ইতালির বুকে রূদবাহ্ খুব সুন্দর দিন কাটাচ্ছে। তার দুটো বন্ধু হয়েছে এখানে। ছেলেটার নাম লরেঞ্জো, আর মেয়েটার নাম আলেসিয়া। আলেসিয়া মেয়েটা তার রুমমেট। ব্যক্তিত্ব খুব চমৎকার। নিত্যনতুন ডেয়ার নিতে পছন্দ করে।
সপ্তাহন্তে আজ সে তাকে শহর ঘুরাতে নিয়ে এসেছে। গ্যালেরিয়া ভিত্তোরিওর ভেতরের এক ক্যাফের জানালার পাশের ক্যাফেতে বসে রয়েছে তারা। রূদবাহ্ চারপাশে সময় নিয়ে চোখ বোলাচ্ছে। তার মাথার ওপর কাঁচের বিশাল গম্বুজ, চারপাশে মানুষের কোলাহল আর ইতালিয়ান কথোপকথনের মৃদু আওয়াজের মাঝে একজন এসে ধোঁয়া ওঠা কপির কাপ তাদের টেবিলে দিয়ে গেল। আলেসিয়া কফির কাপটা হাতে নিয়ে নিজস্ব অ্যাক্সেন্টে ইংরেজিতে বলল,
-“আমি তোমাকে একটা ডেয়ার দিতে চাই। এই ডেয়ারটা কমপ্লিট করতে পারলে আমি বুঝব, তুমি আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য।”
তার কথা বলার ছেলেমানুষী ধরনে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল রূদবাহ্,
-“কী ডেয়ার?”
-“তোমাকে কিন্তু করতেই হবে।”
-“আগে শুনি।”
-“আমরা ওই দরজার সামনে দাঁড়াব। আর ওখান দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে একাদশতম ব্যক্তিকে তুমি একটা অফার করবে। বলবে, হাই! আ'ম লুকিং ফর আ হাজব্যান্ড। আর ইউ ইন্ট্রেস্টেড?”
কফিতে জিভ পুড়ল রূদবাহ্র। বড়ো বড়ো চোখে তাকাল আলেসিয়ার দিকে। কণ্ঠে একরাশ বিহ্বলতা নিয়ে বলল,
-“আলে, এগুলো কোন ধরনের ডেয়ার?”
-“দেখো, ডেয়ার এমনই হয়। মানা করলে বুঝব তুমি ভীতু আর আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্য না। এমনিতেও তোমার ভাগ্য ভালো, আমি বলিনি কিস করতে।”
রূদবাহ্ রাগান্বিত চোখে একদফা তাকালে আলেসিয়া মুখ ভেঙচাল। রেগে থাকতে আর পারল কই? হেসে উঠল রূদবাহ্। মৃদু স্বরে বলল,
-“চলো।”
ক্যাফের অটোমেটিক স্লাইডিং ডোরের দুইপ্রান্তে তারা দুইজন দাঁড়িয়ে রইল, যাদের একজনের চোখে তখন ভয়, উত্তেজনা, আশঙ্কা মিলেমিশে একাকার, তো অন্যজনের চোখে প্রচণ্ড আনন্দ, উল্লাস ও কৌতূহল।
দ্যি গ্রেট আলে গণনা করতে লাগল।
১... ২... ৩...
রূদবাহ্ আরেকবার অসহায় চোখে তাকিয়ে বলল,
-“অন্যকিছু করা যায় না?”
আলেসিয়া ক্রমাগত মাথা নাড়ল।
৫... ৬... ৭....
রূদবাহ্ আবার বলল,
-“দেখো আলে, ঝামেলা হলে কিন্তু আমি সব তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবো!”
-“দিও।”
৮...৯...১০...
রূদবাহ্র বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। পরবর্তীতে সামনে কে এসেছে, সেটা কোনো মহিলা না-কি পুরুষ না-কি পেট... কিচ্ছু দেখল না। কেবল সেই শিখিয়ে দেওয়া বুলি না থেমে বলে গেল,
-“হাই! আ'ম লুকিং ফর আ হাজব্যান্ড। আর ইউ ইন্ট্রেস্টেড?”
পিনপতন নিস্তব্ধতা ভেসে এলো ওপাশ থেকে। কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জাতীয় কিছু না পেয়ে রূদবাহ্ একবার ভেবে বসল, সে বেচে গেছে। কিন্তু... একটা উডি, স্মোকি ফ্রেগ্রেন্স তার নাসারন্ধ্রে তীব্রভাবে আছড়ে পড়ল। সে নিজের খুব কাছে কারো অস্তিত্ব বাজেভাবে উপলব্ধি করতে লাগল। হৃৎপিণ্ড থমকে গেল তার। এক ঝটকায় চোখ দুটো খুলে ফেলল।
আর ঠিক তার মুখোমুখি অবস্থানে, তার দিকে ঝুঁকে, তার একপাশের দেয়ালে হাত রেখে তারই দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যক্তিটির ঠোঁটে কোনো হাসি ছিল না, চোখে আগুন ছিল। আর কণ্ঠে? উত্তাপ...
-“মোর দ্যান আই শ্যুড বি।”
রূদবাহ্ অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল অ্যাডামের দিকে। সে যে কত বাজেভাবে ফেঁসে গেছে, তখনো সেই অনুমান তার নেই। ‘হেহে’ শব্দে হাসল সে। বলল,
-“এটা ডেয়ার ছিল। থ্যাংক ইউ। এখন সরুন। আমি যাব। আলে, প্লিজ ওনাকে বলো, আমরা দুষ্টুমি করছিলাম।”
আলেসিয়া এগোনোর দুঃসাহস করল না। তবে সদ্য পাতানো বন্ধুকে এভাবে বিপদের মুখে ফেলে দৌড়ে পালানোর বৈশিষ্ট্যও তার মধ্যে নেই। সে জানত না, অ্যাডাম রোমানো এখানে এসে হাজির হবে। যদি জানত, আজকে ডর্মিটরি থেকেই বেরোত না।
আলেসিয়া বলল,
-“আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমরা দুঃখিত, স্যার। প্লিজ আমার ফ্রেন্ডকে যেতে দিন।”
রূদবাহ্ আবারও নিজেকে ছাড়নোর শেষ প্রয়াসে বলল,
-“প্লিজ সরে দাঁড়ান। আপনি আশেপাশে থাকলে আমার দম আটকে আসে। আমি ব্যাড ভাইবস পাই।”
ভরা মেহফিলের চোখ ও মনোযোগ তখন অ্যাডামের দিকে স্থির। আর তার চোখ সেই হরিণী চোখে। ঠোঁটের কোণায় সামান্য বাঁক ফুটিয়ে সে ঘোর লাগানো কণ্ঠে বলল,
-“ওয়েলকাম টু হেল, সুইটহার্ট।”
—————
অদ্ভুতরকমের রুমটিতে তখন মলিন আলো জ্বলছে। বারান্দা ও জানালা বেয়ে আসা রোদের উত্তাপ ভারি পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়েছে। বিছানার ওপর উবু হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটি। তার পরনে প্লাজো আর কালো ওভার সাইজড টিশার্ট। টিশার্টটা তার নয়। অন্য এক বান্দার। মৌরি কেন যে লোকটার পরিধেয় পোশাকে এত স্বস্তি পায়! ঠোঁট কামড়ে ভাবল মৌরি। তাকিয়ে রইল ফোনের স্ক্রিনে সদ্য আসা ম্যাসেজটির দিকে। যেখানে লেখা আছে,
-“খেয়েছো?”
সেদিন ইভেন্ট থেকে ফেরার পর নওশাদ কিছু জরুরি কাজে অন্য শহরে গিয়েছিল। তারপর আজ সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। এই বাড়িটা বিষণ্ণভাবে তার মনের ওপর কবজা করে রেখেছে। এই বাড়িটায় স্মৃতি আছে, আবছা, পুরোনো, ভাঙা ভাঙা। এই বাড়িটায় কিছু অতীত দাফন করা আছে। মৌরি টের পায় সেটা। তবে কিছু স্পষ্ট হয় না।
মৌরি রিপ্লাইতে লিখল,
-“আপনি কবে আসবেন?”
নওশাদের রিপ্লাই এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই,
-“কেন? তুমি আমার কাছাকাছি থাকতে চাও?”
মৌরি এর রিপ্লাইতে বলল,
-“আপনার মতো জাহিল মানুষ আমি দুইটা দেখিনি। আপনার আসা লাগবে না। যেখানে আছেন, সেখানেই মুড়ি খান।”
তারপর ফোনটা বিছানার ওপর ফেলে রেখেই উঠে গেল। সে এটুকু নিশ্চিত হয়েছে এতদিনে যে, এখানে সেফ আছে। তার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নওশাদের নেই। আর এমনও তো হতে পারে, নওশাদ তাকে পছন্দ করে? মৌরির হিশামের প্রতি তীব্র ভালোবাসা দেখে সরাসরি কনফেস করার সাহস পায়নি? তাই মিথ্যে গার্লফ্রেন্ডের অজুহাত দেখিয়ে তাকে আটকে রেখেছে? হতে পারে না?
মৌরির চোখ কপালে উঠে গেল। কারণ এটা হবার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। এত বেশি যে, প্রয়োজনে গাছের পাতার রঙ সবুজ অস্বীকার করা যায়, এই সত্যকে নয়।
মৌরি আসলেই একটা উজবুক। নওশাদ ঠিকই বলে। তাকে বোকা বানাতে গাঁধারও পরিশ্রম করা লাগবে না। নয়তো এই একটা সত্য তার মাথায় আসতে এতদিন কীভাবে লেগে গেল?
আর নওশাদ... সে খারাপ না। মাঝেমধ্যে একটু ভালো। মৌরির মন ও মস্তিষ্কে তখন তাই চলছিল, যা একটা বছর ছয়েকের বাচ্চার সামনে চকোলেট এগিয়ে দিয়ে ‘এটা তোমার জন্য’ বলার পর চলে।
সে লাফাতে লাফাতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। ড্যাগার বাড়ির মূল দরজার সামনে পাহারারত সৈনিকের মতো বুক ফুলিয়ে শুয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ঠিক তার দিকে। মৌরি মনে মনে একশত একত্রিশটা গালি দিয়ে ব্যাক ইয়ার্ডে চলে গেল।
এখানে নতুন কিছু গাছ লাগিয়েছে সে কিছুদিন আগে। একপাশে সাদা রঙের কিছু একধাঁচের ফুলগাছ, একপাশে লাল রঙের। সে গাছে পানি দিতে দিতে চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগল।
আজকের আকাশটা সুন্দর। মৌরি খেয়াল করল, বাড়ির পেছনের দিকে কোনো প্রাচীর নেই। এখানে বেশ অনেকটা জায়গায় বড়ো বড়ো গাছ জন্মেছে। মৌরি কৌতূহলী হলো। তার দেখার ইচ্ছে লাগল, জায়গাটা ঠিক কতটুকু বিস্তৃত।
সে ভেতরে প্রবেশ করলে চারপাশের গাছ, ছায়া ধীরে ধীরে তীব্র হতে লাগল। রোদের প্রকোপ কমে এলো অদ্ভুতভাবে। আলো-আঁধারির সাথে খেলতে থাকা এই স্থানকে কোনো জঙ্গল বললে ভুল হবে না।
এখানে একটা পুকুর আছে সামনেই। সেই পুকুরেও শ্যাওলা জমেছে। পানি একদম উপর অবধি ছুঁইছুঁই। খুব শান্ত, ভয়ংকর।
মৌরির বুকের ভেতরটা তীব্রভাবে কাঁপতে লাগল। তার মনে হতে লাগল, ঠিক কাঁধের কাছে কেউ আছে। কেউ শ্বাস নিচ্ছে। দুইহাতে টিশার্টটা খামচে ধরল সে। ধীরে ধীরে পিছে তাকাল।
কেউ ছিল না।
তারপর আচমকা একটা কালো বিড়াল ছানা কোত্থেকে এসে যেন তার পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বুকে হাত রেখে এক প্রকার লাফিয়ে উঠল মৌরি। আতঙ্ক নিয়ে একবার বিড়ালটার দিকে তাকাল। পরক্ষণে তাকাল পুকুরের দিকে।
অনেক দেখা হয়েছে। এবার বাড়ি ফেরা উচিত তার। আর এক সেকেন্ড এখানে থাকলে মরে যাবে সে। এসব ভাবনার মাঝেই সে দৌড় লাগাল। দৌড়াতে দৌড়াতে যেখানে এসে দাঁড়াল, সেখান থেকে চারপাশ একই রকম দেখতে লাগল।
মৌরি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছিল। এই জায়গাটা কতটুকু বড়ো, সেই অনুমান মৌরির ধীরে ধীরে হতে লাগল। এই জায়গাটা শহরের পেছনের ওই পাহাড়ের সাথে গিয়ে ঠেকে। যখন বাড়িতে ছিল, তখন ঘড়িতে বেজেছিল চারটা কুড়ি। এতক্ষণে পাঁচটার বেশি বাজে। ঘন্টা খানেকের মধ্যে বেলা তলাবে। আলো ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে আর তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।
সে পা গতিশীল করল। আশেপাশে না তাকিয়ে, কিছু না শুনে, কিছু না খেয়াল করে, একদম এক দিশায়, সোজা। আনুমানিক সতেরো মিনিটের একটানা দৌড়ের পর তার পা কিছু একটায় আটকাল, সে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। তার হাতে, পায়েসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত হলো। সে পিছে তাকাতেই ভয়ে জমে গেল। তার হাত-পা কাঁপতে লাগল থরথর করে। তার নিশ্বাসেরা গতি হারাল।
সে এই মুহূর্তে যার সাথে আটকে পড়ে গেল, সেটা একটা কবর ছিল। জঙ্গলের শেষমাথায় পাহারের প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে একটা কবর। মৌরি তাকিয়ে রইল কবরটার দিকে। চোখ সরানোর দুঃসাহস করল না। তখনো পুরোপুরি অন্ধকার হয়নি। তার মনে হচ্ছিল, সে এখান থেকে অন্যদিকে তাকালেই এই কবরের ব্যক্তিটিকে দেখতে পাবে।
মৌরির বুকের যেটুকু সাহস, যেটুকু দম আটকে ছিল, তা বের হয়ে গেল পরবর্তী মুহূর্তেই। কবরফলকটা দেখে। সেখানে ইংরেজি অ্যালফাবেটে লেখা,
—————
NAWSHAD AZMEER
Born: Jan.18.1996
Died: Nov.9.2015
Rest in eternal Peace.
—————
মৌরি দুইহাতে মুখ চেপে ধরে নিজের চিৎকার থামাল। পিছে সরে এলো কিছু পদক্ষেপ। কিছু মুহূর্ত আগে যেই ব্যক্তিটির সাথে চ্যাট করছিল মৌরি, সে এগারো বছর আগে মারা গেছে। তার কবর এটা, তার লাশ এই মাটির ছয়হাত নিচে, তার গায়ে মাংস নেই, তার হাড়গুলোও ক্ষয়ে গেছে।
মৌরির শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। তার অ্যাজমা ট্রিগার হয়েছে আর ইনহেলার সাথে নেই।
এই মুহূর্তে কোনো অশরীরীর হাতে তার মৃত্যু না হলেও, শ্বাসকষ্টে সে ঠিক মারা যাবে। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তার চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হতে লাগল কিছু সময়।
হিশাম না, বাবা না, মিশু না।
নওশাদের সাথে কাটানো এই দেড় সপ্তাহ।
সে শ্বাস নিতে লাগল লম্বা করে। তার চোখ তখন বড়ো আকৃতি ধারণ করেছে। অশ্রু মাটিতে পড়ে শুকিয়ে যেতে লাগল। তার জীবনের শেষ শ্বাস গোণা অবস্থায় পেছনে কারো উপস্থিতিতে আঁতকে উঠল মৌরি।
আজরাইল?
হয়তো। তারপর তার ভীতু হৃদয় এই মুহূর্তে যেই আওয়াজটার প্রত্যাশা করতে চায়নি, এটা তারই ছিল। সেই গম্ভীর অথচ নরম কণ্ঠটা শোনা গেল তখন,
-“ব্রিদ, ডার্লিং...”
·
·
·
চলবে……………………………………………………