আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ২৬ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

আজ ওদের মন ভালো নেই
          দাদাজানের ত্রি-তল নিবাসে খানাপিনার কোনো রুটিন টাইম নেই। সুবেহ-সাদিকের প্রারম্ভে হেঁশেলে ডেকচি চাপানো হয়। অন্ধকারটা খানেক পানসে হয়ে এলেই জনা পাঁচেক মজুর কাঁধে বাঁশের চেঙারি চাপিয়ে মৌসুমি সবজি নিয়ে হাজির হয় উঠোনে। পুকুরে জাল ফেলে তোলা হয় কুড়ি কেজি মাছ। উঠোনের এক কোণে হয়তো-বা জবাই দেওয়া হয় ছাগ শিশু। এই সমস্তই সারাদিনব্যপি রান্না হয়। নিচের তলার সুবিশাল খাবার টেবিলে ভোর সাতটা থেকেই খাবার আসতে থাকে। খাবারের বরাদ্দ শেষ হয় রাত এগারোটায় গিয়ে। এই সময়ের মধ্যে কে কখন খাচ্ছে, কে পাচ্ছে, কে পাচ্ছে না সে নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই। মৌনি বাড়ি এলে রোজই ঘুমুতে যায় ভোরে। সকালের খাবার খায় দুপুরে। কিন্তু আজ তার রুটিনে ভয়াবহ ব্যতিক্রম ঘটে গিয়েছে। দাদাজানের কড়া হুকুম ভোর আটটার মধ্যে মৌনিদের সকলকে খাবার টেবিলে উপস্থিত থাকতে হবে। সাব্বিরের শরীর আজকাল বেশ ভালো। সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করবার মতো ভালো। শ্বশুর বাড়িতে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভোজনে মিথি প্রজন্মের সকলের উপস্থিতি অনিবার্য। মৌনি অনিবার্য কার্য সাধন করতে বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে। প্রতিটি সিঁড়ির গোড়ায় মিনিট পাঁচেক করে ঘুমিয়ে নিয়ে খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে গিয়েছে আটটা বিশ। দাদাজান মৌনির এই অসচেতনতায় মুখ গম্ভীর করে তাকিয়েছেন। দাদাজানের মুখ গম্ভীর হওয়ার আরও একটি কারণ অবশ্য আছে। কারণটা মৌনির পোশাক। বাড়িভর্তি পুরুষ মানুষ তার মধ্যে এই বেলেহাজ মেয়ে পরে এসেছে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর টাউজার৷ চোখ-মুখের অবস্থা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এটা তার রাতের পোশাক। বিছানা ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে ভদ্রস্থ হওয়ার কষ্ট সে করেনি। মৌনি দাদাজানের আগুন দৃষ্টি লক্ষ্য না করে একটা চেয়ার দেখে ধপ করে বসে পড়ল। তার পাশেই তার বাবা রিটায়ার্ড বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মঈনুল বসে আছেন। জীবনের অধিকাংশ সময় সামরিক অফিসার পদে বহাল ছিলেন বিধায় নিয়মকানুন সম্পর্কে তিনি অত্যধিক সচেতন। অথচ তার মেয়েরই কি-না এই হালত! দাদাজান বিরক্ত হলেন। তার কঠিন ছেলেকে এই নিয়ম-কানুন ভেঙে নাশ করে ফেলা মেয়ের দিকে গভীর স্নেহ নিয়ে তাকাতে দেখে বিড়বিড় করে বললেন, 

‘ বেকুব!’ 

মঈনুল বাবার ভর্ৎসনায় কর্ণপাত করলেন না। খাবার সামনে নিয়ে ঘুমে ঢলে পড়া মেয়ের মুখে তুলে দিলেন মাংস মাখানো রুটির টুকরা। মৌনির মা তৎক্ষনাৎ কোথা থেকে একটা ওড়না নিয়ে ছুটে এলেন মেয়ের কাছে। মেয়ের গায়ে ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে দিয়ে চাপাস্বরে ধমকালেন,

‘ তুমি সবসময় ওড়না নিতে ভুলে যাও কেন? তোমাকে কতবার বলেছি বাড়ি এলে ওড়না ক্যারি করবে? দিন দিন তুমি বেয়াদবের চূড়ান্ত হচ্ছ মৌন।’ 

মায়ের কথায় মৌনির মধ্যে কোনো ভাবাবেগ হলো না। সে তখন চেয়ারে বসে বসেই গভীর ঘুমে মগ্ন। তার মধ্যেই বাবা তার মুখে একটু একটু করে খাবার তুলে দিচ্ছেন। দাদাজানের রাজত্বে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবা-মায়ের বিশেষ হৈ-চৈ করবার নিয়ম নেই। বাড়ির সকল ছেলে-মেয়েকে সমান চোখে দেখাই আইন। কিন্তু মৌনির বেলায় সবসময়ই এই আইন লঙ্ঘিত হয়। এদিক থেকে বাপ-মেয়ের জুড়ি মেলা ভার। দুজনেই আইন লঙ্ঘন করে শাস্তি পেতে ভালোবাসে। দাদাজান কিছুক্ষণ গম্ভীর চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মাথা নুইয়ে নীরবে খেয়ে চলা সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

‘ তা নাতজামাই? শুনলাম তুমি ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছ? শরীর এখন ভালো?’ 

সাব্বির মাথা তুলে তাকাল। মিথির সাথে অকস্মাৎ অদ্ভুত এক সম্পর্কে জড়িয়ে দেওয়ায় প্রথমদিকে এই ভদ্রলোককে ঠিক পছন্দ করতে পারেনি সাব্বির। কিন্তু এখন তাঁর প্রতি অপরিসীম ভক্তিতে নত হয়ে আসে প্রাণ। সাব্বির বিনীত কণ্ঠে বলল,

‘ জি। শরীর ভালো। অনেকদিন তো বিশ্রাম নিলাম। এবার কাজে ফেরা দরকার।’ 

দাদাজান মাথা নাড়লেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

‘ তা তো অবশ্যই। তা তো অবশ্যই। তা মিথি বুবুকে কী আজই সঙ্গে নিয়ে যাবে নাকি দু'দিন পর?’ 

সাব্বির এবার চমকাল। এক পলক মিথির দিকে তাকিয়ে দ্বিধা নিয়ে শুধাল,

‘ জি?’ 

‘ মিথি বুবুকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছি। বিবাহের পর যুবতী মেয়েদের বাপের বাড়ি থাকা অনুচিত। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে মিল-মোহাব্বতের সঙ্গে থাকবে এমনই ইসলামের বিধান। তোমাদের বিবাহটা হুট করে হয়ে গেল বিধায় একটু সময় নিতে হলো। বিধান যেমনই হোক, ব্যাচেলর বাসায় তো আর হুট করে নববধূ নিয়ে উঠা যায় না? প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। তোমাকে প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। এখন বধূ ঘরে না তুললে তো আমাদের ধর্ম যায় ভাই।’

দাদাজান এবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিস্টার জহিরুল্লাহর দিকে তাকালেন। সাব্বিরের মতামতের অপেক্ষা না করে দৃঢ় কণ্ঠে আদেশ দিলেন,

‘ পুকুরে জাল ফেলার ব্যবস্থা করো মিস্টার জহিরুল্লাহ। ক্ষেত থেকে মৌসুমি সবজি, বাগানের ফলসহ সকল ধরনের ব্যবস্থাদি করে ফেলো। গ্রামের মানুষজনকে দাওয়াত দাও। মিথি বুবু শ্বশুরবাড়ি যাবে। কোনো কমতি যেন না থাকে। নাতজামাই? আজকের রাতটা থেকে কাল সকালে একেবারে বুবুকে সঙ্গে নিয়েই যাও। কী বলো?’

সাব্বির প্রত্যুত্তরে করল না। দাদাজানের এই আকস্মিক ঘোষণায় কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে গেল মিথি। তার আর সাব্বিরের এই মানসিক যুদ্ধের ভেতর দাদাজান যে একটা প্রলয় নিয়ে আসতে পারেন, এতোদিন সে সম্ভাবনার কথা ভাববার ফুরসত পাইনি মিথি। আজ যখন পেলো তখন অদ্ভুত এক অসাড়তা বোধ করল হৃদয়ে। মনে পড়ে গেল, সাব্বির তাকে চায় না। কেউ তাকে চাইছে না তারপরও জোরপূর্বক তার গলগ্রহ হয়ে থাকবে, এতোটাই কী সস্তা মিথি ? শারিরীক, মানসিক দিক থেকে সুস্থ, শিক্ষিত, কর্মক্ষম নারী হওয়ার পরও তার কপালে আত্মমর্যাদাহীনতার এই কালিমা দাদাজান কী করে মেখে দিতে পারেন?

 মিথি জানে সে অবাঞ্ছিত। জন্মের পর পরই মায়ের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে সে বনে গিয়েছে মাতৃহীন কন্যা। বাবার উদাসীন্য তাকে জানিয়েছে বাবার জীবনে সে অতি অনাগ্রহের এক খেলনা। সদ্য বুঝতে শেখা ছেলের হাতে গাড়ির বদলে তুলোর পুতুল ধরিয়ে দিলে সে যেমন বিব্রত হয়। একপাশে ফেলে রাখে বড় অনাদরে। মিথি তার বাবার জীবনে তেমনই একটি পুতুল। যাকে তিনি চাননি তারপরও পেয়েছেন এবং এই নিয়ে রোজ বিব্রত হয়ে চলেছেন। মামা-খালাদের বাসায় জড়বস্তু হয়ে থাকতে থাকতে সে বুঝেছে, তাকে পছন্দ করে বুকের ভেতর আড়াল করে রাখবার মতো লোক এই পৃথিবীতে নেই। এই পৃথিবীর কেউ তাকে চায় না। তারপরও সে চলে এসেছে। তার জন্য নিষিদ্ধ এই পৃথিবীতে দিনের পর দিন তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তারপরও…এতো বঞ্চনা, অপমান, অবহেলার পরও নিজের আত্মসম্মানকে পাহাড়ের মতো অটল রেখেছিল মিথি। কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেনি। কারো বুকে যাওয়ার লোভ করিনি। আর যখন কিছুটা লোভ হলো। তখনও সে জানল, এই লোভ বড় অন্যায়। এই পৃথিবীতে কেউ তাকে চায় না৷ চাইবে না কোনোদিন। কিন্তু কেন চাইবে না? রাস্তার পাশে নোংরা হয়ে পড়ে থাকা পাগলীটির প্রতিও তো মানুষের লোভ হয়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই তার দিকে মমতা নিয়ে তাকায়। তবে কী মিথি সেই পাগলিটির থেকেও নোংরা? এতো অচল! বুকের ভেতরটায় আয়না ভাঙার মতো ঝনঝন করে ভেঙে যায় একটা রঙিন ছবি। যে ছবিটি মিথি অনেক সাহস করে এঁকে ফেলেছিল এক সন্ধ্যায়। আজ এক ঘর লোকের সম্মুখে বসে সেই লুকায়িত ছবিটির কথা ভেবে লজ্জায়, অপমানে নীল হয়ে গেল মিথির মুখ। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

‘ এই মুহূর্তে আমার পক্ষে সাব্বির সাহেবের সাথে শিফট হওয়া সম্ভব না দাদাজান। আমার নিজস্ব কাজ আছে। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে আমার কাজে যেতে সুবিধা।’

দাদাজান গম্ভীর স্বরে বললেন, 

‘ কলাবাগানের চেয়ে মীরপুর-১০ থেকে আপনার কাজের জায়গা কাছে? কিন্তু আমার রিসার্চ যে অন্য কথা বলে বুবুজান? মিস্টার জহিরুল্লাহ?’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ মাথা নুইয়ে বিনীত কণ্ঠে বলল,

‘ জি স্যার।’ 

দাদাজান গরম ভাতে ঘি ছড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, 

‘ বুবুজান বোধহয় কলাবাগান ভালো করে চিনেন না। বুবুজানকে ডিটেইলস জানাও।’ 

মিস্টার জহিরুল্লাহ তোতাপাখির মতো তার তথ্য সমারোহ পাঠ করে গেলেন। কলাবাগান থেকে এফডিসি কত কাছে। যাতায়াতে কী রকম সুবিধা পাওয়া যাবে তার একটা লম্বা লিস্ট তিনি তৈরি করে ফেলেছেন বলে দেখা গেল। দাদাজান মুখে ভাতের গ্রাস তুলে নিয়ে শুধালেন,

‘ আর কিছু বলার আছে আপনার বুবুজান?’ 

মিথি কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে থেকে বলল,

‘ আমার কাজের কোনো টাইম টেবিল নেই। রাত-বিরেতে বাইরে থাকতে হয়। অনেক রাত করে বাড়ি ফিরি। এতে উনার সমস্যা হবে। আমি কারো সমস্যার কারণ হতে চাইছি না।’ 

দাদাজান মিথির কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন,

‘ আপনার সঙ্গে যারা কাজ করে তারা এই টাইম-টেবিল না থাকার জন্য সংসার ধর্মে ইস্তেফা দিয়ে বসে আছে এই রকম তো শুনিনি বুবুজান? কাজ এবং সংসার দুটো একসাথে ম্যানেজ করতে শিখেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আপনার খালাজানকে ফোন করে আপনার জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে ফেলতে বলেন। মিস্টার জহিরুল্লাহ শীঘ্রই সেগুলো নাতজামাইয়ের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে।’ 

দাদাজানের কথার প্রত্যুত্তর করতে অনভ্যস্ত এই বাড়ি মিথির একের পর এক প্রতিবাদী ভাষ্যে ততক্ষণে থমকে গিয়েছে। মিথি এবার ভয়হীনতার সমস্ত সীমা পেরিয়ে গিয়ে কঠিন গলায় বলল,

‘ আমার পক্ষে উনার সাথে শিফট হওয়া সম্ভব না।’ 

মুহূর্তেই চারপাশ আশ্চর্য এক স্তব্ধতায় স্থবির হয়ে গেল। ঘুমকাতুরে মৌনির ঘুম কেটে গেল। কখনও প্রতিবাদের মুখে না পড়া দাদাজান কিছুক্ষণ শীতল চোখে মিথির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথা নুইয়ে খাবারে মনোযোগ দিলেন। দাদাজান খুব আগ্রহ নিয়ে নাস্তা সারলেও বাকি সবাই দুশ্চিন্তা আর বিস্ময়ে কাঁটা হয়ে বসে রইল। কেবল নাহিদকে আরাম করে খাবার চিবোতে দেখা গেল। খাওয়া শেষে দাদাজান খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,

‘ ওহ্, একটা কথা। আপনি যে কোম্পানির সাথে কাজ করার জন্য সুযোগ পেতে চলেছেন। সেই কোম্পানি আপনার চাচা মঈনুলের এক বন্ধুর। ছেলেটা আমাকে চাচা চাচা ডাকে। খুবই শ্রদ্ধা করে। আমাকে অনেকবার বলেছে তার ব্যবসায় চাইলেই আমি ইনভেস্ট করতে পারি। আপনার চাচা তো খুব ব্যস্ত। আপনি একটু আমার ঘরে আসবেন বুবুজান। ছেলেটা কী ধরনের ব্যবসা করে সে নিয়ে আলোচনা করব। মিস্টার জহিরুল্লাহ বলছিল, আপনি ক'দিন ধরে এসব নিয়ে খুব ঘাটছেন!’ 

দাদাজান কথা শেষ করে শান্ত মুখে উঠে গেলেন। মিথি তাঁর যাওয়ার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। রাগে-ঘৃণায় জীবনে প্রথমবারের মতো সামনে থাকা ভাতের প্লেটটা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দের সাথে মিলিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল,

‘ সমস্যা কী আপনার! আপনি আমার সাথে থাকতে চান না, এই সিম্পল কথাটা দাদাজানের সামনে কেন বলতে পারলেন না? আপনি যে মস্ত বড় একটা হিপোক্রেট সেটা কী আপনি জানেন? আপনার মতো কপট, ভন্ডের সাথে কোনো মানুষ কেন? পশুর পক্ষেও থাকা সম্ভব নয়।’ 

খাবার টেবিলে আরেক দফা স্তব্ধতার হাওয়া বয়ে গেল। সবাই অবাক বিস্ময় নিয়ে চিরকালের শান্ত মিথিকে রণচণ্ডী হতে দেখল। বেপরোয়া নাহিদ পর্যন্ত খাবারের গ্রাস তুলতে ভুলে গেল। এতগুলো নতুন মানুষের সামনে এমন অপমানে বেদনায় নীল হয়ে গেল সাব্বিরের মুখ। ব্যথিত চোখে নিষ্পাপ বালকের মতো সে তাকিয়ে রইল মিথির মুখের দিকে। 

—————

বৈশাখের আকাশে দলছুট হয়ে উড়ছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। ভোর রাতের বৃষ্টির রেশটুকুও শুষে নিয়েছে বৈশাখের প্রবল দাবদাহ। নাহিদ বসে আছে দিঘিপাড় থেকে কিছুদূর আম গাছের ছায়ায়। ভ্যাপসা গরম, প্রখর রোদ আর পাকা আমের মিষ্টি সুবাসের সাথে মিশে যাচ্ছে সিগারেটের উৎকট গন্ধ। সৌধ নাহিদের ঠোঁটের কোণে জ্বলতে থাকা সিগারেটের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,

‘ আজকাল একটু বেশি স্মোক করছিস মনে হচ্ছে? ঘটনা কী বল তো?’ 

নাহিদ সৌধর কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,

‘ দূর ব্যাটা! হাতে কাজ কাম নাই তাই সিগারেট খাচ্ছি। ব্যস্ত হয়ে পড়লেই সিগারেটের কথা ভুলে যাব। এখানে আবার ঘটনা থাকবে কী?’ 

নাহিদের বেপরোয়া উত্তরেও সৌধর সন্দেহ কাটল না। বন্ধুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

‘ ভাবীর সাথে তোর ব্রেকাপটা কী এবার সিরিয়াস নাকি?’ 

নাহিদ হেসে ফেলল,

‘ এর আগে কখনও আমাদের ব্রেকাপ হয়েছে?’ 

‘ তারমানে সিরিয়াস? কিন্তু ব্রেকাপের পেছনের কারণটা কী!’ 

নাহিদ প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসল। সিগারেট পোড়া ঠোঁটে সময় নিয়ে নতুন সিগারেট ধরাল। সৌধ বলল,

‘ আমি ভাবীর সাথে কথা বলব?’ 

নাহিদের মুখ এবার গম্ভীর হলো। কঠিন গলায় বলল,

‘ দরকার নেই।’ 

‘ তুই যে ওই মেয়েটার জন্য মোটামুটি দেবদাস হয়ে গিয়েছিস বুঝতে পারছিস? চেইন স্মোকারদের মতো সিগারেট ফুঁকছিস। আদিব হোসেনের সাথে দেখা করার ব্যাপারটা বারবার পোস্টপোনড করছিস। ফোন বন্ধ করে রাখছিস। আর তোর চেহারাটার দিকে তাকিয়ে দেখেছিস একবার?’ 

নাহিদ আবার হাসল। আধপোড়া সিগারেটটা দুই ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে রুক্ষ গালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,

‘ চেহারার আবার কী হয়েছে?’ 

‘ সেটা আয়না দেখলে নিজেই বুঝতে পারবি। তোর যে চেহারা দেখে মেয়েরা লাড্ডু হয়ে যায় সেই চেহারাটাকে দিনদিন কয়লা বানাচ্ছিস। রাস্তার ছেলেদের মতো হাবভাব চলে এসেছে। এসব কী দোস্ত?’ 

নাহিদ সেকথা পাত্তা না দিয়ে বলল,

‘ তুই এখন মাইয়া মানুষের মতো ন্যাগ করছিস সৌধ। বন্ধু-বান্ধব যে তোকে আমার বউ বলে, মিথ্যা বলে না। এসেছিস থেকে অভিযোগের পাহাড় নিয়ে বসেছিস৷ মেয়েদের মতোই মাথাভর্তি ওভার থিংকিং। আরে বাপ! বাড়িতে এসে নিজেকে একটু রিল্যাক্সে রাখছি। এখানে এতো পলিশ করে থাকার তো কোনো দরকার নেই। চিল কর তো। বউয়ের মতো এখন চুমু খাইতে চাইস না।’ 

সৌধ সঙ্গে সঙ্গে নাহিদের উরু বরাবর একটা লাথি বসাল। মুখ খারাপ করে কিছু বলবার প্রস্তুতি নিতেই দেখল, দিঘি পাড়ের দিকে হেঁটে আসছে মৌনি। হাতে খাবারের বাটি৷ বাটি থেকে কিছু একটা তুলে একটা করে কামড় বসাচ্ছে আর উদাস হয়ে আকাশ দেখছে। আর কোনোদিকে তার মনোযোগ নেই। সৌধ সেদিকে ইশারা করে বলল,

‘ তোর এই বোনটা আগুন। আমাকে দেখলেই সাপিনীর মতো ফোঁস করে উঠে।’ 

নাহিদ চোখ ফিরিয়ে মৌনির দিকে তাকাল। সৌধ বলল,

‘ তোর এই বোনের সাথে আমার প্রেম-টেম হয়ে যাবে না তো আবার? আমার সিক্স সেন্স বলছে, হয়ে যাবে। যে পরিমাণ ফাটাফাটি লাগে আমাদের!’ 

নাহিদ হাসল। মৌনির দিকে চোখ রেখে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বলল,

‘ সম্ভাবনা কম। মনে হয় না, তোকে খুব একটা পাত্তা দিবে। পৃথিবীর কাউকে ও পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না। তবু তুই ট্রাই করে দেখতে পারিস। প্রেমে টেমে পড়েছিস নাকি?’ 

সৌধ কথাটাকে উড়িয়ে দিয়ে বলল,

‘ আরে দূর! প্রেম-টেম কিছু না। এমনি বলছিলাম। সিনেমার সিকুয়েন্সগুলো দেখিস না? ঝগড়ার পরই আসে মধু প্রেম।’ 

নাহিদ-সৌধ দু'জনেই হাসল। নাহিদ বলল,

‘ প্রেম করলে করতে পারিস। তবে ঘটকালি আমি করতে পারব না। আমাকে সে দুই আনা দামও দেয় না। অনুমতি ছাড়া মোবাইল নাম্বারও দিতে পারব না। শী ইজ মাই সিস্টার। তার প্রাইভেসি রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।’ 

সৌধ চোখ বড় বড় করে তাকাল। চোখ-মুখ বিকৃত করে বলল,

‘ ওরে আমার সাধুরে! নিজের বেলা ষোল আনা আর আমার বেলা আট? বন্ধুর প্রেমে তাহলে তুমি করতে পারবাটা কী!’ 

নাহিদ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলল। হাত দিয়ে ধোয়া সরিয়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা করে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

‘ কথা বলার সুযোগ করে দিতে পারব৷ পটানোর দায়িত্ব তোর। দাঁড়া ডাকি।’ 

সৌধ আঁতকে উঠে বলল,

‘ ডাকবি মানে কী? ডাকবি কেন?’ 

নাহিদ কণ্ঠ নামিয়ে বলল,

‘ না ডাকলে পটাবি কীভাবে? ডাকি। কথা-টথা বল। যদিও আসবে কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত না। ভাব অত্যধিক। পাত্তা দিতে চায় না।’ 

কথা শেষ করেই নাহিদ মৌনিকে ডাকল। নাহিদের ডাকে মৌনি বিরক্ত হয়ে তাকাল। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই শুধাল,

‘ কী সমস্যা?’ 

‘ এদিকে আয়।’ 

‘ কেন?’ 

‘ আরে আয় না! দরকারি কথা আছে তোর সাথে।’ 

মৌনি তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে এগিয়ে এলো। নাহিদের পাশে সৌধকে বসে থাকতে দেখে বলল,

‘ তোরা এখানে বসে কী করছিস? গাঁজা টাঁজা খাচ্ছিস নাকি?’ 

নাহিদ প্রত্যুত্তরে মিষ্টি করে হাসল। শুধাল,

‘ তুই কী খাচ্ছিস?’ 

মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ পিঁয়াজু।’ 

‘ আমাকে রেখে খাচ্ছিস!’ 

নাহিদের মন খারাপের বাহার দেখে জ্বলে উঠল মৌনি। ধমক দিয়ে বলল,

‘ তোকে সঙ্গে নিয়ে খেতে হবে কেন? তুই কী আমার সোয়ামী লাগিস?’ 

মৌনির কথার ঝাঁজে কেশে উঠল সৌধ। মৌনি এবার সৌধর দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে বলল,

‘ তোর এই বন্ধু সারাদিন তোর পেছন পেছন ঘুরে কেন?’ 

সৌধ বলল,

‘ আপনি চাইলে আপনার পেছনেও ঘুরতে পারি।’ 

মৌনি চোখ গরম করে তাকাল। আসন্ন হাতাপায়ী সামলাতে নাহিদ বলল,

‘ সোয়ামি না হলেই একা খাবি? ভাই-ব্রাদারদের দিতে হয় না? আমাকেও দে।’ 

মৌনি একটু ঠান্ডা হলো। বাটি দেখিয়ে বলল,

‘ খেয়ে ফেলেছি। শেষ।’ 

নাহিদ মৌনির হাতে ধরা আধ খাওয়া অবশিষ্টটুকু দেখিয়ে বলল,

‘ তোর হাতেই তো আছে। ওই যে!’ 

‘ এটা আমার এঁটো করা।’ 

নাহিদ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

‘ তাতে কী?’ 

কথাটা শেষ করে মৌনির অনুমতির অপেক্ষা না করে মাথা এগিয়ে মৌনির হাতের অবশিষ্ট অংশটুকু মুখে পুড়ে নিলো নাহিদ। ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল মৌনি। বিস্মিত হলো সৌধ। নাহিদের এমন ব্যবহারে রাগ করবে নাকি ধমকাবে হঠাৎ যেন বুঝে উঠতে পারল না মৌনি। বিস্ময় নিয়ে নির্বিকার মুখে খাবার চিবোতে থাকা নাহিদের দিকে তাকিয়ে রইল। মৌনি ভেবে পেল না, একটা মেয়ের মুখের খাবার এইভাবে মুখে নিতে নাহিদের ঘৃণা লাগল না? মৌনি হলে নিশ্চয় বমি করে দিতো। এই ছেলে এতো অদ্ভুত কেন! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp