প্রেমার বিছানায় হলুদ শাড়িটা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। পাশেই রাখা এক মুঠো হলুদ চুরি। এগুলো যদিও ও কেনেনি। মেলা থেকে কিনে দিয়েছিলো নোমান ভাই।
মেলাতে সে কী ভিড় ছিলো! ইমন ভাই আর আপাসহ টুইটুবানি এগিয়ে গিয়েছিলো সামনে। প্রেমে পিছিয়ে পড়েছিলো খানিকটা। ওর এত ভিড় আবার ঠিক সহ্য হয় না। কিছুটা ভয় পেয়ে যায় মানুষজন এত দেখলে। যেই না ভাইয়া, আপাকে খোঁজার জন্য চোখ ঘুরিয়েছে সেই মুহূর্তে দেখে নোমান ভাই ওর পেছনেই আছে। মুখ এধার-ওধার ঘুরিয়ে দেখছে মেয়েদের। এই লোকের যে স্বভাবই এমন। প্রেমার বুকে সাহস ফিরে এসেছিলো যদিও কিন্তু নাক-মুখ কুঁচকে ফেলেছিলো ও। দু'কদম পিছিয়ে বেশ গা ঝারা দিয়ে বলেছিলো, “মেয়ে দেখা শেষ হলে তাড়াতাড়ি চলো। ভাইয়ারা তো এগিয়ে গিয়েছে। খুঁজবে তো না-কি!”
এমন করে বলেছিল যেন নোমানের মেয়ে দেখার জন্য ওরা পেছনে পড়ে গেছে।
নোমান ভাই সেসব তোয়াক্কা করা মানুষ তো আর নন। তিনিও গা ছেড়ে বলেছিলেন, “তোকে কে থাকতে বলেছে পেছনে? যা এগিয়ে যা। মেলা তো দেখতে আসেনি তোর ভাই মনে হচ্ছে যেন জীবনে প্রথম দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে এসেছে। তোরাও তাই।”
প্রেমার যদিও ইচ্ছে ছিলো না ঐ লোকের সাথে থাকার কিন্তু পথ হারাবার ভয়তেও থাকতে হয়েছিলো। নোমান ভাইতো মাঝে মাঝে বিশ্রী ভাবে শিসও দিচ্ছিলেন মেয়েদের দেখে। কাউকে কাউকে দেখে মুখে বলেছিলেন ‘ফুলটুসি’।
প্রেমার সেসব পছন্দ নয়। মেয়ে দেখলে এমন অভদ্রতা করবে কেন? বার কয়েক তর্ক করে ও যখন রেগে গেলো। ইচ্ছে করে এগিয়ে যেতে চাইল ভিড় ঠেলে তখন নোমান দু-হাত প্রেমার দু'পাশে রাখল। প্রেমাকে এমন ভাবে নিজের বুকের মাঝ বরাবর রাখল যেন পৃথিবীর মলিন ধূলোরও সাধ্যি নেই নোমানের সেই সীমানা ভেঙে প্রেমাকে আলিঙ্গন করার। নোমান সেই অধিকার কাউকেই দিচ্ছিলো না।
প্রেমাতো তখন রেগে আগুন। কিছুতেই সীমানায় থাকবে না দস্যি রাগের জন্য। নোমান সেই রাগ কমালো এক মুঠো হলুদ চুড়ি দিয়ে। দোকানে গিয়ে কত অবলীলায় বলল,
“মামা, এক মুঠো চুড়ি দেনতো। প্রেমার হাত আজ শব্দ করছে না। মেয়ে হয়ে এখনো জানলো না শাড়ির সাথে যে চুড়ি না হলে হয় না। আমাদের প্রেমানন্দা একটি বোকা মেয়ে, জানেন?”
মামা হাসলেন এত আশকারা দিয়ে যেন নোমান ভাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কথাটি বলেছে।
“কিরে, ঘুমাসনি কেন? কী ভাবছিস নাক ফুলিয়ে?” জোহরার রিনরিনে মেয়েলি স্বর এসে আচমকা প্রেমার কর্ণগোচর হতেই ওর ধ্যান ভেঙে গেলো। কখন যে ভাবতে ভাবতে এতটা মগ্ন হয়ে গিয়েছিলো খেয়ালই নেই ওর।
জোহরা এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। এখনো ভেতরে আসেনি। আপার এই এক গুণ। না বললে কখনোই ভেতরে আসবে না।
প্রেমা মুখটিকে স্বাভাবিক করল। হাসি টানলো কিছুটা। উঠে গিয়ে হাত ধরে আপাকে ঘরে নিয়ে এসে বসালো বিছানায়।
“তোমার কথা-ই ভাবছিলাম। তোমায় স্কার্টে খুব সুন্দর লাগে আপা।”
“তাই? তোকেও শাড়িতে সুন্দর লাগে জানিস? আজ পরেছিস কী মানিয়েছিল! বড়ো বড়ো লাগছিলো।”
“তুমি জোর না করলে থোড়াই পরতাম। আজ এত জোর করলে কেন?”
বোনের প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো জোহরা। শাড়ির প্রসঙ্গ উঠতেই বিব্রতবোধ করল ও বেশ। তখনকার নোমান ভাইয়ের করা আবদারটাও কানে এসে বিঁধল। নোমান ভাইটা মাঝে মাঝে এমন করে কথা বলে যেন জোহরা বোন নয় অন্যকিছু। এ কেমন খারাপ অভ্যেস? অস্বস্তিকরও বটে। তাই তো জোহরা বুদ্ধি করে প্রেমাকে শাড়ি পরালো। এমন ভাবে সবটা উপস্থিত করল যেন আজ প্রেমার খুব শাড়ি পরার ইচ্ছে ছিলো আর প্রেমা চেয়েছিলো ও স্কার্ট পরুক। সম্পর্কে যেন অস্বস্তিজনক কিছুই না আসে।
প্রেমা বোনকে আবার ডাকল, “তুমি কেন বললে শাড়ি পরতে? ঐ গরমে শাড়ি সহ্য হয়?”
“হবে না কেন? আমি পরি না? বেশিরভাগ সময়ই তো পরি। আমার কেমন করে সহ্য হয় তাহলে?”
প্রেমা এবার বোনের পাশে বসল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “তোমার যে গায়ের রঙ! ভীষণ মানায় শাড়িতে।”
“তোরও বা কম কী?”
“আমি তো কিছুটা শ্যামলা। চুলগুলোও হালকা কোঁকড়ানো। তোমার মতো অত নয়। তোমার বিষয়ই আলাদা আপা। যে দেখবে, তাকিয়েই থাকবে।”
“এসব বলতে নিষেধ করেছি না? তুই জানিস, তুই কত সুন্দর? শ্যামলা মেয়েদের চেয়ে সুন্দর আর কী আছে বলতো? অমন মায়া চোখে ধারণ কে করতে পারে?”
“আপার কাছে বোনেরা সবসময়ই সুন্দর।”
প্রেমার কথায় হাসল জোহরা। চোখ গিয়ে পড়ল ওর বিছানায় ছড়ানো চুড়িগুলোতে। কাঁচের চুড়ি এত প্রিয় ওর! তাই হাতে উঠিয়ে নিলো। চুড়ির রিনরিনে শব্দ কানে গিয়ে বিঁধতেই ওর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। চুড়ির প্রতি ওর যেই প্রেম! চুড়িগুলো ভীষণ সুন্দরও তো!
“কখন কিনলিরে এগুলো? মেলা থেকে বেরিয়ে তোর হাতে দেখেছিলাম। বেশ সুন্দর হয়েছে।”
কথা বলতে বলতে জোহরা আবার নাড়াল চুড়িগুলো। প্রেমা বিশেষ একটা আগ্রহ দেখালো না, “মেলাতেই। তোমার পছন্দ হয়েছে? নিয়ে নাও তাহলে।”
“ধুর বোকা। তোর হাতেই মানিয়েছে। শাড়িটার সাথে বেশ মিলেছিলো।”
“আমিতো শাড়ি পরি না, আপা। চুড়ি দিয়ে কী কাজ?”
“পরিস না কিন্তু পরবিতো ভবিষ্যতে নাকি?”
“না, আপা। পরবো না।”
“কেন পরবি না?” জোহরার কণ্ঠ গভীর হলো কিছুটা। চোখগুলো নিবদ্ধ হলো সরাসরি প্রেমার দিকে। প্রেমার শাড়ি না পরার কারণটা জোহরার অবগত। তবুও প্রসঙ্গ যেহেতু এসেইছে তাই আরেকটা বার ও সেই কথা এগুতে চাইল। কিন্তু প্রেমার বোধহয় ঠিক ইচ্ছে হলো না সেই কথা তোলার। সেই কথা তুললেই যে ওর চোখে জল জমে। বুক ভেঙে আসে। দুঃখ বাড়ে। নিজের দুঃখ বাড়াতে কে-ই বা চায়?
“থাকুক সেসব।”
“কেন? সব থেকে গেলে জীবনে সুখী হওয়া যায় না, প্রেমা।”
“তুমিতো জানো, আপা, আমি বাবাকে ভীষণ ভালোবাসি।” এবার প্রেমার কণ্ঠ আর আগের মতো নেই। আগের মতো নেই ওর চোখগুলোও। মণিগুলো অনবরত কাঁপছে। বাতাসের চেয়েও সেই কম্পনের গতিবেগ বেশি।
জল জমবে জমবে ভাব। জোহরার মায়া হলো বোনের জন্য। মায়েদের বুকে যেমন মায়া হয়, ঠিক তেমন। স্বার্থহীন, অমলিন মায়া। ও হাত বাড়িয়ে ছুঁলো বোনের মাথা। বুলিয়ে দিলো স্নেহে,
“জানিতো।”
“বাবাও তো আমাদের ভালোবাসে অনেক।”
“জানি।”
“সেই বাবা যখন ভালোবাসার কন্যার শাড়িগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয় সেই আগুনের তাপ কার গায়ে এসে বেশি লাগে বলোতো, আপা? কেবলই কি এক কন্যার গায়ে?”
“সেসব পুরোনো কথা, প্রেমা। ওসব ধরে জীবন কাটালে হবে কি?”
“কিন্তু আমি কীভাবে ভুলব, আপা? বাবা তার এত মায়ায় গড়া মেয়ের শাড়িগুলোতে আগুন দিলো আগুনটা এসে লেগেছিল সন্তানের প্রতি তার সমস্ত বিশ্বাসের উপরে। আগুন বাবা শাড়িগুলোতে লাগায়নি। লাগিয়ে ছিলো তার এত বছরের ভালোবাসা, বিশ্বাস, স্বপ্নে। আমার আব্বাটা কেমন করে কাঁদছিলো সেদিন আমি কেমন করে ভুলব? কেমন করে আমি সেই দৃশ্য ভুলতে পারি, আপা?”
প্রেমার কণ্ঠ কাঁপছে। চোখগুলো বিলের জল হয়ে গিয়েছে। অনবরত অশ্রু ঝড়ছে।
জোহরা বোনকে বুকে টেনে নিলো। কাঁদছে সে নিজেও। সেই স্মৃতি ওদের জীবনে দুঃস্বপনের মতো। চাইলেও ওরা ভুলতে পারছে না। পারবেও না। এমন ভয়ঙ্কর স্মৃতি কীভাবে ভুলবে? প্রেমাটার হাতে আজও পোড়া দাগ আছে। ছোটো ছিলো কি-না মেয়েটা! বড়ো আপার শাড়ির আগুন সহ্য করতে পারেনি ও। দু-হাত দিয়ে সমস্ত আগুন নিভিয়ে দিতে চেয়েছিলো। কেবলই কি শাড়ির আগুন? বাবার বুকের আগুন কি নয়?
—————
সপ্তাহের শুক্রবারটি ব্যস্ত ঢাকার জন্য একটি আরামের দিন। বিছানায় হেলান দিয়ে ছুটি কাটায় অফিসের বাবুরা। খাবার টেবিলে আড্ডা জমে পরিবারের। কী এক আনন্দ আনন্দ মৌসুম। আনন্দ জমে মেজবাহ্’র বুকেও। আজ যে তার একটি টেলিফোন আসার দিন।
মেজবাহ্’র আজ বিশেষ কাজ নেই। ইদানিং সে ছুটির এই দিনটাতে কাজ কমিয়ে রাখে। বিশেষ করে বিকেলে। সুচরিতার একটু কণ্ঠ শোনার জন্য তার মরিয়া হয়ে উঠা অন্তর শুক্রবারে এসে প্রাণ পায়। শ্বাস নেয় খানিক।
ঘুম থেকে সে এখন উঠতো না যদিও। সিকান্দারটার জন্য উঠতে হয়েছে। এসেই টেলিভিশন ছেড়েছে। সংবাদের শিরোনাম দেখার জন্য ডাক পড়েছে তার। না উঠা অব্দি সেই ছেলে কি ছাড়বে ওকে?
মেজবাহ্ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। এটা তো সকালের শিরোনামের সময় নয়। শিরোনাম দিচ্ছে বিকেল চারটায়। এত বেলা কখন হয়ে গেলো? এত দেরি অব্দি তো ঘুমোয় না সে!
চট করে উঠে গেলো। হাত-মুখ ধুয়ে নিলো কিছু সময়ের ব্যবধানেই। সিকান্দার ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আপেল চিবুচ্ছে। হেলান দিয়ে সংবাদও দেখছে। টেবিলে গরম চায়ে কেটলি রাখা। হয়ত সে-ই করেছে। মাঝে মাঝে সময় পেলেই ও চা করে। মেজবাহ্'র চা-টা আবার প্রিয় কি-না।
টেবিল থেকে কাপে চা ঢেলে নিলো মেজবাহ্। ভাইকে এতক্ষণ সিকান্দার না দেখলেও এখন খেয়াল করল। সোফা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠল বাঁদরের মতো। হাসি হাসি মুখ ওর।
“ভাই, টেলিভিশনে দেখুন। আপনাকে যা হ্যান্ডসাম লাগছে। শালারা আপনারে খুশি করার জন্য এত সুন্দর ছবিও কোথা থেকে যেন জোগাড় করেছে।”
মেজবাহ্’র গায়ে কালো টি-শার্ট। চুলগুলো ভেজা। মুখ ধোয়ার সময় ভিজেছে। গায়ের রঙটা উজ্জ্বল লাগছে বেশ।
আয়েশ করে বসল টেবিলে। তাকালো টেলিভিশনের দিকে। বড়ো বড়ো শিরোনামে ছেপেছে— বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মেজবাহ্ শেখের বিরুদ্ধে যেই গুজব ছড়ানো হয়েছে তা একান্তই ভিত্তিহীন। কয়েকদিন ভুল ছবি ও বিরোধী দলের চক্রান্তেই হয়ত হয়েছে সেসব, বলে আশঙ্কা জানিয়েছেন তিনি।
মেজবাহ্'র ঠোঁটে কোনো উৎফুল্লতার হাসি নেই। চঞ্চলতা নেই চোখ দুটিতে। যেন এমনটা হওয়ারই ছিলো।
সিকান্দার আনন্দ সে তুলনায় অনেক, “দেখলেন ভাই, জামাল মোস্তফা বেশ ভয় পেয়েছেন। বিবিদের বোধহয় বেশিই ভালোবাসেন। উনাদের মতো বড়ো চ্যানেল নিজ দায়িত্বে এমন সংবাদ ছাপানো কত বড়ো বিষয়! কোনো মারধর নয়, টাকাপয়সা নয় কেবল দুই বিবির ভয়তেই সোজা হয়ে গিয়েছেন লোকটা। তবে আপনার একে দুইটা কিল অন্তত দেওয়া উচিত ছিলো।”
“হাত না লাগিয়ে যা হয় তা-ই লাভ। দাগ থাকলেই সমস্যা।”
মেজবাহ্'দের কথোপকথন আরেকটু বাড়ার আগেই টেলিফোন এলো। মেজবাহ্ ঘড়ির দিকে একবার তাকাতেই বুঝল টেলিফোনটি ঠিক কার। কেন এসেছে। সিকান্দারও বুঝল কী? আজকাল মেজবাহ্'র সাথে সাথে এমন একটি টেলিফোনের অপেক্ষা সে করে না? করে বোধহয়। ভাই প্রিয় রমনীর সাথে কথা বললে যেমন শান্ত হয়ে যান! সিকান্দারতো পারে না সেই রমনীকে ভাইয়ের সামনেই নিয়ে আসে।
মেজবাহ্ টেলিফোন তুলতে যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে আগের মতোই। টেলিফোনটি বেজে বেজে কেটে যায়। সে ফিরেও তাকায় না।
সিকান্দার ভাইয়ের মতিগতি বুঝতে পারে না। সে রয়েছে বলেই কি ফোন তুলল না? ভাইয়ের এত লজ্জাশরম হলোই বা কবে? প্রশ্ন মনে রাখতে পারে না ছেলেটা। কথা বলার এত বদ অভ্যেস তার!
“ভাই, আপনি কি আমি সামনে বলে টেলিফোন ধরলেন না?”
“তোর সাথে ফোনের সম্পর্ক কী?”
সিকান্দার প্রশ্নটি শুনে যেন ভীষণ লজ্জা পেলো। লাজুক স্বরে বলে,
“হয়ত লজ্জা পাচ্ছেন।”
সিকান্দারের হাবভাব দেখে ভ্রু কুঁচকে যায় মেজবাহ্'র, “কেন? তুই কি আমার ভাসুর?”
“তা না হই। ভালোবাসার মানুষ তো। একজন ভালোবাসার মানুষের সামনে আরেকজনের ফোন ধরাটা তো খারাপ দেখায়।”
মেজবাহ্ চোখ রাঙিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে। উদ্দেশ্য সিকান্দারের পিঠে দু'টো চড় ফেলা। কিন্তু সিকান্দার সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞ বলেই দ্রুত সরে যায় দরজার দিকে। চেঁচিয়ে জানায়,
“আচ্ছা চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি। আপনাদের ভালোবাসার পথে বাঁধা হবো না। বিদায় দিন প্রাণের স্বামী। বিদায় দ্যান, বিদায় দ্যান গো, ও প্রাণের স্বামী, বিদায় দ্যান আমারেগো…”
কথার মাঝে গান জুড়ে দিলো ছেলেটা। মেজবাহ্ এবার আরেকটু এগুতেই ও ছুটে যায়। তা-ও খুব বদমায়েশের মতো মেয়েলি ভঙ্গিতে। মেজবাহ্'র হাসি চলে আসে সেটা দেখে। দরজা আটকে এসে টেলিফোন তুলে। রিং লাগায় বিপরীতে।
জোহরা তখন দাঁড়ানো সিঁড়ির উপরেই। সকাল থেকে শিরোনাম দেখার পর ওর বুকটা আনচান করছে। কিন্তু মানুষটা তো ওর ফোন তুলল না। তবে কি অভিমান করল খুব?
জোহরার ভাবনার মাঝেই টেলিফোন বেজে উঠে। চমকে রিসিভার তোলে ও। ওপাশ থেকে ভেসে আসে গলার স্বর,
“ইচ্ছে হলো তবে অধমকে ধন্য করার?”
জোহরার বুক কেঁপে উঠে সেই আদুরে স্বরে। কণ্ঠে কোনো হম্বিতম্বি নেই লোকটার। নিঃসংকোচ প্রশ্রয়। অথচ আজ উনার জায়গায় জোহরা হলে অভিমান, অভিযোগে ফেটেই পড়তো।
জোহরার কথা ভেসে আসে না বলে মেজবাহ্'র কপাল কুঁচকে যায় আরও খানিক। এবার কিছুটা উদ্ভ্রান্তও হয় ছেলেটা।
"বাড়িতে কুকুর পুষলে কুকুরের জন্যও মায়া হয় লোকের! আপনার আমার জন্য মায়া হলো না? ক'টা দিন আমি কেমন কাটিয়েছি জানেন? রাজত্ব সামলাবো না রানিকে? হ্যাঁ? এত ছেলেমানুষী কেন?"
আচমকা ধমকেও ভড়কালো না জোহরা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখল। কণ্ঠ ওর জোরপূর্বক কিছুটা কঠিন করল,
"রাজত্বই সামলান। রানি কত আসবে - যাবে।"
"খবরদার। মেজবাহ্ শেখের চরিত্র নিয়ে ভুলেও কথা বলবেন না। মেজবাহ্ শেখের রানি যেকেউ নয় যে আসবে যাবে। মেজবাহ্'র রাজত্ব একটা, রানিও হবে একটি।"
এমন একটা কথার পর জোহরার মুখ থেকে উত্তর আসে না। কেটে যায় কতটা সময়। টেলিফোন ধরে রাখল কানেই। মেজবাহ্ অনবরত শ্বাস ফেলল। মেয়েটার জন্য মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম তার। স্বেচ্ছাচারীনি মেয়ে একটা! যা ইচ্ছে করছে মেজবাহ্'র মনের সাথে। একটু বুকে থাকতে দিয়েছে বলে এত অত্যাচারও সহ্য করতে হবে তার?
এত রাগ জমে ছেলেটার তবুও শান্ত রাখে নিজেকে। পরিস্থিতি বদলাতে আচমকাই সুর তুলে,
"সুন্দরী গো,
দোহাই দোহাই মান কোরো না,
আজ নিশিতে কাছে থাকো
না বলো না।
একেই তো এই জীবন ভরে কাজের বোঝাই জমে,
আজ পৃথিবীর ভালোবাসার সময় গেছে কমে,
একটু ফাগুন আগুন দিয়ে
না জ্বেলো না।
সুন্দরী গো দোহাই দোহাই মান কোরো না.."
·
·
·
চলবে……………………………………………………