বৈশাখের রাত৷ সাব্বিরের কলাবাগানের বাসাটা ডুবে আছে নিঝুম অন্ধকারে। মস্ত জায়গার উপর সংস্কারহীন সেকেলে বাড়ি বলেই হয়তো আসশ্যাওড়ার ঝোপের মাথায় দেখা যাচ্ছে ছন্নছাড়া জোনাক পোকার দল। বাড়ির সীমানায় কয়েকটি কাঁঠাল গাছ খেয়াল করেছিল মিথি। সেখান থেকেই ভেসে আসছে পাকা কাঁঠালের মিষ্ট সুবাস। মিথি বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে ধূসর মেঘ জমলেও ভয়ংকর গরম। মিথির এমন গরমে থেকে অভ্যাস নেই। খালামণিদের মিরপুরের বাসায় খালুজানের বদৌলতে লোডশেডিং কখনও টের পায়নি মিথি। গ্রামে অবশ্য লোডশেডিং উপভোগ করার সুযোগ রেখেছেন দাদাজান। বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও দাদাজান প্রায়শই লোডশেডিং-এর ব্যাপারটাকে পরিবারের প্রত্যেকের উপর চাপিয়ে দিয়ে সকলকে গ্রামীণ রাত্রি দেখতে বাধ্য করেন। গরমের রাতগুলোতে তাই অতিষ্ঠ হয়ে ভাই-বোনদের বেরিয়ে আসতে হয় ঘর থেকে। দিঘি পাড়ে আড্ডা বসে। মাঝরাতে সাঁতার কাটতে নামে ছেলেদের দল। সাব্বিরের বাসার এই শহুরে লোডশেডিংয়ের সৌন্দর্যও বড় অন্যরকম। ঠিক গুমোট নয়। আবার গ্রামীনও নয়। কেমন এক মায়া মায়া, মিষ্টি। ঠিক যেন শরৎবাবুর উপন্যাস। এই রকম লোডশেডিং-এ প্রেমি হয়ে উঠতে চায় হৃদয়। নিজের কোনো মানুষ পাওয়ার শখ হয়। মিথির নিজের কোনো মানুষ নেই তবে নিজের অনেক কাজ পড়ে আছে। এই দুইদিন খুব ছোটাছুটি আর অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্কয়ার গ্রুপের প্রেজেন্টেশনটা রেডি করেছে। ফাইনাল লুকটা চেইক করে আরও নিঁখুত করা যায় কি-না সে নিয়ে খাটতে হবে সারারাত। মিথি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী কাল ক্যাজুয়াল শার্ট প্যান্ট পরে বেরুবে। যেমনটা সবসময় পরতো। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, সাব্বিরের এই বাড়িতে কী কারণে যেন কেবল শাড়ি পরে থাকতে ইচ্ছে হয় মিথির। সেদিন ওমন ইম্পোর্টেন্ট ইন্টারভিউতেও নিজেকে অবাক করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত শাড়িই পরে ফেলল। এইযে আজ, এই গরমের মধ্যেও সুতি শাড়ি পরে বসে আছে। আগের মিথি, মিরপুরের খালামণির বাসায় থাকা মিথি কী কোনোদিন রাতের বেলা শাড়ি পরার কথা কল্পনা করতে পারতো? মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রায় সাথে সাথেই টোকা পড়ল দরজায়,
‘ আপনি কী ব্যস্ত মিথি? আসব?’
মিথি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেই ঘাড় ফিরিয়ে অন্ধকার ঘরের ভেতরে তাকাল। সাব্বিরের গলা পাওয়ার পর আচমকা মনে পড়ল, এখানে আসার পর গত দুইদিনে একবারও সাব্বিরের সাথে সেভাবে দেখা হয়নি মিথির৷ মিথি সবসময় প্রেজেন্টেশনের কাজে বাইরে বাইরে ঘুরে বেরিয়েছে। ফিরতে ফিরতেও হয়েছে গভীর রাত। সাব্বির প্রথম দিনই মিথিকে বাড়ির এক্সট্রা চাবি হস্তান্তর করেছে। সেজন্য আর…
‘ আসুন।’
মিথির মিহি কণ্ঠের উত্তর পেয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সাব্বির। ভেতর ঘরে কোনো আলোর হদিশ না পেয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দিশেহারা বোধ করল। অবাক কণ্ঠে শুধাল,
‘ এতো অন্ধকার! আপনি আলো জ্বালেননি কেন মিথি?’
‘ প্রচন্ড গরম! অন্ধকারে থাকতেই ভালো লাগছে সাব্বির সাহেব।’
‘ আপনি কোথায়?’
‘ বারান্দায় আছি। আপনাকে দেখতে পাচ্ছি। এদিকে চলে আসুন।’
সাব্বির পায়ে পায়ে বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়াল। নিশুতি রাত হলেও আকাশটা আলো আলো হয়ে আছে। সেই আলোতে বারান্দার গ্রিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শাড়ি পরিহিতা এক রমণী। কেমন বিষণ্ণ তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি। সাব্বিরকে বারান্দার দরজায় দাঁড়াতে দেখেই শুধাল,
‘ কোনো দরকার ছিল সাব্বির সাহেব?’
সাব্বির অপ্রস্তুত বোধ করল। মিথির ঘরে আসার পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য তার নেই। হঠাৎ করেই মিথির সাথে কথা বলবার তৃষ্ণা জাগছিল বুকে। খুবই খারাপ তৃষ্ণা। এই তৃষ্ণা শুরু হয়েছে ওই অসুখের দিনগুলো থেকে। সাব্বির ভেবেছিল, ময়মনসিংহ থেকে চলে এলে মিথির সাথে তেমন দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। চোখের আড়ালে এই তৃষ্ণা সয়ে নেওয়া সহজ হবে। তারপর একদিন কথাবার্তা বলে কাগজে-কলমে এই সম্পর্কের শেষ নির্ধারণ করে ফেলা যাবে। সাব্বির মিথিকে যতটুকু জেনেছে, মিথিও তাতে বিন্দুমাত্র বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করবে না। মিথি বাঁধা দিবে না এই চিন্তা সাব্বিরের জন্য বড় ব্যথার, অন্যদিকে খুব স্বস্তির। মিথি পবিত্র। মিথি সুন্দর। কী দরকার মিথিকে তার পাপের সাথে জড়িয়ে রেখে এই ব্যথাটাকে আরও গভীর? আরও গাঢ় করার? এই তৃষ্ণা বেড়ে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে যাওয়ার আগেই কী থেমে যাওয়া উচিত না? কিন্তু দাদাজান এখানেও কষলেন অন্যরকম এক অঙ্ক। সেদিন খাবার টেবিলে অতোগুলো মানুষের সামনে মিথিকে অস্বীকার করা সাব্বিরের জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। যে অগ্নিপরীক্ষায় সাব্বিরের থেকেও বেশি দগ্ধ হতো মিথি। দেবী প্রতিমার মতো মিথিকে আবার কোনো অপমানের মুখে ফেলা সাব্বিরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ভেবেছিল, কী আর হবে একই বাড়িতে থাকলে? নিজের সত্যটা আড়াল করে কয়েকটা মাস নাহয় বন্ধুর মতো নিশ্চুপে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। তারপর ধীরেসুস্থে একটা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা যাবে। কিন্তু মিথি সত্য সত্য এই বাড়িতে উঠে আসার পর সাব্বির বুঝতে পারছে, এই থাকাটা কত সত্য! কত তীব্র! কত চৌম্বকীয়! সাব্বির কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইতস্তত করে বলল,
‘ আপনার সাথে গল্প করতে ইচ্ছে হচ্ছিল মিথি৷’
সাব্বিরের থেকে এমন উত্তর আশা করেনি বলেই হয়ত স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল মিথি। চশমার আড়ালে আবছা চোখদুটো কী যে নিষ্পাপ লাগে মিথির চোখে! অবুঝ বালকের সরলতা তার দৃষ্টিজুড়ে। তাকালেই মিথির ইচ্ছে হয় বুকে নিয়ে আদর করে দিতে৷ মিথিকে চুপ থাকতে দেখে সাব্বির একটু অপ্রস্তুত কণ্ঠে তার আবদারের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করল,
‘ এক বাসায় দুই জন মানুষ একদম অপরিচিতের মতো বোধহয় থাকা যায় না। আপনি যতদিন থাকবেন ততদিন কী আমরা বন্ধু হয়ে থাকতে পারি না, মিথি?’
মিথি সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে থেকেই শক্ত কণ্ঠে বলল,
‘ না।’
সাব্বিরের বালকসুলভ চোখে যেন এবার অভিমানের ছায়া পড়ল। মিথির এমন রূঢ় প্রত্যাখানে কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শুধাল,
‘ তাহলে?’
‘ তাহলে কী?’
‘ তাহলে আমরা কীভাবে থাকব? একদম অপরিচিতের মতো?’
‘ না। তা কেন? আমরা আত্মীয়ের মতো থাকতে পারি। আপনি চাইলে আমাকে আশ্রিতাও ভাবতে পারেন। হাজার হলেও আপনার আশ্রয়ে আছি।’
সাব্বিরের মুখ গম্ভীর দেখাল এবার। সে কঠিন গলায় বলল,
‘ নিজের সম্পর্কে এই ধরনের কথা বলবেন না, মিথি৷ আপনি আশ্রিতা নন। স্বামীর বাড়িতে কেউ কখনও আশ্রিতা হয় না। এটা আপনার অধিকার।’
মিথি হাসল। বলল,
‘ অধিকার তো আরও অনেক ধরনের আছে সাব্বির সাহেব। সব অধিকার বাদ দিয়ে শুধু বাড়ির অধিকারে অধিকারী হওয়াটা ভণ্ডামি না? পেলে সব। না পেলে কিচ্ছু না।’
সাব্বিরের মুখ কালো হলো এবার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
‘ বন্ধু হয়ে কেন থাকা যায় না মিথি?’
মিথি হাসিটুকু ধরে রেখে বলল,
‘ আপনার সাথে আমার পরিচয় তো বন্ধু হিসেবে হয়নি সাব্বির সাহেব। আমাদের পরিচয় হয়েছে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। হয়তো এই পরিচয়ের ভিত্তিতে চলতে চলতে আমরা একদিন বন্ধু হয়ে যেতাম। কিন্তু প্রথম পরিচয়টাই যেখানে ঠুনকো সেখানে সেই পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে নতুন কোনো পরিচয় গড়ে ওঠাটা বিব্রতকর৷ সব বন্ধুত্ব গড়ে উঠার পেছনে একটা সুন্দর গল্প থাকে। আমাদের পুরোনো সম্পর্কটা যেদিন একেবারে শেষ হয়ে যাবে। তার অনেকদিন পর আমরা আবার নতুন করে পরিচিত হবো। সেদিন আমরা বন্ধু হবো সাব্বির সাহেব। সেই বন্ধুত্বের গল্পে কোনো বিব্রতকর গল্প জুড়ে থাকবে না। আমি বিব্রত হতে খুব অপছন্দ করি। ততদিন আমরা নাহয় আত্মীয় হয়ে থাকি?’
সাব্বির প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ মৌন থেকে শুধাল,
‘ আত্মীয়ার সাথে কী রাস্তা হাঁটতে যাওয়া যায় মিথি?’
মিথি ম্লান হেসে বলল,
‘ অবশ্যই, সাব্বির সাহেব।’
সাব্বিরের চোখদুটো এবার উজ্জ্বল হলো। লোডশেডিংয়ের শহরে তারা পাশাপাশি হেঁটে বেড়াল। কখনও নিশ্চুপ, কখনও টুকটাক কথা, কখনও দীর্ঘশ্বাস, কখনও বৈশাখের গরম হাওয়ায় মিথির কপালের মিষ্টি চুলগুলো অল্প করে দোলে ওঠা। হৃদয়ের আঙিনায় বৃষ্টির মতো টুপটাপ ঝরে পড়া আনন্দ। সেই আনন্দের সঙ্গী হতে একসময় ধূসর মেঘ কাটিয়ে আকাশের কোণায় উঁকি দিল কৌতুহলী চাঁদ।
—————
গত কয়েকদিন সূর্য বেশ চঞ্চল থাকলেও আজ আকাশের মুখ ভার। শহরের বুকে সদ্য বয়ে যাওয়া ঝড়ের ছাপ। রাস্তার পাশে, ক্যাম্পাসের মাঠে ভেঙে পড়ে আছে গাছগাছালির কচি ডাল। মৌনি সাধারণত ঝড়-বৃষ্টির দিনে ইউনিভার্সিটির আশেপাশে আসে না। ঝড়-বৃষ্টি মাত্রই মৌনির ঘুম দিবস। এই ঘুম দিবসকে মিথ্যে করে ভার্সিটিতে আসতে তাকে বাধ্য করেছে বেয়াদব মিষ্টি। এই মেয়ে কোথা থেকে খবর নিয়েছে মৌনির আজ ইনকোর্স পরীক্ষা আছে। খবর শোনা মাত্রই সে মৌনির পেছনে হাতধুয়ে পড়েছে। পরীক্ষা দিতে আয়! পরীক্ষা দিতে আয়! পরীক্ষা দিতে আয়! তার সঙ্গে অবিশ্রাম গালাগালি। এই মেয়ের অত্যাচারে মৌনিকে বাধ্য হয়ে পরীক্ষা দিতে আসতে হয়েছে। পরীক্ষা দিতে এসেও হয়েছে আরেক বিপদ। বিপদের নাম — মাহিম। মৌনিদের ডিপার্টমেন্টের সিআর। সিআর টাইপ ছেলেরা কিছুটা মেয়ে ঘেঁষা হয়। ক্লাসের সব মেয়েদের সাথে থাকে এদের বিশেষ খাতির। সবার সাথে খাতির থাকলেও সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত মৌনির সাথে মাহিমের তেমন কোনো সদ্ভাব ছিলো না। মৌনি হলো ডিপার্টমেন্টের অন্যতম ফাঁকিবাজ ছাত্রী। এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে বড়জোর দুইদিন ক্লাসে পাওয়া যায়। বাকি তিনদিন তার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে দুপুর গড়ায়। ক্লাসে এলেও আসে খুবই এলোমেলো পোশাকে। সাজগোজ তার পোষায় না। ক্লাসে এসেও তার প্রধান কাজ সুযোগ পেলেই চট করে ঘুমিয়ে পড়া। বলা বাহুল্য, এই মহামান্য ঘুমকুমারীকে চঞ্চল মাহিম এর আগে খুব একটা খেয়াল করেনি। খেয়াল করল, থার্ড ইয়ারের এক প্রেজেন্টেশনের দিন। শাড়ি পরা রূপসী মেয়েদের দলে মৌনি এলো একেবারে সাধারণ একটা কুর্তি আর ঘুমো ঘুমো চোখ নিয়ে। প্রেজেন্টেশন দিতে গিয়ে নিজের ইন্ট্রোডাকশনে হুট করে বলে বসল,
‘ আসসালামু আলাইকুম, আই অ্যাম গুড মর্নিং।’
নিজের এই ভুলে সবার আগে নিজেই হেসে ফেলল মৌনি। মৌনির ডানদিকের একটা দাঁত বাঁকা। হাসলে তাকে চমৎকার দেখায়। মাহিম সেই চমৎকার হাসি দেখে মৌনির প্রেমে পড়ে গেল। প্রেজেন্টেশন শেষে মৌনির সাথে বিশেষভাবে পরিচিত হতে এলো। মৌনি তৎক্ষনাৎ বুঝে গিয়েছিল, এই ছেলে তাকে বড় জ্বালাবে। এবং সে তার জ্বালানো অব্যহতি রেখেছে। আজ সেই জ্বালাজ্বালির চূড়ান্ত হয়েছে বলেই মৌনির বিশ্বাস। মৌনিকে পরীক্ষার হলে তার পেছনে বসতে দেখে এই ছেলে তার পরীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে পুরো চল্লিশ মিনিট তার দিকে হা করে তাকিয়ে থেকেছে। এই ‘হা’ তে কোনো লুকোচুরি নেই। সরাসরি ‘হা’। মাহিমের সরাসরি হা শুধু বন্ধুরা নয় স্যারের চোখে পর্যন্ত পড়ে গেল। স্যার তাকে পেছন ফিরে একেবারে আয়োজন করে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে দাঁড়া করালেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘ এই মাহিম? তোর খাতা সামনে৷ তুই পেছনে কী দেখিস?’
মাহিম অকপটে বলল,
‘ মৌনিকে দেখি স্যার।’
ডিপার্টমেন্টের সবথেকে চটপটে, দুষ্টু ছেলেগুলো সাধারণত স্যারদের প্রিয় হয়। মাহিমও সেইরকমই একটা ছেলে। স্যারদের বিশেষ স্নেহ পেয়ে পেয়েই সে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পৌঁছেছে। অতএব, স্যার তার এই মৌনি দেখা বিষয়ে বিশেষ আনন্দ পেলেন বলে মনে হলো। ঠোঁটের কোণে চাপা দুষ্টুমি ধরে রেখে গম্ভীর গলায় বললেন,
‘ তুই আসছিস পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা দিবি। দেখতে হলে দেখবি প্রশ্নপত্র। মৌনিকে দেখবি কেন? মৌনি কী প্রশ্নপত্র নাকি?’
সমস্ত ক্লাসে এবার হাসির বন্যা বয়ে গেল। মাহিম দুষ্টু হেসে বলল,
‘ স্যার, কবি বলেছেন – নারীরা হলো পৃথিবীর সবথেকে আনসলভড ইকুয়েশন। তাদের সল্ভ করতে পারলেই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’
স্যার হাসি চেপে ধমক দিয়ে বললেন,
‘ দিবো এক থাপ্পড়! যা, খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যা। তোর পরীক্ষা দেওয়ার দরকার নেই।’
মাহিম বলল,
‘ স্যার আমি আপনার পাশে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকি? বাইরে যাব না।’
‘ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি তাকিয়ে থাকবি?’
‘ স্যার, তাকিয়ে থাকব।’
ক্লাসরুমে আবারও এক চোট হাসির নহর বয়ে গেল। আর ডিপার্টমেন্টের অদৃশ্য গসিপ বোর্ডে পার্মানেন্টলি মাহিমের নামের পাশে লাল কালিতে লেখা হয়ে গেল মৌনির নাম। ঘটনাটা ভাবতেই বিতৃষ্ণায় তেতো হয়ে যাচ্ছে তার মন। মৌনি কোনোরকম পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে দ্রুত ডিপার্টমেন্ট থেকে সরে গেল। ফোনটা বের করতেই দেখল মায়ের ফোন। মোবাইলে যখন তখন কথা বলাটা মৌনির অপছন্দ। তারপরও খুব অনিচ্ছা নিয়ে ফোন ওঠাল। মা শুধালেন,
‘ পরীক্ষা কেমন হয়েছে?’
মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ আমি তো এখন আর ক্লাস টুতে পড়ি না যে পরীক্ষা কেমন হয়েছে এই ধরনের চাইল্ডিশ কোশ্চেন করবে আম্মু।’
মা শুধালেন,
‘ এতো বিরক্ত হয়ে আছ কেন?’
‘ বিরক্ত হয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে তাই বিরক্ত হয়ে আছি। বিশেষ কোনো কারণ নেই। তুমি কী গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে আম্মু?’
‘ তোমাকে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে ফোন দিতে হয়? গুরুত্বপূর্ণ কিছু না বললে কী করবে?’
মৌনি এবার বিরক্ত সরিয়ে হাসল। বলল,
‘ তোমাকে একটা উড়ন্ত চুমু দিয়ে ফোন রেখে দিব। তুমি সেই চুমু দুই ভাগ করে অর্ধেকটা বাবাকে দিবে।’
মা হাসলেন। মেয়ের সাথে কথা বলতে এলেই আবেগে কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে। মেয়েটাকে একটু বুকে নিয়ে আদর করে দিতে পারলে বোধহয় মনটা কিছু শান্ত হতো। মৌনি মাকে প্রশ্রয় দিয়ে বলল,
‘ তোমারও কী আমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে আম্মু? আচ্ছা, তাহলে আমি বাড়ি আসি। আমাকে মন ভরে চুমু খেয়ে নিও। ঠিক আছে?’
‘ না।’
মৌনি মায়ের কণ্ঠের কাঠিন্য ধরতে পারল। হঠাৎ এমন স্বর বদলে একটু অবাক হয়েই শুধাল,
‘ আমার বাড়ি যাওয়া তোমার পছন্দ না কেন, আম্মু?’
মা বোধহয় বিব্রত হলেন। অপ্রস্তুত কণ্ঠে বললেন,
‘ পছন্দ হবে না কেন? তোমার তো জার্নি করা পছন্দ না। পরীক্ষার মাঝে জার্নি করার দরকার নেই। পরীক্ষা শেষ হলে এসো।’
মৌনি প্রত্যুত্তরে ম্লান হাসল। এই হাসি তার চোখ স্পর্শ করল না। সে জানে মা তাকে মিথ্যা বলছে। মা কখনও চায় না সে ওই বাড়িতে যাক। গেলেও মায়ের সতর্ক দৃষ্টি মৌনির দিকে তাক করা থাকা সর্বক্ষণ – এ তথ্য মৌনির জন্য নতুন নয়। মা মেয়ের নীরবতা বুঝে প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন,
‘ তোমার ছোট ফুপা-ফুপি হাসপাতালে ভর্তি। ফোন দিয়ে খবর নিও।’
মৌনি সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভ্রু বাঁকিয়ে শুধাল,
‘ কেন! হঠাৎ হাসপাতালে কেন?’
মৌনির মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
‘ হঠাৎ আর কোথায়! তাদের তো হরদম চলছে। একটা অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়ে তারা কী করে নিজেদের মধ্যে এমন নগ্ন কলহে জড়ায়? কতটা বেপরোয়া হলে একে-অপরের মাথা ফাঁটিয়ে দিতে পারে!’
‘ দু'জন দু'জনের মাথা ফাঁটিয়েছে নাকি?’
‘ তোমার ফুপু তোমার ফুপার মাথা ফাঁটিয়েছে। তোমার ফুপা তোমার ফুপুর হাতে বটি দিয়ে আঘাত করেছে।’
মৌনি হেসে ফেলে বলল,
‘ ওয়াও! গ্রেট!’
মৌনির উচ্ছ্বাসে কঠিন হলেন মা। ধমক দিয়ে বললেন,
‘ এইসব ব্যাপারে মজা করবে না মৌনি। এটা কোনো মজার ব্যাপার না। পাশাপাশি দুই গ্রামে বাড়ি আমাদের। গ্রামে জানাজানি হলে ব্যাপারটা আমাদের জন্য কতটা লজ্জার হবে জানো? দুই একদিনের মধ্যে পারিবারিকভাবে বিচার সালিশ বসবে। এই বয়সে এসে বিচার সালিশের আসামী হওয়া কেমন অপমানের এরা তা বুঝে? এদের জন্য ছেলেমেয়েদুটো নষ্ট হচ্ছে। ছেলেটা তো নষ্ট হয়েছেই। নাহিদ কাল আমাদের বাড়িতে এসেছে। চেহারা ছবির অবস্থা দেখেই বুঝা যায় কী পরিমাণ বখেছে এই ছেলে। তারওপর মেলামেশা করে পাড়ার নষ্ট ছেলেদের সাথে। এই ছেলের জন্যও আমাদের পরিবারের মানসম্মান ডুববে দেখো!’
মৌনি প্রত্যুত্তরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৌনি যতদূর জানে, ছোটফুপুই তাদের বাড়ির একমাত্র মেয়ে যে কি-না দাদাজানের বিরোধিতা করে বাড়ি পালিয়ে ধরেছিল প্রেমিকের হাত। সেই পালিয়ে যাওয়াও ছিল ভয়ংকর পালিয়ে যাওয়া। ফুপা ছিলেন ফুপুদের পাশের গ্রামেরই অভিজাত পরিবারের সন্তান। দাদাজানের বেকার, বখে যাওয়া ফুপাকে পছন্দ ছিল না বলে ফুপুকে বিয়ে দিয়েছিলেন সাধারণ এক প্রফেসরের ঘরে। ফুপু দাদাজানের কথায় বিয়ে করলেও বিয়ের রাতেই করে বসলেন বিধ্বংসী এক কাজ। দাদাজানের সম্মান ধূলিসাৎ করে বাসর রাতে স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন প্রেমিকের হাত ধরে। যারা প্রেমের জন্য এতো দুঃসাহসী হতে পেরেছিল তাদের সাংসারিক জীবনে কেন এতো অশান্তি বুঝে উঠতে পারে না মৌনি। আর নাহিদ! ওকে নিয়ে ভাবতে চায় না মৌনি। ছেলেটার এই দুর্দশার কথা ভাবলেই সুপ্ত বিবেক প্রিয় বন্ধুটিকে দাঁড় করাতে চায় অপরাধীর কাঠগড়ায়। মৌনি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলল। মায়ের সাথে কথা শেষ করে দাঁড়াল মিষ্টির ডিপার্টমেন্টের সামনে। মিষ্টি বন্ধুর ফোন পেয়ে চপল পায়ে বেরিয়ে এসেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। মৌনিকে ভালো করে নিরীক্ষণ করে বলল,
‘ কী হয়েছে? তোর মন খারাপ কেন!’
মৌনি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ বলছি, তার আগে ক্যাম্পাস থেকে বের হ। ওই সিআরের বাচ্চা আমার কলিজা খেয়ে ফেলল বলে! দেখবি যেকোনো সময় এখানেও উড়ে উড়ে চলে এসেছে।’
দুই বন্ধু পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতেই মৌনি আজকের ঘটনার আদ্যোপান্ত জানাল। মিষ্টি দুষ্টুমি করে বলল,
‘ খারাপ কী! ডিপার্টমেন্টে পপুলার তো হয়েই গেছিস৷ এবার বেচারার প্রেম পদ্মটা গ্রহণ করে পপুলার থেকে পপুলার কাপল হয়ে যা।’
মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ মাথা খারাপ! এসব লাইমলাইট আমার একদম পছন্দ না। আমি ঝঞ্জাটহীন জীবন ভালোবাসি। আর এই মুহূর্তে এই ছেলে আমার জীবনের অন্যতম এক ঝঞ্জাল। একে কী করে ছাঁটাই করা যায় সেই পদ্ধতি বল।’
মিষ্টি বলল,
‘ তোর যে বয়ফ্রেন্ড আছে এই কথাটা ছেলেটাকে বলে দিলেই তো হয়।’
মৌনি মিষ্টির কথায় চোখ বড় বড় করে তাকাল। অবাক হয়ে বলল,
‘ আমার আবার বয়ফ্রেন্ড এলো কোথ্থকে?’
‘ না আসলেও আনবি৷ মিথ্যা করে বলবি।’
মৌনি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ না থাকলে মিথ্যা বলব কেন? কমিটমেন্টে না থাকা কোনো মেয়ে সিঙ্গেল থাকতে চাইতে পারে না? এই সমাজে থাকতে হলে কেন কাউকে ভালোবাসতেই হবে? তাকে আমি প্রথমদিনই স্পষ্ট করে বলেছি, আমি এসবে ইন্টারেস্টেড নই। তারপরও এসব আদিখ্যেতা অসহ্য লাগছে। রাবিশ!’
‘ রাবিশ বলে লাভ নেই। পুরুষ মানুষ এতো ওয়েল বিহেভড হলে পৃথিবী আর পৃথিবী থাকতো না। তুই যতদিন সিঙ্গেল আছিস ইন্টারেস্টেড হোস বা না-হোস তারা তোকে পটিয়ে ফেলার চেষ্টা অব্যহত রাখবে। এটাই ইউনিভার্সাল ট্রুথ। এই নিয়ে মুড অফ না করে মুডটা একটু ঠিক কর, প্লিজ।’
মৌনি কিছুক্ষণ বিরক্ত হয়ে থেকে বলল,
‘ ধুর বা*ল। এভাবে মুড ঠিক হবে না।’
মিষ্টি দুই পা এগিয়ে মৌনির সামনে দাঁড়িয়ে নাটকীয় কায়দায় বলল,
‘ তাহলে বলুন, কীভাবে আপনার মুড ঠিক হবে মহারাণী?’
মৌনি চোখে দুষ্টুমি আর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি নিয়ে বলল,
‘ চল সিনেমা হলে গিয়ে একটা দুষ্টু সিনেমা দেখে আসি।’
মিষ্টি ছিটকে সরে গিয়ে বলল,
‘যা সর। মাথা খারাপ!’
মৌনি মুখ ফুলিয়ে বলল,
‘ মাথা খারাপের কী হলো? চল না যাই। চল, চল, চল। তুই তো মিঙ্গেল তোর এক্সাইটমেন্ট আরও বেশি হওয়ার কথা।’
মিষ্টি আঁতকে উঠে বলল,
‘ ঈশানের সাথে এমনিতেই আমার ঝামেলা চলছে। ও যদি জানে আমি এইসব সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে গিয়েছি ও আমাকে আস্ত খেয়ে ফেলবে।’
মৌনি এবার সরু চোখে তাকাল। মিষ্টিকে আগাগোড়া নিরীক্ষণ করে বলল,
‘ তোদের ঝামেলা চলছে! কী নিয়ে?’
মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
‘ খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। ঈশান এই সাধারণ ব্যাপারটাকে টেনে টেনে লম্বা করছে। গতকাল একটা আননোন নাম্বার থেকে তিনবার কল এসেছিল আমার ফোনে। জরুরি ভেবে তৃতীয়বারের সময় আমি কল রিসিভ করেছি। কথা হয়েছে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড। ঈশান ওর ফোনের সাথে আমার ফোন কানেক্ট করে রেখেছে। সে আমার কল হিস্ট্রি দেখতে পারে। এখন এই আননোন নাম্বারের ত্রিশ সেকেন্ড নিয়ে সে হাইপার হয়ে আছে। কেন আমি ফোন তুললাম!’
মৌনি এমন বাহারি সমস্যার কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। মুখ ফসকে বলে বসল,
‘ তোর কল হিস্ট্রি সে কেন চেইক করবে? রিলেশনশিপে এটুকু বিশ্বাস তো থাকা চাই,তাই না?’
মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু কণ্ঠে বলল,
‘ ও আমাকে নিয়ে একটু বেশি পজিসিভ মৌনি৷’
এরপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না।
কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এর থেকে বেশি ইন্টারফেয়ার করা বোধহয় ঠিক হবে না ভেবে
আর কথা এগুলো না মৌনি। উদাস মুখে তাকিয়ে রইল ধূসর আকাশের দিকে। নাহিদ কখনও এই সকল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেনি বলে মিষ্টির ধারণা হয়েছিল নাহিদ তাকে কখনও ভালোবাসেনি। ঈশানের এই হস্তক্ষেপ আবার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাহলে কী ভালোবাসা আর স্বাধীনতা দুটো বিপরীতধর্মী? ভালোবাসা আসলে পরাধীনতারই নামান্তর? কিন্তু মৌনি তো ভেবেছিল, একমাত্র ভালোবাসাই মানুষকে করতে পারে সর্বোচ্চ স্বাধীন। যে বন্য পাখিকে ভালোবেসে খাঁচায় বন্দি করে রাখে তার থেকে খাঁচার দুয়ার খোলে দেওয়া ভালোবাসা কী বৃহৎ নয়?
—————
শহরের বুকে সন্ধ্যা নামছে। আকাশে চড়েছে বাহারি রঙ। কমলা, হলুদ, লাল, নীল, সাদা — ঠিক যেন মৌনির অগোছালো কালার প্লেট। মৌনি বারান্দায় ঝুলানো ঝুলায় কপাল ঠেকিয়ে বসল৷ এই ঝুলাটা সে কিনেছে দুইদিন আগে। কিচ্ছু ভালো না লাগার সন্ধ্যাগুলোতে এখানে বসে দোল খেতে চমৎকার লাগে। দোল খেতে খেতে প্রায়ই তার কারো সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে হয়। মৌনির পৃথিবীতে অজস্র বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী থাকলেও গল্প করার মতো ঘনিষ্ঠ মানুষ খুব একটা নেই। ঘনিষ্ঠ আলাপে মৌনির আচরণে আপনাআপনিই একটা শিশুসুলভ ব্যাপার চলে আসে। এই সময় সে শিশুদের মতোই বলে ফেলে, যা ইচ্ছে তাই। এমন ‘যা ইচ্ছে তাই’ কথাবার্তা সবার সাথে বলা যায় না। তার জন্য বিশ্বস্ত মানুষ দরকার। মৌনির ‘যা ইচ্ছে তাই’ দলের গর্বিত সদস্য হলো মোটে দু'জন। শাওন এবং মিষ্টি। এদের দু'জনের মধ্যে একজনকেও মৌনি নিজে থেকে গল্প করতে ডাকে না। সে অপেক্ষা করে। তার গল্প করার ইচ্ছে ধরনের মন খারাপে এদের কারো ফোন চলে আসে কি-না, এটা দেখাও তার জন্য বিশাল আগ্রহের ব্যাপার। মৌনি ঝুলায় বসে টানা দুই কাপ চা শেষ করল। এর মধ্যে একবার পরিচিত এক প্রকাশকের টেলিফোন এলো। একবার টেলিফোন করল পুরাতন এক বন্ধু। তৃতীয় কলটা এলো বাড়ি থেকে। মৌনি পুরোটা সময় ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু একটা কলও রিসিভ করল না৷ সবশেষে ফোন এলো একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে। নাম্বারটা থেকে দুইবার কল আসার পর মৌনি চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে হাতের ঘড়িতে বার আর সময় দেখল। মঙ্গলবার, সন্ধ্যা ছয়টা। প্রায় প্রতি মঙ্গলবারে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে অপরিচিত নাম্বার থেকে যে কল আসে তার গর্বিত মালিক শাওন। মৌনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার এখন কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আবার….! মৌনি কয়েক সেকেন্ড মৌন বসে থেকে ফোন উঠাল। ঠোঁট উল্টে অনুযোগ করে বলল,
‘ এই শাওন! শাওন? আজ আমার মন ভালো নেই। আমার মনটা ভালো করে দাও তো। এক্ষুনি দাও, কুইক।’
শেষ মুহূর্তে ফোন রিসিভ হওয়ায় যেন প্রাণ ফিরে পেল শাওন৷ মৌনির কলকল কথামালায় নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হাসল। কণ্ঠে আলতো আদর নিয়ে শুধাল,
‘ মনের মনে কী হয়েছে?’
মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ মনের মনে অসুখ হয়েছে।’
পরমুহূর্তেই এই দীর্ঘশ্বাস কাটিয়ে একা একাই হৈ হৈ করে উঠল মৌনি। আগ্রহ নিয়ে বলল,
‘ জানো আজকে কী হয়েছে?’
শাওন আলতো হেসে বলল,
‘ জানি না। আপনিই জানান আজ কী হয়েছে?’
মৌনি ঝোলার উপর আরাম করে বসে পাহাড়ি ঝরনার মতো কলকল করে বলে গেল আজকে ডিপার্টমেন্টে ঘটে যাওয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত। সমস্ত ঘটনা শুনে শাওন শুধাল,
‘ ছেলেটা দেখতে কেমন?’
মৌনি একটু ভেবে বলল,
‘ দেখতে ভালোই। কিন্তু পাটকাঠির মতো শুকনা। এমন চ্যাঙড়া ছেলে আমার একদম পছন্দ না।’
শাওন বলল,
‘ আমি তো পাটকাঠি না। আমার সাথে কোথায় তুমি প্রেম করে ভাসিয়ে ফেলছ?’
‘ তোমার সাথে প্রেম কেন করব? তুমি আমার কাছের বন্ধু। বন্ধুদের সাথে আমি প্রেম ফ্রেম করি না।’
শাওন বলল,
‘ আচ্ছা, আমার সাথে না করলে। বেচারাকে একটা চান্স দাও। চ্যাঙড়া বলে রিজেক্ট করে দেওয়া খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। জানো না কবি কী বলেছেন? যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই৷ পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’
‘ শাট আপ শাওন। এই ছেলে রত্ন হলেও তাকে আমার চাই না। আমি শিওর, এই বদমাইশ এক সাথে পাঁচ সাতটা মেয়ের প্রেমে একইভাবে ডুবে আছে। তাতে অবশ্য আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি বুঝি না, এরা এতো প্রেম পায় কোথায়? এদিকে আমি একশো বছর ধরে চেষ্টা করেও কারো প্রেমে পড়তে পারছি না। আমি বুঝে গিয়েছি, বিয়ে ছাড়া আমার কোনো গতি নেই। কেউ আমাকে জোর করে ধরে বিয়ে কেন দিয়ে দিচ্ছে না শাওন?’
শাওন হেসে বলল,
‘ তোমার দাদাজানের কাছে একটা পত্র লিখো। তিনি তো এই বিষয়ে এক্সপার্ট। তুমি চাইলে তোমার হয়ে আমি লিখে দিতে পারি।’
‘ প্লিজ লেখ। এই দহন আর প্রাণে সহে না। তেইশ বছর চলছে আমার এন্ড আই হ্যাভ নেভার কিসড্ এনিওয়ান। মানা যায়?’
প্রচন্ড হতাশা ফুটে উঠল মৌনির কণ্ঠে। শাওন সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
‘ তুমি সত্যিই কাউকে চুমু খাওনি কোনোদিন?’
‘ কীভাবে খাব? আমার কোনো প্রেমিক ছিল কোনোদিন?’
‘ প্রেমিক না থাকলেও এডমায়ারার তো আছে। তাদের কাউকে ধরে একটা চুমু খেয়ে নাও। বেচারার ভাগ্য খুলে যাবে।’
মৌনি চপল কণ্ঠে বলল,
‘ ধুর! তোমার মনে হয়, আমি যত্রতত্র কাউকে চুমু খেয়ে ফেলার মতো মেয়ে? আমি তাকে চুমু খাব আর সে আমার চুমু নিয়ে অন্য মেয়ের ঠোঁটে চুমু দিতে চলে যাবে? শোন শাওন, আমার ওসবে চলবে না। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর মাই হাজবেন্ড। ব্যাটা কোথায় আছে বলো তো? নিশ্চিত অন্য কোনো মেয়ের ঠোঁটের সাথে রঙ্গ করছে। অথচ এদিকে আমি চুমুশূন্যতায় আহত।’
শাওন হেসে ফেলল,
‘ চুমু নিয়ে তোমার খুব অবসেশন মনে হচ্ছে?’
মৌনি খুব উৎসাহ নিয়ে বলল,
‘ প্রচুর। আমি তো ভেবে রেখেছি বিয়ের পর বরকে দিনে তিনবেলা Daniel এর ওই উক্তিটি শুনাব,
"Kiss me. Kiss me hard. Take the breath from my mouth and replace it with yours so that my lungs would breath your very essence."
শাওনের কণ্ঠ শুকিয়ে এলো। বলতে ইচ্ছে হলো, পাগল মেয়ে! এইভাবে কাউকে বলতে হয় না। তুমি বারবার আমার ভালোবাসার কথা ভুলে গেলেও আমি তো ভুলে যেতে পারি না! কিন্তু বলতে হলো,
' এবার রাখতে হবে মৌনি।'
মৌনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলল,
' কিন্তু আমার তো কথা শেষ হয়নি শাওন।'
' আরও কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে?'
' হ্যাঁ।'
' কতক্ষণ?'
' অনেকক্ষণ। তুমি কবে ফিরবে শাওন?'
' তুমি চাও আমি ফিরে আসি?'
মৌনি মন খারাপ করে বলল,
' চাইই তো।'
' কখন ফিরব?'
মৌনি আহ্লাদ করে বলল,
' এখন।'
' এখন তো আসতে পারব না। পরশু আসি?'
শাওন মজা করছে ভেবে মৌনি হেসে ফেলে বলল,
' আসো।'
শাওন হাসল। মৌনি যদি জানতো এই হাসি কত বিপদজনক! তার একটি আহ্বান এই ছেলেটিকে করে ফেলতে পারে ঠিক কতটা বিধ্বংসী!
·
·
·
চলবে……………………………………………………