ললিতা দুই হাতে শব্দরের কব্জি আঁকড়ে ধরেন মরিয়া হয়ে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভেতরের প্রাণবায়ু যেন একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফুসফুসে আগুন জ্বলছে অক্সিজেনের অভাবে। শব্দরের হাত তার কণ্ঠনালী এমন হিংস্রভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে, মৃত্যুকে তিনি একেবারে দোরগোড়ায় অনুভব করছেন। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে, কানে বাজছে মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি।
হঠাৎ শব্দর এক প্রবল ধাক্কায় তাকে দূরে ছিটকে ফেলে দেয়। ললিতা টলমল পায়ে পেছিয়ে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ান। সারা শরীর কাঁপছে, পা দুটো মাটিতে স্থির থাকতে চাইছে না। তীব্র কাশির দমকে তার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে খসখসে আওয়াজ। কাঁপা হাত দিয়ে নিজের গলা ছুঁয়ে দেখেন, অনুভব করেন ফুলে ওঠা চামড়া, প্রাণভরে শ্বাস নেন।
শব্দর তার দিকে ঝুঁকে হিংস্র পশুর মতো ধারালো কণ্ঠে বলে, ‘আর একবার এ ধরনের ভুল করলে, জীবন্ত মাটিতে পুঁতে দেব তোমায়। ভাইজানের দোহাই দিয়ে, তার মমতার দোহাই দিয়ে আর রক্ষা পাবে না। আর সহ্য করব না। এবার শেষবার বলছি।’
শব্দর ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হয়, ললিতা কাতর কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘তুমি কখনো সুখী হবে না, শব্দর। কখনো না। যে মানুষ নিজের রক্ত, নিজের ঔরসজাত ছেলেকে ভুলে গিয়ে অন্য নারী নিয়ে আমোদ….’
কথা শেষ হওয়ার আগেই শব্দর বিদ্যুৎগতিতে ফিরে আসে, ঝুঁকে পড়ে ললিতার মুখের একেবারে কাছে, এতো কাছে যে তার রাগে ফোঁস ফোঁস করা নিঃশ্বাস ললিতার মুখে এসে লাগে। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘শকুনের অভিশাপে গোরু মরে না। তুমি যতই অভিশাপ দাও, যতই বিষ ছড়াও, আমার কিছু যায় আসবে না। আর, আমার কোনো ছেলে নেই।’
‘তুমি যতই মুখে অস্বীকার করো, তোমার বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পাষণ্ড হৃদয়টা কিন্তু জানে আসল সত্য কোনটা।’
শব্দরের চোয়াল শক্ত হয়ে যায় পাথরের মতো।
গলার শিরা ফুলে ওঠে উত্তেজনায়। গর্জন করে বলে, ‘কোনটাকে সত্য বলছ তুমি, হা? জাওয়াদ আমার ছেলে না, কখনো ছিল না, কখনো হবে না। ও শুধুই আমার ভাতিজা, আমার বড় ভাইয়ের ছেলে, আর কিছু না।’
ললিতা দ্বিগুণ জোর দিয়ে বলে, ‘ও তোমার, তোমার রক্ত।’
'ভুল থেকে জন্ম নেয়া সবকিছুই ভুল, চিরকালের জন্য ভুল। আমি মানি না। কখনো মানব না, জীবনেও না, মরণেও না।'
'না মানলেও জাওয়াদ তোমার। তোমার আর আমার ছেলে। আমাদের দুজনের রক্তমাংসের তৈরি।’
কথাটা শোনামাত্র শব্দরের কান ঝাঁঝাঁ করে ওঠে। তারস্বরে বলে, ‘তোমার ছেলে, শুধুই তোমার। আমার নয়, কখনোই আমার নয়।’
ললিতা এগিয়ে আসেন, হাত বাড়ান শব্দরের গালে স্পর্শ করতে। এই গাল কত টেনেছেন তিনি। শব্দর দ্রুত দূরে সরে যায়। ললিতা থমকে দাঁড়ান, হাত ঝুলে পড়ে। ভাঙা গলায় বলেন, ‘প্রেম ভোলা এতো সহজ শব্দর? যদি সত্যিই এতো সহজ হতো, তবে কেন আমি ভুলতে পারি না?’
‘আমরা কখনো প্রেম করিনি। আমরা শুধুই বন্ধু ছিলাম, বন্ধু ছাড়া আর কিছু ছিলাম না। তুমি আমার ভাবি ছিলে, এখনও আছো, চিরকাল ভাবিই থাকবে। সম্পর্কের মর্যাদা নষ্ট করেছো তুমি, পবিত্র সম্পর্কে কালিমা লাগিয়েছো। আমার বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে, আমার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের মনোবাসনা পূরণ করেছ। এখন জাওয়াদকে আমার ছেলে বলে দাবি করো? সাহস বইকি তোমার! ও তোমার ছেলে, শুধুই তোমার। ও তোমার পাপের ফসল, তোমার লালসার ফসল।’
ললিতার মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়, চোখে জ্বলে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। রাগ হজম করে সাপের মতো হিসহিসিয়ে বলে, ‘আমি ভালো নেই, তোমাকেও ভালো থাকতে দেব না। তোমার কচি বউ জুলফাকেও সুখী হতে দেব না। যেভাবে তোমার জন্য আমি জাহান্নাম ভোগ করেছি, রোজ রোজ পুড়েছি আগুনে, সেভাবে তোমাকেও ভোগ করাব। এই জীবনে তুমি কোনো সুখ পাবে না, এক ফোঁটাও না। আমার অভিশাপ তোমাকে, আমার সমস্ত অভিশাপ তোমার মাথায়। জীবনে আমার করা কোনো পূণ্য যদি থাকে, তার বিনিময়ে আমি তোমার দুঃখ চাই, তোমার কষ্ট চাই।’
‘আমার সঙ্গে যা ইচ্ছে করো, যা খুশি তাই করো। কিন্তু খবরদার..খবরদার। জুলফার গায়ে যেন ফুলের টোকাও না পড়ে, চুলের একটা গোড়াও যেন নড়ে না ওঠে। ও নিষ্পাপ, ও নির্দোষ। ও আমার ভুলের সঙ্গে জড়িত না, আমার নোংরা অতীতের সঙ্গে জড়িত না। ওকে এই কাদায়, এই নোংরা জলাভূমিতে টেনে নামিয়ো না। নইলে আমি তোমাকে এমন শাস্তি দেব, এমন কঠিন শাস্তি দেব যে মরেও মুক্তি পাবে না।’
ললিতার চোখ অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। বলেন, ‘এত ভালোবাসো তাকে? এত উন্মাদনা একটা মেয়ের জন্য? তোমার চেয়ে কতটা ছোট জুলফা! বয়সে প্রায় অর্ধেক, তাই না? কচি শরীরে খুব টান, তাই না, খুব নরম? এখন না হয় বুড়ো হয়ে গেছি, কিন্তু একসময় তো ওর মতোই তরতাজা ছিলাম, যৌবনবতী ছিলাম, পূর্ণ যৌবনে টইটম্বুর ছিলাম। তবুও… ’
শব্দর প্রচণ্ড জোরে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে, ‘তোমার নোংরা মুখটা বন্ধ করো এক্ষুনি। তুমি যেদিকে তাকাও, যেদিকে চোখ রাখো সেদিকটাই ছাই হয়ে যায়, পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। জুলফা পবিত্র, ও একেবারে নিষ্কলুষ। ও আমার জীবনে আলো নিয়ে এসেছে। তোমার মতো অন্ধকার নয়। তুমি আমার জীবনে বিষ ঢেলেছিলে, আর ও প্রতিষেধক, ও আমার মুক্তি। তুমি ওর মতো কখনো হতে পারবে না, কখনো পারবে না। তোমার মতো কলুষিত মন, কলঙ্কিত আত্মা কখনো বুঝতে পারবে না বিশুদ্ধ ভালোবাসা কী জিনিস, প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে। তুমি শুধু জানো কীভাবে কাউকে জাহান্নামে টেনে নামাতে হয়, কীভাবে জীবন নরক বানাতে হয়।’
ললিতা উপহাসের হাসি হাসেন, ‘বিশুদ্ধ ভালোবাসা? মুখে বিশুদ্ধ ভালোবাসার বুলি আউড়াচ্ছো? তুমি তোমার নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করেছো, পাপ করেছো, আর এখন মুখে বিশুদ্ধ ভালোবাসার কথা বলছো?’
ললিতা ভ্রু উঁচিয়ে, বিদ্রূপের সুরে আরও বলে, ‘জুলফাকেও তুমি একদিন ফেলে যাবে, শব্দর। আমার মতোই ফেলে যাবে। তুমি কাউকে ভালোবাসতে পারো না, কখনো পারোনি, কখনো পারবে না। তুমি শুধু নিজেকে ভালোবাসো।’
‘থাকব নাকি ফেলে যাব সেটা আমার ব্যাপার, আমার সিদ্ধান্ত। তুমি শুধু মাথায় রেখো, জুলফার গায়ে যদি ফুলের টোকাও পড়ে, যদি একটা আঁচড়ও লাগে, যদি ওর চোখে এক ফোঁটা অশ্রুও দেখি, তোমার গোষ্ঠীসুদ্ধ, তোমার পরিবারসুদ্ধ, তোমার বংশসুদ্ধ তোমার অন্যায়ের শাস্তি ভোগ করবে। আমার ধৈর্যের একটা সীমা আছে। আর সেই সীমা প্রায় শেষের দিকে।’
শব্দর ঘুরে প্রচণ্ড গতিতে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা অবধি পৌঁছে হাত বাড়ায় দরজার হাতল ছুঁতে, ঠিক তখনই ললিতা বিদ্রূপ ভরা কণ্ঠে বলে, ‘তা তোমার সতীসাবিত্রী, তোমার পবিত্র গুণধর বধূ কার সঙ্গে লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখা করে, কার বুকে মাথা রাখে, কার হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়, সে খবর রাখো তো?’’
সঙ্গে সঙ্গে শব্দরের সমস্ত দেহ বিষে নীল হয়ে আসে, রক্ত জমে যায় শিরায়-উপশিরায়। পিঠ বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। টকটকে লাল রক্তাভ চোখ নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ললিতার দিকে। বুকে চাপচাপ তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। শ্বাসকষ্ট হয়, গলার ভেতরটা শুকিয়ে আসে। ললিতা এ কথা কেন বলল? কেন এই বিষাক্ত বাক্য উচ্চারণ করল? দাউদাউ করে জ্বলে উঠে সন্দেহের আগুন, লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে মনের প্রতিটি কোণে। শব্দর দ্রুত এগিয়ে এসে ললিতার বাহু আঁকড়ে ধরে৷ ললিতা যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে ফেলে৷ শব্দর ব্যাকুল হয়ে বলে, ‘কী বলতে চাইছো? কী জানো তুমি? কী দেখেছো? বলো, এখুনি বলো।’
ললিতা পৈশাচিক হাসি হাসে। যখন জানালা দিয়ে দেখেছিল, শব্দর উন্মাদ হয়ে জুলফাকে ভালোবাসছে, আদর করছে, চুমু দিচ্ছে, তখন তিনি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলেন, পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। বহু বছর ধরে বুকে জমিয়ে রাখা প্রেম, ভালোবাসা এক নিমেষে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। সেই ঘৃণার প্রচণ্ড তোড়ে, সেই উন্মাদনায় আসর ঘরে আগুন লাগিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন শব্দরসহ ওই জুলফাকে, দুজনকেই পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চেয়েছিলেন। পশু হয়ে উঠেছিলেন, মানবিকতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আগুন ধরিয়ে দিয়ে এসে প্রিয় পানের বাটা নিয়ে বসেছিলেন এখানে, শান্ত মনে। তখন অতটাও আনন্দ হয়নি যতটা এই মুহূর্তে শব্দরের ভাঙা চেহারা দেখে, তার অসহায় চোখ দেখে হচ্ছে।
ললিতা জোর করে, ঝটকা দিয়ে নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে শব্দরের হাত সরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘কী বলতে চাইছি সেটা তোমার বউকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। প্রশ্ন করো, তোমার অগোচরে কার সাথে সময় কাটায়।’
ললিতার চোখের ভাষা বলছে, সে মিথ্যা বলছে না! শব্দর উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলে, ‘কে? কে সেই ছেলেটা? বলো কে সে? এই বাড়ির কেউ? কাজের কোনো লোক? খামারবাড়ির কেউ? নাকি বাইরের কেউ? প্রতিবেশী? বলো, বলো, এখুনি বলো আমাকে। নাম বলো তার।’
‘আমাকে মেরে ফেললেও, টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেও আমি বলব না। যাও, ক্ষমতা থাকলে নিজে বের করো। যাও।’
কথাটা বলেই ললিতা দাঁত বের করে হাসে।
রাগে শব্দরের শিরা-উপশিরা দপদপ করে ওঠে। মনে হয় মাথার ভেতরে আগুন ধরে গেছে। ইচ্ছে করে ললিতার গলাটা ছিপকে ধরে তার এই ঘৃণ্য হাসি চিরতরে বন্ধ করে দিতে। তার আগেই ললিতা দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে যান ঘর থেকে।
শব্দর যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো দেয়ালে পিঠ ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটোর আঙুলগুলো শিথিল হয়ে আসে। বুকের বাঁ পাশে একটা তীব্র থেকে তীব্রতর ব্যথা অনুভব করতে থাকে। মনে হচ্ছে, কেউ তার হৃদয়ে ধারালো ছুরি বসিয়ে দিয়েছে এবং সেই ছুরিটা ক্রমাগত পেঁচিয়ে দিচ্ছে, আরও গভীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
জুলফা সত্যিই কারোর সঙ্গে প্রেম করছে! এই উপলব্ধিটা তার মস্তিষ্কে বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, প্রতিটি বার আরও তীব্র আঘাত হানছে তার আত্মায়। তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র সত্যিকারের ভালোবাসা, তার হৃদয়ের রানি জুলফা অন্য কাউকে চাইছে, অন্য কারোর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, অন্য কারোর বুকে মাথা রাখছে। কেউ একজন তাকে অভিশাপ দিয়েছিল, ঘৃণা নিয়ে বলেছিল, ‘একই ব্যথা আপনিও ভোগ করবেন শব্দর, একই যন্ত্রণা আপনার বুকেও জ্বলবে।’
এই তবে সেই ব্যথা? এই তবে সেই অভিশাপের ফল? শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি তাকে গ্রাস করছে ভেতর থেকে। এই জগতে কত মানুষ কত পাপ করে প্রতিদিন, কত অন্যায় করে নির্লজ্জভাবে তবুও তারা শান্তিতে ঘুমায়, সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটায়। অথচ সে একটা মাত্র ভুলের জন্য, এক রাত্রির দুর্বলতার জন্য বছরের পর বছর, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস… অনন্তকাল ধরে শাস্তি ভোগ করে আসছে, অনুতাপের আগুনে পুড়ে মরছে।
ইতিহাসের পাতায়, ধর্মগ্রন্থের কাহিনিতে, পুরাণের গল্পে এমন বহু মানুষের কথা পড়েছে সে, যারা দীর্ঘ তপস্যা-সাধনার পর, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগের পর যা চেয়েছে তাই পেয়েছে, যে বর চেয়েছে সেই বর মিলেছে, যে মুক্তি খুঁজেছে সেই মুক্তি লাভ করেছে। কত মহাপাপী সাধু হয়েছে তপস্যার মাধ্যমে, কত অধর্মী ধার্মিক হয়েছে, কত অত্যাচারী ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছে অনুশোচনার মাধ্যমে। তাহলে সে কেন পারছে না? সে পঁচিশটা বছর শাস্তি ভোগ করেও, প্রতিটি দিন অনুতাপে কাটিয়েও, নিজের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া ত্যাগ করেও, সমস্ত স্বার্থপরতা বিসর্জন দিয়েও একটা পাপের মোচন করতে পারল না? পাপমোচন করতে পাপীকে কি না ঠিক একই ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে, একই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? তারবেলা কেন এই নিয়ম? তবে কেন এতগুলো বছর সে অনুতাপে ভুগল, আত্মগ্লানিতে মরল, নিজেকে ঘৃণা করল প্রতিদিন, নিজের মুখ আয়নায় দেখতে পারল না? কেন সে একটুও সুখ পাবার চেষ্টা করল না, নিজের জন্য কিছু চাইল না, নিজের আনন্দের কথা ভাবল না?
ওস্তাদজী সবসময় বলতেন, ‘সৃষ্টিকর্তা দুঃখ দিয়ে মানুষকে শাস্তি দেন অথবা পরীক্ষা নেন। শাস্তি হলে মানুষের পাপমোচন হয়, তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়, আর পরীক্ষা হলে ধৈর্যশীল মানুষ পুরস্কার পায়, উত্তম প্রতিদান পায়। তাই মানুষের উচিত সবুর করা, ধৈর্য ধারণ করা, ধৈর্যশীল হওয়া, কারণ নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আল্লাহ আছেন, তিনি তাদের সাহায্য করেন।’
তারও কি এখন সবুর করা উচিত, ধৈর্য ধরে বসে থাকা উচিত? কীভাবে করবে সে ধৈর্য ধারণ? কীভাবে শান্ত থাকবে যখন তার বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে, দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, ছাই হয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়? শয়তানের প্ররোচনায়, শয়তানের কুমন্ত্রণায় অল্প বয়সে করা এক রাত্রির মারাত্মক ভুল তাকে পোড়াতে পোড়াতে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। যে ভুলের কথা মনে হলেই নিজেকে নর্দমার কীট মনে হয়, জঘন্যতম জীব মনে হয়, অস্তিত্বহীন কিছু মনে হয় সেই ভুল এতদিনেও মোচন হলো না কেন?
এমন কোনো রাত নেই, এমন কোনো একটি রাত্রি নেই যে রাত্রিতে সে অনুতাপের ভয়াবহ আগুনে পুড়তে পুড়তে ঘুমায়নি, অশান্তিতে ছটফট করতে করতে রাত কাটায়নি, বিবেকের দংশনে কাতরাতে কাতরাতে চোখ বন্ধ করেনি। জুলফা তার জীবনে আসার পর, ভালোবাসা তার বুকের ভেতর বাসা বাঁধার পর সে একটু শান্তি পেয়েছিল, মনে হয়েছিল জীবন বোধহয় আবার বাঁচার মতো হয়ে উঠছে। সে আশায় বুক বেঁধে ভেবেছিল, তার পাপমোচন হয়েছে। অবশেষে সৃষ্টিকর্তা তাকে মাফ করে দিয়েছেন এবং তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।
কিন্তু না, হয়নি! হয়নি কোনো পাপমোচন, মিলেনি কোনো ক্ষমা, আসেনি কোনো মুক্তি। যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসল এই পৃথিবীতে, যাকে সে তার হৃদয়ের রানি করল, যাকে সে তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানাল, যার জন্য সে সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত, ঠিক তার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তা তাকে শাস্তি দিতে চাইছেন, যন্ত্রণা দিতে চাইছেন, ধ্বংস করতে চাইছেন।
জুলফার মুখোমুখি হতে এখন আর ইচ্ছে করছে না তার, একেবারেই ইচ্ছে করছে না ওই ছলনাময়ীর মুখ দেখতে, ওই মিথ্যাবাদী মেয়েটার দিকে তাকাতে। গতকাল রাতে কত কষ্ট দিয়েছে সে জুলফাকে, কত আকুতি করেছে, কত বিনয় করেছে, কত অনুরোধ করেছে সত্যটা বলার জন্য, তবুও সে স্বীকার করেনি কিছুই, মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। হাতেনাতে ধরার মতো শক্তি আর নেই তার। সত্য পরিষ্কার। নিয়তি আর পরিস্থিতি একই সুরে গান গাইছে৷ এই তার নিয়তি। একটা খোঁড়া মেয়ের অভিশাপের ফল!
শব্দর অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করতে করতে বাইরে বেরিয়ে আসে বারান্দায়। বারান্দার লোহার গ্রিলে দুই হাত শক্ত করে রেখে, ওজন দিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। তারপর প্রাণপণে শ্বাস নেয়। তার খালি গায়ে এসে লাগে বাইরের ফুরফুরে বাতাস। ঠান্ডা শীতল বাতাসে গায়ের লোম শিউরে উঠছে, কিন্তু সেই বাতাস তার হৃদয় অবধি পৌঁছাতে পারছে না, বুকের গভীরে যেতে পারছে না। কারণ ওখানটায়, তার বুকের গভীর কোণে ক্রমাগত ঝরে যাচ্ছে লাভা… জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা যা সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। কী করে নিভবে সেই ভয়াবহ আগুন? কীভাবে থামবে এই দহন? জুলফার গলা চেপে ধরে মেরে ফেলবে? নাকি নিজেকেই শেষ করে দেবে এই পৃথিবী থেকে? ঠিক কী করলে তার শান্তি মিলবে, কোন পথে তার মুক্তি আছে?
দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান। মুয়াজ্জীনের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে “আল্লাহু আকবার”। আল্লাহ ডাকছেন তার বান্দাদের, ডাকছেন নামাজের জন্য, ডাকছেন সেজদায় মাথা রাখার জন্য। শান্তি কি ওখানে আছে? সৃষ্টিকর্তার দরবারে, তার সামনে মাথা নত করলে কি এই বুকের আগুন নিভবে? আছে শান্তি সেখানে?
আগুন নিভিয়ে জুলফাকে তুলে এনে তার নিজের পালঙ্কে শোয়ানো হয়েছে। শঙ্খিনী তার মাথার পাশে বসে আছে। জুলফার বুক অবধি সুন্দর করে টেনে দেয়া ক্রিম রঙা মসৃণ সিল্কের একটা চাদর। ঘরে আরও উপস্থিত গৌতমের মা এবং রাইহা, দুজনেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
গৌতমের মা চোখ বড় বড় করে কৌতূহলী দৃষ্টিতে জুলফার ঘাড়ের, গলার, কণ্ঠনালীর চারপাশের গাঢ় লাল দাগগুলি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বিড়বিড় করতে করতে একসময় জোরে বলে ফেলেন, ‘বেগম সাহেবা কি মৌচাকের চাকায় ডিল মারছিলেন? ভোমরা কামড়াইছে? চুন লাগায়া দিব?’
জুলফা হঠাৎ সচকিত হয়ে চমকে তাকায় গৌতমের মায়ের দিকে বিস্ফারিত চোখে। তারপর লজ্জায় দ্রুত চাদর টেনে গলা, ঘাড়, কাঁধ সম্পূর্ণভাবে ঢেকে নেয়। এভাবে অর্ধনগ্ন অবস্থায় শুয়ে থাকতে তার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে, অসহ্য লাগছে, লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কাতর কণ্ঠে বলে, ‘সবাই... সবাই একটু বাইরে যাও। শাড়ি পরতে..’
কথা সম্পূর্ণ করতে পারে না সে, বাক্য অসমাপ্ত রেখেই থেমে যায়। লজ্জায় তার গলা বুজে আসে।
রাইহা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে গৌতমের মা'র হাত ধরে, তাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। গৌতমের মা বাইরে এসে আবারও জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বলেন, ‘কিন্তু বেগম সাহেবারে ভোমরা কামড়াইল কখন? রাত্রিবেলা তো ভোমরা কামড়ায় না! ভোমরাও তো রাইতে ঘুমায়!’
রাইহা বিরক্তির তুঙ্গে পৌঁছে ধমকে ওঠে, ‘চুপ করেন তো। গৌতম কেমনে জন্মাল আল্লাহ জানে।’
বলতে বলতেই রাইহা দ্রুত পা চালিয়ে চলে যায় সেখান থেকে। সে অজু করে পবিত্র হয়ে নামায আদায় করতে নিজের জায়নামাজে দাঁড়ায়, সেজদায় মাথা রাখে। এই জায়নামাজেই সে শান্তি খুঁজে পেয়েছে, সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মুক্তি পেয়েছে।
গৌতমের মা বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থেকে ভাবছেন, ‘ভোমরার কামড়ের সঙ্গে গৌতমের জন্মের কী সম্পর্ক?’
শব্দরকে আসতে দেখে দ্রুততার সঙ্গে মাথা নত করে একপাশে সরে দাঁড়ান।
শব্দর ঝড়ের বেগে ঢুকে যায় ঘরের ভেতর। শঙ্খিনী তখন জুলফাকে শাড়ি পরাচ্ছিল। শব্দরকে হঠাৎ এভাবে ঢুকতে দেখে সে থতমত খেয়ে যায়, কী করবে বুঝতে পারে না এক মুহূর্তের জন্য, তারপর দ্রুত মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। শব্দর জুলফার দিকে একবারও না তাকিয়ে, কোনো কথা না বলে পাঞ্জাবি এবং পায়জামা তুলে নিয়ে সোজা গোসলখানায় চলে যায়।
গোসলখানায় ঢুকে সে পোড়া ক্ষতের উপর ঠান্ডা পানি ঢেলে গোসল করতে শুরু করে। পানি যখন পোড়া চামড়া স্পর্শ করে অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে চায় শরীর, চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে তীব্র বেদনায়। তবুও সে ভয়াবহ জ্বালা উপশমের জন্য কিছুই করে না। কোনো মলম লাগায় না, কোনো ঔষধ ব্যবহার করে না।
গোসল শেষ করে সে কাপড় পরে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। একবারও তাকায় না জুলফার দিকে।
নামায শেষ করে রাইহা খেয়াল করে একটা বই পড়ে আছে মেঝেতে। গত রাতে পড়তে পড়তে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিল। হয়তো তখনই হাত থেকে পিছলে নিচে পড়ে গিয়েছিল বইটা।
বইটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে লেখা। রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ছিলেন কাদম্বরী দেবী, এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র দুই কি তিন বছরের বড় ছিলেন৷ রবীন্দ্রনাথ এবং কাদম্বরী দেবী ছিলেন একে অপরের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো, আত্মার আত্মীয়ের মতো। তারা একসঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্ঠা আড্ডা দিতেন, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন, খুনসুটি করতেন, হাসিঠাট্টা করতেন। রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাদম্বরী দেবী আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করে মারা যান।
মর্মান্তিক ঘটনাটি সারা দেশজুড়ে রহস্য রেখে যায়। যার সমাধান আজও হয়নি। অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, অনেক জল্পনা-কল্পনা হয়েছে সেই মৃত্যু নিয়ে। কারো কারো মতে, রবীন্দ্রনাথ এবং কাদম্বরী দেবী শুধু বন্ধু ছিলেন না, তারা গোপনে প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলেন, একে অপরকে ভালোবাসতেন। তাই কাদম্বরী দেবী রবীন্দ্রনাথের অন্য একজনকে বিয়ে করাটা মেনে নিতে পারেননি, আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। আবার কারো কারো মতে তারা শুধুই বন্ধু ছিলেন। কাদম্বরী দেবী সম্পূর্ণ অন্য কোনো কারণে, হয়তো পারিবারিক কোনো জটিলতায়, হয়তো মানসিক কোনো সমস্যায় আত্মহত্যা করেছিলেন।
রাইহা রহস্য উদঘাটনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কোথায় পাবে কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যার আসল কারণ? কোথায় লুকিয়ে আছে সত্যিটা? চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
তারপর হঠাৎ শব্দর ভূঁইয়ায় চিৎকারে ঘুম ভাঙে।
সে বইটা তুলে বালিশের পাশে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করে। তখন থেকে মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যাচ্ছে না মন থেকে, শব্দর ভূঁইয়া ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে তার ভাবির ঘরে কেন গিয়েছিল?
বাড়ির পাশেই একটা মসজিদ আছে, যেখান থেকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আজান ভেসে আসে। শব্দর সেই মসজিদে না গিয়ে নদী পার হয়ে বিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে উজিরপুরের নিকলা হাওরের ইমাম আব্দুল বারীর মসজিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়৷
সুফিয়ান ভূঁইয়া যখনই মানসিক অশান্তিতে ভুগতেন, তখনই তিনি এই মসজিদে আসতেন সময় কাটাতে। তারপর বাড়ি ফিরে যেতেন ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে৷ শব্দরও আজ এখানে শান্তির খুঁজে এসেছে৷
সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ ক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট পাকা বাড়ি, তার সাথে সংলগ্ন একটা ধবধবে সাদা মসজিদ, যার মিনার আকাশ ছুঁতে চাইছে। চারপাশে সবুজ বাগান ছড়িয়ে আছে, ফুলের মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভাসছে। মসজিদটা পাশের গ্রামের মানুষদের জন্য নির্মিত। জোয়ান ছেলেপেলে খুব একটা দেখা যায় না এখানে, বেশিরভাগই আসেন বৃদ্ধ মানুষজন, যারা জীবনের সন্ধ্যাবেলায় এসে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শব্দর মসজিদের কাঠের দরজার সামনে দাঁড়ায়। ভেতরে তেরোজন বয়স্ক মানুষ নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন সারিবদ্ধভাবে, তাদের সামনে ইমাম আব্দুল বারী সাহেব দাঁড়িয়ে কোরআনের পবিত্র আয়াত পড়ছেন। শব্দর জড়োসড়ো হয়ে একদম পেছনের সারিতে গিয়ে বসে। নামাজ আদায় না করে সামনের মুসল্লিদের রুকু দেখে, সেজদা দেখে, দেখে কীভাবে তারা একসাথে আল্লাহর সামনে মাথা নত করছেন পরম বিনয়ে। একটা অদৃশ্য কাঁচের প্রাচীর তাকে আল্লাহর থেকে আলাদা করে রেখেছে, একটা মোটা পর্দা ঝুলে আছে তার আর রবের মধ্যে। কীভাবে সে সেজদায় যাবে? কীভাবে সে আল্লাহর সামনে মাথা নত করবে, যখন তার মাথা ভর্তি পাপের বিশাল বোঝা, যখন তার কপাল কলঙ্কিত গুনাহের কালিতে? তার মতো কলঙ্কিত, কুলষিত মানুষের সেজদা নিশ্চয়ই আল্লাহ গ্রহণ করবেন না, নিশ্চয়ই তার প্রার্থনা ফিরিয়ে দেওয়া হবে আসমানের দরজা থেকে। সে তো একজন ব্যভিচারী, একজন পাপী, যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে পাপের গন্ধ। তাইতো সৃষ্টিকর্তা তাকে ক্ষমা করেননি, তাইতো তাকে শাস্তি দিতে চাইছেন।
সৃষ্টিকর্তা তাকে শাস্তি দিতে গিয়ে আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সে কতটা পরিত্যক্ত, কতটা অযোগ্য, কতটা অপাত্র আল্লাহর রহমতের জন্য। সে বসে থাকে নিষ্প্রাণ পাথরের মতো নিথর হয়ে। নামাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে সবাই চলে যায়। শব্দর মুখ লুকিয়ে রাখে, কারো সাথে চোখাচোখি হতে দেয় না।
ইমাম আব্দুল বারী খেয়াল করেন তাকে। সুফিয়ানের ভাই শব্দর! সুফিয়ান-শব্দর তার পুরনো বন্ধুর ছেলে, আবার তিনি নিজে শব্দরের উস্তাদজির ছোট ভাইও বটে। নব্বই বছর বয়স হয়ে গেছে তার, কিন্তু এখনো শরীর শক্ত, মজবুত, চেহারায় আধ্যাত্মিক তেজ। সুফিয়ান মাঝেমধ্যে আসে তার কাছে মন হালকা করতে, শব্দর আজই প্রথমবারের মতো পা রেখেছে এখানে। আব্দুল বারী কিছু না বলে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করেন।
শব্দর মেঝের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে স্থবির হয়ে৷ ভেতরে ভেতরে সে ভীষণ অস্থির। ঝড় বইছে তার মনের আকাশে, তুমুল তুফান চলছে তার হৃদয়ে।
আব্দুল বারী কোরআন পড়া শেষ করে তসবিহ হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন শব্দরের কাছে। কোমল স্বরে বলেন, ‘বাবা, নামাজটা আদায় করে নাও। ফজরের ওয়াক্ত চলে যাবে।’
শব্দর ভূতগ্রস্তের মতো তাকায়। আশ্চর্য হয়ে দেখে আব্দুল বারীর চেহারা। কী নূরানি মুখ! যেন তার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে কোনো অলৌকিক জ্যোতি! শব্দর বিড়বিড় করে করে বলে, ‘যার হৃদয় ভরে আছে পাপ দিয়ে, যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে গুনাহের বোঝা সে কীভাবে আল্লাহর মুখোমুখি দাঁড়াবে? কোন মুখ নিয়ে সে আল্লাহকে ডাকবে, কোন সাহসে তার নাম উচ্চারণ করবে?’
আব্দুল বারী মৃদু হাসেন। তিনি তার এই দীর্ঘ জীবনে কত অনুতপ্ত হৃদয় দেখেছেন, কত ভেঙে পড়া মানুষের চোখে চোখ রেখেছেন!
তিনি বলেন, ‘বাবা, এই পৃথিবীতে এমন কোনো গুনাহ নেই, এমন কোনো পাপ নেই যা আল্লাহর রহমতের চেয়ে বড়। উনার রহমত এতই বিশাল, এতই অসীম যে আমরা মানুষেরা তার কল্পনাও করতে পারি না। তিনি সবার জন্য রহমত নিয়ে অপেক্ষা করে আছেন। ধার্মিক, পাপী, খোঁড়া, অন্ধ, সুস্থ, অসুস্থ, ধনী, গরিব সবার জন্য। উনার দরজা কখনো বন্ধ হয় না, সবসময় খোলা থাকে।'
শব্দরের বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। গলায় কান্নার এক বিশাল পিণ্ড আটকে আছে শক্ত হয়ে, কিছুতেই বেরিয়ে আসছে না।
সে কোনো কূল পাচ্ছে না, কোনো পথ দেখতে পাচ্ছে না। কী করলে শান্তি পাবে, কোথায় যাবে, কীভাবে এই পাপের বিশাল বোঝা থেকে মুক্তি পাবে, জুলফাকে নিয়ে কী করবে…নানা অস্থিরতা অতিষ্ট হয়ে আছে! তার পুরো জীবনটাই লণ্ডভণ্ড, বিশৃঙ্খল একটা স্তূপ।
আব্দুল বারী বলেন, ‘ইবলিস তার রবকে অহংকার নিয়ে বলেছিল, ‘আপনার ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম! আমি মানুষদের ভ্রষ্ট করতেই থাকব, পথভ্রষ্ট করতেই থাকব জীবনভর, যতক্ষণ তাদের মধ্যে রুহ থাকবে, যতক্ষণ তারা শ্বাস নেবে এই পৃথিবীতে! কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তখন কী বললেন জানো? তিনি তার মহিমায় বললেন, 'আমার ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম! আমি তাদের ক্ষমা করতে থাকব, তাদের রহমত দিতে থাকব অকাতরে, যতক্ষণ তারা আমার কাছে ইস্তিগফার করে, তওবা করে, অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে!’ দেখো বাবা, শয়তান প্রতিজ্ঞা করছে তোমাকে পথভ্রষ্ট করার, তোমার জীবন ধ্বংস করার, কিন্তু আল্লাহ প্রতিজ্ঞা করছেন তোমাকে ক্ষমা করার, তোমার পাপ মুছে দেওয়ার। এখন তুমিই বলো, কার প্রতিজ্ঞা বেশি শক্তিশালী, কে বেশি ক্ষমতাবান?’
শব্দর ফিসফিস করে বলে, ‘অনুতপ্ত? অনুতাপের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছি। কিন্তু ক্ষমা... ক্ষমা তো পেলাম না আজও।’
‘ক্ষমা পাওয়া মানে এই নয় যে তোমার জীবনের সব সমস্যা হঠাৎ করে জাদুর মতো মিলিয়ে যাবে। ক্ষমা পাওয়ার অর্থ হলো আল্লাহ তোমার পাপগুলো মুছে দিয়েছেন, তোমার নামের পাশ থেকে কালো দাগ সরিয়ে নিয়েছেন।’
‘যদি ক্ষমা করেই থাকেন, তাহলে বহু বছর আগে করা পাপের শাস্তি এখন কেন পাচ্ছি? কেন এখনো এই যন্ত্রণা, এই কষ্ট?'
‘হয়তো তোমার অনুতপ্ততার বিনিময়ে তখনই তোমার নিয়তিতে শাস্তি লেখা হয়েছিল…. সঙ্গে সঙ্গে মুছেও গিয়েছিল তোমার পাপের কালিমা। কিন্তু সেই শাস্তির সময়টা ছিল এই মুহূর্তটা, এই জীবন। হতে পারে না এমন? নিশ্চয়ই আল্লাহর কোনো গভীর পরিকল্পনা আছে তোমার জন্য, যা তুমি এখন বুঝতে পারছো না। বিশ্বাস রাখো তার উপর। তাকদিরে বিশ্বাস রাখো। ভাগ্যে যা লেখা আছে তা হবেই, একে খণ্ডানো যায় না। কিন্তু কিছু কিছু ভাগ্য পাল্টানো যায় দোয়ার মাধ্যমে, তওবার মাধ্যমে, সৎ কাজের মাধ্যমে।’
‘আল্লাহ কেন একজন পাপীর দোয়া কবুল করবেন? আমি কে যে তিনি আমার প্রার্থনা শুনবেন?’
‘তোমার পরিচয় হলো তুমি উনার বান্দা, উনার সৃষ্টি। আর আল্লাহ সেই বান্দাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন যে পাপ করেও ভেঙে পড়ে, যে অনুতপ্ত হয়ে কাঁদে, যে অহংকার করে পাপ আঁকড়ে ধরে না। তুমি কি জানো না, আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না কখনো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন।’ এই আয়াত কার জন্য লেখা? তোমার মতো মানুষদের জন্য, যারা পাপ করে অনুতপ্ত হয়।’
শব্দরের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। চোখ নত করে ঠোঁট কামড়ে ধরে শক্ত করে। অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করে, ‘জীবন যখন এতোই কঠিন হবে, এতো যন্ত্রণাময় হবে, তবে তিনি কেন দিলেন জীবন? কেন পাঠালেন এই পৃথিবীতে?’
আব্দুল বারী মাথা ঝুঁকিয়ে শব্দরের চোখের দিকে চোখ রেখে বলেন, ‘জীবন কঠিন লাগে কারণ আমরা মানুষেরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। আমরা মনে করি আমরাই আমাদের ভাগ্যের মালিক, আমরাই সবকিছু ঠিক করতে পারি নিজেরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সবকিছু আমাদের হাতে নেই। আল্লাহ যা চান তাই হয়, তার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তুমি যখন থেকে মেনে নেবে মন থেকে যে 'আমি শুধু চেষ্টা করব, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব আমার সাধ্যমতো, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেব পুরোপুরি,' সেদিন থেকেই তোমার বুকের ভার কমে যাবে, তোমার কাঁধ থেকে পাথর সরে যাবে। নিয়ন্ত্রণ করার মালিক আল্লাহ, আমরা মানুষ নই। আমরা শুধু মেহনত করতে পারি, বাকিটা তার হাতে রেখে দিতে হয়।'
কথাগুলো শব্দরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে৷ কিছু বলে না, শুধু চেয়ে থাকে ইমাম সাহেবের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে। সত্যিই তো! সে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে জীবন, সব কিছু তার মুঠোয় রাখতে চেয়েছে! অথবা ললিতার হাতে দিয়েছে জীবনের চাবি। কখনো আল্লাহর উপর ছাড়েনি।
আব্দুল বারী তাড়া দিয়ে বলেন, ‘সূর্য এখনই উঠে যাবে। ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফরজ নামাজটা আদায় করে নাও। উঠো। দাঁড়াও আল্লাহর সামনে। শান্তি পাবে। যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি এই পুরো খেলাঘর, এই পুরো জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন, তার কাছে সব বলো। তোমার হৃদয়ের সব কথা, সব কষ্ট, সব অনুতাপ তার সামনে রেখে দাও। তিনি শুনবেন। তিনি অবশ্যই শুনবেন। এখন উঠো, উঠো।’
শব্দর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, এগিয়ে যায় মিহরাবের দিকে৷ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, ইমাম আব্দুল বারীকে। তিনি মুচকি হাসছেন।
পুরো একটা দিন আর একটা রাত পেরিয়ে গেছে। শব্দরের দেখা নেই, কোনো খবর নেই। গতকাল সকালবেলা সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, তারপর থেকে সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আড়তে গিয়েও তার দেখা মেলেনি। সেখানকার লোকজনও বলেছে তারা তাকে দেখেনি।
দুশ্চিন্তায়, অস্থিরতায় জুলফা সারারাত একটুও ঘুমাতে পারেনি। মানুষটার পিঠে, বাহুতে কী ভয়াবহভাবে পুড়ে গিয়েছিল—চামড়া উঠে গিয়েছিল জায়গায় জায়গায়, মাংস বেরিয়ে এসেছিল, ক্ষতচিহ্নগুলো দেখতে বীভৎস লাগছিল। সেই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায়ও সে গোসল করেছে, নিজেকে পরিষ্কার করেছে, দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে শরীর ধুয়েছে, জল ঢেলেছে পোড়া ক্ষতের ওপর। কিন্তু কেন? কেন সে নিজেকে এতটা কষ্ট দিচ্ছিল, এতটা যন্ত্রণা সহ্য করছিল? এই প্রশ্ন তাকে রাতভর তাড়া করেছে, ঘুরে ফিরে এসেছে মনের কোণে।
রাতভর না ঘুমানোর ফলে জুলফার চোখ দুটো মলিন হয়ে গেছে, ক্লান্তিতে ভারী হয়ে উঠেছে, চোখের পাতা ফুলে আছে, মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে আছে।
হঠাৎ করে দ্রুত পদচারণার শব্দ ভেসে আসে বারান্দা থেকে। জুলফার হৃদয় দপদপ করে ওঠে, বুকের ভেতরে মৃদঙ্গ বাজতে থাকে জোরে জোরে। শব্দর ফিরে এসেছে? সে উৎসুক হয়ে, আশায় বুক বেঁধে তাকায় দরজার দিকে। কিন্তু না, শব্দর নয়। শঙ্খিনী!
শঙ্খিনী তাড়াতাড়ি করে এসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘বেগম সাহেবা, নাভেদ বাবু এসেছেন। পশ্চিমের ঘরে অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য।’
জুলফা চমকে তাকায় শঙ্খিনীর দিকে। কেন যেন তার খুশি অনুভব হয় না, বরং একধরনের অস্বস্তি বোধ হচ্ছে, বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছে। নাভেদ এই দিনের আলোয়, এই বেলায় কেন এলো! কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে কী হবে? এমনিতেই শব্দর তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে, বাজপাখির মতো নজর রাখছে।
জুলফা দ্রুত ঘোমটা টেনে নিয়ে সাবধানে চারপাশ দেখতে দেখতে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। তার হাত ঠান্ডা হয়ে আছে।
এদিকের ঘরগুলোতে এ সময় সাধারণত কেউ আসে না, তবুও শঙ্খিনী দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে থাকে, সতর্ক দৃষ্টি রাখে চারদিকে, ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে কেউ আসছে কিনা।
নাভেদ জুলফাকে দেখেই দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে, বুকে টেনে নেয়। উদ্বিগ্ন সুরে বলে, ‘আপনি ঠিক আছেন তো? গতকাল বিকালে শুনলাম আগুন লেগেছিল বাড়িতে। পুরো রাত আমি ঘুমাতে পারিনি চিন্তায়, পাগল হয়ে ছিলাম। কী হয়েছিল? কীভাবে আগুন লাগল?’
জুলফা তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, ‘আমি ঠিক আছি। আপনি এখানে কেন এলেন? কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আপনার হুট করে এভাবে আসা ঠিক হয়নি।’
‘সেদিন সারা বিকেল অপেক্ষা করেছি। আপনি এলেন না কেন? কী হয়েছিল?’
‘উনি আমাকে সন্দেহ করছেন, নজরে নজরে রাখছেন, তাই আসতে পারিনি। দোহাই লাগে আপনি এখন চলে যান। কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলে উনার সন্দেহ আরও বেড়ে যাবে, বিপদ হবে।’
‘বাড়ুক সন্দেহ। আমি পরোয়া করি না। আমি আপনাকে এই জাহান্নাম থেকে, এই নরকের জীবন থেকে নিয়ে চলেই যাব। ওই লোকের সন্দেহ হলেই কি আর না হলেই কি? কী যায় আসে তাতে?’
জুলফা থমকে যায়। অস্ফুটস্বরে, কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কবে? কবে নিয়ে যাবেন আমাকে?’’
'সপ্তাহ দুয়েক পরেই। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ, সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেছে। টিকিট কেনা হয়েছে, থাকার জায়গা ঠিক হয়েছে, সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
‘এতো তাড়াতাড়ি!’’
নাভেদ অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। ভুরু কুঁচকে বলে, ‘তাড়াতাড়ি? এতদিন তো আপনিই তাড়া দিচ্ছিলেন, অধৈর্য হয়ে উঠছিলেন। বলছিলেন তাড়াতাড়ি নিয়ে চলুন এখান থেকে, আর দেরি নয়। আর এখন বলছেন তাড়াতাড়ি?’’
‘হু।’’
জুলফা অন্যমনস্ক হয়ে যায়, তার দৃষ্টি কোথায় যেন হারিয়ে যায়, মনটা অন্য কোথাও ঘুরে বেড়ায়। শব্দরের মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। পোড়া পিঠ, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীর!
‘আগুন লাগল কী করে? কোথাও লাগেনি তো আপনার?’
নাভেদ উদ্ভ্রান্তের মতো জুলফার হাত ধরে দেখে, উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করে, আঙুল ছুঁয়ে দেখে, পা দেখে, তার গলার দিকে তাকায়। গলায় চোখ পড়তেই চোখ সরু হয়ে আসে, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে। জুলফা সেই দৃষ্টি বুঝতে পেরে দ্রুত আঁচল টেনে ঢেকে ফেলে তার গলা, ঘাড়। কিন্তু নাভেদ জোর করে সেই আঁচল সরিয়ে নেয়, টান মেরে সরায়। গলায়, ঘাড়ে লালচে দাগ, কামুকতার সুস্পষ্ট চিহ্নগুলো চিনতে তার কোনো অসুবিধে হয় না।
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় নাভেদের, রক্তশূন্য হয়ে পড়ে, কণ্ঠ ফ্যাসফ্যাসে হয়ে আসে যখন বলে, ‘আপনি আমার সাথে মিথ্যা বলেছেন?’
জুলফা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কোনটা...কোনটা মিথ্যে বলেছি আমি?’
‘শব্দর ভূঁইয়ার সঙ্গে আপনার দূরত্বের কথা। আপনি বলেছিলেন তার সাথে আপনার আর কোনো সম্পর্ক নেই, তিনি আপনাকে স্পর্শ করেন না, কাছেও আসেন না।’
জুলফা তার আঁচলটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, মুঠোয় পাকিয়ে নেয়। তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে প্রচণ্ড বেগে। মনে হচ্ছে, হৃদয় বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। সে তো মিথ্যা বলেনি! নাভেদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে সে শব্দরকে কাছে আসতে দেয়নি, নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে, শীতল ব্যবহার করেছে, দূরে দূরে থেকেছে। তার এই এড়ানো সার্থক হয়েছিল শব্দরের দীর্ঘ অসুস্থতার জন্য।
মাঝের সময়টায় শব্দর খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, সারাক্ষণ বুকে আর পেটে তীব্র ব্যথায় কাতর থাকত, কুঁকড়ে থাকত। চিকিৎসার উপর ছিল, পনেরো দিনের মতো আলাদা ঘরে থেকেছে, একা একা কষ্ট সহ্য করেছে। রাতের পর রাত কবিরাজের কাছে গিয়েছে চিকিৎসা নিতে। বাকি দিনগুলোতে যদিও দুজন পাশাপাশি শুয়েছে, কিন্তু কাছাকাছি আসেনি কেউ, মাঝখানে ছিল অদৃশ্য এক প্রাচীর। সেইসব দিনের অবহেলা, বঞ্চনা পরশু রাতে ভয়ংকরভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে, আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উথলে উঠেছে।
নাভেদ চিৎকার করে উঠে, ‘কথা বলছেন না কেন? নারী জাত বুঝি এমনই হয়? দুই কূলই আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়, দুই নৌকায় পা রাখতে চায়।’
‘আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আপনি জানেন না কী ঘটেছে, কী অবস্থা হয়েছিল।’
‘এতো লালসা মনে? এতো কামুকতা লুকিয়ে ছিল আপনার ভেতরে? একইসাথে দুজনের বিছানায় শুতে বাঁধল না আপনার?’
নাভেদের কথাগুলো তীরের মতো বিঁধে যায় জুলফার সর্বাঙ্গে, ছুরির মতো বিদ্ধ করে। অপমানে জুলফার শরীর আগুনে পুড়তে থাকে, মর্মবেদনায় জ্বলে যায়, হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হতে থাকে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। অশ্রুসিক্ত গলায় বলে, ‘কী বলছেন আপনি? এসব কী বলছেন আপনি আমাকে? কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন? আমাকে চেনেন না আপনি?’
নাভেদ মেজাজ হারিয়ে ফেলছে, তার চোখ রক্তাক্ত হয়ে উঠছে, মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না সে কেন এভাবে রেগে যাচ্ছে, কী এক বিষাক্ত ঈর্ষা তাকে গ্রাস করছে। শব্দর আর জুলফার ঘনিষ্ঠতা সে কেন সহ্য করতে পারছে না, কেন এটা তার বুকে পাথরের মতো চাপ দিচ্ছে। ব্যক্তিত্বের মুখোশ খুলে যাচ্ছে! তার মেজাজ চিড়বিড় করে ওঠে, হুংকার দিয়ে বলে, ‘আপনি আর কখনোই ওই লোকটার কাছে যাবেন না। শুনছেন? আর কখনো না।’
জুলফা মুখ ফসকে রেগে বলে ওঠে, ‘একশোবার যাব। হাজারবার যাব। উনি আমার স্বামী। আমার বিয়ে করা স্বামী।’
‘স্বামী? কীভাবে বলছেন স্বামী? স্বামীকে রেখে যখন অন্য পুরুষের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করেন, অন্য পুরুষের বিছানায় শোন, অন্য পুরুষের বুকে মাথা রাখেন, অন্য পুরুষের সাথে স্বপ্ন দেখেন, তখন মনে ছিল না স্বামীর কথা? তখন কোথায় ছিল আপনার সতীত্ব? এখন হঠাৎ স্বামী হয়ে গেলেন তিনি? এখন সুবিধা মনে হচ্ছে স্বামীর পরিচয় দিতে? যখন দরকার তখন স্বামী, যখন দরকার তখন প্রেমিক?’
জুলফার বুক যেন দুই টুকরো হয়ে যায়, তার কলিজা ছিঁড়ে যায়, ভেঙে চুরমার হয়ে যায় হৃদয়টা। সে ভূতগ্রস্তের মতো বিহ্বল গলায় বলে, ‘আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। একদমই চিনতে পারছি না।’
‘এটাই আমি। আসল আমি। আমি যে যেমন, তার সাথে তেমন ব্যবহার করি। চরিত্রহীনা নারীদের আমার একদম সহ্য হয় না, আমি ঘৃণা করি তাদের। একইসাথে দুই পুরুষের বিছানায় শোয় কারা জানো? বেশ্যারা। তাদের যায় আসে না দুই পুরুষের বী…’
জুলফা হঠাৎ নাভেদের মুখে হাত চাপা দিয়ে ধরে, প্রাণপণে চাপ দেয়। তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল বেরিয়ে আসতে থাকে, গাল বেয়ে ঝরে পড়ে। শরীর কাঁপছে, হাঁটু দুর্বল হয়ে আসছে। এসব কী শুনছে সে! কীভাবে এমন কথা বলতে পারে এই মানুষটা! যাকে সে বিশ্বাস করেছিল, যার জন্য সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলেছিল সে এসব কি নোংরা অপবাদ দিচ্ছে! এই মুখেই সে মধুর কথা বলেছিল, ভালোবাসার কথা বলেছিল।
শঙ্খিনী হঠাৎ করে দৌড়ে এসে ঘরে ঢোকে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘বেগম সাহেবা, জমিদারদের মামার বাড়ি থেকে অনেক মানুষ এসেছে।’
জুলফা দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়, মুহূর্তে নিজেকে সংযত করে চোখ মুছে ফেলে আঁচলে।
নাভেদ তাড়াহুড়ো করে আদেশের সুরে বলে যায়, ‘আগামীকাল বিকালে চাঁদের কুটিতে আসবেন। কথা আছে। আসতেই হবে। শুনলেন? নইলে…’
প্রায় হুমকির মতো কথাটা বলে চলে যায় সেখান থেকে, পেছনে ফিরেও তাকায় না। শঙ্খিনী খুব সাবধানে তাকে বের করে দেয়।
জুলফা পাথরের মূর্তির মতো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, থামছে না, নিরবধি ঝরছে, আঁচল ভিজে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগছে, ভেঙে পড়েছে সব।
নাভেদ বনে এসে নিজের কপাল নিজে চাপড়ায়, মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে মাটিতে। কী ব্যবহারটা করল সে! শেষ চাল দেবার আগেই না সব নষ্ট হয়ে যায়…সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়! ওভাবে রেগেই বা গেল কেন সে? নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল কেন? ইচ্ছে করছিল জুলফাকে মেরে ফেলতে, গলা টিপে ধরতে, শ্বাস বন্ধ করে দিতে। জুলফা শুধুমাত্র তার গুটি। সে একশো পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেও তার কি! অথচ শব্দরের সঙ্গেই জুলফার ঘনিষ্ঠতা সহ্য হচ্ছে না। অস্থির অস্থির লাগছে, বুকের ভেতর জ্বালা করছে। লাল হয়ে উঠেছে চোখমুখ, শিরা ফুলে গেছে, রাগে কাঁপছে শরীর।
নাভেদ চিৎকার করে গাছের গুড়িতে লাথি মারে কয়েকটা, মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে আঘাত করে, ছাল উঠে যায়, রক্ত বেরিয়ে আসে হাত থেকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………