শিকদার বাড়িতে মানুষ বিশেষ বেশি না হলেও সারাক্ষণ টুইটুবানির হাঁক-ডাকে সমস্ত রমরমাই থাকে। জোহরাও বেশ উচ্ছ্বসিত মেয়ে। ওরা দু'জনেই বাড়িটিকে বেশি জমিয়ে রাখে। তবে প্রেমা এক্ষেত্রে একটু ভিন্ন। একটু ধারালো স্বভাবের মেয়ে। কথা বলে ওদের চেয়ে কিছুটা কম।
তিনজনই আজ ড্রয়িং রুমে উপস্থিত। টেলিভিশনে সংবাদ শিরোনামে আজও জ্বলজ্বল করছে মেজবাহ্ শেখের সংবাদ। দেশব্যাপী এই একজন লোক বেশ হৈ-হল্লা তৈরি করে ফেলেছেন। খ্যাতি বেশ ছিলো কি-না তাই একটি বিষয়ের জের ধরে সেটাকে তাল বানাতে ছাড়ছে না কেউ।
জোহরার ধ্যানমগ্ন দৃষ্টি টেলিভিশনেই আটকে। সংবাদের সাথে সাথে লোকটার হাঁটার, চলার কিছু ভিডিও এবং ছবিও প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে ও আরও মনযোগ দিয়ে নিখুঁত ভাবে দেখছে। কেমন করে হাঁটে মানুষটা তা গত দুই বছরে জোহরার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। এত দ্রুত হাঁটে যেন সবসময়ই কী একটা তাড়ার ভেতরে থাকছে সে।
“আচ্ছা মেঝো আপা, তোমার কি মনে হয়? এই সংবাদ চ্যানেল গুলো সবসময় সঠিক সংবাদই ছাপে?” প্রেমার দৃষ্টি জোহরাতে নিবদ্ধ। উত্তর জানার জন্য মণিগুলো ছটফট করছে বেশ।
জোহরা তখনও সংবাদের দিকেই তাকানো,
“সবসময়ের কথা বলছিস, না এখনের?”
“হবেই একটা।”
“দেখ, সবসময়ের কথা বললে বলব, এই সংবাদ মাধ্যমগুলোকে বিশ্বাস করাই সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। তবে এখনের কথা বললে বলব, বিশ্বাস না করাটাই উচিত।”
“তাহলে তুমি যে গতকাল খাবারের টেবিলে আমায় প্রশ্ন করলে আমি কেন উনাকে বিশ্বাস করছি?” প্রেমার চোখে কৌতূহল। আপাকে ঠিক বুঝতে পারছে না সে।
জোহরা এবার রয়েসয়ে তাকাল প্রেমার দিকে। একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“আমি তোর পয়েন্ট অফ ভিউ জানতে চেয়েছিলাম। আসলে তুই কী ভাবছিস সেটা জানাও তো আমার কর্তব্য। তুই মানুষকে কী কী ভাবে বিচার করিস।”
“কী বুঝলে তবে?”
“ও কী বুঝলো জানি না, তবে আমি বুঝলাম তুই একটা বড়ো দাঁতের গাধী।” দরজা দিয়ে বত্রিশটি দাঁত দেখাতে দেখাতে এলো নোমান। এমন অবলীলায় বলল যেন খুব দারুণ কিছু বলে ফেলেছে।
ওদের তিনজনের দৃষ্টি গিয়ে আটকালো সেই নোমানের দিকে। এর মাঝে টুইটুবানি ও প্রেমার হাসি কিছুটা দমে গেলো। কিন্তু জোহরা রইল পূর্বের মতোই হাসি হাসি মুখ করে।
নোমান এসে বসল সোফায় জোহরা ও প্রেমার ঠিক মধ্যিখানে। হাতের স্টিলের টিফিনবাক্সটা টুইটুবানির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নে তো টুইটুবানি, এটা ধর। আম্মা তোদের জন্য পুঁইশাকের বরা আর চিংড়ি ভাপা পাঠিয়েছে। বেশ বড়ো বড়ো চিংড়ি। বরাগুলো অনেক মুচমুচে।”
টুইটুবানির কপালে যথারীতি ভাঁজ রয়েছে প্রায় তিনটে। নোমানকে যে তার বিশেষ পছন্দ নয় তা ঐ ভাঁজ দেখে যে কোনো কানা লোকেও বুঝতে পারবে।
জোহরা চোখ রাঙাল। টুইটুবানি ধরছিলো না বলে কিছুটা জোর প্রয়োগ করে বলল,
“কী হলো নিয়ে রাখ। বাবার পছন্দ তো, বাবাকে রাতে চিংড়িটা দিস।”
“সাথে টেপিকেও দিস। টেপিরও কিন্তু বেশ পছন্দ। তোরা দু'জনে খেয়ে নিস না আবার।”
নোমানোর খোঁচানোতে রুষ্ট হলো টুইটুবানি। বাক্সটা প্রায় একপ্রকার কেঁড়ে নিতে নিতে বলল, “আমরা কি হাভাইত্যা? আমাগোরে আব্বা যথেষ্ট খাওয়ায়।”
“পেটুকদের যথেষ্ট কেন, এর বেশি কিছু খাওয়ালেও এদের ছোঁচামো যায় না। যাই হোক, প্রেমা যা তো চা করে নিয়ে আয়। সাথে পুঁই শাকের বরাগুলো নিয়ে আয়। বিকেলের নাস্তাটা হয়ে যাবে।”
টুইটুবানি ভারি বিস্মিত হলো। এই লোকটার এমন স্বভাবে সে বিরক্তও হলো বটে, “তাইলে আর কষ্ট কইরা আনছেন কেন? বাড়িতেই তো খাইতে পারতেন বরাগুলা!”
“বাড়িতে খাইলে তো আর নাম হইতো না তোদেরকে দিছি যে। তাই তোদের বাড়িতে নিয়ে আসছি। এখন আমি খাই বা টুনির বাপ নামতো তোদেরই হবে।”
নোমান হেসে ফেললো, হাসলো জোহরাও। টুইটুবানি টিফিনবাক্সটা নিয়ে হনহনিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরে। আর প্রেমা বসে রইল আগের মতোই।
“তুমি ভীষণ অদ্ভুত, নোমান ভাই! আমি এমন দেখি না কাউকে।”
“দেখবে কী করে? একটা কথা জানো তো, In this world, a star is born but once and when it dies, it dies only once। বিষয়টা হলো যে, পৃথিবীতে নক্ষত্র একবারই জন্মায় একবারই মরে। আমি একবারই জন্ম নিয়েছে এবং সেটা এইবারই। তাই তোমার আগে দেখার সুযোগ ছিলো না কিংবা আমার মতোই আরেকজনকে দেখার সুযোগ নেই।”
“বাবারে, তুমি আর নক্ষত্র? মাঝে মাঝে এত দার্শনিক কথাবার্তা বলো কেন?” প্রেমা প্রথম বাক্যটি কিছুটা ব্যঙ্গ করেই বলল। কিন্তু এতে নোমানের কিছু হলেতো! ওর মুখের হাসি চির স্থির।
ও টেলিভিশনের চ্যানেল বদলাতে বদলাতে বলল,
“বলতে হয় নয়ত তোরা বুঝবি কীভাবে আমি কতটা দার্শনিক। যা তৈরি হয়ে নে, তোদের নিয়ে বের হবো। ইমন শালা বলেছে ধানমন্ডি নিয়ে যেতে তোদের। ওখানে না-কি কীসের মেলা হচ্ছে।”
জোহরা ও প্রেমা একত্রে বিস্ময় নিয়ে বলল, “ধানমন্ডি?”
“আস্তে বল বাবারে, কানের পোঁকা নাড়িয়ে দিলি। যা টুইটুবানিকেও বল তৈরি হতে।”
“কিন্তু চা খাবে না? বললে যে চা বানাতে।”
“ঐ চা হজম হবে না আমার। যেভাবে করলি বরাগুলোর জন্য! তোরাই খা সেগুলো। আমি খেয়ে বাথরুমে যেতে চাই না। এই প্রেমার যা নজর। ওর সামনে কিছু খেলে আমার হজমই হয় না।”
নোমানোর এমন কথায় অন্যান্য সময় প্রেমা তুমুল ঝগড়া লেগে যেত। কিন্তু আজ হলো ব্যতিক্রম। ঘুরতে যাবে বলে মন এতই উৎফুল্ল হলো যে সে আর ঝগড়া করল না। আনন্দ মনে ছুটে গেলো রান্নাঘরে।
জোহরাও উঠল সাথে। প্রেমা চলে যেতেই নোমান টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বলল,
“আজ শাড়ি পরো, টেপি। বাহিরের আবহাওয়া বেশ ভালো।”
—————
শেখ বাড়ির ভেতরে থমথমে আবহাওয়া। রিমঝিমের আজ ছুটি হয়েছে হসপিটাল থেকে। ওদের গাড়ি চলে এসেছে। একটু আগেই হর্ণ পাওয়া গিয়েছিলো।
আজ বাড়িতে সকলেই উপস্থিত প্রায়। কেবল বাদ রয়েছে মেজবাহ্। রেণুকা বেগম উনার কথা রাখতেই আজ স্বয়ং ঝামেলা সামলাবেন বলেছেন। তাহমিনা বেগমের হাবভাব এখনো থমথমে। উনার এক কথা, এই বউ উনি বাড়িতে উঠাবেন না।
রিমঝিমের অসুস্থ শরীরটা ভেঙে আসছে। বাহুতে ধরে রেখেছে ওর স্বামী হিমেল। তার থেকে এক কদম পেছনেই ঢুকল রাহাত। তাহমিনা বেগমকে এতক্ষণ সকলে যে বোঝালেন কিছু না বলার জন্য সেটা তিনি মোটেও শুনলেন না। রিমঝিমকে দেখতেই এমন করে তেতে উঠলেন যেন ভস্ম করে দিবেন।
“খবরদার হিমেল, এই মেয়েকে তুমি এই বাড়িতে আনবা না। তুমি তোমার মায়ের উপর দিয়ে গিয়ে কাজ করেছো? এত নির্লজ্জ, বেয়ারা ছেলে হলে কী করে?”
মহিলা চিৎকার বাড়ির দেয়াল অব্দি যেন ধাক্কা খেলো। রিমঝিমের নত মুখটি নেমে গেলো আরও। থুতনি গিয়ে ঠেকল বুকে। লজ্জায় ও চোখ উঠিয়ে তাকাতে অব্দি পারছে না। পারবেও বা কী করে? রাতারাতি দেশে তাকে ও তার দেবরকে নিয়ে যেই রঙ্গলীলা চালানো হচ্ছে তা মোটেও কোনো মেয়ে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারার কথাও নয়। তারতো ইচ্ছে করছিলো গাড়ির নিচে নিজের মাথা দিতে। এত লজ্জা জীবনে সে কখনো পায়নি। এই সবই কপালের লিখন। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ কখনো সুখের সাম্রাজ্য সাজাতে পারে না বৈকি।
হিমেল আজ একটু ঠান্ডা রয়েছে। চোখ-মুখেও কিছুটা গাম্ভীর্যতা স্পষ্ট, “আম্মা, ও ঘরে যাক। শরীর অসুস্থ ওর।”
“তুই কি কাপুরুষ হলি? হ্যাঁ? এমন চরিত্রহীন মেয়েকে কীভাবে নিজে গিয়ে নিয়ে আসলি? তোর পুরুষত্বে বাঁধলো না? যে মেয়েকে নিয়ে দেশব্যাপী এমন আলোচনা হচ্ছে তাকে কীভাবে বাড়িতে আনলি? তোর পুরুষত্বে বাঁধল না? না-কি তুই আর বউ পেতিস না?”
তাহমিনা বেগম রীতিমতো রাগে কাঁপছেন। ফর্সা, ভরাট মুখটি লাল হয়ে গিয়েছে। তিনি যেন কোনো একটি অদৃশ্য কারণে রিমঝিমকে দেখতে পারতেন না। এখন আরও সোনায় সোহাগা হওয়ায় আরও সুযোগ হয়ে গিয়েছে অপছন্দের পাল্লা ভারি করার।
রেণুকা বেগম এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। ভেবে ছিলেন এই মহিলা হয়ত এক-দুই কথার পর ছেড়ে দিবেন কিন্তু উনার নিজের পুত্রের সম্বন্ধেও এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শোনার পর রেণুকা বেগম মোটেও আর চুপ থাকতে পারলেন না। অত্যধিক শান্ত স্বরে বললেন,
“হিমেল, যাও তুমি উপরে। তোমার মায়ের নতুন করে শিখতে হবে সন্তানদের সাথে ঠিক কোন ভাষায় কথা বলতে হবে।”
“রেণুকা, তুমি আমার বিরুদ্ধে আমার ছেলেকে উস্কাচ্ছো? তোমার ছেলেতো উচ্ছন্নেই গিয়েছে এখন আমার ছেলেদেরও সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করছ? আর আমার শাসনে ভেতরে তুমি ঢোকার কে?”
তাহমিনা বেগমের গলা ভীষণ উঁচুতে। তিনি পারছেন না তার বিরুদ্ধে যাওয়া প্রত্যেকের গলা চেপে ধরতে।
কবির শেখ বরাবরই পারিবারিক বিষয়ে শান্তিপূর্ণ মন্তব্য রাখেন। কিন্তু রেণুকা বেগমের উপর নিজের ভাবীকে চড়াও হতে দেখে আজ শান্তিপূর্ণ মন্তব্যে আর রইলেন না। বরং বেশি অসন্তুষ্ট নিয়ে উত্তর দিলেন,
“ভাবীজান, ওকে অধিকার দেওয়ার আপনি কে? ও এই বাড়ির বউ। ওকে অধিকার আমি দিয়েছি। ও বলবেই।”
কবির শেখকে কিছুটা সমীহ করে চলে তাহমিনা বেগম। এই বাড়িতে যে উনার মেঝ দেবরের ক্ষমতা বেশি তা উনি বেশ ভালো করেই জানেন। তাই কিছুটা দমে এলেন ঠিক তবে থামলেন না মোটেও,
“আমিতো আমার ছেলের সাথে কথা বলছিলাম। তোমার স্ত্রী না এলেই তো হয়!”
“কথা যখন পরিবারের মাঝে দাঁড়িয়ে হবে তখন আসতেই হবে আমাকে। রূপসা, তুমি রিমঝিমকে ভেতরে নিয়ে যাও।” রেণুকা কিছুটা আদেশই করলেন যেন।
তাহমিনা বেগম ফুঁসতে লাগলেন। রিমঝিমের দিকে আঙুল তাঁক করে বললেন, “এই মেয়েকে যদি আমি ছুঁড়ে না ফেলেছি তবে আমার নামও তাহমিনা বেগম নয়।”
রিমঝিমের চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। সেই ঝাপসা দৃষ্টিতেই সে শাশুড়ির অগ্নিঝরা রূপটি দেখল। মহিলা যে ওর সম্বন্ধে কতটুকু বিষ অন্তরে পুষে রেখেছেন তা ঐ দৃষ্টি দেখে আঁচ করতে পারবেন যে-কেউ।
রিমঝিমের শরীর কাঁপছে। দাঁড়িয়ে থাকা যেন তার জন্য কষ্টের হয়ে উঠেছে। সে খেয়াল করল হিমেলের হাতটি আর তার বাহুতে নেই। মায়ের ছেলে মায়ের ধমকে কখন যেন তাকে ছেড়ে দিয়েছে। রিমঝিমের বেশ তাচ্ছিল্য ভরা একটি হাসি এলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে স্বামীকে উদ্দেশ্য করে সেই হাসিটিও ছুঁড়ল। জীবনসঙ্গী যদি ভুল মানুষ হয় তবে একটি মেয়েকে যে বেঁচে থাকতেই জাহান্নাম দেখতে হয় তা নিজের সাথে না ঘটলে কখনোই বুঝতো কি সে?
অথচ এই সব বিষয় কস্মিনকালেও ও সহ্য করতো না। আগে কারো মুখে শুনলে ফুঁসে উঠত। কিন্তু আজকাল মুখ ফুটে নিজের জন্য অব্দি বলে না সে। বলতে পারে না। যে জীবন বেছে নিয়েছে সে নিজেই, সেই জীবন নিয়ে অভিযোগ করলে সাজে কি?
ঢুলতে ঢুলতে কখনো যেন মাথা ঘুরিয়ে উঠল রিমঝিমের সে ঠিক টেরও পেলো না। একদম কাঁত হয়ে পড়ে যেতে নিলো। শরীরে ওর এক ফোঁটা শক্তি নেই যে দাঁড়িয়ে থাকবে একটু।
রাহাত আচমকাই রিমঝিমকে হেলে পড়তে দেখে কোমড় চেপে ধরল। কাঁত হয়ে যাওয়া রিমঝিম ছিটকে পড়ল রাহাতের বুকে। শরীর ছেড়ে দিয়েছে তার। একটুও হুঁশ নেই আর।
রাহাত তার হাতের সমস্ত কিছু ফেলে দিয়ে কেবল আঁকড়ে নিলো রিমঝিমকে। ছুটে এলেন রূপসা,ও টুপু। অথচ হিমেলের চোখে উদ্রেক নেই। ভাইয়ের বুকে লেপ্টে থাকা অর্ধাঙ্গিনীর মুখটির দিকে সে তাকিয়ে রইল নির্বিকার হয়ে। ঐ মুখটি তো তার এক সময়কার প্রেমিকারও বটে, তবে আজ কেন মায়া হচ্ছে না? পূর্ণতার পর সত্যিই কি তবে প্রেম এতটাই মলিন হয়?
রাহাত নিজের বড়ো ভাইয়ের স্থির মুখটির তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যিই এই ছেলেটা কাপুরুষই বটে। স্ত্রীর পক্ষে যেই স্বামী থাকতে পারে না তাকে কাপুরুষ ছাড়া কী বলা যায়?
—————
মেজবাহ্'দের গাড়ি এসে থেমেছে কাওরান বাজারের একটি সংবাদ অফিসের সামনে। সারারাত উন্মাদের মতো ড্রাইভ করেছিলো সিকান্দার। চোখগুলো ওর লাল হয়েছে বেশ। মেজবাহ্ গাড়ির কাঁচ লাগিয়ে নিয়েছিলো এর আগেই। সাংবাদিকদের অফিসের সামনে কাঁচ নামানো থাকলেই সমস্যা। এদের নতুন সংবাদের শিরোনাম হয়ে যাবে।
“ভাই, পোলাপানদের তো আনলেন না সাথে। এই সিনিয়র সাংবাদিকটা যদি না আসতে চায়? দুই-চারটা চড় দিবো কি?”
মেজবাহ্ সিটে হেলান দেওয়া, চোখ বুজে আছে নীরবে। কেবল আদেশ জারি করল প্রতিত্তোরে, “চড়, মারামারি ছাড়াও কথা হয়। তুই কেবল যাবি, কানে কানে বলবি ওর দ্বিতীয় বউ এসেছে নিচে। এনে কেবল পেছনের সিটে বসিয়ে দিবি।”
“দ্বিতীয় বউয়ের কথাটা যে মকবুল ভাই বললেন, এটা আদতেও সঠিক?”
“মকবুলের কাছে কোনো ভুল খবর থাকে না। প্রতিটা সংবাদ অফিসের সিনিয়র সাংবাদিকদের গোপন খবর ও ভালো রাখে।”
“এই কাজের জগতটাতেও তাহলে খারাপ-ভালো রয়েছে! আমি ভাবলাম কেবল রাজনীতিতেই আছে।”
“রাজনীতির চাবিইতো থাকে এদের কাছে। এই যে আমার পেছনে পড়েছে তোর কি মনে হয় এরা বিপক্ষের দল থেকে কম অর্থ নিচ্ছে? আমার দল থেকেও সরাতে চাইবে। এরজন্য যা করণীয় করবে এরা।”
“আচ্ছা ভাই টেনেহিঁচড়ে আনছি। আপনি খালি অপেক্ষা করেন।”
“টেনেহিঁচড়ে না। সাধারণ ভাবে, ভালোবেসে।”
“ভাই, আমি যারে-তারে ভালোবাসতে পারি না। কেবল আপনারেই ভালোবেসে সব করতে পারব। অন্য কাউকে না।” সিকান্দারের কণ্ঠে ঠাট্টার পূর্ণ আভাস। মেজবাহ্ চোখ গরম করল। হেলান ছেড়ে উঠতে নিলেই সিকান্দার ভোঁ দৌড় দিলো। অন্তত সে এই লোকের হাতে মার খেতে চায় না।
মেজবাহ্ ধীরে ড্রাইভিং সিটে সরে বসল। সিকান্দারকে এই দায়িত্ব সে দিতে পারবে না আপাতত। বাকিটুকু করবে নিজেই।
মিনিট পাঁচ পেরুতেই সিকান্দারকে বের হতে দেখা গেলো। বেশ লোকটার কাঁধে হাত রেখেই বের হচ্ছে। এই চ্যানেলের সিনিয়র সহকারী জামাল মোস্তফা। বয়স কমপক্ষে পঞ্চাশ তো হবেই। ভুঁড়ি যেন বেরিয়ে যাচ্ছে পেট ফুঁড়ে।
মেজবাহ্ গাড়ির কাঁচে দেখল ওদের কাছে আসা। সে ঘুরে তাকালো না মোটেও। লোকটাকে বেশ হন্তদন্ত দেখাচ্ছে। ভয়ে ঘামছে অনবরত।
সিকান্দার আলগোছে লোকটাকে পেছনের সিটে বসিয়ে উঠে এসে বসল সামনের সিটে। মেজবাহ্ জানালা গুলোসহ গাড়ির দরজা লক করে দিলো। লোকটা তখনও বুঝতে পারল না গাড়িতে কে উপস্থিত। বরং মুখস্থের মতো বলল,
“কোথায় আমাে ওয়াইফ? কোথায়?”
“আছে, বাড়িতেই। তবে কখন সংবাদপত্রের শিরোনামে আসবেন বোঝা যাচ্ছে না।”
মেজবাহ্'র গম্ভীর কণ্ঠ লোকটার শরীরে যেন বিদ্যুৎ বেগে ছুটল। চমকে উঠল লোকটা, “আপনি কে? আপনার কণ্ঠটি বড়ো চেনা চেনা।”
মেজবাহ্ এবার ঘাড় ঘোরালো। চোখগুলো জামাল মোস্তফার চোখে নিবদ্ধ করে কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলল, “চেনারই কথা। যাকে নিয়ে সংবাদ ছাপেন তাকে চিনবেন না?”
লোকটা ভূত দেখার মতো চমকালেন। ভড়কে গেলেন বেশ,
“তুমি, তুমি মেজবাহ্ শেখ না?”
“জি। বেশ চিনেছেন। তা মিস্টার জামাল, আমি কি জানতে পারি এমন সংবাদ ছাপানোর নির্দেশ দেওয়ার কারণ কী?”
জামাল মোস্তফা হতবিহ্বল হলেন। পাশের দরজাটা ঠেললেন বের হয়ে যাওয়ার জন্য। মেজবাহ্ কেনো জোড়াজুড়ি করল না। গাড়ি স্টার্ট দিলো বেশ আয়েশ করে,
“ঠিক আছে, চলেন তবে। আর কত দুই বিয়ের চাপ সামলাবেন। আপনাকে উপরের টিকিট কেটে দিই।”
লোকটা বুঝতে পারল না মেজবাহ্'র কথা কেবল চ্যাঁচালেন, “গাড়ি থামান। আমাকে মিথ্যে বলে এখানে এনেছেন? এটা মোটেও উচিত কাজ নয়।”
“আপনিও তো মিথ্যা ছাপিয়েছেন সংবাদে। আমি কি কিছু বলেছি?” মেজবাহ্'র গাড়ি তখন ফুল স্প্রিডে মোড় ঘুরেছে। কিন্তু আচমকা লুকিং গ্লাসে ও ছিপছিপে একটি পরিচিত ছেলের মুখ। মেজবাহ্ ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটিকে দেখে নিলো একবার। এই ছেলের গোষ্ঠীর খোঁজও নিতে হবে। এত বড়ো সাহস ছেলেটার!
·
·
·
চলবে……………………………………………………