আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৬৬ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

          বিশেষভাবে নির্মিত কাঠের ঘোড়াশালাটিতে একটিই ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। যা প্রাচীরের ন্যায় বিশাল, রাজকীয়, গম্ভীর। সম্মুখে রাখা আছে দুটো রুপোর বালতি। একটিতে স্বচ্ছ পানি, অন্যটিতে ওটস। আদিলের দৃষ্টি কেবলই অনড় রয় রাজকীয় ঘোড়াটির ওপরই। বয়সের ভার বোঝা যাচ্ছে। বয়স হয়েছে তো! এতগুলো বছর গেল বলে! ভুল না হলে, পঁচিশ বছরে পা দিয়েছে বাদশাহ্। স্মৃতির যন্ত্রণা, প্রতিশোধের আগুন দেহ-মনকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, ছোটোবেলার এই সঙ্গীটির কথা আর সেভাবে ভাবা হয়নি। না তার পা পড়েছে প্রাসাদের দুয়ারে, আর না সাক্ষাৎ হয়েছে বোবা প্রাণীটির সঙ্গে। আজ এতগুলো বছর পর দুচোখ ভরে দেখতেই চোখের পাতায় ভাসল অজস্র স্মৃতির সমাবেশ। নড়ে উঠল ভেতরটা। বাদশাহ্ মাথা নুইয়ে খাচ্ছিল, তার প্রিয় গাজর। গাজর মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে মাথা তুলে তাকাল সামনে। অবয়বটি দেখেই স্থির হয়ে পড়ে প্রাণীটি। খাড়া হয় ওর কান দুটো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয় সামনের দিকে অপলক। আদিল ধীর কদমে কাছে আসছে ক্রমশ। বাদশাহ্ পেল সেই পুরনো, পরিচিত গন্ধটি। হঠাৎ নাক বাড়িয়ে আদিলের কাঁধের কাছে মুখ রাখে। নেয় অস্থিরভাবে কিছু শ্বাস। প্রত্যুত্তরে আদিলের ধূসর চোখদুটোর দৃষ্টি নরম হয়ে আসে। এগোয় এক কদম। হাত ওঠাল, বাদশাহ্-র মাথায় রাখল। বুলিয়ে দিল, আদর করল খুব। বোবা প্রাণীটি গোঙাল শুধু। নিজের মাথাটা আদিলের বুকের দিকে ঠেকিয়ে দিল কেমন! বাদশাহ্ পছন্দ করতো আদিলের স্পর্শ। বিশেষ করে কাঁধে, ঘাড়ে! আদিল চিরচেনা ভঙ্গিতেই বুলাচ্ছিল। 

সে-দৃশ্যে ছলছল করে ওঠে শান্তর চোখদুটো। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয় চটজলদি। বড়ো করে একবার শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চাল্ল্লা। অবশেষে রক্তিম হয়ে ওঠা চোখদুটো ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে নিল। এলেন তুলনামূলক কিছুটা স্বাভাবিক। উল্টো কাছে গিয়ে ঘোড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে সরে যাওয়ার ইশারা করল হা নাড়িয়ে। বাইশ বছরের তরুণ ছেলেটির চোখেমুখে তখনও ছিল একরাশ মুগ্ধতা। নির্ভয়ে দেখছিল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এক গম্ভীর পুরুষকে। এলেনের ইশারা পেয়ে এবারে হড়বড় করে কয়েক পা পেছনে সরে দাঁড়াল। ঝটপট নোয়াল দৃষ্টি। এলেন গলাটা পরিষ্কার করে আস্তে করে শুধাল,

‘রাইড করবেন, বস? রাইডিংয়ের পোশাক আনাব?’

আদিল ফিরে তাকায় না। ক্রমাগত হাত বুলোত থাকে বাদশাহ্-র শরীরের ওপর -

'বয়স হয়েছে ওর। আগের মতো কি আর রাইড করতে পারবে! কষ্ট হবে।’

শান্ত এসে দাঁড়িয়েছে পাশেই, 'বাদশাহ্ কথা বলতে পারলে নিশ্চিত এতক্ষণে বলত, আপনি আমায় রাইড না করালেই বরঞ্চ কষ্ট পাব।’

ততক্ষণে আদিল কাঠের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা বাদশাহ্-র লাগামের গিঁট খুলে দিয়েছে। মাথার ওপরের রশিটা সরিয়ে হাতে নিয়েছে লাগাম। একটা বালতি থেকে অ্যাপল তুলে খাইয়ে দিল। যখন সে সামনে হাঁটা ধরে, বাদশাহ্-কে টানতে হয় না মোটেই। আদিলের সঙ্গে সঙ্গে সুড়সুড় করে খোলা প্রাঙ্গণে নিজেই বেরিয়ে এল। এক মুহূর্তও আর দেরি না করে এক লাফে তার পিঠে উঠে বসে আদিল। পরক্ষণেই কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে আনন্দে অস্থির বাদশাহ্ ছুটে চলল দিকবিদিকশুন্য হয়ে। বয়সের ভারে আগের মতো সেই দুরন্ত জোশ না থাকলেও, পুরোনো শক্তির অনেকটাই রয়ে গেছে তার শরীরে। সুস্থ লাগছে বেশ! দুটো রাউন্ড দিতেই মিষ্টি কণ্ঠে ডাক কর্ণগোচর হয় -

 ‘ড্যাডিইইই!’

আদিল তৎক্ষণাৎ লাগাম টানতেই পেছন ঘুরে থামল বাদশাহ্। মেয়ে তার নগ্ন দু ছোট্ট পায়ে দৌড়ে আসছে। তার পেছনে শান্ত, এলেন ধ্রুব, ক্লান্ত —সবগুলো দৌড়াচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আদিলের কপালে পড়ে তিন-চারেক ভাঁজ। ঘোড়ার পিঠ থেকে দ্রুত নামতে নামতে ক্লান্তর দিকে চেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল -

‘বেয়ারফুটে কেন —’

বাচ্চাটা বাবাকে কথা শেষ করবার সুযোগটুকু দিলে তো! চোখমুখ তার জ্বলজ্বল করছে, ঝলমলে সূর্যের মতো। দূর থেকে ঝাঁপিয়ে কোলে চড়ার হাবভাব দেখে আদিল ঝুঁকে দুহাত অল্প প্রসারিত করে রাখল। মেয়েকে ঝট করে কোলে নিয়ে তবেই অসন্তুষ্টি জাহির করল -

‘জুতো কোথায় তোমার? বেয়ারফুটে কেন?’

ক্লান্ত প্রায় ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে হৃদির পেছনে ছোটো একজোড়া জুতো নিয়ে ছুটতে ছুটতে। রীতিমতো বড়ো বড়ো শ্বাস নিচ্ছে সে। ওদিকে বাবার কথা শুনছে না হৃফি। মুগ্ধ চোখে দেখছে ঘোড়াটিকে -

 ‘ইট ইজ আ বিউটিফুল হর্স, ড্যাড।’

আদিল বা-হাত দিয়েই মেয়ের পা-দুটোর তলা মুছে দিতে দিতে ঘোড়াটির কাছে নিয়ে গেল, ‘ডু ইউ লাইক হিম, বেবি?’

‘লাভ হিম। ওর নাম কী?’

‘বাদশাহ্…’

হৃদি চকচকে চোখে চেয়ে আস্তে আস্তে ছোটো হাতটা বাড়িয়ে ছুঁলো বাদশাহ্-র মাথা। আদর করতে করতে আওড়াল -

‘ওয়াও, হি’জ সফট, অবিডিয়েন্ট।’

—————

জাহানারা বেগম রোযাকে টেনে নিজের পাশে বসালেন। ঘরভর্তি মানুষ নিয়েই তিনি রসের আলাপে মজেছেন। তার একেকটি কথায় রোযার মাথাটা ক্রমশ লজ্জায় নুয়ে পড়ছে। ছোটো-বড়ো সকলের সামনে এ-ধরনের আলা্পে কুন্ঠাবোধ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক! রীতিমতো চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। অথচ জাহানারা বেগম তখনো নিজের বয়ানে অটুট। একের পর এক মশলা মিশিয়ে চলেছেন দিব্যি -

‘তোমার দাদুভাই ছিলেন একটা নাকউঁচু মানুষ। টাকাকড়ি না থাকলে কী হইছে! অহংকারে তার মাটিতে পা পড়ত না। কী রংটাই না দেখাইছিল! পেত্থম পেত্থম আমারে যেই পুরুষগিরি দেখাইসে তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। বউরে অমন মাথায় তোলার মতো পুরুষ ওই ব্যাডা কোনো কালেই আছিল না। কিন্তু আমি জাহানারা কি আর যেমন-তেমন মাইয়ামানুষ নাকি? নিজের রূপের, গুণের এমন ঝলক দেখাইছি, মাথা ঘুইরা গেছে ব্যাডার। আমারে ছাড়া তখন আর কিচ্ছুই বুঝত না। এইজন্যই কই, নাতবৌ! তুমি হইসো পরির লাহান সুন্দর। শাড়ি পইরা যহন পেত্থম আইলা, আমি তো ভাবছি কোনো জমিদারগিন্নি বুঝি আইতাছে! রূপে-গুণে স্বয়ংসম্পন্ন। তুমি একটু মোহব্বত করলেই নাতি আমার তোমার আঁচল ধইরা ডানে-বায়ে কেন ঘূর্ণিঝড়ের মতন ঘুরব। সোয়ামির অমন একনিষ্ঠ ভক্তি পাইতে হইলে কিছু টোটকা লাগে, বুজছোনি? ওই টোটকাগুলাই আমি তোমারে শিখাইয়া-পড়াইয়া দিমু—’

নাসির সাহেব গলা তুলে কাশলেন। মায়ের বয়ান থামানোর সামান্য প্রচেষ্টা। তাতে জাহানারা বেগম থোড়াই পরোয়া করেন! থামলেন তো না-ই, উল্টো পেছনে ফিরে না তাকিয়েই হাত নাড়িয়ে ছেলেকে চুপ থাকার ইশারা করলেন। অগত্যা ভদ্রলোক ছোটো দুই ভাইয়ের দিকে চোখের ইশারা করেন। পরপরই তিন ভাই আলগোছে উঠে পড়লেন। কোনোভাবে সেখান থেকে সরে গেলেন। এতক্ষণ যাবৎ মুখে হাত চাপা দিয়ে রেখেছিল ঝুমুর। সুপ্তি রীতিমতো ওড়নার একটুখানি দাঁতে কামড়ে ধরে রেখেছে। জুলেখা বেগম নিঃশব্দে হাসছেন। দম আটকে আসছে নূরজাহানের। ঠোঁট কামড়ে রেখেছে শিকদার বাড়ির তিন গিন্নিও। জাহানারা বেগম বলে গেলেন আপন সুরে -

‘আপাতত দুইডা টোটকা হুনো, নাতবৌ। জামাইয়েরা হইতেসে স্ত্রীদের আদরের দাস। স্ত্রী যত নরমসরম হয়, যত লজ্জা পায়, ততই মোহাব্বত করে জামাইলোক—’

রোযা আর শুনতে পারল না। অন্যকেউ হলে এতক্ষণে তার মুখ চলতো। নির্ঘাত বলে বসতো, ওই লাফাঙ্গাটাকে টোটকা শোনান গিয়ে! তবে দাদিমার ক্ষেত্রে ওসব তো আর বলা যায় না। বড্ড সম্মানিত যে! অগত্যা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাথার ওপর তুলে রাখা শাড়ির আঁচলটা সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল। কোনো রকমে আঁচলটা সামলাতে সামলাতে পালাতে পালাতে বলে উঠল -

‘দাদিমা, চুলায় বোধহয় আমি কিছু দিয়েছিলাম!’

রোযার হড়বড়িয়ে চলে যাওয়া দেখে শব্দ করে হেসে উঠল ঝুমুর। বৃদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলেন -

‘এই ছ্যামড়ি, হাসছ ক্যা ওমন? তুইও এই টোটকা মাথায় রাখ। তোরও কাজে—’

ঝুমুরের হাসিটুকু একমুহূর্তেই দপ করে নিভে গেল। অন্যদিকে সুপ্তি তখন হাসতে হাসতে সোফার ওপর গড়িয়ে পড়েছে। জাহানারা বেগম বিরক্ত চোখে তাকাতেই ঝুমুর হড়বড়িয়ে রোযার পেছনে ছুটল। সুপ্তিও পড়ে রইল না, সেও হাসতে হাসতে পালাল। মিছিমিছি দেখানো বিরক্তির ছাপটুকু ধীরে ধীরে মুছে গেল জাহানারা বেগমের মুখশ্রী থেকে। ঝলমলে প্রাসাদের চারদিকটায় একবার চোখ বুলালেন তিনি। ঠোঁটের কোণে এসে ভিড়ল তৃপ্তির হাসি। জুলেখা বেগমের ইশারায় নূরজাহান ডেকে আনল তিন শিকদার সাহেবদের। 

—————

‘ও নায়ায়াতবৌ, নায়ায়াতবৌ? ওওঅঅঅঅ….’

সুপ্তির ওমন অভিনয় সুরে ডাকা শুনে অবশেষে মাথা ঘুরিয়ে চোখ রাঙাতেই আরেক দফা হেসে উঠল সুপ্তি। ঝুমুর তো হাসতে হাসতে হেলেদুলে প্রায় রোযার গায়েই পড়ছে। সুপ্তিও জলদি এসে ঘেঁষল রোযার পাশে। বলে -

‘আমি দাদিমার সাথে একমত নই, ভাবি।’

রোযা মনে মনে ভাবল, যাক! মেয়েটা তাহলে শুধরেছে! অথচ পরমুহূর্তেই সুপ্তি গম্ভীর মুখে আওড়ায় -

‘কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি শুধু ডুবে ডুবে মোহব্বতের জলই খাচ্ছো না। রীতিমতো তলিয়ে গিয়েছো তার গভীরে। যা দাদিমা ধরতে পারেননি –’

রোযার দুরন্ত কদম সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। একটুও দেরি না করে টেনে ধরল সুপ্তির ডান কান। বেচারি কাইকুই করে ওঠে। নিজের কান বাঁচাতে গুঙিয়ে বলে -

'আরেহ আরেহ...সত্য কথার, সত্যবাবাদীদের দেখি দাম নাই।'

ঝুমুর হাসছে। আঙুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলছে, 'বেশ হয়েছে। খা কান মলা…’

হাসির সুমধুর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে প্রাসাদের চারপাশে। দোতলার এই করিডোরের সরু পথটি গিয়ে শেষ হয়েছে পশ্চিম দিকের প্রশস্ত বারান্দায়। সেখান থেকে একনজরে দেখা গেল প্রাসাদের বিস্তৃত প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য। নীলসাদাটে আকাশের বুকে তখন সূর্যটা ঝলমল করছে। রক্তিম আভায় চারপাশ সোনালি-লাল রঙে ভেসে আছে। মৃদু বাতাসে প্রাসাদের আশেপাশে থাকা গাছের ডালপালা গুলো দুলছে। উড়ছে রোযার শাড়ির আঁচল, চুল।  

ঝুমুর, সুপ্তির দুষ্টুমিতে হাসতে হাসতেই হঠাৎ তার চোখ গিয়ে আটকা্ল অদূরে। সফেদ একটি ঘোড়া ধীর পায়ে হেলেদুলে এগিয়ে চলছে। তার পিঠে বসেছে আছে। প্রাণখুলে হাসছে, লাফাচ্ছে! তাকে ধরে রেখেছে আদিল। মেয়েকে ঘোড়ায় চড়িয়ে, ধরে রেখে রাইড করাচ্ছে। হৃদি হাতের ইশারায় বাবাকেও উঠতে বলছে। একপর্যায়ে আদিলও চড়েছে ঘোড়ার পিঠে। মেয়েকে বুকের কাছে আগলে নিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে সামনে। পাশে শান্ত, এলেন হাঁটছে। পেছনে ক্লান্ত, ধ্রুবকেও দেখা যাচ্ছে। সেদৃশ্যে নিজের অজান্তেই মুগ্ধতায় স্তব্ধ হলো রোযার দৃষ্টি। ভরে এল তার প্রাণ। কিঞ্চিৎ আরও এগিয়ে গিয়ে মিলল ব্যালাস্ট্রেড দেয়ালের সাথে। মাথা বাড়িয়ে নিপুণ দৃষ্টিতে দেখছিল। হঠাৎই ঝাপসা ভাবে দৃষ্টি মিলল একজোড়া ধারালো দৃষ্টিতে। থতমত খেল রোযা! আদিল আচমকা তাকিয়েছে যে! কীভাবে বুঝল এত দূর থেকে কেউ তাকে দেখছে? 

—————

গ্রাউন্ড ফ্লোরের বিশাল ঘড়ির কাঁটা ঘুরে এসে দুটোতে ছুঁয়েছে। আজ অনেক পদের রান্না হয়েছে। রোযা নিজ হাতে রান্না করেছে সবকিছু। জুলেখা বেগমের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল আদিলের পছন্দের কিছু পদ। এই যেমন, মাটন বিরিয়ানি তার ভীষণ পছন্দের। আবার লোকটাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তার একেবারে সুইট টুথ। মিষ্টি ভীষণ পছন্দ করে। অগত্যা রোযা বেশ সময় নিয়ে মাটন বিরিয়ানি রান্না করেছে। খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে রান্না করেছে পায়েসও। হৃদির পছন্দের খাবারের পাশাপাশি অতিথিদের পছন্দের কথাও সে মাথায় রেখেছে। আপাতত সবকিছু ডাইনিংয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে।
নূরজাহানের সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়েছেন শিকদার বাড়ির তিন গিন্নি। বসে থাকার মহিলা তারা নন। উশখুশ করে খুঁজে খুঁজে যা পারছেন, করছেন! পারলে বাড়ির কাজের লোকদের তুলে বাইরে রেখে নিজেরাই সব করেন! রোযা রান্না করেছে, আর তারা সারাক্ষণ তার আশপাশে থেকেছে। এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করেছে। ঝুমুর, সুপ্তিও টুকটাক কাজে হাত লাগিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ বেলা হয়ে গেছে। রোযা ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাইকে ডেকে ডাইনিংয়ে বসাতে। অথচ কেউই বসছে না। সবাই আড়চোখে তাকাচ্ছে দরজার দিকে! যেন কারও অপেক্ষায় আছে। নাসির শিকদার আওড়ালেন -

'ব...বসকে দেখছি না।'

অগত্যা হাতের কাজ ফেলে বাইরে বেরিয়ে এল রোযা। দেখা গেল, সে-লোক বাগানের ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে। কানে ফোন চেপে ধরে কারও সঙ্গে কথা বলছে। কথা কম, মনে হচ্ছে কাউকে উত্তমমধ্যম দিচ্ছে কথার মাধ্যমে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ রাগান্বিত। তা থোড়াই পরোয়া করল রোযা! ইতর লোক! সকালে কীভাবে ফাঁসিয়েছিল ওকে! তার ওপর দাদিমা সকাল থেকে তার কান দুটোর কাছে রমরমিয়ে টোটকা বলে বেড়িয়েছে! এর শোধবোধ তো সে নেবেই। রোযাকে আসতে দেখে ততক্ষণে কান থেকে ফোন নামিয়েছে আদিল। কাছাকাছি থাকা শান্ত, এলেন সরে দাঁড়িয়েছে দৃষ্টি নুইয়ে। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা চোখদুটো এড়িয়ে রোযা বলে -

'আসুন, খাবেন।'

আদিল গম্ভীরমুখটায় চোখ বুলিয়ে জানায়, 'বের হব এখন... '

শেষ করতে পারে না কথাটুকু। রোযা শোনে না। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে ঘুরে হাঁটা দেয়ার আগে বলে যায়, 'খেয়ে তারপর যাবেন যেখানে যাওয়ার।'

আদিল নির্বাক চোখে দেখল হনহনিয়ে চলে যাওয়া শীর্ণ শরীরটাকে। তার অভিব্যক্তির পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে না হলেও, হঠাৎ কিঞ্চিৎ মাথা নুইয়ে নিঃশব্দে হেসে ফেলল। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছিল শান্ত। না ফিরে তাকিয়েই আদিল বলল -

‘আধঘণ্টা দেরি হবে, বলে দে।’

এলেন হাসি চেপে কল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কথা শেষ করে ছুটল বসের পেছনে। আদিল ততক্ষণে প্রবেশ করেছে ভেতরে।
হৃদি পাখির মতো উড়ে এসে উঠে গেল বাবার কোলে।ডাইনিংয়ে ইতোমধ্যে বসে আছেন জাহানারা বেগম। তার পাশেই মেয়েকে নিয়ে আদিল বসতেই, বাকিদেরও ডেকে বসাল রোযা। এমনকি শান্ত, এলেন, ক্লান্ত, ধ্রুবকেও বসিয়েছে। এলেন আশ্চর্যজনকভাবে চেয়ার টেনে বসেছে সুপ্তির পাশে। এতে সে মেয়ের তেমন ভাবান্তর দেখা যায় না। সুপ্তি তখন নিজের প্লেটে খাবার বেড়ে নিতে ব্যস্ত। প্রথমেই রোস্ট থেকে এক পিস রান নিয়ে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। এলেনের আড়চোখের দৃষ্টি দু-বার চলে গেল খাওয়ায় মগ্ন মুখটির দিকে। খেতে খেতেই নীরবতা ভেঙে সুপ্তি বলে ওঠে -

‘ভাবি, এত দারুণ রাঁধতে পারো তুমি! কী পারো না তুমি? ও মাই গড! এত সুস্বাদু হয়েছে। আঙুল গিলে ফেলা যাবে!’

শান্ত এমনিতেও নিজের পরিবারের সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারে না! এমনভাবে ‘ভাবি’ আর ‘তুমি’ সম্বোধন করছে, যেন নিজের আপন ভাইয়ের বউ! জন্ম জন্মান্তরের আপন! দুঃসাহস দেখ এদের! সুপ্তির থেকে একশো কাঠি ওপরে আবার তার দাদিমা! শান্ত আড়চোখে বসের দিকে তাকাল। আদিলের দৃষ্টি একজনের ওপরেই নিবিষ্ট। তার পাশেই রোযা সামান্য নুইয়ে খাবার বেড়ে দিচ্ছে প্লেটে। এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। আদিলের ঊরুর ওপর বসা মেয়েকে পানি খাওয়াচ্ছে। নূরজাহান বেগমও একটু খেয়েই প্রশংসার বুলি আওড়িয়ে থামালেন না। উল্টো রোযাকে ডেকে এনে নিজের খুঁট হাতড়ে চারটা একশো টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে গেলেন ট্রেনের গতিতে -

‘নাতবৌ, আরও পাক্কা গিন্নি হও। স্বামীর বাধ্য, লক্ষ্মী বউ হও। কয়েকটা ছানাপোনা জন্ম দিয়া এই বিশাল ঘরদোর ভইরা লাও।'

শান্তর চোয়াল ঝুলে এসেছে। কাঁপছে তার হৃৎপিণ্ড। রোযার স্তম্ভিত দৃষ্টি গিয়ে মিলল একজোড়া হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টির সঙ্গে। মুহূর্তে নাক ফুলিয়ে ডাকল -

‘দাদিমা!’

থমকে গেল সবাই। পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মুখে খাবার নিয়ে বৃদ্ধা তাকিয়ে শুধালেন -

‘কও, কিতা হইসে?’

‘কিছু টোটকা আপনার নাতিকেও দিন।’

জাহানারা বেগম বলেন, 'হেয় কি তোমারে মোহব্বত করে না? আগে কইবা না!’

রোযা মনে মনে পস্তাল খুব। ততক্ষণে জাহানারা বেগম আদিলকে ডেকে আলাপ শুরু করে দিয়েছেন -

‘ও নাতি, বউয়ের রান্না খাইসো না? প্রশংসা করো না ক্যান? ওমন গম্ভীরমুখ কইরা রাখলে বউয়ের মন পাইবা কেম্নে? বেশি বেশি আদর আদর কতা কইবা। এখন কও, কেমন লাগল? অন্তর ভরল ত? এমন মজার খাওন খাইতে হইলে কিন্তু বউরে মেলা সোহাগ করতে হইব। যত্নে রাখতে হইব। মাথায় কইরা রাখতে হইব। নাইলে কিন্তু তরকারিতে ছ্যাপ দিয়া দিব, বুঝতেও পারবা না।’

আশ্চর্যজনক ভাবে আদিলের নির্বিকার প্রত্যুত্তর এল, ‘আচ্ছা….’

জাহানারা বেগম সন্তুষ্ট হলেন বড্ড। রোযার হাত ছুঁয়ে বলেন, ‘কইয়া দিসি নাতবৌ। নাতি আমার মেলা বুদ্ধিমান। শেখার চাহিদা আছে। দেখলা…’

রোযা হনহনিয়ে সরে এল ওখান থেকে। এতো মোটা চামড়া একটা লোকের কীভাবে হতে পারে। নির্লজ্জ! 

—————

আদিলের পরনে সেই একই পোশাক, কালো থ্রিপিস স্যুট। চকচকে জুতোজোড়া ড্রাইভওয়ের সামনে এসে থেমেছে। পায়ের কাছে এসে ভিড়েছে তিতান-থোর! ঘেউঘেউ করছে সমানে! আদর চাইছে। আদিল ফিরে তাকাল, রোযা নেই কোথাও। অগত্যা গাড়িতে উঠবে ঠিক তখনই কোকিলকণ্ঠের পরিচিত ডাক শুনে সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়াল। ড্রাইভওয়ে জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা তখন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। আদিল দ্রুত পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল, রোযা এগিয়ে আসছে। পরনে শুভ্র রঙের একেবারে সাদামাটা জর্জেটের শাড়ি। চুলগুলো এলোমেলো করে খোঁপা করা। অথচ তার চোখেমুখে এইমুহূর্তে অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি। কাছে এসেই রোযা ইশারায় কিছু একটা বোঝাতে চাইল। আদিল বুঝল না। দু-কদম এগিয়ে ডান ভ্রু সামান্য উঁচু করে তাকাতেই রোযা বলল -

‘আপনায় একটু ঝুঁকতে হবে।’

হঠাৎ এমন হুকুমের সম্মুখেও আদিল মির্জা বড্ড বাধ্য। বিনা দ্বিধায় মাথা নুইয়ে স্ত্রীর সমান হতেই চোখের পলকে তার গালে এবং নাকের ডগায় আচমকা চুমুর স্পর্শ পড়ল। একমুহূর্তেই জমে গেল দাম্ভিক দেহখানা। হতবিহ্বল, বিমূঢ় আদিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছুই বুঝে উঠতে পারে না কিছু। ক্রমশ শক্ত হয়ে ওঠে চোয়াল। দৃঢ় হয় চোখের দৃষ্টি। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই রোযার। আদিল তাকে ধরার আগেই দ্রুত সরে এসেছে। হড়বড় করে কয়েক কদম দূরে চলে আসতেই, ঠিক তখনই চোখ তুলে তাকিয়েছিল শান্ত। দুজনের চোখাচোখি হলো। চোখে চোখ পড়তেই রোযা সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত গলার কাছে নিয়ে গিয়ে গলা কা টার ইশারা করে, সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে শাসাল অবধি। পরক্ষণেই হাওয়ার গতিতে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে চলে গেল। কিছুই বুঝতে পারল না শান্ত।
ম্যাডামের হলোটা কী? কীসের ইশারা করলেন? অথচ পরমুহূর্তেই তার বস ঘুরে তাকাতেই থমকে গেল গোটা দুনিয়া। গালে আর নাকের ডগায় টকটকে লাল লিপস্টিকের চুমুর ছাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হতভম্ব আদিল মির্জা। সেদিকে অবশ্য এলেনের চোখ পড়েনি। সে জানায় -

‘বস, তাড়া দিচ্ছে। খুব জরুরি…’

আদিল পুনরায় তাকাল বাড়িটার দিকে। রোযার ছায়ামাত্র নেই সেখানে। ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হাতটা খুলল তার। নিজেকে স্বাভাবিক করে অবশেষে উঠে বসল গাড়ির পেছনের আসনে। মাথাটা এলিয়ে দিল সোফার হাতলে। গালে, নাকের ডগায় এখনো সেই একজোড়া গোলাপি ঠোঁটের স্পর্শ লেগে আছে। উষ্ণ সেই স্মৃতিটুকু অদ্ভুতভাবে হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই শাস্তি দিচ্ছে! আদিলের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজের আগে এমন কাণ্ড করা তো তাকে শাস্তি দেওয়ারই মতো! গাড়িগুলো চলছে ভীষণ দ্রুত গতিতে। এলেন হাতের ফাইলগুলো চেক করছিল। পাশে বসা শান্তকে ওমন নির্বাক দেখে ভ্রু তুলে তাকাল। 

‘হয়েছে কী? এমন অবস্থা করে রেখেছিস কেন মুখের? যেন বউ ভাত দেয় না বাড়িতে!’

তর্কে যায় না শান্ত। আড়চোখে পেছনে চেয়ে শুধাল, ‘কিছু দেখিসনি?’

‘কী দেখব?’

শান্ত পড়ল মহা বিপদে! ম্যাডাম ত ইশারা করল, জানালে তার জান কবজ করবে! ওদিকে বস যদি এভাবে গিয়ে হাজির হয়! শান্ত ভাবতে পারছে না আর। তাই ইনিয়েবিনিয়ে ডাকে -

 ‘বস….’

আদিল মাথা তোলে না। চোখ মেলে তাকায় না। সরায় না মুখের ওপরে থাকা হাতটা। সেভাবেই বলে, ‘বল!’

‘বস, দেখুন! জানালার কাঁচে কী যেন লেগেআছে!’

আদিল একইরকম অবস্থায় থাকে। উত্তর নেই! এলেন তখন বোকার মতন চেয়ে আছে শান্তর মুখের দিকে। ডান হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করল শান্তকে, ‘তুই কি পাগল? মাথার নাটবল্টু সব খুলে গেসে?’

পাত্তা দেয় না শান্ত। উল্টো নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করে বলে, 'বস, আয়নাটা ঝকঝক করছে। একদম ম্যাডামের নেইলপলিশের মতন। দেখুন!’

আদিল অবশেষে হাত সরাল মুখ থেকে। উল্টাপাল্টা কথা বলা মুখটা থামাতে আদেশ করল, 'একটা শব্দ শুনতে চাই না।’

হা হয়ে আসা মুখটা চট করে বন্ধ করে ফেলল এলেন। লাল লাল চিহ্নগুলোর দিকে চেয়ে একবার ডাকার চেষ্টা করল -

‘বস, আপনার গা—’

‘বি কোয়ায়েট!’

আদিল মির্জার ধমক পড়ল রীতিমতো। শান্তর হাত কপালে চলে গেল। এলেন তখনও হতভম্ব। আজ সময় হাওয়ার গতিতে ফুরোল। গাড়ি এসে থামল আইনমন্ত্রী আব্দুল মান্নানের ফার্মহাউসে। আজ আর শান্ত বেরিয়ে এসে দরজা খোলার সময়টুকুও পেল না। আদিল নিজেই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছে। দাম্ভিক কদমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ভেতরের দিকে।
শান্তর ছটফটে ডাকেও সাড়া দিল না। শান্ত কপাল চাপড়াল। এলেনের দিকে আড়চোখে চেয়ে বুঝল, বেচারার মুখ রীতিমতো শুকিয়ে গিয়েছে।

—————

বাইরের ঝলমলে আলো ভেতরে পুরোপুরি ঢোকেনি। হলদে আলোয় পরিবেশটা বেশ গুমোট। দেশের মান্যিগণ্যি লোকজনের সমাগম বসেছে সেখানে। আদিল প্রবেশ করতেই আব্দুল মান্নান তদারকি করতে করতে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।

‘বাপজান… আপনার অপেক্ষা—’

দমে গেল ভদ্রলোকের কণ্ঠ। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন শুধু। তারচেয়েও হাস্যকর অবস্থা বাকিদের। আদিল অবশ্য তা লক্ষ্যই করল না। দু-পা ছড়িয়ে বসল দিকপাল চ্যাটার্জির পাশে। ব্যস্ত হাতে একটা সিগারেট ধরাল। মুহূর্তেই আরও গম্ভীর হয়ে উঠল তার অস্তিত্ব। গাল, নাকের চিহ্নের সাথে যা মোটেও মিলল না। অবশেষে পিনপতন নীরবতাটা টের পেল আদিল। জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে চেপে উপস্থিত সকলের হতভম্ব মুখের দিকে তাকাল। ভ্রুদ্বয়ের মধ্যিখানে কয়েকটি ভাঁজ পড়ল তৎক্ষণাৎ! মান্নান সাহেব ততক্ষণে ছটফট শুরু করেছেন। আমতা-আমতা করে উঠলেন -

‘বা-বাপজান, তয় আপনার সুন্দরী বউ আপনারে খুব ভালোবাসে, তা নাহয় বুঝলাম। এইজন্য কি তার প্রমাণ মুখেও রাখা লাগল?’

কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো আদিলের। অভিব্যক্তি দেখে দিকপাল চ্যাটার্জির যা বোঝার, বোঝা হয়ে গেল। ভদ্রলোক ফিক করে হেসে উঠলেন। আদিলের গাল আর নাকের দিকে বার কয়েক তাকিয়ে বললেন -

‘মুখ দেখোনাই? তোমার গার্ড বলেনাই?’

শান্ত দাঁতে দাঁত পিষল। বুইড়া গুলা ঝামেলা করতেছে কীভাবে! চটজলদি সে ফোনের ক্যামেরা অন করে আদিলের হাতে ধরিয়ে দিল। ফিসফিস করে কোনোরকমে বলল -

‘বলতে চাচ্ছিলাম, বস। আপনি স-সময় দেন দেননি আরকি!’

শান্তর পা-জোড়া শুধু থরথর করে কাঁপা বাকি। অথচ আদিল নির্বিকার। তেমন হেলদোল তার ভেতরে দেখা গেল না। নির্বাক চোখে নিজের চুমুর ছাপ পড়া মুখখানি ঘুরেফিরে দেখল শুধু। যেন কোনো চমৎকার আর্ট পর্যবেক্ষণ করছে। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল চিহ্নের স্থানটুকু। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে রোযার মুখখানি। আনমনা হয়ে দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। দিকপাল চ্যাটার্জি রীতিমতো হেসে হেসে সোফার হাতলে এলিয়ে পড়েছেন।

‘ম্যাডাম নিজের সম্পত্তিতে স্ট্যাম্প মেরে দিয়েছেন। যেন কারও নজর না লাগে।’

তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসছে কমবেশি সবাই, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাই আর ঋণা সওদাগর ব্যতীত। ঋণাও আজ উপস্থিত আছে, তবে ভীষণ পেছনে বসেছে। কিছুটা আড়াল হয়ে, আধো-অন্ধকারে। আদিল অবশেষে আওড়াল -

‘ইট লুকস নাইস…’

তার পেছনে দাঁড়ানো শান্ত-এলেনও থমকাল। আদিল ফোনটা ফেরত দিয়ে পুনরায় সিগারেটে মনোযোগ দিল। তারপর আলাপ তুলল -

‘বলুন, কী বলার আছে! বেশি সময় দিতে পারব না।’

আব্দুল মান্নান আঙুল তুলে বললেন, 'বাপজান, ওইগুলা মুছবেন না?’

আদিল নির্বিকার, 'কোনগুলো?’

‘চুমুর দাগ!’

‘কেন? ভালো দেখাচ্ছে না?’ আদিল প্রায় ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল। ফাঁকা হেসে আব্দুল মান্নান বললেন -

‘চমৎকার লাগতাসে শুধু তোমার মুখের গম্ভীরতার সাথে ঠিক মানাচ্ছে না।’

আদিল ডান ভ্রু তুলতেই ভদ্রলোক বসতে বসতে দু-হাত তুলে বললেন -

‘মজা করছি, বাপ। হা হা… ফান, ফান!’

—————

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবে হবে ভাব। বাগানজুড়ে সবাই বসে গল্পে মজেছে। জাহানারা বেগম আগেকার দিনের গল্প বলছিলেন। মেয়েকে কোলে নিয়ে মন দিয়ে শুনছিল রোযা। মায়ের কোলে বসে হৃদি পুতুল নিয়ে খেলছিল। তার আবার এসব গল্পে মন নেই। খেলার ফাঁকে ফাঁকে দু একটা বোকাবোকা প্রশ্ন করছে, মৃদু হেসে বেশ ধৈর্যের সঙ্গে জবাব দিচ্ছে রোযা। রোযার পায়ের কাছে বসে আছে তিতান-থোর। ঘুমুচ্ছে, কোনো সাড়া নেই। নূরজাহান ট্রে-তে সবার জন্য গরম গরম চা নিয়ে এসেছে। চা পান করতে নিয়ে আড়চোখে একফাঁকে রোযা লক্ষ্য করল, ক্লান্তকে কেমন অপ্রস্তুত লাগছে! যেন সে কিছু একটা বলতে চায়, আবার বলতে চায় না। আড়চোখে বারবার রোযার দিকে তাকাচ্ছে, আবার দৃষ্টি নুইয়ে নিচ্ছে। সন্দেহ হতেই রোযা উঠে দাঁড়াল। হৃদিকে চেয়ারে বসিয়ে এগিয়ে এল ক্লান্তর কাছে।

‘কী হয়েছে? কিছু ্কি হয়েছে?’

ক্লান্ত একবার চারপাশে তাকাল। বাগানে উপস্থিত ছোটো-বড়ো সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিল। তার বস যদি ওই মুখে থাকা চুমুর চিহ্ন নিয়ে এভাবে সবার সামনে এসে পৌঁছান, তাহলে ম্যাডাম মুখ লুকাবেন কোথায়? বড্ড মায়া করেই তার মনে হলো, ম্যাডামকে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এতে যদি তার কোনো উপকার হয়! ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করল -

‘ম্যাডাম, ইয়ে মানে—বলছিলাম…’

রোযার চিন্তা আরও বাড়ল, 'তোমার বস কোথায়?’

‘ফি-ফিরছেন…’

রোযার সুন্দর মুখে ভাঁজ পড়ল, 'তাহলে? কী সমস্যা?’

সেটাইতো সমস্যা! ক্লান্ত কীভাবে কথাটা বলবে, বুঝে উঠতে পারল না। অগত্যা চোখজোড়া বন্ধ করে নিজের ফোনের স্ক্রিনে খোলা চ্যাটটি রোযার চোখের সামনে ধরল। প্রথমে থতমত খেল রোযা। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো স্ক্রিনে। একপর্যায়ে চোয়াল ঝুলে পড়ল। লজ্জায় কয়েক মুহূর্ত নড়তেও পারল না সে। স্ক্রিনে আদিলের একটি ছবি। আড়ালে তোলা। মুখে চুমুর চিহ্ন নিয়ে ঘরভর্তি মানুষের সঙ্গে বসে আলাপ করছে। আর এভাবেই আবার বাড়ি ফিরছে! মানে, লোকটা মোছেনি ওগুলো! রোযার মনে হলো, এ কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের কাজ হতে পারে না। একটা মানুষের চামড়া এত মোটা কীভাবে হতে পারে? অসম্ভব! ক্লান্ত ফিসফিস করে বলল -

‘বাইরে এত মানুষ। বস ওভাবে এসে পৌঁছালে…’

রোযা আঁতকে উঠল। লজ্জায় রীতিমতো হাঁসফাঁস লাগছে তার। ফিরে একপলক তাকাল। সবাইকে দেখে দৃষ্টি লুকিয়েই কোনোরকমে আওড়াল -

‘গাড়ি বের করো। বের হব।’

ক্লান্ত বড়ই বাধ্য। এই আদেশটিরই অপেক্ষাতেই ছিল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি ড্রাইভওয়েতে এনে দাঁড় করাল। রোযা নূরজাহানকে জানিয়ে দ্রুত উঠে পড়ল গাড়িতে। তার ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি আবার গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়ে অসভ্য লোকটা! তাদের গাড়িটা দ্রুত বেরিয়ে এল মির্জা ম্যানশন ছেড়ে। ম্যানশনের পাশের সড়কপথটা বেশ নীরব, জনমানবশূন্য। গাড়ি ছুটে চলল সেই পথ ধরে। বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতেই দূর থেকে চোখে পড়ল, একটি নীরব এলাকা দখল করে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ গাড়ি, বডিগার্ডস। আদিল মির্জাকে চিনতে রোযার এক মুহূর্তও লাগল না। পায়ের নিচে কাউকে পিষে দাঁড়িয়ে আছে সে। গ্লাভস পরিহিত হাতে পিস্তল।
এযাত্রায় শান্তর ইশারায় আর পিনপতন নীরবতা ভেঙে আসা গাড়ির শব্দে আদিল ফিরে তাকাল। রোযা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল জেদি বাচ্চার মতো। কদম বাড়াল না। 

সূর্যটা তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। রক্তলাল হয়ে আছে আকাশ, প্রকৃতি। রোযার ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে মিশে আছে অনেক কিছু। রাগ, লজ্জা, অভিমান! সব একসঙ্গে মিলে চোখজোড়াকে কেমন টলমল করে তুলেছে। আদিল বোধহয় বুঝল। তার ধূসর চোখদুটো হাসছে। ততক্ষণে শান্ত রাস্তা্য পড়ে থাকা লোকটাকে তুলল। তাদের অনুসরণ করছিল। সবাই পালিয়ে বাঁচলেও এটাকে ধরতে পেরেছে। হাত-পা বেঁধে গাড়িতে রেখে, শান্ত সবাইকে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়ে পড়ল। 

ওদিকে আদিলকে কাছে আসতে না দেখে রোযার রাগ আরও বাড়ল। চোখ রাঙিয়ে তাকাতে তাকাতে অবশেষে কদম বাড়াল সে। মৃদু বাতাসে উড়ল তার চুল, শুভ্র শাড়ির আঁচল, শাড়ির কুচি। সে দৃশ্যে আদিল চোখ ফেরাতে পারল না। পলক ফেলতেও ভুলে গেল। নির্নিমেষ চেয়ে রইল। কয়েক কদম হেঁটে, পরপরই রোযা দৌড়াল। দৌড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল আদিলের শক্ত, প্রশস্ত বুকে। শক্তপোক্ত বুকের ওপর ডান হাত দিয়ে বসিয়ে দিল পরপর কয়েকটি ঘুষি। আদিল ভীষণ মৃদু শব্দে কানের কাছে হেসে ফেলল। তাতে কেঁপে উঠল বুকের ভেতরটা। যার কম্পন স্পষ্ট অনুভব করল বুকে মিশে থাকা রোযা। হাসির শব্দটা যেন আরও বিঁধল তার কানে -

‘আপনি একটা অসম্ভব রকমের ফালতু লোক। বর্বর, নির্লজ্জ, লম্পট! একটা মানুষের চামড়া এত মোটা কীভাবে হতে পারে!’

আদিল নীরব রইল। রোযা মাথা না তুলেই খামচে ধরল তার পরনের কোট -

‘মোছেননি কেন? আমাকে লজ্জায় ফেলতে খুব ভালো লাগছিল?’

আদিল শান্ত গলায় বলে, 'দিকপাল চ্যাটার্জি বললেন, আমার স্ত্রী তার সম্পত্তিতে স্ট্যাম্প মেরে দিয়েছে, যেন কারও নজর না পড়ে। আমি আমার স্ত্রীর স্ট্যাম্প পাহারা দিলাম মাত্র!’

ইশ! সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় রোযার শরীর আরও মিইয়ে গেল। এতগুলো মানুষ জেনেছে, দেখেছে! সে ভাবতে পারছে না জাস্ট! রোযা দাঁতে দাঁত পিষে শুধায় -

‘এগুলো নিয়ে আবার বাড়িতেও যেতেন?’

আদিলের উত্তর এল স্পষ্ট, নির্লিপ্ত, 'যাচ্ছিলাম তো…’

রোযা অবশেষে মাথা তুলে তাকাল। পরমুহূর্তেই থমকে গেল আদিলের নিঃশ্বাস। চোখের খুব কাছে থাকা সুন্দর মুখটা লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে আছে। সূর্যের মিঠে আলোয় তাকে এতটাই অপরূপ লাগছে যে আদিলের হৃৎপিণ্ড আচমকাই বেসামাল হয়ে উঠল। ধুকপুক করে ছুটল কোথাও। রোযা চোখে চোখ রাখল না কোনোভাবেই। নাক ফুলিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে আদিলের গাল, নাকের চিহ্নটুকু মুছে দিতে চাইল।
অথচ আদিল দ্রুত মাথাটা রোযার হাতের কাছ থেকে সরিয়ে নিল। রোযা বিস্মিত হলো। বড়ো বড়ো চোখে তাকাল। টলটলে চোখে প্রশ্ন -

‘সরছেন কেন?’

কানের কাছে মৃদু স্বরে জবাব এল -

‘উঁহু, নট লাইক দিস, মাই মিসেস। যা দিয়ে দাগ বসিয়েছেন, তা দিয়েই উঠাতে হবে। নাহলে এই দাগ নিয়ে যতদিন কাটানো যায়, কাটিয়ে দেব।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp