উত্তপ্ত আকাশের এক চিলতে রাজ্য গলিয়ে কয়েকটি অপরিচিত মেঘের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। ইমনের শার্ট ভিজে লেপ্টে আছে গায়ের সাথে। বর্তমানে সে বসে আছে জামাল মোস্তফার অফিস রুমটায়। ভদ্রলোক চ্যানেলের ডিরেক্টর বলে তার রুমটায় এয়ার কন্ডিশনার লাগানো হয়েছে। শীতল বাতাসে ইমনের ভেজা পিঠ প্রায় প্রায়ই কেঁপে কেঁপে উঠছে শিরশির করে।
জামাল মোস্তফা ভীষণ চিন্তিত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে আছেন চেয়ারে। লোকটার ভুঁড়ি ব্যতীত দেখা যাচ্ছে না কিছু।
ইমন অধৈর্য হলো, “স্যার, কিছু বলার জন্য ডেকেছিলেন কি? বলছেন না তো। আমার আবার বিকেলের আগেই ফিরতে হবে।”
ইমনের কথায় ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চিন্তার সুতোয় টান পড়ল কিছুটা বোধহয়। ভীষণ হতাশ শ্বাস ফেলে বললেন,
“কোথায় যাবে? তোমার সাথে আমার প্রয়োজন ছিলো, ইমন।”
লোকটার হাবভাব ইমনের সুবিধা লাগে না যদিও। তবুও জানায়, “সিলেট যাবো স্যার। আমার বাবার ইচ্ছে হচ্ছে সিলেট যাওয়ার। বিকেলেই রওনা হবো।”
“সিলেট?” কিছুটা চমকে উঠতে দেখা গেলো যেন জামাল মোস্তফাকে। সিলেট শব্দটি আতঙ্কের মতো গায়ে লাগলো মনে হলো। ইমনের ভ্রু আরও কুঁচকে যায়। বলে, “হ্যাঁ, সিলেট। কেন স্যার? কোনো সমস্যা?”
জামাল মোস্তাফা টেবিল থেকে পানির গ্লাস উঠিয়ে ঢকঢক করে গিলে নেন কিছুটা পানি। উনার মুখটি দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে তিনি ঠিক কতটুকু অস্বস্তিতে আছেন।
“আসলে ইমন, আমি যে সেদিন একটি সংবাদ টেলিকাস্ট করলাম না? মেজবাহ্ শেখের নির্দোষ হওয়ার? সেটার জন্য বিরোধী দল এখন চাপ দিচ্ছে। আসলে চ্যানেলটার হেডে বিরোধী দলের কয়েকজন নামকরা মানুষ রয়েছে কি-না!”
“তো? যা সত্যি তা প্রকাশ করেছেন। এতে উনারা চাপ দেওয়ার কে?” ইমনের একরোখা কণ্ঠে জামাল মোস্তফা আরও একবার জোরে শ্বাস ফেলেন। আজকালকার যুবক ছেলেগুলো বুঝতে চায় না কিছু। সবকিছু এদের ভেঙে ভেঙে বোঝাতে হবে নয়ত বুঝবে না।
“উনাদের চ্যানেল উনারাই তো চাপ দিবেন। আমাকে থ্রেটও দিচ্ছে।”
“কে? কারা?”
“সিলেটেই থাকেন। বিরোধী দলের নেতা কামাল হোসেনের সেক্রেটারি দু'টো চিঠি পাঠিয়েছেন, টেলিফোন করেছেন। কেন এই চ্যানেল মেজবাহ্ শেখের পক্ষে সংবাদ ছাপালো।”
“কেন ছাপিয়েছেন তা আপনি পরিষ্কার করে বলে দিন তাহলে। যা সত্য তা ছাপিয়েছেন।”
“আসলে ইমন আমি ছাপাতে চাইনি এমন সংবাদ। মেজবাহ্ শেখ জোর করাতে ছাপাতে হয়েছিলো।” বেশ আমতা-আমতা করেই বললেন জামাল মোস্তফা। তার কাচুমাচু মুখে সংকোচ স্পষ্ট। ইমনের কাছে ব্যাপারটা বোধগম্য হয় না ঠিক। সে কিছুটা চমকেই উঠে,
“কেন? উনার জোরে আপনি না জেনেই সংবাদ ছাপিয়েছেন? কেন? চ্যানেল যদি রাজনীতির জোরে চলে তবে দেশের নাগরিক কী জানবে? এটাতো অন্যায়, স্যার!”
ইমনের কণ্ঠে এবার কাঠিন্যতাও স্পষ্ট হলো। জামাল মোস্তফা বাহিরের ভেসে বেড়ানো পাখিগুলোর চেয়েও দ্রুত ভাবে এসে চেপে ধরলেন ইমনের হাত, আকুতিভরা গলায় অনুরোধ করলেন,
“আমায় তুমি সাহায্য করো, ইমন। মেজবাহ্ শেখের ভয়ে উনার পক্ষ নিতে হয়েছে যদিও তবে সংবাদটি ভুল ছাপানো হয়নি। কিন্তু বিপরীত দলের সেই লোক আমাকে হুমকি দিচ্ছে বেশ। আমায় রক্ষা করো।”
বেশ ভারিক্কি ধরণের জামাল মোস্তফাকে এমন শিশুসুলভ আচরণ করতে দেখে ইমনের ভারি মায়া হলো। সে না চাইতেও একটি হাত নিয়ে রাখল জামাল মোস্তফার কাঁধে। আশ্বস্ত করল নিজ ভঙ্গিতে। যদিও তার জানা নেই সে করবেটা কী। করার কিছু নেইও।
যদিও এই চাকরিটা করে সে শখবশত। এত গভীরে না গেলেও হয়। কিন্তু জামাল মোস্তফা সবসময় তাকে স্নেহ করে এসেছেন। তাই নিষেধও করতে পারল না। কখনো কখনো স্নেহের কাছে হার মানতেই হয়।
—————
রূপসা বেগম অনেক সাজগোছ করে তৈরি হয়েছেন। বয়স পঁয়ত্রিশ অথবা ছত্রিশ হলেও বোঝার উপায় নেই মোটেও। শরীরের যেই গঠন তাতে অনায়সেই টুপুর সমানই লাগে। ছোটোও লাগে কখনো কখনো।
টুপু বেগম রূপসা বেগমেরই বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক দাঁড়িয়ে নয় কাজও করছেন। রূপসা বেগমের শাড়িগুলো গোছাচ্ছেন।
“আচ্ছা টুপু, তুমি চলো আমার সাথে। কতবার বললাম। এই বয়সে একটু বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিবে, কেনাকাটা করবে তা-না, ঘরকুনো কাজেই আটকে রেখেছ জীবনটা। এমন করলে কি হয় বলো?”
টুপু বেগম কাপড় গোছাতে গোছাতেই হাসলেন। হালকা রঙের শাড়িতে উনাকে ভীষণ সুন্দর দেখায়। একটুও প্রসাধনী মাখে না মুখটায়। সবসময় উদাস উদাস ভঙ্গি। অথচ তবুও কত পরিপাটি লাগে ওকে! রূপসা তো চোখই ফেরাতে পারে না।
“হাসছো যে বড়ো?” রূপসার কথায় টুপু একবার চোখ তুলে তাকায়। পুনরায় মনোনিবেশ করে গোছানোতে,
“হাসবো না? আপনি যা বলেন, না হেসে পারা যায়?”
“হাসার মতো কী বললাম? জীবনকে উপভোগ করা কি হাসার বিষয়?”
“আমার জন্য হাসার বিষয়ই। যার ঘর, বর বলতে কিচ্ছু নেই সে কীসের উপর ভরসা করে জীবনকে উপভোগ করবে বলুন? জীবন এখন কোনোরকমে বয়ে নিয়ে যেতে পারলেই বাঁচি যে।”
রূপসা টুপুর চোখের দিকে তাকায়। শুকনো চোখ, ওর মুখের হাসিটাও কেমন যেন শুকনো। সংসার ভাঙা মেয়েদের হাসি কি এমনই হয়? রূপসার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে।
“এমন করে বললে তো এই শেখ বাড়ির দুর্নাম হবে বড়ো। যেন মনে হচ্ছে আমরা তোমার গলা চেপে ধরেছি!”
“না, না, অমন আমি কল্পনাতেও ভাবি না। শেখ বাড়ি ছিলো বলেইতো আমি আর আমার ছেলেটা একটা আশ্রয় পেয়েছিলাম। নয়তো কোথায় গিয়ে পড়তাম বলুন তো?”
টুপুর কথার দীর্ঘশ্বাস যেন ছুঁয়ে যায় রূপসার উচ্ছ্বাসিত জীবনের বাগানটুকুও। ও সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে যাবে সেই মুহূর্তেই ওর ঘরের ব্যক্তিগত টেলিফোনটি সশব্দে বেজে উঠল। এত উচ্চরবে যে উপস্থিত দু'জন নারীই চমকে উঠল ভূতগ্রস্তের মতো। একে অপরের দিকে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল নিঃশব্দে।
“টুপু তুমি দাঁড়াও, আমি দেখছি..” বলেই রূপসা এগিয়ে গেলো টেলিফোনের দিকে। রিসিভার তুলতেই ওপাশের পরিচিত নিজস্ব পুরুষের স্বরটি এসে লাগল কানে,
“এই যে রূপসী নারী, কোথায় থাকেন শুনি? একটু খোঁজও নিতে সময় হয় না বুঝি?”
টেলিফোনের ওপাশ হতে ভেসে আসা স্বরটি এত মায়া মায়া যে রূপসার না চাইতেও হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। টুপু আঁড়চোখে সেই হাসিটি ঠিক খেয়াল করল। এবং হাসির উৎস ঠিক কোথা হতে তা বুঝতে বাকি রইল না তার। অস্বস্তি অনুভব হলো তার ভীষণ। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেও ইচ্ছে হলো। অন্যকারো দাম্পত্য জীবনে সে নিজের এমন নিশ্চুপ উপস্থিতি যে রাখতে চায় না। কিন্তু হুট করে চাইলেও কি চলে যাওয়া যায়? সেটি আরও খারাপ দেখাবে না? ওরা ভাববে না যে টুপুর হিংসে হচ্ছে হয়ত?
“এই যে মিস্টার ডাক্তার সাহেব, বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থেকে স্ত্রীর খোঁজ না নিয়ে দেশে ফিরুন। দেখব আপনার কেমন সময় হয় আমার খোঁজ নেওয়ার।”
তামাটে বর্ণের পুষ্ট দেহের তপু স্ত্রী'র খানিক অভিমানে হেসে উঠল। রূপসা ভীষণ ভালো মেয়ে বলেই সে এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থাকতে পারে। মেয়েটার তার উপর কোনো জোর নেই। তাকে এতটাই নিজের মতো থাকতে দিয়েছিলো যে তপুর আর কোনো স্বপ্নেই বাঁধা আসেনি। কিংবা দুঃখও যাপন করতে পেরেছিলো নিজের মতো।
টুপুর অস্বস্তি হলো। এই অনাধিকার চর্চার মতো উপস্থিতিতে সে মিইয়ে যাচ্ছিলো বলেই পাশ কাটাতে চাইলো। কিছুটা ইচ্ছেকৃত শব্দ করে বলল,
“এমা দেখেছো ছেলেটাকে ঘুম থেকে তুলতেই ভুলে গিয়েছি। আমি আসছি কেমন?” কোনো সম্বোধন নেই, ডাকনাম নেই, বিশেষণ নেই অথচ তবুও রূপসা বুঝে নিলো কথাটি তাকে বলা হয়েছে যে। তাই সে বাঁধ সাধলো সঙ্গে সঙ্গে। টেলিফোনটা অন রেখেই এগিয়ে গেলো টুপুর দিকে। টুপুর হাত টেনে টেলিফোনের কাছে নিয়ে এসে টেলিফোনটা কানে তুলে নিলো তৎক্ষণাৎ। ব্যস্ত স্বরে বলল,
“শুনছো, আমি এখন একটু কেনাকাটা করতে যাচ্ছি। তুমি টুপুর সাথে কথা বলে নাও। কখনো তো তেমন ওর সাথে কথা বলো না। আমি এখন গেলাম কেমন?”
তপু শেখ অথবা টুপু কাউকেই কিচ্ছুটি বলতে না দিয়ে রূপসা টেলিফোনটা তুলে দিলো টুপুর হাতে। কাঁধের ব্যাগটা তুলে নিয়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলো।
হতবিহ্বল টুপু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না। এই নারীটি যেন কেমন! হুটহাট কী করে বসেন কিচ্ছু বোঝা দায়। টুপু তাই পিছু ডাকল,
“শুনুন না…”
ডাক শুনল রূপসা। দাঁড়ালোও কিছু ভেবে। এরপর মুখ ফিরিয়ে হাসিমুখে বলে, “শুনুন, বলুন আর কত করবে, টুপু? কোনো সম্বোধন দিলে না, কোনো ডাকনাম দিলে না। আমি কি কেউ হতে পারিনি এখনো? ভাবী না ডাকলে বন্ধুতো ডাকতেই পারো? না-হয়, নাম ধরেই ডেকো। কেমন?”
আচমকা রূপসার এমন কথায় টুপুর জড়তা আরও চেপে বসল। মুখের কথা যেন ছিনিয়ে নিয়েছে কোনো অজ্ঞাত দানব। শ্বাস নিতেও তার এত লজ্জা বোধ হচ্ছিলো যে কিছুক্ষণ শ্বাসটাও ধরে রাখল। রূপসা ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে। আশেপাশে তার চিহ্নটুকু নেই। ঘরজুড়ে ঝুপ করেই নেমে এসেছে শেষ সন্ধ্যের নিস্তব্ধতা, একটি বুক হু হু করা দুঃখ।
তপুর কণ্ঠ ভেসে এলো সেই দুঃখ জড়ানো সন্ধ্যেতে, “টুপু, রূপসাকে আজও কিছু বলে ডাকা হয়নি?”
ভীষণ বিস্ময় ভরা সেই কণ্ঠ। যেন সে এর আগে কখনোই এই বিষয়ে জানেনি। আজই প্রথম জানলো, খেয়াল করল।
টুপুর উদাস উদাস চোখটিতে চিলিক দিয়ে উঠল কী যেন! হলুদ আলোয় চোখ দু্টোকে ভেজা নক্ষত্র মনে হলো। কণ্ঠ হলো আরও মলিন,
“সম্বোধন দেওয়ার কথা ছিলো বুঝি? কখনো ভাবিনিতো এমন কেউ আসবে, ভাবলে সম্বোধন তৈরিই রাখতাম।”
“আজও বাঁকা উত্তর দেওয়া হয়…” তুপুর আনমনা স্বর বাতাসের মতো এসে লাগে টুপুর কানে। সেই বাক্য শুনে বাঁকা হাসি ফুঁটে উঠে টুপুর ঠোঁটে। তার বড্ড বলতে ইচ্ছে হয়, ঐ লোকটা বাঁকা কথা ছাড়া আর শুনলোটা কি? বুঝলটা কি? কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। যেমন করে রংধনু উঠার পূর্বে আসা বর্ষার ঝড়ো তান্ডবকে কেউ বুঝেনি।
—————
মেজবাহ্'র বিষয়বস্তু ঘিরে কথোপকথন চলমান বৈঠকে। উপরমহল থেকে একটি চিঠি এসেছে। দলীয় নেতার নামে ছড়ানো দেশব্যাপী এমন সংবাদে উপরমহলে কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দলীয় লোকদের একত্রিত হয়ে সাময়িক সময়ের জন্য একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সে নিয়েই বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়েছে উপস্থিত সকল লোকবল।
দোলন শেখকে দেখা যাচ্ছে কিছুটা উত্তেজিত বটে। মুখ লাল হয়ে গিয়েছে, “মেজবাহ্ একজন বুদ্ধিমান ছেলে। ওকে ওর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্তের কথা আপনারা তুললেনও বা কীভাবে? এটা কোনো বিচার হলো? আর কোনো নেতাকর্মীদের নিয়ে কখনো গুজব ছড়ায়নি? ও-ই কি প্রথম না-কি?”
বড়ো চাচার চিৎকার গিয়ে তীর্যক ভাবে লাগছে সকলের কানে। মেজবাহ্ আজ বেশ শান্ত। যতটুকু ঝড় যাওয়ার পর শান্ত হয় আসমান ঠিক ততটুকু। কবির শেখ নিজের বড়ো ভাইয়ের উত্তেজনায় কিছুটা সম্মতি পোষণ করলেন,
“অবশ্যই বড়ো ভাই ঠিক বলছেন। আপনি বাড়াবাড়ি করছেন অনেক!”
মালেক সাহেব আজ উত্তেজিত নন। এই পুরো হলরুম জুড়ে যদি কেউ শান্ত থাকে তবে তা দু'জন। এক মালেক সাহেব, দ্বিতীয় মেজবাহ্।
দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে উনার যুক্তি খণ্ডন করার মতো সাধ্য সকলের নেই। উনি বেশি নরম-শান্ত স্বরে বললেন,
“আমি তো আপনাদের পরিবারের কেউ নই যে কেবল পরিবারের কথা ভাববো। আমি দলের কথা ভাবছি। আপাতত মেজবাহ্ যদি কিছুদিন বিরতিতে থাকে তবেতো ক্ষতি নেই, তাই না? বিরোধী দলের লোকেরা যদি এই চক্রান্ত করে থাকেন তবে উনারা বুঝবেন উনারা সফল। এতে মেজবাহ্'ও নিরাপদ রইল এবং শত্রুপক্ষকেও আমরা দুর্বল করতে পারলাম!”
“কিন্তু মেজবাহ্’তো দোষীই নয়। সাময়িক বিরতির প্রয়োজনটাই বা কী?” কবির শেখ শক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লেন।
“দোষী নয় তা তো সবাই ই দেখছে। কিন্তু রাজনীতির মানুষ কী দেখছে তা ভাবুন। উপরমহল যেহেতু চাচ্ছে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিই তাহলে নিতে ক্ষতি কী? আপাতত নাহয় আপনাদের বড়ো ছেলে হিমেল ওর জায়গাটুকু সামলাক। এরপর মাস খানেকের মাথায় ও চলে এলো। এতে জনগণও নতুন নেতৃত্বের স্বাদ বুঝবে। মেজবাহ্ কতটুকু করছে অন্য নেতা কতটুকু করছে তার পার্থক্য বুঝবে। এতে ভোটেও তো লাভ হবে! আমাদের দল থেকে সিলেট অঞ্চলে ও জেতার সম্ভাবনা থাকবে।”
মালেক সাহেবের যুক্তি হয় বাণের মতো। একদম সঠিক জায়গায় গিয়ে আটকায়। চাইলেও মুখের উপর অবজ্ঞা করা সম্ভব হয় না। দোলন শেখ বিরোধিতা করতে চাইলেন তবুও কিন্তু মেজবাহ্ সেটি করতে দিলো না। বরং বেশ স্বাভাবিক ভাবেই সম্মতি প্রদান করতে করতে বলল,
“আজ উনার সাথে আমিও একমত। এটাতে লাভ বেশি দেখছি। রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে বেশি দেখতে হয় লাভ। আমি সহমত পোষণ করছি। আপাতত এই মাস আমি বিরতিতেই থাকি।”
“কিন্তু আব্বা, তুমি দলের মাথা। তোমায় ছাড়া দল খেঁই হারাবে!” চাচার কথায় উঠে দাঁড়ায় মেজবাহ্। ভরসা দেয় নিবিড়ে,
“আমি তো দলে থাকছি। পদ থেকে সরছি দল থেকেতো নয়। চিন্তা করবেন না। আপনারা সিদ্ধান্ত উপরমহলে পাঠিয়ে দিন।” শেষ আদেশ টুকু করেই বেরিয়ে গেলো সে।
কবির শেখ ছেলের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেটি তার উপর উপর এত শক্ত-পোক্ত কিচ্ছু বুঝতে দিতে চায় না। কিন্তু বাবা হিসেবে সে-যে এতটুকু বুঝে, ছেলের কোন কথাটি মুখের আর কোনটি মনের। এই দল, এই পদ ছেলের জীবনের সাথে আটকে রয়েছে। এগুলো ছেড়ে সেই ছেলে কি বাঁচতে পারবে? মালেক সাহেব ইচ্ছেকৃত এমন প্রস্তাব দিলেন। তিনি কি বুঝেন না? ঢের বুঝেন। মেজবাহ্'ও নিশ্চয় বুঝেছে। তবুও কেন সম্মতি দিলো ও?
—————
সিলেটের দিকে গাড়ি প্রবেশ করলে যতটুকু পথ পুরোটাই একদম ঝকঝকে, ফকফকে। ঢাকার রাস্তাও এতটা সুন্দর নয়। গাড়ির কাঁচ খোলা বিধায় ফুরফুরে বাতাস এসে চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে জোহরার। প্রেমার চুলগুলো বাঁধা বলে ওকে বেশি কষ্ট পোহাতে হচ্ছে না।
রাস্তাে পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সোনালি লাগছে জোহরার মুখটি। আজ ওর বেশ খুশি লাগছে। এতক্ষণের পথ পেরিয়ে যে এসেছে একটুও ক্লান্তি লাগছে না তার। বরং মনটা ফুরফুরে হয়ে গিয়েছে। বাবা হুট করে সিলেট ঘুরতে চাইলেন বলেই তাদের এই যাত্রা। ওরও খুব ইচ্ছে করে আজকাল মেজবাহ্ শেখের এই শহরে থাকতে। মানুষটার পাশে না হোক, কাছাকাছি থাকতে।
যাবের শিকদার গাড়ির পেছনের সিট থেকে গলা উঁচু করে ড্রাইভারের সাথে থাকা ইমনকে ডাকলেন,
“ইমন, একটা ভালো রেস্তোরাঁয় গাড়ি থামিও তো। আজ আমরা বাহিরে খাবো। রাত তো হয়েছে বেশ।”
যাবের শিকদার ঘোরাফেরা, বাহিরে খাওয়া খুব কম পছন্দ করেন। করেন না বললেই চলে। আচমকা উনার প্রস্তাবে ইমন কপালে ভাঁজ ফেলল। প্রেমা তাকাল সন্দিহান দৃষ্টিতে,
“বাহিরে খাওয়াবে, বাবা?”
“হ্যাঁ, তোমরাতো পছন্দ করো! কেন, কোনো সমস্যা?”
জোহরা বোনের হাত চেপে ধরল। ওর আনন্দ আর ধরছে না। উচ্ছ্বাসিত ভঙ্গিতে বলল,
“কোনো সমস্যা নেই। রেইনবো চাইনিজে চলো তাহলে, বাবা? ওখানের ভেতরটা অনেক সুন্দর। ইমন ভাই ক্যামেরাও এনেছে। আমরা ছবি তুলতে পারব।”
“রেইনবোতে? এক্সপেন্সিভ তো!” ইমন পুনরায় কপাল কুঁচকে বলল। কিন্তু আজ যাবের শিকদারের যেন ভিন্ন কিছু হয়েছে। নির্ভাবনায় মন জুড়িয়ে আছে বলেই হয়ত ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তাতে কি? তোমার বাবার কি টাকা কম? এত গরীব ভাবছো?”
ইমন লজ্জা পেলো বাবার কথায়। ও এমনটা বোঝাতে চায়নি। মুখটা কাচুমাচু করে ফেলল তাই,
“না, বাবা, তেমনটা নয়। আচ্ছা ওখানেই যাবো।”
জোহরার আনন্দ আরও বাড়ল দ্বিগুণ। ও মেজবাহ্ সম্পর্কে অনেক সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম খবর জানে বিধায়ই এটাও জানে যে মেজবাহ্ শেখের এই রেস্তঁরাটা সবচেয়ে প্রিয়। আর মেজবাহ্ শেখের প্রিয় জায়গায় জোহরার পা রাখাটা স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর বিষয় যে! ঐ জায়গাগুলোতে মানুষটার অস্তিত্ব আছে, স্মৃতি আছে। সবগুলো কোণায় উপস্থিতি আছে। জোহরা সেই উপস্থিতি অনুভব করবে। মন দিয়ে, খুব খুব খুব মন দিয়ে।
—————
মেজবাহ্ এসে গাড়ির সামনে দাঁড়াতেই সিকান্দার ছুটে এলো। হাসি হাসি মুখ। চঞ্চল চোখ। ওর এই মুখটি দেখলে মেজবাহ্'র খটকা লাগে। নিশ্চয় কোনো কুমতলব থাকেই ওর।
মেজবাহ্ ঘাড় নাড়াল, ভ্রু বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“হয়েছে কী? হাসছিস কেন?”
সিকান্দারের হাসি এতে আরও বিস্তৃত হলো। ও নিজেও প্রশ্নের বিপরীতে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ভাই আপনার সাথে দেখা করতে ঐ মেয়েটি এসেছে।”
“কোন মেয়ে?” ভ্রু কুঁচকে আসে মেজবাহ্'র।
“ঐ যে নাটক করে যে? শুক্লা? উনি। আজ নাকি আপনাদের একসাথে ডিনার করার কথা?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………