গল্পটা আমাদের - পর্ব ০৩ - আফরোজা আক্তার - ধারাবাহিক গল্প


          যথারীতি অফিস শেষ করে আজও নিশাত বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় আধাঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরেও বাসের দেখা মেলেনি। নিশাত পায়ে হাঁটা শুরু করল। ভেবেছে কিছুটা হেঁটে তারপর রিকশা নেবে। এতে অন্তত কিছু টাকা বেঁচে যাবে। ঘড়িতে রাত প্রায় এগারোটা। অন্যান্য স্টাফরা যেখানে সাতটায় বের হয়ে যায় সেখানে নিশাতকে অতিরিক্ত কাজ দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। এ সবকিছুই আফরাজের ইশারায় হচ্ছে। নিশাত বুঝতে পারলেও কিছুই বলে না। কাজ শিখে যাওয়ার পর তার বেশ ভালোই লাগে কাজ করতে। কাজের প্রেশারে থাকলে অন্যকিছু আর মাথায় আসে না। খানিকটা পথ এগোতেই কিছু বখাটে ছেলে নিশাতের দুপাশে হাঁটা শুরু করে। নিশাত বেশ জোরেই পা চালায়। কিন্তু ছেলেগুলোর সাথে পেরে উঠছে না। তাই পা থামিয়ে পেছনে ঘুরে সরাসরি প্রশ্ন করল, 

‘কী চাই?’ 

বখাটেদের মধ্যে একজন বলল, 

‘তোমাকে চাই।’ 

নিশাত ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও সেই ভয় নিজ মুখশ্রীতে ফুটিয়ে তোলেনি। 

‘আমাকে দিয়ে কী লাভ?’ 

‘লাভ তো হরেক রকম।’ 

‘পায়ের থেকে জুতা খুলে যখন গালে ঠাস ঠাস করে মারব তখন হরেক রকম লাভ ঘুঁচে যাবে। অসভ্য অভদ্র ছেলেপেলে।’ 

ছেলেগুলো ভীষণ রেগে নিশাতের দিকে এগিয়ে আসে। একটা ছেলে নিশাতের ডান হাতটা বেশ শক্ত করে ধরে বলে, 

‘তুমি আমার বা*লটা করবা। হাতটা তো ধরলাম, দেখি কী করতে পারো।’ 

কথাটা বলে ছেলেটা নিশাতের গাল ছুঁয়ে দিল। এমন আচরণে ভড়কে যায় নিশাত। তার সাথে আগে কখনও এমনটা ঘটেনি। হঠাৎই পেছন থেকে একটা গাড়ি লাগাতার হর্ন বাজাতে থাকে। ছেলেগুলো বিরক্ত হয়ে পেছনে তাকায় আর বলে, কী ব্যাপার, রাস্তায় আর জায়গা নাই? গাড়ি থেকে একজন বের হয়ে এসে বলে, 

‘রাত বারোটাও বাজল না। পথেঘাটে এখনও মানুষ আছে টুকটাক। এর মধ্যেই একটা মেয়ের হাত ধরে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করে দিয়েছ! তোমাদের তো মানুষ বলে মনে হয় না, তোমরা তো একেকটা কলিজা।’ 

‘বুঝে যখন ফেলেছেন তখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ কী? নিজের কাজে যান। আমাদেরকে আমাদের কাজ করতে দিন।’ 

‘নিজের কাজেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎই তোমাদের মতো কলিজাওয়ালা কয়েকটা বা*স্টা*র্ড নজরে পড়ল। তোমাদের কলিজাগুলো হাতে না ধরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত যাচ্ছি না। চিন্তা কোরো না। একজন একজন করে আসো। আমি পালাচ্ছি না।’ 

পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে নিশাত এবার পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে নিশাত যেন খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আর আফরাজ, নিশাতকে ওই অবস্থায় দেখে হকচকিয়ে যায়৷ সে এতক্ষণ ভেবেছিল অন্য কোনো মেয়ে হবে। কয়েকটা রাস্তার বখাটে কুকুরদের হাতে হেনস্তা হতে থাকা মেয়েটা যে নিশাত হবে এটা সে কল্পনাতেও আনতে পারেনি। গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আফরাজ মুহুর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দুইহাত মুষ্টিবদ্ধ করে চোখ রাঙিয়ে তাকায় ছেলেগুলোর দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর যেন নিশাত চোখে অন্ধকার দেখতে পেল। চোখের সামনে এই প্রথম মারপিট দেখছে সে। আফরাজ গাড়ি থেকে একটা লোহার রড বের করে বেধড়ক মারছে ছেলেগুলোকে। আফরাজের মা'র দেখে আশেপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। নিশাত একটা কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ থেকে পানি বেয়ে পড়ছে তার। কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। মারা থামিয়ে আফরাজ নিশাতের কাছে যায় এবং তাকে টানতে টানতে ছেলেগুলোর সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বেশ উচ্চ গলায় বলতে থাকে, 

‘ওর চেহারাটা ভালো করে চিনে রাখ। নেক্সট টাইম ওকে যখন দেখবি তখন মা ডেকে সালাম দিবি। মনে থাকবে?’ 

একটা ছেলে সাথে সাথেই নিশাতের পায়ে ধরে বলতে লাগল, 

‘আম্মা, মাফ করে দেন। আম্মা আর এমন ভুল হবে না।’ 

নিশাত বোকার মতো তাকিয়েই আছে। ছেলেগুলো খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেলে আফরাজ এবার একা একা বলতে শুরু করে, 

‘টিকেট না কেটে ছবি দেখা শেষ হয়েছে আপনাদের? তামাশা দেখছেন নাকি এখনও? যান এখান থেকে।’ 

লোকগুলোও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গেল। আফরাজ তখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিশাতের দিকে তাকিয়ে বলল, 

‘গাড়িতে উঠুন। আমি পৌঁছে দিচ্ছি আপনাকে।’ 

এবার নিশাত ক্ষেপে যায়। সে-ও বেশ উচ্চস্বরেই বলে, 

‘সবকিছু আপনার জন্য হয়েছে। সামান্য রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য আমাকে রাত দশটা পর্যন্ত অফিসে আটকে রেখেছেন আপনি? আমি এত বছর এই শহরে চলাফেরা করি, এর আগে তো কখনও এমন হয়নি৷ কারণ এর আগে আমি কখনও রাত এগারোটা পর্যন্ত বাইরে থাকিনি। আমি এত মানুষ দেখেছি, আপনার মতো একটাও দেখিনি। লাগবে না আপনার সিম্পেথি। আপনি চলে যান। আমি নিজেই চলে যাব।’ 

নিশাত সামনে পা বাড়াতেই আফরাজ তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা স্বরে বলে, 

‘আর একটা কথা না। চুপচাপ গাড়িতে উঠুন।’ 

গাড়ির দরজাটা খুলে দিলে নিশাত চুপসে গাড়িতে উঠে বসে। আফরাজ গাড়ি ড্রাইভ করে নিশাতকে তার গন্তব্যে নিয়ে যায়। 

—————

দুপুর একটা নাগাদ আফরাজ অফিসে ঢোকে। নিশাতের ডেস্ক খালি দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের কেবিনে চলে যায়। নিজের অত্যন্ত প্রিয় পিওনকে খবর দেয় আফরাজ। পিওন এসে দাঁড়ালে আফরাজ পিওনকে জিজ্ঞেস করে বলে, 

‘মিস নিশাতের ডেস্ক খালি কেন?’ 

‘স্যার, নিশাত ম্যাডাম তো আসে নাই।’ 

‘আসে নাই মানে! অফিসেই আসেনি?’

‘না স্যার। সাবরিনা ম্যাডামকে নাকি জানাইছে উনার শরীর ভালো না।’ 

‘ওকে। তুমি যাও। কফি নিয়ে এসো। উইদাউট সুগার।’ 

পিওন চলে গেলে আফরাজ সাবরিনাকে ডেকে পাঠায়। সাবরিনা নক করে ভেতরে আসে। আফরাজ সাবরিনাকে বলে, 

‘আপনাকে একটা মেইল ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছি। মেইলটা চেক করে মিস নিশাতকে দেবেন। বলবেন, বিকেলের মধ্যেই যাতে আমাকে দেখায়।’ 

‘স্যার, নিশাত তো আজ অফিসে আসেনি। ওর শরীর ভালো না। আমাকে ফোন করে জানিয়েছে। আমি ওর হয়ে একটা অ্যাপ্লিকেশন জমা করে দিয়েছি। ওর নাকি অনেক জ্বর এসেছে। আসলে কাল রাতে নাকি ওর সাথে বিশ্রী একটা ঘটনা ঘটেছে। কে বা কারা ও চেনে না। ছেলেগুলো নাকি ওর সাথে অসভ্যতা করেছে।’ 

আফরাজ সাবরিনার মুখ থেকে নিশাতের কথাই জানতে চেয়েছিল। তাই কায়দা করে মেইলের কথা বলেছে। সাবরিনাকে চলে যেতে বলে গুগল ড্রাইভ থেকে নিশাতের ফাইল বের করে। ওইখানে নিশাতের ফোন নাম্বার দেওয়া আছে। কী জানি কেন, আফরাজ নিশাতের নাম্বারটা নিজের ফোনে নেয়। এরপর কলও দেয়। কিন্তু কলটা যাওয়ার আগেই কেটে দেয়। গতকাল রাতে মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারত মেয়েটার সাথে। ভাগ্যিস সময় মতো সে-ও ওই রাস্তা ধরেই যাচ্ছিল। ভেবেছিল অন্য মেয়ে হবে। কিন্তু ওটা যে নিশাত হতে পারে তার ভাবনাতেও ছিল না। 

—————

তিন দিনের দিন নিশাত অফিসে যায়। সাবরিনার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে তাকে বড় স্যার মানে লতিফ সাহেব দেখা করতে বলেছেন। নিশাত লতিফ সাহেবের কেবিনে নক করে ঢুকল। সদ্য জ্বর থেকে সামান্য সেরে ওঠা নিশাতের মুখ চোখের অবস্থা খুব একটা ভালো না। লতিফ সাহেব নিশাতকে বসতে বললে নিশাতও চেয়ার টেনে বসে পড়ে। 

‘স্যার, আমাকে ডেকেছিলেন।’ 

‘হ্যাঁ। তুমি আমার মেয়ে মতো, তাই তুমি করেই বললাম। মনে কিছু নিও না।’ 

‘না না স্যার। ঠিকাছে। ডাকুন। আমি এমনিতেও আপনার মেয়ের বয়সী।’ 

‘হুম ঠিক। তোমার শরীর তো এখনও অসুস্থ মনে হচ্ছে।’ 

‘নাহ স্যার। আমি সুস্থ আছি। আসলে জ্বর হলে আমাকে এমনই লাগে। আমাকে কিছু কাবু করতে পারে না। একমাত্র মাইগ্রেন আর জ্বর এই দুটো জিনিস আমাকে একদম কাবু করে ফেলে।’ 

‘রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম তোমার। আচ্ছা শোন, এখন থেকে আই মিন আজ থেকে তুমি সব স্টাফদের সাথেই বের হবে। অফিস আওয়ার শেষ হবার সাথে সাথেই বের হয়ে যাবে। তোমাকে দেওয়া কাজ শেষ না হলেও চলে যাবে। পরদিন এসে বাকি কাজ শেষ করে নতুন কাজে হাত দিবে। আমি তো কিছুদিন ছিলাম না তাই এসব জানি না। গতকাল রাতে টরেন্টো যাওয়ার আগে আফরাজ আমাকে বলেছে তুমি যেন অফিস আওয়ার শেষ হলেই চলে যাও।’ 

‘ওকে স্যার। থ্যাংক ইউ স্যার।’ 

‘ইটস ওকে মাই চাইল্ড। নাও ইউ ক্যান গো।’

‘ওকে স্যার।’ 

নিশাত নিজের ডেস্কে এসে বসে। মাথাটা ভার হয়ে আছে তার। সাবরিনা এসে ডেস্কের পাশে দাঁড়ায়। বলে, 

‘কী বলল স্যার?’ 

‘অফিস আওয়ার শেষ হলেই যেন চলে যাই।’ 

‘হ্যাঁ। আমার সাথেও এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছিল স্যার। আমিও বলেছি স্যার, আফরাজ স্যারই তো ওকে এত রাত অবধি আটকে রেখেছে এতদিন।’ 

‘ওহ।’ 

‘জানো, একটা ভালো খবর আছে। আমাদের অফিসের একটা শাখা টরেন্টোতে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওটা নিয়েই আফরাজ স্যার সেখানে গিয়েছে। ভাবো একবার, যদি একটা শাখা সেখানে ওপেন হয়ে যায়, আমাদের অফিস থেকে বেছে বেছে অনেককেই সেখানে কাজে নেবে। ইশ! আমিও যাতে থাকি এদের মধ্যে। তাহলে আর জীবনেও বাংলাদেশের মুখ দেখব না।’ 

নিশাত মুচকি হেসে কাজে মন দেয়। 

—————

রাতে শুয়ে শুয়ে নিশাত ফেসবুক স্ক্রল করছিল। হঠাৎ একটা আইডি সামনে আসে তার। আইডিতে দেওয়া নামটা বেশ ভালো করে পড়ার চেষ্টা করে নিশাত। ইংরেজিতে লেখা নামটা -- Afraaz Ahmed. 

নিশাত আফরাজের আইডি স্টক করে। আইডির প্রোফাইল পিকচার এবং কভার পিকচারে আফরাজেরই ছবি দেওয়া। বেশি সুন্দর লাগছে কভার পিকচারটা। একটা কালো সোফায় সাদা স্যুট পরে হালকা হেলান দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। এক দেখায় যে কেউ পছন্দ করবে এই লোকটাকে। কিন্তু সেই কেউ কি জানবে, এই লোকটা কতটা বদরাগী। বায়োতে ইংরেজিতে কিছু একটা লেখা। টরেন্টো গিয়ে একটা জায়গার ছবি তুলেছে। সেই ছবির ক্যাপশনে লেখা -- My favourite place. আফরাজের আইডিটা বেশ সুন্দর করে সাজানো। সব কিছুতেই ফর্মাল ফর্মাল একটা ভাব আছে। নিশাত আফরাজের ছবিগুলো জুম করে করে দেখছে। তার মনে হলো, আফরাজকে একটা থ্যাংকস দেওয়া উচিত কি? সেদিন আফরাজ না থাকলে হয়তো আজ সে থাকত না। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনটা বেঁকে বসল। নাহ, সে থ্যাংক ইউ বলবে না। কেন বলবে থ্যাংক ইউ? সেদিন তার সঙ্গে যা হয়েছে সব কিছুর জন্য আফরাজ দায়ী। তাই আফরাজের উচিত তাকে সরি বলা। ফোনের ডিসপ্লে লাইটটা অফ করে নিশাত চোখ বুজে। সে এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। এমন নাক উঁচু মানুষকে ভাবাও ঠিক না। নিশাত ঘুমানোর চেষ্টা করে। সকাল হলেই আবার অফিসে ছুটতে হবে তাকে। 
·
·
·
চলবে........................................................................

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp