চারদিনের মতো খাগড়াছড়িতে এসেছে। আজ শেষদিন। শাওলিন গোসল শেষে ছোটো ব্যাগটা গুছাচ্ছে হঠাৎ রাবেয়া ডাকল,
- ভাবী?
- কে? রাবেয়া! ভেতরে আয়।
রাবেয়া ভেতরে ঢুকে মুখ নিচু করে বলল,
- ভাবী, আফনের কাছে ওই জিনিস আছে? রোকেয়াবু আনে নাই। আইজ ফরথম দিন।
শাওলিন 'জিনিসটা' বুঝে হতাশ মুখে বলল,
- তোর ব্যাগে একটা নেই?
- শেষ হইছিল ভাবী। এহন বাইরে ক্যামনে যাই?বাইত কেউ নাই অখন।
- আচ্ছা, ফার্মেসী কতদূর?
- ভালা দূর। মসজিদ গলির ওইদিকি। যাইতে আধ ঘণ্টা লাগব ভাবী।
- শোন, আমি এনে দিব। তুই বাইরে বের হবি না।
- ভাইজান যদি হোনে? আফনেরে তো একলা যাইতে নিষেদ করছে।
- সঙ্গে কাকে নেব? আচ্ছা গার্ডদের একজনকে নিয়ে যাচ্ছি। তুই ঘরে থাক।
শাওলিন একটা খোপা করে কাঁটা গেঁথে পার্সব্যাগ নিয়ে বের হলো। যাবার আগে সুতির নরম কাপড় ভাঁজ করে রাবেয়াকে দিল। বাইরে সূর্যের তেজ। চোখে সরাসরি লাগছে। ডানহাত চোখের ওপর তুলে শাওলিন গেটের কাছে গার্ডদের খুঁজে পেল না। কী মসিবত! এখন কী বিরতির সময়? দুজন গার্ড একসঙ্গে হাওয়া? মসজিদ গলি প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ। দুদিকে ঘন বন-জঙ্গল, মাথার ওপর উঁচু গাছ ছাওয়া। কিছু দূর সামনে ছোট্ট এক জটলা দেখতে পেল শাওলিন। ভ্রু কুঁচকে দেখল একটা অল্পবয়সী মেয়ে একদল যুবকের বৃত্তে। মেয়েটার ওড়না চারজনের একজন হাতে প্যাঁচাচ্ছে। অশ্লীল খিস্তি, বাজে মন্তব্য শুনতে পাচ্ছে শাওলিন। দুই ভ্রু রাগে খিঁচিয়ে প্রচণ্ড এক হুংকার দিল,
- কী হচ্ছে এদিকে? কে আপনারা? মেয়েটাকে আঁটকে রেখেছেন কেন?
যুবকদের ভেতর নেতা গোছের যুবক শাওলিনকে দেখতে পেল। খেপাটে গলায় আচমকা সুর বদল করে বলল,
- ওম্মা! আফনে কিডা? এইদিকি কী?
শাওলিন চোয়াল খিঁচিয়ে উঠল। প্রত্যেকের পরনে শার্ট, প্যান্ট। কারো হাতে, গলায় চেইন। ঠোঁট কালো। চোখ রক্তজবার মতো লাল। শাওলিন মেয়েটাকে কাঁদো কাঁদো দেখে প্রত্যুত্তরে বলল,
- ওড়না ফেরত দিন। মানুষের ঘরে জন্ম হলে অমানুষের পরিচয় দেবেন না।
হইহই করে উঠল একজন,
- এ শালী? থ্রেড মারাস? আমরা কারা চিনোস?
- মুখ সাবধানে। সাহস থাকলে পরিচয়টা দেবেন। শোনা যাক, মুরুব্বির কী নাম।
একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল যুবকরা। এই প্রথম এমন বিরল ঘটনার সম্মুখীন হলো। কালো শার্ট পরা একজন বলল,
- আফনেরে কুনদিন দেহি নাই। কিডা আফনে? কার বাড়িত উঠছেন?
- পরিচয় কী আপনাদের দেয়ার কথা না?
লাল-কালো চেকশার্ট পরা একজন বলল,
- আইজকা ফরথম ঝামেলা করছেন, নতুন মানুষ। আইজ আফনেরে মাফ দিলাম।
- আপনার থেকে মাফ চাইল কে? আমি আপনাদের চিনি না, আপনিও না। এখন মেয়েটার পথ ছাড়ুন।
মেয়েটা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
- ওরা মাইরা ফেলিব আফা! আফনে এইদিকথি যান গা!
শাওলিন মেয়েটার থেকে চোখ ফিরিয়ে দুই সেকেণ্ড ভাবল। এরপর নিচে ঝুঁকে একটা ইট তুলে বলল,
- ব্যবহার করতে চাই না। বাধ্যও করবেন না। সরে দাঁড়ান যে যেখানে আছেন।
চার যুবকের একজন দাঁত পিষল। হাত মুঠো করতেই শাওলিন দুদিকে মাথা নেড়ে সাবধান করল,
- ওই ভুল করবেন না। ওকে অবলা পেয়েছেন আমি কিন্তু অবলা না।
যুবক ঠোঁটে ঠোঁট চেপে এগোতে নিলে পেছন থেকে নেতার বাঁধা পেলে থামল। নেতা তার কাঁধে হাত রেখে ইশারা করছে। সেকেণ্ডের ভেতর বৃত্ত ভেঙে একপাশ ফাঁকা হতে লাগল। শাওলিন মেয়েটার হাত ধরে হেঁচকা টানে বাইরে বের করল। যুবকগুলো অনড়। চোখ দিয়েই যেন গিলে খাবে। শাওলিন কী করবে চুপ করে দেখল। শাওলিন ওদের দিকে ডানহাত বাড়াল,
- ওর ওড়নাটা দিন। ওই জিনিস আপনাদের কোনো কাজের না।
চতুর্থ জনের হাতে বাটিকের রঙচটা লাল ওড়নাটা। নেতা ইশারায় ওড়নাটা দিতে বলল। যুবক ক্ষোভে গরগর করে বলল,
- ভাই, আফনে ছাইড়ে দিতেছেন? হাশেম ভাইয়ের ছেলেরা এই ছুঁড়ির কাছে ঠকব?
- তোরে হালারপো কে কইছে ঠকতে? যে বাল বুঝস না ওই বাল ফালাস ক্যা? ওড়নাডা দে হালা।
চরম অপমানিত হয়ে যুবক ওড়নাটা ছুঁড়ে দিল মাটিতে। শাওলিন তা কুড়িয়ে নিয়ে মেয়েটার গা ঢেকে দিয়ে বলল,
- ব্যাগ, টাকা কিছু নিয়েছে? তাড়াতাড়ি বলো!
মেয়েটা শঙ্কিত চোখে চারজনের দিকে তাকাল। শাওলিন কাঁধ ধরে মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরাল,
- শোনো, ভয় পাবে না। আমি তোমাকে পৌঁছে দিব। বলো কিছু চুরি গিয়েছে?
- হ, সইন্নের দুল।
দুম করে মেয়েটার পায়ের কাছে একজোড়া স্বর্ণের দুল ছুঁড়ে দিল কেউ। শাওলিন তুলে নিয়ে মেয়েটার হাতে গুঁজে দিল। মেয়েটার নাম ঠিকানা শুনে দুজন হাঁটা দিল। হঠাৎ থামতে শাওলিনকে। কেউ পেছন থেকে চেকশার্ট পরা বলল,
- আইজ ছাড়ছি, কাইল এইয়া দেইখে লইয়াম। তুমি কোন চ্যাটের বা- দেইখে ছাড়াম।
শাওলিন ঘাড়টা ঘুরিয়ে পিছু তাকাল। চোখে চোখ গেঁথে বলল,
- আরেকবার যদি ঝামেলা করতে দেখি, তখন ইট দিয়ে না, জুতা দিয়ে মারব।
হাতের ইটটা ছুঁড়ে দিল শাওলিন। স্বর্ণের দুলজোড়ার মতোই ছেলেগুলোর পায়ের কাছে ওটা পড়ল। লম্বা আঁচলে পিঠ ঢেকে হাঁটা দিল সামনে। পেছন থেকে নেতা ছেলেটা কণ্ঠস্বর তুঙ্গে তুলে বলল,
- আফনে ফরিচয় করি গেলেন না যে!
শাওলিন একমুহুর্ত থেমে ঘাড় বরাবর মুখটা রাখল,
- আমার নাম শাওলিন। আমাকে চেনার কথা না। বনবিভাগের বড়ো কর্তাকে চেনেন? আমি উনার স্ত্রী।
এ কথার পর সামনে মুখ ফেরাল শাওলিন। মেয়েটাকে নিয়ে অগ্রসর হলো। মেয়েটার চোখগুলো যে বিস্ফোরিত, ঠোঁট দুটো যে হা করে আছে সেদিকে না চেয়েও আঁচ করে শাওলিন। পেছনে যুবকের দল স্তম্ভিতের মতো তাকিয়ে ছিল। কেউ একজন সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
- ভাই, বড়ো কর্তা বলছে না! আফনে চিনছেন?
অন্যজন শঙ্কিত স্বরে বলল,
- হে বড়ো ছারের বউ?
দূরবর্তী হলে শব্দগুলো আর শোনা গেল না। শাওলিন মেয়েটাকে বাড়ি পৌঁছে দিলে চোখের সামনে জীর্ণ পরিবেশ দেখতে পেল। বাঁশ, পাটের শোলা দিয়ে তৈরি পুরোনো ভিটেবাড়ি। দুটো খুপরির মতো ছোটো ছোটো ঘর। কাঁচা মেঝে। মেঝেতে পাতা চটের মাদুরে মেয়েটার বাবা ঘুমাচ্ছে। হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা নেই। শতছিন্ন সাদা গেঞ্জিতে তামাটে রঙ এসেছে। মেয়েটা অশ্রু মুছে বাপের পাশে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করে উঠে এল। পাশের ঘরের পর্দা তুলে শাওলিনকে বলল,
- এইদিকি আসেন, আফুমণি। আব্বা ঘুমায়, জাগান যাইবে না।
শাওলিন নিঃশব্দে পাশের ঘরে ঢুকলে চোখগুলো টলমল করতে চাইল। নিজেকে রুখলো ও। এভাবে কেন আবেগাক্রান্ত হচ্ছ শাওলিন? থামাও নিজেকে! মেয়েটার ঘরে আসবাব নেই। বাঁশের দেয়ালে দড়ি টাঙিয়ে কাপড় রাখা। এককোণে মাটির কলস। মেঝেতে ছেঁড়া পাটি বিছিয়ে তেলতেলে এক ময়লা বালিশে শয্যা পাতা। মেয়েটা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল,
- আফনে বড়ো কত্তার বউ জাইনে সুখ হইচ্ছে। আফুমণি এইদিকে বসেন। ময়লা নাই, ঝেড়ে দিছি।
শাওলিন ওর পেতে দেয়া কাঠের পিড়িতে বসে দুহাতে হাঁটু জড়িয়ে বলল,
- শম্পা, তোমরা বড়ো কর্তা বলো কেন? উনি তো জেলা প্রশাসনের কেউ না। বনবিভাগের লোক।
শম্পা হাসি দিয়ে এককোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো ভাঁজ করে বলল,
- জিলা অফিসার উনাক মান্যি করে চলেন আফুমণি, আফনি কী কথা যে কইচ্ছেন! বড়ো কত্তার বলিয়েন, আফনাক সকলে চিনিব।
শাওলিন হাঁটুর ওপর নিজের থুতনি ঠেকিয়ে বলল,
- এতো চেনার কারণ?
- আফনে জানেন না আফুমণি?
শাওলিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
- কী জানব?
- বড়ো কত্তা কী কী কাজ করিছে জানেন না?
- না।
- উনি একটা স্কুল দিছে আফুমণি। মহিলাদের জইন্যে সিলাইখানা কইচ্ছে। ঢাকা থিহি মাজে মাজে বড়ো ডাক্তার আসি চিকিচ্ছা দেয়।
শাওলিন কোনো কথা বলল না। শুধু ঠেকানো থুতনিটা হাঁটু থেকে উঠে গেল। শম্পা বলে চলল একমনে,
- আমরার ছুডু বইন তিনটে। একটাক কলেজ দিছি এইবার। স্কুলে আছে দুইটে। এরা পড়ানেখা করে। আব্বার অসুক। ডাক্তার কইছে খাটনি করা যাইবে না। বড়ো কত্তা সব শুনি সিলাইখানায় যাতি কছে। দুই বচছর হতি চইললো।
শাওলিন মাটিতে চোখ রেখে কিছুক্ষণ ভাবনা সেরে বলল,
- সেলাইখানাটা কোনদিকে?
ডেসপেন্সারির দোকান থেকে দু প্যাকেট নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটছে শাওলিন। শম্পার কাছ থেকে সেলাই কারখানার ঠিকানা শুনেছে। বেশি দূর মনে হয়নি ওর। তবে এখন ফিরতি পথে বেশ সাবধান শাওলিন। খাগড়াছড়ির সেই হামলার পর শাওলিন আত্মরক্ষার্থে ছুরি রাখে। ছুরিটা ছোট ও টিপ ফলা। কিন্তু কোমরের খাপে এমনভাবে রাখতে হয় যেখানে ওর কাটা জায়গাটা আবার কাঁচা হচ্ছে। শোয়েবের বাংলোটা একটু উঁচুতে। গেটে তখনো গার্ডের দেখা পেল না শাওলিন। ব্যাপার কী? গার্ডদের একজনও ফেরেনি? এমন তো উনারা করেন না! সন্দেহের চোখে বাহির বাড়িতে গেল শাওলিন। রাবেয়ার হাতে প্যাকেটটা দিয়ে অরক্ষিত গেটটা দেখতে দেখতে বাংলোর ভেতরে ঢুকে গেল। হঠাৎ টেলিফোনের শব্দে নীরবতা ভঙ্গ হলো। শাওলিন অজানা শঙ্কায় ধড়ফড়িয়ে ফোনটা তুলে নেয় কানে। ওপাশ থেকে অচেনা স্বরে কেউ বলল,
- হ্যালো। আমি সুনীল দত্ত বলছি। আমি কী মিসেস শেহজানা আলমের সঙ্গে কথা বলছি?
- জ্বি, আমি শেহজানা বলছি। কিন্তু আপনি, আপনি কী মেজর দত্ত বলছিলেন?
- আপনি দেখছি চিনেন। আপনি কী বলতে পারবেন শোয়েব কোথায়?
- উনি ডিপার্টমেন্টে থাকবেন।
- আপনি একটু আগে কোনো প্রবলেম ফেস করেছেন?
- কেমন প্রবলেম?
শাওলিন অবাক হলো। এতো দ্রুত ঘটনাটা পাঁচকান হয়েছে? সুনীল দত্ত গম্ভীর সুরে বলল,
- দেখুন ম্যাডাম, রাস্তায় কী হয়েছে জানি না। কিন্তু খবর পেলাম হাশেম ভূঁইয়ার ছেলেপিলেদের সাথে ঝামেলা হয়েছে। আপনি এখন কোথায়?
শাওলিনের মনে হলো বাজে একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছে। হাশেম ভূঁইয়াকে চেনে না, কিন্তু ফেরেশতা যে নয় তা যুবকদের কর্মকাণ্ড থেকে পরিষ্কার। শাওলিন খুব ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ঘটনাটা বলে অবশেষে জানাল,
- দেখুন, আমি জানতাম না এখানেও যে পলিটিক্যাল কানেকশন আছে। আমার মনে হয়, ওরা মেয়েটাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছে। মেয়েটা মানেনি। আজ ফাঁকা রাস্তা পেয়ে খারাপ কিছুই করতে যাচ্ছিল।
- শোয়েব জানলে ঝামেলা হতে পারে ম্যাডাম। এমনিতেও এসব শুনতে পারে না। তার ওপর আপনি জড়িত, এখন কী করবে বোঝা মুশকিল।
- লোকটা কে? আর উনার সঙ্গে কেমন ঝামেলা?
- ম্যাডাম, ফোনে শর্টকাট বলি। ঝামেলার শুরু ফরেস্ট ডেপ্টের এক কর্মী নিয়ে। সে হাশেম ভূঁইয়ার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিল, সেটা সঠিক সময়ে পরিশোধ করতে পারেনি। এ নিয়েই বিরোধ। টাকা না পাওয়ায় ওই কর্মীর স্ত্রী, বোনকে তুলে আনার হুমকি দেয়া হয়েছিল। এটা শোয়েবের কানে যায়। ঋণ যা ছিল শোয়েব মিটায়। কিন্তু হাশেম ভূঁইয়া ব্যাপারটা নিতে পারেনি।
- আমি হাশেম ভূঁইয়ার নাম আজই প্রথম শুনলাম। জানতাম না উনার সঙ্গে ভেতরে ভেতরে ঝামেলা হয়েছিল। এখন কী করতে হবে? আমি কী খবরটা উনাকে দেব?
- আপাতত অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি কী করা যায়। আপনি বাড়িতেই তো?
- জ্বী।
- সাবধানে থাকুন। বাড়িতে নিশ্চয়ই গার্ডরা নেই? বাইরে বেরোবেন না।
শাওলিন আর কিছু বলার মতো অবস্থা দেখল না। মনে হলো, চরম একটা বিপদ আকাশে মেঘ হয়ে ঝুলছে। গার্ডরা নেই, কিন্তু এই খবর সুনীল দত্তের কাছে! লাইন কেটে গেল। শাওলিন টেলিফোন নামিয়ে সদর দরজা আঁটকাল। রাবেয়াকে বাংলোয় ডেকে আনতে ভুলল না। বাড়িতে এখন কেউ নেই। নিরাপত্তা অরক্ষিত।
—————
বন কার্যালয় থেকে বের হয়েছে শোয়েব। অফ হোয়াইট ল্যাণ্ড ক্রুজারের দরজা খুলে ড্রাইভার দাঁড়িয়ে আছে। ফোনে কথা বলতে বলতে শোয়েব গাড়িতে চড়বে এমন সময় কেউ ডেকে উঠল,
- স্যার! দাঁড়ান স্যার! খবর আসিছে!
শোয়েব থমকে গেল। কান থেকে ফোন নামিয়ে পিছু তাকাল,
- কী হয়েছে নাঈম?
- স্যার, আফনিরে সুনীল স্যার কল দিচ্ছে। আফনিরে পাচ্ছে না।
- ল্যাণ্ডলাইন নাম্বার?
- জ্বী স্যার। আফনি কতা বলেন। জরুরি কী কতা আছে।
- দেখছি।
শোয়েব গাড়িতে উঠল। ড্রাইভার দরজা আঁটকে স্টিয়ারিং হুইলের সামনে বসলো। ফ্রন্ট মিররে শোয়েবের দুই ভ্রু কুঁচকাতে, চেহারায় কাঠিন্যের প্রকাশ দেখছে মোশাররফ। শোয়েব কানে ফোন চেপে বলল,
- হ্যাঁ, সুনীল। আপনি কল দিয়েছিলেন?
সুনীল দত্ত সংক্ষেপে বলল সব। শোয়েব নিষ্পলক চোখে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
- আপনি কী করতে বলেন?
সুনীল সাবধানে কথা নির্বাচন করল,
- শোয়েব, ঝামেলা রফা দাও। সামনে জাতীয় নির্বাচন। এই মুহুর্তে পার্বত্যাঞ্চলের পরিস্থিতি ভালো নয়।
- জাতীয় নির্বাচন আমার খাতায় কবে ঢুকল? আমার বাড়ির গার্ডদের পিটিয়েছে, সুনীল। আপনি আমাকে কী বলছেন, বুঝতে পারছেন?
- শোয়েব, আর ঝামেলা কোরো না ভাই। এমনিতেই যে কাজে এসেছ, তা নিয়ে উপরমহলে যুদ্ধ চলছে।
- আমি কারো গোলাম না, মেজর। উপরমহল আপনার ফিল্ড, আমার কখনোই ছিল না।
শোয়েব কল কেটে দিল। ফোনটা পাশের সিটে ছুঁড়ে দিল ক্ষোভে। মোশাররফ ফ্রন্ট মিরর থেকে শোয়েবের রক্তবর্ণ গাল, পুরুষালি ঠোঁটের ক্ষিপ্ত কুঞ্চন দেখতে পেল। মোশাররফ একটু সাবধানী কণ্ঠে বলল,
- স্যার, গাড়ি কী হাশেম ভূঁইয়ার বাড়িতে ঘুরাব?
শোয়েব জানালা দিয়ে বিকেলের তেজহীন সূর্য দেখছিল।
- গাড়ি কী হাশেম ভূঁইয়ার মেয়েকে চেনে?
- চেনে তো, স্যার।
- ওই মেয়ের শ্বশুরবাড়িটা ঘুরাও। লাঞ্চের মেন্যুটা চেক করা দরকার।
মুচকি হাসি দিল মোশাররফ। ইঙ্গিত বুঝতে দেরি হলো না। গাড়ি ইউটার্ণ নিয়ে সোজা অগ্রসর হলো পার্বত্যাঞ্চলের ভূমিদস্যু কুখ্যাত নেতা হাশেম ভূঁইয়ার একমাত্র মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে। গাড়ি থামল হাশেম ভূঁইয়ার মেয়ে জামাই, কাউন্সিলর আশেক কামালের বাড়ির গেটে। আশেক কামাল ডাইনিং রুমে খেতে বসেছে। দারোয়ান এসে খবরটা দিল। দুম করে খাওয়া ছেড়ে উঠল আশেক। হাত প্লেটে ধুয়ে বাইরে গেল ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের আগমনে। শোয়েব গাড়ির গায়ে পিঠ দিয়ে দুহাত পকেটে গুঁজে তাকিয়ে আছে। চোখে রুক্ষ দৃষ্টি, বাতাসে কপালের ওপর চুলগুলো ঝাপটা দিচ্ছে। আশেক কামাল হাসিমুখে বেরিয়ে বলল,
- গরীবের বাড়িটা ধণ্য করলেন, স্যার। অবশেষে আসলেন গো! আসেন আসেন, ভেতরে আসেন।
শোয়েব পকেট থেকে হাত বের করে ঘড়ি দেখল। আশেকের হাসিমাখা মুখে একমুহুর্ত স্থির থেকে বলল,
- আপনার স্ত্রী ভেতরে?
আশেকের চেহারা থেকে হাসির মুখোশ খসে পড়ল। ভদ্রলোক দুর্বোধ্য দৃষ্টিতে বলল,
- তারে কেন দরকার?
শোয়েবের নীল চোখগুলো ছুরির মতো চকচক করছে। আশেক কামাল ওই প্রখর চোখে তাকিয়ে থাকতে পারলেন না। স্ত্রীর নাম ধরে হাঁক দিলেন,
- মুনিয়া? বাইরে আও তো মনা।
একটু পর শাড়ি পরা এক নারী পায়ে নূপুরের ঝংকার তুলে এল। ফরসা দেহে কালো শাড়ি। ছোটো হাতার ব্লাউজে পেট ও কোমর অনাবৃত। দুহাতে সোনার চুড়ি পরে মাথায় ঘোমটা টেনে শোয়েবের দিকে সলাজ চোখদুটো একপলক তুলে, সাথে সাথে নত করল। আশেক বিকেলের ঠাণ্ডা পরিবেশেও দরদর করে ঘামছেন। শোয়েব নিজের কঠোর বুকের ওপর দুহাত ভাঁজ করল,
- কেমন আছেন?
মুনিয়া কিশোরীর ন্যায় বলল,
- আপনি এদিকে আসিছেন কেন? আব্বা কিছু করিছে?
শোয়েব কোনো কথা বলল না। আড়চোখে আশেক কামালের ভীত মুখ, সামনে মুনিয়ার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারা দেখতে লাগল। কেন এসেছে এবার জানাবে।
হাশেম ভূঁইয়া খালি গায়ে একটা সাদা লুঙ্গি পরে বারান্দায় বসে আছেন। দুহাতে খবরের কাগজ, হাই তুলে পড়ছেন খবর। তালপাখায় বাতাস করছে এক ভৃত্য। বিছানায় অল্প বয়সী এক মেয়ে আপত্তিকর অবস্থায় ঘুমোচ্ছে। ভৃত্যের দিকে ইশারা করলেন হাশেম,
- এই ছুড়ি ডর খায়। শক্ত দেইখে আনিস।
ভৃত্য যুবক বিশ্রী হেসে বলল,
- আমি আইজ চাইছিলাম, হুজুর। দেবেন? আমার এইটাক ফছন্দ।
- লইয়ে যাইস, বাপ। অখন বাতাস কর। ম্যালা গরম।
ভৃত্য খুশি হয়ে হাতপাখার বেগ বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ বাটন ফোনে ভ্রুম ভ্রুম শব্দ হলে হাশেম ভূঁইয়া খবরের কাগজ রেখে ফোনটা তুলে নেন। মেয়ের কল দেখে মনভুলোনো হাসিতে বললেন,
- ও মা, মাগো, আছ কেমন?
- আব্বা আফনি কী মানুষ ভালা হইতেন না?
- কেন আম্মা? কী করিছি?
- আব্বা, আব্বা আইজ উনি আসিছিলেন। আপনার জামাইর সামনে আপনাক শাষিয়ে গেছেন। আপনি যদি না শুধরান উনি আপনাক কইলজে ছিঁড়ে ফেলিব।
হাশেম ভূঁইয়া পাখা থামাতে হাত তোলেন। বেতের সোফা ছেড়ে টানটান দাঁড়িয়ে যান। ভৃত্যকে যেতে বলে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলেন,
- আম্মা, আমি ঢাকাত। আইজ বাড়িত নাই চারদিন। কারা কী করিছে আম্মা?
- আব্বা, মুরাদ ভাইয়ের নাম নিয়ি শাষাই গেছে। আপনি মুরাদ ভাইদের না করি দেন আব্বা। আমি শান্তি চাই।
- মুরাদ?
- মুরাদ ভাই সেলাইখানার এক ছুড়ি ধরতে গেছিল। উনার বউ ওই রাস্তা দিয়ে যাতি সময় ভাইরা ঝামেলা করিছে। আব্বা, মুরাদ ভাইদের সরি যাতি বলেন।
- কইয়ে দিমু, আম্মা। তুমি কান্না কইরো না। আব্বা রাখি?
—————
সন্ধ্যার দিকে সদর দরজায় দুম দুম আওয়াজ পড়ল। শাওলিন চমকে উঠে বিছানা থেকে নামল। জানালা বন্ধ বলে আজ বাইরের কিছু দেখেনি ও। উঠে শাড়িটা ঠিক করে নিচতলায় গেল। দরজায় করাঘাতের শব্দ আরো বেড়েছে। শাওলিন একসেকেণ্ড থেমে দৃঢ় গলায় বলল,
- কে?
একমুহুর্ত পর কাঙ্ক্ষিত জবাব আসে,
- দরজা খোলো, শাওলিন। আমি। ফারশাদ।
ত্রস্ত হাতে দরজা খুলে দেয় শাওলিন। গাঢ় আঁধারে শোয়েবের ক্লান্ত মুখ, ঘামে ভেজা শরীর, হাতে ঝুলোনো স্যূট দেখে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে। শোয়েবের বুকটার ভেতর নিজেকে জড়ালো শাওলিন। আজও ঘর্মাক্ত শোয়েবের গায়ে মিশতে দেরি করল না। শোয়েব ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু সময় দিল। শাওলিন নিজ থেকে ছেড়ে দিলে শোয়েব নির্ভার সুরে বলল,
- না খেয়ে বসে আছ? মুখ শুকিয়ে আছে।
- অপেক্ষা করতে তো ক্ষতি নেই।
- সন্ধ্যা এখন। আমার জন্য অপেক্ষা করতে নিষেধ করেছি।
শাওলিন হাত থেকে স্যূট নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল। শোয়েব পেছন পেছন আঁচল দিয়ে সিক্ত মাথা-মুখ মুছে নিচ্ছে। শোয়েব উপরে উঠলে শাওলিন স্যূটে আঙুল বুলিয়ে বলল,
- আপনাকে কেউ কিছু বলেছে?
- কী বলবে?
- কেউ কল করেনি?
- না।
শাওলিন আশ্চর্য হয়ে পা থামাল। শোয়েব ওর পাশে দাঁড়িয়েছে। শাওলিন চোখ তুলে বলল,
- মিথ্যা বলছেন কেন? সুনীল দত্ত কল করেনি? বলেনি কী হয়েছে?
শোয়েব ওর চোখে চোখ রেখে হাসি দিল। দুহাত বাড়িয়ে তুলে নিল কোলে। বাকি পথ একাই হাঁটল ঘরমুখো। শাওলিন মৌণতা পালন করল। চেয়ে দেখছে শোয়েবের ধারালো চোয়াল, প্রতিদিন শেভ করা গাল, পুরুষ্টু দুই ঠোঁট। ঘরে ঢুকে আলমারির সামনে নামায় ওকে। শাওলিন পাক্কা গৃহিনীর মতো পোশাক বের করে বাথরুমে ঝুলিয়ে মোবাইল দুটোকে চার্জে দিল। ডাইনিং রুমের বদলে আজও খাবার নিয়ে অফিস ঘরে বসতে হলো। শোয়েব একটু একটু বোঝাতে লাগল সব। শাওলিন পাশে বসে বুঝল। কিছু জিনিস বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করল। তবু বুঝতে না পেরে বারবার শুধাল। শোয়েব বিরক্ত হলো না। শাওলিন কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজি জানে না। কিন্তু মন বলছে, জানতে ও শিখতে বেশি সময় নেবে না মেয়েটা। খাবারের পর নিচতলার একটা ঘরে বিশ্রামের জন্য শুলো দুজন। বিছানা ঘেঁষে ছোট্ট বুকশেলফ। সাদা তাকে হরেক বই। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, উর্দু, বাংলা। শোয়েব বালিশে মাথা রেখে ডানে তাকিয়ে বলল,
- বই পড়ে শোনাও। খুব ক্লান্ত লাগছে আজকে। তুমি পড়ো, আমি শুনি।
শাওলিন পাশ থেকে বলল,
- বাংলা, ইংরেজি ছাড়া তো অন্য ভাষাটা জানা নেই।
- বই পড়ার জন্য মন দরকার। রপ্ত পরে। আমার একটা রুলস আছে। যখন যেখানে বলব, বই পড়ে শোনাতে হবে। কমাণ্ড অ্যাকসেপ্টেড?
- পড়ব না হয়। অ্যাকসেপ্টেড।
- ওই বইটা আনো। শী, হেনরি রেইডার হ্যাগার্ড।
- রোমান্টিক?
- পড়লেই বুঝবে।
শাওলিন বইটা আনলে শোয়েবের ইশারায় তার বুকে মাথা পেতে আরাম করে শুলো। বইটা খুলে পড়তে শুরু করল। প্রথমবার একটু অসহ্য, বিরক্তি, একঘেয়েমি টের পাচ্ছিল। কিন্তু সময় যত এগোল, ততই ডুবে যেতে লাগল এক অন্তহীন রঙিন জগতে। শোয়েব চোখ বন্ধ করে শুনছে। চারপাশ শান্তিময়। শাওলিন এমন ভাবে পাঠ করছে যেন মানস চোখে সবকিছু দেখতে পাচ্ছে। একশো পাতা পড়ার পর শাওলিন মাথা তুলে বলল,
- কাহিনীটা পড়েছেন?
- পড়েছি।
- লিও, হোরেস হলি, চাকরটা অ্যামাহ্যাগারে বন্দি হলো। এই জংলীগুলো কী ওদের জ্যান্ত পুড়াবে ?
- নিজে পড়ো। আমাকে জিজ্ঞেস করে স্পয়লার চাচ্ছ কেন?
- একটু তো বলা যায়? আর লিও যে বিয়ে করল!
- বিয়েটা কীভাবে হয়েছে সেটা দেখো। তাছাড়া মেয়েটা ওকে ভালোবাসে।
- বাজে কথা বলবেন না। 'সে যাকে মানতেই হবে' লিওর অপেক্ষায় বসে আছে। আর এদিকে লিও অন্য কাউকে বিয়ে করে হানিমুনে ব্যস্ত।
শোয়েব হাসতে হাসতে বইটা কেড়ে নিল। একপাশে রেখে ওর দিকে শুধাল,
- ধরো, কেউ বাস্তবেও বিয়েটা এভাবে করল। তার জন্যও 'সে যাকে মানতেই হবে' অপেক্ষা করছে। কী হবে ইনোসেন্ট মেয়েটার?
শাওলিন চাপা রাগে ভ্রু খিঁচায়। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
- আজগুবি কথাবার্তা বলবেন না। আপনি নিজের সঙ্গে মেলাতে যাবেন কেন? মনে হচ্ছে যেন আপনার জন্যেই কেউ অপেক্ষা করছে?
শোয়েব রহস্য করে হাসলো। হাসিটা দেখে শাওলিনের সন্দেহ কমলো না। শোয়েব মৃদু চালে শান্ত গলায় বলল,
- বইয়ের মজাটা বুঝলে? কোনোটাই বাস্তব সত্য না। তবু ভাবতে, চিন্তা করতে মন্দ লাগে না।
এতোক্ষণ পর ভয়ংকর ভাবনাটা থেকে বের হলো শাওলিন। বইটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর বলল,
- বোঝার উপায় কী, কোন বই ভালো? কোন বই খারাপ?
- মানুষকে যেরকম ভালো-মন্দ দিয়ে পার্থক্য করো, সেভাবেই পাঠ্য জিনিসকে আলাদা করবে। অন্যের রিভিউ শুনে বই, মানুষ যাচাই করবে না। নিজের জাজমেন্ট তৈরি করবে। ভবিষ্যতের জন্য ব্রড নলেজ মাস্ট। ইটস ইয়্যুর কিংডম, শাওলিন। জানো, প্রশ্ন করো, থামবে না।
শাওলিন বইগুলোর দিকে চেয়ে নিজের সম্ভাব্য ভবিষ্যতকে কল্পনা করল। কেমন ভয় হচ্ছে বুকের কোণে। এই মানুষটার জীবনে, জগতে প্রবেশ করে চিন্তা বাড়ছে কেন? কেন পরিবারের লোকগুলো আলাদা? কেন মর্তুজাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক নেই? কেন রেবেকা নেওয়াজ শোয়েবকে নিয়ে সুআভাস দেয় না? চোখ বুজল শাওলিন। ঘুটঘুটে আঁধার। শুধুই অমাবস্যা!
শেষ রাতটুকু শোয়েবের সান্নিধ্যে কাটল। শেষরাতে শোয়েব যখন নিদ্রায় ডুবো; তখন তার ঘুমন্ত মুখে তাকিয়ে রইল। বুঝে উঠতে পারল না, শোয়েব কেন এতো তাড়াহুড়ো করছে? কেন সময়ের অভাব? এতো জলদি ব্যবসায়িক বিষয়ে যুক্ত করছে, কিন্তু, তবু প্রশ্ন আসছে কেন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………