নিজের চেম্বারে বসে আছে তনয়া। সবে মাত্র রোগী দেখা শেষ হল। ইদানীং গরম পরেছে প্রচুর, ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তনয়ার। টেবিল থেকে ফোনটা হাতে তুলল, কল করল তাসলিমাকে। কল রিসিভ হতেই তনয়া প্রশ্ন করল,
"তিতলি আরিশ বাড়ি পৌছেছে?"
ওপাশ থেকে পরমুহূর্তেই ভেসে আসলো তাসলিমার দীর্ঘশ্বাস।
"তোর ছেলে মেয়ে আজকেও মারামারি করে ফিরেছে। আর ইউশা তোর বাবার সাথে বেরিয়েছে।"
তনয়ার চোয়াল ঝুলে পরে। এই ছেলে মেয়ে দুটো কি ভালো হবে না? কদিন পর পিএসসি পরিক্ষা আর এরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে এদিক সেদিক মারামারি করে বাড়ি ফেরে। পুরো বাপের মতো হয়েছে দুটো। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিচার আসবেই আসবেই আর তেহরাবের মতো এরা দুটোও ভাবলেশহীন আচরণ করে কেটে পরে। আজকাল বেশি বাড়াবাড়ি করছে ছেলেমেয়ে দুটো। এর জন্য অবশ্য তনয়ার হাতে মারও খেতে হয়। উল্টো দিকে ইউশায় ভালো সে পুরোপুরি তনয়ার মতো হয়েছে।
তনয়া কন্ঠে রাগী ভাব এনে বলল,
"এখন কই ওরা?"
"এখানেই বসে আছে। আরিশের পা ছিঁলে গিয়েছে। আর তিতলির হাত।"
তনয়ার রাগটা দ্বিগুণ হল।
"আসছি আমি৷ আজ ওদের একদিন কি আমার একদিন। আপনার ছেলে যেন আমাকে না আটকায়।"
তনয়া কল কেটে দেয়। বেরিয়ে পরে চেম্বার থেকে।
—————
"একদম উচিত কাজ করেছে। আরো করা উচিত ছিল।"
তেহরাবের এমন কথা শুনে মনোয়ার সাহেব ক্ষেপে উঠলেন।
"মিয়া আপনার আস্কারাতেই আপনার ছেলেমেয়ে দুটো গোল্লায় যাচ্ছে। কোথায় ভুল করলে শাসন করবেন, তা না করে উল্টো বলছেন ঠিক করেছে? দেখুনতো আমার ছেলেটাকে বিনা কারনে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।"
তেহরাব গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল,
"ওরে চান্দু কি সুন্দর কথা। আপনার ছেলে সাধু? আপনার এইটুকুনি ট্যাপা ছেলে আমার মেয়েকে বলে আমি নাকি টাকা দিয়ে রেজাল্ট কিনেছি৷"
মনোয়ার সাহেব কিছুটা ভরকে গেলেন। তেহরাব একই ন্যায় বলল,
"আমি স্কুলের সভাপতি বলে আমার ছেলে মেয়েদের সবাই যা তা বলবে আর আমার বাচ্চারা মেনে নিবে? তেহরাবের ছাওয়াল পাওয়াল তেহরাবের মতোই।"
আর কিছু বলতে পারলেন না মনোয়ার সাহেব। বলেও যে কোনো লাভ নেই তাও জানা আছে। ছেলেকে নিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বললেন,
"বজ্জাত বাপের বজ্জাত পুলাপান।"
তেহরাব পকেট থেকে সিগারেট বের করল। সামনেই তিতলি আর আরিশ ঠোঁট টিপে হাসছে। তেহরাব সিগারেটে টান দিয়ে হাস্যজ্জ্বল আরিশ তিতলির দিকে তাকিয়ে বলে,
"তোদের আবার কি হল? এত খুশি কেন? যাহ ফ্রেশ হয়ে খেতে বস।"
আরিশ আর তিতলি একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখ মারে। তেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলে,
"হ্যাভ এ নাইস ডে মাই ডিয়ার পাপা।"
তেহরাব ভ্রু কুঁচকায়। আরিশ তিতলি দৌড়ে চলে যায় বাড়ির ভেতরে। তেহরাব বুঝে উঠতে পারল না বাচ্চাদের এহেন কান্ডের কারন। আর বোঝে ওঠার আগেই পিঠে ধুম করে আঘাত পড়লো তেহরাবের। তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
"এই কোন শাল............
বলতে নিয়েও বলল না তেহরাব। রাগে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকা তনয়াকে দেখে কথা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গিয়েছে তেহরাবের। তেহরাব বোকা বোকা হেসে বলে,
" আরেহ জান তুমি কখন আসলা?"
তনয়ার রাগটা বেড়ে গেল আরো। নিচ থেকে ইটের টুকরো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারে তেহরাবের দিকে।
"এই বজ্জাতের বংশধর, নিজে তো বদের হাড্ডি সাথে আমার বাচ্চা দুটোকেও করছো।"
তেহরাব সড়ে দাঁড়ায় । সিগারেটটা ফেলে দিয়ে তনয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। তনয়ার গালে হাত রেখে বলে,
"আরে ঠান্ডা হ জান, এত গরম হওয়ার প্রয়োজন নেই। তুই এমনিতেই হ*ট। একে তো সূর্যের হ*টনেস তার উপর তোর, তেহরাব তো পুড়ে ছাঁই হয়ে যাচ্ছে।"
তনয়া অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তেহরাবের দিকে। মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,
"অসভ্য লোক। বাজে কথা বন্ধ করুন। আজ আপনাদের তিনজনের খবর আছে।"
তেহরাব আড়ালে ঠোঁট টিপে হাসে৷ তনয়াকে রাগাতে বেশ ভালোই লাগে তেহরাবের কাছে। আগের সেই ভীতু তনয়া এখন আর ভীতু নেই। তবে তেহরাবের কাছে তনয়া আজও সেই আগের মতোই, কাছে আসলেই কাঁপুনি ধরে সর্বাঙ্গে।
তেহরাব তনয়ার কাছে এসে তনয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে,
"তিনজনকে দেখতে হবে না, আমাকে দেখলেই চলবে জান। চল রুমে যাই।"
তনয়া কেঁপে উঠে। আবারো ধাক্কা দিতে চায় তবে পারে না।
"দেখুন...
" হ্যাঁ চল দেখব সাথে দেখাব।"
তনয়া বিরক্তি নিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়।
"ছ্যাহ, অসভ্য। "
তেহরাব হাসে,
"শুধু তোর জন্য।"
—————
ইউশাকে কোলে নিয়ে বসে আছে তনয়া। মেয়েটার জ্বর এসেছে প্রচুর, সন্ধ্যা থেকেই জ্বর। কিচ্ছু খাচ্ছে না। তেহরাবকে ওষুধ আনতে পাঠিয়েছে।
এমন সময় ঘরে আসে তাসলিমা, হাতে খাবারের প্লেট।
"খাবারটা খাইয়ে দে। মেয়েটার ওষুখ বিসুখ লেগেই থাকে।"
তনয়া কিছু না বলে মলিন মুখে খাবারের প্লেটটা হাতে নেয়। ইউশাকে ডেকে বলে,
"আম্মু একটু উঠো, একটু খাও সোনা। না খেলে তো আরো খারাপ লাগবে।"
ইউশা চোখ বন্ধ রেখেই দুদিকে মাথা নাড়ে। বিড়বিগ করে বলে,
"কাব না। দাদু যাব।"
তনয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটা দাদার ভক্ত। সারাদিন দাদা নাতনি একসাথেই। এমনটি তাসলিমা ও ইউসুফের সাথেই ইউশা থাকে রাতে। দাদু বলতে পাগল।
"মা আব্বা কোথায়?"
তাসলিমা থমথমে মুখ করে বলে,
"লোকটাকে কত করে বলেছি ইউশাকে আইসক্রিম বা বাইরের খাবার না খাওয়াতে। সে কি শোনে? এখন গিয়েছে তেহরাবের সাথে।"
কথার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করে ইউসুফ আর তেহরাব। ইউসুফ ইউশার কাছে আসে,
"দাদু ভালো লাগছে না?"
দাদুর গলা পেয়ে ইউশা চোখ খুলল। দাদুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। হাত বাড়াল তার দিকে।
"দাদু যাব।"
ইউসুফ কোলে তুলে নেয় ইউশাকে।
"আম্মু একটু খাও, খেয়ে ওষুধ খেলেই ভালো লাগবে।"
ইউশা তেহরাবের দিকে তাকায়।
"দাদু খাইয়ে দিবে।"
ইউসুফ হাসে,
"হ্যাঁ চলো খাইয়ে দিব। তনয়া আমি ওকে নিয়ে গেলাম।"
তনয়ার ইচ্ছে করছে না ইউশাকে যেতে দিতে। কিন্তু মেয়েটা তার সাথে কিছুতেই থাকবে না। মাথা নেড়ে বলে,
"ওষুধটা খাইয়ে দিও মা।"
তাসলিমা ওষুধ আর খাবার নিয়ে চলে যায়, পিছু পিছু ইউসুফ ইউশাকে নিয়ে প্রস্থান করে। ঘরে থেকে যায় তেহরাব আর তনয়া। তনয়া ধপ করে বসে পরে বিছানায়,
"মেয়েটার জন্য আর ভালো লাগে না। জন্মের পর থেকেই অসুস্থতা লেগেই থাকে।"
তেহরাব তনয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
"প্রিম্যাচিউর বেবি ছিল, তাই একটু আকটু অসুখ লেগেই থাকে। চিন্তা করিস না ঠিক হয়ে যাবে।"
তনয়া কিছু বলল না। চুপচাপ জড়িয়ে ধরল তেহরাবকে। তেহরাব তনয়ার চুলে চুমু খায়।
"তনয়া।"
"বলুন।"
"আমাদের গল্পের সমাপ্তি কোথায়?"
তনয়া চোখ বন্ধ করে নিল।
"মৃত্যুতে। মৃত্যু ব্যতিত এই গল্পের সমাপ্তি হবে না। "
তেহরাব হাসে।
"মরে গেলেই গল্প শেষ?"
"উহু।"
"তাহলে?"
তনয়া তেহরাবের দিকে তাকাল। তেহরাবের গালে হাত রেখে নিচু করল। চুমু খেল ঠোঁটে,
"কোথাও না কোথাও আবারো শরু হবে আমাদের গল্প। হয়তো ভিন্ন রূপে, ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন গল্পে।"
তেহরাব নিজেও চুমু খায় তনয়ার অধরে।
"আমাদের গল্পটা আবারো শোনাবো তাদের।"
"কাদের?"
তেহরাব বাম হাত দিয়ে লাইট অফ করে দেয়। আঁকড়ে ধরে তনয়ার কোমর।
"যারা বারবার শুনতে চায় আমাদের গল্প। যারা অনুভব করে আমাদের ভালোবাসার মিষ্টত্বতা।"
তনয়া জড়িয়ে ধরে তেহরাবকে।
"ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি! হাজাল লক্ষ কোটি বার ভালোবাসি।"
তেহরাব হেসে বলে,
"আমিও ভালোবাসি।"
আবারো হয়তো আসবে তারা। নতুন গল্পে, নতুন ভাবে, নতুন রূপে। তেহরাব তনয়া!