সমুদ্রের বুকের উত্তাল ঢেউ, আকাশের বুকে ঘুরেবেড়ানো মেঘ, ছুটতে থাকা বাতাস সবই একমুহূর্তের জন্য আদিল মির্জার জন্য থমকে গেল। সবসময়কার বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়া এই মুহূর্তে কেমন বোকা বোকা হয়ে আছে। পরপর এতটা স্পষ্ট, এতটা স্বচ্ছ স্বীকারোক্তিও যে তার বিশ্বাসের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না। কিংবা হতে পারে, কথাগুলো বিশ্বাস করার মতো সাহসটুকুই এই মুহূর্তে হলো না। তার শ্রবণশক্তি বুঝি আরেকটু প্রখর হওয়া প্রয়োজন ছিল? সমুদ্রের তুমুল ঢেউয়ের গর্জনের চেয়েও শক্তিশালী গর্জন করে উঠল আদিলের হৃৎপিণ্ড। বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই তোলপাড় চালাল অদৃশ্য ঝড়। সম্মোহিতের মতোই কদম বাড়াল সে। যতটুকু দূরত্ব ছিল, ততটুকুই ঘুচিয়ে ফেলল। হাত বাড়িয়ে আঙুলগুলো দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিল রোযার নরম গাল। মাথা নুইয়ে এলো একদম তার মুখের সামনে। সোজা তাকাল চোখে। চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে থামাল ঠোঁটের ওপর। অবিশ্বাস, বিস্ময় আর এক অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন হয়ে বিড়বিড়িয়ে উঠল ক্রমশ -
‘স…সে ইট অ্যাগেইন। সে ইট অ্যাগেইন!’
রোযাও নিজে থেকে এক কদম এগিয়ে এলো। দূরত্ব তো ছিলই না বিন্দুমাত্র, আরও এগিয়ে এসে শক্ত বুকটায় নিজেকে স্বেচ্ছায় পিষে দিল। ছটফটিয়ে ওঠা লোকটার আকুতি মেশানো চোখেমুখে ব্যাকুল ভাবে চেয়ে থাকা তার স্বর স্বচ্ছ শোনাল -
‘প্রেমে পড়েছি আপনার।’
শব্দগুলো আদিলের বুকের ভেতরে গিয়ে আছড়ে পড়ল। রোযা এক মুহূর্তের জন্য থামল। পরক্ষণেই তার সামনে নুইয়ে থাকা মাথাটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ফের বলে গেল -
‘আপনি প্রেমে পড়ার মতোই একজন।’
সমুদ্রে তখন ঢেউয়ের গর্জন বহমান। একের পর এক উন্মত্ত ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে, তার তোড়ে কেঁপে উঠছে ভূমি। স্রোতের তীব্র গর্জন বাতাস ভেদ করে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে যেন কানের লতি। রোযা পেছনে না তাকিয়েও ঠিক অনুভব করতে পারল, সমুদ্রের পাগলপারা স্রোতটা তাদের দিকেই ছুটে আসছে পাল্লা দিয়ে। আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত। এই তো, এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে তাদের পা-জোড়া। কিন্তু ঢেউ পাল্লা দিয়ে ছুটে এসে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তেই আদিলের ডান হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার সরু কোমর। এক টানে জমিন থেকে তিন ইঞ্চি ওপরে তুলে ফেলল। পরক্ষণেই তার শরীরটা এনে পিষে ধরল নিজের শক্তপোক্ত বুকের সাথে। সমুদ্রের চেয়েও গভীর কণ্ঠে উন্মাদের মতন বলল -
'যা বললে আবার বলো! বারবার বলো। ততক্ষণ, যতক্ষণ আমার হৃৎপিণ্ড শান্ত না হয়!'
বিপরীতে মুখে নয়, এবারে কাজে উত্তর করল রোযা। ধীরেসুস্থে দু’হাত আদিলের বুক থেকে উঠিয়ে জড়িয়ে ধরল তার গলা। মাথাটা সামান্য বাড়িয়ে খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা অমসৃণ গালে নিজের নরম, তুলোর মতো মসৃণ গাল মিশিয়ে দিল। শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল এতে, চোখ দুটো আপনা-আপনিই বুজে এলো। সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করল আদিল শ্বাস নিচ্ছে না। রোযার হৃৎপিণ্ড যেন এক লাফে গলার কাছে চলে আসে। মনে হয়, এই বুঝি বুক চিরে বেরিয়ে আসবে! তারপরও থামে না সে। মুখোমুখি হয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় আদিলের ডান গালে। সঙ্গে সঙ্গে চোখজোড়া বুজে নিলো আদিল। রোযা এবার তার বাম গালেও ঠোঁট ছোঁয়াতে চাইল। কিন্তু পারল কোথায়? গুলির ক্রমাগত আওয়াজে ধড়ফড়িয়ে উঠল আদিলের বাহুতেই। তড়িৎ মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়ল।
শান্ত, এলেন, ক্লান্ত—ওরা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের ঘিরে রেখেছে দূর থেকে। সমানে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে। গুলি ছুড়ে বোঝাচ্ছে ওরা আনন্দিত! কীসের জন্য, তা আর বুঝতে অসুবিধে হলো না! তাদের এমন অবস্থা দেখেই বুঝি এমনটা করল? রোযার বোধ ফিরল। মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল মুখ। মনে পড়ে গেল কোথায় আছে তারা! অগত্যা আস্তে করে আদিলের বুক ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নামতে চাইল। অথচ বিপরীতে আরও জোরালোভাবে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিল আদিল। বিনাবাক্য ব্যয়ে সবেগে মুখ বাড়িয়ে রোযার গোলাপি ঠোঁট দুটোতে সিলমোহর বসিয়ে দিলো। নিজের ভেতর আকড়ে নিল। উন্মাদনায় দিশেহারা তার সমস্ত আবেগ, অনুভূতি, পাগলপনা যেন ফুটে উঠল এই গভীর চুম্বনে।
রোযা প্রথমে শুধু চোখ বুজে এই গভীর আক্রমণ মেনে নিলেও একপর্যায়ে আর পারল না। চোখের কোণ ভিজে একফোঁটা জল গড়াল। শ্বাস ফেলতে ফেলতে দুর্বলভাবে মাথাটা সরিয়ে আনতে চেয়ে হাত দুটো রাখল আদিলের বুকে। অনুভব করল তার ধড়ফড়ানো হৃৎপিণ্ড। মনে হচ্ছে বিট করতে করতে বেরিয়ে আসবে। ততক্ষণে আদিলের একটি হাত উঠে এলো রোযার ঘাড়ে। টেনে নিলো আরও। উন্মাদনা তার আরও বাড়ল। বাড়ল গভীরতা। ছুঁয়ে গেল সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর জায়গায়….
আদিল যখন চুমুটা ভেঙে মাথাটা এক ইঞ্চি দূরত্বে এনে চোখ মেলে তাকাল, সঙ্গে সঙ্গে কান্নারত চোখে তাকাল রোযাও। সামনের র ক্তিম চোখ দুটো দেখে রোযার শ্বাসপ্রশ্বাস গলায় আটকে গেল একমুহূর্তেই। দীর্ঘক্ষণ তার পলক পড়ল না, শ্বাস নিতে পারল না।
‘মাই বিলাভড…’
—————
মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে এলেন ফিসফিস করে শুধাল, 'আমি যা দেখছি, যা বুঝতে পারছি তা কি সঠিক?’
শান্ত জবাব দিতে পারল না। অবিশ্বাস্য অনুভূতি সরে গিয়ে মুগ্ধতা বিরাজ করছে তার দু’চোখে। আনন্দে দিশেহারা লাগছে। হৃৎপিণ্ডটা কেমন লাফাচ্ছে আনন্দে। গলায় বোধহয় কিছু একটা বিঁধে আছে। ক্লান্ত যথাসম্ভব দৃষ্টি নুইয়ে রাখতে চাইছে, অথচ বারবার চোখ চলে যাচ্ছে সামনের দিকে। ওমন দৃশ্য সে যে কল্পনা করেছে তবে কখনো হতে পারে তা ভাবেওনি। কল্পনাকে বাস্তবে দেখার এই আলৌকিক আনন্দ কীভাবে প্রকাশ করা যায়? ঠিক কীভাবে? আকাশে গুলি উড়িয়ে তো তেমন কাজ হলো না।
‘হঠাৎ হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, এই জীবনের গোটা সুখ এসে আমায় ধরা দিল।’
শান্তর এমন কথায় এলেন আস্তে করে আওড়াল শুধু, ‘গোটা সুখ! হু, তাই।’
বস তাদের জীবনের অনেক বড়ো একটা জায়গাজুড়ে বিরাজমান। বসের জীবনের গোটা সুখ তো তাদেরও সুখ। ক্লান্ত বিড়বিড়িয়ে উঠল -
‘দেখে মনে হচ্ছে, একে অপরের জন্যই তাদের বানানো হয়েছে।’
এলেন সহমত প্রকাশ করে বলল, 'পাশাপাশি পারফেকশন।’
‘মেইড ফর ইচ আদার।’
শান্তর অনুমান সঠিক হয়ে থাকলে সে হয়তোবা তার বসের অনুভূতির একাংশ বুঝতে পারছে। কেমন বোধ করছে ঠিক? শান্ত সাহস করে পুনরায় তাকাল। সন্তুষ্টিতে হেসে নিয়ে শান্ত সহ বাকিদের চোখমুখ নির্বিকার হয়ে গেল। আদিল মির্জার ডান হাত আর বাম হাতের বাহ্যিক রূপ যেমন হয়, ঠিক তেমন। রুক্ষ, নির্বিকার! তাদের চোখমুখ দেখে বোঝার আর উপায় নেই কিছুক্ষণ আগেই যে তারা উল্লাসে মেতে উঠেছিল! বসের আনন্দে কী হৈহুল্লোড় করেছিল!
—————
সমুদ্র থেকে এই পর্যন্ত আসা অবধি রোযা আড়চোখে খুব করে লক্ষ্য করে গেল মানুষটার পরিবর্তন। এই মুহূর্তে কী ভীষণ নির্বিকার লাগছে দেখতে! কিছুক্ষণ আগেই সমুদ্রের পাড়ে যে আদিল তার সঙ্গ দিয়েছিল, তার সঙ্গে এই আদিল মির্জার যেন মিলই নেই, শূন্যের কোঠায়। কাটকাট চোখমুখ, ভাবলেশহীন অভিব্যক্তি। রোযার হাতটা নিজের গ্লাভস পরিহিত হাতের মুঠোয় নিয়ে আঙুলে আঙুল জড়িয়ে মৃদু টানে, দৃঢ় পদক্ষেপে হেঁটে এগিয়ে চলেছে ঝলমলে প্রশস্ত পথ ধরে। তার প্রতিটি ভঙ্গিতে কী প্রবল দৃঢ়তা, কী নিঃশব্দ ক্ষমতার প্রকাশ! এত এত মানুষের ভিড়েও জ্বলজ্বল করছে তার ব্যক্তিত্ব। চোখের দৃষ্টি থেকে শুরু করে চালচলন, সবকিছুতেই যেন আলাদা এক দাপট। রোযা ক্রমশ মুগ্ধ হতে থাকল। মানুষ প্রেমে পড়লে বুঝি তাদের মন আরও সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে? চোখের দৃষ্টিও কি আরও প্রখর হয়? তাই বুঝি ছোট্ট ছোট্ট ব্যাপারও তখন চোখ এড়িয়ে যায় না?
তাদের দুপাশজুড়ে সারি সারি ছোট লণ্ঠন। সাদা ফুলের সঙ্গে নারকেলগাছের কাণ্ডে জড়িয়ে থাকা উষ্ণ আলোগুলো নরম আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে। ঠিক পাশেই সমুদ্র। ঢেউ ভাঙার শব্দের সঙ্গে মিশে দূর থেকে ভেসে আসছে সেতারের মৃদু সুর। আর তারপরই রোযার চোখে পড়ল ভেন্যুটি। সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক কাঁচের প্যাভিলিয়ন। চারপাশের দেয়াল প্রায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ফলে বাইরে থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভেতরের ঝলমলে আয়োজন। সেই কাঁচের ওপাশে ছটফট করতে করতে এগিয়ে আসছেন আব্দুল মান্নান। চারটি সিঁড়ি দ্রুত পেরিয়ে একেবারে সামনে এসে পড়তেই হড়বড়িয়ে বললেন -
‘মাই বয়! মাই পাওয়ারফুল বয়! আমি তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। তুমি ছাড়া এই ঘোড়ার ডিমের বিয়েশাদি যেন জমছিলই না।’
কথাগুলো কতটা মন থেকে বললেন আব্দুল মান্নান, কে জানে! পরক্ষণেই এসে দাঁড়ালেন দিকপাল চ্যাটার্জি। তিনি দু-একটি কথা বলার আগেই আব্দুল মান্নান বলে উঠলেন -
‘তা খবর পেলাম, আরও আধঘণ্টা আগেই পৌঁছেছো। এতক্ষণ ম্যাডামকে নিয়ে সমুদ্রবিলাস করাচ্ছিলে বুঝি?’
বলতে বলতেই আড়চোখে তাকালেন রোযার দিকে। এই নিয়ে কবার তাকালেন, তা আদিলের বাজপাখির মতো ধারালো দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ডান ভ্রু সামান্য ওপরে উঠল তার।
‘জানার এত আগ্রহ, মন্ত্রী সাহেব?’
একটিমাত্র প্রশ্ন। অথচ তার কণ্ঠের ভারেই যথেষ্ট উত্তর দিয়ে দিল মনে হয়। কারণ সেই কণ্ঠ শুনেই তড়াক করে সোজা হয়ে গেলেন আব্দুল মান্নান। গলাটা একবার পরিষ্কার করে আর ঘাঁটালেন না প্রসঙ্গটি। ভুলেও আর তাকালেন না পাশে। দ্রুত বললেন -
‘চিন্তা থেকে বললাম বাপ। আসো, আসো…’
অথচ রোযার চোখ তখন কারও দিকেই নেই। দৃষ্টি স্থির শূন্যে। চোখেমুখে নেই ভদ্রতাসূচক কোনো কৃত্রিম হাসিও। একেবারে স্বাভাবিক, সাবলীল তার ভঙ্গি। যেন সামনে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নন, দাঁড়িয়ে আছেন একেবারেই সাধারণ কোনো মানুষ। আড়চোখে সেই শান্ত মুখখানা দেখতে দেখতে হঠাৎই আদিলের মনে পড়ে গেল রোযার বলা একটি কথা। কথাটার অর্থ দাঁড়ায়, কাউকে ভয় করি না, কারণ আপনি আছেন সামনে। অদৃশ্য এক হাসি ঠোঁটে জমে আবার বিলীন হয়ে গেল। রোযার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল। দৃষ্টি পড়ল তাদের জড়ানো হাতটায়। তার শক্ত মুঠোয় থাকা হাতটা আজ নিজেও নরম করে আকড়ে রেখেছে তার হাত পাল্টা। ওই স্পর্শ ঠিক আদিলের হৃদয়ে বসে গেল। কদম বাড়াল সিঁড়ি গুলো বেয়ে, পেছনে রোযাও তালে তাল মিলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে।
—————
‘খুশি হলাম সঙ্গে ম্যাডামকেও এনেছো বলে। রীভা তখন থেকেই মাথা খাচ্ছে, ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করবে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এসে পৌঁছেছেন ভেন্যুর কাঁচের দরজার সামনে। বলতে গেলে, ঢোকার জন্য বেশ তাগাদাই দেখালেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে থামল আদিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোযার ওপর। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে আদিলের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
ভেতরে উপস্থিত দেশের উচ্চবর্গের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিয়ের নিমন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার সাহসই বা কার আছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর ছোটো ভাই জয়নাল আবেদীনও। তাঁর দৃষ্টি ঠিক কোথায়, তা বোঝার উপায় নেই। রোযা তখন আদিলের দিকেই তাকিয়ে আছে প্রশ্নবোধক চোখে। তার সেই নীরব প্রশ্ন আদিলের চোখ এড়াবে কীভাবে? ভেতরের দিকে এগোতে এগোতেই সংক্ষিপ্ত স্বরে জানাল -
‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ওয়াইফ।’
রোযা কিছুই বুঝল না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর স্ত্রী তার সঙ্গে দেখা করার জন্য এতটা উদগ্রীব কেন? ততক্ষণে তারা পৌঁছে গেছে বসার টেবিলগুলোর সামনে। কমবেশি সব টেবিলই অতিথিতে পরিপূর্ণ। সামনের সারির প্রথম টেবিলটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। ঠিক মাথার ওপর ঝুলছে শত শত ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। সাদা অর্কিড, গোলাপ আর রাজনীগন্ধায় সাজানো প্রতিটি টেবিল। সোনালি কাটলারি, ক্রিস্টালের গ্লাস, মোমবাতির নরম আলো সবকিছুতেই অঢেল আভিজাত্যের ছাপ। আদিল সঙ্গে সঙ্গে বসল না। রোযাকে বসিয়ে সে আস্তে করে জানাল -
‘এখানেই আছি। বসো। কিছু লাগবে?’
‘উহুঁ।’
আদিলের হাতটা তার মাথায় উঠে এলো, বুলিয়ে আওড়াল, ‘প্রয়োজনে ডেকো, শান্ত আছে পেছনে।’
রোযা মাথা দোলাল। আদিল চলে গেল কিছুটা দূরে। আলাপে দাঁড়াল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, আইনমন্ত্রী আর দিকপাল চ্যাটার্জির সঙ্গে। তাদের দলে আরও কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন। রোযার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে রোযা ডাকল -
‘শান্ত!’
শান্ত সঙ্গে সঙ্গে মাথা নুইয়ে ফেলল। আগের তুলনায় তার কণ্ঠ, ভাবভঙ্গি, দুটোতেই ভীষণ বাধ্যতা -
‘জি, ম্যাডাম?’
‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর স্ত্রী কি আমায় চেনেন?’
শান্তর চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই। অথচ কণ্ঠে রহস্যময়ী শোনাল -
‘চিনতে পারে। কাক ময়ূরীর বেশ ধরলে একটু ভাব ধরেই। ওসব আপনার ভাবতে হবে না, ম্যাডাম।’
রোযা কিছু বুঝল না। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে মনে হলো না। তাকাল সামনে।
কাচঘেরা স্টেজে তখন নাচগান চলছে। ধীর লয়ে ইউরোপিয়ান কাপল ডান্স। সুরটাও ভীষণ শান্ত, স্থির, মৃদু অথচ চারপাশটাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় করে রাখার মতো।কিছুক্ষণের মধ্যেই আদিল ফিরে এলো। বসল তার পাশে। একেক করে পুরো টেবিলটা ভরে উঠল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, তাঁর ছোটো ভাই, আইনমন্ত্রী, দিকপাল চ্যাটার্জি, আরও সব স্বনামধন্য ব্যক্তি। অথচ রোযার মনোযোগ রইল কেবল তার পাশের মানুষটার ওপর। রোযার পেছনের চেয়ারের হাতলে রাখা হাতটা ধীরে ধীরে নেমে এলো তার কাঁধে। গভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘খারাপ লাগছে?’
রোযা চোখ তুলে তাকাল। আদিলের ধূসর মণিদুটো অদ্ভুতভাবে চকচক করছে। মানুষটাকে আজ ভিন্ন লাগছে। ভীষণ ভিন্ন। মুখের অভিব্যক্তিতে কেমন এক অদেখা উজ্জ্বলতা, যা রোযার চোখ এড়াল না। রোযা আস্তে করে আওড়াল,
‘লাগছে না।’
আব্দুল মান্নান তখনও বলে চলেছেন -
‘আদিল, একটা কাপল ডান্স হয়ে যাক? কী বলো? তুমি আসার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কিন্তু তার স্ত্রীকে নিয়ে নেচেছে।’
ঠিক তখনই টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল একজন রমণী। পরনে শুভ্র অফ-শোল্ডার গাউন। পরিচয় জানার প্রয়োজন হলো না রোযার। দেখেই বুঝল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কমবয়সী স্ত্রী। মেয়েটির পাশেই ঋণা সওদাগর। পরনে নতুন ড্রেস, ফিটেড কালো গাউন। তার দৃষ্টি এসে অবধি সেঁটে আছে আদিলের ওপর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ততক্ষণে নিজের স্ত্রীকে পাশে বসিয়ে সবার সামনেই জড়িয়ে ধরেছেন। নির্দ্বিধায় স্ত্রীর ঠোঁটে চুমু খেলেন। রোযা সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। কানে এলো আব্দুল মান্নানের থমথমে স্বর -
‘মন্ত্রী সাহেব, একটু কন্ট্রোল করেন! আমরা আছি তো।'
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থামলেন। গলা পরিষ্কার করে শুধু অল্পবয়সী স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। ঋণা এই টেবিলে ফাঁকা চেয়ার না পেয়ে দাঁড়িয়েই আছে। আড়চোখে আদিলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলে বলল -
‘কন্ট্রোল করবে কেন? স্বামী-স্ত্রী তারা। চুমু খেতেই পারে।’
বিপরীতে আব্দুল মান্নান দুষ্টু ইঙ্গিতে আওড়ালেন -
‘আরে, বুঝো না ঋণা। কিছু মিছু হয়। আসো না তুমি কাছে!’
ঋণা নির্বিকার চোখে তাকাল। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে বলে বসল,
‘আদিল মির্জার সাথের জনকে চোখে লাগে না, মন্ত্রী সাহেব? সুন্দরী তো বেশ!’
মুহূর্তেই টেবিলজুড়ে নেমে এলো থমথমে নীরবতা। আব্দুল মান্নানের মুখ শুকিয়ে গেল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মুখেও মুহূর্তে আতঙ্কের ছাপ। কেউ কিছু বলার আগেই শোনা গেল আদিলের কণ্ঠ। থমথমে। অনুভূতিহীন। বরফশীতল।
‘মেয়েমানুষ মারি না বলে কখনো মারব না, এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখিনি। মিসেস চৌধুরীর জিহ্বা কেটে এখানে ঝুলিয়ে রাখতে আমার দু-মিনিটের বেশি লাগবে না। যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারতে আমার সময় লাগেনি।’
কিংকর্তব্যবিমূঢ় ঋণা। সে তো কম বাড়াবাড়ি করেনি এতদিন! অথচ বিপরীতে কখনো কোনো কথা বলেনি আদিল। ভালো-মন্দ কিছুই না। আর আজ? এতটা খোলাখুলি হুমকি যে সে পাবে, তা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি। রোযা ফিরেও তাকাল না। তবে বুকের ভেতর কিছুক্ষণ আগেও যে আগুন জ্বলছিল, তা যেন আচমকাই নিভে গেল। জ্বলে ওঠা হৃদয়টা মুহূর্তেই পানির মতো শান্ত হয়ে এলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পাশেই বসা তাঁর স্ত্রী রীভা এবার আদিলের দিকে চেয়ে মিষ্টি হেসে বলল -
‘এসব ছাড়ুন, মিস্টার মির্জা। মিসেস মির্জার সঙ্গে একটা রোমান্টিক ডান্স করলে কেমন হয়?’
আদিল তাকাল না। উত্তরও দিল না। তাই রীভা এবার পাশের দিকে তাকাল। চোখেমুখে দুষ্টুমির আভাস, যেন সে জানে, রোযা রাজি হবে না। রীভা এবার সরাসরি রোযাকে বলল -
‘মিসেস মির্জা, হয়ে যাক?’
আব্দুল মান্নানও আড়চোখে তাকালেন রোযার দিকে। ভেতরে ভেতরে কে না জানে আদিল মির্জার জোরপূর্বক বিয়ের কথা? অথচ আদিলের অভিব্যক্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। পরমুহূর্তেই রোযা নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে ধরল তার সামনে। চমকে উঠল আদিল। ধূসর চোখদুটো সরাসরি এসে আটকাল রোযার চোখে। দ্বিতীয় বারের মতো সেই নিশ্চল চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল আশ্চর্যতা।
—————
মুহূর্তেই নিভে গেল পুরো ভেন্যুর আলো। অন্ধকারে ডুবে গেল চারপাশ। শুধু কাচঘেরা স্টেজটাকে ভাসিয়ে রাখল ওপর থেকে নেমে আসা একরাশ সাদা আলো। সেই আলোর বৃত্তের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল দুটো শরীর। আদিল মির্জা আর তার বিলাভড। চারপাশের শত শত চোখ যেন মুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে গেল তাদের সামনে। রয়ে গেল শুধু তারা দুজন। আর তাদের অস্তিত্ব, চোখে চোখ। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল ধীর লয়ের ইউরোপিয়ান টিউন। সুরের মৃদু ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছিল তাদের পায়ের গতি। এক পা সামনে, এক পা পেছনে। কখনো পাশাপাশি, কখনো অর্ধবৃত্তে ঘুরে। প্রতিটি বাঁকে রোযার শরীর সামান্য দুলে উঠছে, আর আদিলের হাত তাকে নিখুঁতভাবে সামলে নিচ্ছে। ছুঁয়ে দিচ্ছে, বুকে আগলে নিচ্ছে। আদিলের একটি শক্তপোক্ত হাত সদা আবদ্ধ হয়ে থেকেছে রোযার কোমরে। রোযার একটি হাত তার কাঁধে। অন্য হাতে তাদের আঙুলগুলো জড়িয়ে আছে। প্রথমদিকে রোযার পায়ের গতি ছিল খানিকটা অনিশ্চিত। এত মানুষের সামনে এভাবে নাচার অভ্যাস তার নেই। অথচ আদিলের উপস্থিতিতে, তার চোখে জালে সবই সে ভুলল। তার হাতের চাপটুকুই প্রতিটি ভুল পদক্ষেপের আগেই তাকে সামলে নিচ্ছিল। আদিলের দৃষ্টি কোথাও সরছিল না। তার দৃষ্টি স্থির রোযার চোখে, ঠোঁটে... সর্বপরি মুখে।
রোযাও একসময় বুঝতে পারল বুঝি! সুরের সঙ্গে নয় বরং আদিলের চোখের সঙ্গে, তার ইশারার সাথে তাল মিলিয়ে নড়ছিল মাত্র। কাঠের পুতুলের মতো। একবার আদিল তাকে নিজের দিকে টেনে নেয় তো পরক্ষণেই ছেড়ে দেয় সামান্য দূরত্বে। রোযা ঘুরছে তার হাতের নির্দেশে। সাদা আলোয় তার শাড়ির আঁচল বাতাস কেটে ঘুরছে আশপাশ জুড়ে। ঘোর শেষ হতেই আবার এসে থামল আদিলের সামনে। কোমরে রাখা হাতটা একটুও সরেনি। বরং আরও দৃঢ় হলো। হঠাৎ সুর বদলে গেল। এলো ভিন্ন গান। যা ভেসে বেড়াল তাদের ঘিরে -
‘পৃথিবী একদিকে, তুমি আরেক দিকে আমার,
আমি তোমার কাছেই যাবো…
এ পথে যতোই নামুক আঁধার,
আমি দুনিয়া ছাড়তে পারি,
আমি জিতেও হারতে পারি…
পারবো না শুধু বাঁচতে কভু… তুমি ছাড়া…’
শব্দগুলো যেন সোজা এসে আঘাত করল আদিলের হৃৎপিণ্ডে। তার পায়ের গতি এক মুহূর্তের জন্য থমকাল। ধূসর চোখদুটো গভীর ভাবে স্থির হয়ে গেল রোযার মুখে। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আদিল তাকে ঘুরিয়ে নিল। এতে রোযার কদম হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল। এক পাক ঘুরে সে এসে থামল আদিলের বুকের কাছে। পিঠ ঠেকে গেল তার প্রশস্ত বুকে। আদিলের একটি হাত তখনও তার কোমর আকড়ে রেখেছে। অন্য হাতটা তাদের জোড়া হাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রোযার শ্বাস আটকে এলো। পেছন থেকে আদিলের উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে ছুঁয়ে গেল তার কানের পাশ। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা অস্থির শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ এতটাই কাছে যে ব্যাকগ্রাউন্ডের সুরের মাঝেও স্পষ্ট শোনা গেল। আর তখনই গানের পরের লাইনগুলো এবার শুধু স্পিকারে বাজল না। আদিলের ঠোঁট থেকেও বেরিয়ে এলো ফিসফিস ভঙ্গিতে। রোযার কানের একদম কাছে, ভীষণ ধীরে ধীরে -
‘আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো, তুমি ছাড়া…’
রোযার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আদিলের কণ্ঠ থামল না।
'আমি পাগল হয়ে যাবো, তুমি ছাড়া…
আমি ধ্বংস হয়ে যাবো, তুমি ছাড়া…
আমি সময়কে থামিয়ে দেব… তুমি ছাড়া।'
এইমুহূর্তের জন্য রোযার মনে হলো, সত্যিই বুঝি সময় থেমে গেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার বুকের ধুকপুকানি, কোমরে শক্ত হয়ে থাকা হাত আর কানের কাছে ভেসে থাকা সেই গভীর কণ্ঠ, সবকিছু মিলেমিশে তাকে স্তম্ভিত করে ফেলেছে।
—————
এরপর থেকে রোযা ঠিকভাবে শ্বাস নিতে পারল না। অন্যমনস্ক আর অস্থির হয়ে থাকল পুরোটা সময় জুড়ে। শুধু অনুভব করে গেল তার পাশের মানুষটা ভীষণ স্বাভাবিক। তাকে ভীষণ ভাবে আগলে রেখে ব্যবসায়িক আলাপ করে গেল। সময় গড়াল, রাত গভীর হলো। বিয়ের আয়োজন শেষের পথে এলো। সবাই বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলো ভেন্যু থেকে। আদিল রোযাকে হেলিকপ্টারে নয়, তাদের কোনো গাড়িতে নয় নরঞ্চ একদম নতুন, অচেনা একটা গাড়ির পেছনের ব্যাকসিটের দরজা খুলে বলল -
‘যাও, আমি একটু পরে আসছি।’
রোযা ঢুকল না। আশেপাশে চেয়ে সতর্ক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু হয়েছে?’
আদিল ভীষণ শান্ত। সবসময়ই থাকে যেন কিছুই তার পরিস্থিতির বাইরে নয়, ‘বিশেষ কিছু না। যাও…..উঠে বসো।’
রোযা কয়েক মুহূর্ত চোখের দিকে চেয়ে দুহাতে টেনে ধরল আদিলের গলার টাই। একগুঁয়ে আচরণ তার। কণ্ঠেও অদম্য জেদ। যা সবসময়ই ছিলো -
‘হয় আমি থাকব সাথে, নাহয় আমার সাথে ফিরবেন।’
আশেপাশের গার্ড সব ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। অদূরে তখনো দিকপাল চ্যাটার্জি, আব্দুল মান্নান আছেন। আদিল হঠাৎ তাকে আটকে ধরল গাড়ির সাথে। মাথাটা নুইয়ে আনল কাছাকাছি। চোখের দৃষ্টি ঘুরল মুখ জুড়ে। কণ্ঠ খাদে নামল তার-
‘তুমি কি চাও আমি এখানেই তোমায় আদর করি? চুমু খাই?’
রোযা ঢোক গিলল। তারপরও নড়ল না। চেয়ে থাকল একই ভঙ্গিতে। আদিল বলে গেল যা, তা শুনে রোযা হড়বড়িয়ে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলল -
‘তুমি কি জানো আমি ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারছি না এখনো? আমার মাথা কাজ করছে না! পুরোটা সময় ধরে করেনি। আমি এই পুরোটা সময় শুধু তোমায় ভেবেছি। তোমার প্রত্যেকটা কথা, আচরণ নিয়ে ভেবেছি। কীভাবে সহ্য করেছি ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া?’
কেঁপে উঠল রোযার শরীর। আদিলের মুখ চলে এলো কানে, ‘রোজআ… রাইট নাউ, আই জাস্ট ওয়ানা ডিভাওয়ার ইউ, রুইন ইউ, অ্যান্ড পজেস ইউ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………