ভালোবাসি সুচরিতা - পর্ব ১৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

ভালোবাসি সুচরিতা - মম সাহা
          সিলেটের স্বনামধন্য লোকদের আনাগোনা রেইনবো চাইনিজ রেঁস্তোরাটাতে। সারি বেঁধে এত গাড়ি এখানে পার্কিং করা থাকে, দেখলেই বোঝা যায় ধনীদের রাজ্য এটি। 
 জোহরা ছবি তুলতে পছন্দ করে ভীষণ। ইমনের যেই ব্যক্তিগত ক্যামেরাটি রয়েছে সেটি দিয়ে সে এক মুহূর্তেই কতগুলো ছবি যে তুলল তার কোনো হিসেব নেই। ইমন বেশ দারুণ ভাই। বোনের এই শখটিকে সে নিজেও উপভোগ করে। নানান ভঙ্গিমায়, চোখের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জোহরা যখন ছবি তোলায় মগ্ন হয়ে যায় ইমন তখন মগ্ন হয় বোনের সবচেয়ে সুন্দর ছবি তুলতে। 

 জোহরার পরনে হালকা গোলাপি রঙের একটি সিল্ক শাড়ি। কাঁচের চুড়িগুলো ওর হাত নাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নড়ছে। রুনুঝুনু শব্দ করে বাজছে। নিরিবিলি রেঁস্তোরাটায় কেবল সেই চুড়ির শব্দগুলোই একমাত্র শোরগোল করছে। কেউ কেউ খাবারের ফাঁকে, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বাঁকে জোহরার সেই অঙ্গভঙ্গিকে খেয়াল করছে। মেয়েটার এক জোড়া ভ্রমর কালো চোখ আছে বলেই হয়ত যে একবার ওকে দেখে সে আরেকটি বার দেখার জন্য দৃষ্টি না দিয়ে পারছে না। 

  খাবারের টেবিলে বসেছেন যাবের শিকদার, টুইটুবানি, প্রেমা, নোমান। খাবারের অর্ডার দেওয়ার কার্যক্রম যাবের শিকদারই সম্পন্ন করেছেন। ছবি তুলতে মগ্ন জোহরা খাবারের দিকে হুঁশ নেই তেমন। 

 রেঁস্তোরার ডানদিকে যেই জায়গাটুকু তা একান্তই ভিআইপি মানুষদের জন্য। কাঠের মোটা দরজাটির ওপাশে থাকা সেই ভিআইপি জায়গাটুকু আজ বুকিং। সেখানে অনেকগুলো বসার জায়গা থাকলেও আজ অনেকে এখানে বসেনি। বসেছে কেবল তিনজন মানুষ।
 একটি টেবিলের একটাতে বসে আছে মেজবাহ্ শেখ এবং অন্যটিতে শুক্লা।
 তার দু'টো টেবিল পেছনের একটি টেবিলে সিকান্দার বসা। পা দোলাতে দোলাতে সে গরম গরম চাউমিন খাচ্ছে। ওর আবার অত দিকে ধ্যান নেই। খাবারের প্রতি ওর বিশেষ টান রয়েছে। তাই খাবার পেলে দিন-দুনিয়ার খোঁজ সে বিশেষ রাখে না।

  শুক্লার শরীরে আজ নরম নীল রঙের শাড়ি। রেঁস্তোরার ডান দিকে খোলা জানালার বাতাসে মাটিতে এলিয়ে থাকা নীল রঙের শাড়িটির চাদর থেকে থেকে উড়ছে। সাথে ঠান্ডা হচ্ছে ওর গরম চা। 
 পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। কথোপকথন ছাড়া একদমই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। তাই মেজবাহ্ ইচ্ছেকৃত ভাবেই প্রথম কথা শুরু করল। নারীদের সাথে তার একাকী কখনো এমন বসা হয়নি বলে অস্বস্তি বেশ কাঁটা দিয়ে উঠেছিলো।

 “শুনেছিলাম, আপনি নাকি আমাকে টেলিফোন করেছিলেন? আমার খোঁজ নিতে? নাকি কোনো প্রয়োজন ছিলো?”

 অস্বস্তি কেটে গেলো মেজবাহ্'র স্বাভাবিক কথার ধরণে। শুক্লা এতক্ষণ কথা বলারই অপেক্ষায় ছিলো। মেজবাহ্'র প্রশ্নে ও হাসলো। উজ্জ্বল শ্যামলা গালগুলো হাসলো সুন্দর দেখায়। ওর বাচনভঙ্গি গোছানো বেশ। গোছানো ভঙ্গিতেই বলল,
 “হ্যাঁ, ঐ মাঝে অনেক সংবাদ ছাপলো তো আপনাকে নিয়ে তাই একটু খোঁজ নেওয়ার জন্য টেলিফোন করেছিলাম।”

  “আপনি সংবাদ বিশ্বাস করেননি?” মেজবাহ্'র দৃষ্টি চায়ের কাপে। প্রশ্ন করে ও শুক্লার দিকে তাকায়নি। তবে উত্তরটুকু জানার আগ্রহ ভেতরে রয়েছে বেশ। 

 “এইসব কি বিশ্বাস করার মতো সংবাদ? আমি কেন, আপনাকে একটু হলেও জানে এমন কেউ-ই নিশ্চয় বিশ্বাস করেনি।”

 “মানুষকে জানা কি এতই সহজ, মিস শুক্লা? আমরা যা দেখি, যতটুকু দেখি তা তো সামান্যই। তাতে কি আর জানাবোঝা হয়?”

লোকটা বেশ কথা প্যাঁচাতে জানে। তবে শুক্লাও বা কম কীসে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সে। পড়াশোনা, অভিনয় কোনোকিছুতেই কম নয়। তাই এসব কথার মারপ্যাঁচ ওর কাছে নিতান্তই সামান্য। ও এবার নিজের সামনে থাকা ঠান্ডা শরবতটুকু তুলে চুমুক দিলো। ঠোঁটের হাসিটা স্পষ্ট হলো আরও। জবাব দিলো ধীরে ধীরে, 
 “হয়ত পুরোপুরি জানা হয় না তবে কিছুটা হলেও জানাতো হয়, তাই না? তাছাড়া আমরা নারী। আমরা পুরুষদের চোখ দেখলেই বুঝতে পারি কোন পুরুষটির সাথে কোন তকমাটি মানায়। আপনার সাথে অন্তত চরিত্র নিয়ে কোনো গুজব মানায় না। যদি বলতো খু ন করেছেন কাউকে তবুও না-হয় বিশ্বাস করে নিতাম। কিন্তু চারিত্রিক বিষয়টি বিশ্বাস করা অসম্ভব।”

  শুক্লার আত্মবিশ্বাসী স্বরটি মেজবাহ্'র কানে গিয়ে লাগলো বেশ তীক্ষ্ণ ভাবে। এবার কিঞ্চিৎ আগ্রহী না হয়ে পারলোই না। সরাসরি দৃষ্টি রাখলো শুক্লার দিকে। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
 “এতটা নিশ্চিত কীভাবে?”

 “আমরা নারী। কোনো পুরুষ আমাদের দিকে কীভাবে তাকাচ্ছে তা দেখলেই আমরা ধারণা করে নিতে পারি। আপনি মেজবাহ্ শেখ কখনো আমার চোখ ব্যতীত আর কোথাও তাকাননি। আপনাকে এক-দুই মাস পরে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আমার চেহারাটি দেখতে কেমন, হলফ করে বলতে পারি আপনি আমার চেহারার বর্ণনা দিতে পারবেন না ঠিকঠাক। কারণ আপনি খেয়াল করে কখনো দেখেনইনি বর্ণনা দিবেন কী করে। যে মানুষ শুক্লার মতো অভিনেত্রীকেও দু'বার দেখেনি ফিরে সে লোক আর যাই হোক চরিত্রের দিক দিয়ে খারাপ নয়।” 
শুক্লার বুদ্ধিদীপ্ত কথা এক ধারে মনোযোগ দিয়ে শুনল মেজবাহ্। কথার মাঝে একবার টু শব্দটুকু করেনি সে। মুগ্ধও হয়েছে বটে। ও নারীদের ভেতর সচারাচর এমন যুক্তিতর্ক, উপস্থাপনার ভাব দেখে না। খুব কম নারীই আছে যারা নিজের দিকটা এত সঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারে, বোঝাতে পারে। শুক্লা তাদেরই মাঝের একজন।

  “মিস শুক্লা, আপনি ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট।” মেজবাহ্ চা খেতে খেতে উৎফুল্ল মনেই প্রশংসা করে। শুক্লার বোধহয় লজ্জা লাগে এতে। মুখ নামিয়ে ফেলে ও। আরক্ত মেঘের মতো হয়ে উঠে মুখ টুকুন। চোখ তুলে তাকায় না অব্দি।
সিকান্দার চাউমিন খেতে খেতে তাকায় সেই মুখটির দিকে। তাকিয়েই থাকে তারপর মিনিট কয়েক। এর আগে কখনো এমন করে তো তাকাতে ইচ্ছে করেনি ওর। তবে আজ কেন করছে?

—————

 রিমঝিম আজকাল ঘর ছেড়ে বের হয় না তেমন। শরীর শুকিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে মেয়েটার। চোখগুলো কোটরে চলে গিয়েছে।
ঘর অন্ধকার করে বসে থাকে। কখনো কখনো বা বারান্দা দিয়ে তাকিয়ে থাকে পথের বাঁকে। শান্ত দু'টো চোখ যেন উতলা হয়ে থাকে মনের দু'টো কথা বলার জন্য। এত বাড়িতে এত মানুষ থাকার পরেও ও গুমরে মরে দু'টো কথা বলার লোকের অভাবে। এ বাড়িটি যে তার নিজের হয়নি, আপন হয়নি।

  অন্ধকার ঘরটি আচমকা আলোকিত হয়ে উঠেছে। সুইচবোর্ডের ছোট্টো শব্দেই হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরটায়। আচমকা আলো চোখে পড়তেই চোখ বুঁজে ফেলে রিমঝিম। মাথা ধরে উঠে তার। বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে কাটাতে কাটাতে আজকাল আলোর সাথে ঠিক বনিবনা হয় না তার।

 বন্ধ চোখেই রিমঝিম অনুভব করল তাকে জাপটে ধরেছে একটি শক্তপোক্ত দেহ। দেহের ভার বেশখানিকটা রিমঝিমের শরীরের উপরে পড়েছে বলেই মৃদু স্বরে গুঙিয়ে উঠল সে। 
“রিমঝিম, রিমঝিম, আজ আমি অনেক খুশি। রিমঝিম, তুমি জানো আজ আমি জীবনের প্রথম এত আনন্দিত। আমি যা চেয়েছি তা পেয়েছি। রিমঝিম, আমার যে কী করতে ইচ্ছে করছে খুশিতে।”

 হিমেলের চঞ্চল কণ্ঠ। হড়বড়িয়ে কথা বলছে ও। রিমঝিম চোখ মেলে হিমেলের বাহুতে নিজেকে আবদ্ধ দেখে চমকে না উঠে পারলই না। হিমেল বহুদিন ওকে এমন আনন্দ ভরে জড়িয়ে ধরেনি। কতদিন পর এতটা কাছে এসেছে লোকটা, রিমঝিম নিজেও জানে না। 
 “বউ, তুমি কী চাও বলো? আজ তুমি যা চাও তা-ই দিবো। বলো কী চাও?”

  হিমেলের উৎফুল্ল স্বর এতটাই ছুটছে যে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বলার সুযোগ হয়ে উঠছে না রিমঝিমের। ও কেবল ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। বুঝতে চাইল আজ পৃথিবীর কোন নিয়ম এমন অমান্য হলো যে হিমেলের বুকটায় ওর জায়গা হলো। 

  আনন্দিত হিমেল তখন দিক ভুলে বসেছে। নিশ্চুপ রিমঝিমের জন্য তার আনন্দে যেন ভাঁটা পড়ছে। মেয়েটা ওর সাথে একটু আনন্দ করছে না কেন? ও এত আনন্দ জড়িয়ে ধরেছে তবুও মেয়েটা ওর পিঠে হাত বুলাচ্ছে না কেন?

 “কী হলো, বউ? কথা বলো না কেন?” হিমেলের কণ্ঠে আজ কেবল মায়া। নরম, কোমল স্বরে সকল প্রেম আজ উপচে পড়ছে বন্দনার মতো। রিমঝিমের কোনো কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে ও বুঝতে চাইল বিষয়টা। 
 “কী বলব বুঝতে পারছি না আসলে। এত আনন্দের কারণ?”

“বউ, আমি দলের পদটা পেয়েছি। মেজবাহ্'র পদটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। আমি পেয়েছি অবশেষে। আমি যে খুশি, বউ।” হিমেল গদোগদো হেসে উত্তর দিলো। ও বোধহয় সর্বপ্রথম খুশির খবরটা রিমঝিমকেই দিতে এলো। বাহিরে কাউকে কিচ্ছুটি বলেনি। কারণ রিমঝিম ওর কণ্ঠ বাহিরে শুনেনি। অর্থাৎ হিমেল বাড়িতে এসে সোজা এই রুমেই ঢুকেছে।

 কিন্তু রিমঝিম ভড়কালো। মেজবাহ্'র পদ হিমেল পেয়েছে তবে মেজবাহ্'র কী হলো? এই প্রশ্নটি ওর মনে এলেও ও বলার সাহস করল না। পাছে হিমেল যদি কোনো নোংরা কথা শুনিয়ে দেয়? 

 “কী হলো? তুমি কিছু বলছ না যে? তুমি কি খুশি হলে না?” হিমেল প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকালো কথাটি জিজ্ঞেস করেই। চোখ ওর সরাসরি রিমঝিমের চোখের উপর।

 রিমঝিমও তাকিয়ে আছে একই ভাবে, “তুমি খুশি তো?”

“তো খুশি হবো না? কত সাধনার ছিলো জানো?”

 “তাহলে আমিও খুশি।”

“এবার বলোতো কী চাও? যা চাইবে আজ তা-ই পাবে। বলো কী চাও?” জিজ্ঞেস করতে করতে হিমেল আরও ঘনিষ্ঠ হলো রিমঝিমের সাথে। দু'টো হাত আগলে রাখল রিমঝিমের গাল, থুতনি। 

 রিমঝিম দীর্ঘসময় তাকিয়ে থেকে খুব ধীরে বলল, “চাওয়ার তো অনেককিছুই ছিলো কিন্তু যদি তোমার দেওয়ারই হয় তবে আমায় মুক্তি দিও।”

 রিমঝিমের সেই ধীর স্বর হিমেলের কানে বুলেটের গতিতে গিয়ে আটকালো। ওর হাসি হাসি মুখটি, কুঁচকে থাকা ভ্রু দুটো সরল হয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য চাহুনিতে উচ্চারণ করল, “মুক্তি!”

—————

   রেঁস্তোরার ডান দিকে একটি বড়ো বারান্দা রয়েছে। বারান্দাটিতে রয়েছে দু'টো দোলনা। জোহরা এক কাপ চা হাতে দোলনাটিতে দুলছে মনের সুখে। এতক্ষণ ইমন ওকে ছবি তুলে দিয়েছে এখানটায়। ইমন চলে গেলেও জোহরা যায়নি। এই খোলা বাতাসে ওর যত প্রেম। রেঁস্তোরার পাশের বাগানটায় কত ধরণের আলো জ্বলছে। দেখলে যেন দেখতেই ইচ্ছে করে। ও সেদিকেই তাকিয়ে আছে। বাতাসে উড়ছে ওর কোঁকড়া চুলগুলো। 

 ওর মোহগ্রস্ত সেই ধ্যানে আচমকাই ভাঙন ঘটালো একটি কণ্ঠ। ওর পরিচিত, প্রিয়, প্রেমের সেই কণ্ঠ। এতটাই আকস্মিক কণ্ঠটি পেলো যে ও ঘুরে তাকাতেও পারল না। তখনই হুড়মুড় করে বারান্দার কাঁচের দরজাটি ঠেলে কেউ একজন চলে এলো যেন। সেই বহু পুরোনো পারফিউমটার ঘ্রাণ এসে ওর নাকে লাগতেই গায়ের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেলো। ও কি ভুল দেখছে? ভ্রম হচ্ছে এই মুহূর্তে? গা শিরশির করে উঠল ওর। কেবল মণিটুকু ঘুরিয়ে বুঝল ওর পাশেই একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। যার সাদা পাঞ্জাবিটি জোহরার মুখস্থ। যার নীল চাদরের কোণায় জোহরার স্বপ্ন বাঁধা। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp