হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ০৪ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          সবই তোর কপাল আইরিন, পোড়া কপাল! তা না হইলে বিয়ের আসর থেকে উঠতে না উঠতেই নয়া জামাই এমনে ঘর ছেড়ে বাইরে ঘোরে? একবার ভাবে না মানুষে কী কইব! আমি তো তখনই কইছিলাম জামাইয়ের মুখটা একদম তিতা করলার মতো হইয়া আছে। মনে হয় তোর মুখ দেইখাই ভড়কাইয়া গেছে গা।

​ফুপু একটু থেমে আইরিনের দিকে আড়চোখে তাকালেন। সে ততক্ষণে বিয়ের বেনারসি ছেড়ে একটা আরামদায়ক সুতি শাড়ি পরে নিয়েছে। গয়নাগুলো ড্রেসিং টেবিলের ওপর অবহেলার সাথে পড়ে আছে।

​ফুপু আবার শুরু করলেন, 
শহরের শিক্ষিত পোলা তো, হয়তো কোনো মাইয়ার সাথে পিরিতি আছে। এখন তোর বাপের ডরে আর ওই মেম্বারের চাপে পইড়া কবুল কইছে ঠিকই, কিন্তু ঘর করবো বইলা তো মনে হয় না। এই রাত-বিরাতে গ্রামে টো টো কইরা ঘুরতেছে, ঘরে ফেরার নাম নাই। তোর দিন তো শুরু হইতে না হইতেই শেষ হইয়া গেল রে। 
​আইরিন কোনো উত্তর দিল না। 

সে রান্নাঘরে ঢুকতেই কুলসুম বেগম থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি তখন কাঁচের বাটিতে মিষ্টি সাজাচ্ছিলেন। আইরিনকে এই অবস্থায় দেখে তাঁর চোখ কপালে উঠল।

​-একী! তুই বিয়ের শাড়ি-গয়না সব খুলে ফেললি কেন? এখনো সব বিদায় হয় নাই, আর জামাই বাবাজি তো বাইরে গেল। তুই ওনার সাথে খাবি তো!

​আইরিন চুলার পাশে রাখা বড় ডেকচির ঢাকনাটা খুলল। সুগন্ধি বাসমতী চাল আর খাসির মাংসের জম্পেশ কাচ্চির ঘ্রাণে সারা ঘর মৌ মৌ করছে। আইরিন থালা বের করতে করতে নির্বিকারভাবে বলল,
আমার ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে। এখন ওইসব মিষ্টি আর চটপটি দিয়া আমার পেট ভরবে না। আমাকে এক থালা কাচ্চি দাও তো। খেয়ে দেখি নিজের বিয়ের খাবারের স্বাদ কেমন হয়।

​কুলসুম বেগম আঁতকে উঠলেন। তিনি আইরিনের হাত থেকে থালাটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে বললেন, 
পাগলামি করিস না তো আইরিন! নতুন বর বাইরে থেকে ফিরলে দুইজনে একসাথে খাবি। কত সুন্দর করে বাসর ঘর সাজানো হইছে। বর-বউ একসাথে খাবে এইটাই নিয়ম।

​আইরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আলগোছে হাত থেকে থালাটা ছাড়িয়ে নিয়ে এক বড় চামচ কাচ্চি বেড়ে নিল।

-নিয়ম দিয়ে তো আর পেট ভরে না। আর তোমার জামাই বাবাজি যে মেজাজে বাইরে গেছে, সে কখন ফিরবে তার কোনো গ্যারান্টি নাই। ফিরে এসে সে আদৌ খাবে কি না, সেটাও সন্দেহ। আমি অহেতুক উপোস করে বসে থাকতে পারবো না।

​ঠিক এই সময়ে আইরিনের মেজ ফুপু রান্নাঘরে ঢুকলেন। পান চিবোতে চিবোতে তিনি আইরিনের এই কাণ্ড দেখে বিদ্রূপের হাসি হাসলেন,
দেখো ভাবী! মেয়ের আক্কেল দেখো! জামাই বাইরে রাগে না জানি গজগজ করতেছে, বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠতে না উঠতেই সে ঘরছাড়া। মানুষে তো বলাবলি শুরু করছে যে তোমাগো মেয়ের মুখ দেইখাই নাকি বর ভড়কায়ে গেছে। আর এদিকে রাজকইন্যা বরের তোয়াক্কা না কইরা বসে বসে কাচ্চি গিলতেছে! বেহায়া কোথাকার। 

​আইরিন ফুপুর দিকে একবার তাকাল। তার শান্ত চোখে কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরণের করুণা ফুটে উঠল।
-উনি তো আর কচি খোকা নন যে হারিয়ে যাবেন। গ্রামটা ওনার চেনা না, একটু হাওয়া খেয়ে মনটা শান্ত করে ফিরবেন হয়তো। আর ওনার যদি ফেরার ইচ্ছা না থাকে, তবে আমার না খেয়ে মরলে কি উনি ফিরে আসবেন? বরং খেয়ে নিই, রাতে ঝগড়া করার শক্তি পাবো।

​কুলসুম বেগম কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। কোথায় মেয়ে জামাইয়ের মন জয় করার পরিকল্পনা করবে, উল্টো ঝগড়া করার তালে আছে। আইরিন কাচ্চি নিয়ে চুলার কাছে পিঁড়ি পেতে বসে গেল।

খাওয়া শেষে গ্লাস ভরে পানি খেয়ে হাত ধুয়ে সে কামিনীকে ইশারা করল। কামিনী পাশে দাঁড়িয়ে অগোছালোভাবে থালাবাসনগুলো গুছিয়ে নিচ্ছিল। আইরিন ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, তোরাও খেয়ে নে। সমস্যা নেই। ফুপু শুধু আমার পিন্ডি চটকাতে তৎপর।

​কামিনী তটস্থ হয়ে তাকাল। ফুপু এরকম কথা শুনলে আব্বার কাছে নালিশ করতে দু'বার ভাববে না।
 আইরিন উঠে দাঁড়াল। ​দরজা খুলে নিজের ঘরের ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল সারা বিছানায় গোলাপ, গাঁদা আর রজনীগন্ধা ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামের বিয়েতে এই কড়া ঘ্রাণের ফুলগুলোই বেশি চলে, কিন্তু এই বদ্ধ ঘরে ফুলের গন্ধটা এখন ভ্যাপসা আর ভারী হয়ে আছে। সে সরাসরি জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঠের কপাটগুলো সশব্দে হাট করে খুলে দিল।

​বাইরে পৌষের গভীর রাত। জানালার পাল্লা খুলতেই কনকনে ঠান্ডা হাওয়া হুহু করে ঘরে ঢুকে এল। জানালার সাদা পর্দাগুলো বাতাসে উড়তে শুরু করল। বাইরের সেই হিমেল বাতাস আইরিনের সারা শরীরে এক ধরণের শিহরণ ধরিয়ে দিল। 

আইরিন ফুলের দিকে একবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর খাটের এক কোণে রাখা দুটো বালিশ নিজের দিকে টেনে নিল। সে ফুলগুলো একপাশে সরিয়ে জায়গা করে নিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। 

​আইরিনের মনে কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করছে না। বাইরের হিমেল হাওয়া আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে শুনতে সে চোখ বুজল। পৃথিবী একদিকে রসাতলে যাক, তার এখন শুধু শান্তির ঘুম প্রয়োজন।

—————

মাহির নিশিখালি গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছিল। কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশটা ওর বর্তমান জীবনের মতোই অস্পষ্ট। শীতের হাড়কাঁপানো বাতাস ওর শরীরে বিঁধছে, কিন্তু মাহিরের ভেতরের বাড়ন্ত ক্রোধ সেই ঠান্ডাকে ছাপিয়ে গেছে।

ওই মুহুর্তের চাপ কেটে যাওয়ার পর মস্তিষ্ক শিথিল হয় তার। কত বড় সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয়েছে তা পীড়া দিতে থাকে। চিন্তার সুতোগুলো জট পাকিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ঘৃণা হয় পলাতক বশিরের ওপর। যে নিজের জান বাঁচাতে মাহিরকে বলির পাঁঠা বানাতে দ্বিধা করেনি, তার কথা শুনে নিশিখালিতে আসা মাহিরের কাছে সবচেয়ে বড় অভিশাপ মনে হচ্ছে। এতক্ষণ নিশ্চয়ই ঢাকা পৌঁছে শান্তিতে আছে সে।

​কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতটা ছিল অন্য জায়গায়। মাহির বাঁশঝাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ল সেই পুকুরঘাটের কথা। সেই তামাটে শ্যামলা মেয়েটি, যার দিকে তাকিয়ে মাহিরের মনে হয়েছিল এই পাণ্ডববর্জিত গ্রামেও অপররূপ স্নিগ্ধতা আছে। মেয়েটি নিজের পরিচয় দিয়েছিল আয়না নামে। অথচ মাহির তাকে তিন কবুলের পর নিজের পাশে পেয়েছিল আইরিন পরিচয়ে। তবে কেন সে মিথ্যা নাম বলল? 

​মাহিরের মনে হচ্ছে সে একটা সাজানো নাটকের শিকার। তার মনে হচ্ছে আয়না বা আইরিন যেই হোক না কেন, পুরো পরিবারটাই চক্রান্তকারী। মাহিরের অসহায়ত্ব এখন রাগে রূপান্তরিত হয়েছে।

​সে একজন শিক্ষিত, সচেতন যুবক হওয়া সত্ত্বেও কেন এই আদিম শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করল? কেন সে গ্রামের ইজ্জত রক্ষার মতো হাস্যকর যুক্তির সামনে নিজের স্বাধীনতা, জীবন পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার বলি দিল? এই অসহায়ত্ব তাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে কোনো মানুষ নয়, বরং এক পাল্লা থেকে অন্য পাল্লায় বদলে যাওয়া এক বস্তুমাত্র।

—————

আফজাল মেম্বারের ভাষ্যমতে গ্রামের যে সরল, দুর্বল মনের মেয়েটিকে বিয়ে করে উদ্ধার না করলে গলায় দড়ি দিবে, তাকে বিয়ের রাতে টিভি ছেড়ে বাসর রাতের স্বামীর জন্য বরাদ্দ দুধে এনার্জি বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে দেখে মাহির বেশ আচম্বিত হলো। 

তার এই নির্লিপ্ত ভঙ্গি মাহিরের সব ধৈর্য ও গাম্ভীর্য এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, মাই গড, আপনার রুচি দেখে সত্যিই অবাক হচ্ছি। এদিকে আপনার, আপনার বাবার এই গ্রামের তথাকথিত ইজ্জত বাঁচানোর জন্য একজন মানুষকে ধরে বেঁধে আনা হলো আর আপনি সিনেমা ও খাওয়া দাওয়াতে ব্যস্ত!

সদর দরজার সামনে টেলিভিশনটা চলছে। ভলিউম কমানো থাকলেও পর্দায় ছায়াছবির দৃশ্য নাচছে। আর তার সামনে সোফায় পা তুলে বেশ আয়েশ করে বসে আছে আইরিন। 

তার চেহারায় কোনো শোক নেই, বরের জন্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগও নেই। মাহিরের মনে হলো, তাকে উদ্ধার করার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সে এই বিয়েতে সই করেছে, তা আসলে এক বিরাট তামাশা। 

-ক্ষুধা লেগেছে তাই খাচ্ছি। আর তুমি যে রাত আড়াইটা পর্যন্ত বাইরে ঘুরে বেড়াবে, সেটা তো আমার দোষ নয়। আমি তো ভেবেছিলাম তুমি হয়তো এই গ্রাম ছেড়েই পালিয়েছ। আর কবুল বলেই যে বর ঘর ছেড়ে পালায়, তার সাথে পাল্লা দিতে হলে একটু আধটু সাহস তো জমিয়ে রাখতেই হয়। তোমার বন্ধু বা আত্মীয়রা তো অলরেডি পালিয়েছে, তুমি কেন পড়ে রইলে?

এক রত্তি মেয়েটা কেমন অবলীলায় তাকে তুমি করে সম্বোধন করতে পারছে মাহির তা ভেবে পেল না। সহজ-সরল না ছাই!
-হুয়াই অন আর্থ উড আই রান? 

-মানুষের মাথায় যখন খুব চাপ পড়ে, তখন রক্তে অ্যাড্রেনালিন আর কর্টিসল হরমোনের বন্যা বয়ে যায়। তখন মানুষ হয় লড়তে চায়, না হয় পালাতে চায়। ওই সময়টায় মানুষের বুদ্ধি লোপ পায়, শুধু কাজ করে তার আবেগ। তাদের হুমকি-ধামকি ও সাথে কান্নাকাটি তোমার শরীরের ওই হরমোনগুলোকে চাঙ্গা করে দিয়েছিল। তখন তোমার নিজেকে মহান কোনো শহীদ মনে হয়েছিল যে একটা মেয়ের জীবন বাঁচাতে নিজেকে উৎসর্গ করছে।
​কিন্তু হরমোনের ওই জোয়ার বেশিক্ষণ থাকে না।
ওটা নেমে গেলেই মানুষ ঠান্ডা মাথায় বাস্তবতা বুঝতে শুরু করে। এখন রাত আড়াইটা, তোমার শরীরের সেই রাশ আরো অনেক আগেই শেষ। 
তাই এখন তোমার ভেতর রিগ্রেট বা অনুশোচনা শুরু হওয়ার কথা। সম্ভবত তুমি এখন বুঝতে পারছ কত বড় ভুল করেছ। পালিয়ে গেলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু আমার ধারনা তোমার আশেপাশে যথেষ্ট পাহারা ছিল। পালাতে গেলে ধরা পরে যেতে।

মাহির তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে মুখ সরিয়ে ফেলল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, আপনি নিজের মিথ্যা নাম কেন বলেছিলেন? 

আইরিন সময় নিয়ে বলল, মিথ্যা বলিনি তো। ডাকনাম কি নিজের নাম না? 

-কাউকে তো ভুলেও আয়না নামের উচ্চারণ করতে দেখলাম না। অথচ ডাকনামেই সবাই ডাকে। 

-আমি ব্যতিক্রম তাহলে। তাদের জিজ্ঞেস করো কেন ডাকে না। তবে তুমি চাইলে ডাকতে পারো।

মাহির ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটার কথাবার্তার কোনো ঠিক নেই। আইরিন আবার বলল,
 তাহলে কি তোমার আসল রাগ এই জায়গায়? কেন নাম জানলে কি আরো দ্রুত বিয়ে করতে রাজি হয়ে যেতে? আয়নাকে খুব পছন্দ হয়েছিল? 

-পছন্দ-অপছন্দের কথা আসছে কোত্থেকে? আমার অবাক লাগছে আপনার এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখে। একটা জলজ্যান্ত মানুষের বদলে অন্য একজনকে ধরে এনে আপনার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হলো! আপনি কি আদৌও বুঝতে পারছেন এটা কতটা অস্বাভাবিক? আপনি এই ঘরের মেয়ে। আপনার সামনে একটা আস্ত নাটক হয়ে গেল আর আপনি কি না দিব্যি এখানে বসে সিনেমা দেখছেন? আপনার কি কোনো বোধশক্তি নেই নাকি?

​আইরিন সোফায় পা দুটো গুছিয়ে নিয়ে মাহিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
​-অস্বাভাবিক? আমার কাছে এর চেয়েও বেশি অস্বাভাবিক লাগে যখন দেখি রাজিবের মতো একটা ছেলে বিয়ের আসর থেকে উধাও হওয়ার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু মাহির আহমেদের মতো একজন শিক্ষিত মানুষ মেম্বার চাচার হুমকির মুখে কবুল বলে বসে আছেন। আপনি যে বোধশক্তির কথা বলছেন, সেই বোধশক্তি আপনার কোথায় ছিল যখন আপনি নিকাহনামায় সই করছিলেন?

​মাহির এক কদম এগিয়ে এল। ওর রাগের পাল্লাটা এখন চরমে।
-আমি পরিস্থিতির চাপে পড়েছিলাম! আমি মানুষ হিসেবে একটা দায়বদ্ধতা অনুভব করেছিলাম আপনার কথা ভেবে। মেম্বার বলেছিল আপনি গলায় দড়ি দেবেন!

​আইরিন হাসল, 
গলায় দড়ি? আর আমি? আফজাল মেম্বার আপনাকে যা বলেছে তা তো আপনাকে জালে আটকানোর জন্য বলেছে। আর আপনিও সেই টোপ গিললেন। এখন এসে আমার ওপর রাগ ঝাড়ছেন কেন? এই যে বরের অদলবদল হলো এটা আমার কাছে জীবনের একটা অংকের মতো। রাজিব নেই, আপনি আছেন। রফিক সরকারের ইজ্জত বাঁচল, আপনার শহীদ হওয়া সফল হলো। এখন কান্নাকাটি করলে কি আপনি রাজিব হয়ে যাবেন? নাকি রাজিব ফিরে আসবে? 
এখন দয়া করে বাসর ঘরে যান। ঘরটা আমি গুছিয়ে রেখেছি, জানালাও খোলা। পৌষের বাতাস আপনার মাথা ঠান্ডা করতে সাহায্য করবে। আর হ্যাঁ ফুলটুলের তোয়াক্কা করবেন না ওগুলো স্রেফ সাজসজ্জা, আমাদের জীবনের মতো।

আইরিনের কথার পিঠে মাহির আর কোনো তর্কে জড়াল না। তার মনে হলো কথা বলে এই মেয়েকে হারানো অসম্ভব। সে রেগে ঝড়ের বেগে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো ব্যস, অনেক হয়েছে! এই মুহূর্তেই সে এই গ্রাম ছেড়ে চিরতরে হারিয়ে যাবে।
​কিন্তু হুট করেই তার হাতটা শিথিল হয়ে এল। বাইরের জমাট বাঁধা অন্ধকার আর কনকনে বাতাসের ঝাপটা জানালার কাঁচের ওপার থেকে তাকে যেন উপহাস করল। মাহির স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
 তার ক্লান্ত মস্তিষ্ক তাকে মনে করিয়ে দিল যে, আজ রাতটা তার জন্য এমনিতেই অনেক বড় বড় সিদ্ধান্তের এক গোলকধাঁধা ছিল। এর ওপর আরও একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক জোর তার অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া তার সারা শরীর ক্লান্তিতে অবশ হয়ে আসছে। এখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটু ঘুম।

​সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার খিলটা ছেড়ে দিল। আইরিনের দিকে আর ফিরেও তাকাল না সে। ধীরপায়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এল।

কামিনী দরজার ও পাশ থেকে উঁকি দিল। মাহিরকে যেতে দেখে বলল, দুলাভাইয়ের কি হয়েছে আপা?

-আয়নাকে তার পছন্দ হলেও, আইরিনকে সহ্য করতে পারছে না। এই আর কি! তুই ঘুমোতে যা।

​বাসর ঘরে ঢুকে মাহির আলো জ্বালল না। অন্ধকারে জানালার ওপার থেকে আসা চাঁদের আলোয় ঘরটা আবছা দেখা যাচ্ছে। সে বিছানাটার দিকে তাকাল। পরিপাটি করে সাজানো বিছানা, ওপরে ছড়িয়ে রাখা গোলাপের পাপড়িগুলো এই মুহূর্তে তার কাছে স্রেফ কতগুলো আবর্জনা মনে হলো। 

​মাহির এক মুহূর্ত ভাবল সে কি নিচে শোবে? কিন্তু তার শরীর এতটাই ভেঙে আসছে যে ওইটুকু ভদ্রতা দেখানোর শক্তিও তার নেই। সে তার পাঞ্জাবি আর জুতোটা কোনোমতে খুলে এক কোণে ছুড়ে ফেলল।
​এরপর কোনো দিকে না তাকিয়ে সে সটান বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ফুলের পাপড়িগুলো তার পিঠের নিচে খসখস করছে, কিন্তু মাহিরের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তার চোখের পাতা ঘুমে বুজে আসছে। ঘুমানোর ঠিক আগমুহূর্তে তার মনে হলো, আয়না ঠিকই বলেছে সে এখন ক্লান্ত, রিগ্রেট করার শক্তিটুকুও তার এখন নেই। 
তার এখন শুধু নিশ্ছিদ্র একটা ঘুম প্রয়োজন, যাতে সকালের বাস্তবতাকে সে নতুন করে সামলাতে পারে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp