আজ ওদের মন ভালো নেই - পর্ব ৫০ - নৌশিন আহমেদ রোদেলা - ধারাবাহিক গল্প

          কোমল সকাল ঢলে গিয়ে আকাশে ঝকঝকে রোদ উঠেছে। রোদ মৌনির পছন্দ না। রোদ দেখলেই তার শরীর চিড়বিড় করে। অসহ্য এক জ্বালাবোধ হয়। মৌনি গর্তজীবী প্রাণী। ঘরের বাইরে বেরুনোও তার খুব একটা পছন্দ নয়। সে ঘর থেকে বেরুতে পছন্দ করে কেবল শীত আর বর্ষায়। এখন ফাল্গুন মাস। বসন্তকাল চলছে। এই সময়ে কেউ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসে না। কিন্তু মৌনি এসেছে। পৃথিবীর যাবতীয় উলোটপালোট কর্মকান্ড করা মৌনির মৌনিত্বের প্রথম ধাপ। এই সকল কাজ যে মৌনি ইচ্ছে করে করে এমন নয়। কোনো এক আশ্চর্য উপায়ে সব কিছু আপনা আপনিই ঘটে যায়। ভরা বসন্তে পঞ্চগড় চলে আসাও তার মধ্যে একটি। মৌনি কখনোই ক্যালেন্ডার দেখে না। কবে কোন বার, কোন মাসে কোথায় যাওয়া ফলপ্রসূ হবে তার কোনো হিসেবই তার জানা নেই। মৌনির জানার মধ্যে আছে কেবল একটি ক্যালেন্ডার, তার নাম আমরা ধরে নিলাম ‘মৌনির মন বিষয়ক পঞ্জিকা’। 

মৌনির মন বিষয়ক পঞ্জিকা-র গর্বিত প্রণেতা মহীয়সী মৌনি ঢাকার বাইরে বেড়াতে এসে প্রথমেই আবিষ্কার করলো– বাংলাদেশে মেয়ে মানুষের একলা চলাফেরা এখনও মোটামুটি বিস্ময়কর ঘটনা। মাথায় চুড়ো খোঁপা, ঢোলা প্যান্ট আর ফতুয়া পরে বেড়ানো মৌনিকে রাস্তাঘাটের কেউই তেমন একটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না। যেখানে যাচ্ছে মানুষ বিস্মিত হচ্ছে। অতি বিস্ময়ে বারবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকাচ্ছে। অবস্থা দেখে মৌনি প্রথম প্রথম খুবই অস্বস্তিতে পড়ে গেল। হোটেলে ফিরে গিয়ে জিন্স, ফতুয়া বদলে সালোয়ার কামিজ পরল। কিন্তু তাতে উৎসুক মানুষের উৎসাহ কিছুমাত্র দমন হলো বলে মনে হলো না। একা একটা মেয়ে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবি তুলছে। টং দোকানে বসে চা খাচ্ছে। সবই যেন এই আদিম পৃথিবীতে এই প্রথম। মৌনি বিরক্ত হয়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়াল। এক কাপ চায়ের ফরমায়েশ দিয়ে চারপাশের অস্বস্তিকর উৎসাহ ভুলে থাকতে ফোনের পর্দায় ডুব দিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন কিছু চলছে না। ঘরের বাইরে বেরুলে এই আধুনিক যন্ত্রটির কোনো কিছুই তার পছন্দ হয় না৷ এক গাদা ম্যাসেজ, ই-মেইল, নোটিফিকেশন ছাড়া এখানে দেখার মতো কিছু নেই। মৌনি সবকিছু এড়িয়ে নিজের একটা ছবি তুলল। মিষ্টিকে ছবিটা পাঠিয়ে জানতে চাইল,

‘ পঞ্চগড়ের হাওয়া লেগে আমি এক রাতে বিশ্ব সুন্দরী হয়ে গেলাম কি-না দেখ তো?’

মিষ্টি অনলাইনে ছিল। লিখল, 
‘ কেন? কেউ প্রেমে পড়েছে নাকি?’

‘ একটা চায়ের দোকানে বসে আছি। কমপক্ষে পাঁচ-সাত জোড়া চোখ আমাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে।’

মিষ্টি হাসল। জানতে চাইল,
‘ কোথায় তুই? আমি আসি। তারপর দুজন মিলে প্রেমনেত্র অবলোকন করি।’

যেন গলির মোড়ে এলেই তাকে পাওয়া যাবে এমন এক ভাব নিয়ে মৌনি উত্তর দিল, 
‘ পঞ্চগড়। পঞ্চগড় জিরো পয়েন্টে চলে আয়। আমি আছি।’

‘ পঞ্চগড়!’
মিষ্টি অবাক,
‘ ঢাকায় পঞ্চগড় জিরো পয়েন্ট কোথায় পেলি? নাম শুনিনি তো কখনও।’

মৌনি উত্তর দেওয়ার আগ্রহ পেল না। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই চোখে পড়ল একটি ম্যাসেজ। আননোন নাম্বার, প্রোফাইলে নাহিদের ফটো। নাহিদ লিখেছে, 
‘ এই মৌনি।’

মৌনির ভ্রু কুঁচকে গেল। ভাই-বোনদের পুণঃমিলন ছাড়া নাহিদের সঙ্গে তার কথাবার্তা তেমন হয় না। দু'জনের কারোই প্রয়োজন পড়ে না। মৌনি নাহিদের নাম্বারটা সেইভ করে উত্তর দিল, 
‘ বল।’

নাহিদ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল, 
‘ একটা কাজ করে দিবি মনমন?’

মৌনি সোজাসাপটা উত্তর দিল,
‘ না।’

নাহিদ লিখল, 
‘ তুই দিবি। তোর বাপসহ দিবে।’

মৌনি সঙ্গে সঙ্গেই দুটো ফোন নাম্বার পাঠাল। নাহিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ এগুলো কী?’

‘ আমার বাপের নাম্বার। আমার বাপকে দিয়ে করা।’

নাহিদ প্রত্যুত্তরে কিছু লিখল না। সম্ভবত উত্তর দেবার ভাষা খুঁজে পেল না। মৌনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখতে নিয়েই একটা ঝটকা খেল। নিজের ফলোয়ারর্স লিস্ট নিয়ে কোনো কালেই বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না মৌনির। কিন্তু আজ ছুটে গিয়ে বারংবার চেইক করে দেখল, নোটিফিকেশনটা সত্য। একাউন্টটাও সত্য। মৌনি দ্রুত হাতে নোটিফিকেশনের স্ক্রিনশট নিয়ে মিষ্টিকে পাঠাল। উত্তেজনা ধরে রাখতে না পেরে বলল,
‘ দোস্ত! দেখ? এইটা সেই প্রফেসর না?’

প্রশ্নটা অকারণ। উত্তরটা মৌনির জানা। সেইদিন ওভাবে ধরা খেয়েই ভদ্রলোকের পার্সোনাল একাউন্ট খুঁজে বের করেছিল মৌনি। খুঁজে বের করে মৌনির হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। ভদ্রলোকের সেন্স অব হিউমার চমৎকার। মৌনির প্রেম-ভালোবাসায় আগ্রহ নেই। বিয়ে সম্ভবত সে করবে না। তারপরও এমন চমৎকার একটা লোক অন্যকারো প্রেমিক হবে ভাবতেও মন খারাপ হয়ে যায়। সেই মন খারাপ করা লোকটি চুপিচুপি মৌনিকে ফলো করছে ভেবেই বেশ মজা পেয়ে গেল মৌনি। ভদ্রলোক চাইলেই মৌনিকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠাতে পারতো। কিন্তু পাঠায়নি। বুঝা যাচ্ছে, ভদ্রলোকের অহংজ্ঞান বেশ ধারালো। বন্ধু হওয়ার পত্র পাঠিয়ে অপেক্ষমাণদের দলে ভীড় জমানো তার পছন্দ নয়। তিনি সম্ভবত নিভৃতে মৌনিকে স্টক করার ধান্দায় ছিলেন। মৌনির ধান্দাটাও মোটামুটি সেরকমই। মৌনি নিজের মনে হেসে ফেলল। আশ্চর্য হলো এই ভেবে, দুজন মানুষ একই সময় দুজনের উপর একইভাবে নজর রাখছে। হয়তো একই রকম চিন্তা করছে। অথচ দু’জনের কেউই ব্যাপারটা ধরতে পারছে না। একজন আরেকজনের মনোভাব ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না। আশ্চর্য! এই বিস্ময়কর পৃথিবীতে সব চাইতে বিস্ময়কর সম্ভবত মানব জাতির মনস্তত্ত্ব। তারা কখন হাসে, কখন কাঁদে, কখন আনন্দ পায় তা মাঝেমধ্যে নিজেদের কাছেই বোধগম্য হয় না। এইযে এই সাধারণ একটা কারণে মৌনির মন ফুরফুরে হয়ে গেল। চারপাশের অস্বস্তি ভুলে দেহ-মনে অন্যরকম একটা জোশ ফিরে পেল তার কারণও কী মৌনির কাছে বোধগম্য হলো? মৌনি ফুরফুরে মনে চায়ের দাম মেটালো। চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে আসার আগে দোকানদারকে বলল,

‘ মামা? আপনার একটা ছবি তুলি? চায়ের কাপে চা ঢালছেন এমন একটা ছবি। এখানে ছবি ভালো আসবে। ছবির ফ্রেমটা চমৎকার।’

চা দোকানী ফ্রেমের আলাপ বুঝলেন না। এক গাল হেসে বললেন,
‘ আমি কালা মানুষ মামা। আমার কী ছবি তুলবেন?’

মৌনি হেসে বলল,
‘ কালোই জীবনের আলো মামা। দাঁড়ান একটা ছবি তুলি।’

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে মৌনির হঠাৎ নিজেকে পৃথিবীর সব চাইতে সুখী বলে মনে হলো। পথচারীদের অহেতুক কৌতূহলী দৃষ্টি হঠাৎ সে উপভোগ করতে লাগল। আশ্চর্য এক আত্মবিশ্বাস এসে ভর করলো নাকের ডগায়। রোদটাকেও খুব একটা খারাপ লাগছে না আর। নিজেকে উন্মুক্ত পাখির মতো লাগছে। পৃথিবী এক আজব রহস্যপিণ্ড। এই রহস্যে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা একটা গল্প আছে। সেই গল্পে নিজের অজান্তেই কে কাকে কতটা দিয়ে গেল, সে কথা কী কেউ জানতে পারে? কিছুক্ষণ আগেও অস্বস্তিতে জড়োসড়ো হয়ে থাকা মৌনি হাঁটতে হাঁটতেই গুনগুন করে গান ধরলো, 
‘ আমার মতোন সুখী কে আছে? 
আয় সখী আয় আমার কাছে 
সুখী হৃদয়ের সুখের গান 
শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ…’ 

—————

পুরান ঢাকা। জনসন রোডের কাছে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল নাহিদ। সৌধর হাতে ওয়ানটাইম চায়ের কাপ। সৌধ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বেজার করে বলল,

‘ ভাই, এমন করে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক লেভেল তো দূর দেশের থার্ড গ্রেড ম্যাগাজিনও দাঁড় করাতে পারব না আমরা। শালার, ফাও জীবন পানি করতেছি। মাস গেলে মাল-কড়ি পাওয়ারও সম্ভাবনা নাই। আদিব হোসেনের কথা শুনে কাজটা মাইনেতে করলেই ভালো হতো। এখন দেখ, দুই দিকেই মারা খেলাম।’

সৌধর হতাশ বাক্যচ্ছটার বিপরীতে কোনো উত্তর দিলো না নাহিদ। নির্লিপ্ত মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। ম্যাগাজিনটা দাঁড় করানোর জন্য পাঁচ মাস ধরে হাড় পানি করে ছুটছে ওরা। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। ম্যাগাজিন দাঁড় করানোর প্রাথমিক উত্তেজনায় ভাটা পড়তেই নাহিদ বুঝতে পারছে কাজটা যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজ নয়। তাদের কাছে যে জনবল আছে তারা এখনও সেই ওল্ড-স্কুল জার্নালিজমের মধ্যেই আটকে আছে। তাদের মধ্যে নতুন কিছু করার কোনো স্পৃহা নেই। গলির মোড়ে উড়ে বেড়ানো গালগপ্পকে কনটেন্ট বানিয়ে ছেপে দেওয়া তাদের ধর্ম। অথচ আদিব হোসেন এদের নিয়েছে একটা নতুনধারার ক্রিয়েটিভ ম্যাগাজিনের কাজে! বিশ্বাস হয় না নাহিদের। নাহিদ আর সৌধ নিজেদের কাজে যতটা শ্রম দেয় তার সিকিভাগও দেখা যায় না বাকিদের মধ্যে। সবার মধ্যে একটা গা-ছাড়া ভাব। নাহিদ বুঝে, এরা এভাবেই কাজ করে অভ্যস্ত। নাহিদ আদিব হোসেনকে যে পরিকল্পনা দিয়েছিল তাতে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল টিম। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট, ক্রিমিনোলজি কনসালট্যান্ট, বাংলা ইংরেজি দুই ভাষার অনুবাদক, সম্পাদক, ডিজাইনার আর একজন মার্কেটিং এক্সপার্ট। প্রথমে এই ছোট দল নিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে তারা দল ভারী করবে। প্রতিটি টিম মেম্বারকে নিয়ে আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্ট তৈরি করবে। দলের সকলেই থাকবে উদ্যমী। জোরেসোরে কাজ চলবে। কিন্তু দেখা গেল বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। আদিব হোসেন প্রতিটি পদেই মূর্তমান গাধাদের বসিয়ে রেখেছেন। এদের কারোরই এই ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ক্রিমিনোলজি কনসালট্যান্ট পদে বসে যে রোজ মুখ ভর্তি করে পান খায়। সে ইসলামি ইতিহাস নিয়ে স্নাতক করেছে। ছাত্র জীবনে আর কোনো সম্মানজনক চাকরি না পেয়ে ঢুকে গিয়েছে সাংবাদিকতায়। বিগত বিশ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় আছে এটাই তার ডিগ্রি। বিরক্তি ধরে যায় নাহিদের। মাথার ভেতর অজস্র দুশ্চিন্তা নিয়ে সৌধকে সঙ্গে করে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের দিকে হাঁটতে থাকে। এখানে এক ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে ওরা। ভদ্রলোক বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ক্রাইম সাইকোলজি নিয়ে বেশ ভালো লেখালেখি করেন। নাহিদের এই লোককে পছন্দ হয়নি। তার আরও ভালো কিছু চায়। ইউরোপ-আমেরিকার ক্রিমিনোলজি স্টুডেন্টদের প্রতিই তার সবচাইতে বেশি নজর। কিন্তু এই লোককে রাজি করানোই তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা এই ব্যাপারেই তারা সন্দিহান। নিজেদের কাজের একটা পার্ফেক্ট গ্রাফ, একটা পার্ফেক্ট পরিকল্পনা তাদের দরকার। সব এলোমেলো হয়ে গ্যাঞ্জাম লেগে গিয়েছে বলে কোনো কাজই ঠিক করে কাজে লাগছে না। যত এগুচ্ছে তত যেন ধ্বসে পড়ছে। সৌধ মেডিকেল কলেজের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই ফের একবার বিষোদ্গার করে বলল,

‘ তোর ওই বোনকে তোরা এতো প্রশ্রয় কেন দিস আমি বুঝি না। বেশি পাত্তা দিস বলেই ভাব বেশি। বালের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না।’

নাহিদ বুঝল, সৌধ মৌনির কথা বলছে। সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করিয়ে ‘ধর প্যারেক, মার হাতুড়ি’ টাইপ উত্তর দেওয়ায় সৌধ মৌনির উপর ভয়ংকর ক্ষেপে আছে। নাহিদ নির্লিপ্ত গলায় বলল,

‘ তুই ওকে পাত্তা দিস না। ও তোকে পাত্তা দিতে বলেছে?’

সৌধ উত্তপ্ত কণ্ঠে বলল,
‘ আমি এসব বালছালকে পাত্তা দেইও না। তোদের কথা বলছিলাম। তোরা দেস ক্যান?’

নাহিদ হো হো করে হেসে বলল,
‘ তুই ওকে পাত্তা দেস না? এখন যদি মৌনি তোকে ম্যাসেজ দেয় কুত্তার মতো দৌঁড়ে গিয়ে উত্তর দিবি না?’

সৌধর মুখটা একটু গম্ভীর হলো। একটু ভেবে বলল,
‘ তা দিব। তবে সেটাকে পাত্তা দেওয়া বলে না। কৌতূহল বলে। এমন অহংকারী মেয়ে আমাকে কেন মনে করলো জানতে হবে না?’

নাহিদ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে শলাকাটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে বলল,
‘ ঘটনা সেটাই। সবাই ওই কৌতূহলেই দৌঁড়ে মৌনির কাছে যায়। কেউ না গেলেও মৌনির কিচ্ছু যায় আসে না বলেই যায়।’

সৌধ সময় নিয়ে কী একটা ভাবল। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
‘ তবে ভালোই লাগে কিন্তু বল?’

নাহিদ ঝট করে আরেকটা সিগারেট ধরাল। মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞাসা করল,
‘ প্রেমে পড়ছো নাকি বন্ধু?’

সৌধ নাহিদের সিগারেটে ভাগ বসিয়ে বলল,
‘ আরে নাহ! কিন্তু একেবারে আগুন। এই মেয়ের অহংকার থাকুক, ভালোই লাগে। খারাপ না।’

প্রত্যুত্তরে ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি অব্যহত রাখল নাহিদ। বলল,
‘ পটানোর চেষ্টা করে দেখতে পারিস। হাতে কোনো কাজকাম নাই। আয় কারো প্রেমে পড়ি। দু'জনেই একজনের প্রেমে পড়লে কেমন হয়? একজন হারলাম, আরেকজন জিতলাম। একটু ব্যথা ট্যথা পেলাম।’

সৌধ বলল,
‘ পড়া যেতো। কিন্তু পকেটের যা অবস্থা! দেবদাসের মতো মদ তো দূর, দুইদিন পর সিগারেট কেনার পয়সাও থাকবে না৷ এমন গরীবি হালতে ছ্যাকা খেয়ে মজা আছে?’

নাহিদ উত্তর দিলো না। দুই বন্ধু নীরবে কিছু দূর যেতেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল নাহিদ। সৌধর দিকে সিগারেটটা বাড়িয়ে দিয়ে রাস্তার ওপাশে লক্ষ্য করে বলল,
‘ ওই নীল জমা পরা মেয়েটাকে দেখ। চেনা চেনা লাগছে না?’

সৌধ দেখল। মিষ্টি আদলের মেয়েটিকে কিছুটা পরিচিত লাগছে বটে! কিন্তু কোথায় দেখেছে ঠিক মনে করতে পারছে না। নাহিদ অবশ্য মনে করার অপেক্ষাও করলো না। রাস্তা পেরিয়ে সরাসরি মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে ভীষণ সুন্দর করে জানতে চাইল,

‘ কেমন আছেন?’

মেয়েটি চমকে নাহিদের মুখের দিকে তাকাল। নাহিদ মেয়েটিকে চিনতে না পারলেও মেয়েটি যে নাহিদকে চিনেছে তা তার মুখভঙ্গিতে ঠিক বুঝে ফেলল নাহিদ। মেয়েটি এক সময় বলল,

‘ ওহ, আপনি! এখানে কী কাজে আসা হলো?’

নাহিদ মিটিমিটি হেসে বলল,
‘ আপনিই তো আমার সব চাইতে বড় কাজ।’

মেয়েটি নাহিদের ওই হাসি অগ্রাহ্য করতে পারল না। রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলে বলল,
‘ ফাজলামো নয়। সত্য করে বলুন৷ কোনো প্যাশেন্ট আছে এখানে? নাকি ভাইয়ের মতো আপনিও ডাক্তার?’

শেষ কথায় বিস্ময় ঝরে পড়ল মেয়েটির কণ্ঠে। নাহিদ ঠোঁটে হাসি রেখে দ্রুত চিন্তা করতে লাগল। ভাইয়ের মতো ডাক্তার মানে, কোন ভাই? ইশতিয়াক? কিন্তু মুখে বলল,

‘ আপনি আমার কোনো কথাই সিরিয়াসলি নেন না কেন বলুন তো? সত্যিই আপনার জন্যই এসেছি। পুরান ঢাকায় একটা কাজ ছিল। মেডিকেল কলেজটা চোখে পড়তেই আপনার কথা মনে পড়ে গেল। শুনেছিলাম, আপনি এখানে পড়েন। যদিও দেখা হয়ে যাবে এতোটা ভাবিনি।’

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল,
‘ আমি যে এখানে ভর্তি হয়েছি আপনি কী করে জানেন? আপনার ভাই বলেছে? তিনি আমাকে নিয়ে আলোচনাও করেন?’

নাহিদের তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে গেল, মেয়েটি প্রভা। ইশতিয়াকের সঙ্গে তার একটা মানসিক যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে। নাহিদ বলল,

‘ ভাই বলেনি। আমিই জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আপনি আমার প্রেমে না পড়ে ইশতিয়াক ভাইয়ের প্রেমে পড়েছেন বলে আপনার খোঁজ নেব না, এমন নিষ্ঠুর আমাকে ভাবলেন কী করে?’

নাহিদের দুষ্টুমিতে হেসে ফেলল প্রভা। বলল,
‘ আপনি কী সবসময় সবার সাথে এমন দুষ্টুমি করেন?’

নাহিদ বলল,
‘ সবার সঙ্গে করি কিনা বলতে পারছি না। তবে আপনি প্রথম। আপনি চাইলে আরো কয়েকজনের সাথে করব। আপনার রূপবতী কোনো বান্ধবী নেই?’

প্রভা নাহিদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‘ আমি চাইলে? আমি না চাইলে কারো সঙ্গে দুষ্টুমি করবেন না?’

‘ না, করব না। আমি রূপবতীদের কথা ফেলতে পারি না।’

প্রভা হেসে ফেলল। নাহিদ মন খারাপ করে বলল,
‘ ইশতিয়াক ভাইকে কেন আপনার এতো পছন্দ বলুন তো? আমাকে কেন নয়? আমি কি খুব খারাপ?’

 প্রভা বলল,
‘ আপনি কী আমাকে পটানোর চেষ্টা করছেন নাকি?’

নাহিদ সোজাসাপটা উত্তর দিলো, 
‘ অবশ্যই পটানোর চেষ্টা করছি। সদ্য প্রেমিকা হারিয়ে মোটামুটি হা-ভাতে টাইপ অবস্থা আমার। প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ সাতজন মেয়েকে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছি। এদের প্রায় সকলেরই প্রেমিক আছে। এটা এক ধরনের প্রতিশোধ। আমি আমার প্রেমিকা পাইনি তাই সকল প্রেমিকের বুক থেকে তাদের প্রেমিকা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু প্রস্তাব দেওয়ার সিস্টেমে সম্ভবত কোনো ঝামেলা আছে। কেউ রাজি হচ্ছে না।’

নাহিদের কথার ভঙ্গিতে খিলখিল করে হেসে উঠল প্রভা। নাহিদ জিজ্ঞেস করল, 
‘ আচ্ছা, এখানে ডাক্তার আশুতোষ শিকদারকে চিনেন? উনার সঙ্গে পরিচয় আছে আপনার?’

প্রভা একটু ভেবে বলল,
‘ হ্যাঁ, প্রতি সপ্তাহে উনার একটা লেকচার পাই আমরা। কেন বলুন তো?’

‘ উনার সঙ্গে আমার একটা দরকার ছিল।’

প্রভা চোখ বড় বড় করে বলল,
‘ ইশ! দেখেছেন? ঠিকই একটা কাজ সঙ্গে করে এনেছেন। অথচ বলছিলেন আমার জন্য এসেছেন।’

নাহিদ হাসল। প্রভার সুন্দর চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
‘ কেন, আপনি বুঝি চাইছিলেন আমি শুধু আপনার জন্য আসি?’

নাহিদের ওমন গভীর গলায় একটু অপ্রতিভ হলো প্রভা। একটু লজ্জা পেলেও প্রকাশ না করে বলল,
‘ ছি! তা কেন চাইবো?’

নাহিদ হাসল,
‘ইশ! চাননি তাহলে? কিন্তু পরের বার চাবেন প্লিজ।’

তারপর নিজের কার্ড এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘আপনি যতবার আমাকে দেখতে চাইবেন ততবার আমি হাজির হয়ে যাব।’

প্রভা কার্ডটা নিয়ে তেরছা গলায় বলল,
‘ আপনাকে কেন দেখতে চাইব আমি?’

নাহিদ মন খারাপ করে বলল,
‘ একটু দেখতে চাইলে কী হয়?’

প্রভা প্রত্যুত্তরে চোখ রাঙাতে গিয়েও নাহিদের ওমন মিষ্টি মুখখানা দেখে হেসে ফেলল। বলল,
‘ আপনি তো খুব ফাজিল ছেলে। চলুন, আশুতোষ স্যার পর্যন্ত পৌঁছে দেই আপনাকে।’

নাহিদ পিছনে ফিরে সৌধকে এদিকে আসার ইশারা করে প্রভাকে খুব মিষ্টি করে বলল,
‘ সো নাইস অব ইউ৷’ 

—————

বসন্তের সোনা ঝরা বিকেল। কংক্রিটের শহরটাকে ছায়া করে রেখেছে এক টুকরো মেঘ। মিথি দাঁড়িয়ে আছে তার সাবলেট বাসার জানালার কাছে। প্রশস্ত জানালার প্রায় পুরোটাই রুদ্ধ হয়ে আছে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া ফুলে। মিথি এই বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলার একটা ঘর নিয়ে থাকে। তার জানালার আধহাত ওপাশেই বিশাল এক বহুতল ভবন। তারমধ্যেই, এই সংকীর্ণ জায়গায় কী করে এমন প্রকান্ড এক কৃষ্ণচূড়া গাছ ডালপালা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসেছে– সে কথা জানে না মিথি। সব চাইতে বিস্ময়কর ঘটনা, এখানে যে এমন প্রকান্ড এক কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে তার হদিসই মিথি পেয়েছে আজ বিকেল বেলা। সাব্বিরের কলাবাগানের বাসা ছেড়ে দিয়ে প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল এই বাসায় এসে উঠেছে মিথি। কাজ পাগল মিথির এই পাঁচ মাসে একবারও এই জানালা খোলার প্রয়োজন হয়নি৷ খুব ভোরে কাজে বেরিয়ে মাঝরাত্তিরে ফেরা, সময় নিয়ে একটু গোসল আর সর্বসাকুল্যে তিন ঘন্টা ঘুম – এই করেই চলছে দিন। একটু সময় করে বসবে। ঘরটা মন ভরে দেখবে। দেওয়ালের একপাশে একটা বুকসেল্ফ গুছিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলবে, সেই সময়টুকু মিথির নেই। শুটিংয়ের জন্য শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটাছুটি। শুটিং শিডিউল না থাকলে প্রোডাকশনের কাজ, বাজেট হিসেব, পোস্টার ডিজাইন, টেলিফিল্মের টিজার রিলিজ, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন কত দিকে নজর তার! একটা প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল মিথি। চড়কির মতো ঘুরতে থাকা ব্যস্ত জীবনে এক মুহূর্তের বিরতি টেনে বহুদিন পর সত্যিকারের নারীদের মতো হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে নিলো দুটো কৃষ্ণচূড়া ফুল। আনমনে সেগুলো গুঁজল কানের পাশে। সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার পর্দার মতোন তার মনে পড়ে গেল একটা আটপৌরে বারান্দা। ভীষণ বর্ষা। একটি মাধবীলতা ফুল আর… আর দুটো মুগ্ধ চোখ। গত পাঁচ মাস কী অপরিসীম ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে মিথির। ক্যারিয়ারের প্রথম মৌলিক কাজে নিজের মেধা, মননের সমস্তটা উগড়ে দিয়েছে সে। কোনো ব্যথা, কোনো স্মৃতি, কোনো বাধাই তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তারপরও কি থেমে যায়নি মিথি? থেমেছে। শুটিং স্পটে ক্যামেরার এপাশে বসে কত কতবার মিথি প্রবল অপেক্ষা নিয়ে চারপাশে নজর বুলিয়েছে। মনে হয়েছে, যদি! যদি সাব্বির কোনোদিন চলে আসে? ওই ভিড় থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে অপ্রস্তুত গলায় যদি বলে বসে,

‘ আপনার টেলিফিল্মের শুটিং দেখতে এলাম। আপনি কেমন আছেন মিথি?’

মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে সাব্বির কোনোদিন আসবে না। সাব্বির কোনোদিন আসবে না– সে নিয়ে মিথির আফসোস হয় না। স্বামী, সংসার নিয়ে কবেই বা অতো স্বপ্ন ছিল মিথির? এই একটা জীবন কাজে কাজেই কেটে যাবে তার। তারপরও মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছে করে, ওই দিঘি চোখের ছেলেটি কী কখনও তাকে মনে করে? ওই চোখে ওমন গভীর সরলতা নিয়ে মিথি ছাড়া আর কাকে সে ওমন মুগ্ধ হয়ে দেখে? মিথি তার চব্বিশ বছরের জীবনে কোনোদিন কাউকে ঈর্ষা করেনি৷ কিন্তু পঁচিশ বছরের মহীয়সী হয়ে তার এই গোটা পৃথিবীর প্রতি ঈর্ষা হলো। সাব্বির তার ওই দিঘি চোখে যাকে যাকে দেখেছে তাদের সকলের প্রতি ঈর্ষায় জ্বলে উঠল বুক। অসহ্য ঠেকলো ওই আকাশ। নিশ্চুপ অবসরের দিনগুলোতে ওই আকাশকেই তো সাব্বির সবচাইতে মুগ্ধ হয়ে দেখে! 

কিছুক্ষণ জানালার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ফুলদুটো খুলে জানালার বাইরে ফেলে দিল মিথি। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ফের ফিরে এলো তার কর্মব্যস্তময় জীবনে। টেলিফিল্মের শুটিং শেষ হওয়ার পর থেকে প্রচার প্রচারণা নিয়ে খুব খাটতে হচ্ছে তাকে। মিডিয়া কভারেজের জন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হচ্ছে। প্রমোশনাল কন্টেন্টের দিকে নজর রাখতে হচ্ছে। তার এই সামান্য টেলিফিল্মের প্রচারণায় তারকারা খুব আগ্রহ নিয়ে অংশ নিবে এমন কোনো আশা রাখেনি মিথি। কিন্তু তাকে বিস্মিত করে দিয়ে সাফাত সাগ্রহে এই প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। তার ওমন কঠিন শিডিউলের মধ্যেও ইন্টারভিউ দিচ্ছে। রিদিমাকে ম্যানেজ করে প্রিমিয়ার শো গুলোতে যাচ্ছে। আজও একটা শো আছে সাফাতের। শো কতৃপক্ষ কী ভেবে সাফাত আর রিদিমার সাথে পরিচালক হিসেবে মিথিকেও নিমন্ত্রণ জানিয়ে বসেছে। ক্যামেরার এপাশের মিথির, ক্যামেরার ওপাশে দাঁড়ানোর কোনো আগ্রহ নেই। সারা জীবন কাজ আর স্বপ্নের পেছনে ছুটে ছুটে কাজের বাইরে সমস্ত কিছুর প্রতিই তার তৈরি হয়েছে অপরিসীম বিরক্তি। কিন্তু কিছু করার নেই। টেলিফিল্মটা ফলপ্রসূ করতে তাকে ছুটতে হবে সকল অনাগ্রহকে পিছু ফেলে। জানালা থেকে সরে এসে সন্ধ্যার প্রিমিয়ার শো-এর জন্য তৈরি হতে বসল মিথি। সবসময় ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে কাজের পেছনে ছুটা মিথির কাছে তৈরি হওয়া মানে কেবলই, একটা শাড়ি। কানে ছোট্ট রূপোর ঝুমকো। হাতে সবসময়ের পরা ঘড়ি আর এলো খোঁপায় বাঁধা চুল। চোখে একটু কাজল আঁকতে গিয়ে মিথির খেয়াল হলো, তার ঘরে কোনো আয়না নেই। এই পাঁচ মাসে তার একবারও আয়নার প্রয়োজন পড়েনি। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে একবার সময় দেখে ব্যাগ হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মিথি। দরজায় তালা দিতেই পাশের ঘরের দরজা খুলে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে এলো একটি মেয়ে। মেয়েটির নাম দীপ্তি । সম্ভবত ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। মিথি যখন এই ঘর ভাড়া নিতে আসে তখন দুই একটা কথা হয়েছিল তার সাথে। দীপ্তি মিথিকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। জিজ্ঞাসা করল,

‘ কোনো প্রোগ্রামে যাচ্ছেন আপু?’

 আশেপাশের মানুষের সাথে অযথা হৃদ্যতা তৈরি করা মিথির স্বভাবে নেই বলে না চাইতেও গম্ভীর স্বরে বলল,
‘ হ্যাঁ।’

দীপ্তি মুখের হাসি ধরে রেখে বলল,
‘ শাড়িতে আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে৷ এই সাজের সাথে ছোট্ট একটা কালো টিপ পরলে আরও অপূর্ব লাগবে। আমার কাছে টিপ আছে, দিব?’

মিথির চোখ-মুখ কঠিন হয়ে গেল। কারো কাছ থেকে বিনে পয়সায় কিছু নেওয়ার অভ্যাস তার নেই। কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়ার অর্থই হলো ঋণি হয়ে যাওয়া। কারো কাছে ঋণি হওয়া, কাউকে ঋণি করা কোনোটাই মিথির পছন্দ নয় ৷ মিথিকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি নিজেই এগিয়ে এসে নিজের কপালের টিপটা খুলে লাগিয়ে দিলো মিথির কপালে। এই অনাধিকার চর্চায় কিছুটা বিরক্ত হলেও মেয়েটা যখন ব্যাগ থেকে একটা আয়না বের করে তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

‘ টিপে আপনাকে কত সুন্দর লাগছে জানেন?’ 

তখন কিছুটা নরম হলো মিথি। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে আয়নায় নিজের মনোরম মুখটির দিকে তাকিয়েই তার মনে পড়ে গেল সেই দিঘি দিঘি চোখ দুটোর কথা। কোনো এক আষাঢ় সন্ধ্যায় রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ওই দিঘি চোখের মালিক খুব বিস্ময় নিয়ে শুধিয়েছিল, ‘ আপনি জানেন আপনি কত সুন্দর, মিথি?’ সেদিন কোনো উত্তর দিতে পারেনি মিথি। আজও কোনো উত্তর দিতে পারল না। নীরবে আয়না ফিরিয়ে দিলো। ওই দিঘি চোখের ছেলেটি জানল না, যে মেয়েটির চোখে তাকালে তার অভিশপ্ত জীবন আরও ভারী ঠেকে। যে মেয়েটিকে সে ত্যাগ করেছে তার জীবনের বিনিময়ে। সেই মেয়েটির আয়নায় এখনও তার চোখ ভাসে। এখনও সে কাজল পরলে আয়নার ওপাশ থেকে কেউ গাঢ় স্বরে বলে, ‘আপনি জানেন আপনি কত সুন্দর, মিথি?’ 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp