আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৫১ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

          ধূসর আঁধার কেটে গিয়ে ভোর হচ্ছে। ম্লান একটা আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। নাহিদের ছাদের ঘরের জানালার পাশে এখনও ছায়া ছায়া অন্ধকার। হঠাৎ দেখলে ঠাহর করা যায় না, ওই অন্ধকারে নীরব মূর্তির মতোন বসে আছে দীর্ঘদেহী এক ছায়াচিত্র ৷ হাতে ধূমায়িত শলাকা নিয়ে শীতল চোখে সে তাকিয়ে আছে আকাশে। জানালার পাশের টেবিলে অসংখ্য এলোমেলো কাগজ। তার মধ্যে দুই-একটি পতপত করে উড়ছে ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায়। ঘরের একমাত্র সিঙ্গেল বিছানায় চার হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছে সৌধ। আজ সারারাত কাজ করেছে ওরা। আদিব হোসেনের সাথে মিটিং, নতুন পরিকল্পনা, ফিচার লেখা, নিজেদের ম্যাগাজিন কোম্পানির একটা মানসম্মত পোর্টফোলিও, এপ্রোচ তালিকা… কত কাজ। কাজ ওরা অনেকই করছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সেদিন এক ডাক্তারের সাথে আলাপ হলো। ভদ্রলোক কনভেন্স হলেন না। না হলেও সমস্যা নেই। নাহিদ নিজেকে জানে। কাজ না হওয়া পর্যন্ত কাজের পিছু সে ছাড়বে না। তার আগে জীবন তাকে ভালো রকম নাচাবে। নাহিদ নাচবে। নাচতে তার কোনো সমস্যা নেই। নাহিদের এই তেইশ বছরের জীবনে নাচানাচি ছাড়া আর আছেই বা কী ? সৃষ্টিকর্তা খুব আমুদের সাথে তাকে একটা নরক সমতুল্য পরিবারে জন্ম গ্রহণ করিয়েছেন। সেই নরকের প্রধান হর্তাকর্তা নাহিদের বাবা। নিজের ছেলেকে কত রকমভাবে অত্যাচার করা যায় তার সব চমৎকার উপায় তিনি জানেন। ছেলেবেলা থেকে বহুবার বাবার এই অসীম ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছে নাহিদ। নাহিদের প্রতিটি ভোর কেটেছে বাবা-মায়ের হাতাপায়ী আর অশ্লীল গালিগালাজ দেখে। দু'জন ভালোবেসে বিয়ে করা মানুষ একজন আরেকজনকে বিশ্রীভাবে আঘাত করছে। বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করছে। কেউ তাদের আটকাতে আসছে না। বনেদী পরিবারের সন্তান নাহিদের বাবা। গ্রামে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ভালো। নাহিদের সকল চাচাদের ভালো চাকরি। কেবল নাহিদের বাবা বেকার। তার কিছু করবার চেষ্টা নেই। কিন্তু নবাবী হালে চলবার অভ্যাস আছে। নাহিদদের সংসার চলে মায়ের চাকরি আর মামাদের পয়সায়। মামারা যখন যা পাঠায় তাতেই প্রয়োজন মেটে। বাবা মায়ের ঝামেলা হয় সেই পয়সা নিয়ে। চাচা, ফুপুদের অন্যায্য ব্যবহারে মায়ের প্রতিবাদ ডেকে আনে নাক-মুখ ফাটানোর ঘটনা। বাবা তার ভাই-বোনের অপমান সহ্য করতে পারেন না ; তবে স্ত্রীর অপমান তার পুরুষ গায়ে সহনীয়। ছেলেবেলায় নাহিদ বুঝতে পারতো না, কেন তাকে বাবা একেবারেই পছন্দ করেন না? একটু পাজি, দস্যি ছেলে সে নিশ্চয়ই। তাই বলে নিজের ছেলেকে একজন বাবা একেবারেই পছন্দ করবে না তাই কী হয়? নাহিদ তো মেয়েও নয়, ছেলে। তার বাপের বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী। তারপরও এতো ঘৃণা কেন? বড় হওয়ার পর এই উত্তর পেয়েছে নাহিদ। বুঝেছে, তাকে নিয়ে বাবার মনে একটা গোপন সন্দেহ আছে। সন্দেহটা ভারি কুরুচিপূর্ণ। সেই সন্দেহের দুই পাশে দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে নাহিদের বিরোধটা হয়েছে পাকাপোক্ত। 

