নবোঢ়া - পর্ব ১৯ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

নবোঢ়া - ইলমা বেহরোজ
          সিদ্দিক মুখ ভার করে বাগানের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। সুফিয়ান একটু দূরে দাঁড়িয়ে কড়া নজরে দেখছেন সিদ্দিক কাজে ফাঁকি দেয় কি না। গাছের প্রতি তার ভালোবাসা প্রায় পাগলামির পর্যায়ের। কোনো গাছে একটা পোকা লাগলে বা পাতা হলুদ হলে তাঁর রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। মালি কোন গাছে ঠিক কতটুকু পানি বা সার দেবে, তার জন্য তিনি ডায়েরিতে কঠোর রুটিন লিখে রেখেছেন। এই বাগানে ফুল বা পাতা ছেঁড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; কেউ অজান্তে একটা কলি ছিঁড়লেও তিনি প্রচণ্ড রেগে যান। তাই মালির কাজে সামান্য অবহেলাও তিনি সহ্য করতে পারেন না।

তখন জাওয়াদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তার পা ফেলার শব্দ পেতেই সুফিয়ান ভারী কণ্ঠে ডেকে ওঠেন, "জাওয়াদ!"

জাওয়াদ থমকে দাঁড়ায়। এক মুহূর্তের জন্য তার শরীর শক্ত হয়ে যায়, পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয়। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অলস ভঙ্গিতে বাবার দিকে ফেরে। 

সুফিয়ান চোখ সরু করে বলেন, "শুনলাম, দুদিন নাকি খামারবাড়িতে লুকিয়ে ছিলে?"

"লুকিয়ে ছিলাম বলছেন কেন? এমনি গিয়েছিলাম। আমি যেতে পারি না?"

"এসব ছাড়ো। তোমার মা কত চিন্তা করেছে জানো? দুইদিন আগে কবিরাজের কাছে গিয়েছিলাম, চিকিৎসা শেষ না করেই ফিরতে হলো। কীসের জন্য? ব্যবসার জন্য। নাভেদ পাটোয়ারী গম নিয়ে চলে..."

জাওয়াদ বাবার কথার মাঝেই বাধা দিয়ে বলে, "বাবা, আমার একটু জরুরি কাজ আছে। পরে কথা হবে।'

সে পা বাড়াতে যাচ্ছিল।

সুফিয়া গর্জে উঠেন, "দাঁড়াও! আমার কথা শেষ হয়নি।"  

জাওয়াদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে পড়ে।

সুফিয়ান এবার ধমকের সুরে বলেন, "আমার অনুমতি ছাড়া কোথায় যাচ্ছো? তোমাকে কতবার বলেছি, ব্যবসায় মন দাও। এই জমিদারি একদিন তোমাকেই দেখতে হবে। কিন্তু তুমি কী করছো? উড়ে বেড়াচ্ছো।"

"আমি অনেক আগেই বলেছি বাবা, ওসব আমি পারব না। জমিদারি, ব্যবসা এসব আমার জন্য নয়। আমার নিজের আলাদা স্বপ্ন আছে।"

সুফিয়ান ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, "তোমার মুখে স্বপ্নের কথা মানায় না। ছোটবেলা থেকে শুধু আকাশে বিমান উড়াতে চেয়েছো। তোমার মা আর চাচার অনুরোধে শহরে রেখে পড়াশোনা করিয়েছি। আর তুমি কী করেছো? সব কিছু ফেলে নিখোঁজ হয়ে গেছো। টাকা আর সময় দুটোই নষ্ট করেছো।"

"সময় বা টাকা কোনোটাই নষ্ট হয়নি। কমার্শিয়াল পাইলট হওয়ার জন্য দিনরাত এক করে খেটেছি আমি। লাইসেন্সটা প্রায় হাতের মুঠোয় চলে এসেছিল। তারপর... "

সুফিয়ান বিরক্তিতে মাথা নেড়ে বলেন, "তারপর কী? পেলে না তো, তার আগেই নিখোঁজ হয়ে গেলে। ওসবের মেয়াদও শেষ। এখনো বলোনি কোথায় গিয়েছিলে।" তিনি একটু থামলেন। নিজের ভেতরের উদ্বেগটাকে সামলাতে চেষ্টা করছেন। তারপর আবার বলেন, "তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কি ভেবেছো? সময় থাকতে ব্যবসায় মন দাও। ওসব বিমান উড়িয়ে কি হবে?"

জাওয়াদ কিছু বলে না। 

সুফিয়ান নরম হয়ে বলেন, "তুমি ছাড়া আমাদের আর কোনো উত্তরাধিকারী নেই। এই ব্যবসাটা আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য, সেটা তোমাকে বুঝতে হবে।"

জাওয়াদ পরিষ্কার গলায় বলে, "চাচা তো সবে বিয়ে করেছেন। উনাকে বলুন একটা ছোট্ট উত্তরাধিকারী নিয়ে আসতে। সেই উত্তরাধিকারী নিশ্চয়ই আপনার মতো হবে। না হলেও আমি তাকে শিখিয়ে দেব কীভাবে আপনার মতো গম্ভীর মুখ করে বসে থাকতে হয়। আর ঐতিহ্যের কথা বলতে হয়।"

সুফিয়ান হকচকিয়ে গেলেন। মুখ লাল হয়ে উঠে রাগে। তিনি গর্জন করে উঠেন, "কী বললে? এই বেয়াদব ছেলে! তোমার এত বড় সাহস?"

জাওয়াদ সেখান থেকে হনহনিয়ে চলে যায়। 

সিদ্দিক ঠোঁট টিপে হাসে। সে যতই চেষ্টা করুক, চোখে-মুখে ফুটে ওঠা কৌতুকের ভাবটা কিছুতেই লুকোতে পারে না। সুফিয়ান ঝাঁঝালো চোখে তাকান সিদ্দিকের দিকে। গর্জন করে উঠেন, "কী রে হারামজাদা? হাসছিস কেন?"

সিদ্দিক তড়িঘড়ি অন্যদিকে ফিরে।

সুফিয়ান আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠেন, "আমার ছেলে আমাকে বেইজ্জতি করল, আর তুই দাঁড়িয়ে হাসছিস?"

সিদ্দিকের মুখ ভয়ে সাদা হয়ে যায়। সে কাঁপা গলায় বলে, "মাফ করেন হুজুর।'

সুফিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রাগটাকে দমন করার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে, ধীরে ধীরে বলেন, "দেখ সিদ্দিক, তুই আমার মায়ের বাড়ির লোক। তার মানে এই না যে, যা খুশি তাই করবি। এমন কাণ্ড করবি না যাতে তোকে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে হয়।"

সিদ্দিক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।

সুফিয়ান বলেন, "যা, গিয়ে দেখ জাওয়াদ কোথায় যাচ্ছে। ওর পিছু নে। আর শোন, এ বাড়িতে যা হয়, তা এই বাড়িতেই থাকবে। বাইরে যেন না যায়।"

সিদ্দিক মাথা নেড়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে জাওয়াদের পথ ধরে।

জুলফার ঘরের দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে শঙ্খিনীর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "বেগম সাহেবা, দরজা খুলুন। কিছু মুখে দিন। কী হয়েছে আপনার?" 

ঘরের অন্ধকারে, চার পোস্টার বিশাল পালঙ্কে পড়ে আছে জুলফা। তার চোখ লাল, অশ্রুর নদী বয়ে গেছে সেখানে। চুল এলোমেলো। গতকাল বিকেল থেকে শুধু পানি ছাড়া কিছুই স্পর্শ করেনি তার ঠোঁট। 

জুলফা চোখ বোজে। সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যটা ভেসে ওঠে। নাভেদ, রাইহা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে রেখেছে। জুলফার বুকের ভেতর একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করে।।চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে, অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গালের ওপর দিয়ে।

"কেন?" জুলফা নিজের মনেই প্রশ্ন করে, "কেন রাইহা? তুমি তো ছোট জমিদারের বউ হবে। সমাজের চোখে উঁচুতে উঠবে। তবে কেন নাভেদকে জড়িয়ে ধরলে?"

বাইরে শঙ্খিনী এখনো ডাকছে। জুলফার কানে তা পৌঁছায় না। সন্ধ্যা নামছে। জুলফার মনেও অন্ধকার সন্ধ্যা। সে অতল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে। তার চিন্তাগুলো উত্তাল তরঙ্গের মতো এসে আছড়ে পড়ছে মনের তীরে। হয়তো জাওয়াদের অজান্তেই রাইহা আর নাভেদ প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। এখন জাওয়াদের কী হবে? আর তার নিজের কষ্ট? সে জানে নাভেদকে সে কখনো পাবে না। অবিবাহিত থাকাকালীনই নাভেদের নজরে পড়েনি, সেখানে এখন সে বিবাহিত। তবুও কষ্ট হচ্ছে। বুকের মধ্যে একটা তীক্ষ্ণ ছুরি বিঁধে আছে। কিছুতেই এই যন্ত্রণা আটকানো যাচ্ছে না। হয়তো তাদের মধ্যে প্রেম হয়নি। কিন্তু দুই বছর ধরে যে পুরুষ তার স্বপ্নের রাজপুত্র ছিল, সেই পুরুষকে অন্য মেয়ে জড়িয়ে ধরেছে এই দৃশ্য কীভাবে মেনে নেয়া সম্ভব? 

রাইহাই বা কীভাবে জাওয়াদকে প্রতারিত করে নাভেদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে? আর নাভেদ, সে কি একবারও ভাবেনি, জমিদার বাড়ির হবু বউয়ের সঙ্গে সম্পর্কে যাওয়া কত বড় অপরাধ? 

রাত গভীর হয়। ঘরের বাইরে এখন আর কোনো শব্দ নেই। জুলফা ধীরে ধীরে উঠে বসে পালঙ্কে। শরীর অনাহারে ক্লান্ত। মাথা ঘুরছে। সে টলতে টলতে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে গভীর অন্ধকার, কালো কালিতে ডুবে গেছে সারা প্রকৃতি। 

জুলফার মন যখন বিষাদে ভারাক্রান্ত হয়, তখন সে রাতের অন্ধকারে একাকী ঘুরে বেড়ায়। তার মনের গহনে কী একটা অজানা শক্তি তাকে আহ্বান করছে। কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই, সে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। পা চালায় বনের দিকে। 

কিছুক্ষণ পর থমকে দাঁড়ায় একটা বিশাল বটগাছের নিচে। গাছের খসখসে বাকলে হাত বোলায়। এই গাছও তার মতো একা। তবুও দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। হঠাৎ একটা পেঁচার ডাক শোনা যায়। 

সে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা তারা। জুলফা আবার হাঁটতে শুরু করে। 

হঠাৎ কানে আসে ঘোড়ার ক্ষুরের ছন্দোবদ্ধ শব্দ - খটাং খটাং, খটাং খটাং। অপ্রত্যাশিত শব্দে জুলফা থমকে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড পাখির ডানার মতো ফড়ফড় করে উঠে। নিঃশ্বাস থেমে যাবার উপক্রম হয়। বিস্ফারিত চোখে সে তাকিয়ে থাকে সামনের অন্ধকারের দিকে।

গভীর রাতের আবরণ ভেদ করে ধীরে ধীরে প্রকট হতে থাকে একটা অস্পষ্ট মূর্তি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আবছা আকৃতি রূপ নেয় এক দৃপ্ত অশ্বারোহীর। রাতের আলোয় ঝলমল করছে সাদা ঘোড়া। আর তার পিঠে বসে আছে নাভেদ। জুলফার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নাভেদের দৃষ্টিতেও ফুটে উঠে বিস্ময়। সে সটান লাফিয়ে নামে ঘোড়ার পিঠ থেকে। ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে জুলফার দিকে। 

জুলফার দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে, "কী আশ্চর্য! আপনি এই নির্জন বনে?"

জুলফার হৃদয় তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। সে কিছুটা সংকুচিত হয়ে উত্তর দেয়, "আমি... আমি এখানে একটু হাঁটতে এসেছিলাম।"

"এতো রাতে! একা!"

জুলফা অস্বস্তি নিয়ে বলে, "এখানে প্রায়ই আসি, আমার অভ্যাস আছে।"

"এই বন আর আগের মতো নিরাপদ নেই। শুনেছি, দস্যুরা নাকি এদিকে তাদের আস্তানা গেড়েছে। আপনার মতো একজন রূপবতী নারীর পক্ষে এখানে একা থাকা মোটেও নিরাপদ নয়।"

"আপনিও তো একা একা ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।"

নাভেদ হেসে জবাব দেয়," মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মনের ভেতর জমানো সব একাকীত্ব আর শূন্যতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন এই ঘোড়াই আমার একমাত্র সঙ্গী হয়। আমরা দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়ি। মনের শান্তি আর জীবনের অর্থ খুঁজতে।"

জুলফার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে আসে "আপনারও দুঃখ আছে!"

নাভেদের ঠোঁটে হাসি প্রশস্ত হয়। বলে, "দুঃখ? সে তো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর অস্তিত্ব প্রতিটি মানুষের জীবনেই থাকে। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এই বিশাল জমিদারির একজন অধিকারিণী হয়েও আপনার মনে এতো অতৃপ্তির জন্ম কেন?"

জুলফার চোখ দুটিতে কৌতুহল ভর করে। নাভেদ কীভাবে তার অন্তরের গোপন কথাটি জানতে পেরেছে? সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, "আমার? আমার আবার কীসের অতৃপ্তি? আমি তো সবই পেয়েছি জীবনে।"

"মনে অশান্তি কিংবা অতৃপ্তি না থাকলে কি কেউ এভাবে রাতের অন্ধকারে নির্জন বনে ঘুরে বেড়ায়? মানুষ তখনই প্রকৃতির কোলে আশ্রয় খোঁজে যখন সে মানুষের সান্নিধ্যে কিংবা বস্তুগত সুখ-সমৃদ্ধির মাঝে তার মনের শান্তি খুঁজে পায় না।"

জুলফা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নাভেদ কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলে, "রাত গভীর হয়ে আসছে। আপনার এবার বাড়ি ফেরা উচিত। বনের নীরবতা যতই মনোরম হোক, এর বিপদও কম নয়।"

জুলফা মাথা নাড়ে। নাভেদ ঘোড়ার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই, আবার জুলফার দিকে ফিরে তাকায়। একটু ইতস্তত করে বলে, "রাইহা আর আমার মধ্যে... ওটা শুধুই বন্ধুত্বের সম্পর্ক। জানেন তো, মেয়েটা একটু আধুনিক মনের। তাই ওভাবে জড়িয়ে ধরেছিল।"

বলেই দ্রুত ঘোড়ায় চেপে বসে। একবার ফিরে তাকিয়ে বলে, "আসি তাহলে।"

জুলফা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চল মূর্তির মতো। নাভেদের শেষ কথাগুলো তার কানে বাজছে, "রাইহা আর আমার মধ্যে... ওটা শুধুই বন্ধুত্বের সম্পর্ক।" কথাগুলো মন্ত্রের মতো কাজ করে। মনের আকাশ থেকে কালো মেঘের আস্তরণ সরে গিয়ে সেখানে দেখা দেয় মনোরম রামধনু। গতকাল থেকে বুকের মধ্যে যে ভারী পাথরটা চেপে বসে আছে, সেটা হঠাৎ করেই পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে।

সেইসাথে কানে বেজে উঠে নাভেদের অন্য আরেকটি কথা, "আপনার মতো একজন রূপবতী নারীর পক্ষে এখানে একা থাকা মোটেও নিরাপদ নয়।" তখন এই কথাটা তার মনে তেমন দাগ কাটেনি, কিন্তু এখন সেই কথাটি নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে।
"রূপবতী..." শব্দটা জুলফার মনে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। নাভেদ তাকে রূপবতী বলেছে! সে এক হাতে নিজের গাল স্পর্শ করে।

আবার ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ভেসে আসে। জুলফা চমকে উঠে মুখ তুলে। নাভেদ ঘোড়া থেকে নেমে এসে সংকোচ নিয়ে বলে, "আপনাকে নির্জন বনপথ দিয়ে একা যেতে দেওয়া উচিত হবে না।" একটু থেমে আবার বলে, "যদি আপত্তি না থাকে, আমি আপনাকে আমার ঘোড়ায় চড়িয়ে বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারি।"

নাভেদের প্রস্তাবে জুলফার মন বিস্ময়ে, আনন্দে বাক-বাকুম করে ওঠে। সঙ্গে একটা সূক্ষ্ম উদ্বেগও মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সে কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজের ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নিয়ে মৃদু স্বরে বলে, "নাভেদ সাহেব, আপনার উদারতায় আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু..." একটু থেমে তারপর আস্তে আস্তে বলে, "আপনি জানেন, আমার অবস্থান... সমাজের চোখে... যদি কেউ দেখে ফেলে..."

নাভেদ জুলফার অসমাপ্ত কথার অর্থ বুঝতে পেরে জুলফার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, "আমি আপনার দুশ্চিন্তা বুঝতে পারছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার নিরাপত্তাই সবচেয়ে জরুরি। লোকে কী ভাববে, সেটা নিয়ে এখন ভাবার সময় নয়। আর তাছাড়া, আমরা তো কিছু অন্যায় করছি না। শুধুমাত্র একজন বন্ধু হিসেবে আরেক বন্ধুকে সাহায্য করছি।"

জুলফার মনের মধ্যে তখন তুমুল দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার দায়, অন্যদিকে নাভেদের প্রতি তার অনুরাগ। এই মানুষটার সান্নিধ্য জন্য সে সর্বক্ষণ উন্মুখ হয়ে থাকে। আর এখন যখন সেই সুযোগ এসেছে, তখন কি সে তা হারাতে পারে? 

জুলফা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে বলে, "ঠিক আছে। তবে... আমি কখনো ঘোড়ায় চড়িনি। একটু ভয় লাগছে।"

নাভেদ ঘোড়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, তারপর জুলফার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, "আমি আছি। আপনার কিছু হতে দেব না। আসুন।"

জুলফা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে নাভেদের হাতে হাত রাখে। নাভেদ তাকে যত্ন করে ঘোড়ার পিঠে তুলে দেয়। 

নাভেদ পিছনে বসতেই জুলফা অনুভব করে তার পিঠের সঙ্গে নাভেদের বুকের স্পর্শ। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথা ফাঁকা হয়ে যায়। হৃদয় উধাও হয়ে যাচ্ছে, মাথা ঘুরছে অবিরাম। গায়ে এক ফোঁটাও শক্তি পাচ্ছে না। ঘোড়া ছুটতে শুরু করেছে। তার ক্ষুরের শব্দে বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে পড়েছে। চাঁদের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে নাচছে তাদের গায়ে। জুলফার নিশ্বাস ক্রমশ দ্রুত হয়ে ওঠে। সে চেষ্টা করছে নিজেকে সামলাতে, কিন্তু নাভেদের উষ্ণ শ্বাস তার ঘাড়ে লাগায়, অনুভূতির বেড়াজালে সে আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।

হঠাৎ করেই জুলফার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে। শরীর ঝিমঝিম করতে থাকে, মনে হয় যেন সে ভেসে যাচ্ছে অতল গহ্বরে। তার জ্ঞান হারানোর মুহূর্তটা একটা স্বপ্নের মতো। বনের গাছপালা, চাঁদের আলো, ঘোড়ার দৌড় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

জুলফার শরীর ঢলে পড়ছে। তৎক্ষণাৎ নাভেদ তাকে জড়িয়ে ধরে। ঘোড়ার গতি কমিয়ে জুলফাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। তার নরম চুলে হাত বুলিয়ে, কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, "জুলফা, আমি আছি তো। ভয় নেই।" 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp