প্রহরের চেঁচামেচিতে ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে পিঠে দু ঘা লাগিয়ে দেয় পাতা। ব্যস চেঁচামেচি খতম। কাহিনী এখানেই শেষ নয়। প্রহর টলমলে চোখে তাকিয়ে গাল ফাটিয়ে কান্না শুরু করে দেয়। পাতা তাঁর কান্নায় গললো না। উল্টো আরেকটা চড় মেরে গায়ে সাবান ঘষে গোসল করিয়ে দেয়।
“পাঁচ বছরের বুড়ো বাচ্চা এখনো বিছানা ভেজায়। লজ্জার কথা না? আর এনার লজ্জা নেই। লোকে শুনলে ছিঃ ছিঃ করবে।”
প্রহরের কান্না আরও বাড়ে। সে কি ইচ্ছে করে বিছানা ভেজায়? সে তো দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমেই শিশি দেয়। কিন্তু সকালে ঘুম ছাড়লে ওয়াশ রুম বিছানা হয়ে গেলে তাঁর কি দোষ!
দরজা ধাক্কাধাক্কির আওয়াজ আসছে। পাতা গুরুত্ব দিলো না। প্রহরকে গোসল করিয়ে গা গতর মুছে দেয়। তোয়ালের দুই অংশ কোমড়ে গিঁট্টু মেরে বলল,
“পাপার কাছে যাও মাথা মুছে দিবে। কি হলো, যাচ্ছো না কেন?”
প্রহর মায়ের দিকে তাকিয়ে ফোঁপায়। তারপর একছুটে পালায়। মাম্মামের সাথে প্রহরের কাট্টিবাট্টি। আর মাম্মামের সাথে ঘুমাবে না সে। ভাইটুসের কাছেই থাকবে। দরকার পড়লে একাই থাকবে। ছিটকিনির সাথে যুদ্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে বাবার বুকে হামলে পড়ে প্রহর।
“কি হয়েছে ছোট সরকারের? কাঁদছে কেন?”
প্রহর কিছু বলে না। কাঁদতেই থাকে। অরুণ সরকার আর শুধালো না। কোলে তুলে বিছানায় দাঁড় করিয়ে দেয়। শুকনো তোয়ালে এনে মাথা মুছিয়ে দেওয়ার সময় খেয়াল করে ফর্সা পিটে আঙ্গুলের ছাপ। কান্নার কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না। রাগ হয় পাতার উপর। সে ছেলের পিঠে চুমু দিয়ে বলল,
“পিঠে দাগ মুছে যাওয়ার আগে তোমার ভাইটুসকে একবার দেখাবে বুঝলে, ছোট সরকার?”
প্রহর তবুও কথা বলে না। গোলগাল মুখে টইটুম্বুর অভিমান। ভাইটুসকেও বলবে না। সে কাউকেই বলবে না। অরুণ প্রহরকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। ফুলো দুগালে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু দেয়। প্রহর তবুও হাসে না।
ভেজা কাপড়ের বালতি হাতে পাতা কটমট করে। অরুণ তাঁকে দেখেও দেখলো না। পাতা ঝগরুটে ভঙ্গিতে তেড়ে এসে বলল, “আপনি তো আচ্ছা কুচুটে! প্রহরকে কি সব উল্টাপাল্টা শেখাচ্ছেন।”
“আমি বললে তো কানে তুলো না। তাই যার কানে গেলে কানে তুলবে তাঁর কানেই দিতে বললাম। পিঠটা দেখো? কত জোরে মেরেছো!”
অরুণ প্রহরকে কোলে তুলে নিয়ে ছেলের উন্মুক্ত পিঠ দেখায়। পাতার মুখটা কালো হয়ে আসে। গোসল করবে না বলে জেদ করছিল, চেঁচামেচি লাগিয়ে দিয়েছিল। হাত পা ছুঁড়ে তাকেও আঘাত করছিল। অতিষ্ট হয়েই দু'টো লাগিয়েছে। এখন নিজেরই খারাপ লাগছে। পাতা ছেলের পিঠে হাত রাখতে নিলে অরুণ বাঁধা দিল,
“যাও নিজের কাজে যাও।”
পাতা ভ্রু কুঁচকে বালতি হাতে ছাদে চলে যায় কাপড় মেলতে। প্রহরের চোখে পানি চিকচিক করে। বাবার গলা ছেড়ে মুখোমুখি হয়ে বলল,
“পাপা, আজকে আমাকে তোমার সাথে অফিসে নিয়ে যাবে। ওকে?”
“জো হুকুম ছোটে সরকার।”
প্রহর হাসলো মিষ্টি করে। অরুণ ছেলের কপালে চুমু দিয়ে আবারও বিছানায় বসিয়ে দেয়। গায়ে বেবি লোশন লাগিয়ে কাতুকুতু দেয়। প্রহর কিটকিটিয়ে হাসে। অরুণ তাকিয়ে দেখে তার হাসি। প্রহর বড় দুজনের থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন। না কোনো প্রকার রাগ জেদ, না কোনো দুষ্টু স্বভাব। বিজ্ঞদের মতো যুক্তি দেখিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে জানে। খুবই নরম মনের, শান্ত-শিষ্ট একটা বাচ্চা। পুরাই পাতাবাহারের নেচার পেয়েছে। অভিমান করবে কিন্তু কাউকে বুঝতে দেবে না। তাঁর অভিমান ভাঙাও খুব সহজ। আদর করে ডাকলেই গলে পানি হয়ে যায়। এই তো সেদিন অরুণিতার ঘুঙুর নিয়ে খেলতে খেলতে কোথায় রেখেছে বলতে পারে না। অরুণিতা রেগে বোধহয় চড় মেরেছিল।প্রহর কাউকেই বলে নি সে কথা। উপরন্তু আপুইয়ের ঘুঙুর হারানোর অপরাধে মুখটা কালো হয়েছিল তাঁর। প্রহর তাঁর টমেটো আকৃতির মাটির ব্যাংকটি ভেঙ্গে ফেলে। সব নতুন কড়কড়া নোট। দুই টাকা থেকে শুরু করে একশ টাকার মধ্যের নোট গুলো। পাতাবাহার হাজার পাঁচশো টাকার নোট নিয়ে দশ টাকার গোলাপী রঙের দু’টো নোট দেয়। প্রহর তাতেই খুশিতে বাকবাকুম। যাইহোক প্রহর টাকা গুলো এনে তাঁর কাছে দিয়ে বলেছিল, ‘পাপা, আপুইয়ের জন্য সেম সেম ঘুঙুর কিনে এনো।’ অরুণ সরকার সেই টাকা গুলো নিয়েছিল। ভাইয়ের দেওয়া ভালোবাসা গুলোর বিনিময়ে ভাইয়ের আপুইকে স্বর্ণের ঘুঙুর গড়িয়ে দিয়েছে সে।
“পাপা?”
“বলো পাপা?”
“ভাইটুস আর আপুইয়ের মতো আমারও আলাদা ঘর চাই। আমি তোমাদের ঘরে থাকবো না।”
“কেন?”
অরুণ ছেলের গায়ে টিশার্ট গলিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো। প্রহর চুপ থাকলো। অরুণ প্রহরকে ফুল প্যান্ট পড়িয়ে বলল,
“পাপার তো তোমাকে ছাড়া ঘুম আসবে না, ছোট সরকার।”
“আমি তোমাদের ঘরে থাকবো না। আমি না থাকলে তো বিছানাও ভিজবে না। তোমাদের কষ্টও হবে না। মাম্মামকে রোজ রোজ বিছানাও পরিষ্কার করতে হবে না। মাম্মাম রাগবেও না।”
অরুণ হাসলো। ছেলেকে নিয়ে বেলকনিতে নিমন্তন্ন খেতে আসা একঝাঁক রোদের সাথে বসলো। প্রহর নামক পুঁচকেটা তাঁর অবেলাকে রঙিন বানিয়ে দিয়েছে। ছেলেকে কোলে বসায় অরুণ। গালে চুমু দিয়ে বলল,
“আমার পাপা, তুমি একা ঘুমাতে পারবে? ভয় করবে না, চড়ুই পাখির?”
প্রহরের মুখ চুপসে গেল, “আ’ল ম্যানেজ পাপা।আমি এখন বড় হয়ে গেছি না?”
পাঁচ বছরের পুঁচকে ছেলের কথা শোনো? এতো পরিষ্কার কথা বলবে! কোনো জড়তা নেই। ও যখন কথা বলে মনে হয়, হা করে শুনতেই থাকি। অরুণ আবারও আদর করে ছেলেকে। প্রহর হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল,
“ভালো হবে পাপা, তুমি যদি আমাকে একটা লাল টুকটুক বউ এনে দাও। বউটি সাথে থাকলে আমার ভয় লাগবে না।”
অরুণ সরকারের মুখটা দেখার মতো হয়েছে। ভোরের ছোটবেলায় সে খুব চাইতো ওইটুকুন বাচ্চাকে বিয়ে করিয়ে ঘরে লাল টুকটুকে আরও একটা বাচ্চা বউমা এনে পালতে। কিন্তু এখন তার কোনো শখ নেই। যদি সম্ভব হতো সে দুই ছেলের একটাকেও বিয়ে করাতো না। বউ আসবে মানে ছেলেকে ছেলেবউয়ের হাতে তুলে দিতে হবে। তাঁর অতি আদরের ছেলের উপর কোনো অপরিচিত মেয়ে এসে হক জমাবে সে তো সহ্য করতে পারবে না। তাই তাঁর চাওয়া হলো ছেলেদুটো অন্তত পক্ষে তাঁর মৃত্যুর আগে বিয়ে না করুক। নিজ ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয় অরুণ। ছেলে মেয়ে সারাজীবন তো আর বাবা মায়ের গন্ডিতে পড়ে থাকবে না। খুঁজে দেখলে পাওয়া যাবে বড় ছেলে তাঁর গার্লফ্রেন্ডকে বলছে, ‘বাবু তুমি না খেলে আমিও ভাত খাবো না।’ হাসে অরুণ। সত্যিই তাঁর কলিজার গার্লফ্রেন্ড আছে? কানাঘুষা তো তাঁর কানেও এসেছে। ছেলের ফর্ম ফিলাপ করাতে ভার্সিটিতে গিয়েছিল কি-না। তবে তাঁর মন তো ভিন্ন কথা বলে। ছেলের নজর তো বাড়ির আঙিনায় ঘুরেফিরে।
“ও পাপা, বলো না আমার জন্য শপিং মল থেকে বউ এনে দিবে? বউ কিন্তু মাম্মামের মতো সুন্দর হতে হবে। নইলে আমি এক্সচেঞ্জ নিবো।”
ছেলের কথায় ফোঁস করে শ্বাস ফেলল অরুণ। বলল, “বউ শপিংমলে পাওয়া যায় না ব্যাটা।”
“তাহলে কোথায় পাওয়া যায়?”
“শ্বশুরবাড়িতে।”
“আমাকে তাহলে শ্বশুরবাড়ি থেকেই বউ এনে দাও।”
প্রহর বাবার হাতের জেগে ওঠা রগ টেনে খেলা করে আর বলে। অরুণ সরকার ভাবে ছেলের মাথা থেকে বউয়ের ভুত নামানো দরকার। এখনই বউ বউ করলে বড় হলে কি হবে? সে বলল,
“আমার অবেলার প্রহর, আমার স্নো বয় ওলাফ! আমার কথা মন দিয়ে শুনবে। শুনছো?”
“ইয়েস পাপা। আ’ম হেয়ারিং!”
প্রহর বাবার হাতের রগে কামড় দিয়ে বলল। অরুণ ব্যথা পায় না। বরং ভালো লাগে। সে ফিসফিসিয়ে বলল, “বউ খুব ভয়ংকর প্রাণী, বুঝেছ প্রহর? ওদের হয়তো ভ্যাম্পায়ারদের মতো রক্ত চোষা দাঁত নেই কিন্তু ওঁরা ঠিকই ভ্যাম্পায়ারদের মতো বরদের রক্ত চুষে খায়। রোজ নিয়মকরে মাথা চিবিয়ে খাবে। অনেক ভয় দেখাবে। তোমাকে বিরক্ত করবে। আর তোমাকে মুখ বুজে সহ্য করতে হবে।”
“কি বলছো পাপা! সত্যিই? মানে মাম্মামও এমন?”
অরুণের ফিসফাস সুর প্রহরের ছোট্ট মনে ভয় জাগাতে সক্ষম। অরুণ হাসলো, “হ্যাঁ! জানো আমাকে কত্ত ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়?”
প্রহর মাথা নাড়ে, সে জানে না। অরুণ বিজয়ী হাসে। হঠাৎ কারো আক্রমণে ভড়কে যায়। আশ্চর্য বউ সত্যিই রাক্ষস হয়ে গেলো নাকি? সে প্রহরকে বলল,
“এই দেখো প্রহর। তোমার মাম্মাম কিভাবে আমার তাজা রক্ত খাচ্ছে?”
প্রহর তড়িৎ বেগে বাবার দিকে ফিরে। ওই তো মাম্মাম, পাপার ঘারে দাঁত বসিয়ে রক্ত খাচ্ছে। প্রহর কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, “আমার আর বউ চাই না।”
অবশেষে বউয়ের ভূত নামলো। পাতা অরুণের ঘার থেকে দাঁত কপাটি তুলে পিঠ পেছনে দাঁড়ায়। গলা চেপে ধরে বলল, “কি পড়ানো হচ্ছিল ছেলেকে হুঁ?”
“বেনিফিট’স ওফ বউ।”
“তাই না?”
অরুণ ঘার বাঁকিয়ে চায় পাতার দিকে। পাতা চোয়াল ঢেকে রাখা সাদা কালো মিশেলের চাপ দাঁড়িতে আঙুল দিয়ে চুলকে দেয়। বলে, “শুনে এসেছি শ্বাশুড়ি ছেলে বউকে সহ্য করতে পারে না। হিংসায় জ্বলে পুড়ে রাখ হয়। কিন্তু এখানে তো পাশা উল্টে গেছে। আপনিই বোধহয় প্রথম শ্বশুর যে ছেলের বউকে হিংসা করবে। সেম ওন ইয়্যু, ভোরের বাবা! আমি কিন্তু বউমাদের খুব স্নেহ করবো।”
অরুণ পাতার আঙুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে দেয়। পাতা তাঁর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে ঝুঁকে আসে। ছেলে সামনে ফিরলে লোকটার কামড় দেওয়া স্থানে ঠোঁট চেপে চুমু দেয়। অরুণ হাসলো। পাতা চেয়ার টেনে অরুণের কাছ ঘেঁষে বসে। অভিমান করে গাল ফুলিয়ে নেওয়া আদরের ছেলেকে জোর করে কোলে টেনে নেয়। গালে মুখে আদর করে বলে,
“ছোট বাবা রাগ করেছে? ছোট বাবার রাগ কি করে ভাঙাই বলুন তো, প্রহরের বাবা?”
অরুণ পাতার গাল টেনে বললো, “আরেকবার আমার ছোট সরকারের গায়ে হাত তোলার স্পর্ধা দেখালে তোমার হাত ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিবো। বুঝলে পাতাবাহার?”
প্রহর বাবার দিকে তাকায়। পাতা ছেলের মাথাটা বুকে চেপে ধরে। গালে ঘনঘন ঠোঁট ছুঁইয়ে পিঠ দুইয়ে দেয়। কান্নাভেজা কন্ঠে বলে, “মাম্মাম আর মারবে না। অনেক অনেক স্যরি। মাম্মামের স্যরি গ্র্যান্টেড করবে না?”
“স্যরি বলতে হবে না। আমি রাগ করি নি।”
পাতা ছেলের কপালে আঁছড়ে পড়া চুলে সরিয়ে চুমু দেয়। আবারও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে। প্রহর বাবার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। অরুণ সরকার ছেলের নাক টেনে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। পাতার কপালে টোকা দিয়ে বলল, “বড়জন বাড়ি ফিরেছে? নাকি এখনো ফোরটুয়েন্টি করে বেড়াচ্ছে?”
—————
পায়ে স্পোর্টস শু, মাথায় সবুজ ক্যাপ; গায়ে বাংলাদেশের জার্সি। জার্সির পেছনে গোটা অক্ষরে ‘ARUNAV’ লেখা। জার্সির নম্বর 17. হাতে শিকলের মতো ব্রেসলেট। ডান কানে মাঝারি আকারের রিং যা সদ্য পড়ানো হয়েছে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফকে উঁকি দিতে দেখা যায়। ডাগর ডাগর বিড়াল চোখে অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ। আঙুলের সাহায্যে চাবি ঘুরিয়ে হনহনিয়ে গাড়ির কাছে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবে পেছন থেকে ‘ভোর’ ডাক শোনা যায়। নিজেকে যথাসম্ভব সামলে অরুণাভ চাচি মনির দিকে ফিরে।
রুবি এগিয়ে এসে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। অরুণাভের আপাদমস্তক দেখে নেয় একবার। ছেলেটার বেশভুষায়ও কেমন উগ্রপণা। ভদ্র বাড়ির ছেলে হয়ে বখাটের মতো ভাব নিয়ে থাকে। সে কপালে ভাঁজ ফেলে শুধালো,
“কোথায় বেরুচ্ছো?”
“আপনি তো জানেনই। তাই উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন খুঁজে পাচ্ছি না।”
রুবি কটমট করে বলল, “আমি তোমাকে আগেই সাবধান করেছিলাম আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে।”
“এভরিওয়ান ফিলস মোর ড্রন টু ফরবিডেন থিংস। আপনি নিষেধ না করলে হয়তোবা ওর ভাবনা আমার মাথাতেই আসতো না। দ্য ফল্ট ইজ ইয়্যুর’স চাচিমনি।”
অরুণাভ খুবই চটপটে ভঙ্গিতে জবাব দিলো। রুবি থমথমে মুখে বলল, “দিন দিন বেয়াদব হচ্ছো ভোর!”
“আমি ছোট থেকেই বেয়াদব চাচিমনি। সাথে উগ্র, হিংস্র আপনার ভাষ্যমতে মেন্টালি সিক। সাম কাইন্ড ওফ সাইকো।”
“খবরদার আমার মেয়ের পেছনে লাগবে না। অরুর মতো আনিকাও তোমার বোন হয়।”
“সি’জ নট মায় সিস্টার। সি’জ মায় কাজিন। আর কাজিনের সাথে বিয়ে জায়েজ আছে।”
রুবি পারে না রাগে ফেটে পড়ে। সে কর্কশ গলায় বলল, “নির্লজ্জ ছেলে! আমি কিন্তু তোমার বাবাকে জানাতে বাধ্য হবো।”
“বড্ড উপকার হবে। লজ্জায় আমি আব্বুকে বিয়ের কথা বলতে পারছি না। আপনি জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।”
অরুণাভ বলে বলে ছক্কা হাঁকিয়ে গর্ববোধ করে। একটু আগে রাগে মাথা ফেটে যাবার উপক্রম হলেও এখন ফুরফুরে লাগছে। চাচিমনির রাগী রাগী চাহনি তাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছে। ইচ্ছে করে আরেকটু জ্বালাতে। কিন্তু ওদিকে চাচিমনির মেয়ে কোথাকার কোন কৈতরের সাথে আড্ডা দিচ্ছে কে জানে। সেখানে যাওয়া দরকার। সে গাড়িতে উঠে বসে। রুবি নীরব চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল,
“আনিকা তোমার কক্ষনো হবে না, ভোর। ভাগ্য তোমাদের কক্ষনো জুড়তে দিবে না।”
অরুণাভের ফুরফুরে মেজাজ বিষন্নতার অতলে তলিয়ে যায়। ম্লান হেসে বলে, “ভাগ্য না বরং আপনি চান না। আমি আপনার ধারনার মতোই খুব উশৃঙ্খল ছেলে। আনিকা যদি আমাকে চায়, ওকে আমার হতে কেউ আটকাতে পারবে না। কেউ মানে কেউ না।”
রুবি হাসলো। ছেলেটা এইখানটাতেই ধরা খেলো। অরুণাভ গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে। অরুণিতাকে ফাইল নাড়িয়ে গাড়ি থামাতে বলে। অরুণাভ গাড়ি থামায়। উইন্ড্রস্ক্রিণ নামিয়ে বলে,
“ভাবনা, কিছু বলবে?”
বাড়ির সবাই ‘অরু’ ডাকলেও ব্রো সবসময় ভাবনা বলবে। নামটা অরুণিতার খুব একটা পছন্দ না। সে ‘অরু’ ডাকটাই ভালোবাসে।
“আজ লাস্ট এক্সাম ছিলো। যদি আমাদের ড্রপ করে দিতে! আসলে আভারি কাকা নয়নকে নিয়ে হাসপাতালে গেছে। সেখান থেকেই ওকে স্কুলে নিয়ে যাবে। আমি পাপাকে বলতাম। তোমাকে বেরুতে দেখে ভাবলাম তোমার সাথে যাই।”
আদরের বোন বলবে আর অরুণাভ মানা করবে? এমনটা কক্ষনো হয় নি। আনিকাকে তো পরে দেখে নিবে। সে ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে বলল, “বসো গাড়িতে। আমিই পৌঁছে দিচ্ছি। এক্সাম ক’টায়?”
“দশটায়। দাঁড়াও আমি রূপ ব্রোকে ডেকে আনছি।”
বলেই রূপকে ডাকতে চলে যায়। একটু পরেই অরুণিতা আর রূপক সরকার এসে গাড়িতে বসে। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “ওই, তোর স্কুল ইউনিফর্ম কই?”
“লাস্ট দিন তাই পড়বো না। বন্ধুরা এক্সাম শেষ করে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছে। আমিও যাবো।”
রূপক কলার উঁচিয়ে ঘন ঘন চুল নেড়ে একটু ভাব নেয়। অরুণাভ বাঁকা হেসে বলল, “চাচিমনির থেকে পারমিশন নিয়েছিস?”
রূপকের মুখটা পানশুটে হয়ে আসে। সে রেগে বলল, “তুমি কিন্তু ভুলেও বলতে যাবা না। বললে আমি বলে আ’মা কে দিবো তোমার গার্লফ্রেন্ড আছে।”
অরুণাভ শব্দ করে হাসলো, “তোকে কে বলেছে আমার গার্লফ্রেন্ড আছে?”
“এসব কথা কেউ বলে না। বাতাসের সাথে ভেসে আসে বুঝলা ভাইয়া?”
“বুঝলাম।”
রূপক মুখ কষে। অরুণাভ ফ্রন্ট সিটে বসা বোনের দিকে তাকায়। সবসময়ের মতোই চুপচাপ আর গোমড়া মুখে বসে। তবে আজকের নিশ্চুপতা একটু ব্যতিক্রম। সে অরুণিতাকে বলল,
“ভাবনা বুড়ির মন খারাপ কেন?”
অরুণিতা মুচকি হাসলো ‘বুড়ি’ সম্বোধনে। উইন্ড্রস্ক্রিণে বাইরের ব্যস্ত শহরের দিকে দৃষ্টি অবিচল রেখে বলল, “মন খারাপ না। এমনিই ভালো লাগছে না।”
অরুণাভ বোনের কপালে হাত রাখে। নাহ্ জ্বরটর তো নেই। সে বিচলিত সুরে বলল, “ভালো লাগবে না কেন? কি হয়েছে?”
“কিছু না। এমনিই ভালো লাগছে না।”
অরুণাভ আর কিছু বললো না। ভাবনাকে বলেও লাভ নেই। ও বলবে না, জানা তাঁর। সে নিজেই বলল, “স্কুলে কিছু হয়েছে? আবারও কেউ ডিস্টার্ব করেছে? শুধু নামটা বলবে তাঁর ভর্তা বানিয়ে তোমার রেস্টুরেন্টের মেন্যুতে রাখবো।”
অরুণিতা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আবারও হাসলো। বড় ভাইদের ধারনা স্কুলের সব ছেলেরা তার বোনের পেছনে পড়ে থাকে। সব বড় ভাই-ই কি এমন? নাকি শুধু তাঁর ভাই এমন! সে হেসে বলল,
“তারপর পাপা আর তোমার তৃতীয় যুদ্ধ। যদিও যুদ্ধ আরেকটা লাগবে। আনিপু কিন্তু তৈমুর ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গেছে সাতসকালে। তৈমুর ভাইয়া বেশ হ্যান্ডসাম দেখতে। চাচ্চু ছবি দেখালো যে।”
শেষের কথাটুকু ফিসফিস করে বলে অরুণিতা। রূপ ভাইয়া না শুনতে পায়। অরুণাভ শক্ত চোয়ালে বলল, “কৈতরটাকে কি করা যায় বলতো?”
“উল্টাপাল্টা ভাবনা বাদ দিয়ে পাপাকে বলো। পাপা ম্যানেজ করে দিবে সব।”
একদম কার্যকরী উপায়। কিন্তু আব্বুকে বলতে পারবে না সে। বাকি পথ কথা হয় না। স্কুল গেইটের সামনেই গাড়ি পার্ক করে অরুণাভ। অরুণিতা, রূপক নেমে আসে। সাথেও অরুণাভও নামলো। ওয়ালেট বের করে বোনকে টাকা দেয়। রূপক এদিক ওদিক তাকিয়ে টিপ্পনী কাটলো,
“আমিও কি পাবো?”
অরুণাভ খুঁজে খুঁজে পাঁচ টাকার কয়েনটা বের করে বলল, “এটা দিয়ে ললিপপ কিনে খাস।”
রূপক ফোঁস ফোঁস করে বলল, “নিজের বোনকে তো ঠিকই পাঁচশো টাকা দিলে। আর আমাকে পাঁচ টাকা দিচ্ছো। পাঁচ টাকা তো ভিক্ষুকেরাও নেয় না। আমাকে হাজার দাও। আমি এসএসসি দিবো। বড়দের বেশি বেশি দিতে হয়।”
অরুণাভ হাজার টাকাই দিলো। রূপক খুশিতে গদগদ হয়ে জড়িয়ে ধরে। গেইটের কাছে গিয়ে দাঁত দেখিয়ে বলল, “ভাইয়া, আ’মা আমাকে আজ তিন হাজার টাকা দিয়েছে। সি লাভস মি লট।”
অরুণাভ হিংসাত্মক মনোভাব দেখালে রূপক হেসে কেটে পড়লো। অরুণিতা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। অরুণাভ বোনের মাথার বেঁকে যাওয়া ক্লিপ ঠিক করে দিয়ে বলল,
“কিছু বলবে?”
অরুণিতা উপর নিচ মাথা নাড়লো, “আমার বার্থডের কিন্তু বেশি দেরি নেই।”
“আই নো। এন্ড গেইস হুয়াট? আ’ভ ওলরেডি বউট আ গিফট ফর ইয়্যু। হোপ ইয়্যু উইল সারপ্রাইজড!”
থামে অরুণাভ। ছোট ছোট চোখে শুধায়, “এর আগে তো কখনো বার্থডে নিয়ে এক্সাইটেড হতে দেখি নি। হঠাৎ?”
অরুণিতা ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে সোজাসাপ্টা বলল, “এবার বার্থডে তে আমার মোবাইল চাই ভাইটুস। আমার সব ফ্রেন্ডসদেরই মোবাইল আছে শুধু আমার নেই। আমি কখনোই এভাবে সেধে কিচ্ছু চাই নি। তোমরা যা দিয়েছো নিয়েছি। এবার আমি নিজেই চেয়ে নিচ্ছি।”
অরুণাভের সহজ মুখটা গম্ভীর হয়। বোনের মাথায় হাত রেখে বোঝালো, “সবার থাকলেই তোমার থাকতে হবে এমনটা নয় ভাবনা। এখনও ছোট তুমি। বড় হলে তোমাকে বলতে হবে না আমরাই দিবো। রূপ এসএসসি দিবে ওকে কিন্তু ফোন দেওয়া হয় নি! বলা হয়েছে এসএসসির পর পাবে। তুমিও।”
অরুণিতা গম্ভীর মুখের পরিবর্তন নেই। সে আর টু শব্দ করে না। তাঁর ধারনা ছিলো সবাই নাকচ করলেও ভাইয়া তাঁর আবদার ফেলবে না। কিন্তু সে ভুল।
“এক্সামের জন্য লেট হচ্ছি।”
অরুণিতা চলে যায় হনহনিয়ে। অরুণাভ পিছু ডাকে শোনে না। ছোট্ট শ্বাস ফেলে বোনের পিছু যায়। হঠাৎ খেয়াল করে হা করে খোলা গেইটের একপাশে দু’টো ছেলে দাঁড়িয়ে। কলেজের হবে। গতবছর স্কুলে ইন্টারমিডিয়েট সেকশন খোলা হয়েছে। ছেলে দু’টোর অঙ্গভঙ্গি সুবিধার লাগছে না। অরুণিতাকে দেখেই কেমন বিশ্রী হেসে ফিসফাস করছে। সে এগিয়ে এসে শোনার চেষ্টা করে ছেলে দুটোর কথা।
“এই মোটা মেয়ে পুরাই খাসা মা*ল। কে বলবে সেভেনে পড়ে! ফিগার দেখ? ভোজপুরির নায়িকাদের মতো। বাপের খেয়ে ভালোই চর্বি জমিয়েছে। এরে পটাতে পারলে লাভ আছে। ওর হাঁটা দেখেই তো লোভ লাগে। মনচায় খাবলে ধরি! ইশ্”
এখানেই থেমে নেই। অপর জন বলল, “ভাই, পেছন থেকে দেখেই এই হাল? সামনে থেকে দেখলে তো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। দূর থেকে দেখেই দাঁড়িয়ে গেছে। ওই নরম নরম শরীর ছুঁতে…”
থেমে যায় ছেলেটা। সামনের যুবককে দেখে ঈষৎ ঘাবড়ে যায়। যুবকটা মেয়েটার ভাই হয়। সে কেন, স্কুলের প্রতিটি ছেলে জ্ঞাত আছে। সে শুকনো ঢোঁক গিলে সাফাই গাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু বলতে পারে না। মুখ থুবড়ে পড়ে যায় বালু মাটিতে।
অরুণাভ মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে নাক মুখ বরাবর ঘুষি মেরে যায় বিরামহীন। তাঁর রাগে লাল মুখটা খুবই হিংস্র লাগছে। দাঁতে দাঁত চেপে থেমে থেমে বলে,
“হাউ ডেয়ার ইয়্যু ব্রাস্টার্ড! ইয়্যু ব্লাডি বিচ! আ'ম গোন্না কিল ইয়্যু রাইট নাউ!”
শক্ত হাতের একেকটা ঘুষিতে কলেজপড়ুয়া ছেলেটা চোখে সর্ষে ফুল দেখে। চেঁচানোর বোধবুদ্ধি খুইয়ে ফেলে। দাড়োয়ান, স্কুল শিক্ষার্থী সহ অনেকেই ঘিরে ফেলে তাদের। অরুণিতাও ছুটে আসে। মুহুর্তেই হট্টগোল বেঁধে যায়। অরুণাভের হিংস্র আক্রমণের প্রেক্ষিতে কেউই বাঁধা দেওয়ার সাহস করে উঠতে পারে না।পাশের ছেলেটি বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। অরুণাভ হায়েনার মতো তার উপরেও হামলে পড়ে। রাগে চেঁচিয়ে ওঠে,
“সন ওফ বিচ! আ’ম গন্না ডিসট্রয় ইয়্যুর ফাকিং টেস্টিকেলস! হাউ ডেয়ার ইয়্যু লুট এক মায় সিস্টার? আ’ল টেইক ইয়্যুর ফাকিং আইস আউট।”
উপস্থিত অনেকেই বুঝতে পারলো ঘটনা। কেউ দৌড়ে যায় প্রিন্সিপালকে ডাকতে। অনেকেই সাহস করে অরুণাভকে ছেড়ে দিতে বলে। অরুণিতা এখনও আতংকিত চোখে দাঁড়িয়ে। ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসতে সময় নেয়। ভাইয়াকে তাঁর ভয় লাগছে। সে কালবিলম্ব না করে ভাইকে বাঁধা দেয়। গম্ভীর শক্ত ধাঁচের অরুণিতা ভয়ে কেঁদে ওঠে। ভাইকে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে ধরে বলে,
“ভাইটুস ছাড়ো। আমার খুব ভয় লাগছে। ছাড়ো না? মরে যাবে।”
অরুণাভের মাঝে ছাড়ার হাবভাব ঠাহর করা গেল না। অনেকেই এগিয়ে এসে অরুণাভকে টেনে তুলে। অরুণিতা ভাইকে শক্ত করে জাপটে ধরে বিড়বিড় করে বলে, “ভাইটুস প্লিজ স্টপ। ফর মায় সেক, কাম ডাউন। ভাইটুস প্লিজ?”
অরুণাভের ভেতরে এখনও দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। রাগের দরুন কাঁপছে, ফোঁস ফোঁস শ্বাস নিচ্ছে। অরুণিতা আরও শক্ত করে চেপে ধরে ভাইকে। মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ছেলে দু’টো। একজনকে নড়তে চড়তে দেখা গেলেও অপরজনের নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে না। প্রিন্সিপাল সহ সকল টিচার ছুটে এসেছে। স্কুলের অধিকাংশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলো। ভিড়ের কেন্দ্রে অরুণিতা ভাইকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। অরুণাভ একহাতে বোনকে জড়িয়ে নেয়। অরুণিতার এক বান্ধবী ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো,
“এই মোটু কি হয়েছে?”
শান্ত হয়ে আসা অরুণাভ আবারও গর্জে উঠলো। মেয়ে বলেও বিন্দুমাত্র নমনীয়তা পেলো না। উপরন্তু কঠোর চিত্তে ধমকে উঠলো, “এ্যাঁই মেয়ে? মোটু কাকে বলছো? হাউ ডেয়ার ইয়্যু? লজ্জা করে না বন্ধুকে বডি শেমিং করতে? আরেকবার শুনলে থাপড়ে মুখের নকশা বদলে দিবো। মাইন্ড ইট!”
মহল পুরো বিগড়ে আছে। স্কুলের আনাচে কানাচে কন্ট্রোভার্সি। টিচাররা একেকজন একেকরকম জ্ঞান বিতরণ করছেন। প্রিন্সিপাল স্যার তাদের কথা শুনেও প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না। এই শীতে তিনি ফ্যান ছেড়ে বসে আছেন। তিনি কোনদিকে যাবেন ভেবে পাচ্ছেন না। এই ঘটনার জন্য তার স্কুল কতটা বাজে ট্রলের শিকার হবেন ভাবতেই বুক চেপে আসে। ছেলে দুটোর মধ্যে একজনের অবস্থা খুবই নাজুক। কি যে হবে! তিনি ল্যাপটপ অন করে ভিডিওটি আবার দেখেন। কি হিংস্রভাবেই না মারছে ছেলে দুটোকে। অরুণ সরকার তো ভদ্রলোক। অথচ ছেলেটা পুরাই জল্লাদ!
সময়ের গড়িমসি হলেও এক্সাম চলছে পুরোদস্তুর। ভাবনার সিট পড়েছে নিচ তলার এক ক্লাসরুমে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে খাতায় উত্তর লিখে। একটু পরপরই জানালা দিয়ে বারান্দায় তাকায়। ভাইকে দেখে স্বস্তি পায়। অরুণাভ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। যায় নি সে। অরুণিতার এক্সাম শেষ হলে সাথেই নিয়ে যাবে। খালি দাঁড়িয়ে থাকতে একঘেয়েমি লাগে বিধায় পায়চারি করে। হঠাৎ চোখ যায় বারান্দার অপর মাথায়। একদল যুবক হকিস্টিক, ব্যাট, স্ট্যাম্প হাতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। অরুণাভ বুঝতে পারে তাদের আগমনের কারণ। সে বারান্দা থেকে মাঠে নেমে আসে। অরুণিতা যেন দেখতে না পায় তাঁকে। লেখা যাবে পরীক্ষা ফেলে ছুটে এসেছে।
ছেলেগুলো এগিয়ে আসে। হকিস্টিক ঘুরিয়ে বলে, “আরে এ তো বাচ্চা ছেলে! তুই সিওর এই মেরেছে আমাদের সবুজকে?”
“আরে ভাই এই ছেলেটাই। ভিডিও দেখালাম না?”
দলনেতা জাকির, অরুণাভকে দেখে চেনার চেষ্টা করলো। অরুণাভ ক্যাপ ঘুরিয়ে পেছনে সরিয়ে দেখার সুবিধা করে দেয়, “আমিই মেরেছি বিচ দুটোকে। কোনো সন্দেহ?”
দলনেতা ভ্রু কুঁচকে চাইলো। এই হ্যাংলাটা মেরেছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। একেও তো বাচ্চাই লাগছে। সে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “শালাবাবু, তোর বোনকে একটু ডেকে আনতো? বলিস দুলাভাই এসেছে __ আরে আরে রাগছিস কেন?”
অরুণাভ দলনেতার কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল, “আমার বোনকে নিয়ে একটা কটু কথা বলে দেখ? তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো।”
ত্রিশোর্ধ্ব জাকির বাঁকা হেসে ধাক্কা দেয় অরুণাভকে। সে কয়েক কদম পিছনে যায়। জাকির পেশিবহুল হাত তোলে, ঘুষি মেরে সুশ্রী যুবকের মুখের নকশা পাল্টানোর জন্য। কিন্ত পারলো না নকশা বদলাতে। কেউ তাঁর শক্তপোক্ত ঘুষি মুঠোয় ভরে থামিয়ে দিয়েছে। সে ভ্রু কুঁচকায়। অরুণাভ অবাক চিত্তে বাবার রাগে লাল গম্ভীর মুখের দিকে তাকায়।
অরুণ সরকার হাত মুচড়ে ধরে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে, “আমার কলিজা সে। এতোই সহজ তাঁর গায়ে হাত তোলা? হাতটাই না গায়েব হয়ে যায়, সাবধান!”
জাকিরের চ্যালারা হৈ হৈ করে তেড়ে আসে। অরুণ সরকার ছেলের সামনে ছেলেকে আড়াল করে দাঁড়ায়। গায়ের কোর্ট আর হাত ঘড়ি খুলে নিলো। শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে বলল, “আমি ঝুটঝামেলা পছন্দ করি না। কিন্তু ঝুটঝামেলা কাছে আসলে অনাদরও করতে পারি না। এসেছি সব মীমাংসায় বসতে। এখন তোরা ঝামেলা করলে কেস খেয়ে যাবি। কত টাকা দিয়ে ভারা করেছে তোদের? আমি ট্রিপল দিবো।”
চ্যালাপ্যালা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। সোজা ট্রিপল? জাকির নামক দলপতির মুখের রং বদলায়। মাথা চুলকে বলে, “এটা তো নেমকহারামি হবে!”
অরুণ সরকার ক্ষীণস্বরে হেসে বলল, “তোরা দেখছি ঈমানদার গুন্ডা! আজকাল ঈমানদার লোক খুব কম পাওয়া যায়।”
“পাপা, ডায়লোগবাজি কম করো। আর একশনে যাও না? আমি ঢিসুম ঢিসুম দেখবো।”
দূর হতে প্রহর চেঁচিয়ে উঠলো। অরুণাভ তাঁর দিকে তাকালো। ওলাফ যে! গুন্ডাগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলে অরুণকে বললো, “টাকা দিতে হবে না। আপনার ছেলে যাকে মারছে সে আমার আত্নীয়ের ছেলে। ফোন দিয়ে বললো ঘটনা। সিসিটিভি ফুটেজ দেখলাম। রাগ নিয়ে এসেছি মেরে হাত পা ভেঙ্গে দিবো। আপনাকে দেখে ভদ্রলোক মনে হচ্ছে কিন্তু আপনার ছেলে হিংস্র পশুর মত।”
“এমনি এমনি তো কাউকে মারতে যাবে না, তাই না? আপনার বোনকে নিয়ে বাজে কথা বললে আপনিও এর থেকে বেশি হিংস্র হয়ে উঠতেন মিস্টার।”
অরুণের কথায় জাকিরের মনটা গললো। তাঁর ঘরেও তো মা বোন আছে। তার মা বোনকে নিয়ে কথা বললে সেও রাগতো। তবুও জাকির আরো কতক কথা শুনিয়ে দলবল নিয়ে চলে গেলো। অরুণ সরকার ছেলের দিকে ফিরে। আকস্মিক গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে রাগত স্বরে বলে,
“পাগল তুমি? দু’টোর কাছে তিন চারটে চড় দিতে, এনাফ হতো। কিন্তু তুমি তো তুমিই! দুটোই আইসিইউতে ভর্তি। একজনের অবস্থা খুবই নাজুক। এদিক সেদিক হলে তোমার ক্রিকেটের ক্যারিয়ার শেষ। এ্যাঁই ছেলে, এতো কিসের হিংস্রতা হ্যাঁ? এতো পাগল কেন তুমি?”
অরুণাভ ঘার ডলে এদিক ওদিক তাকায়। রাগে নাকি অভিমানে জানা নেই। চোখের কোটরে নোনাজল জমতে চায়। সে সন্তর্পণে লুকিয়ে নিয়ে বলল, “আমার কাছে আমার বোন আগে, ক্যারিয়ার না। আমার বোনের দিকে বাজে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা প্রত্যেকটিকে খুন করে ফেলবো। তুমি বুঝবে না ওই ছেলে দু'টো যখন ভাবনাকে নিয়ে নোংরা কথা বলছিল আমার ভেতরে কি বইছিলো। ওদের নাম নিশাণ মিটিয়ে দিতে পারলে শান্তি পেতাম আব্বু।”
অরুণ ক্লান্ত চোখে তাকায় ছেলের দিকে। অরুণাভ বাবার পেছনে থাকা বোনের দিকে তাকিয়ে। কাঁদছে কেন? কেউ কিছু বলেছে কি? সে ইশারায় কাছে ডাকে। অরুণিতা এগিয়ে আসে। ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয়। অরুণ সরকার দেরি নাক করে মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে নেয়। কপালে সস্নেহে চুমু দিয়ে বলল, “ভয় নেই সোনা। পাপা আছি তো।”
“তুমি ভাইটুসকে কিছু বলো না পাপা। সব দোষ ওই ছেলে দু’টোর।”
ভাই পাগল মেয়ের কথায় অরুণ ছেলের দিকে তাকায়। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারা গেলো না। এতো হিংস্রতা কোথা থেকে পেলো? সে তো এতোটা হিংস্র নয়।
—————
বারান্দায় ঝুলন্ত দোলনায় দুলছে অরুণাভ। চোখে মুখে গম্ভীরতা। বাড়ির পরিস্থিতি থমথমে। আব্বু তাঁর বাইরে যাওয়া বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। সে হম্বিতম্বি দেখালেও কাজে দেয় নি। একা একা বিরক্ত লাগছে। টুটুলের কথা মনে পড়ছে। ছেলেটা তাঁর ফোন ধরছে না। নিশ্চয়ই সকালের ঘটনায় রাগ করেছে। সে ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে কতকগুলো টেক্সট পাঠায়। সিন হয় না। অথচ এক্টিভ দেখাচ্ছে। অরুণাভ দাঁত কটমট করে। শা*লা না জানি কোন মেয়ের ইনবক্সে গিয়ে লুতুপুতু করছে। ওর সাথে কথা হলে আগে ওর ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড নিতে হবে। তারপর লগিন করে সব মেয়েদের আনফ্রেন্ড করে দিবে। আনফ্রেন্ড না, এক্কেবারে ব্লক মেরে দিবে। অরুণাভ টুটুলের ফেসবুক আইডি ঘাঁটছিল আর রাগে ফুসছিল। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। আননোন নাম্বারটা কার অরুণাভ জানে। রিসিভ করার ইচ্ছা হয় না বিধায় কেটে দেয়। কিন্তু ফোনের ওপাশের ব্যাক্তি লাগাতার ফোন করছিল। বিরক্ত হয়ে রিসিভ করে বলল,
“কল কেটে দিচ্ছি তার মানে আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার। বলেছি না আমাকে কল করবেন না? নাম্বার ব্লক করতে করতে আমি হাঁফিয়ে গেছি।”
নাহ্ অনেক হয়েছে। নিজ নাম্বার চেঞ্জ করা ছাড়া উপায় নেই। ফোনের ওপাশের ব্যক্তি তাঁর বিরক্তি বুঝতে পেরেও বললেন,
“বরুন, আমি তোমার মা। এভাবে কথা বলছো কেন? তোমার জন্য মন কাঁদে তাই তো বারবার কল করে বিরক্ত করি।”
অরুণাভ চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত রেখে বলল, “আমারও একসময় মন কাঁদতো। কথা বলতে চাইতাম কিন্তু তখন দু'টো মিনিট কথা বলার সময় পেতেন না আপনি। বাহানা দেখিয়ে কল কেটে দিতেন। আমি তবুও কানে ফোন চেপে রাখতাম। আর হ্যাঁ আমার মা নেই। আমার একজন সুইট আম্মু আছে। আর সে আমার কাছেই আছে। আমাকে বিরক্ত করবেন না।”
বর্ষার মুখটা ম্লান হয়ে আসে। প্রসঙ্গ বদলে বলে, “আজকে বিকেলে তোমার আসার কথা ছিলো বরুন। তুমি কি আসবে না? আমি তোমার অপেক্ষায় আছি।”
“ঝামেলায় আছি আমি আজকে যেতে পারবো না। অন্যদিন চেষ্টা করবো।”
“কি ঝামেলা হয়েছে বরুন?”
“ডোন্ট কল মি বরুন এগেইন। আ’ম অরুণাভ সরকার।”
“রাগছো কেন? আমি তো তোমাকে ছোট থেকেই বরুন ডাকি।”
অরুণাভ মুখের উপর কল কেটে দেয়। এমনিতেই মুড খারাপ তাঁর উপর এসবে মুখটা তেতো হয়ে গেছে। চা খাওয়া দরকার। সে দোলনা ছাড়তেই খেয়াল করে দরজায় অরুণিতা দাঁড়িয়ে। অরুণাভ একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ভাবনা কি তার আর মায়ের কথোপকথন শুনে নিয়েছে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………