আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৬৮ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

আদিল মির্জাস বিলাভড - নাবিলা ইষ্ক
          মেয়েটা তাদের তেমন কিছুই বলে না। সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখে। বাবা-মা হিসেবে মেয়ের পাশে সেভাবে তো দাঁড়াতে পারেননি-ই তারা। উল্টো নিজেদেরই একরকম বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে। আগের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন তাদের কপালে আর নেই বললেই চলে। আজিজুল সাহেবের মিনতিতে বাড়িঘর অক্ষত রাখা হলেও, চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সার্বক্ষণিক পাহারায় নিয়োজিত রয়েছে দুজন গার্ড। বাড়ির বাইরে পা রাখলেই তাদের চোখে চোখে রাখা হয়। সেই কড়া নজরদারির ফাঁক গলে কখন রাজুর সঙ্গে জিহাদের দেখা হয়েছে, কে জানে! ছেলেটাও হয়েছে বোনের মতোই। কিচ্ছুটি জানায়নি। জানালে তো একটা ব্যবস্থা নিতে পারতেন! অন্তত মেয়ের কানে এই খবর পৌঁছাতে দিতেন না।

এদিকে মায়ের হাতের দুটো চড় খেয়ে সোফায় বসে আছে রাজু। তার ফোনটা ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন আজিজুল সাহেব। রাগে ফোঁসফোঁস করছেন ভদ্রলোক! এত কিছু রাজু বুঝবে কী করে? সে তো ভেতরের খবর কিছুই জানত না! জিহাদ ভাই এতো এতো মিনতি করছিলেন যে রাজু বাধ্য হয় বোনকে জানাতে! ছেলেটার রক্তিম চোখজোড়া বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে আওড়ায় রাজু -

‘দুলাভাই কি খুব রাগ করেছেন? আপুর কোনো ক্ষতি করবেন না তো?’

চিন্তায় বুক ভার হয়ে আসছে নিপা বেগমের। মুখে আঁচল গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদছেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেই হৃদিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কোনো কথা ব্যতীত! আদিল মির্জা নিজেই এসেছিল স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে যেতে। বাড়িতে পা রেখেই বুঝতে পেরেছে, রোযা এখানে নেই। অথচ এর আগে নিপা বেগম কিংবা আজিজুল সাহেব কেউই জানতেন না রোযা যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। শুধু রাজুই জানত। জিজ্ঞাসাবাদে চট করে সব বলে দিয়েছে ছেলেটা।

‘আমার খুব ভয় হচ্ছে! কী হলো, জানতে না পারলে শান্তি পাব না!'

স্ত্রীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শুনেও তাকে কোনো সান্ত্বনা দিতে পারলেন না আজিজুল সাহেব। কী বলেই-বা সান্ত্বনা দেবেন? নিজের ভেতরেই যে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন তিনি! গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বডিগার্ডকে ধরে কিছু খবরাখবর জানার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওই হতচ্ছাড়াগুলো যেন একেকটা রোবট! হ্যাঁ-তে হ্যাঁ, না-তে না। এর বাইরে মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দই বের করতে চায় না। নিপা বেগমও কম চেষ্টা করেননি। বেশ কিছুক্ষণ খুঁতখুঁত করার পর স্বামীর চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেলেন এক গার্ডের সামনে।

‘আদিল মির্জার ফোন নম্বরটা দাও তো, বাবা!'

বাড়িতে যাওয়া যখন সম্ভব নয়, অন্তত ফোনে তো কথা বলা যাবে! মেয়েটার কী হয়েছে, কোথায় আছে, একবার যদি জানতে পারতেন!

—————
  
এলেন হাঁসফাঁস করছে। একপর্যায়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে চোখে চোখে জিজ্ঞেস করে, ‘এই আপদকে কী করব? তুলে নিয়ে মেরে ফেলব? নাকি এখানেই জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব?’

অথচ তখনো চারপাশজুড়ে পিনপতন নীরবতা। কতটা সময় পেরিয়ে গেছে! তবু আদিল মির্জার নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এমনকি তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দটুকুও যেন এই নিশুতি রাতের শিশিরভেজা নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেছে। আলাদা করে শোনার উপায় নেই। জিহাদ তখনো মেঝেতে পড়ে আছে। মার খেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে বহুক্ষণ। শরীরে লেগেছে দুটো গুলি, অনেকটা রক্তও ঝরেছে। অথচ এসবের দিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। শান্ত পুরোটা সময় দৃষ্টি নুইয়ে রেখেছিল। একবারের জন্যও সামনের দিকে তাকানোর সাহস করেনি। নিজের শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যন্ত আটকে রেখেছিল একরকম। অবশেষে এযাত্রায় আড়চোখে পাশে তাকাতেই তার হৃৎপিণ্ডটা যেন দুদফা লাফিয়ে উঠল বুকের ভেতর। 

আদিলের চোখজোড়া ভয়ানক লাগছে! রক্তলাল চোখজোড়া তখনো নিবদ্ধ আদিলের দুহাতের ওপর নিথর হয়ে পড়ে থাকা ভীষণ ক্ষীণদেহী শরীরটার মুখের ওপর। রক্তশূন্যতায় মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। ফর্সা, কোমল চোয়াল আর সংবেদনশীল গলায় এবার শুধু আঙুলের দাগই পড়েনি, চামড়া ভেতরের দিকে দেবে গেছে। সেখানে গভীর ক্ষতচিহ্ন পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে শক্তির প্রয়োগ আর কম করেনি। হঠাৎ আদিলের ডান হাতটা উঠে এল রোযার ঘাড়ের কাছে। আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দেখতে গিয়েও কেঁপে উঠল নিজ অজান্তেই। ধীরে ধীরে নুইয়ে এল মাথাটাও। তার শক্ত, দৃঢ় ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে গেল রোযার দাগ বসে যাওয়া চোয়াল। বসে যাওয়া গভীর, গম্ভীর কণ্ঠ ছিঁড়ে বেরিয়ে এল বিড়বিড়িয়ে - 

‘হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান টু মি, সিই? আই ক্যান বি দ্যাট অবিডিয়েন্ট ফর ইউ, ক্যান বি দ্যাট ডেঞ্জারাস ফর ইউ। এভরিথিং ডিপেন্ডস অন ইউ, মাই বিলাভড।’

হাতের ওপর নিথর হয়ে পড়ে থাকা শরীরটাকে ভীষণ যত্নে কোলে তুলে নিল আদিল। এক হাত পিঠের নিচে, অন্য হাত দুহাঁটুর ভাঁজে রেখে বুকের সঙ্গে আগলে ধরল তাকে। অথচ রোযার মাথাটা পেছনে হেলিয়ে পড়ল। আদিল দ্রুত কদম বাড়াতেই শান্ত পিছু নিল। কিছুটা সংকোচ নিয়ে অবশেষে আস্তে জানতে চাইল -

‘কী করব, বস? ওর?’

আদিলের কদম থামল না। তার প্রাণহীন কণ্ঠ ভেসে এল, 'ওর পেছনে কেউ আছে! তারাই ওকে বাঁচাবে। লোক রেখে যা।’

শান্তর মস্তিষ্ক মুহূর্তে দৌড়ায়! ম্যাডামের খবর এই বলদ পাবে কীভাবে? ওর কি সে ক্ষ মতা আছে? নেই! তবে? আর দেরি করল না শান্ত। তড়িঘড়ি হাতের ইশারায় বাকিদের দুই ভাগে ভাগ করে একদলকে পেছনে রেখে অন্যদের নিয়ে ছুটল বসের পিছু পিছু। এলেন শেষবারের মতো জিহাদের কাছে গিয়ে দেখে নিল, ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে কি-না। শ্বাস চলছে নিশ্চিত হয়ে তাকে ওভাবেই ফেলে রেখে সেও বড়ো বড়ো কদম ফেলে পেছনে ছোটে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখা গেল, কালো গাড়িগুলো সরু গলিটার প্রায় পুরোটাই দখল করে রেখেছে। গাড়িগুলো থেকে কিছুটা দূরে তখনো দাঁড়িয়ে আছে একটি ট্যাক্সি। চালক ভদ্রলোক ট্যাক্সির সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে ভয়ে উঁকি দিচ্ছিলেভয়ে তার আত্মা শুকিয়ে এল পালাতে ইচ্ছে হলো না! চিন্তা হচ্ছিল যে ওই মেয়েটির, যে ভেতরে গিয়েছিল! এরপরই তো ঝড়ের গতিতে এল ভয়ংকর আবহাওয়ায় তুলকালাম তুলা লোকজ্ন গুলো! বন্দুক-টন্দুক দেখে ভয়ে একেবারে চুপসে গিয়েছিলেন চালক। কিন্তু অচেতন রোযাকে যখন ওই লম্বাচওড়া, পেশিবহুল পুরুষটির কোলে দেখলেন, তখন তার ভয় যেন আরও বেড়ে গেনিজের জন্য, সুন্দর দেখতে ওই মেয়েটির জন্যও! কাপুরুষের মতো পালাতে পারলেন না। দূর থেকেই ঢোক গিলে, কণ্ঠে মিনতির সুর এনে কোনোরকমে জিজ্ঞেস করলেন -

‘উনারে কেন নিতাছেন, সের?’

আদিল সঙ্গে সঙ্গেই তাকাল। ওই দৃষ্টি নির্বাক দৃষ্টি বুঝেই মুহূর্তে রুক্ষসুশক লোকটার ঘাড়ের লোম যেন খাড়া হয়ে গেল। কাঁপল হাতপা। ধড়ফড়িয়ে ওঠে বুক। আদিল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। তার চোখের ইশারা পেয়ে শান্ত বিরক্ত চোখে একবার তাকিয়ে এগিয়ে এল চালকের কাছে। চালকের হাতে হাতে কয়েকটি টাকা গুঁজে দিয়ে ফিরে আসতে যাবে, এমন সময় ভদ্রলোক টাকাগুলো ফেরত দিতে চেয়ে পুনরায় আকুতি জানালেন -

‘উনারে কি ছাইড়া দেওয়া যায় না?’

শান্ত ফিরে তাকাল এবারে। সৎ ভদ্রলোকের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘উনি আমার বসের স্ত্রী! তার স্ত্রী!'

এতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ট্যাক্সিচালক। দেখেই বুঝেছিলেন, বড়লোক বাড়ির মেয়েমানুষ! কিন্তু এতটা বড়লোক, তা তো ঘুণাক্ষরেও টের পাননি! শান্তর মুখে কথাটা শুনে ভদ্রলোকের এমন উদ্বেগ আর আন্তরিকতা দেখে মৃদু মাথা নাড়ল তিনি। আজকাল এমন ভালো মানুষ কজনই-বা আছে! ততক্ষণে এলেন গাড়ির দরজা খুলে ধরেছে। রোযাকে কোলে নিয়েই আদিল ব্যাকসিটে উঠে বসল। মুহূর্তেই গাড়িগুলো দ্রুতগতিতে ছুটে চলল গন্তব্যের দিকে। সারাটা পথজুড়ে বিরাজ করল নিস্তব্ধতা। আদিলের দৃষ্টি একবারের জন্যও সরে এল না জ্ঞানহীন রোযার মুখের ওপর থেকে।  

—————

আজ কুয়াশা বেশ ঘন হয়ে নেমেছে। শীত পড়েছে ভীষণ। মৃদু বাতাস বইছে বাইরে। আকাশে চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে। বারান্দার কাচের দরজা বন্ধ থাকলেও পর্দা সরানো থাকায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। নূরজাহান বসে আছে বিছানার পাশে। পরম মমতায় বুলিয়ে দিচ্ছিল রোযার মাথায়। তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছে রোযার গলা আর চোয়ালের দিকে। কী বিভৎস অবস্থা! তিনি শান্তকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী হয়েছে ম্যাডামের! কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি। কিছুক্ষণ আগেই ক্ষতচিহ্নগুলোতে মলম লাগিয়ে দিয়েছে সে। অথচ কিছুতেই বুঝতে পারছে না, হঠাৎ এমন কী ঘটে গেল! এই তো সবকিছু চমৎকার চলছিল। কিছুটা সময় গড়াল, এমন সময় নড়ে উঠল রোযার চোখের পাতা। ধীরে ধীরে চোখজোড়া পিটপিট করছে। মুহূর্তেই নড়েচড়ে বসল নূরজাহান। রোযার গালে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে ডাকল -

‘ম্যাডাম! ম্যাডাম!’

রোযা এবার চোখ মেলে তাকাল পুরোপুরি। নূরজাহান ততক্ষণে এক গ্লাস পানি নিয়ে ফিরে এসেছে। রোযাকে ধরে ধীরে ধীরে উঠিয়ে বসাল। নিজ হাতে পানি পান করাল। রোযা নিঃশব্দে পান করল দুঢক। রোযার এমন নিরুত্তাপ মুখের দিকে তাকিয়ে নূরজাহানের পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। প্রথমবার যখন রোযাকে দেখেছিল, ঠিক এমনই ছিল মেয়েটার চেহারা। তবে কি আবারও সেই দিনগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে? মাঝখানের এই সুন্দর দিনগুলো কি তবে কেবলই একটুকরো স্বপ্ন ছিল?

‘ম্যাডাম? কিছু খাবে—’

কথাটা শেষ করতে পারল না নূরজাহান। রোযার রক্তিম চোখজোড়ার দিকে তাকাতেই যেন হারিয়ে গেল তার সমস্ত কথা। স্নেহভরে হাত বাড়িয়ে রোযার মাথায় হাত রাখতে চাইল। কিন্তু পারল কই! অদৃশ্য কোনো দ্বিধা তাকে আটকে দিল। শেষমেশ অসহায় কণ্ঠে শুধু জিজ্ঞেস করল -

‘কী হয়েছে, ম্যাডাম?’

পরমুহূর্তেই শরীর এলিয়ে দিল রোযা বিছানার হেডবোর্ডে। কারও সামনে চোখের জল ফেলতে পারে না সে। তাই দুগাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুভেজা মুখটা দুহাতে ঢেকে রাখল। এই মুহূর্তে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে তার। অসহ্য এক যন্ত্রণা যেন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। জিহাদকে বিয়ে করতে চেয়েছিল সে, কারণ ছেলেটা তার খুব ভালো বন্ধু ছিল। এমন এক বন্ধু, যে সবসময় তার পাশে থেকেছে। তারপর একদিন জানিয়েছিল, রোযাকে ভালোবাসে। তখন পারিবারিক টানাপোড়েনে নুইয়ে পড়েছিল রোযা। ভালোবাসার জন্য আলাদা করে কোনো জায়গা ছিল না তার জীবনে। জিহাদ তবু অপেক্ষা করে গিয়েছিল বছরের পর বছর। জেনেও যে, রোযা তাকে ভালোবাসে না। অন্তত সেই অর্থে নয়, যে অর্থে জিহাদ তাকে চেয়েছিল। একসময় পারিবারিক জটিলতা কাটল। জীবনে সাফল্য এল। দেখতে দেখতে বিয়ের বয়সও পেরিয়ে গেল। অথচ জিহাদ তখনো হাত বাড়িয়ে অপেক্ষায়। কাছেই ভালো এই বিকল্পটাকেই মেনে নিয়েছিল, রোযা রাজি হয়ে গেল বিয়েতে।

 ছেলেটার চরিত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। অন্তত রোযা তেমন কিছু জানত না। তাই বিয়েটাকে অসম্ভব কোনো সিদ্ধান্তও মনে হয়নি তার কাছে। অথচ জিহাদের সত্যিটা, খালাতো বোনের সাথে সম্পর্ক জানার পর ঘৃণায় সারা শরীর জ্বলে উঠেছিল। আর তার পরপরই আদিলের সঙ্গে তার সেই জোরপূর্বক বিয়ে—সেটাও কোনো না কোনোভাবে মেনে নিতে শুরু করেছিল সে শুধুমাত্র প্রতারণা পেয়ে। অথচ সবটাই যে মিথ্যে ছিল! পুরোটা সাজানো চাল! কিছু একটা আঁচ করতে পারা আর নিজের কানে সেই সত্য শোনা এক কথা যে নয়। অনুমানের অস্পষ্টতাকে কোনোভাবে সামলে নেয়া যায়, কিন্তু এমন সত্য কীভাবে সামলাবে? রোযা কি ধরে নেবে, তাকে পাওয়ার রাস্তায় যেকাউকে মে রে ফেলতে পারে? হয়তো-বা মেরেছেও! 

অথচ জিহাদের তো তেমন কোনো দোষ নেই! সে শুধু সত্যিটা জানাতে চেয়েছে। জানালেই বা দোষের কী? জানার রাইট কি তার নেই? সারাজীবন অন্ধকারে থেকে যেত সে? নিজের জীবনের এত বড় একটা সত্য না জেনেই কাটিয়ে দিত বাকি দিনগুলো? সেই নির্দোষ ছেলেটাকে কেন মেরে ফেলতে চাইবে? এখন রোযার কথারও আর কোনো মূল্য নেই! এইজন্যইতো শোনেনি তখন। তিক্ত কথাগুলো বলতে বাধ্য হয় রোযা! আর কী বা বলে বাঁচাতো? সে নিজেকে সামনে না দাঁড় করলে আদৌ থামতো? আবার থামতে নাও পারে! 

রোযা এখনো নিজের গলায় আদিলের সেই ভয়ংকর থাবার স্পর্শ অনুভব করতে পারছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সত্যিই গলা টিপে মেরে ফেলবে তাকে।

‘রোযা…’

নূরজাহান বোধহয় এই প্রথম তাকে ম্যাডাম না বলে নাম ধরে ডাকল। তবু মুখ থেকে হাত সরাল না রোযা। নূরজাহানই শেষমেশ আলতো করে তার হাত দুটো সরিয়ে দিল। কান্নায় ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। চোখদুটোও অশ্রুতে টকটকে লাল।

‘শান্ত হও…’

‘কীভাবে? কীভাবে হব আমি, নূরজাহান?’

কণ্ঠটা কেঁপে উঠল রোযার। জমে থাকা কান্না আর অভিমান একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল -

‘জেনেশুনে যে সে আমার পুরোটা জীবন নিয়ে নিজের মতো করে খেলেছে! তার চারপাশে এত এত মিথ্যে! আরও কত কী লুকিয়ে রেখেছে আমার কাছ থেকে? আর কত? কেন আমার সবার থেকে জেনে বেড়াতে হবে! কেন বলেনি আমাকে?'

নূরজাহান এখনো পুরো ঘটনা জানে না। তাই কোনো উত্তর দিতে পারল না। রোযাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও খুঁজে পেল না। আদিল মির্জা যে তার জন্য পাগল তা আর শব্দে বলে লাভ আছে কী? অথচ সত্যের চেয়েও বেশি আঘাত করেছে রোযাকে আদিলের ব্যবহার। এর আগেও তো আদিল তার গলা চেপে ধরেছে, চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরেছিল। তখন তো তার যায় আসেনি! কারণ তখন সে ভালোবাসেনি। কিন্তু এখন? রোযার অশ্রুসিক্ত চোখজোড়া ধীরে ধীরে অভিমানে, রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। ক্রমশ শক্ত হয়ে এল দাগ বসা চোয়াল খানা। নূরজাহানকে বিস্মিত করে দিয়ে রোযা বিছানা ছেড়ে নামল দ্রুত। এলোমেলো শাড়িটা কোনোরকমে গুছিয়ে নিয়ে, এলোমেলো চুলে খোঁপা করে নিল। চাবিটা তুলে হনহনিয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। হতভম্ব নূরজাহানও দ্রুত পিছু নিল তার। ক্রমাগত ডাকল -

‘ম্যাডাম!’

রোযা শুনল না। তিনতলার করিডোরের শেষ মাথায় পৌঁছাতেই চোখে পড়ল আদিল মির্জাকে। খোলা বারান্দায় সটান দেহে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। পরনে সেই স্যুট, হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। দৃষ্টি নিবদ্ধ বাইরে, কোথায় কে জানে। পদচারণের শব্দ চিনল আদিল! তার যে রোযা জনিত সবটাই মুখস্থ! মাথা নয়, সেই পুরোটা ঘুরে দাঁড়াল। মুহূর্তেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল দুজনের। কেঁদে কেঁদে চোখমুখ লাল করে ফেলেছে রোযা। গলা আর চোয়ালের দাগগুলোও আরও বাজে ভাবে ঝলমলে আলোয় স্পষ্ট হয়ে আছে। যা চোখে বিঁধছে আদিলের। দৃশ্যটা চোখে পড়তেই ডান হাতটা ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল। হাতের মুঠোয় আটকে রইল জ্বলন্ত সিগারেট। পুড়ে যেতে লাগল হাতের তালু, অথচ সেই যন্ত্রণা অনুভব করার অবকাশটুকুও যেন নেই তার।

নূরজাহান আর এগোল না। থমকে দাঁড়াল পেছনেই। দৃষ্টি নোয়াল। রোযাই এগিয়ে এসে দাঁড়াল আদিলের সামনে। রক্তিম, অশ্রুসিক্ত টলমলে চোখজোড়ায় দুর্দমনীয় জেদ। চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি অবিচল। রোযা হিসহিসিয়ে ওঠে -

 'ক্ষমতা আছে বলে মানুষকে মানুষ মনে করেন না, তাই না? আপনার হাতের পুতুল আমি—যেভাবে নাচাবেন, নাচব, তাই তো? দ্বিমত প্রকাশ করলে গলা টিপে ধরবেন। বন্দী করে রাখবেন!’

আদিল বিপরীতে যে একটা শব্দও উচ্চারণ করে না। নিশ্চুপভাবে মেনে নেয় স্ত্রীর ক্ষোভের হুংকার। আদিলের এমন নির্বিকার অভিব্যক্তি, দৃঢ় দৃষ্টি রোযার রাগ আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায় -

'আপনি আদিল মির্জা হলে আমিও আয়াত তালুকদার রোযা! আপনার ক্ষমতা আমায় আটকে দেখাক তবে আজ।’

রোযা উল্টো পথে ঝড়ের গতিতে ঘুরে হাঁটা ধরল। তাতে ছুটল খোঁপা, উড়ল তার চুল, আঁচল, কুঁচি। আশেপাশে কোথাও না তাকিয়ে সিঁড়িগুলো দ্রুতো গতিতে নেমে সোজা চলে এল বাড়ির বাইরে। গ্যারেজে রাখা অনেকরকমের গাড়ি। লাল রঙের গাড়িটাতেই উঠে বসল সে। কী-হোলে চাবি ঢুকিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে ফেলল। এলেন, শান্ত, ক্লান্ত—সবাই তখন হতবিহ্বল। বারে বারে তাকাচ্ছে ওপরে! তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের বড়ো বড়ো চোখের সামনেই গাড়ি স্টার্ট করে হাইয়েস্ট গতিতে ড্রাইভওয়ে পিষে ছুটল রোযা। রোযার দৃষ্টি সোজা, অনড়। ম্যানশনের গেট খুলে না দিলে এই গাড়ি আজ গেটের সঙ্গে যুদ্ধ করে আগুন লাগিয়ে ছাড়বে। প্রয়োজনে জ্বলন্ত গাড়িতে ও পুড়ে যাবে!

এই লোককে শিক্ষা না দিলে রোযা নিজের নাম পাল্টে ছাড়বে! ওদিকে গেটের কাছে দাঁড়ানো দুজন গার্ড তেড়ে আসা গাড়ি দেখে আতঙ্কে পড়ে গেছে। অথচ কোনো নির্দেশ না পাওয়া অবধি তারা গেট খুলে দিতে পারবে না। অন্যদিকে শান্ত আর এলেন তাকিয়ে আছে ওপরে, তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা আদিল মির্জার মুখের দিকে। যার দৃষ্টি ছোটা ওই গাড়িতেই। গাড়ি থামার লক্ষণ নেই। বন্ধ করে রাখা দরজাতেই বুঝি হামলে পড়বে গাড়ি সমেত। হার মানল আদিল মির্জা! অবশেষে ইশারা করল। তার করতে দেরি, শান্ত তক্ষুণি দ্রুত ব্লুটুথে আদেশ ছুড়ে দিল -

'গেট খুলে দে। ফাস্ট ফাস্ট ফাস্ট!’

গেট বিদ্যুৎগতিতে খুলতে শুরু করেছিল। মাত্র অল্প খোলা হয়েছে, তারমধ্যেই হাওয়ার গতিতে বেরিয়ে গেল রোযার গাড়িটা। পরমুহূর্তেই তার পেছনে বেরিয়ে এল এলেন আর ক্লান্ত গাড়িও। শান্ত চমকে রয়েছে তখনো। দৃষ্টির বাইরে গাড়িগুলো যেতেই ওপরে তাকাল। আদিল তখনো দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি সোজা, দরজার দিকে। হাতটা জ্বলছে বোধহয়! চোখের সামনে এনে বুঝল তালু পুড়ে গেছে। তাতে তেমন যন্ত্রণা অনুভব করছে না যে। কানে ভাসছে তখনও রোযার বলা কথাগুলো। আদিল চোখ বুঝল। পরমুহূর্তেই দেয়ালে সজোরে কয়েকটা ঘুষি বসাল পোড়া হাত দিয়েই। দুটোর পরে তিনটা বসাতেই র ক্তে মেখে গেল দেয়াল! আদিলের বিড়বিড়িয়ে বলা কথাগুলো ভেসে বেড়াল সবটা জুড়ে -

'আমার সমস্ত ক্ষমতা শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য, রোজ-আ! তোমার জেদ, অভিমান, ক্ষোভের সামনে শুধু আমার ক্ষমতা না... এই আদিল মির্জাই মাথা নোয়াতে বাধ্য।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp