গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার জনজীবন। ধানমন্ডি থেকে বামদিকে যাওয়া রাস্তায় এত বেশি জ্যাম যে এক ফোঁটা গাড়ি নড়ছে না। মেজবাহ্ চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে আছে সিটে। চোখদুটো ব্যথা করছে। এতক্ষণ এত জোরে গাড়ি চালিয়েছে সে, যে, সিকান্দারের অব্দি মাথা ঘুরছে।
গাড়ির নিস্তব্ধ, নিবিড় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করতেই সিকান্দার কিছুটা আগ বাড়িয়েই বলল,
“ভাই, পানি আনবো? আপনার কি মাথা ঘুরাচ্ছে?”
মেজবাহ্'র চোখের পাতা বন্ধ রইল ঠাঁই, “মোটেও না।”
“কিন্তু আমার ঘুরাচ্ছে। আপনি এত জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিলো প্রদীপ বুঝি এই নিভল।”
“প্রদীপ?” মেজবাহ্ ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সিকান্দারের কথাটি। প্রদীপ বলতে সিকান্দার ঠিক বোঝালো কী?
সিকান্দার দাঁত দেখিয়ে হাসল, “বংশের প্রদীপ ভাই। আমি ছেলে মানুষ। ছেলেদের বংশের প্রদীপ বলে। যদি এখন আমার কিছু হতো তাহলে আমার পুরো বংশ অন্ধকার করে দিয়ে প্রদীপ নিভে যেত।”
সিকান্দারের অকাজের বুলি আজকের নয়। নিত্য দিনের কাজ ওর। মেজবাহ্ তাই আর গা করল না। ওর আজ ভীষণ গরম লাগছে। জ্যেষ্ঠমাসটা ভীষণ দস্যি হলো বোধহয়। পুড়িয়ে ছারখার করছে তাকে। আচ্ছা জ্যৈষ্ঠমাস কি এসে পড়েছে? সে অবশ্য বাংলা মাসের হিসেব তেমন রাখে না তাই বুঝতে পারছে না।
“সিকান্দার, কাজল সাহেবতো বললেন না টেলিফোনের নাম্বারটির ঠিকানা পেতে কতদিন লাগবে!” মেজবাহ্'র কণ্ঠ বেশ ভাবুক। হুট করে নিশ্চয় প্রেয়সীর কথা মনে পড়েছে তার। নয়ত টেলিফোনের কথা বলতো না সে।
“অল্প কয়েকদিন, ভাই। আমি খোঁজ নিবো। আপনি চিন্তা করবেন না।”
“নাহ্, চিন্তা কীসের? দু'বছর অপেক্ষা করতে পারলে আরও দু'টো মাসও পারব।”
“আমি মাঝে মাঝে অবাক হই, ভাই। আপনার মতো একজন মানুষ না দেখে কাউকে এমন করে ভালোবেসে ফেলল কী করে?”
“সত্যি বলতে আমিও অবাক হই। আমার মনে হয় ভালোবাসার চেয়েও বেশি যেটা হয়েছে তা হলো অভ্যেস। কথার অভ্যেস। অপেক্ষার অভ্যেস। প্রতিটা শুক্রবারের আশায় আমার ছ'টা দিন যে কেমন কাটে বোঝাতে পারব না।”
মেজবাহ্'র মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলা কথাগুলো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে গিলল সিকান্দার। এই লোক যে এমন নরম করে কারো জন্য করা তীব্র অপেক্ষার কথাও বলতে পারে তা সিকান্দারের অন্তত জানা ছিলো না। ভালোবাসলে মানুষ এতটাই নরম হয়ে যায় কি? মেঘের মতো, তুলোর মতো, এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো!
বাহিরের অনর্থক শব্দগুলো এসে বিঁধতে লাগল মেজবাহ্’র কানে। অহেতুক বিরক্ত করল তার সেই ভাবনাকে যা হারিয়েছিলো প্রেয়সীর সেই সুরেলা কণ্ঠে। মেয়েটার অভিমান কমেছে কি-না ভেবে মনটা যে একটু কল্পনাপ্রবণ হবে এই যন্ত্রের শহরে তা মোটেও সম্ভব নয়। এই শহরটা যেন কেমন! প্রাণ নেই। প্রেমও নেই। মেজবাহ্ না পারতে এখানে আসে। এত বিরক্তিকর শহর!
“কাঁচটা উঠিয়ে দে, সিকান্দার। এ শহরের শব্দ ভীষণ প্রাণহীন। কান ফেঁটে যায়। বুকে যতটুকু ভালো লাগা আছে ততটুকুই হাওয়ায় মিলিয়ে দিবে এই শব্দ।”
সিকান্দার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। মানুষটা একটু আগেই জামাল মোস্তফাকে কী রকম ভয় দেখালেন! এমন ভাবে গাড়ি টানলেন যেন এখুনি নরকের দুয়ারে নিয়ে রেখে আসবেন। ঐ পেট ভারি লোকটা শেষমেশ না পেরে ঘামতে ঘামতে উত্তর দিয়েছেন। এই এক নিউজ নিয়ে গোলগোল ঘুরেছে ওরা কেবল। তবে ঐ লোকের কথামতো খবরটা পেয়েছে বিপক্ষীয় এক নেতার থেকে। ছবিও উনি পাঠিয়েছেন। নেতার অবশ্য খবর নিবে মেজবাহ্ ভাই। কিন্তু ওর একটু সন্দেহ হচ্ছে বটে। বাড়ির ভেতরে তা-ও অমন মধ্য রাতের ছবি যেহেতু বাহিরে গিয়েছে তার মানে শত্রু বাড়িতেই রয়েছে। কিন্তু কে? পাহারাদার চারজন আর কিছু ছেলেপেলে ব্যতীত শেখ বাড়িতে আসার অনুমতি নেই কারো। তবে কি দলের কেউ-ই বিপক্ষীয় দলের নেতাদের সাথে যুক্ত?
“কী হলো? বসে বসে স্বপ্ন না দেখে ঘুমিয়ে দেখ। জানালাটা কখন আটকাতে বলেছি?” মেজবাহ্'র মৃদু ধমকে চমকে উঠল সিকান্দার। হড়বড়িয়ে আটকে দিতে গেলো কাঁচ।
হুট করেই মেজবাহ্'র চোখ গিয়ে আটকালো ফুটপাতের দিকে। হলুদ স্কার্টে বসা কোঁকড়াচুলো মেয়ে। গাড়িটা ফুটপাতের বেশ কিছুটা কাছাকাছি বলেই শুনতে পারল সেই মেয়েটির কিছু কথা,
"বাবু, তুই তো দেখছি ব্যথা পেয়েছিস। কিরে.. "
বাকি কথা শোনার আগেই কাঁচ লেগে গেলো। কণ্ঠটি মিলিয়ে গেলো মুহূর্তেই। মেজবাহ্ সেই কণ্ঠের জন্য উন্মাদ হয়ে কাঁচের বাহিরে দৃষ্টি দিতেই দেখল সেই মেয়েটি যত্ন করে ফুটপাতে বসে কুকুরের পায়ে কাপড় বেঁধে দিচ্ছে। কী যেন বলছেও আদর করে করে। মেয়েটির কোঁকড়া চুলে ঢেকে গিয়েছে মুখের একপাশ।
মেজবাহ্'র বোধ নেই এতটুকু যে, সে গাড়ি থেকে নামবে। নাকি চেঁচাবে। এর মাঝেই জ্যাম ছেড়ে দিলো। গাড়ি স্টার্ট হলো সশব্দে। গতি ধরল এত বেশি যেন সেকেন্ডের আগে পৌঁছাবে সিকান্দার। হার মানাবে ঘড়ির কাঁটাকেও।
মেজবাহ্’র ঘোর ভাঙলো সেই গতির প্রতিক্রিয়ায়। আচমকা ওর কী যে হলো! কথাই আসতে চাইল না কণ্ঠে।
কেবল অস্ফুটস্বরে বলল,
"সিকান্দার কাঁচ নামা। জলদি। সুচরিতা..."
সিকান্দার সেই স্প্রিডের বিপরীতে আসা আধো আধো কথাগুলো ঠিক বুঝল না। উঁচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কী, ভাই?”
“গাড়ি থামা নাদান কোথাকার। আমার সর্বনাশ হয়ে গেলো।” মেজবাহ্'র কণ্ঠের সাথে সাথে হাতও এতটা উত্তেজিত যে মনে হচ্ছে এখুনি গাড়ি না থামালে ও লাফই দিবে।
এই ব্যস্ত রাস্তাতে তবুও কায়দা করে গাড়ি থামালো সিকান্দার। মেজবাহ্ সেই চলন্ত রাস্তাতেও নেমে গেলো ব্যস্ত পায়ে। দ্রুত ছুটল পেছনের দিকে। এবং খেয়াল করল ওরা সেই ল্যাম্পপোস্টের আলো থেকে বেশ খানিকটা দূরেই চলে এসেছে। কিছু সেকেন্ডের মাঝে এতটা দূরে চলে এলো কীভাবে? মেজবাহ্'র কানে সেই কণ্ঠটি এখনও স্পষ্ট। ওটা সুচরিতাই ছিলো। এই কণ্ঠ ভুল শোনার নয়। ভুল নয়। ইশ মুখটিও একটু দেখার ভাগ্য হলো না তার। ইশ, ইশ, ইশ…
সিকান্দার ছুটে এলো পেছন পেছন। হাঁফিয়েও গিয়েছে প্রায়। ও ঠিক বুঝেইনি হলো কী। কেবল হাঁফাতে হাঁফাতে জিজ্ঞেস করল,
“কই যান ভাই? কী হয়েছে?”
মেজবাহ্’র তখন মনের আকাশে আফসোসের মেঘগুলো উড়ছে পর পর। কী হয়েছে সেই ব্যাখ্যা ও ঠিক কেমন করে দিবে? ঠিক কেমন করে বললে সিকান্দার বুঝবে মেজবাহ্ তার জীবনের আজ বড়ো একটা কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য হারিয়েছে। তার সুচরিতার সঙ্গে সাক্ষাতের দৃশ্য। এই দৃশ্যের জন্য ও কতটি দিন অপেক্ষা করেছে। নির্ঘুম কাটিয়েছে কতগুলো রাত!
“সিকান্দার, এই শহরে আমার সুচরিতা আছে। এই যন্ত্রের শহরে প্রেম রয়েছে আমার। এই শহরে আমার ফিরতে হবে। আবার, বার বার, হাজারবার।”
—————
প্রেমার এই বিশ্রী গরমে জর্জেটের হলদেটে শাড়িটা ঠিক ভালো লাগছে না। তবুও জর্জেট বলে একটু গায়ে হাওয়া লাগছে। কী অপ্রয়োজনে যে ও শাড়িটা পরতে গেছিলো! এরচেয়ে ওর নিজের পোশাক ঢের ভালো ছিলো।
জোহরার কোলে থাকা ছোটো কুকুর ছানাটি থেকে থেকে ডাকছে। হাঁটার তালে তালে ওর কান দুটো খাঁড়া হচ্ছে কখনো কখনো।
তা দেখে প্রেমার নাক-মুখ কম কুঁচকাচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে গিয়েছে ও প্রায়,
“একে আবার সঙ্গে নিলে কেন, আপা? তুমি জানো না কুকুরবিড়াল আমার পছন্দ নয়?”
“তোর পছন্দে শিকদার বাড়ি চলে না-কি, প্রেমা? তাছাড়া এগুলো তোর স্বজাতি। ওদের পছন্দ করছিস না কেন? স্বজাতির প্রতি তোর এ কেমন অন্যায়?”
নোমানের ঠোঁটের আগাতেই যেন উত্তর তৈরি থাকে সবসময় প্রেমার জন্য। এবং সেই উত্তর হয় প্রেমার ভাবনার সাথে সংঘর্ষিত। এখনও হলো তাই। প্রেমার বিরক্তি পারদে পারদে আরও বিকট হলো,
“তোমায় বলতে বলেছি কিছু, নোমান ভাই? সবসময় আগ বাড়িয়ে কথা বলো কেন তুমি?”
“তুই বলার পর আমি কিছু বলব, প্রেমা? মহারানি ভিক্টোরিয়া তুই?”
অপমানটা যেন সুক্ষ্ম ভাবেই গায়ে লাগল প্রেমার। গটগট করে ও এগিয়ে গেলো সামনে। ইমন ভাইয়ের ঠিক পাশেই। ইমন ভাই বোনের শাড়ি নিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা দেখে বোনের হাতটা ধরল বিনা বাক্যে। সাবধানে বোনের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, ধীরে ধীরে বলল, “এত রাগতে হয় না। ভাইয়ার সাথে সাথে হাঁট। ভাইয়া আছি না?”
“নোমান ভাইটা খুবই খারাপ, ভাইয়া।”
বোনের অভিমানী স্বরে ভাইয়ের ঠোঁটে হাসি জমলো। চোখের ইশারায় সান্ত্বনাও এলো, “এমন বলতে হয় না। ও একটু মজা করে।” এরপরই বোনকে আরেকটু শান্ত করতেই পেছনে ঘুরে মিছিমিছি চোখও রাঙালো ও নোমানের উদ্দেশ্যে। গলা উঁচিয়ে বলল,
“নোমান, আর কোনোদিন যদি আমার বোনের পেছনে লেগেছিস তাহলে এই শহরে তোকে থাকতে দেওয়া হবে না। বুঝলি?”
নোমান ওদের থেকে কিছুটা পেছনেই ছিলো। বুঝতে পারল ঠিক প্রেমা নালিশ ঠুকেছে ভাইয়ের দরবারে। তবে ও কি আর সেসবের তোয়াক্কা করে? গা দুলিয়ে অবলীলায় বলল,
“কেন রে শালা, শহরটা কি তোর বোনের?”
ইমন আরেকবার চোখ রাঙিয়ে হাঁটতে লাগলো। এই ছেলের মুখ লাগা উচিত নয়। কীসব উল্টোপাল্টা বলে দিবে তখন ওরই মানইজ্জত যাবে।
জোহরার আবার এসব বাক-বিতন্ডায় ঠিক আগ্রহ নেই। ও আছে কুকুর ছানাকে নিয়ে ব্যস্ত। নোমানোর হাস্যরসে মত্ত চোখে সেই বুঁদ হয়ে থাকা জোহরার দিকে নিবদ্ধ হলো।
জোহরা কুকুর ছানার সাথে সে কী গল্প জুড়ে দিয়েছে!
“তোর কি বেশি ব্যথা লেগেছেরে, বাবু?”
কুকুর ছানা উত্তর দিতে পারে না বলেই হয়ত উত্তরটা নোমান দিলো, “হ্যাঁ।”
“কোথায় লেগেছে?”
“এইতো, বুকে।” জোহরা চোখ উঠিয়ে একবার তাকালো। পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“বুকে কেন?”
“শাড়ি পরতে বললাম পরোনি বলে। আবদার না রাখলে তো কষ্টটা বুকেই হয়।"
"বুকে কেন হয়?"
"বুকে থাকা মানুষের কাছেই তো আমরা আবদার করি। তাই কষ্টটাও বুকের মধ্যিখানে গিয়ে লাগে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………