সবসময় হাসি-মজা করে বেড়ানো ফাজিল নাহিদের ভেতরে যে খুব গোপনে একটা মানসিক ঝড় বয়ে যায় রোজ– সেই ছেলেবেলাতেই সে কথা কী করে যেন টের পেয়েছিলেন নানাজান। তিনি নাহিদকে সেই ঝড় থেকে রক্ষা করার জন্যই সম্ভবত টেনে আনলেন নিজের কাছে। কিন্তু ঝড়ের মধ্যেই যার সৃষ্টি তাকে কী করে শান্ত করা যায়? যদি যায় তবে নাহিদ কেন পারলো না? প্রচন্ড জেদে সেই ঝড় এক সময় টর্নেডো হলো। নাহিদ নিজেকে আটকাল না। সবাই জানলো নাহিদ নষ্ট, নাহিদ ভন্ড, নাহিদ বখাটে, নাহিদের মধ্যে কোনো সিরিয়াসনেস নেই। মামারা নাহিদকে পছন্দ করেন না। নাহিদকে দেখলে তাদের মুখ গম্ভীর হয়। এলাকায় নাহিদের সুনাম নেই, দুর্নাম প্রতুল। জীবনের দেওয়া কত কত অপমান নাহিদ হাসতে হাসতে গিলে ফেলেছে। অপমান গিলে খেয়ে নাহিদ আরও খারাপ হয়েছে। আরও নিকৃষ্ট হয়েছে। কোনো আঘাত, কোনো ব্যর্থতা নাহিদকে থামিয়ে দিতে পারেনি। নাহিদ জানে, এসব ছোটোখাটো অসফলতাও তাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। সে নতুন আরেকটা সিগারেট ধরালো। ইতোমধ্যে চারদিকে আলো ফুটেছে। ছাদের পশ্চিম দিকের কার্ণিশে খুব আয়েশ করে বসে আছে একটি কাক। নাহিদ সিগারেটটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করল। তারপর জানালার পর্দাটা টেনে দিয়ে চলে গেল বিছানায়। নাহিদের ঘরে একটা মাত্র চৌকি। এই চৌকিতে দু'জন শোবার উপায় নেই। শুলেও গায়ে গা চাপিয়ে শুতে হয়। গায়ে গা লাগলে নাহিদের ঘুম হয় না। এ বিষয়ে আবার সৌধর পিএইচডি ডিগ্রি। পাশে শুলেই সে অসীম আগ্রহে জড়িয়ে ধরতে চায়। আজও তাই ঘটলো। নাহিদ পাশে গিয়ে শোয়ার কিছুক্ষণ পরই গায়ের উপর পা তুলে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল সৌধ। নাহিদ ওকে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,

‘ ঘুমের মধ্যে নিজেকে লায়লা আর আমাকে মজনু মনে করিস নাকি? সর তো।’

সৌধ তখন গভীর ঘুমে। নাহিদের ভর্ৎসনা তার কানে গেল না। ঘুমের ঘোরে একটু সরে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো নাহিদের কাছে। নাহিদের তখন কেবল চোখ লেগে এসেছে। সৌধর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এবার একটা কঠিন চড় বসিয়ে দিল তার গালে। চড় খেয়ে ঘুম হালকা হলো সৌধর৷ বোকা বোকা চোখে তাকাতেই নাহিদ ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,

‘ তুই আবার আমাকে চেপে ধরলে আমি তোকে ঠেসে ধরে চুমু খাব।’

কথাটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল সৌধর। বুঝে উঠতেই স্প্রিংয়ের মতো উঠে বসে সন্দেহের চোখে তাকাল। নাহিদ আরেকটু আরাম করে শুয়ে নির্বিকার গলায় বলল,

‘ যদিও আমি স্ট্রেইট। তারপরও…’

বাক্যটুকু বাতাসে ভাসিয়ে রেখে সৌধর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল নাহিদ। সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে ছিটকে নেমে গেল সৌধ। বিছানার একমাত্র কাঁথাটা ছিনিয়ে নিয়ে নাহিদকে শক্ত একটা লাথি উপহার দিয়ে মেঝেতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। বিরক্ত গলায় বলল,

‘ নজর ঠিক কর শালা। আল্লার লানত পড়ব তোর উপর।’

নাহিদ চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। সৌধর কথায় মৃদু হাসল। বিস্মিত হয়ে বলল,
‘ তুই চাস সেটা কিছু না? আমি দিতে চাইলেই দোষ?’

প্রত্যুত্তরে কঠিন চোখে তাকাল সৌধ। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তার মেজাজ যথেষ্ট খারাপ। সেই মেজাজকে আরও একটু উত্তপ্ত করার চেষ্টা করল নাহিদ। বলল,

‘ ওমন করে তাকাচ্ছিস কেন? তোর যে আমার প্রতি একটা দুর্বলতা আছে সেটা তো আমি জানিই। জগতের সবাই জানে তুই আমার বউ।’

সৌধ প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। নাহিদকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। নাহিদ তাকে চুপ থাকতে দেখে তার দিকে ফিরে অকৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বলল,

‘ এই সৌধ? বাবুনের মা কোনোভাবে তুই নোস তো? ছেলেটা আমার সবসময় বলে তার মাকে আমি ভালোবাসি না। তাই তো বলি, এই পৃথিবীতে এমন কোনো মেয়ে কী করে থাকতে পারে যাকে আমি ভালোবাসি না? পৃথিবীর কোনো মেয়ে আমার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে এমনটা অসম্ভব। তবে তোকে ভালোবাসা কঠিন।’

বলে মুখ গম্ভীর করে সৌধর দিকে তাকাল নাহিদ। গম্ভীর গলায় বলল,
 ‘ কী করে কী হলো বল তো সৌধ! এই ছিল তোর মনে?’

সৌধ এবার অতিষ্ঠ চোখে তাকাল। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ক্ষণকাল নীরবে তাকিয়ে থেকে ছুটে গিয়ে কাঁথা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল নাহিদের গলা। সৌধর শরীরে তখন অসুরের শক্তি। গলায় ভয়ংকর চাপে চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠলেও হাসতে লাগল নাহিদ। তার হাসিতে হাতের চাপ আরও বাড়াল সৌধ। নাহিদকে এই জঘন্য পৃথিবী থেকে মুক্তি দেওয়াই তার অভিলাষ। কিন্তু তার সেই ইচ্ছে পূরণ সম্ভব হলো না। এমন চমৎকার মুহূর্তে সদ্য জন্মানো শিশুর মতো তারস্বরে চিৎকার করে উঠল নাহিদের মুঠোফোন। এই ভোরের মুখে ফোনের ঘণ্টি বাজায় দুই বন্ধুই কিছুটা বিস্মিত হলো। সৌধ নাহিদকে ছেড়ে দিয়ে ফোনের দিকে উঁকি দিয়ে শুধাল,

‘ কে রে?’

নাহিদের মুখ তখন গম্ভীর। দুই ভ্রুর ভাঁজে অপরিসীম বিস্ময়। সে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত গলায় বলল,
‘ মামা। সেজো মামা।’

সৌধ সেজো মামাকে চিনলো না। অবাক হয়ে বলল,
‘ সেজো মামা! এই মালটা আবার কে?’

নাহিদ চট করে উঠে বসে বলল,
‘ মৌনির বাপ।’

সৌধ চোখ বড় বড় করে বলল,
‘ তোর যে মামা বিগ্রেডিয়ার, সে?’

নাহিদ উত্তর দিলো না৷ এমনিতে কাউকে পরোয়া না করলেও সেজো মামাকে তারা সকলেই একটু সমীহ করে চলে। সারাজীবন আর্মির স্ট্রিক্ট জীবন কাটানোর কারণেই কিনা কে জানে তিনি ভয়ংকর গম্ভীর। নাহিদকে তিনি দু'চোখে দেখতে পারেন না। কালেভদ্রে দেখা হলেই বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলেন। চোয়াল শক্ত করে বলেন,

‘ তোর চুলের এই অবস্থা কেন? এমন বখাটেদের মতো চেহারা কী জন্য? বাড়িতে আরও কতগুলো ছেলেমেয়ে, তাদের চেহারা ছবি তো এরকম নয়!’

তারপর কঠিন মুখে তিনি নাহিদকে চুল কাটাবার পয়সা দিবেন। নাহিদ ইতোপূর্বে বহুবার চুল কাটাবার টাকা নিয়েছে। সেই টাকায় চুল না কাটিয়ে অতি অবশ্যই অন্য কোনো অকাজ করেছে। নাহিদ চোখে-মুখে বিভ্রান্তি নিয়ে কল রিসিভ করল। সালাম দিতেই সেজো মামা ওপাশ থেকে মেঘস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন,

‘ নাহিদ বলছিস?’

‘ জি, মামা।’

‘ কেমন আছিস?’

নাহিদ চোখে-মুখে প্রবল বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘ ভালো আছি মামা।’

তারপর নিস্তব্ধ রাতের মতো চুপ করে রইল নাহিদ। সেজো মামা মানুষটা অন্যরকম। বাড়িতে তিনি পারতপক্ষে কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলেন না। নাহিদের দৃঢ় বিশ্বাস নিজের মেয়েকে ছাড়া বাড়ির আর কোনো ছেলেমেয়েকেই তিনি ঠিক করে চেনেন না। সেই ধরাছোঁয়ার বাইরের সেজো মামা হঠাৎ তাকে কেন ফোন করেছেন ভেবে পেলো না নাহিদ। কিছু জিজ্ঞাসাও করলো না। মামা এক সময় নিজেই মুখ খুললেন। বললেন,

‘ মৌনি বলল, তোর নাকি আমার সঙ্গে কোনো দরকার আছে? আমি যেন অতি অবশ্যই তোর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার হাতে সময় নেই। তোকে তিন মিনিট সময় দেওয়া হলো। এর মধ্যে ঘটনা পরিষ্কার করতে পারবি?’

নাহিদ অবাক হলো। মৌনির সঙ্গে সেদিন কথা না হলেও কী ভেবে দরকারের কথাটা বলে রেখেছিল নাহিদ। বেখেয়ালি মৌনি যে শেষ পর্যন্ত ম্যাসেজটা দেখে মামাকে বিষয়টা জানাবে ভাবতে পারেনি সে। নাহিদ শান্ত গলায় বলল,
‘ পারব।’

‘ তাহলে বল। তিন মিনিটের মধ্যে শেষ করবি। তিন মিনিট পর আমি রাস্তা হাঁটতে বেরুবো।’
 
—————

চমৎকার বৃষ্টি হচ্ছে। বসন্তকালে বর্ষাকালের মতো নিরবিচ্ছিন্ন বর্ষণ। ঋতি মৌনিকে এই নিয়ে কত নম্বর বার কল করলো তার হিসেব ঋতির জানা নেই। তার হাত-পা মৃদু লয়ে কাঁপছে। নাক ঘামছে। কোনো কিছু নিয়ে অস্থির হলে ঋতির নাক ঘামে। মৌনি কল ধরে ঋতির নাক ঘামা আটকাতে পারবে না। সে চেষ্টাও সে করবে না। উল্টো ভয়ংকর এক ধমক দিয়ে ঋতির মন খারাপ করিয়ে দিবে। তারপরও কোনো বিষয় নিয়ে অস্থির হলেই ঋতি মৌনিকে ফোন করে। মৌনির ধমক খেয়ে মন খারাপ হলেও অস্থিরতা তরতর করে কমতে থাকে। ঋতির মনে হলো সে এই পর্যন্ত মৌনিকে এক লক্ষবার কল করে ফেলেছে। এতোবার কল করলে দেশের প্রাইম মিনিস্টারেরও হৃদয় কোমল হয়ে যাবে। ঋতির জন্য মায়ায় টলমল করে উঠবে বুক। অথচ মৌনির হৃদয় পাথর। ঋতির চোখদুটো সজল হয়ে এলো। তার সজল চোখে প্লাবন ঘটে যাওয়ার এক ফাঁকে মৌনি কল রিসিভ করল। রিসিভ করেই ভয়ংকর বিরক্ত হয়ে বলল,

‘ এই তোর সমস্যাটা কী? হোয়াট ইজ ইউর প্রবলেম।’

ঋতি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
‘ তোমাকে আমি এক লক্ষবার কল করেছি মৌপু। তুমি কখনোই কল ধরো না।’

মৌনি ধমক দিয়ে বলল,
‘ ধরি না, বেশ করি। তুই আমাকে কল করবি কেন? ফোন কি আমি তোর পয়সা দিয়ে কিনেছি?’

ঋতি কোনোরকমে চোখের পানি আটকে বলল,
‘ আমি জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি মৌপু। আর তুমি আমায় বকছো?’

‘ জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকলেই কল করতে হবে? এমন আলটিমেট সময়ে তোর একমাত্র কাজ হলো দোয়া-দুরুদ পড়া। আমাকে কল করার পেছনে তোর মোটিভ কী? ক্ষমা চাইতে ফোন করেছিস? ক্ষমা তো তোকে আমি করব না। তোর জন্য এই মাত্র আমার বাস ছুটে গিয়েছে। তোর এই অপরাধ আমি হাশরের ময়দান পর্যন্ত মনে রাখব।’

ঋতি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বলল,
‘ ওই লোকটার সঙ্গে আজ আবার আমার দেখা হয়ে গিয়েছে, মৌপু।’

‘ লোক!’ ভ্রু কুঁচকে গেল মৌনির। তার কথার রেলগাড়ীতে বাধা পড়ায় খানিক বিরক্ত হয়ে বলল,
‘কোন লোক?’

‘ ওইযে, কয়েক মাস আগে ট্রেনে যার সঙ্গে দেখা হলো, সে-ই।’

মৌনি সন্দিহান গলায় বলল,
‘ কোথায় দেখা হলো?’

‘ রেলস্টেশনে।’

‘ কথা বলেছিস?’

ঋতি আঁতকে উঠে বলল,
‘ পাগল!’

মৌনি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ ভদ্রলোক এখন কোথায়? নাটক-সিনেমার মতো আবার তোদের পাশাপাশি সিট পড়েছে?’

‘ আরে না। আমি তো টিউশনি করাতে শহরে এসেছিলাম। এখন শাটলের জন্য অপেক্ষা করছি। ক্যাম্পাসে ফিরব। আর সে পাশের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অন্য কোনো ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে।’

বলে একবার আড়চোখে পাশের প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল ঋতি। কালো শার্ট গায়ে উদাস চোখে বৃষ্টি দেখছে সেই ভদ্রলোক। হাতে ওয়ানটাইম চায়ের কাপ। বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে গিয়েছে বুকের কাছটা। তারপরও কী চমৎকার দেখাচ্ছে! ঋতি আরেকবার সেদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
‘ কালো শার্টে কী যে চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে মৌপু!’

ঋতির হৃদয়ের ডাকেই কিনা কে জানে মৌনি কিছু বলবার আগেই উদাস মুখটা ফিরিয়ে ঋতির দিকে তাকাল সেই ভদ্রলোক। সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ল। ঋতি চমকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
‘ ওরে আল্লাহ! মৌপু! ভদ্রলোক আমাকে দেখে ফেলেছেন, মৌপু।’

মৌনি বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ তুই কী মিস্টার ইন্ডিয়া? কোনো বিশেষ উপায়ে অদৃশ্য হয়ে আছিস? বিশ বছরের দামড়া একটা মেয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থেকে হা করে তার রূপ যৌবন গিলছিস আর সে দেখবে না? সে কী ছাগল?’

ঋতি উত্তর না দিয়ে আরেকবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে ভদ্রলোকটিও তাকাল ঠিক তক্ষুনি। ফের একবার চোখে চোখ পড়ল দু'জনার। ঋতি বুকের ভেতর উথাল-পাথাল অনুভূতি নিয়ে বলল,

‘ মৌপু! মৌপু আবার তাকিয়েছে। কী সুন্দর করে তাকায় সে! আমার মনে হয়, হাত-পা অবশ হয়ে আসছে মৌপু। আমি হয়তো এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাব। তুমি আমাকে নিয়ে যাও।’

মৌনি ধমক দিতে চেয়েও হেসে ফেলল। প্রেম চমৎকার একটা ব্যাপার। নিজেকে ভেঙেচুরে কারো প্রেমে পড়ার খুব শখ ছিলো মৌনির। নিজের প্রতি অতি প্রেমের কারণেই সম্ভবত সে শখ কোনোদিন পূরণ হয়নি তার। কিন্তু ঋতি সেই চমৎকার অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ভেবেই বড় ভালো লাগল। ফিসফিস করে বলল,

‘ কংগ্রাচুলেশনস ঋতি।’

ঋতি মৌনির অভিবাদন শুনলো না। ততক্ষণে ট্রেন চলে এসেছে। ভদ্রলোক চায়ের কাপটা ডাস্টবিনে ফেলে দ্রুত পায়ে ট্রেনে উঠে গেল। ঋতি কলের পুতুলের মতো স্থির চোখে তাকিয়ে রইল সেই ট্রেনটির দিকে। এতো ভিড়ের মধ্যে ভদ্রলোককে আর দেখা যাচ্ছে না। তারপরও ওই ট্রেনটি থেকে চোখ ফেরাতে পারল না ঋতি। এক সময় ট্রেন গন্তব্যের পথে রওনা করলো। ঋতি অস্থির চোখে এদিক-ওদিক তাকাতেই বঘির শেষদিকে তার চোখ আটকে গেল। ওইতো জানালার পাশে দুটো অসম্ভব সুন্দর চোখ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কেমন নির্বিকার তার চাহনি। ওই চোখে কী কোনো ভাষা আছে? ঋতির মন কী সে বুঝেছে? তাদের কী আবার দেখা হবে? ঋতির ভাবনার মাঝেই ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গেল। স্টেশন নয়, ঋতির মনে হলো তার মনটাই বুঝি শূন্য হয়ে গেল। সে খুব মন খারাপ করা গলায় বলল,

‘ আমাদের কী আর কোনোদিন দেখা হবে না, মৌপু?’

মৌনি এতোক্ষণ নীরব থাকলেও এবার কলকল করে উঠল। নির্বিকার গলায় বলল,
‘ হবে না কেন? হওয়ালেই হবে।’

ঋতি মুখ কালো করে বলল,
‘ কীভাবে হওয়াব? আমি তার নাম জানি না, কোথায় থাকে, কী করে কিচ্ছু জানি না। এভাবে কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?’

মৌনি নিরুত্তাপ গলায় বলল,
‘ তার নাম জানিস না তাতে কী? আজ কী বার সেটা তো জানিস? প্রতি সপ্তাহে এই বারের এই সময়ে স্টেশনে এসে বসে থাকবি। বার হিসেবে না পেলে প্রতি মাসের আজকের তারিখে এসে বসে থাকবি। তাতেও কাজ না হলে প্রতি বছরের এই দিনে এসে অপেক্ষা করবি। প্রেম করবি আর পরিশ্রম করবি না, তা তো হয় না৷ মনে রাখবি, প্রেমে যত পরিশ্রম, প্রেম তত খাঁটি।’

ঋতি মৌনির ঠাট্টায় সঙ্গ দিলো না। কয়েক সেকেন্ড মৌন থেকে ফিসফিস করে বলল,
‘ পৃথিবীতে এতো সুন্দর মানুষও হয়, মৌপু? কেন হয়? পুরুষ মানুষের কি এতো সুন্দর হওয়া ঠিক?’

মৌনি হাসল। ঋতির কপালে একটা উষ্ণ আদর দেওয়ার লোভ সংবরণ করে বলল,
‘ সে যদি ঋতির হয় তাহলে ঠিক৷ নয়তো একদম না। অতি সুদর্শন হওয়ার অপরাধে তার নামে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব। এই জলদি কল কাট তো। দীপ্র ভাইকে কল করে দেখি এই ব্যাপারে কোনো ধারা টারা আছে নাকি।’

ঋতি হেসে ফেলল। বলল,
‘ তুমি এতো ভালো কেন মৌপু?’  

—————

রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর। রাস্তার ধারের কনকচাঁপা গাছে অসংখ্য ফুল ফুটেছে। সাফাত গাড়ি থেকে নেমেই ফুলের গন্ধ পেল। এই পথে এর আগেও বহুবার চলাচল করেছে সে কিন্তু এই আশ্চর্য ফুলের সন্ধান আগে কখনও পায়নি। সাফাত ঘাড় ফিরিয়ে একবার গাছটির দিকে তাকাল।  

আজ শনিবার। সাফাতের কোনো শ্যুটিং শিডিউল নেই। কাজের চাপ না থাকলে সাধারণত বাড়িতে বসে বই পড়ে সময় কাটায় সে। কঠিন ব্যস্ত জীবনের ছোটখাটো অবসরগুলো তার একা একা কাটাতে ভালো লাগে। এই সকল দিনে কখনও বাড়ির বাইরে বেরোয় না সাফাত। আজ কী মনে করে বেরিয়ে এসেছে। সাফাত লম্বা লম্বা পা ফেলে উঠে এলো দু'তলায়। মিথির অফিস রুমের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দোলনচাঁপার মতো স্নিগ্ধ মুখখানা তুলে তাকাল মিথি। একেবারে সাধারণ একটা শাড়ি আর এলো খোঁপায় মগ্ন হয়ে কাজ করছিল সে। এই অসময়ে সাফাতকে দেখে বিস্ময় লুকিয়ে হাসল। সঙ্গে সঙ্গেই সাফাতের মনের কোণে বেজে উঠল একটা নাম,

‘ দোলনচাঁপা।’

মিথি বলল,
‘ আরে, সাফাত ভাই যে! কেমন আছেন? হঠাৎ এদিকে?’

 একটা চেয়ার টেনে বসল সাফাত। মিথির টেলিফিল্মের কাজটা শেষ হয়েছে অনেকদিন হলো। প্রমোশনাল কাজও কমে আসায় মিথির সাথে অনেকদিন দেখা হয় না তার। এছাড়াও সাফাতের নতুন সিনেমার অপরিসীম ব্যস্ততা। সে বলল,

‘ এদিকেই একটা কাজে যাচ্ছিলাম। ভাবলাম, জাতির ক্রাশের সঙ্গে একবার দেখা করে যাই।’

মিথি অল্প হাসল। হৃদয় এক ফাঁকে সিঙ্গারা আর চা দিয়ে যেতেই বলল,
‘ সিঙ্গারা চলবে তো সাফাত ভাই? আমরা দরিদ্র মানুষ। আমাদের বাজেট কম।’

কয়েকদিন যাবৎ নিজের ফিটনেসের দিকে মনোযোগ দিয়েছে সাফাত। সে সিঙ্গারা এড়িয়ে গিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলো। বলল,
‘ শুধু চা। আজকাল খুব নিয়ম মেনে চলছি। নিয়মের বাইরে এক চুমুক পানিও না।’

মিথি ফের হাসল। সকালে তার নাস্তা করা হয়নি। সিঙ্গারার প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলল,
‘ আপনার সিনেমার কাজ কেমন চলছে ভাইয়া?’

সাফাত মাথা নাড়ল,
‘ বেশ ভালো।’

তারপর একটু থেমে বলল,
‘ আগামী সপ্তাহে তো টেলিফিল্মটা রিলিজ হচ্ছে, তাই না? তোমার টেলিফিল্মটা খুব হিট করবে দেখো। এমনিতেও করতো। এখন তো আরও বেশি করবে। তুমি এখন টক অফ দ্য টাউন।’

সাফাতের সম্মোধনটা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে। কবে থেকে এই রদবদল হলো সে তথ্য খুব সম্ভবত সাফাতেরও অজানা। মিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সোশ্যাল মিডিয়ায় আজকাল তার কিছু ছবি, ভিডিও খুব ট্রেন্ডিংয়ে চলছে। সেদিনের সেই প্রিমিয়ার শো সম্প্রচার হওয়ার পর কোনো এক আশ্চর্য কারণে সোশ্যাল মিডিয়ার তরুণ সমাজে মিথিকে নিয়ে খুব হৈচৈ পড়ে গেল। চিত্রনায়িকার চাইতে যে মিথি কত সুন্দর– সে কথা প্রচার করায় এদের মেহনতের শেষ নেই। ফেসবুক, ইউটিউবে চোখ গেলেই মিথিকে নিয়ে রিলস্। ভারি বিরক্ত লাগে মিথির। মানুষ কত অকারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো নষ্ট করে ভেবে আশ্চর্য হয়। মিথি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

‘ আমি টক অফ দ্য টাউন না হয়ে আমার কাজ টক অফ দ্য টাউন হলে বেশি সুবিধা হতো সাফাত ভাই।’

সাফাত হেসে বলল, 
‘ সেটাও হবে। তোমার মতো তোমার কাজও চমৎকার মিথি।’

সাফাতের কণ্ঠে একটা অন্যরকম মুগ্ধতার রেশ পেয়ে একটু অপ্রস্তুত বোধ করল মিথি। প্রসঙ্গ এড়াতে সিঙ্গারার প্লেটটা সাফাতের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,

‘ একটা সিঙ্গারা খেয়ে টেস্ট করতে পারেন কিন্তু সাফাত ভাই। কলিজার সিঙ্গারা। চমৎকার খেতে। আমাদের ভাই-বোনদের আড্ডায় এই সিঙ্গারা অপরিহার্য।’

কাজের বাইরে একটিও কথা না বলা মিথিকে হঠাৎ নিজের সম্পর্কে কথা বলতে দেখে খুশি হলো সাফাত। ডায়েটের তোয়াক্কা না করে হাত বাড়িয়ে একটা সিঙ্গারা নিলো। আগ্রহ নিয়ে বলল,

‘ তোমাদের ভাই-বোন সংখ্যা বিশাল নাকি? সকলেই সমবয়সী?’

মিথি হেসে বলল, 
‘ বিশাল তো বটেই। আমাদের ভাই-বোনের সংখ্যাটা একটু কমপ্লিকেটেড। আমরা নিজেরাও ঠিক করে জানি না আমরা আসলে কতজন। ভাই-বোনদের হিসেব রাখার জন্য আমাদের বাড়িতে একজন এসিস্ট্যান্ট রাখা আছে।’

সাফাত আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘ বলছ কী! ভাই-বোনের হিসেব রাখার জন্য এসিস্ট্যান্ট! ইন্টারেস্টিং তো!’

মিথি হাসল। সাফাতের চমকে যাওয়া মুখ দেখে বহু বহুদিন পর নিজেকেই অবাক করে দিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল সে। সাফাত মিথিকে কোনোদিন প্রাণখুলে হাসতে দেখেনি। আজ এই অবিশ্বাস্য অথচ মধুর দৃশ্যটি দেখে ভারি আশ্চর্য হলো। মুগ্ধ হলো। বলল,

‘ এমন আশ্চর্য বাড়ির কথা আমি কোনোদিন শুনিনি মিথি। তুমি একদিন আমাকে এই আশ্চর্য বাড়িটি দেখতে যাওয়ার নিমন্ত্রণ দাও তো।’

মিথি হাসিমুখে সাফাতের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সে উপলব্ধি করল, বাড়ির কথা বলতে তার আরাম লাগে। তার চেয়েও আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল, সেই আরাম আরাম বাড়ির কথা সাব্বির ছাড়া আর কাউকেই কোনোদিন বলেনি মিথি। কারো সঙ্গেই গল্প ফাঁদেনি। অথচ আজ কত সহজেই বলে ফেলল। কে জানে, ওসব কথা সে সাফাতকেই কেন বলল? সাফাত কি তার গল্প বলার মানুষ?  
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp