বজ্রমেঘ - পর্ব ৩১ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প

বজ্রমেঘ - ফাবিয়াহ্ মমো
          আহত বাঘ যেভাবে পরাজয় মেনে নিশ্চুপ হয়, শোয়েবের মুখ তেমনি নির্বিকার। বুকের ভেতর জড়িয়ে রেখেছে সদ্য বিবাহিতাকে, যাকে বিয়ে করেছে মাত্র সাড়ে আট ঘণ্টা আগে। এমন দুরবস্থা আড়ালে, অগোচরে ঘটে গেছে, সে কিছুই টের পায়নি। ডানহাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল ওর মাথা। পিচ-ফল রঙা শাড়ির আঁচলটা ফস করে জায়নামাজে পড়ে গেল। ভ্রুঁক্ষেপ না করে শোয়েব আঙুল ডুবিয়ে দিল ওর চুলের গভীরে। মনে প্রশ্ন ঘুরছে, কীভাবে জ্বর এলো? কখন বাড়ল? গাড়িতে তো তেমন কিছু বোঝা যায়নি। তবে গাড়ির ভেতর ছিল ঘন অন্ধকার, ইনসাইড লাইটটা সে আজও জ্বালায়নি। মাথা নত করে শোয়েব ওর চুলে ঠোঁট ছোঁয়াল। হিম-কঠোর গলায় ধীরে বলল, 

  - আমাকে শুনতে পাচ্ছ? শাওলিন?

কোনো সাড়া এল না। চুলের গভীরে রাখা হাত সামান্য তুলে নিজের বুক থেকে ওর মাথাটা একটু উঠিয়ে ধরল। উজ্জ্বল আলোয় ধরা দিল ফ্যাকাশে, বিবর্ণ মুখ। জ্বরের দাহে সারামুখে রক্তিম আভা। ঠোঁটদুটো গোলাপি নয়, লালচে দেখাচ্ছে বেশি। কিছুক্ষণ আগেও সেখানে ছিল গাঢ় মেরুন রঙের ছোঁয়া। এখন কেবল দুর্বল তিরতিরে কাঁপন। এক মুহূর্ত স্থির থেকে শোয়েব নিজের মুখটা নামাল। নরম, জ্বরতপ্ত গালে ছুঁইয়ে দিল ক্লিনশেভ গাল। সুঠাম বুকের ভেতর ওকে আরও শক্ত করে টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, 

  - গাড়িতে যদি একবার জানাতে, ঢাকাতেই সব ব্যবস্থা করতে দিতাম। আজ রাতে তাড়াহুড়ো করে ফিরতামই না। আমার কাছে তোমার নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ শাওলিন। 

শাওলিনের দুটো শীর্ণ হাত কোলের ওপর পড়ে আছে। ক্রমশ থরথর করে কাঁপছে। শোয়েব ওর পিঠ থেকে হাত নামিয়ে কোলের ওপর সেই হাতদুটো ধরল। এক হাতেই দুটো হাতকে মুঠোবন্দি করে বলল, 

  - সব ঠিক করে দিচ্ছি। একটু ধৈর্য ধরো . .

কথাগুলো বলতেই কানের নরম কোণে ঠোঁট ছোঁয়াল শোয়েব। গালে গাল চেপে দিল সে। কানের কাছে উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই জ্বরের ঘোরে কেঁপে উঠল শাওলিন। তবু শোয়েব ওকে এতটুকুও বাহুপাশ থেকে ছাড়ল না। যদি এই মুহূর্তে শাওলিন চোখ মেলে দেখত, তবে বুঝত কতটা কাছে আছে ও। আছে এই মানুষটার। এই অচেনা, অজানা, স্বল্প, আধা, অপরিচিত পুরুষটার। ওকে শক্ত বাহুদূর্গে বেঁধে নিজের পেশিবহুল বুকে তুলে নিয়েছে শোয়েব। পরনে এখনো ডার্ক মেরুন শার্ট, কালো ফর্মাল প্যান্ট, কোমরে এখনো বাঁধা দামি কালো বেল্ট। পা দুটো বিছানার দিকে বাড়িয়েও হঠাৎ থেমে গেল শোয়েব। নীল চোখ দুটো ঘুরল বাথরুমের দিকে। কিছু একটা ভেবে সে সেদিকেই এগোল। ডান পায়ে দরজা ঠেলে ঢুকে গেল প্রশস্ত আধুনিক বাথরুমে। চারদিকে সাদা টাইলসের ঝলক, রূপালি বাথরুম সেটিংস, একপাশে বিশাল সাদা বাথটাব। শোয়েব হাঁটু গেড়ে বসল ভেজা মেঝেতে। ওকে কোলে বসিয়ে দেয়ালের হুক থেকে তুলে নিল শাওয়ার। বাঁহাতের থাবায় ওর গরম মাথাটা রেখে চালু করল নব। ঝমঝম করে ঠান্ডা পানি পড়তে লাগল শাওলিনের জ্বরতপ্ত চুলে। এলো চুল ছড়িয়ে পড়ল বাথটাবের বুকজুড়ে। দৃশ্যটা দেখাল যেন কালো মেঘরাশি সফেদ কোনো রাজ্যকে গ্রাস করে ফেলছে। শোয়েব তখনো নির্বিকার। নির্জীব চোখে তাকিয়ে আছে শাওলিনের মুখে। সময় কতক্ষণ কেটে গেল সে খেয়াল নেই। হঠাৎ শাওলিনের চোখের পাতা কেঁপে উঠতেই শোয়েব উদ্বিগ্ন গলায় বলল, 

  - চোখ খোলো শাওলিন। তাকাতে চেষ্টা করো! তাকাও!

শাওলিন চেষ্টা করছিল। চোখের পাতা মুহুর্মুহু কাঁপছে ওর, কিন্তু শরীরে শক্তি নেই একটুও। খানিকটা পর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় ও। চোখের কোণ ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা গরম অশ্রু। শোয়েব সেদিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল, 

  - খুব খারাপ লাগছে? ডক্টর রেজা ডাকব? 

চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল শাওলিন। উত্তরটা না সূচক জানাল ও। চিন্তা ও উদ্বেগে শোয়েব আবার প্রশ্ন করল, 

  - এখন কেমন লাগছে? মাথায় একটু আরাম পাচ্ছ?

চোখ খুলে অশ্রুপূর্ণ চাহনিতে তাকাল। মানুষটার হাতের ভরে মাথা রেখেছে, সেই সুক্ষ্ম অনুভূতিটা যেন খানিক ঠাহর করছিল। এবার হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল শাওলিন। স্বস্তির একফোঁটা হাসি ফুটল শোয়েবের মুখে। কিন্তু মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল, যেন ওই হাসিটার আয়ু ছিল দুই সেকেণ্ড সময়। ফের পূর্বাবস্থায় গম্ভীর হয়ে প্রশ্নটা করে শোয়েব, 

  - জ্বর এলো কীভাবে? আমি জানলাম না কেন? কেউ খবর দেয়নি কেন তুমি অসুস্থ? 

শাওলিন একটু আগের সেই হাসিমাখা মুখটা আবার দেখতে চাইল। সেই মুখ, যেখানে লোকটার নীল চোখ দুটো অদ্ভুত হাস্যোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। পুরুষ্টু অথচ নিষ্ঠুর ঠোঁটেও ফুটেছিল একটুকরো সুন্দর হাসি। কিন্তু এখন তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, ওটা বুঝি স্বপ্নই ছিল। হাসি আর হাস্যোজ্জ্বল চাহনি, দুটোই যেন এ মানুষটার অকল্পনীয় ভঙ্গি। যা সবসময় ধরা দিতে চায় না। শাওলিন দুর্বল কণ্ঠে বলল, 

  - পার্লারে . . যাবার আগে . . 

  - হুম। 

  - দুঘণ্টা . . 

  - দুঘণ্টা? 

  - ঝর্ণার নিচে . . 

  - ঝর্ণার নিচে ভিজেছ? 

  - হুঁ। 

  - পার্লারে যাবার আগে দুঘণ্টা? 

  - হুঁ। 

শোয়েব রাগে ভ্রুঁ কোঁচকায়। নবের হাত ভয়ংকর মুষ্টি পাকিয়ে যাচ্ছে। প্রবল চাপের জন্য আঙুলের গিঁটগুলো ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। শোয়েব ক্রোধ চেপে খুব সামলানো সুরে বলল, 

  - রেবা কোথায় ছিল? 

শাওলিন ওই প্রশ্নে ইতস্তত বোধ করে। কিছু বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু ঠোঁট ফাঁক করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। শোয়েব গম্ভীরভাবে নিশ্চুপ। রাগটাকে ওই ভঙ্গিতেই গিলে ফেলে সে। এক নিষিদ্ধ ইচ্ছে টের পাচ্ছিল শেকলাবদ্ধ মনে। প্রবল অমানুষী এক ইচ্ছে! ওই কাতর ঠোঁটদুটো তার ঠোঁটের মাঝে তুলে নিতে। তার ওষ্ঠযুগলের ওমে মিশিয়ে রাখতে। যেভাবে খানিক আগে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিল, ঠিক সেভাবেই রাখার ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু অবাধ্য মনকে শেকল পরালো সে। নিজেকেই শাষাল কঠোর ভাবে, ‘নিয়ন্ত্রণ করো ফারশাদ। ও অসুস্থ। অতো উন্মাদ হয়ো না!’ শোয়েব ভাবনার গভীরে কিছুটা হারিয়েছিল, হঠাৎ চোখ আঁটকে গেল। গলা আর কাঁধের সংযোগস্থানে, ছোট্ট একফোঁটা সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। একটি কালো তিল। পানির স্পর্শে তিলবিন্দুটি যেন অদ্ভুত লোভাতুর সৌন্দর্যে ফুটে উঠেছে। শোয়েবের মনে হঠাৎ এক অবাধ্য ইচ্ছা জাগল। যদি একবার ওখানে. . . পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। দীর্ঘ একটা দম ফেলে অমন ইচ্ছেটাকে দমন করল।

নবটা তখন বন্ধ করা হয়েছে। এর চেয়ে বেশি পানি দেয়া ঠিক নয়। ঠাণ্ডা বসে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
শোয়েব ওকে কোলে তুলে বিছানার দিকে হাঁটল। হাঁটার সময় শাড়ির ভেজা আঁচল বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে তার পা। নিচে তাকিয়ে বুঝল, শার্টের স্লিভের পাশাপাশি আঁচলটাও ভিজে গেছে। হঠাৎ থেমে গিয়ে বলল, 

  - পোশাকটা বদলানো যাবে? আঁচলটা ভিজে গেছে। এভাবে শোয়া যাবে না। 

শাওলিন ধীরে বলল, 

  - পারব।
  
  - নিশ্চিত?

  - হুঁ। 

  - ভেবো বলো। 

  - পারব আমি। 

  - ঠিক আছে। বদলে নাও। আমি এখানেই আছি। 

কথাটা বলতেই ওকে দাঁড় করিয়ে দিল। পায়ে পায়ে পিছিয়ে গেলে শাওলিন দেয়ালে ডানহাত রেখে দাঁড়াল। রুমের বাতিটা টাশ করে নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। আলমারি খুলে কিছু খুঁজতে লাগল শোয়েব। শাওলিন তার দিকে পিঠ দিয়ে বিছানা বরাবর দাঁড়ায়। কাঁপতে থাকা আঙুল খুব সাবধানে সেফটিপিনটা চাপ দিয়ে খুলে। আঁচলটা ফস করে পড়ল মেঝেতে। শোয়েব ডান কাঁধ বরাবর আড়দৃষ্টি ছুঁড়ল। দুটো সরু হাত ছিপছিপে কোমরের কাছে নরম শাড়িটা ধীরে ধীরে খুলে নিচ্ছে। আঙুলগুলো কাঁপছে, থমকে যাচ্ছে, তবু খুলে আনছে শাড়ির দৈর্ঘ্য-বহর। রাতের তরল আলো ওকে এঁকে দিয়েছে নিখুঁত ভঙ্গিমায়। তার ঘোর মাখা চোখ বুঝল, যে দৃশ্য দেখছে, তা দুর্লভ। কোনো পুরুষ ওকে এভাবে দেখেনি। এই মূর্তিতে, এই অবয়বে, এই ভঙ্গিমায় দেখার সুযোগ তারই হচ্ছে। এই নিঃসীম রাত যতটা বিহ্বলভাবে ওকে দেখাচ্ছে, প্রভাতের রোদ্দুর ওকে কতখানি স্নিগ্ধ করবে? বিকেলের যে আকাশ আবির রঙে লাল টকটক করে, সেই লজ্জাবেশে কেমন দেখাবে ওর মুখ? যখন চারধার চাঁদের স্নানে ভিজে যাবে, সেই স্নিগ্ধ তরলের কাছে কীভাবে ফুটবে ও? শোয়েব বিবশ চোখে তাকিয়ে থাকল। চারপাশ সম্বন্ধে বেখেয়াল বেমালুম। শাড়িটা খুলে রাখলে পরনে রইল ওর ব্লাউজ আর পেটিকোট। ব্লাউজের রঙ পিচ। হাতদুটো কনুই ঢাকা। পেটের কাছে সরু এক চিলতে অনাবৃত হয়েছে ফরসা ত্বক। হঠাৎ ওর খেয়াল হলো, বাথরুমে ঢোকার বা বাইরে যাবার কোনো শব্দ তো হয়নি। শুধু আলমারির কাছে অনেকক্ষণ যাবৎ খুটখাট শব্দ শুনেছে। কী মনে হতে পেছনে তাকাল শাওলিন, ধ্বক্ করে উঠল বুক! দুচোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল! লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। ওর পেছনে, ওর দিকেই থমকানো চোখৈ! শার্ট খুলে ফেলেছে। বুকের ভাঁজ সুস্পষ্ট, পেশি যেন আরো পাকানো। ডান বাহুতে সাদা-গজ ব্যাণ্ডেজ, কোমর থেকে খুলে নিয়েছে বেল্ট। বাঁহাতে সেই বেল্টটা প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে গোল চাকতি বানাচ্ছিল। শাওলিন হিম চোখে দুর্বলভাবে ঢোক গিলল। 

  - হয়েছে? 

শাওলিন উত্তরে মাথা নাড়ল। ওর ভাবমূর্তি দেখে দৃঢ়ভঙ্গির মুখটা অল্প শব্দে বলল, 

  - বিছানায় শুয়ে পড়ো।

  - পোশাক?

  - দরকার নেই। শুকিয়ে যাবে।

শাওলিন বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলাল। প্রচণ্ড হাঁ হয়ে বলল, 

  - বদলানোর কথা ছিল তো . . 

  - এখন দরকার নেই।

চাকতি পাকানো বেল্টটা আলমারিতে রেখে দেয় শোয়েব। ওর দিকে দৃষ্টি তাক করে বলল, 

  - কাঁপা হাতে পরা লাগবে না। কোনো দরকার নেই। শুয়ে পড়ো। 

এ কথা বলে শোয়েব বাথরুমে ঢুকে গেল। হতবাক শাওলিন চোখদুটো নত করে। যখন ও বিছানায় শুয়ে পড়েছে, ঠিক তখন বাথরুম থেকে বেরোল শোয়েব। খাটে ওঠার আগে ফিনফিনে পর্দা ঘেরা আব্রু ডানহাতে সরিয়ে ঢুকল। একবার হালকা স্বরে ডেকে দেখল, 

  - ঘুমিয়েছ? . . শাওলিন? 

শাওলিন বাঁদিকে গুটিশুটি পাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। শরীরজুড়ে কাঁপুনি। হাঁটু দুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে আনা, ভেজা চুল বালিশে ছড়িয়ে আছে। একটা নরম পশমি কম্বল দুহাতে খুলে ওকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয় শোয়েব। পাহাড়ে রাত বাড়লে ঠাণ্ডা নামে। কুয়াশায় ঢেকে যায় রাতের চেহারা। গা শিরশিরে আবহাওয়ায় নিজেও কম্বল টেনে শুয়ে পড়ল। তবে দূরত্বসীমা মানলো না। পিঠ দেয়া মেয়েটির সংস্পর্শে শোয়েব চলে এল দুর্বৃত্তের মতো। নিঃশব্দে তার সুঠাম বুকে ওর পিঠ মিশিয়ে দিলে আচমকা সিক্তভাব ঠেকল। বুঝল, চুলের পানি ভিজিয়ে দিয়েছে পিঠ। ব্লাউজটা ভেজা। আলতো হাতে পিঠের কাছটা হুক মুক্ত করল শোয়েব। প্রশস্ত বুকের ভেতর মিলিয়ে দিল উন্মুক্ত পিঠ। একটা হাত ওর মাথার নিচে ঢুকিয়ে, অন্যহাতটা রাখল পেলব পেটের ওপর। আঙুলগুলো যেন তুলোর শরীরে ডুবে যাচ্ছে, নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে ওঠা-নামা করছে ওর নরম দেহ। চোখদুটো গভীর আবেশে বুজে ফেলল শোয়েব। চোখ থেকে চশমা খুলে মাথার কাছে রাখল। চোখে নেমে এসেছে ক্লান্তির ঘুম। বুকের ভেতর জাপটে ধরল ঘুমন্ত মানবীকে। বিড়বিড় করে ঘুমকণ্ঠে বলে উঠল, 

  - এভ্রিওয়ান আই লাভ, আই হার্ট। পিপল লিভ মি অ্যালোন। কোঅপারেট উইদ মি, প্লিজ। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লুজ ইয়্যু সো স্যূন। 

—————

ঠিক সকালে ঘুমটা ভাঙল। কিছুক্ষণ কাটল দোটানায়, কোথায় আছে, কার ঘর, গতকালের স্মৃতি। ঘুমঘোর চোখ এপাশ-ওপাশ মেলে বিছানায় উঠে বসে শাওলিন। গা থেকে আলগোছে পশমী কম্বলটা সরে যায়। ডানহাতে মাথা চেপে পাশে তাকাল। জায়গাটা শূন্য। মানুষটা নেই। ঘরের ভেতরটা কোমল সূর্যকিরণে ঝলমল করছে। একটু পর বিছানা থেকে নেমে হাতমুখ ধুয়ে সোজা গোসল সারলো। শরীর থেকে জ্বরের শেষ চিহ্নটুকু পাহাড়ের সুশীতল পানিতে ধুয়ে-মুছে গেল। একটা আরাম বোধে আচ্ছন্ন হয় শাওলিন। গতকালকের ভেজা শাড়িটা ঘরের এককোণে শুভ্রদেহী ডিভানে মেলে দিয়েছে। ঘূর্ণনরত ফ্যানটার দিকে চেয়ে শাওলিন প্রথমবার এই বিশাল ঘরটার চতুর্দিকে চোখ বুলাল। ছিমছাম, শান্তি মোড়ানো এক টুকরো স্বর্গ। পায়ের নিচে কাঠের পরশ, দেয়ালজুড়ে অ্যান্টিক শিল্পকর্মের দৃষ্টিনন্দন ছবি, একদিকে গাঢ় কালচে রঙা কাঠ আলমারি, ঠিক তার পাশে একটি ওয়াক-ইন-ক্লোজেট। এই অদ্ভুত ব্যাপারটা প্রথম চোখে পড়ল। ঘরের মতো সুপরিসর জায়গায় দু সারিতে পোশাক সাজানো। ভেতর থেকে পোশাক বদলানো যায়। ডানদিকের সারিতে ওর পোশাক, বাঁদিকে সেই পুরুষটার। রুচিশীলতার সর্বোচ্চ সুন্দর প্রকাশ দেখল শাওলিন। ঠোঁটে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ছলকে ওঠে। দুহাতে অগোছালো বিছানাটা টানটান করে, পরনের শাড়িটা আরেকবার দেখে নিয়ে শাওলিন বাইরে বেরোয়। হাতের ডানদিকে লম্বা করিডোর, যেটি দানবাকৃতি বাংলোর মতো ভীষণ সুনশান। পায়ে পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে, সেই শব্দটাই যেন চারপাশে জানান দিচ্ছে। বুক ঢিপঢিপ করা অস্বস্তি নিয়ে নিচতলায় চলে আসে ও। হলঘর খ্যাত সুবিশাল ফাঁকা ঘরটা আজ নিস্তব্ধ। একমুহুর্ত মনে হলো, বাড়িতে কেউ নেই নাকি? সবাই কোথায় গেছে? চারপাশে উদ্বিগ্ন নয়ন ঘুরাতে হঠাৎ পা থমকে যায়। মাথায় ঘোমটা ঠিক করতে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখল বাইরে হইচই শব্দ। দমফাটা হাসির শব্দে সদর দরজার দিকে চোখ ঘুরল। 

ঘাসে ছাওয়া সুন্দর উঠোনে চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। শালবন গাছের আড়াল ভেদ করে জালিকাটা রোদ্দুর মাটিতে পড়ছে। চারপাশ শান্ত, স্নিগ্ধ, কেমন সুনিবিড় শান্তিপূর্ণ। চায়ের কাপে আরেকদফা চা ঢেলে নিতে হঠাৎ থমকায় তাহিয়া। মাঝপথে চা অর্ধেক ভরিয়ে সে উজ্জ্বল হাসিতে ডগমগ করে উঠে। এক চিৎকার দিয়ে ডাকে,  

  - শাওলিন! এই তুমি উঠে গেছ? আসো আসো, আল্লাহ! এবার ষোলকলা পূর্ণ। 

তাহিয়ার অমন উচ্ছল চিৎকারে অধরা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। দাদী বই পড়ছেন। দুই নাতবউয়ের সঙ্গে মিষ্টিমধুর গল্প করছেন। অধরা নিজের কাপটা পিরিচে ঢেকে ঝটপট শাওলিনের কাছে ছুটে যায়। পা দুটো খালি। সবুজ ঘাসের সুড়সুড়ি চাদরে শাওলিনকেও খালি পায়ে নামাল সে। কণ্ঠে উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা বইয়ে বলল, 

  - আসো শাওলিন। আমরা তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি। দুবার ডাকতে গিয়েও ডাকিনি। দেবর সাহেব বারবার নিষেধ করে গেছেন। 

নিষেধের কথা শুনে বিস্মিত হয় শাওলিন। কিন্তু অস্ফুটে কিছু প্রকাশ করে না। অধরা কবজি ধরে টানতে টানতে দাদীর কাছে চলে এসেছে। দাদীর পরনে ঘিয়ে রঙা শাড়ি। চোখে সোনালি ফ্রেমের চেইন ঝুলোনো চশমা। খুব মনোযোগ দিয়ে 'অনেক আঁধার পেরিয়ে' পড়ছেন। পাশে কারোর উপস্থিতি বুঝে চোখ তুলে ডানে তাকান। অমায়িক হাসিতে চোখের কোলে ভাঁজ ফেলে বলেন, 

  - ঘুম হয়েছে? 

মাথা সসংকোচে নত করে শাওলিন। সম্ভ্রম সুলভে বলল, 

  - জি, 

  - বসো। 

শাওলিন চেয়ার টেনে বসল। বাইরে খুব সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। গাছের নবীন পাতাগুলো তিরতির কাঁপনে দোল খাচ্ছে। দাদী আরেকবার ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকান। অসম্ভব মায়াবি লাগছে মেয়েটাকে। এই রূপে, এই বেশে, এই আবহে। ফারশাদ যদি একবার দেখে যেতো? কণ্ঠে চাপা আফসোস যুক্ত করে বলেন, 

  - ফারশাদ তো বেরিয়ে গেল। রাঙামাটির দিকে কী একটা ঝামেলা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে বলল আজ নাও ফিরতে পারে। তুমি দুটো দিন আমার কাছে থাকো। জ্বর এসেছে শুনলাম, এখন একটু কমেছে? 

বৃদ্ধার উষ্ণ আন্তরিকতায় যে কেউ নরম হয়ে যাবে। কথার ভেতর নির্জলা ঝর্ণার মতো আরাম মাখানো ওম। শাওলিন সংকোচ ভরা চোখে তার দিকে তাকাল। এই প্রথমবার লক্ষ করল দাদী যেন ওর প্রতি আগের চেয়েও কোমলসুচক। হ্যাঁ সুলভ মাথা নাড়িয়ে পরিষ্কার অথচ নিখুঁত স্বরে বলল, 

  - এখন জ্বর নেই। কালরাতের চেয়ে কিছুটা ভালো আছি। 

  - নাশতা আনতে বলি? কিছু খাও। ঔষুধ রেখে গেছে, না খেলে ও এসে বকাবকি করবে।

দাদীর কথায় ফিক করে হাসলো তাহিয়া। ঠোঁট টিপে শাওলিনের দিকে তেরছা ইঙ্গিতে বলল, 

  - দাদী কিন্তু বকাবকি দিয়ে কথা বন্ধ বোঝাচ্ছেন। রেগে গেলে একটা কথাও বলবে না। এমন উপেক্ষা করবে, যেন ওর সামনে তোমার কোনো অস্তিত্বই নেই। কাজেই, আবার ভেবে বসো না শোয়েব শান্ত বলে একেবারেই হিংস্র না। 

কথাটা বলেই হাসি চাপা দিয়ে বিস্কুটের পিরিচ টেনে নেয়। পাশ থেকে অধরার মুখ কিছুটা বিবর্ণ দেখাচ্ছে। যেন কথাটা এ মুহুর্তে বলাই বিপদ। একটা সন্দেহের বাষ্প শাওলিনের চোখে ঘনাতে দেখলে অধরা দ্রুত প্রসঙ্গটা চাল দিয়ে ঘুরাল,

  - ধ্যাত, কীসব বলেন ভাবী! হিংস্র আবার কী?মিথিলা ভাবীর মতো শুরু করলেন নাকি? উনারও এমন খোঁচাখোঁচি স্বভাব। সুযোগ পেলেই যাকে-তাকে খোঁটা দিয়ে বসেন। 

অধরার কথায় প্রথম প্রথম হেসে ফেলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেল তাহিয়া। সাবধানে ওর দিকে তাকিয়ে বিস্কুটে চিন্তিত কামড় দিল। অধরা উলটোদিকের চেয়ারে বসে নিজের বাঁদিকে আড় ইঙ্গিত করে। তাহিয়া বুঝতে পেরে বিস্কুট চিবোতে চিবোতে শাওলিনের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছে। মনে হল মেয়েটা সেভাবে কিছু বুঝেনি। দাদী তখন বই বন্ধ করে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছেন। কিন্তু অধরা চোখের ইশারায় যেন প্রশ্নটা বোঝাল, 

  - ওর সামনে এসব বলবেন না ভাবী! মেয়েটা যথেষ্ট বোঝে। চুপচাপ থাকলেও আঁচ করতে জানে। আপনি সাবধানে কথা বলুন। 

অপ্রস্তুত ঢোক গিলে তাহিয়া উদ্বিগ্নতা বোঝাল, 

  - মিথিলা ভাবী এলে তো বিপদ হবে। সে এখনো সবকিছু জানে না। যদি শোয়েবের বউ হিসেবে ওর নাম শোনে, তাহলে কী হবে ভেবেছ? 

অধরা ফ্যাকাশে মুখে নিভে যায়। নিভন্ত ভাব চোখেমুখে মাখিয়ে বোঝাল, 

  - গতবার চুপ থেকেছে, তার মানে এই নয় এবারও ঠাণ্ডা থাকবে। মনে হয় না ছেড়ে কথা বলবে। এবারও ওদেশ থেকে আসার সময় চিঠি নিয়ে এসেছে। 

কথাটা শুনে ভীষণ চমকে উঠল। ভয়ংকর রক্তশূন্য দেখাল তাহিয়াকে। সে আর বসে থাকতে পারছিল না। দাদীকে নাশতা আনার কথা বলে উঠি উঠি করছে, ঠিক তখনি খালি কাপ-পিরিচ নিয়ে অধরাও সঙ্গ বুঝল। দুজন একসাথে উঠোন ছাড়লে দ্রুত বাংলোয় প্রবেশ করল। ফাঁকা কোণ বেছে তাহিয়া উত্তেজিত গলায় বলল, 
 
  - ওই চিঠিটা শোয়েবের কাছে? 

  - হ্যাঁ ভাবী! কেন আপনি জানেন না? 
  
  - আরে না! কীভাবে জানব? আমি তো জানি চিঠি দেয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছে। দিয়েছে জানতাম না! কী হবে বলো তো? 

  - চিঠিটা নিশ্চয় ঘরে রাখেনি। শোয়েব কখনো এসব ব্যক্তিগত জায়গায় রাখে না। আপনি কী একবার নিচতলার ঘরে দেখবেন? 

  - দেখা যায়। কিন্তু যা করার জলদি করতে হবে। চিঠিটা খুব সম্ভবত শোয়েব নিজেও খুলেনি। তাছাড়া ওই হতচ্ছাড়া কাজটা কেন মিথিলা ভাবীকে করতে হবে! বলো তো আমাকে! অসহ্য লাগছে না এসব দেখলে? 

  - কিচ্ছু করার নেই। আপনি আমি উভয়ই জানি মিথিলা ভাবী সুযোগের অপেক্ষায় আছে। যখন ঝোঁপ দেখবে, সাথে সাথে কোপটা লাগাবে। 

  - আচ্ছা আমাকে এটা বলো, সেগুফতা ভাবী কফে ফিরছেন? বাবার-বাড়ি থেকে কবে ফেরার কথা বলে গেছে? দাদীকে কিছু বলেছে? 

  - বিয়ে খাচ্ছেন নাকি। খুব ব্যস্ত। উত্তরায় জমজমাট আয়োজন। 

  - হুম। সেগুফতা ভাবী দেরিতে আসুক। উনি এই ব্যাপারটা মেনে নিবেন না। জিভটা যা ধার, শাওলিনকে কে° টে র°ক্তাক্ত করবে। 

  - না, দাদী আছেন। আশা করা যায় উনি ওকে দেখে রাখবেন। নাহলে একটা খবর যদি শোয়েবের কানে যায়, মির্জা বাড়ির কাউকে ভদ্র অবস্থায় রাখবে না। এখন চলুন, রাবেয়াকে ডেকে আসি। দুপুরের আয়োজনটা দেখে ফেলা যাক।

পায়ে পায়ে এগোতে তাহিয়া অন্যমনষ্ক হলো। হঠাৎ অধরার দিকে প্রশ্ন করে উঠল, 

  - কিন্তু নতুন বউ রেখে কোথায় গেল? কিছু জানিয়ে গেছে? 

দুই ভ্রুঁ কপালে তুলে অধরা গালে হাত দেয়। আশ্চর্যে হাঁ হয়ে বলল, 

  - আপনি কোন দুনিয়ায় থাকেন? নিজের বড়ো ভাইরাই জানে না ছোটো ভাই বিয়ে করেছে। এখনো বাড়ির অন্যরা খবর পায়নি। শোয়েব একচুল কিচ্ছু জানায়নি। আপনি সেখানে বলছেন সে কোথায়? কাউকে বলে বের হয়? 

ঠাস করে নিজের কপালে চাপড় মারল তাহিয়া। উজবুকের মতো প্রশ্ন করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যে লোক নিজের বিয়ের খবর বলেনি, সে তো বাইরের খবরও বলবে না। কোন কাজে খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটি ছুটল কে জানে। পাহাড়ে তো কম বিপত্তি কাটায়নি। তবে চিঠিটা আত্মসাৎ করতে হবে। কোনোভাবেই শাওলিনের হাতে পড়া যাবে না! ভুল করেও না! চিঠিটা ইথিলা আশরাফের। পাঠিয়েছে বড়োবোন মিথিলা আশরাফের হাত দিয়ে! ইথিলা এখনো একটা মহাবিপদ! চরম বিস্ফোরণী বিপদ! 

—————

বিকেলের সূর্য যখন ডুবো, সন্ধ্যার আঁচ ততটাই গাঢ়বর্ণ হলো। সবুজ প্রকৃতি আঁধারের কাছে ভীতিমুখ খুলল। বাইরে কু কু স্বরে কোনো বন্যপাখি আর্তনাদ করছে। বাংলোর পেছনে ঘন জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে শুকনো পাতা মর্মর। শাওলিন অন্ধকার ঘরে আলো দিতেই ফোনটা ভাইব্রেট হতে দেখল। একমুহুর্ত মনে হলো, হয়ত সেই লোকটা কল দিয়েছে। কিন্তু হাতে তুলতেই বুঝল কলটা রেবেকার। রিসিভ করে কানে চাপতেই জানালায় পর্দা টেনে বলল, 

  - হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম। 

  - ওয়াআলাইকুমসসালাম। সারাদিনে একটা কল দিলে না। লক্ষণ বেশ ভালোই। 

কণ্ঠের নিচে চাপা বিদ্রুপ টের পেল শাওলিন। জানালাটা বন্ধ করে বলল, 

  - আপনি রাগ করবেন না। পরিবেশটা আমার জন্য নতুন। সবকিছু খাপ খাওয়াতে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি। কল দিব দিব করেও দেয়া হয়নি। 

চটান করে রেবেকা বলল, 

  - কেন? কীসের অসুবিধা? 

  - অসুবিধা না। 

  - তাহলে? 

শাওলিন নিরবতা পছন্দ করল। এই মুহুর্তে মনে হলো নিজের ভাবী সম্মানীয় নারীটা তাকে কটাক্ষসুলভ কথা বলছে। কথার ভঙ্গিমা হাস্যপূর্ণ না। শাওলিন নিরুদ্যম শ্বাস ফেলে শান্তসুরে বলল, 

  - কালকের ঘটনায় আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমাকে শুধু শুধু অপমান করা হলো। আমি আশা করেছিলাম আপনি সেই মুহুর্তে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন। একটা বাজে কথারও উত্তর দিবেন না। কিন্তু.. 

শাওলিন কথাটা অসম্পূর্ণ করল। ওপাশের গুমোট নীরবতা খানিকটা বুঝে নিয়ে আবার বলতে লাগল, 

  - কিন্তু আপনি শেষপর্যন্ত কিছুই বললেন না। যারা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করল, সেখানে চুপ থাকাকে পছন্দ করলেন। কেন? আপনি কী জানতেন না আমি এ সম্বন্ধে রাজি ছিলাম না? কখনো এ কথা বলিনি আপনাকে? আপনি সবার সামনে বলতে পারতেন, বিয়ের সম্বন্ধটা আমার পছন্দমতে ঠিক হয়নি। আপনার পছন্দমতে হয়েছে। কারণ আপনার ভাই ছিল। আমি আপনাকে সম্মান করতাম বলেই শ্রদ্ধা-সম্মান জানিয়েছি। হ্যাঁ বলেছি। বিশ্বাস ছিল আপনি ভুল হবেন না। 

কানে খট করে একটা কথা বিঁধল। রেবেকা ভ্রুঁ কুঁচকে উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্নটা করল, 

  - সম্মান করতাম মানে? তাহলে এখন আর করো না? 

শাওলিন নিরুত্তর। পাল্টা উত্তরে অনেক কিছুই বলা যায়। কিন্তু আবারও পারিবারিক শিষ্টাচারে শান্ত থেকেই বলল, 

  - আপনি কী জানতেন না আপনার জেঠির ছেলে কেমন? আপনাকে কী বলিনি মানুষটার সাথে কিছুই মেলে না? তখন কী উত্তর দিয়েছিলেন? বলেছিলেন না, আমি সময় এলে বুঝব আপনিই ঠিক ছিলেন? এই তাহলে সময়? 

একরাতের ভেতরে এ কেমন পরিবর্তন? যে মেয়ে গতকাল সকালেও তার মতে মতে চলেছে, সে যা উপদেশ দিয়েছে তা ছোটো হিসেবে মেনেছে। পদে পদে বুঝিয়েছে, সে ঠিক, ও ভুল। সেই কথার সুর এভাবে বদলে গেল? রেবেকা খুব গম্ভীরভাবে নিঃশ্বাস ফেলল। গতকাল একটা বাজে ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় তাকে দোষ দেয়া হবে! এই দুঃসাহস আজপর্যন্ত কেউ তাকে দেখায়নি। রেবেকা নেওয়াজকে দু কথা শোনাবে এমন হিম্মত কার? লাউড স্পিকারে দেয়া ফোনে দ্ব্যর্থভাবে বলল, 

  - কি বলতে চাও এখন? আমি তোমার চাপা উত্তরটা বুঝে নেব নাকি? স্বামীর ঘরে একরাত কাটল না, তাতেই তুমি ঠিক-বেঠিক বোঝাচ্ছ? 

বাইরে রাত নেমেছে। কালো আকাশে টিমটিম কর ফুটছে নক্ষত্র। শাওলিন জানালাটা আবার খুলে দিয়ে মুক্ত বাতাসে রাগের দমকটা চাপালো। উনি কী বুঝতে পারছে না ভুলটা কোথায়? কোথায় উনার একগুঁয়েমিটা খাটালো? সে জেনে-বুঝে সবকিছু পাকা করেছিল, তার ওপর বিশ্বাস করে শাওলিন হ্যাঁ বলেছিল। এখন তাহলে দোষটা শাওলিনের না? বিশ্বাস করেছিল যে এটাই মস্ত বড়ো দোষ হলো, তাই না? কী আশ্চর্য উপহার! শাওলিন একটু থেমে আবার বলে উঠল, 

  - আপনি কী বুঝতে পারছেন না ভুলটা কোথায়? আপনি জানতেন সে কেমন। আপনি সবকিছু জেনে-শুনে রাজি হয়েছেন। আমাকে আপনি বিশ্বাস করাতে বাধ্য করেছেন আমিই আমার সিদ্ধান্তে ভুল; আপনি ঠিক। আপনি যা বলছেন তা একবাক্য ভুল না। আপনি আমার চেয়ে বেশি জীবন দেখেছেন। বয়স বেশি,তাই আপনার চিন্তা, ভাবনা, অভিজ্ঞতাও দূরদর্শি। জহুরি চোখে সব টের পেয়ে যান। সেই চোখ দিয়ে মেপে দেখেছেন তাহমিদ সুযোগ্য। ওই পরিবার নির্ঝঞ্ঝাট। 

  - সে তোমাকে পছন্দ করে এটা বুঝতে পারোনি? ব্যাপারটা কেমন মারাত্মক হলে তোমার কথা নিজের মায়ের কাছে বলে! জেঠি তো তোমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে রেখেছে। তুমি কী সেগুলোর মূল্যায়ন করেছ? 

  - আমি কী মূল্যায়ন করিনি? 

  - সেটা তুমি নিজেই ভালো জানো। তাছাড়া আমি সবদিক দেখেছি। সেই হিসেবে তাহমিদ সেরকম উশৃঙ্খল না। পেশাগত জায়গায় ওর যতটা উন্নতি, সেটা কী তোমার চোখে ভালো-যোগ্যর সম্মান আনে না? হ্যাঁ, ছেলেদের কিছু জায়গায় সমস্যা থাকে, সেটা বিয়ের পর ঠিক হয়ে যায়। সবাই তো একরকম হবে না শাওলিন। যা বোঝো না তা নিয়ে তর্ক করা কেন? 

মেজাজটা কী পরিমাণ খারাপ হলো, শাওলিন তা ভাষায় বোঝাতে পারল না। একটা মানুষ কীভাবে কথা প্যাঁচাচ্ছে! সে যে ভুল করেছে এটা সে স্বীকারই করল না! বারবার বোঝাতে চাইছে তাহমিদ ঠিক, এভাবে-ওভাবে-সেভাবে ঠিক। আরে, প্রসঙ্গটা কী শুধুই তাহমিদের? রেবেকা নামের ত্রিশ বছর বয়সী ব্যক্তিরও না? যে নিজেকে ব্যক্তিত্ববান শিক্ষিত বুঝদার বোঝায়? শাওলিন কি বলতে চাচ্ছে সেটা একবারও বুঝেছে? গভীর দম টেনে নিজেকে শান্ত করে ও। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর আগ্রহ হারিয়ে বলল, 

  - আপনাকে সম্মান করি মণি। ছোটো বলেই সম্মানটা বেশি করি। হয়ত চোখে দেখা যায় না বলে বোঝাও যায় না। আজ অনেক কিছু পয়েন্টে পয়েন্টে বলা যেতো। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা এখন হচ্ছে না। কলটা রাখতে চাচ্ছি। পরে কথা বলব। 

কান থেকে ফোন নামাতে যাচ্ছিল, এমন সময় হঠাৎ কথাগুলো শুনল। যেন ইচ্ছে করে ওর অকৃতজ্ঞতার ঘোষণা দিয়ে বলছে, 

  - যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি। এখন তোমার সব হয়েছে, পর হয়েছি আমি। 

শাওলিন আশ্চর্যভাবে নির্বাক। কানে শুনতে পেল আবারও দাম্ভিক সুর, 

  - যে হাতে দিতে চেয়েছি, একটা আঙুল নষ্ট, বাকি চারটা ঠিক ছিল। এখন যার হাতে পড়েছ, তার পাঁচটাই নষ্ট। 

টুট টুট যান্ত্রিক শব্দটা কানে পৌঁছল। হতবাক হয়ে ফোন নামাল শাওলিন। দুর্বোধ্য ভাবে তাকিয়ে থাকল ক'মিনিট। গলায় যেন ঢোক গিলতে পারছিল না। কী বলল এগুলো? কথাগুলো কেমন ভাবে উচ্চারণ করল? উপমাটা কীসের ইঙ্গিতে ছিল? হাতের পাঁচটা আঙুল নষ্ট . . কিন্তু — ভ্রম ভ্রম করে হঠাৎ মুঠোটা কেঁপে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে ফুটল তিন অক্ষর — D.F.O.। বুকের ভেতর যেন খপ করে মোচড়ে উঠল। দুপাটি দাঁত শক্ত করে ম্যাসেজটা ক্লিক করে ও। সেখানে লেখা—

 “হাতের পাঁচ আঙুল নষ্ট, থাবা ঠিকঠাক। তোমার ঠোঁটে চুমু খেতে থাবা লাগবে না।”
Page 2
          ভয়ংকর ভাবে থতমত খেল শাওলিন। ওর ফোন ট্যাপড! কাজটা করেছে মিথ্যুক প্রতারক। কত বড়ো খারাপ! কত বড়ো জো-চ্চর! কিন্তু ফোনে টাইপ করতে গিয়ে দেখল আঙুলগুলো অবশ। থরথরিয়ে কাঁপছে, গলাটাও কেমন শুকিয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ল দুবার। নিজেকে শান্ত বানিয়ে কিবোর্ডের বাংলা অক্ষরে বুড়ো আঙুলটা ছোটাতে লাগল,   
  
  - আপনি আমার ফোনে আড়ি পেতেছেন? দূর থেকে এইসব করে শুনছেন! কবে এই থার্ডক্লাস ঘটনাটা করেছেন বলুন!   
  
ম্যাসেজটা পাঠিয়ে দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে দম ছাড়ল। অপেক্ষা করতে লাগল পাঁচ মিনিট। কিন্তু দশ মিনিটেও যখন উত্তর এল না তখন মনে মনে ধরেই নিল অসভ্য প্রকৃতির চরম চালাক লোকটা ওর কথার প্রত্যুত্তর দেবে না। বাইরে ক্লান্ত সন্ধ্যা ভর করছিল, সঙ্গে পাহাড়ি বন্য বাতাস। জানালার কপাট দুটো ত্রস্তগতিতে আঁটকে দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় কানে ঢুকল ' বিপ বিপ ' আওয়াজ। চকিতে হাত দুটো ছুটিয়ে ঘাড় পিছু করে তাকাল শাওলিধ। কপালে ভ্রুঁ কুঞ্চন করতে করতে বুঝল নতুন ম্যাসেজ এসেছে ফোনে, ক্লিক করতে দেখল আমেরিকান ইংরেজিতে প্রত্যুত্তর।  
  
 "Someone made a move on your phone.  
I shut it down before they even got close. "   
  
ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে লেখাটা পড়ছিল শাওলিন, কিন্তু মাঝপথেই ঠোঁট স্থির হয়ে শ্বাসরোধ হলো! চোখে ফুটল বেমক্কা বিস্ফোরণ। কে ভয়াবহ কাজটা করতে যাচ্ছিল? মানুষটা কী... প্রশ্নটা মাথায় চিড়িক দিয়ে উঠতে ফটাফট টাইপে ফিরল শাওলিন। আঙুলগুলো এবার জড়তাহীন, সাবলীল, ত্রস্ত ভঙ্গিতে লিখে দিল,   
  
  - কাজটা কে করেছে জানেন? এটা কবের ঘটনা?   
  
এবারও দু মিনিট বিরতি। এই দু মিনিটের ভেতর বারকয়েক নিচের ঠোঁটটা দাঁতে কামড়ে চলল। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ঠোঁট কামড়াতে থাকে প্রচণ্ড। মাঝে মাঝে ত্বক ফেটে টাটকা রক্ত চলে আসে। এখনো ব্যাপারটা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিল, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিপ্ বিপ্ মাঝপথে বাঁধা দিল,    
  
  - 'Before that little situation. The surveillance camera in your BATHROOM . '  
  
শাওলিন হাঁ হয়ে যায় লেখাটা পড়ে। মস্তিষ্কের ভেতর যেন সহস্র মৌমাছি ভোঁ ভোঁ করছে। কানে কিছু শুনছে না, চোখের পাতা পড়ছে না, কণ্ঠনালী প্রচণ্ড শুকিয়ে কাঠ। আঙুলটা বহু কষ্টে নাড়াল,   
  
  - কে ছিল?   
  
  - You know the answer. DON'T make me say it.   
  
নাম উচ্চারণ না করেও বুঝতে পারল, ব্যক্তিটা কে ছিল। শাওলিন প্রচণ্ড ধাক্কার মতো চুপ করে রইল। এই ঘটনা চাপা পড়ে ছিল, বাথরুমের সেই গোপন ক্যামেরাটারও আগে। একটা ব্যাপার এখনো রহস্য ছাড়ল না। তাহমিদ গোপন ক্যামেরাটা কী উদ্দেশ্যে লাগিয়েছিল? শুধুই কি অশ্লীল চাহিদা পূরণ করতে? ওর মন কেন জানি এই বাক্যে সন্তুষ্ট হতে পারে না। বারবার কুয়াশার মতো পাতলা আবরণ ওর চিন্তাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ খেয়াল হলো ডান মুঠোটা কাঁপছে। ঝটকা দিয়ে ভ্রম ভেঙে ফোনে তাকাল শাওলিন, মানুষটার ইনকামিং কল। এক মুহুর্ত দ্বিধা করে কলটা কানে চেপে বলল,   
  
  - হ্যালো।   
  
পৌরুষদীপ্ত ভারি কণ্ঠে শোয়েব বলল,   
  
  - জ্বর কমেছে?   
  
  - কমেছে।   
  
  - রেবার কথা শুনেছি বলে রাগ হচ্ছে?   
  
সত্যটাই বলতে চাইল চটান। কিন্তু শেষমুহুর্তে থামল শাওলিন। গভীরভাবে দম টেনে সেটা আস্তে ছেড়ে বলল,   
  
  - রাগ হওয়াটাই কী স্বাভাবিক ছিল না?   
  
প্রশ্নটা করল ঠিকই, কিন্তু ওপাশ থেকে একই সময় আরেকটি কণ্ঠ এল, ভীষণ উত্তেজিত গলায় কেউ বলছে,  
  
  - শোয়েব স্যার, স্যার... আরেকটা লাশ! এটাও বিকৃত। পচে মুখের কঙ্কাল বেরিয়ে গেছে।   
  
কথাটা শোনার পর শোয়েব কিছু বলবে, তার আগেই আর্তনাদ করে উঠল শাওলিন,    
  
  - লাশ! কার লাশ? আপনি এখন কোথায় আছেন?   
  
শোয়েব অপ্রস্তুত চোখে তাকাল রেঞ্জ অফিসার অতুল সাহার পানে। কলটা ভাগ্যিস ব্লু টুথ ডিভাইসে কানেক্ট। অতুল সাহা শুনতে পায়নি। শোয়েব পেশাদার কণ্ঠে অতুল সাহাকে বলল,   
  
  - অতুল, সময় কম! জায়গাটা দুই মিনিটের ভেতর ক্লিয়ার করো। নিকটবর্তী থানার ওসিকে কল দাও। ফরেনসিক টিম ডাকো। কুইক! ডু ফাস্ট!  
  
  - জ্বি স্যার। এক্ষুণি দিচ্ছি। স্যার, আপনি... আপনি কোয়ার্টারে যান। সুনীল স্যার আপনার সিকিউরিটি নিয়ে টেন্সড।   
  
এরপর আর কথা বলা যায় না। কানে কল, সামনে অতুল, অদূরে লাশ। সবকিছু জরিপ করে শোয়েব চক্ষু ইশারায় যেতে বলে। জায়গাটা থেকে অল্প দূরে সরে কানে ডান তর্জনী চেপে বলল,   
  
  - শাওলিন, মন দিয়ে শুনবে। একদম ঘাবড়াবে না। আমি রাঙামাটিতে আছি। যেভাবে ঔষুধগুলো দিয়ে এসেছি, সেভাবে সবটা নিয়ো। তোমাকে ফ্রি হয়ে —
  
শাওলিন কিচ্ছু বলতে দিল না। মুখের কথা বেদম ছিনিয়ে নিয়ে বলল,   
  
  - লাশটা কার? আপনি এখন কোথায় আছেন? মানে জায়গাটার নাম তো হবে? রাঙামাটি জেলার কোন —

  - আমি আছি। রাঙামাটিতেই আছি। 

শাওলিন থামল না, 

  - কোন জায়গায় আছেন!

 - শাওলিন পরে কল করি। 

 - না বলেছি! আপনি জায়গার নাম বলুন! 
  
এবার রাগীভাবে কথার লাগাম টানল শোয়েব। শাওলিনকে চুপ বানাতে হঠাৎ ধমকে উঠল,   
  
  - শাওলিন, চুপ! 

ঝাঁকুনির মতো চমকে কেঁপে উঠল শাওলিন। একেবারে চুপ হয়ে গেল। শোয়েব বলে চলল ক্ষীপ্তভাবে, 

  - একদম চুপ! আর একটা কথা না। আমি ফিরব। ফেরার পর যা বলার তখন বলবে। এখন কল রাখছি।   
  
স্পষ্ট আন্দাজ করল খবরটা শুনে ভয় পেয়েছে মেয়েটা। হয়ত ভয় পাচ্ছে তার নিরাপত্তা নিয়েই। রুক্ষ ভাবে বলাটা ঠিক হলো না জেনেও শোয়েব অটল রইল। ওপাশ থেকে মৃদু ধমক খেয়ে শাওলিন তখন শক্ত,   
  
  - ভালো থাকুন।   
  
লাইন কেটে টুট টুট আওয়াজ শুনল শোয়েব। চোখের পাতা হতাশ ভাবে বুজে এল। কল্পনায় ভেসে উঠল প্রথম মৃতদেহ। মুখে ছিঁটেফোঁটা মাংস নেই। সাদা কঙ্কাল বেরিয়ে মাছির ঝাঁক ভনভন করছে। বুকের মাঝ থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত প্রকাণ্ড হাঁ করা। ভেতরের নাড়িভুঁড়ি উথলে ওঠে, সবকিছু মাটিতে পরে আছে। মৃতদেহের নাম ফাইরুজ। সদ্য ইন্টার্ন করা নার্স। মেয়েটা নিখোঁজ ছিল এতোমাস। হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়তে অতুল সাহার আগমন। প্রথমে মৃদু গলায় ' স্যার ' ডেকে উঠলে শোয়েব পিছু তাকায়। অতুল দুহাতে কিছু একটা বাড়িয়ে ধরে বলল,   
  
  - শোয়েব স্যার, এটা পাওয়া গেছে। মারা যাবার আগে এটাই আপনার হাতে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু. . পারল না।   
  
কথাটা বলতে যেয়ে গলা কেঁপে উঠল। অতুল সাহা ধাক্কাটা সামলাতে পারল না, জায়গাটা দ্রুত ছেড়ে অন্যত্র চলে গেল। অতুলদের প্রতিবেশি কোয়ার্টারে এই ফুটফুটে মেয়েটা থাকতো। চাচার বাড়িতে থেকে এখানকার একটি বড়ো হাসপাতালে হাসিখুশি ইন্টার্নশীপ করছিল। মেয়েটা এখন নেই . . . খুব যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেল।   
  
শোয়েব হাতের বস্তুটার দিকে তাকাল। নাযীফের সেই হারানো ক্যামেরা! যে ক্যামেরা ফাইরুজ চুরি করেছিল। শোয়েব বুঝেছিল ফাইরুজই ওটা হাতবদল করেছে। কিন্তু ফাইরুজ কখনোই তা স্বীকার করেনি।

—————
  
রাত সাড়ে আট। ফাতিমা নাজ দোর দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। পিন পড়লেও শব্দ হবে এমন নির্জন বাংলোটা। অধরা দোতলার ডানে, বারান্দা ঘেরা সুদৃশ্য ঘরে স্বামীর সঙ্গে কথা বলছে। তাহিয়া রাবেয়ার হাতে তেল দিয়ে নিচ্ছে চুলে, বাড়ির বাইরের অংশ, যেখানে ভৃত্যশ্রেণির বাসস্থান। রাবেয়া তাহিয়ার চুলে আঙুল চালিয়ে বলল,   
  
  - ভাবী, একটা কথা বলি বলি করতেছি। আপনেরে কথাটা খুইলা কই?   
  
তাহিয়া অমত করল না। সায় জানিয়ে বলল,   
  
  - বল।   
  
বুকে ভরসা পেয়ে চঞ্চল চোখদুটো দেখে নিল আশপাশ। বড়ো বোন রোকেয়াকে না দেখে স্বস্তির দম ছেড়ে বলল,   
  
  - রোকেয়াবুর কাছে বলিয়েন না ভাবী। কথাটা শুধু আপনেরেই বলতেছি।   
  
বাতাসে রহস্যের গন্ধ পেয়ে তাহিয়া চোখ মেলল। কিছুটা গাঢ় কণ্ঠে বলল,   
  
  - কী কথা রে?   
  
রাবেয়া কণ্ঠটা আরো খাদে পাঠাল,   
  
  - আপনে যে চিঠিটা খোঁজ করতাছেন, ওই চিঠিটা রোকেয়াবুর খাতার ভিতরে। বুবু ঝাড়ু দিতে গিয়া ওইটা পাইছে।   
  
  - কী বলিস! ওটা খাতার ভেতরে? খাতার ভেতরে কীভাবে গেল? আমি তো সমস্ত জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজে শেষ! চল তো রাবেয়া, খাতাটা আমাকে দেখাবি।   
  
সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটে তর্জনী চেপে 'শশশ..' করে রাবেয়া। তাহিয়াকে সাবধান করতে গিয়ে বলল,   
  
  - ওই খাতাটা বুবুর খাস খাতা। ওইখানে এমন কিছু লেখে, যেটা কাউরে দেখায় না।   
  
কপাল কুঞ্চন করল তাহিয়া,   
  
  - কী লেখে? প্রেমের কপচা?  
  
আরো ফিসফিস করে রাবেয়া,   
  
  - না ভাবী। প্রেমের না। আমি একবার খাতাটা খুইলা দেখছিলাম, ওইখানে নাম লেখা।   
  
তাহিয়া থমকে গেল,   
  
  - নাম? কীসের নাম?   
  
রাবেয়া আরো গলা নামিয়ে ফিসফিস করল,   
  
  - মানুষের নাম। কাদের নাম আমি জানি না। শুধু একটা নাম মনে আছে।   
  
  - কী নাম সেটা?   
  
নামটা মনে করতে লাগল রাবেয়া,  
  
  - মনে হয় ফা... ফাই.. ফাইরুজ।   
  
—————
  
রাতটা কেটে গেল, কিন্তু তবু রাতটা শেষ হল না শাওলিনের কাছে। বারবার চোখ বুজেছে, আবার খুলেছে। বালিশে মুখ গুঁজেছে, উঠে বসেছে। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে, আবার দরজার কাছে থমকে গেছে। এক মুহুর্তও কাছ ছাড়া করেনি ফোনটাকে। যখনি দূরে রেখে ওয়াশরুম বা পানি খেতে উঠেছে, তখনি ছুটে গিয়ে ফোনটা চেক করেছে। না, কল আসেনি, টেক্সট করেনি, কিচ্ছু না। যখনি চোখটা একটু লেগে এসেছে, তখনি ঝট করে উঠে গেছে। হাতে ঝড় তুলে ফোন খুঁজতে থাকত, কিন্তু ফোন হাতে পেলেও কল থাকত না। একবার, দুবার, দশবার কল দিয়েও থেমে গেছে। ' নেটওয়ার্ক নেই ' কথাটার আড়ালে কী হচ্ছে, ভাবতেও বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যেতো।   
  
মাঝরাতে উঠে পড়ে শাওলিন। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ, আবার পানি খেয়ে আলমারি থেকে লাগেজটা খুলে ওটা বের করে। ফোনটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরোয়। অন্ধকার করিডোর, সিঁড়িতে ফোনের ফ্ল্যাশ আলো জ্বেলে নিচতলায় অফিস ঘরে ঢুকল। দরজাটা শোয়েব খোলে, সেই বন্ধ করে বেরোয়। এখন শাওলিন খুলল, ঘরটার চর্তুদিকে তাকিয়ে দরজা চাপিয়ে দিল। কাঠ ও কবজার মরচে ধরা ক্যাচ ক্যাচ শব্দে ঘরটা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। যেন বহুদিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে কেউ ঢুকে পড়েছে তার সীমানায়। কোণের দিকে সাজানো টেবিল-চেয়ার। কালো গদি মোড়া রিভলভিং চেয়ারটা অদ্ভুতভাবে স্থির। শাওলিন ধীরে এগিয়ে গিয়ে আঙুল ছুঁইয়ে দিল চেয়ারে। তারপর বসে পড়ল। মনে হলো, এই চেয়ারটাতেই বসে মানুষটা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। শাওলিন ডায়েরি খোলে, টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় ফুটে ওঠে খালি পাতা। সামনে কাঠ নির্মিত ছোট্ট কলমদানি, একটা কলম তুলে মনের সমস্ত কথা, অস্থিরতা, ভয়, দুশ্চিন্তা সব লিখতে শুরু করে,   
  
  
  
আলুটিলা জোন।  
খাগড়াছড়ি পার্বত্য অঞ্চল।  
২১ আগস্ট, শনিবার।  
  
এখন সময় মধ্যরাত। ঘুম আসছে না। অদ্ভুত এক অস্থিরতা মাথার ভেতরটা গুলিয়ে দিচ্ছে। যুক্তি দিয়ে যেটা বোঝার চেষ্টা করি, কোনো কিছুই ঠিকমতো ধরা দিচ্ছে না। আমার পুরোনো ডায়েরিটা নেই। সেই ডায়েরি — যেখানে কাঠগোলাপ খোদাই করা ছিল, যেখানে দাদার চিহ্ন লুকিয়ে থাকত। থাকলে হয়তো আজ এই কথাগুলো সেখানেই লিখতাম। মনে হতো, ওখানে লিখলে আমি যেন দাদাকেই বলছি।  
  
আমার একটা মাত্র ভাই ছিল। আমার ভাইয়া।কখনোই বলতে পারিনি, দাদা, তোমায় মিস করি।বাবাকে আমি পাইনি, তুমি পেয়েছিলে। মাকে আমরা দুজনই পেয়েছিলাম, কিন্তু মা সহ্য করতে না পেরে চলে গেলেন। তুমিও কেন সেই একই নিষ্ঠুরতার মুখে পড়লে? মানুষের সবচেয়ে বড়ো দুঃখ কী জানো? কোনো মানুষ না থাকা। তার কথা শোনার মতো কেউ না থাকা। বুকের ভেতরের এই ছিঁড়ে যাওয়া অনুভূতি যদি কোনোভাবে দেখানো যেত, তাহলে হয়তো বোঝা যেত যন্ত্রণা কেমন।  
  
কাল খুব ভয়ংকর একটা দিন ছিল। আমার জীবনে ভয়ংকর দিনের অভাব নেই। একটার পর একটা আসে, পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে, তারপর চুপচাপ হারিয়ে যায়। আর খুঁজে পাওয়া যায় না।  
  
মণি প্রথমে বলেছিলেন, আমি বড়ো হয়েছি।আঠারো বছর বয়সটা গুরুত্বপূর্ণ। এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো যুবকের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। যদি বলতেই হয়, তবে মনের মতো মান্য-যোগ্য-শ্রেষ্ঠ পাত্র খুঁজে নিতে হবে। আমি এসবের কিছুই বুঝি না। আমি কেবল একটা গুটিয়ে থাকা মেয়ে। অসামাজিক, নির্জন, নিজের ভেতরেই বন্দি। ক্লাস করি, পরীক্ষা দিই, ফলাফল নিয়ে ফিরে আসি। এই পর্যন্তই আমার পৃথিবী।আমার প্রত্যাশা নেই। কুড়িতে অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই আমার বুকবাঁধা স্বপ্ন, আকাশ ছোঁয়া ইচ্ছে, রঙিন বুরুজে রাঙানো সাতরঙা ক্যানভাস — সব একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যাদের বাবা-মা নেই, জীবনে অভিভাবকের ঘরটা ফাঁকা, তাদের জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে না।  
  
জাবিতে ঢোকার পর শ্রেষ্ঠার মতো বড়ো বোনকে পেলাম। সে-ই আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আমার দুঃখগুলোকে নিঃশব্দেও কীভাবে যেন বুঝে ফেলত। আমার চোখ ওর চোখে পড়লেই শ্রেষ্ঠা গম্ভীর হয়ে বলত, “তুই কী ভাবিস জানা?” আমার নাম কিন্তু জানা না। আগের ওই ডায়েরিটায় এর কারণটা লিখেছিলাম। আজ ছোটো করে লিখি। আমার তিনটে বড়ো বড়ো নাম— শেহজানা, আলম, শাওলিন। শ্রেষ্ঠা শেহজানা নামটাকে পছন্দ করল। ওটাকে খাটো করল। ক্যাম্পাসে ওর নেত্রীসুলভ জয়ে ‘শেহজানা’ তখন ‘জানা’ হয়ে গেল। কিন্তু একটা মানুষ আমাকে অন্যভাবে ডাকল। শাওলিনকে ফার্স্ট নেম বানিয়ে ডাকতে থাকল — শাওলিন আলম।  
  
  
থমকে গেল কলম। শাওলিন কোথাও যেন হারিয়ে গেল। অন্যমনষ্কতা ওকে ভাবনার দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে বন্ধ দুয়ারের ওপাড়ে ওই মানুষটিরই রাজত্ব। শোয়েব ফারশাদ। নামটা হৃদয়ের প্রতিটি কোণ ছুঁয়ে গেল। শাওলিন শিরশির করে কাঁপল। বুক মথিত হয়ে নিঃশ্বাস থমকাতে চাইল সহসা। কলম যেদিকে থেমেছিল, সেদিকে আবার চলল গতিময়তা।  
  
  
“…খাগড়াছড়ি, জীবনের প্রথম ভ্রমণ আমার। পাহাড়, বনভূমি, মেঘের রাজ্য দেখাটা স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, যেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমাকে হাসতে হাসতে সেখানে টেনে নিয়ে গিয়েছে। যেখানে মণির পছন্দ করা পাত্র তাহমিদ মর্তুজার সঙ্গে বিয়েটা হতোই। কিন্তু আজ একুশ আগস্ট, এই মধ্যরাতে লিখছি — আমি কখনোই চাইনি বিয়েটা মর্তুজার সঙ্গে হোক। বিয়েটা হয়নি।  
  
আমি যেদিন প্রথম অনুভব করেছিলাম, আমার কিছু একটা খাগড়াছড়িতে রয়ে গেছে, যা আমি সঙ্গে আনতে পারিনি, পারছি না — সেই দিনই বুঝেছি আমার চূড়ান্ত ভরসা, বিশ্বাসের জায়গা, সেই পুরুষ, যার উপস্থিতি অনুপস্থিতির মতো ছিল। যার অদৃশ্য হাত দৃশ্যমান হাত থেকেও বড়ো। যার পুরোটা আমি জানি না, কিন্তু আমার অজানাটা তার জানা।   
  
হ্যাঁ, ভাগ্য নির্মম। আমি সঠিক সময়ে ভুল ব্যক্তির হতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সঠিক সময়ে সবচেয়ে নির্ভুল ব্যক্তির হাতে চলে গেলাম। আজ সে ডিউটিতে ব্যস্ত। এই প্রথম তার কণ্ঠ প্রফেশনাল ব্যক্তির চেয়ে পার্সোনাল ব্যক্তির মতো পেতে চাইল। যেন আমার কলটা কেন কাটল — এতে আমার সীমাহীন রাগ হয়েছে। পরে কলটা কেন দিল না — এতেও বালিকাসুলভ অভিমান হয়েছে। আমিও যে টেনশন করতে পারি, আমারও তাকে নিয়ে ভয় হয়, দুর্ভাবনা আসে — এসব কিছু একে একে অনুভব করছি। কিন্তু সুযোগ দিতে সাহস দরকার। সাহসটা এখন পাচ্ছি না। যদি তার কাছে পুরোটা সপে দিলে, সে যদি কাঁচের মতো সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে?”  
  
এমন সময় কী একটা বিপ বিপ করে উঠল। টেবিলে মৃদু কম্পন হলো একটা। শাওলিন ঝটিতি কলম ফেলে হুড়মুড়িয়ে উঠেছে। খপ করে ফোনটা তুলেই সোজা কানে ধরল! শাওলিন এক মুহুর্তও দেরি করে না; অস্থির, ব্যাকুল, উত্তেজনাপূর্ণে বলল,   
  
  - হ্যালো?   
  
যদি একবার নামটায় ভালোভাবে দেখতো শাওলিন, তবে বুঝতো নামটা অন্য কারোর! আশ্চর্য হয়ে ভাবতো, এই ব্যক্তি কেন কল দিল এখন? লেকচারার মিসেস স্নেহা মাহমুদ! ট্রু-কলার অ্যাপসটা যদি ওর জন্য কার্যকর হতো, তবে দেখতে পেতো রেজিঃ নাম — তাশরিফ সাগ্রত। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp