“আমি আমার দিক থেকে শক্ত আছি চাচ্চু। কিন্তু তোমার ছেলের ভিত্তি নড়বড়ে। গা ছাড়া ভাব দেখায়। আম্মু ওই অচেনা লোকটার সাথে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ তোমার ছেলের এটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই।”
অরুণ সরকার হাসলো। আনিকা হতাশ হয়ে বলল, “চাচ্চু তুমি হাসছো!”
“ফোর টোয়েন্টিটা আছে কোথায় শুনি?” অরুণ ছেলের খোঁজ জানতে চাইলো। আনিকা বিষন্ন মুখে বলল,
“কোথায় আবার! টি টোয়েন্টি খেলছে। পুরো জাহান একদিকে আর ওর কাছে খেলা আরেক দিকে।”
আনিকা চলে যায়। অরুণ সরকার ফেলে রাখা প্যাকেট হাতে তুলে দেয়। খুলতেই ফরচুন বরিশালের লাল রঙের জার্সি দৃশ্যমান হয়। জার্সিতে ‘ARUNABH 17’ লেখা। অরুণ সরকার জার্সিটা হাতে তুলে নেয়। লেখাটায় ঠোঁট চেপে ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাঁর বাচ্চাটা!
—————
মা মেয়ের নীরব যুদ্ধ এখনও চলমান। অরুণিতার মাঝে হেলদোল না দেখা গেলেও পাতা ছটফট ছটফট করে। মেয়ে তাঁর সাথে কথা বলছে না। সে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু মেয়ে অতি সুক্ষ্মতার সাথে তাকে এড়িয়ে গেছে। ব্যস পাতার নরম মনে তীব্র প্রভাব পড়ে। ভোরের বাবা ঠিক বলে। অরুণিতা তাদের মেয়ে হয়ে জন্মায় নি, মা হয়ে জন্মেছে। সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর ক্ষমতা আছে তাঁর। পাতা মুচকি হেসে মেয়ের পছন্দের দুটো আইস্ক্রিম নিয়ে মেয়ের ঘরে যায়।
ফর্সা গতরে জলপাই রঙের ডিজাইনার কুর্তি, ঢিলেঢালা জিন্স। কাঁধ সমান ভেজা চুলে চিরুনি করে করে ছেড়ে দেয়। ছোট ছোট চোখের ঘন দীঘল পাপড়িতে মাশকারা ছুঁয়ে চোখ পিটপিট করে। ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক লাগিয়ে দুই ঠোঁট একত্রিত করে ‘প্পা’ শব্দ করে। পছন্দের এয়ারিং কানে লাগিয়ে গুনগুন সুর তুলে। হাতে স্বর্ণের চিকন ঘড়ি। অরুণিতা আয়নায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে। ফোলা গালে টোল পড়বে-ই সেই মুহূর্তে ধরাম করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে কেউ। অরুণিতা চোখ বুজে বিরক্তের সুরে বিড়বিড় করে,
“নো সাচ থিং অ্যাজ প্রাইভেসি, হাহ? সি কল পাপা ম্যানারলেস, ইয়েট সি ডোন্ট ইভেন রিয়ালাইজ দ্যাট এন্টারিং সামওয়ান’স রুম উইদাউট পারমিশন ইজ ব্যাড ম্যানার্স… উফ!”
পাতা মুগ্ধ চোখে মেয়েকে দেখে। পাঁচ আঙুলের ডগা একত্রিত করে সেথায় চুমু এঁকে যেভাবে টিপ পড়িয়ে দেয় সেভাবেই আঙুলগুলো মেয়ের কপালের একাংশে ছুঁয়ে বলল, “দুশো বছর আগে ফেলে যাওয়া ইংরেজদের বংশধর, মাশাআল্লাহ কি সুন্দর লাগছে রে তোকে। যাইহোক কি বিড়বিড় করছিস?”
অরুণিতা জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। Dior J’adore-এর শিশিটা তুলে গায়ে সুগন্ধি মাখে। পাতার ঘোর সন্দেহ হয়।
“কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”
“টু মিট মায় বয়ফ্রেন্ড!”
পাতার চোয়াল ঝুলে পড়ে। পরক্ষনেই ফিক করে হেসে উঠলো। মেয়ের গাল টিপে দিয়ে বলে, “বয়ফ্রেন্ড তাও তোর মতো ম্যানারলেস মেয়ের? বেচারা একশ একবার কান ধরে উঠবস করবে। তওবা কেটে ‘মা’ ডেকে পালিয়ে যাবে।”
অরুণিতা সরাসরি মায়ের চোখে চোখ রেখে বলল, “আই লুক লাইক আন্টি, ডোন্ট আই?”
“ইয়্যু আর দা মোস্ট প্রিটিয়েস্ট গার্ল আই এভার সিন। সে নিশ্চিত ভাগ্যবান কেউ যার ভাগ্যে তুই আছিস।”
অরুণিতার গাল রক্তিম হয়। পাতার মুচকি হাসলো। মেয়ের চুল কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বলল, “সেদিনের জন্য স্যরি রে আম্মু!”
“ডোন্ট নীড দ্যাট। আই নেভার মাইন্ড!”
অরুণিতার স্পষ্ট জবাব। পাতা শুধালো, “তোর মাথায় এসব কে দিলো?”
“আ’ম গেটিং লেট, বায়!”
পাতা জলভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। অরুণিতা দরজা অবদি গিয়ে থেমে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে। দুই হাত বাড়িয়ে মাকে জড়িয়ে নেয়। কোমল স্বরে বলে,
“মাম্মাম, আই লাভ ইয়্যু।”
“আমার কাছে ভোর সোনা, অরু সোনা, ওলাফ সোনা তিনজন হৃদয়ের তিনটে টুকরা।”
পাতা মেয়েকে জড়িয়ে রেখেই বলল। অরুণিতা মায়ের কাঁধে থুতনি রেখে ফিসফিস করে বলল, “চার নাম্বার টুকরো নিশ্চয়ই নাক উঁচু ম্যানারলেস অরুণ সরকার।”
পাতা হেসে দেয়। মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, “আইসক্রিম ডেট হয়ে যাক? তোর ফেবারিট আইসক্রিম।”
অরুণিতা মাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল, “ডিনারের পর। আ’ভ টু গো নাও।”
‘আই হ্যাব তু গো নাও’ পাতা মেয়েকে মুখ ভেঙায়। চোখ রাঙিয়ে বলে, “কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়া বন্ধ হবে না তোর?”
“সমস্যা কি?”
“কোথায় যাচ্ছিস এখন?”
“অরুণিতা’স কিচেনে।”
“কেন?”
“বললাম তো বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে।”
পাতা চোখ রাঙায়, “বলা নেই কওয়া নেই ড্যাং ড্যাং করে বেড়িয়ে পড়ছিস। অনুমতি নিয়েছিস আমার?”
“পাপা অনুমতি দিয়েছে।”
“সে দিক, আমি তো দিই নি। কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। দিন দুনিয়া খারাপ। বন্ধুদেরকেও ভরসা করা উচিত না। টিভি, ফোন বের করলেই ভয়াবহ সব নিউজ।আর মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু মেয়েরাই।”
“আই ক্যান প্রোটেক্ট মাইসেল্ফ।”
“আমি একা পাঠাচ্ছি না। প্রটেক্টিভ কাউকে সঙ্গে নিলে ভাবতে পারি।”
অরুণিতা নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “আই হেইট ইয়্যু মাম্মাম।”
“বাট আই লাভ ইয়্যু সুইটি!”
অরুণিতা রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায়। পাতা ফোন বের করে কল লাগায় অরুণ সরকারের নম্বরে। রিসিভ হয় না। তবে একটু পরেই কল আসে। সে রিসিভ করেই ঝাড়ি দিয়ে বলল,
“আপনি অরুকে বন্ধুদের সাথে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন? কাল রাতে নিউজ দেখে কে যেন ভয়ে ফিট খাচ্ছিলো।”
অরুণ সরকার কানে ফোন চেপে ফাইল ঘাটে। খানিকটা অসহায়ের মতো বলে, “অনুমতি? হাহ! সে বলল পাপা আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যাবো। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম ‘না’ । সে বলল ‘ইয়েস’, আমি বললাম ‘নো’। সে রেগে বলল ‘ইয়েস’, তখন আমি বললাম ‘ওকে’ । সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিলো। কিছু বলার সুযোগই দিলো না।”
পাতা দাঁত কটমট করে বলে, “যত হম্বিতম্বি সব আমাদের উপর। মেয়ের সামনে তো ঠিকই মেও মেও করেন। ফোন রাখুন!”
অরুণিতা থমথমে মুখে গাড়িতে বসে। পাশে তাকাতেই বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আসে? এই হলো তাঁর প্রটেক্টর! সরকার বাড়ির ছোট সরকার। অরুণিতা যদি ঢং জানতো হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে বসতো!
“আপুনি, তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে?”
অরুণিতা বাঁকা চোখে চায়, “এই কথা কেন উঠছে?”
“আপুনি, আমি কি সিসিটিভি ক্যামেরা?”
“তা কেন হবি?”
“মাম্মাম বলেছে তোমার উপর নজর রাখতে।”
‘আই হেইট ইয়্যু মাম্মাম’ অরুণিতা বিড়বিড় করে। প্রহর বোনের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে, “বললে না তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে নাকি নেই।”
“বয়ফ্রেন্ড মানে কি জানিস?”
“যার সাথে প্রেম করে সেই বয়ফ্রেন্ড, আমি জানি।”
অরুণিতা কোণা চোখে ছোট ভাইকে দেখে নেয়। অবাক হয় না। এ ছেলে বহুত কথা জানে।
“প্রেম কিভাবে করে রে?”
“আমি কিভাবে বলবো? আমি কি প্রেম করি?”
“তাও ঠিক!”
প্রহর হঠাৎ মিটিমিটি হাসা শুরু করে। অরুণিতা হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করলে প্রহর ফিসফিস করে বলল, “সেদিন বারান্দায় মাম্মাম আর পাপা লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিলো। আমি দেখেছি।”
অরুণিতা চোখ রাঙানি দিলে প্রহর হেসে বলল, “তুমি কি ভ্যাম্পায়ার?”
“হ্যাঁ, আরেকটা কথা বললে তোকে খেয়ে ফেলবো।”
“আমি কি রসগোল্লা যে খেয়ে ফেলবে!”
“থামবি?”
“তুমি কি ট্রাফিক পুলিশ?”
অরুণিতা রাগ নিয়ে তাকায়। প্রহর ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, “তাহলে থামতে কেন বলো?”
অরুণিতা মাথা চেপে ধরলো। প্রহর চোখ পিটপিট করে বলল, “তোমার কি মাথা ব্যাথা? আমি কি টিপে দেবো?”
অরুণিতা রাগটাও করতে পারে না। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে মুচকি হাসলো।
তিড়িং বিড়িং করে নাচতে থাকা ছোট ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে ‘অরুণিতা’স কিচেনে’ প্রবেশ করে উক্ত রেস্টুরেন্টের মালকিন অরুণিতা সরকার। রেস্টুরেন্টের প্রতিটি স্টাফ মিষ্টি হেসে সৌহার্দ্যপূর্ণ কথা বলে। অরুণিতা গম্ভীর মুখে তাদের উদ্দেশ্যে বলল, “আমার ফ্রেন্ডদের আসার কথা ছিল!”
কর্ণারের এক টেবিল থেকে সায়ান নামক ছেলেটা ডাকলো, “এই অরু, আমরা এখানে?”
অরুণিতা বন্ধুদের পানে তাকায়। পুরো পল্টন তুলে এনেছে। আজ রেস্টুরেন্টের সব খাবার এরাই খেয়ে যাবে নিশ্চিত! সে ভাইকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়।
“এটা কে রে?” অরুণিতার বান্ধবী শেলী জিজ্ঞাসা করে।
“ছোট ভাই। প্রহর, হ্যালো বলো সবাইকে!”
সবাই তাঁর দিকেই তাকিয়ে। প্রহর হঠাৎ লজ্জা পেয়ে বোনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মিনমিনে গলায় ‘হ্যালো’ বললো। সায়ান তার গাল টিপে বলল, “কিউট আছে! অরু দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এখানে বয়?”
নিজ পাশের খালি সিটটা দেখায়। অরুণিতা বসে সেখানে। টেবিলে পার্স রাখার সময় খেয়াল করে সেখানে কারো ওয়ালেট আর আই ফোন রাখা। অরুণিতা কপাল কুঁচকে বলল, “এগুলো কার?”
“আমার মামুজানের। বললাম না সেও আসবে? ট্রিপের যাবতীয় কিছু সেই ম্যানেজ করবে। আমরা শুধু চিল করবো।”
সায়ানের মামুজান? অরুণিতা বলল, “সায়রা মিস যাবে না? মিস গেলে আই উইল ম্যানেজ মায় পাপা। বাট…”
“আরে অরু চিল থাক না? বাড়িতে আম্মুর কথাই বলবি কিন্তু আমরা সঙ্গে নিয়ে যাবো মামুজানকে। আম্মুকে নিয়ে গেলে তো মজাই করতে পারবো না। আর আমার মামুজান ফান লাভিং! পুরো ট্রিপ জমিয়ে রাখবে। তুই শুধু তাঁর সাথে একবার কথা বলে দেখ তুইও ফ্যান হয়ে যাবি। এরা সবাই ওলরেডি মামু ভক্ত হয়ে গেছে!”
শৈলী আঙুলে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, “হি’জ ঠু মাচ হ্যান্ডসাম ইয়ার। মামু ডাকতে বুকে বাঁধে।”
অরুণিতা ছোট ছোট চোখে চায়। উপস্থিত সকলেই কমবেশি মামুজানের প্রশংসা করে। সায়ান হেসে বলে, “আমার মামু সিঙ্গেল আছে। ট্রাই করে দেখতেই পারিস। বাট মামু তোদের মতো বাচ্চাদের প্রতি ইন্টারেস্টেট না। মামু কিছুটা ধার্মিক মাইন্ডের বুঝলি? সে তো নম্র-ভদ্র, ধার্মিক, লজ্জাবতী, নরম মনের মেয়ের সন্ধানে। ওহ্ হ্যাঁ ট্রিপে মেয়েদের নিয়ে যাবে না। আমি কত কিছু বলেই না ম্যানেজ করলাম।”
অরুণিতার কপালে নাখোশতা। সায়ান তা বুঝতে পেরে বলল, “আরে মুখ ওমন বানাচ্ছিস কেন? মামুকে দেখলেই সব দুশ্চিন্তা ভ্যানিশ হবে দেখেনিস।”
অরুণিতার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রহর চুপ করে তাদের কথা শোনে। অপরিচিত মানুষের সামনে তাঁর ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ থাকে। সে একটু পর পর বোনের দিকে তাকায়। অরুণিতা তা খেয়াল করে বলল, “কিছু বলবে?”
প্রহর চোখ পিটপিট করে। তাঁর না বলা কথাগুলো অরুণিতার বুঝতে সময় লাগে না। ভাইকে নিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে চলে যায়।
“আমি কি লেডি?”
“প্রহর?”
“আমি তো ম্যান, জেন্টলম্যান! পাপা বলে জেন্টলম্যানরা লেডিদের ওয়াশ রুমে যায় না।”
অরুণিতা ভাইয়ের হাত ছেড়ে দেয়, “যা তবে।”
প্রহর আবারও খপ করে বোনের হাত ধরে বলে, “তুমিও চলো। আমার ভয় লাগে না বুঝি?”
“আমি লেডি, জেন্টল লেডি। মাম্মাম বলে জেন্টল লেডিরা ম্যানদের ওয়াশ রুমে যায় না।”
অরুণিতা প্রহরের কথা প্রহরকেই ফিরিয়ে দিলো। প্রহর কাঁচুমাচু মুখ বানিয়ে বলে, “আমি তাহলে যাবোই না। পরে প্যান্ট নষ্ট করলে বকবে না কিন্তু!”
অরুণিতা ফোঁস ফোঁস করে ভাইকে জেন্টস ওয়াশ রুমে যায়। ফাঁকা ভেবে স্বস্তি পায়। প্রহরকে কমোডে বসিয়ে রেখে দরজা ভেজিয়ে রাখে। প্রহর বদ্ধ স্থানে থাকতে পারে না। ভয়ে কেমন হয়ে যায়। অরুণিতা পাশেই পায়চারি করতে ব্যস্ত। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হয়। কেউ আসছে ভেতরে। অরুণিতা বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। না জানি কোন নমুনা ঢুকে। সে নাকে স্কার্ফ চেপে এক টয়লেটের ভেতরে প্রবেশ করে ছিটকিনি তুলে দেয়।
“টয়লেটের মতো স্থানেও পুরুষ সেভ নেই। অথচ সবার মুখে মুখে নারী নিরাপত্তার স্লোগান। ধিক্কার হে জাতি, তোমাকে শত ধিক্কার।”
অরুণিতার ছোট নেত্রযুগল মার্বেলের মতো হয়ে এসেছে। তীব্র গতিতে পেছন ফিরে দেখার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেলো। অরুণিতা দরজায় মিশে যায়। এক মুহূর্ত পর পিটপিট করে চোখ খুলে। এক লম্বা চওড়া পুরুষালী দেহ তাঁকে না ছুঁয়েও বন্দি বানিয়ে ফেলেছে। ভয়ে অরুণিতা মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, ঘাবড়ে যায়। কিন্তু সামনের মানুষটিকে তা বুঝতে না দিয়ে কর্কশ গলায় বলল,
“এ কেমন অসভ্যতা?”
“জেন্টস টয়লেটে ভূতের মতো এন্ট্রি নেওয়া কেমন সভ্যতা?”
উষ্ণ শ্বাস মুখে বারি খায়। সিগারেটের অসহনীয় গন্ধে পেট মুচড়ে উঠলো। অরুণিতা চোখে চোখ রেখে বলল, “দরজা খোলা রেখে টয়লেটে কে বসে?”
সোহারাব শেখ হাসলো। রমনীর রক্তিম নাকের ডগায় অহংবোধ টইটম্বুর। এ মেয়ে মাথা নোয়াবার নয়। সে আরেকটু ঝুঁকে আসে। চৌকা আর ভোঁতা নাক ছুঁই ছুঁই অথচ ছুঁয়ে দেয় না। নয়নে নয়ন আটকে রয় কয়েক পল। সামনের পুরুষ কি বশীকরণ জানে? নাকি কোনো কালো জাদু! অরুণিতা শ্বাস ফেলা ভুলে নিষ্পলক চেয়ে রয়। সোহরাব ফিসফিস করে বলে,
“তুই আর মানুষ পাস না? এ শহরে এসেছি থেকে আমার পেছনে পড়ে আছিস। কাহিনী কি হুঁ?”
অরুণিতা শ্বাস নিতে পারে না, যদি লোকটার নিঃশ্বাসে বিষ থাকে? কথা বললেই বুঝি ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়া লাগবে। অরুণিতা দরজায় আরেকটু মিশে যেতে চায়। সোহরাব দুষ্টু হেসে বলল,
“সোনারে এমন করে তাকিয়ে থাকিস না। তোর ভিতু চাহনি আমার ভেতরের দুষ্টু ছেলেটাকে জাগ্রত করছে। আমি কিন্তু খুব খারাপ মানুষ।”
তা বলার অবকাশ রাখে না। টয়লেটে শার্ট বিহীন বসে আছে। প্যান্ট খুলে রেখেছে কি-না সন্দেহ। অরুণিতা এই ভয়ে নজর ঝুকানোর সাহস পাচ্ছে না। সে অনেক কষ্টে নিজ গম্ভীর খোলস ফিরে আনলো। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, “আমাকে যেতে দিন, নয়তো খুব খারাপ হবে।”
“সোনা, সব জায়গায় হুকুম চলে না। মিষ্টি করে ‘স্যরি’ বল যেতে দিবো।”
অরুণিতার চোখে রাগের চ্ছটা। সোহরাব মজা পায়। দাঁত কপাটি দেখিয়ে দুষ্টু হেসে বলে, “দুই দিনের মেয়ে! নাক টিপলে দু*ধ বেরিয়ে আসবে। অথচ ভাব দেখাস ছত্রিশ বছরের রাগী আন্টিদের মতো।”
অরুণিতার গায়ে লাগে খুব। হাইস্কুল লাইফ থেকেই বন্ধু-বান্ধব, ক্লাসফেলো, সিনিয়র, জুনিয়র অনেকেই মজা ও টিটকারীর ছলে ‘আন্টি টাইপ’ বলে থাকে তাকে। অরুণিতা রাগ সামলাতে না পেরে দুই হাত বুকে ঠেলে ধাক্কা দেয়, সফলও হয়, সাথে স্বস্তি। লোকটা শার্ট বিহীন হলেও প্যান্ট পড়েই আছে। সে ছিটকিনি খোলার চেষ্টা করে।
সোহরাব শেখ টি শার্টটা গায়ে জড়াতে জড়াতে বলে, “ধর আমার জায়গায় তুই আর তোর জায়গায় আমি থাকতাম! তখন তুই কি করতি?”
“স্যান্ডেল খুলে মারতাম।”
দরজা খুলে বেরিয়ে যায় অরুণিতা। সোহরাব হতভম্ব। মেয়ের কি তেজ বাব্বাহ! সে বেরিয়ে আসে। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে বলে, “সেই হিসেবে আমারও তো একই কাজ করা উচিত। আমার পায়ে তো স্নিকার। তোর হাই হিলটা কর্জ দে তো?”
অরুণিতা রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে। সোহরাব দাঁত কপাটি দেখিয়ে বলে, “মেয়ে তোর চরিত্রে ঘাপলা আছে। জেন্টস টয়লেটে কি করছিস? নিশ্চয়ই আমার মতো নাদান পুরুষদের ইজ্জতে কালি মাখাতে এসেছিস! ছিঃ দেখে তো ভদ্রঘরের মেয়ে মনে হচ্ছে। মুখোশের আড়ালে এ কি রূপ তোর! আমি এক্ষুনি প্রেস ডাকবো। তারপর প্রতিটি চ্যানেলে হট নিউজ ‘ভদ্র বেশে ঘুরে বেড়ানো এক সুন্দরী তরুণী জেন্টস টয়লেটে থাকা এক নাদান পুরুষের সর্বনাশ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে’ তারপর সবাই তোর মুখে চুনকালি মাখবে।”
অরুণিতার রাগে মাথা ফেটে যাবার উপক্রম হলেও সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলে, “এই ধরনের কেসে আমাদের দেশে মুজলিমকে না বরং ভিক্টিমকে চুনকালি মাখাতে সবাই কাজ করে। সো ভেবে দেখুন, চুপ থাকবেন নাকি কনফারেন্স ডাকবেন।”
সোহরাব শেখের হাসি দীর্ঘ হয়। সাথে মুগ্ধও হয় বাচ্চা মেয়েটার বুদ্ধিমত্তায়। সে অদ্ভুত কান্ড করে বসে। অরুণিতার ভোঁতা নাক টেনে দিয়ে বলে,
“বুচির বোচা নাকে বুদ্ধি আছে। বিউটি উইথ ব্রেন। আই লাইক দ্যাট।”
অরুণিতার কপালে কয়েক ভাঁজ খেলে যায়। দাঁত কটমট করে বলে, “হাউ ডেয়ার ইয়্যু?”
“কিউট আছিস!”
“ইয়্যু…”
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে অরুণিতা, সোহরাব পাশে তাকায়। প্যান্ট ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রহর। সোহরাবকে খেয়াল করে নি সে। বোনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আপুনি, জিপার কি দুষ্টু ছেলে? উপরে উঠছেই না। তুমি বকে দাও তো।”
অরুণিতা ফট করে সোহরাবের দিকে তাকায়। সোহরাব প্রহরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। হাতের ইশারায় বলল,
‘‘তোর ভেতরের খরগোশকে আসসালামুয়ালাইকুম!”
প্রহর সোহরাবের ইশারায় নিচের দিকে তাকায়। তারপর নিজ মান ইজ্জত ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সোহরাব শব্দ করে হেসে উঠে। হাঁটু গেড়ে বসে প্রহরের প্যান্টের জিপার আটকাতে সাহায্য করে।
অরুণিতার ফর্সা গাল লাল টুকটুকে হয়ে আছে। আজকের দিনটা সে যত দ্রুত সম্ভব স্মৃতির অ্যালবাম থেকে ছিঁড়ে ফেলবে।
কাহিনী এখানেই সমাপ্ত হতে পারতো। কিন্তু নাহ্! ভাল্লুকটা নাকি সায়ানের মামুজান। সায়রা মিসের অতি আদরের একমাত্র ভাইটি। অরুণিতার ইচ্ছে করে কানে হাত চেপে গগণ বিদারী চিৎকার করতে। লোকটার গা জ্বালানো হাসি গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। বুঝতে বাকি নেই লোকটা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত! সে ভুলক্রমেও এই ট্রিপে যাবে না।
“আমি ট্রিপে যাচ্ছি না। তাই আমাকে বাদ রেখেই প্ল্যান কর তোরা।”
অরুণিতার কথায় মুহূর্তেই টেবিল জুড়ে হাউকাউ লেগে যায়। সায়ানকে সবচেয়ে বেশি রাগতে দেখা গেলো। সোহরাব ডোনাটে কামড় দিয়ে ভাগ্নের মতিগতি বোঝার চেষ্টা করে। আপার কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মতো না। ভাগ্নে হাবুডুবু খাচ্ছে। তাঁর হাসি পায়! এই আতঙ্ক ভাগিনা বধূ হলে আপা হারপিক খেতেও দ্বিধাবোধ করবে না। নাহ্ এটা মানা যায় না। তাছাড়াও আজ টয়লেটে যা হলো! খুক খুক করে কেশে ওঠে সোহরাব শেখ। প্রহরের হাত থেকে মিল্কশেক কেড়ে নিয়ে মুখে দেয়। প্রহর বোনের দিকে অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকালো। সোহরাব তাঁর মাথায় চাটা মেরে বলল,
“বোনের দিকে তাকচ্ছিস কেন? তোর বোনকে ভয় পাই আমি?”
“আপুনি দেখেছো? দুলাভাই আমাকে মারলো!”
মিল্ক শেক নাকে মুখে উঠে বিষম খায় সোহরাব। অরুণিতা নাকের পাটা ফুলিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। তাঁর চাহনি বলে দিচ্ছে ‘আজ প্রহরের রক্ষে নেই’। এদিকে বাকি সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, প্রহর কেন সায়ানের মামুজানকে দুলাভাই ডাকলো!
—————
“এসব কি? মনে হচ্ছে মাঠ থেকে সরাসরি উঠে এসেছিস!”
“মনে হওয়ার কিছু নেই। মাঠ থেকেই এসেছি। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি? ভেতরে চল?”
আনিকা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। অসন্তোষের দৃষ্টিতে অরুণাভের দিকে তাকিয়ে থাকে। স্কাই ব্লু রঙের নর্মাল জার্সি আর টাওজার। তাতেও মাটি লেগে আছে। ঘামে গা হতে গন্ধও আসছে। চুলগুলো এলোমেলো। পায়ে স্পোর্টস শুতে কাঁদা লেগে বিশ্রী দেখাচ্ছে। টোকাইদের মতো কাঁধে স্পোর্টস ব্যাগ। এই বেশে কেউ ডেট করতে আসে?
“কি হলো?” বাহু ধরে জানতে চাইলো অরুণাভ।
আনিকা ঝটকায় হাত সরিয়ে দেয়। রাগে ফোঁস ফোঁস করে বলে, “তোর কি কমন সেন্স নেই? টোকাই বেশে কেন এসেছিস?”
অরুণাভের হাস্যোজ্জ্বল মুখটায় একটু ভাটা পড়লো। নিজের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বললো, “ঠিকই তো আছে!”
“তোর মাথা আছে! তোকে আমি বলেছিলাম আমরা একসাথে লাঞ্চ করবো। সাম কাইন্ড ওফ ডেট!”
“তারজন্যই তো আমি খেলা ফেলেই ছুটে এসেছি। ইচ্ছে করে আউট হয়েছি। দলকে চিট করেছি।”
অরুণাভের সহজ স্বীকারোক্তি। আনিকার রাগ হয়। থেমে থেমে বলে, “তুই একবার আমার দিকে তাকা, তারপর নিজের দিকে তাকা! ওহ্ আল্লাহ আমার রাগ কমিয়ে দাও!”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়লো। আনিকা লং কুর্তি আর জিন্স পড়েছে। ফিনফিনে রঙিন ওড়না গলায় পরিপাটি করে রাখা। লম্বা চুলগুলো খোঁপায় বাঁধা, খোপাল লাল গোলাপ। বড় ঝুমকা পড়েছে কানে। হাতে রেশমি চুড়ি। গাল মুখ কৃত্রিম প্রসাধনীতে রাঙিয়েছে। অরুণাভ মাথা চুলকে হাসে। এক গাল প্রশংসা করতেও কুন্ঠিত হয় না।
“আমি অন্যদের মতো ছন্দ মিশিয়ে বলতে পারি না। বাট তোকে সুন্দর লাগছে।”
“কিন্তু তোকে লাগছে না। টোকাই লাগছে তোকে! টোকাইরা যেমন বস্তা কাঁধে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বোতল, হাবিজাবি কুঁড়ায়। তেমন লাগছে।”
আনিকা মুখের উপর বলে। অরুণাভ এ যাত্রায় লজ্জিত হয়। ব্যাগ থেকে কালো চেক শার্ট বের করে গায়ে জড়াতে জড়াতে বলে, “তুই সকালে জানালে আমি সেরকম প্রস্তুতি নিয়েই আসতাম। রোদের মধ্যে মাঠে খেলছিলাম, তখন ফোন দিয়ে আসতে বললি তাই..”
“শাক দিয়ে মাছ ঢাকে না ভোর। আমি বুকিং ক্যান্সেল করে আসছি।”
আনিকা থমথমে মুখে ভেতরে চলে যায়। অরুণাভ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে কি খুব বাজে লাগছে? হয়তোবা! তাঁর কি চলে যাওয়া উচিত? চলে গেলে আনিকা আবার রেগে না যায়! তাই সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।
আনিকা মিনিট দশেক পর ফিরে আসে। মুখচোপা রাগে লাল। চোখ দেখে মনে হয় কেঁদেছে। অরুণাভ অনুতপ্ত হয়ে বলে, “আ’ম স্যরি। আমি বুঝতে পারি নি। আচ্ছা কাল আমার তরফ থেকে বুকিং থাকবে। বিকেলে লং ড্রাইভেও যাবো দুজন। গাড়ি না, বাইক রাইডে। হুঁ?”
“কাল তোর টিম জয়েনিং না? সকালেই তো চলে যাবি।”
অরুণাভ কপাল ঘঁষে বলে, “তাহলে আমি এখনইচেঞ্জ করে আসি?”
“নো নীড।” আনিকা ফুলের বুকে ও গিফট পেপারে মোড়ানো একটা গিফট বক্স অরুণাভের দিকে ছুঁড়ে মারে।
অরুণাভ সেগুলো ধরে মুচকি হেসে বলল, “আমার জন্য?”
“না, আমার উডবি তৈমুর নেওয়াজের জন্য।”
অরুণাভের হাসি গায়েব হয়। মুখে গাম্ভীর্যতা এসে ঠায় জমায়। কিছু বলে না। আনিকার রাগ দ্বিগুণ হয়। বাহুতে কিল ঘুষি বসিয়ে বলে, “ইয়্যু ডোন্ট লাভ মি ভোর।”
“আই ডু!”
“নো ইয়্যু ডোন্ট। আ’ম নট ইয়্যুর ফার্স্ট প্রায়োরিটি।”
“ইয়্যু আর!”
“দেন চুজ যাস্ট ওয়ান! আনি ওর ক্রিকেট?”
হঠাৎ বিস্ফোরণ হলো আশেপাশে। কিন্তু কেউ ছোটাছুটি করছে না। না কারো মুখে আতংক বিরাজ করছে। তবে কি বিস্ফোরণ হয় নি? এটা কি তাঁর অলীক ধারণা! অরুণাভের মুখটা পূর্বের চেয়েও বেশি গম্ভীর দেখালো। সে রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধালো, “পাগল হয়েছিস?”
“হ্যাঁ হয়েছি। তুই বলেছিলি আম্মু আব্বু না মানলে আমরা পালিয়ে বিয়ে করবো। এখানে আমাকে আব্বু-আম্মু আর তোর মাঝে একপক্ষকে চুজ করার ছিলো। আমি তোকে চুজ করেছিলাম। এখন তুই বল তুই কাকে চুজ করবি! আমাকে নাকি ক্রিকেটকে?”
“আশ্চর্য তুই আমার ক্রিকেটকে কেন মাঝখানে আনছিস?”
ব্যস্ত রাস্তায় দুই মানব দাঁড়িয়ে। দূরত্ব খুব একটা দূরে না হলেও মনটা যোজন যোজন দূরে সরে আছে একে অপরের থেকে। ভোর কতটা জোড়ালো গলাতেই না বলল ‘আমার ক্রিকেট’। সে কি তার নয়? আনিকা কিছু না বলে হাঁটা দিলো উদ্দেশ্য হীন। অরুণাভ লম্বা পা ফেলে পায়ে পা মেলায়। দৃঢ় স্বরে বলে,
“চুপ করে আছিস কেন? তুই আমাদের মাঝখানে ক্রিকেটকে কেন আনছিস? আই লাভ ক্রিকেট এন্ড আই ওলসো লাভ ইয়্যু।”
“আগে ক্রিকেটটাই এলো।”
“হঠাৎ তোর কি হলো? এই ড্রেসআপে আমাকে বাজে লাগছে বলেই কি এতো রাগ?”
“হ্যাঁ। নিজেকে আয়নায় দেখ। কেউ বলবে না তুই বাপের অতি আদরে বড় হওয়া এক লাট সাহেব।”
অরুণাভ আনিকার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। হতাশ সুরে বলে, “আমি কোনো শপে গিয়ে চেঞ্জ করে নিচ্ছি। তুই প্লিজ রাগ করে থাকিস না আনি।”
“আই হেইট ইয়্যু বাডি! আম্মু ভুল বলে নি। তুইও চাচ্চুর মতো স্বার্থপর। চাচ্চু যেমন চাচিমণির ভালো মানুষীর সুযোগ নেয় তুইও তেমনটাই করবি। তুই চাচিমণিকে ঠকিয়ে ওই মহিলার সাথে দেখা করিস। শোন ভোর, আমি না চাচিমণির মতো ভালো মানুষ নই।”
অরুণাভের হাতের বাঁধন ঢিলে হয়। নিশ্চয়ই ভুলভাল শুনছে সে। আবারও অসহায় সুরে বলে, “আনি, শান্ত হ তুই। তুই যেমন বলিস আমি তেমনই চলবো। কোনো অভিযোগের অবকাশ রাখবো না। আই লাভ ইয়্যু না আনিবুড়ি।”
“তাহলে বল ক্রিকেট ছেঁড়ে দিবি। সাথে সমস্ত ফোর টোয়েন্টি স্বভাব।”
অরুণাভ অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে। আনিকার গলার স্বর নমনীয় হয়ে আসে। খুশির ঝিলিক স্পষ্ট। সে বলে,
“আম্মু বলেছে তুই সুধরে গেলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সে তোকে মেনে নিবে ভোর। তুই এসব ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হ। আর চাচ্চুর সাথে বিজনেস সামলা। আম্মুকে আমি ঠিক মানিয়ে নিবো।”
আনিকা জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে। অরুণাভের মাঝে সেরকম হেলদোল দেখা গেল না।দ্ব্যর্থকণ্ঠে আওড়ায়,
“কিন্তু আমি পারবো না মানিয়ে নিতে।”
আনিকার সমস্ত খুশি গায়েব। সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “প্রমাণ করলি তুইও একটা স্বার্থপর। চাচ্চুর মত…”
আনিকা থেমে যায় অরুণাভের প্রতিক্রিয়ায়। মুচকি হেসে বলল, “হাত নামালি কেন? নে থাপ্পড় মার?”
আনিকা গাল এগিয়ে আনে। অরুণাভ রক্তিম চোখে একপল চেয়ে হনহনিয়ে চলে যায়। ভরাট দিঘীর টলমলে জল উপচে পড়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………