ঠেকিয়ে দুচোখ বন্ধ করে ক্ষীণ গলায় বলল,
- জানালা খোলা।
পেছন থেকে ভারি সশব্দ শ্বাস ওর কান ছুঁয়ে জানাল,
- থাকুক খোলা . . .।
কণ্ঠের ভেতরে নেশা মাখানো সুতীব্র পরশে বশীভূত হয় শাওলিন। শরীর তিরতির করে কাঁপে। বুকের কাছে উত্থাল পাত্থাল নিঃশ্বাস বড্ড অস্থির করছে ওকে। অনুভব করতে পারল, পিঠের কাছে কিছু একটা করে দিল বনমানুষটা। খসখসে শক্ত আঙুলগুলো ওর উন্মুক্ত পিঠের ত্বকে নিগূঢ় স্পর্শ বুলোতে লাগল। টের পেল, কাঁধের কাছে থাকা তপ্ত নিঃশ্বাসের মুখটা নামতে নামতে ওর পিঠের ওপর থেমেছে। দুটো পুরুষালি ওষ্ঠের আতপ্ত ছোঁয়া ওই পেলব নরম পিঠে ছুঁয়ে দিতেই গা সর্বস্ব শিউরে উঠল শাওলিন। ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা শীতল হাওয়ার মতো কাঁটা দিয়ে উঠে পশম স্তর। গ্রিলে আঁকড়ে ধরা হাতদুটো প্রবল মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললে শোয়েব নেশালু ঠাণ্ডা গলায় ধীরে ধীরে বলল,
- তুমি যখন চলে যাও, তুমি জানো না আমার কীভাবে সময় কাটে।
শাওলিন চোখদুটো বুজে জানতে চাইল,
- কীভাবে কাটে?
- তোমার সঙ্গে কাটানো এই মুহুর্তগুলো ভেবে। কত অল্প মুহূর্ত আমাদের! আমাকে পর্যাপ্ত সময় আজও দাওনি। আসার পর . . এখনো নয়।
শাওলিন কাঁধের কাছে মাথা এনে পিছু তাকাতে চাইল। ঝরঝরে চুলগুলো ব্যতীত কিছু চোখে পড়ল না। নরম স্বরে মানুষটার ছোটো ছোটো দোষ টুকে বলল,
- রাত করে বাইরে থাকে কে? দিনের নির্দিষ্ট সময় অফিসে কাটাচ্ছে কে? রাগ উঠলে জেদ দেখাল কে?
কথা শুনে মৃদু ঠোঁটে হাসি দেয় শোয়েব। হাসি জড়ানো সুন্দর ওষ্ঠযুগল ছুঁয়ে যায় ওর নরম পিঠে। কণ্ঠ স্তিমিত করে ফের বলে ওঠে শোয়েব,
- রাতে কোথাও যাব না। দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখব। তালার চাবি জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দেব। চলবে?
শাওলিন ফিক করে হেসে দেয়। বুকের ভেতরটা দুকূল ছাপানো বাতাসে শান্ত হয়ে যায়। গলার কাছে দলা পাকানো নিঃশ্বাসটুকু সন্তপর্ণে ফুসফুসে ঠেলে নীচু সুরে বলল,
- হাতদুটো শিথিল করুন।
- করলাম।
- করছেন না।
- করেছি।
শোয়েব কথামতো হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালে শাওলিন তার দিকে ঘুরে তাকাল। সরাসরি চোখদুটো নীলচক্ষুর স্বচ্ছ তারায় আবদ্ধ করে বলল,
- কেউ যখন প্রশ্ন করে, তাকে উত্তর দিতে জানাতে। উত্তর যদি ভয়ংকর হয় তখন দেখা উচিত সে কী বুঝদার কিনা। আপনার চোখে সেরকম হতে পারিনি?
কথাটুকু বলেই আলতো করে শোয়েবের গালদুটো মুঠোবন্দি করল শাওলিন। পায়ের পাতায় সবটুকু ভর ছেড়ে কয়েক ইঞ্চি উঁচু হয়ে নাগালে পৌঁছুল তার। ঘটনার আকস্মিকতা দেখে মিটিমিটি হাসছে শোয়েব। বেচারির উচ্চতাজনিত সমস্যাকে এক তুড়িতে বাজিমাত করে নিজেই মুখটা নীচু করে দিল শোয়েব। সঙ্গে সঙ্গে দুটি ওষ্ঠাধর নিজের ওষ্ঠের ভাঁজে আবদ্ধ করে নিবিড়ভাবে ডুবে গেল। শোয়েব জানে না এই নিবিড় আলিঙ্গনের মাঝে এমন কি লুকোনো ছিল, এমন কীসের আবেগ-বিহ্বলতা ছিল এতে!
- আমার আদুরে চাদর। তুমি কখনো আমার কাছে ঠুনকো ছিলে না। তোমার কাছে যেটুকু শান্তি পেয়েছি, আম্মির পর তুমিই আমার ওম হয়েছ।
ভরা জোৎস্নার আলোয় নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস ছোঁয়ানো মুহুর্তটুকু ভারী কোমল। শাওলিন হাত বাড়িয়ে আস্তে আস্তে পিঠ স্পর্শ করে শোয়েবের গালদুটোতে স্থির হয়ে গেল। অধরমুক্ত করে মানুষটার সারা মুখে চুমু খেয়ে ভরিয়ে তুলল আদর। শোয়েব ম্রিয়মাণ, নিষ্প্রভ।
শোয়েবের প্রতিটি শব্দের বিপরীতে নীরব মুহুর্ত ফেরত দেয় শাওলিন। গোলাপি আঁচলটা তুলে বাঁহাতের কবজিতে গিঁট বেঁধে নেয়। ভেজা চুলের ভেতরে হাত ডুবিয়ে পাঁজকোলে বন্দি করে শাওলিনের সদ্যস্নাত দেহ। দোদুল্যমান ফিনফিনে পর্দাঘেরা শয্যার মাঝে রেখে দেয় দুটো হাতের ভর। শাওলিন চোখ খুলে তাকালে দুটো জ্বলজ্বল চাহনি মাদকপূর্ণ হাসিতে তাকায়। হাতের রিস্টওয়াচ খুলে, বাদামি শার্টকে মেঝেতে ছুঁড়ে মিষ্টি মায়াবী মুখের ওপর নিজের ধারালো-দৃঢ় মুখ রাখে শোয়েব। ডানহাতে সেই গালকে ধীরেসুস্থে ছোঁয়, যেখানে রেবেকার আঘাত তার কারণেই পড়েছিল। ডানের জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া একমুঠো চন্দ্রালো রূপোলি বুরুশ মাখিয়ে দেয় ওর চোখে-মুখে। সেই আলোতে উড়ে আসা কিছু চুল বাঁহাতের আঙুল কানের পেছনে গুঁজে দেয় শোয়েব। যেন তার নেশা, অসুখ, বিষ সবকিছুকে শুষে নিচ্ছে চক্ষুতারায়। শাওলিন ওভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে মৃদুভাবে বলল,
- কী দেখেন?
- কেন তুমি বিশেষ হয়েছ। কেন তোমাকে ছুঁয়ে দিলে বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখার অদম্য ইচ্ছে হয়। যেন কেউ না দেখুক। এই গোপন কিছুটা শুধু আমার।
- এতো আলতো করে কথাগুলো শোনাচ্ছেন যে, আগলে রাখতে রাখতে যেন আমার মৃত্যু এসে যাক।
শোয়েব ঝাঁপিয়ে দুহাতে জাপটে ধরল। চশমার ডাঁট মট করে ভেঙে যায়। শাওলিনের মন ভীষণ উদ্বিগ্ন হলেও গ্রাহ্য করে না শোয়েব। একহাতে চশমাটা খুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল দেয়ালে। কাঁচ চূর্ণ হবার শব্দে বুকের ভেতরেই কেঁপে উঠল শাওলিন। ঠিক তখনই কানের কাছে প্রচণ্ড উদ্বেল সুরে বলতে শুনল,
- পাওয়ার অনুভূতি থেকে হারানোর অনুভূতিতে ভাঙচুর হতে চাই না!
·
·
·
চলবে……………………………………………………