আমি বুঝতেই পারছি না আমার কাপড়চোপড়ের কী হচ্ছে।
এখন তো এগুলো ধোয়া নিয়ে আমার রীতিমতো ফোবিয়া শুরু হয়ে গেছে। ব্যবহার করার আগে আমি গরম পানি আর স্যাভলন দিয়ে যতটা পারি ওয়াশিং মেশিনটাকে জীবাণুমুক্ত করি। তবু মেশিন থেকে যেটাই বের হয়, সবকিছুতেই ভয়ংকর অ্যালার্জি হচ্ছে। আমি সত্যি সত্যি মাথা ঠিক রাখতে পারছি না।
“মেশিনটা পরিষ্কার করো কী দিয়ে?”—ঘুমোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে নাবিলা আমাকে জিজ্ঞেস করল। দুঃখের বিষয়, এটাই এখন আমার আলোচনার প্রিয় টপিক হয়ে গেছে। ও নিশ্চয়ই বোরড হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমাকে খুশি করার জন্য নিজে থেকেই বিষয়টা তুলছে।
“ভিনেগার আর বেকিং সোডার মিশ্রণ,” আমি বললাম, “সবই ন্যাচারাল ইনগ্রেডিয়েন্টস দিয়ে বানানো। ইউটিউব দেখে শিখেছি।” শুনতে এমন লাগছে যেন আমি ক্লাস টু-এর কোনো ছাত্র। “আমি বুঝতে পারছি না এই পদ্ধতিটা শুরুর দিকে কাজ করলেও এখন কেন আবার আগের মতোই বাজে অবস্থা হয়ে যাচ্ছে।”
“যদি তোমার কাপড়গুলো লন্ড্রিতে নিয়ে ড্রাই ওয়াশ করিয়ে নিয়ে আসি?” নাবিলা বলল। “আমার বুটিকের পাশেই তো লন্ড্রি আছে।”
“না, না তোমার এত কষ্ট করার দরকার নেই। আমি নিজেই অফিস থেকে ফেরার পথে লন্ড্রি করে নিয়ে আসতে পারব।”
ভাবতেই রাগে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে— ঘরে একদম ঠিকঠাক অটোমেটিক ওয়াশিং মেশিন থাকা সত্ত্বেও আমাকে কাপড় বাইরে ধুতে দেয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে! অনেক শখ করে সিঙ্গার-এর দামী ফ্রন্ট লোডিং মডেলটা কিনেছিলাম। আর এখন আমি নিজেই ওটা ব্যবহার করতে পারছি না।
নাবিলা শান্ত গলায় বলল। “আমি করালে সমস্যা কী? তোমাকে এভাবে চুলকানি নিয়ে কষ্ট পেতে দেখতে আমার মোটেও ভালো লাগছে না, আহসান।”
আমি আবার প্রতিবাদ করতে গেলাম, কিন্তু ততক্ষণে নাবিলা আমার কাপড়গুলো তুলে নিয়েছে। তারপর আলমারি থেকে একটা বড় পলিথিন ব্যাগ বের করে কাপড়গুলো একটার পর একটা ভেতরে ঢোকাতে শুরু করেছে।
“আহ! তুমি কষ্ট করতে যাবে কেন,” আমি বললাম। “বললাম তো আমি করাবো।”
সে কোনো উত্তর দিল না। কারণ ও ততক্ষণে আমার একটা সাদা শার্ট হাতে নিয়ে থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা যেন থমথম করছে।
“কী হলো? অমন করে তাকিয়ে আছো কেন?”
“আহসান,” সে শীতল কণ্ঠে বলল, “তোমার কলারে এটা কী?”
আমি বুঝতে পারলাম না ও কীসের কথা বলছে। বিছানার পাশ ঘুরে আমি ওর সামনে গেলাম যাতে ভালো করে দেখতে পারি কী নিয়ে সে এত অস্থির হয়ে আছে। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু তারপরই দাগটা চোখে পড়ল। সাদা শার্টের কলারের এক কোণায় একটা টকটকে লাল দাগ।
নাবিলা আঙুল দিয়ে দাগটা ঘষল, কিছুটা রং উঠে এল। “এটা লিপস্টিক,” সে শীতল কণ্ঠে বলল।
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। “হয়তো তোমার লিপস্টিক লেগে গেছে। ওটা নিয়ে টেনশনের কিছু নেই। ধুলেই উঠে যাবে।”
নাবিলা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। “আমি এই শেডের লিপস্টিক ব্যবহার করি না, আহসান।”
আমি একবার কলারের উজ্জ্বল লাল দাগ আর নাবিলার ঠোঁটের দিকে তাকালাম। কিন্তু ও তো আজ কোনো লিপস্টিক লাগায়নি। আমি শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ওর লিপস্টিকের কয়টা কালেকশন আছে, আমি জানব কী করে?
“আমি শুধু পিঙ্ক শেড ব্যবহার করি,” সে স্পষ্ট করে বলল। “আমার স্কিন টোনের সাথে ওটাই যায়।”
হুম, ওর কথা সত্যি হতে পারে। যতদূর মনে পড়ছে ওর ঠোঁটে কখনো কড়া লাল লিপস্টিক দেখিনি।
তাহলে? আমার শার্টের কলারে এই লাল লিপস্টিক এল কোথা থেকে?
আমি কল্পনাও করতে পারছি না কীভাবে এটা সম্ভব। কিন্তু নাবিলার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ওর কল্পনাশক্তি আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
“নাবিলা।” আমি ওর কাঁধে হাত দিতে গেলাম কিন্তু সে লাফ দিয়ে সরে গেল। “তুমি কি ভাবছ আমি তোমার সাথে চিট করছি?”
“যদি চিট না করে থাকো, তাহলে তোমার কলারে লিপস্টিক এল কীভাবে?” ওর চোখ বড় হয়ে গেল। “এজন্যই কি আমাকে দিয়ে কাপড় লন্ড্রি করাতে চাচ্ছিলে না?”
“না!” আমি শার্টটা ওর হাত থেকে টেনে নিয়ে কলারের দাগটা দেখতে থাকলাম। কীভাবে হলো এটা? “আমি সত্যি জানি না। হয়তো শার্টটা কোথাও ফেলে রেখেছিলাম, আর তানজিনার লিপস্টিক লেগে গেছে।”
“তানজিনা কখনো লিপস্টিক দেয় না।”
এটাও তো সত্যি। তানজিনাকে কখনো মেকআপ করতে দেখিনি। কিন্তু তারপরও কেন জানি না মনে হচ্ছে, এটার পেছনে তানজিনার হাত আছে।
“আমরা দু’জন বাইরে থাকার সময় যদি তানজিনা আমাদের ঘরে ঢুকে আমার শার্টে লিপস্টিক ঘষে দেয়?” সন্দেহটার কথা শেষমেশ বলেই ফেললাম। “ও নিশ্চয়ই চাইছিল এটা তোমার চোখে পড়ুক। ও চায় আমার সাথে তোমার ঝগড়া হোক। আগেই তো বলেছিলাম, ও আমাকে সহ্য করতে পারে না।”
“এটাই তোমার উত্তর?” নাবিলা কোমরে হাত রেখে আমার দিকে তাকালো। “তানজিনা আমাদের বেডরুমে ঢুকে তোমার সব কাপড়ে লিপস্টিক ঘষে দিয়েছে? সিরিয়াসলি? তুমি কি সত্যিই আশা করছ আমি এটা বিশ্বাস করব?”
হ্যাঁ, আমি ঠিক এটাই আশা করছি। কিন্তু নাবিলার কথার টোনেই বুঝলাম অতোটা আশা করা ঠিক হয়নি। আমি ঢোক গিললাম। “শোনো,” আমি বললাম, “আমি সত্যি জানি না এই লিপস্টিক কীভাবে এল। কিন্তু আমি সত্যি কথা বলছি— আমি তোমাকে ঠকাইনি। কখনোই ঠকাবো না।”
“হুম।”
“নাবিলা।” বুকের ভেতর থেকে এক দলা অভিমান মেশানো কান্না বের হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু কাঁদলাম না। ছেলে মানুষদের কাঁদতে নেই। “তুমি কী করে ভাবতে পারলে আমি পরকীয়া করছি? প্লিজ একবার শুধু বলো, তুমি এমনটা বিশ্বাস করো না।”
নাবিলা বিছানায় বসে পড়ল। “আমি জানি না।” সে ফিসফিস করে বলল। “সত্যি আহসান, তুমি ইদানীং এত অদ্ভুত আচরণ করছ...”
“অদ্ভুত আচরণ?”
“তুমি বুঝতে পারছ আমি কী বলছি,” সে নিচু গলায় বলল। “তুমি প্রায় রাতেই ঘুমাও না। সারাক্ষণ কোনো না কোনো ব্যাপারে খিটখিট করো— এমনকি রাতে এমন সব শব্দের কথা বলো, যা তুমি ছাড়া কেউ শোনে না। আর তানজিনাকে নিয়ে তুমি অস্বাভাবিকভাবে প্যারানয়েড হয়ে আছো। আমার তো তানজিনাকে খুব ভালো লাগে।”
হ্যাঁ, নাবিলার কাছে সে অবশ্যই ভালো। নাবিলা তো ওর অকারণ প্রতিহিংসার টার্গেট না।
“নাবিলা।” আমি হাত দুটো মেলে ধরলাম— দু’হাতের জায়গায় জায়গায় আর বুকের মাঝখানটা লাল হয়ে আছে। “শরীরের সব জায়গায় এটা থাকলে যে কেউই পাগল হয়ে যাবে। ব্যাপারটা আমাকে মানসিকভাবে আপসেট করে দিচ্ছে। তার ওপর চাকরির অবস্থাও খুব একটা ভালো না। বলো তো, এই অবস্থায় আমি কি সত্যিই মানসিকভাবে এমন জায়গায় আছি যে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম বা অ্যাফেয়ার করব?” আমি ঝুঁকে ওর চোখের দিকে তাকাতে চাইলাম। “আমাকে কে ভালোবাসতে চাইবে? এখন তো আমাকে দেখে মনে হচ্ছে, চর্মরোগের ডাক্তারের চেম্বার থেকে এইমাত্র বেরিয়ে এসেছি!”
কথায় কাজ হলো বোধহয়। হঠাৎ ওর মুখে হাসির রেখা দেখা গেল। এই সুযোগে বিছানায় ওর পাশে বসলাম। ও আমাকে হাত ধরতে দিল। যদিও এই মুহুর্তে ওকে জড়িয়ে ধরার সাহস পাচ্ছি না।
“এই র্যাশটা আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে, নাবিলা,” আমি বললাম। “জানি, কাপড়ে লিপস্টিক লেগে থাকার ব্যাপারটা ভালো দেখাচ্ছে না। কিন্তু আমি আল্লাহর কসম কেটে বলছি— আমি জানি না এটা কোথা থেকে এসেছে। আমি আমার বাবার কসম খাচ্ছি।” আমি ঠোঁট কামড়ালাম। “তুমি বিশ্বাস করছ তো আমাকে?”
ওর উত্তরের অপেক্ষায় আমি নিশ্বাস আটকে রাখলাম
“আমি... আমি মনে হয় বিশ্বাস করছি,” নাবিলা শেষ পর্যন্ত বলল। “সত্যি বলতে, তোমাকে অন্য কোনো মেয়ের সাথে আসলেই কল্পনা করা যাচ্ছে না। তুমি তো পাঁচ সেকেন্ডের জন্যও চুলকানো থামাতে পারছ না।”
ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম। “ঠিক তাই। অন্য কাউকে চুমু খাওয়ার ইচ্ছাও আমার নেই। আমার শুধু ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন আর ভালো একটা মলম দরকার।”
নাবিলা হেসে উঠল। “আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ। তাই তো আমি নিজেই তোমার কাপড়গুলো লন্ড্রি করতে চেয়েছিলাম।”
“ঠিক আছে,” আমি রাজি হলাম। “তবে একটা কথা। এটা যেন পার্মানেন্ট সলিউশন না হয়ে যায়।”
মনে মনে বললাম, তানজিনাকে যাতে আমরা খুব তাড়াতাড়ি আমাদের বড়ি থেকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করতে পারি।
কিন্তু এখন আমার ভয় হচ্ছে— এই ঘাড়ধাক্কার ঘটনাটা হয়তো খুব শিগগির ঘটবে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………