ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১২ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
          তথাকথিত হারামখোর বন্ধুর দল অরুণ সরকারকে অফিস থেকে টেনে বেঁধে শপিং মলে এনেছে। কোনো হেতু নেই। এমনিই সকলের শখ জেগেছে একটু সময় কাটাবে। আজকাল বন্ধুদের সাথে সেভাবে কথা বলাই হয় না সেখানে দেখাসাক্ষাৎ তো অমাবস্যার চাঁদ।

“অরু রে, আমাদের শুভ তো শ্বশুর মশাই হয়ে যাচ্ছে রে। কলিকাতা হারবাল সেবন করা কচি খোকাটা এখন বেয়ানের সাথে ফ্লার্ট করবে। আজ একটা বেয়ান নেই বলে দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে! তুই যদি আমার দুঃখ লাঘব করতে চাস তো অরু পার্ট টু আই মিন অরুণিতাকে আমার সাহিরের সাথে দিতে পারিস। আপাদত বাগদান করে রাখি। এই সুযোগে আমিও একটা বেয়ান পাবো।”

অরুণ সরকার বুকটায় মোমড় লাগে। প্রাণপ্রিয় বন্ধুর পেটে ঘুষি মেরে বলে, “এতোই শখ তো ছেলেকে পাঠিয়ে দে। আমি আদর যত্ন করে ঘরজামাই পালবো।”

শুভ হেসে বলল, “তুই এখনও দিবাস্বপ্নেই আছিস অরুণ? ঘর জামাইয়ের কথা সিরিয়াসলি বলিস নাকি মজা মজাতে।”

“আ’ম ড্যাম সিরিয়াস। মেয়েকে একবেলা না দেখলে আমার প্রেসার বেড়ে যায়। সি’জ এভরিথিং টু মি। আমি তাকে মাথায় রেখে বড় করেছি। সে অন্যের বাড়িতে মাথানত করে থাকবে এটা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর তোরা প্লিজ এই টপিক তুলিস না। আমার অস্থির লাগে।”

অরুণের ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে আছে। ফয়সাল প্রসঙ্গ বদলে দিলো, “ভোরের খবর কি রে? ওর প্রথম ম্যাচ কবে রে?”

“নেক্সট উইকেন্ডে। তবে কাল সকালেই চলে যাবে। টিম জয়েন করবে দেন প্র্যাকটিস শুরু।”

মুস্তাকিম বলল, “পিচ্চি ছেলেটা এখন ক্রিকেটার হয়ে গেল। অনেক নাম করুক। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক। প্রতিটি ক্রিকেট ভক্তদের মুখে ‘অরুণাভ’ নাম অটল থাকুক।”

“আমরা শুধু টাকাই কামালাম। ভোর টাকার সাথে ফেম কামাবে। দেশকে লিড করবে। সেলিব্রিটি হয়ে যাবে। আমাদের বাচ্চাটা।” শুভ হেসে বলল।

অরুণ সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সাথে বিশুদ্ধ দেশি গালি খাবে। যেমন তোরা দিতিস। আর সব কিছু এতো সহজ না। সব জায়গাতেই রাজনীতি চলে ভাই। আমার তো ওর জন্য চিন্তা হয়। মনটা একটু বেশিই নরম ওর। অথচ যে পথে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে মনকে কংক্রিটে ঢেকে নিতে হতো।”

“তুই অহেতুক চিন্তা করিস।”

“এই বয়সে চিন্তা ছাড়া আর কিই বা করবো!”

“হোয়াট ডু ইয়্যু মিন বায় ‘এই বয়স’? ডু ইয়্যু থিংক আমরা বুড়ো হয়ে গেছি?”

অরুণের কথায় মুস্তাকিম খানিকটা তেতে উঠলো। বুড়ো, বয়স এসব নিয়ে কথা উঠলে সে ক্ষেপে যায়। অরুণ বাঁকা দৃষ্টিতে তাকে মনে করিয়ে দেয় তাঁর বয়স আদৌতে কত! 

“নাম্বার ফোরের জন্য ট্রাই করতেই পারিস অরু জান্স। উই ডোন্ট মাইন্ড। তোকে নিয়ে এক চিমটিও খিল্লি উড়াবো না। তোর পাতাবাহারের প্রমিজ।”

ফয়সাল অতি সহজ গলায় অরুণকে বলল। অরুণ চোখ পিটপিট করে বোঝার চেষ্টা করে। বুঝে উঠতেই বন্ধুর দিকে তেড়ে যায়। ফয়সাল হু হা হাসিতে ফেটে পড়লো। মুস্তাকিম দুষ্টুমির সুরে বলল, “যাহ্ তাই সম্ভব নাকি! বেচারা পারবে না। দেখেছিস ওকে? বুড়ো হয়ে গেছে। এখন তো নাতি নাতনির অপেক্ষায় থাকতে হবে।”

“অরুণ একদম হতাশ হবি না। আমাদের কলিকাতা স্পেশালিস্ট দা গ্রেট শুভ আছে কি করতে? শুভ?” রাসেল শুভর দিকে তাকিয়ে ইশারা করে। 

শুভ হেসে অরুণের দিকে তাকায়, “এক ডোজ সেবন করবি নাম্বার ফোর আসতে দুই মাসও দেরি হবে না। উই হ্যাভ ফেইথ ইন ইয়্যু বাডি!”

“হারামির ঘরের হারামখোর! শালা কলিকাতা হারবাল তোদের পাছায় ঢুকিয়ে দিবো।”

অরুণ সরকার গম্ভীর গলায় দাঁত কিড়মিড় করে বলল। রাসেল একগাল হেসে নিলো। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে কিছু বলতে নিবে চোখ যায় অদূরে বসা এক মেয়ের দিকে। তাঁরা বর্তমানে জেন্টস শু কালেকশনে আছে। সেখানে মেয়েদের উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছুই না। তবে তাঁর প্রশাসনিক নজর অনেক কিছুই ধরতে সক্ষম। মেয়েটা বেশ সময় ধরে তাদের ফলো করছে। এখনও তাদেরকেই দেখছে।সে কিছু বললো না। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মজে থাকলেও মেয়েটাকে চোখে চোখেই রাখে।

পত্রলেখা অস্বস্তিতে দুই হাত সমান তালে কচলে যায়। কথা বলা উচিত হবে নাকি না? নিচ তলা থেকে চার তলায় পাগলের মতো ছুটে এসেছে কথা বলার জন্যেই তো! নিশ্চয়ই মেন্টাল মোল্লাটা তাঁকে হনহনিয়ে খুঁজছে। তাঁর নির্ভেজাল জীবনে একমাত্র জঞ্জাল ওই জারিফ মোল্লা। পত্রলেখা তাঁর নামকরণ করেছে মেন্টাল মোল্লা। বেডার মানসিক রোগীদের মতো হাবভাব। 

পত্রলেখা দুই কদম এগোয় আর এক কদম পেছায়। এরই মাঝে অচেনা লোকটা তাঁর দিকে তাকালো। সে হাত নাড়িয়ে হাই জানালো। ভদ্রলোক কপাল কুঁচকে চাইলে পত্রলেখা আঙুল তুলে অরুণ সরকারকে ইশারায় ডেকে দিতে বলে। 

রাসেল ভ্রু উঁচিয়ে হাত ঘুরিয়ে ‘কেন’ ইশারা করে। পত্রলেখা মুখটা কিউট ভঙ্গিতে দুলিয়ে আকার ইঙ্গিতে ‘প্লিজ’ বোঝায়। রাসেল ঠোঁট গোল করে ‘নো’ বোঝায়। পত্রলেখা আরেকটু অনুরোধ প্রবণ মুখ বানিয়ে আকুতি ভরা চোখে চাইলো। রাসেল ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতে নেয়। মুস্তাকিম ফিসফিস করে তাঁর উদ্দেশ্যে বলল,

“শা*লা বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে নাকি? কিসের ইশারা ইঙ্গিত করছিস বে?”

তাঁর ফিসফাস সুরে সকলেই রাসেলের দিকে তাকালো। রাসেল পত্রলেখার দিকে ইশারা করে। সবাই পত্রলেখার দিকে ফিরলো। অরুণের কপালে এক রাশ কৌতুহল জমলো।

“এদিকেই আসছে রে রাসু।” মুস্তাকিম ফিসফিসিয়ে বলল। 

“অরুণ, তোর চেনা জানা নাকি?”

 রাসেলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি উপেক্ষা করে অরুণ পত্রলেখার দিকে সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। পত্রলেখা এগিয়ে আসে। পাঁচ মানবের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। অস্বস্তিতে নুইয়ে পড়লেও কাঁধের ব্যাগ ঠিকঠাক করে। হাত নাড়িয়ে ‘হাই’ বোঝায়। অরুণ স্বীয় ঠাঁঠ বজায় রাখলো। কিচ্ছুটি বললো না। মুস্তাকিম-রাসেল নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে। শুভই প্রথম কথা তুললো।

“কিছু বলবেন?”

বেচারা প্রফেসর মানুষ। সবার সাথেই ভদ্র আচরণ করতেই হবে। রাগী রাসেল হলে খানিকটা ঝাড়ি দিয়ে জিজ্ঞাসা করতো। অসামাজিক অরুণ চুপ থাকা পাবলিক। 

পত্রলেখা উপরনিচ মাথা নাড়লো। মুস্তাকিম হেসে বলল, “তো বলো? চুপ করে আছো কেন?”

পত্রলেখা শুকনো ঢোঁক গিলে ব্যাগ থেকে নোটবুক ও নীল কালির কলম বের করে। নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে নোটবুকে কলম চালিয়ে তা উঁচু করে মেলে ধরলো।

‘Hi, I am Potrolekha.’

সকলের সজাগু দৃষ্টি তাঁর উপর। অরুণ ভাবনায় পতিত হয়। এটা রামিশা না?

ফয়সাল ব্যঙ্গ করে বলল, “তাই বুঝি চিঠি পত্র লিখছো? মেয়ে এটা চিঠিপত্রের যুগ না। এটা ই-মেইলের যুগ। তোমার বাবা-মা তোমাকে ভুল সময়ে ল্যান্ড করিয়েছে।”

পত্রলেখা অরুণ সরকারের দিকে এক পল চাইলো। আরেকটা কাগজ ছিঁড়ে সম্মুখে ধরলো। সেথায় লেখা,

‘I can't talk.’

“তুমি কথা বলতে পারো না?”

এবার অবাক হবার পালা। ফয়সাল অনুতপ্ত হয়ে বলল, “আ’ম সো স্যরি ফর দ্যাট।”

পত্রলেখা চমৎকার হাসি দিয়ে মাথা দোলালো। যার অর্থ বোধহয় ‘ইটস্ ওকে’। শুভ মুগ্ধ হলো। মেয়েটা ভারী কিউট তো! পুরাই পুতুল টাইপ। চোখে মুখে অদ্ভুত শীতল শীতল ভাব রয়েছে।

“তোমার নামটা বেশ সুন্দর। তোমার সাথে যায়। চিত্রলেখা নাম শুনলেও পত্রলেখা প্রথমবার শুনলাম। কে রেখেছে নামটা?”

‘Babai’

“তোমার বাবার নাম কি?”

‘Mubin Pathan’

“পাঠান? এদেশে পাঠানরাও আছে! পাকিস্তানী নাকি তোমরা?” 

‘Babai from Herat, Afghanistan.’

পত্রলেখা লেখা শেষ করে শুভকে দেখায়। মুস্তাকিম টিপ্পনী কেটে বলল, “তাই তো বলি আমাদের দেশের সিংহভাগ ছেলেরা সিঙ্গেল কেন থাকে! চায়না, কোরিয়া, পাকিস্তান থেকে প্রেমের টানে ছেলেরা ছুটে আসে। এখন আফগানিস্তানও বাদ যায় নি। তা তোমার বাবা কি এখানেই সেটেল?”

‘He’s no more.’

অরুণ ব্যতিত সবাই পত্রলেখার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে অরুণের দিকে তাকায়। অরুণের কপালের ভাঁজ দৃঢ় হয়। সে শুভকে খোঁচায়। শুভ বন্ধুর ইশারা বুঝে বলল,

“আমাদের চিনো তুমি?”

পত্রলেখা অরুণ সরকারের দিকে আঙুল তুললো। অরুণ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পত্রলেখার তাক করা আঙুল স্বীয় আঙুলের সাহায্যে নামিয়ে দিলো। বলল, “আমাকে কিভাবে চিনো? আমি তো তোমাকে চিনি না!”

‘কি মিথ্যুক!’ পত্রলেখার চুপসানো গাল ফুললো যেন। সে আবার নোটবুকে কলম ঘুরিয়ে অরুণের দিকে তাক করলো। 

‘সত্যিই চিনো না?’

ভাসা ভাসা চোখে অভিমানের ঝিলিক। অরুণ স্পষ্টত অস্বীকার করে বলল, “না”

পত্রলেখা ক্ষণপল তাকিয়ে রইলো তার দিকে
তারপর নীরবে নিভৃতে প্রস্তান নিলো। 

“তুই সত্যিই ওকে চিনিস না?”

“বললাম তো না।” গম্ভীর মুখে শুভর পশ্নের জবাব দিলো অরুণ। বন্ধুরা আর ঘাটলো না।

পত্রলেখা এক্সিলেটরে দাঁড়িয়ে চতুর্থ তলা থেকে নিচে নামতেই জারিফ মোল্লার দর্শন পায়। খাড়ুসটা বাজখাঁই গলায় ধমক দিয়ে বলল,

“কোথায় মরতে বেরিয়েছিলি, বে*য়াদব? মেয়েমানুষ মেয়েমানুষের মতো থাকবি।”

পত্রলেখার হাতে নোটবুক, কলম ছিলোই। সে এবার সুযোগ হাতছাড়া করলো না। গোটা গোটা অক্ষরে লিখলো,

‘আমি কি শার্ট প্যান্ট পরে আছি? আমার গোঁফ দেখতে পাচ্ছেন?’

জারিফ মোল্লা ভয়ংকর চোখে চায়। নোটবুক আর কলম ছুঁড়ে ফেলে পত্রলেখার হাতের কব্জি শক্ত করে চেপে ধরে। ব্যথায় পত্রলেখার মুখ বিকৃত হয়ে আসে। পাষন্ডের দয়া হয় না। একপ্রকার টানতে টানতেই নিয়ে যায়। পত্রলেখা ঘার তুলে চতুর্থ তলার দিকে তাকায় একবার।

অরুণ সরকার রেলিং ধরে সবই লক্ষ্য করে। ছেলেটা কে? এতোটা রূঢ় ব্যবহার কেন করছিলো? সে নিচে নেমে কলম আর নোটবুকটা তুলে নেয়। 

—————

‘বিধবাদের মতো সাদা কাপড় পরে ঘুরবে, কেন? ওর কি ভাতার মরেছে! যত্তসব ফালতু মেয়ে মানুষ!’ আপনমনে বিড়বিড় করে জারিফ মোল্লা। দোকানির উদ্দেশ্যে বলে, 

“ওর মাপের জামা দেখান। সব যেন কটকটে রঙের হয়। লাইক লাল, মেরুন, ভায়োলেট আরো যা যা আছে!”

দোকানি কাপড়ের স্তুপ বের করতেই জারিফ মোল্লা মেরুন রঙের কুর্তি হাতে নিলো। পত্রলেখার দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল,

“সাইজ লাগবে কি-না দেখ।”

পত্রলেখা আশেপাশে তাকায়। পুষ্পর দুটো কাজিন, এক ফুপু সহ আরেক চাচিও উপস্থিত। আশ্চর্যের বিষয় কেউ কিছু বলছে না। নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত। তাদের আচরণ কেমন যেন রহস্যময়। নীরবে মেন্টাল মোল্লার টক্সিক আচরণ গুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এ বাড়িতে এসে কি সে ভুল করলো? আজই মায়ের সাথে কথা বলবে। ঝামেলা না করে চুপিসারে চলে যাবে। মায়ের সুখের সংসারে আঁচ না পড়ুক। 

পত্রলেখা পুষ্পর দিকে তাকায়। পুষ্প পত্রলেখার হয়ে চাচাকে বলল, 

“চাচ্চু লাগবে।”

জারিফ মোল্লা একই মাপের বিভিন্ন রঙের কুর্তি নিলো। সবগুলোই গাঢ় রঙের। নিশ্চুপ পত্রলেখার চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর উপায় নেই। 

—————

“তো তুই অরুণ সরকারের ছোট ছেলে?”

“হুঁ”

সোহরাবের শ্যামকালো মুখে হাসির ঝিলিক। স্মৃতিগুলো তরতাজা হয়ে হাতছানি দেয়। ফিনাইলের কড়া ঘ্রাণ! নবজাতকের কান্নার রোল। সব স্পষ্ট মনে আছে তাঁর। মনে থাকবে না? স্বর্ণের বালা জোড়া আব্বার কথায় দুঃসম্পর্কের আত্মীয়কে দিয়ে এসে আম্মার বাজখাঁই গলার ধমক সে আমৃত্যু মনে রাখবে। আর আব্বাও নিজেকে বাঁচাতে সমস্ত দোষ একমাত্র আদরের ছেলের কাঁধে ফেলতে দুবার ভাবে নি। সোহরাব রেগে গিয়ে দুদিন ভাত খায় নি। আজ সকালে সায়রা আপা যখন জানালো সায়ানের সহপাঠি অরুণ সরকারের সেই মেয়েটি। তখন সে অতি আগ্রহের সাথে ভাগ্নের সাথে দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের মুখদর্শন করতে এসেছে। শত হোক তাঁর মায়ের গড়ানো সোনার বালা বলে কথা! সোনার দাম যে তরতরিয়ে বাড়ছে। তবে সে এসে এত বড় ঝটকা খাবে ভাবেও নি। নিয়তির এ কেমন লীলা খেলা!

“তোমাকে ‘দুলাভাই’ ডাকায় আপুনি রাগলো কেন?”

সোহরাব মুচকি হেসে বলল, “সবার সামনে ডেকেছিস তাই বেচারি লজ্জা পেয়েছে।”

“তোমার বাবা এরকম অদ্ভুত নাম কেন রেখেছে? ‘দুলাভাই’ কোনো নাম হলো নাকি!”

প্রহরের কথায় সোহরাবের হাসি দীর্ঘ হয়, “আমার নাম সোহরাব শেখ।”

প্রহর কেমন করে যেন তাকালো। সোহরাব আবারও মাথায় চাটা মারে। প্রহর চেঁচিয়ে ওঠে, “মারলে কেন?”

“ইচ্ছে করলো তাই।”

“তুমি এতো পঁচা কেন?”

“খরগোশ তোর দাঁত দুটো কিউট কেন?”

প্রহর মুখ কালো করে নিলো। সোহরাব আবারও মাথায় চাটা মারলো। প্রহর চেঁচালো না। টলমল চোখে বলল, “আমি আপুনিকে বলে দিবো কিন্তু!”

“তোর আপারে আমি ভয় পাই না।”

“তখন তাহলে পেঁচার মতো মুখ বানিয়েছিলে কেন? তোমার নাকে মুখে মিল্ক শেক উঠেছিল কেন?”

“ওটা তো এমনিতেই!” সোহরাব জবাব দিতে থতমত খেয়ে গেল। 

“তুমি আপুনিকে ভয় পেয়েছিল। আপুনিকে তো পাপাও ভয় পায়।”

সোহরাব গায়ে মাখলো না। বলল, “তোর ভাইয়ের নাম যেন কি?”

“তোমাকে কেন বলবো?”

“দুলাভাই না আমি তোর?”

সোহরাব মন খারাপির সুর তুললো। প্রহরের মায়া হলো বেশ। বলল, “অরুণাভ, অনেকে ভোর বলেও ডাকে। পাপা ‘কলিজা’ আর ‘ফোরটোয়েন্টি’ বলে ডাকে।”

‘‘কুমড়ো পটাস’’

প্রহর পিটপিট করে তাকালো। সোহরাব ফুটপাতের এক দোকান থেকে চিপস ছিঁড়ে দিলো প্রহরের হাতে। নিজে এক সিগারেটের প্যাকেট নিলো। প্যাকেট খুলে একটা শলাকায় আগুন ধরিয়ে দোকানিকে বলল, “কত হলো?”

“দ্যাশশো!” 

সোহরাব প্যান্টের পকেট হাতালো। আফসোসের সুরে বলল, “ইশ্ ওয়ালেট রেখে এসেছি। এখন উপায়?”

 দোকানি পানের পিচকারি ফেলে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো যেন এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে। প্রহর ঘন ঘন পলক ফেললো। চিপসের এক টুকরো হাতে থাকলেও খাওয়ার সাহস হলো না। সোহরাব হে হে সুরে হাসলো। প্রহরকে ঠেলে দোকানির কোলে বসিয়ে দিয়ে বলল, 

“আমার কাছে টাকা নেই। এটাকে রেখেদিন। বড্ড ভালো ছেলে। আপনার অনেক উপকারে আসবে।”

প্রহর আতংক ভরা চোখে সোহরাবের দিকে তাকায়। সোহরাব তাঁর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দোকানিকে বলল, “না খাইয়ে রাখবেন না। তিন বেলা না দিন, এক বেলা অন্তত খেতে দিয়েন। খরগোশ রে, ভালো থাকিস!”

প্রহর সোহরাবের দিকে তাকায়, পরপরই ঘার ঘুরিয়ে দোকানির দিকে তাকায়। কি বিচ্ছিরি হাসি! প্রহরের কান্না পায়। 

“তুমি মজা করছো তাই না দুলাভাই?”

সোহরাব প্রহরের মতো ঘনঘন পলক ঝাপটায়। তারপর দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নার ভান করে চলে যায় হনহনিয়ে। একবারও পিছু ফিরে তাকালো না। একসময় তাঁর ছায়াটুকুও দেখা যায় না। প্রহর ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয়। হাত পা ছুঁড়ে পাপা মাম্মাম সহ চৌদ্দ গুষ্টিকে ডাকে। 

সোহরাব শেখ ঠোঁট চোখা করে সিটি বাজায়। হাতের আঙুলে চশমা ঘুরিয়ে স্টাইলের সাথে চোখে দিয়ে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে। ধপাস করে অরুণিতার পাশের খালি চেয়ারটায় বসে ক্লোজআপ হাসি দেয়। অরুণিতা চরম বিরক্তের সাথে বলল, “এ কেমন অভদ্রতা মামুজান?”

সোহরাব সানগ্লাস নাকের ডগায় নামিয়ে সুক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে বলল, “যাস্ট জান বললে বেশি খুশি হতাম সোনামুনি! মামু ডাকটা যাচ্ছে না।”

টেবিল জুড়ে হাসির কলরব। সবাই মজা হিসেবেই নেয় ব্যাপারটা। শৈলীকেও একই কথা বলা হয়েছিল। তবে সায়ানের ভালো লাগলো না। শৈলী আর অরুণিতা আলাদা মানুষ।

“মামুউউউ!”

সোহরাব অরুণিতার হাত থেকে ডেজার্টের বাটি ছিনিয়ে নিয়ে মুখে পুরে নিলো। ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে বললো, “তোর আবার কি হলো? ডাকলি ক্যান?”

সায়ান গোমড়া মুখে বলল, “কিছু না। প্রহর কই?”

“কোথায় যে গেলো! আমার পিছু হাঁটছিল। হঠাৎ দেখি নাই। আমি ভাবলাম ফিরে আসছে।” 

সোহরাব গা ছাড়া ভাব দেখায়। অরুণিতা আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠলো,

 “ হোয়াট ডু ইয়্যু মিন বায় ‘ফিরে আসেছে’? আমি মানা করার পরেও জোর করে নিয়ে গেলেন। এখন বলছেন কোথায় যে গেলো! আপনাকে তো আমি…”

অতিরিক্ত রাগে কথা আঁটকে আসে অরুণিতার। ভাইয়ের চিন্তায় মাথা খারাপ হবার উপক্রম। সোহরাবকে নির্লিপ্ত বসে থাকতে দেখে হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যায়। নিজ শান্ত গম্ভীর আচরণ থেকে বেরিয়ে সোহরাবের চুলের মুঠি টেনে ধরে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“ইয়্যু আর দা মোস্ট ডি*জ*গা*স্টিং পিপল আই এভার মেট। আই হে*ইট ইয়্যু… আই হে*ইট ইয়্যু মোর দেন এনিথিং! গো টু হে*ল!”

“অরু, উনি মামা হয় আমার। গুরুজনের সাথে এ কেমন অভদ্রতা?”

সায়ান শাসনের সুরে বললো। অরুণিতা উল্টো শাসিয়ে বলল, “গুরুজন মায় ফু*ট! ইয়্যু এন্ড ইয়্যুর সো-কল্ড মামু ক্যান গো ড্রাউন ইন আ ডিচ।”

অরুণিতা চলে যায় হনহনিয়ে। সোহরাব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বাটির ডেজার্ট সাবাড় করে। পানির বোতল নিয়ে ঢকে ঢকে পানি পান করে। উপস্থিত সকলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি উপহার দিলো। সায়ান সহ তাঁর বন্ধুরা হা করে তাকিয়ে আছে। সায়ান অবাক সুরে বলল,

“মামু, অরু তোমাকে অপমান করে গেলো আর তুমি হাসছো?”

সোহরাবের হাসি দীর্ঘ হলো। টেবিলের উপর রাখা ওয়ালেট আর ফোন হাতে নিয়ে বলল, “আরে ভাগ্নে, সব অপমান গায়ে মাখতে নাই। বড় কথা হলো আংরেজিতে কি বলে গেলো আমার ব্রেন ঠিকঠাক ধরতে পারলো না। কি বলছে রে সায়ু? গালি টালি দিছে নাকি? যদিও রাগে রাগে বললো কিন্তু শুনতে ভালোই লাগছিল।”

মুহুর্তেই হাসির রোল পড়ে গেলো। সায়ান গোমড়া মুখে বলল, “মামু তুমিও না। এখন বলো প্রহরকে কোথায় রেখে এসেছো?”

“বন্ধক রেখে এসেছি। যাই টাকা পরিশোধ করে ছুটিয়ে আনি। তোরা থাক এখানে।”

সোহরাব উঠে দাঁড়ালো। হামি তুলে আলসে ভঙ্গিতে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

অরুণিতা ও দুজন ওয়েটার রেস্টুরেন্টের আশেপাশের এলাকায় হন্ন হয়ে প্রহরকে খুঁজে চলেছে। অরুণিতার চোখে মুখে উদ্বিগ্ন ভাব। চোখে চিকচিকে নোনাজল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে মৃদুমন্দ। এই বুঝি মেঘেরা বিনা গর্জনে ভূপতিত হয়। এমনই ক্রান্তিকালে পাশে এসে দাঁড়ালো কেউ। অরুণিতা ফিরে না দেখলেও চিনতে অসুবিধা হয় না। সোহরাব সিগারেটের শেষ সুখটান দিয়ে পায়ের তলায় পিষে ফেলল। বলল,

“তুই আস্ত বেয়াদব। কোন কথা ছাড়াই আমার পিছু আয়!”

অরুণিতাকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না সোহরাব। জিন্সের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেঁটে চলে ফুটপাত ধরে। অরুণিতা থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো কতক্ষণ। তারপর কি মনে করে পিছু চললো। একটু হাঁটতেই প্রহরের কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। অরুণিতার জানে প্রাণ ফিরলো। ছুটে এসে দোকানির কোল থেকে ক্রন্দনরত প্রহরকে ছিনিয়ে নেয়। এই মুহূর্তে তাঁর মনে একটাই ভাবনা উদয় হয়, অপছন্দের ছোট ভাইটির জন্য তাঁর বুকে অফুরন্ত স্নেহ লুক্কায়িত আছে। ভাইকে বুকে জড়িয়ে গালে মুখে চুমু দেয়। প্রহর বোনের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করলো,

“আপুনি, দুলাভাই আমাকে এক প্যাকেট সিগারেট আর একটা চিপসের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে!”

—————

দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রশান্তির জায়গাটি বোধহয় মায়ের কোল। অরুণাভ এই মুহূর্তে মায়ের কোলেই মাথা রেখে শুয়ে আছে। মায়ের মমতাময়ী হাত তার চুলের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা দুশ্চিন্তাদের বের করে আনছে। সে মায়ের আঁচল টেনে হাতের কব্জিতে বেঁধে নেয়। অস্ফুট কন্ঠে ডাকে,

“আম্মু?”

“হুম?”

“আমি কেন ওই মহিলাকে ঘৃণা করতে পারি না? আমার মনে তাঁর জন্য সফট কর্ণার লুকিয়ে কেন থাকবে?”

পাতা হাসলো, “কারণ দশ মাশ দশটা দিন তাঁর সাথে তোমার অস্তিত্ব জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মাধ্যমেই তুমি দুনিয়ায় এসেছো। তোমাকে দুটো বছর নিজ ছায়ায় বড় করেছে সে।”

“তারপর সে আমাকে ফেলে চলে গেলো। এক মা কিভাবে পারে তাঁর নিজ সন্তানকে ফেলে চলে যেতে? মায়েরা তো সন্তানের জন্য দুনিয়া ছাড়তেও পিছপা হয় না। অথচ সে আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আমি কতটা গুরুত্বহীন ছিলাম তার কাছে। আমার তো উচিত তাকে ঘৃণা করা কিন্তু আমি তা করছি না। আমি খুব স্বার্থপর তাই না আম্মু? তোমাকে কষ্ট দিচ্ছি। আই যাস্ট হেইট মাইসেল্ফ।”

অরুণাভের চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। পাতা তা খেয়াল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার যদি তাঁর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, দেখা করতে ইচ্ছে করে করতে পারো। নিজ মনো বাসনাকে চাপিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা ভেবো না আমি কষ্ট পাবো।”

পাতার গলা কাঁপে। এতো ভালোবাসা স্নেহের পরেও ভোরের মন ওই মহিলার জন্য ছটফট করবে কেন? এটা কি ধোঁকা না? পরক্ষনেই সে সব স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিলো। জন্মদাত্রী সে! নারির টান যে শতভাগ সত্যি। তাঁর মা-বাবাও তো তার সাথে কত অন্যায় করেছে। কই সে তো তাদেরকে কখনো মন থেকে সরাতে পারে নি। তাদের এতো অবহেলাতেও কখনো মা-বাবা বলা বাদ দেয় নি। 

“আম্মু প্লিজ আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমি মরেই যাবো। আমি ওই মহিলার সাথে দেখা করতে যাই নি। উনি বলেছিল ওনার মা খুব অসুস্থ। মর্মর অবস্থা। শেষবারের মতো আমাকে দেখতে চায়। ওনার মাও ফোনে কেঁদে একটিবারের জন্য আসতে বলেছিল। আমি মানা করতে পারি নি। হ্যাঁ, ওনাকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিলো। পরে ভাবলাম আমার কিসের কষ্ট? আমার তো ‘তুমি’ আছো! ”

“বুঝতে পারছি।”

“নাহ্ তুমি বুঝতে পারছো না। তুমি আমার উপর রাগ করছো। ওনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শি লেফট মি অ্যালোন। আই ওয়ান্ট টু হেইট হার। আই ব্লকড হার নাম্বার।”

পাতা চুপ থাকলো। কিছুই বললো না। অরুণাভ শুকনো ঢোঁক গিলে ডাকলো,

“আম্মু?”

“শুনছি।”

“তুমি প্লিজ রাগ করিও না। আমি অনেক স্যরি তো।”

“আমি রাগ করি নি।” 

 অরুণাভ মুখোমুখি হলো। কাতর দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি রাগ করেছো। তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”

পাতা কোল থেকে অরুণাভের মাথা সরিয়ে দিয়ে বলল, “এ বিষয়ে আমাকে না জানালেই হতো। না শুনতাম, না মন খারাপ হতো।”

অরুণাভ জানাতে চাইছিলো না। কিন্তু আনিকা জানে, তারমানে চাচিমনিও। চচিমনি নিশ্চয়ই চুপ থাকবে না, সে জানাতোই। চাচিমনি তাঁর গুনগান গাইতে বড্ড বেশিই পছন্দ করে। সে হাতের উল্টো পিঠে চোখ ডলে নিলো। বলল,

“আমার ভুল হয়েছে। স্যরি আম্মু!”

পাতা বিছানা থেকে নামতে নামতে অতি স্বাভাবিক গলায় বলল, “ভুল কেন হবে? মায়ের সাথে দেখা করা ভুল নাকি?”

অরুণাভ অনুভূতিহীন চোখে চায়। পাতা হাসলো।

“সকালেই তো বেরুবে। আমি লাগেজ গুছিয়ে দিচ্ছি। কী কী প্যাক করতে হবে বলো।”

“তুমিই আমার আম্মু, তুমিই আমার মা। আমি আর কাউকেই চিনি না। প্লিজ আম্মু মাফ করে দাও।”

পাতা শুনেও না শোনার ভান করে আলমারি খুললো। বলল, “ওসব ছাড়ো। খেলার আগে গেট টুগেদার পার্টি অ্যারেঞ্জ করা হয় না? তোমার বাবা তোমার জন্য নতুন স্যুট সেলাই করেছে। সেটাই পড়বে কিন্তু। আমি ওটা আলাদা প্যাক করে দিলাম, হু?”

অরুণাভের মুখটা মলিন হয়ে যায়। বলে, “তোমার ইচ্ছে।”

পাতা লাগেজ নামিয়ে গোছানো শুরু করে দেয়। অরুণাভ বিষন্ন মুখে তা দেখে যায়। তার ভাগ্য কতটা প্রসন্ন! সে তাঁর ক্ষুদ্র জীবনে সব পেয়েছে কিন্তু কিভাবে তা আঁকরে রাখতে হয় তা শেখা হলো না।

প্রহর পা টিপে টিপে ঘরে প্রবেশ করে। ভাইকে দেখেই সব ভুলে ঝাপিয়ে পড়ে। অরুণাভ ভাইকে উপরে তুলে নেয়। কোলে বসিয়ে বলে,

“কোথায় গিয়েছিলে তোমরা? কতবার ফোন করেছি ভাবুক চড়ুই ফোন ধরছিল না!”

“আপুনির বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সবাই খুব ভালো শুধু একজন ছাড়া।”

প্রহর উচ্ছ্বসিত হয়ে জবাব দিলো। অরুণাভ একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “কে সে?”

“দুলাভা...”

“আমার ফ্রেন্ড দুলালের কথা বলছে ও। তাই না ওলাফ, হুঁ?”

দরজায় দাঁড়িয়ে অরুণিতা ছোট ভাইকে সাবধান করে। প্রহর বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লো। অরুণাভ বলল, “ভাবুক চড়ুই, তোমার সব ফ্রেন্ডদেরকেই আমি চিনি। তাদের এ টু জেট ডিটেইল আমার জানা আছে। এই দুলাল কে?”

“সায়ানের কাজিন। স্কুল আলাদা হলেও আমরা একই কোচিংয়ে ছিলাম।”

অরুণিতা বিন্দুমাত্র ঘাবড়ালো না। তবে প্রহর চোখ পিটপিট করে। অরুণিতা মৃদু চোখ রাঙানি দিলে প্রহর সামলে গেল। তাকে ভালোবেসে যেমন নাচাবে, সে তেমনি নাচবে। অতিরিক্ত কথা বলা ছাড়া বাচ্চাটার কোনো বাজে গুন নেই। না হিংসা, না বিদ্বেষ। পুরাই সুইট বয়। 

“পাপা কোথায়?”

“কি জানি!” অরুণাভ আনমনে জবাব দিলো।

পাতা লাগেজে কাপড় রাখতে রাখতে বলল, “ঘরেই তো দেখে এলাম। বাইরে থেকে এসেছিস ফ্রেশ হয়ে নে আগে। পাপা তো পালিয়ে যাচ্ছে না।”

কাঁধে স্নেহের হাত। অরুণিতার গোমড়া মুখে ঈষৎ হাসির ঝিলিক। বাবার কোমড় জড়িয়ে বুকে মাথা রাখে। চিরচেনা গাম্ভীর্য থেকে বেরিয়ে আহ্লাদী সুরে ডাকলো, “পাপা!”

“হ্যাঁ পাপা বলো?”

“লাভ ইয়্যু পাপা!”

“একটু বেশিই খুশি খুশি লাগছে না? কাহিনী কি সোনা?”

অরুণিতা মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে বলল, “এমনিতেই, ফিলিং হ্যাপি।”

অরুণ সরকার মেয়ের মাথার অগ্রভাগে ছোট চুমু দিলো। ছেলেদের দিকে তাকাতেই কপাল কুঁচকে গেলো। ছোট জনের যেমন তেমন বড় জনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। সে বড় ছেলেকে বলল,

“মুখ লাল হয়ে আছে কেন? কি হয়েছে!”

“কিছু না। কাল চলে যাবো তাই মন খারাপ লাগছে।”

অরুণাভ হালকা হাসলো। প্রহর ভাইয়ের গালে হাত রেখে বলল, “ভাইটুস, তাহলে তুমি চলে কেন যাচ্ছো? প্লিজ যেওনা!”

“যেতে তো হবেই। না গেলে তো আমাকে টিভিতে দেখতে পাবে না ওলাফ।”

“আই মিসভ ইয়্যু ভাইটুস।” 

ভাইকে জড়িয়ে ধরে মন খারাপির সুরে বলল প্রহর। অরুণাভ তাঁর পরিপাটি চুল এলোমেলো করে দিয়ে আদর করে। অরুণিতা এগিয়ে এসে ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসলো। ফিসফিস সুরে বলল,

“হাউ ওয়াজ দা ডেট?”

“গুড।”

“গিফট পছন্দ হয়েছে? সে বারবার বলছিলো ওর পছন্দ হবে না। পরবে না ব্লা ব্লা।”

অরুণাভের ক্ষত গুলো আবারও মাথাচাড়া দিলো। প্রহর বলল, “তোমরা কি মাছমাছ করছো?”

“মাছ মাছ?” অরুণিতা ভ্রু নাড়লো। 

প্রহর দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল, “ফিস মানে মাছ আর ফিসফিস মানে মাছমাছ।”

তাঁর কথায় কেউই হাসলো না। প্রহর চোখ পিটপিট করে গাল ফুলিয়ে নিলো। বাবার আগমনে অরুণাভ সরে বসে বাবাকে বসার জায়গা করে দেয়। অরুণ সেথায় বসলে প্রহর ভাইয়ের কোল ছেড়ে বাবার কোল দখল করে। গলা জড়িয়ে গালে চুমু দিয়ে বুকে মাথা রেখে হামি তুললো। অরুণ সরকার শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয় তাকে। পাতা লাগেজের চেন লাগিয়ে এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“তৈমুর নেওয়াজ আসার কথা। কিন্তু রুবি আপু আমাকে জানালো না। সুফিয়া খালা না বললে তো জানতেই পারতাম না।”

অরুণাভ আলগোছে উঠে ওয়াশ রুমে চলে যায়। অরুণিতা বিরক্ত হয়ে বলল, “চাচিমণির সমস্যা টাকি?”

“তোমার ভাই।” অরুণ ওয়াশ রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে বলল। 

“ভাইয়ের কোন দিকটা ওনার পছন্দ না?”

“চতুর্দিক”

“পাপা?”

“আমি ভুল কিছু বলেছি? তোমার ভাইয়ের হাবভাব আমার-ই সুবিধার মনে হয় না। ওদের কি বলবো। ওদের দিক থেকে বিবেচনা করলে ওদের সীদ্ধান্তে ভুল খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

অরুণিতা বাবার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, “তুমি সমাধানের পথ খোঁজা বাদ দিয়ে উল্টো ওদের সাইড নিচ্ছো। দিস ইজ নট ফেয়ার পাপা। ব্রোর জন্য আনিপুকে চাই মানে চাই। তুমি মাঠে নামলে কারো সাধ্যি নেই ঠেকানোর।”

অরুণ হাসলো, “আমি একবার অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছি। দ্বিতীয়বার আমাকে ও পথে পাবে না সোনা।”

“পাপা?”

অরুণ চুপ থাকলো। পাতা এতক্ষণ চুপ থাকলেও এবার মুখ খুলল, “রুবি আপুকে মানানো বোধহয় সম্ভব না। আমি কতবার কথা পাড়লাম। সে চুপ থাকে। কিছুই বলে না। আরিয়ান ভাইয়া শুধু হাসে। আমাকে সিরিয়াসলিই নেয় না। তবে ওনাকে ধরেই গন্তব্য হাসিল করা সম্ভব।”

“মাম্মাম, আনিপু আর ভাইয়া দুজনেই রাজি। এখন শুধু কাজিকে দরকার। বিয়েটা পড়িয়ে আনলেই হয়। তখন চাচ্চু, চাচিমণি কিছু করতে পারবে না। আমি ভাইয়ার সাথে একমত।”

“যতটা সহজ ভাবছো ততটা নয়। আনিকা যদি ঘরের মেয়ে না হতো গুন্ডা ভাড়া করে তুলে আনতাম। কিন্তু এখানে মামলাটা সেনসিটিভ। একটার সাথে কতগুলো সম্পর্ক জুড়ে আছে। একটু উনিশ বিশ হলে সম্পর্ক নষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রবল। শুধু রুবি আপুর অমত থাকলে ওতটা সমস্যা হতো না। বাট আরিয়ান ভাইয়াও অমত দেখাচ্ছেন। এখন তো তাঁরা দুজনেই চাচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব আনিকা আর তৈমুরের চারহাত এক করে দিতে। তাই আমাদের উচিত সব মুখ এক করে ব্যাপারটা মিমাংসা করা। ভোরের বাবা আপনি শুনছেন?”

পাতা অতি শান্ত সুরে বলল কথাগুলো। অরুণিতা পাতা দুজনেই জবাবের অপেক্ষায়। অরুণ ঘুমন্ত প্রহরকে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,

“ধরো, আমি জোর করে ওদের মিলিয়ে দিলাম। তাঁর দুদিন পরের কথা ভেবে দেখেছো? রুবি ছেলেটাকে দুদন্ড শান্তিতে থাকতে দিবে না। পান থেকে চুন খসলেই শুরু হয়ে গেলো তাঁর। আর একই বাড়ি যেহেতু কানপড়া তো থাকছেই। তুমি ভাবলে কি করে ওঁরা হ্যাপি ম্যারিড লাইফ লিড করবে? আমার ভাবতেও অবাক লাগে সে-ই ছোট বেলার ঘটনাকে কেন্দ্র রুবি এখনো আমার বাচ্চাটাকে জাজ করে। কথায় কথায় খোঁচাখুঁচি, অপমান করা তো আছেই।”

কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মতো না। পাতা তবুও বলল, “তাই বলে ভোরের খুশির কথা ভাববেন না? আমরা না হয় কারণ দেখিয়ে অন্য বাড়িতে শিফট হলাম।”

“যা করার করো আমি এর আগে পিছে নেই।”

অরুণ হাত পা সব গুটিয়ে নেয়। অরুণিতা, পাতা হতাশ হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। এরই মাঝে অরুণাভ ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আসে। আলমারি খুলে গায়ে হুডি জড়াতে জড়াতে গম্ভীর গলায় বলল,

“কাউকে কিছুই করতে হবে না‌। যা ভাগ্যে লেখা আছে তাই হবে। চাওয়ার আগেই তো সব পেয়ে যাই। দুই একবার না পেলে হয়তো একটু কষ্ট হবে…নয়তো একটু থেকে বেশিই হবে কষ্ট। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না।”

অরুণাভ টুপি মাথায় তুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। হুডির পকেটে হাত ঢুকিয়ে উত্তরের বারান্দা বরাবর হাঁটে।‌ কোত্থেকে আ্যনা ছুটে এসে বাঁধা হমে যায়। লেজ খাঁড়া করে রাগী সুরে ‘মিউ মিউ’ করে চেঁচায়। অরুণাভের মন ভালো না থাকায় পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। আ্যানা আবারও পথ আটকায়। 

“তোর সমস্যা কি অ্যানা? শট খাবি?”

অ্যানা হঠাৎ হাত পা উল্টিয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খেলো। যেন ‘শট’ দেওয়া হয়েছে তাকে। অরুণাভ বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে অ্যানা পা জড়িয়ে ধরে সুর তুলে ডাকে,

“মিয়াঁও!”

“ছাড় মেজাজ খারাপ করবি না।”

“মিয়াঁও!”

অরুণাভ কতক্ষণ পা ঝাঁকিয়ে নিস্তার পেলো না। বাধ্য হয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একশ টাকার নোট বের করে মেঝেতে ফেলে। অ্যানা তাঁকে ছেড়ে খপ করে নোটটা ধরে ফেললো। নাক দিয়ে শুঁকে পরখ করলো আসল নোট কি-না! তারপর টাকা নিয়ে ছুটে পালালো। এই টাকা ছাড়া সুফিয়া বানু তাকে মাছ দিবে না।

‘Anika’s Queendom’ দরজায় টাঙানো পোস্টারে থাবা মেরে দরজা ধাক্কায় অরুণাভ। মিনিট ক্ষণ পর আনিকা দরজা খুলে দিল। বিরক্তিকর ভাঁজ ফুটিয়ে বলল, “ভদ্রতা শিখলি না তুই। এভাবে কে নক করে?”

“আমি করি! সর ভেতরে ঢুকতে দে।”

আনিকা বিরক্ত মুখে সরে দাঁড়ালো। অরুণাভ ভেতরে প্রবেশ করে। বিছানায় অনেক গুলো সালোয়ার স্যুট রাখা দেখে কিছু বলতে নিবে তার আগেই আনিকা হাসিমুখে বলল,

“তৈমুরের আসার কথা। তাই আম্মু বললো সুন্দর দেখে স্যুট পরতে। কিন্তু আমি চুজ করতে পারছি না। তুই চুজ করে দিবি? দাঁড়া আমি তোকে দেখাচ্ছি।”

একে একে সবগুলো স্যুট দেখাতে শুরু করে আনিকা। মুখে উপচেপড়া হাসি। অরুণাভের বুকটা জ্বালাপোড়া করে। নিজের রাগ অভিমানকে সংযত করে নত হয়।

“দুপুরের ব্যাপারটা নিয়ে আমি দুঃখিত আনি। আমি ভাবি নি আমার ড্রেসাপ নিয়ে তুই এতোটা ইমব্যারেস হবি।”

আনিকা গোলাপী রঙের সালোয়ার স্যুট রেখে বাকি ড্রেস আলমারিতে তুলে রাখে। স্বাভাবিক সুরে বলে,

“স্যরি বলে তো আর লাভ নেই ভোর। সব তো শেষ, তাই না?”

অরুণাভ যেন ঝটকা খেলো। রাগে ফর্সা মুখ লাল হতে সময় নেয় না।‌ আনিকার বাহু চেপে ধরে বলে, “সব শেষ মানে কি আনি? ইটস বিগিনিং…”

আনিকা বাহু হতে সন্তপর্ণে অরুণাভের হাত ছাড়িয়ে নিলো।

“ইটস টোটালি এন্ড। তুই আমাকে না ,ক্রিকেট চুজ করেছিলি!”

“পাগল তুই? আমি কোনোটাই চুজ করি নি‌। আমার কাছে তুই আর ক্রিকেট দুটোই মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট। ইয়্যু আর মায় লাইফলাইন, ক্রিকেট ইজ মাই প্যাশন। তুই কিভাবে দুটোর মধ্যে একটা চুজ করতে বলিস?”

আনিকাকে যথেষ্ট শান্ত দেখালো। সে বলল, “দেখ ভোর, সব মেয়েরাই তাঁর পছন্দের মানুষটির ফার্স্ট প্রায়োরিটি হতে চায়। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু তোর ফার্স্ট প্রায়োরিটি আমি নই। তৈমুরের সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা রোজ হয়। যেকোনো দিন ডেইট পরতে পারে। আমি কোনমতে আঁটকে রেখেছি তাদের। কিন্তু এ নিয়ে তোর বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা অন্তত আমার চোখে পরছে না। তুই আছিস তোর বস্তাপচা ক্রিকেট নিয়ে। তো থাক তুই ক্রিকেট নিয়েই। তৈমুর নেওয়াজকে এই অল্প সময়ে যতটুকু বুঝলাম সে সবসময় আমাকে টপ প্রায়োরিটি দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দিবে।”

শেষোক্ত কথায় আনিকা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করে। কাজ হলো যেন। বিড়াল চোখদুটো আগুনের ফুলকির চেয়ে কম জলন্ত লাগছে না। অদম্য রাগে ভেতরটা জ্বললেও অরুণাভ যথাসম্ভব ঠান্ডা ভাব প্রদর্শন করার চেষ্টায় বলল,

“আনি তুই তো জানিস ক্রিকেট আমার প্রথম প্রেম। এক ক্রিকেটের জন্য আব্বুর কত অবাধ্য হয়েছি। বিপিএলে ভালো পারফরমেন্স করতে পারলেই টিমে টিকে যাওয়ার একটু আশা আছে। প্রথমবার বিপিএলে খেলবো। কতটা নার্ভাস বোঝাতে পারছি না। কোচ স্যার বলেছেন ম্যাচ খেলে নিজের দূর্বলতা খুঁজে সেটার উপর কাজ করতে। আমি নিজের বেস্টটা দিতে চাইছি।”

“আমি সেটাই বলছি। তুই তোর প্রথম প্রেমেই মজে থাক। আমি কারো সেকেন্ড প্রায়োরিটি হতে চাই না।”

“আনি তোর জন্য আমি সব করতে পারি…”

“তো ক্রিকেট ছেড়ে দে।”

অরুণাভ ব্যথিত হয়ে বলল, “তুই এটা কিভাবে বলতে পারিস আনি?”

“আম্মু আমাকে অন্য একজনের ঘারে চাপাতে চাইছে আর তুই এখনও ক্রিকেট ক্রিকেট করে যাচ্ছিস। কাল সকালেই তো চলে যাবে ড্যাং ড্যাং করে। আমার কি হবে?”

“আ’ল ম্যানেজ।”

“ইয়্যু কান্ট!”

অরুণাভ ঘার ডলে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টায় মত্ত। আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুই আমাকে ভালোবাসিস?”

“বাসি, তোর চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি তোকে।”

অরুণাভ গলায় বিন্দুমাত্র দ্বিধা খুঁজে পাওয়া গেলো না। আনিকার মন নরম হলো। বলল,

“বাসলে বাসিস। কিন্তু আমার উপর তোর বিশ্বাস নেই। আমি কি জানি না তুই ক্রিকেটের প্রতি কতটা অবসেসড! আমাকে চুজ করলে আমি কি তোকে ক্রিকেট থেকে দূরে রাখতাম? এই বিশ্বাস আমার প্রতি? যাইহোক এটা তো প্রমাণ হলো আমার থেকেও ক্রিকেট তোকে বেশি টানে। ক্রিকেট তোর স্বপ্ন আর আমি কি? আমি যে তোর দূরে চলে যাচ্ছি সে খবর রাখিস? আজ তৈমুর আসবে। কাল পরশু হয়তো ওর ফ্যামিলিও আসবে। এনগেজমেন্ট হয়ে যাবে। তুই তো সকাল হতে না হতেই নিজ স্বপ্নের পিছু ছুটবি।”

অরুণাভ এগিয়ে আসে। আনিকার দুই হাত মুঠোয় ভরে বলে, “আনিকা, ট্রাস্ট মি। তুই যদি আমার পাশে থাকিস আমি সবার সাথে লড়ে নিবো। তোকে আমার করে নিবো। আমি চুপ আছি মানে এই না আমার মাথা ব্যথা নেই। তুই প্লিজ কথা বাড়াস না। ক্রিকেট আমার স্বপ্ন হলেও তুই আমার সেই বেস্ট এনিমি যার হাত ধরে আমি আমার ছোট বড় সব স্বপ্নের সুখ ভাগ করে নিতে চাই।”

আনিকা খুব করে চাইলো নিজ হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দুটো কড়া শব্দ শুনিয়ে দিতে। কিন্তু পারলো না। নাক টেনে ক্রন্দনরত সুরে বলল, “ওই তৈমুর নেওয়াজ পার্ফেক্ট আছে। একটাও দোষ খুঁজে পাই নি। কিন্তু আমার তো তোকে পছন্দ। যে পদে পদে দোষ করবে আর কান ধরে ক্ষমা চাইবে। নে কান ধর?”

অরুণাভ হাসলো। কান না ধরে পছন্দের মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কান টান ধরতে পারবো না আমি।”

“তুই ধরবি তোর ঘার ধরবে।”

অরুণাভ হাসলো। কিছু বলার জন্য গলা পরিষ্কার করলো, “তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে আনিবুড়ি।”

“ভোর, ছাড়।”

“কেন? তোর কি অস্বস্তি হচ্ছে? নাকি লজ্জা পাচ্ছিস?”

“দরজায় আম্মু দাঁড়িয়ে।”

“মজা করছিস?”

“আহম্মক, পেছনে দেখ তো একবার!”

অরুণাভ তৎক্ষণাৎ ছিটকে সরে আসে। সত্যিই দরজায় চাচিমনি দাঁড়িয়ে। লজ্জায় নাক কাঁটা গেলো তাঁর। বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মাথা চুলকায়। ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,

“চাচিমনি, ইটস্ যাস্ট নর্মাল হাগ।”

গাল বোধহয় অবশ হয়ে গেলো। মেয়েমানুষের হাত এতোটা শক্ত আঘাত হানতে পারে! অরুণাভ মাথা নত করে নেয়। রুবি চাঁপা আক্রোশে ফুঁসে ওঠে,

“নির্লজ্জ কোথাকার! এতোটা অধঃপতন হয়েছে আমি ভাবতেও পারছি না।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp