হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ১২ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          আয়নার আজকাল মনে হয় তার জন্মস্থান নিশিখালিতে দামামা বাজিয়ে শীতের আগমন হতো। ভোরের আলো ফোটার আগে ধানের শীষে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো যখন আয়নার পায়ের গোড়ালি ছুঁয়ে যেত, তখন বুনো শীতলতা শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে যেত। গ্রামের সেই শীত ছিল হিমে ভেজা মাটির গন্ধ মাখা, নিশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকলে ভেতরটা জুড়িয়ে যেত।

​কিন্তু আহমেদ নিবাসের এই তিনতলার চিলেকোঠায় শীতের রূপটা একদম আলাদা। এখানে কুয়াশা ধোঁয়াটে, ধুলিকণার সাথে মিশে ধূসর পর্দার মতো জানালার কাঁচে লেপ্টে থাকে। শহরের এই রুক্ষ হিমাঙ্ক মানুষের হাড়ের ভেতর সূক্ষ্ম সুঁচের মতো বিঁধতে থাকে।

​প্রথম দিন যখন আয়না এই বাড়িতে পা রেখেছিল, পৌষ তখন কেবল জেঁকে বসতে শুরু করেছে। রোদ ছিল কিন্তু তাতে কোনো উত্তাপ ছিল না। সেই নতুন পরিবেশে আয়না ছিল নিজের অস্তিত্বের মতোই বিবর্ণ। 

আজ তিন সপ্তাহ পর শীত আরও গাঢ় হয়েছে। এখন মাঘের মাঝামাঝি। ভোরের দিকে জানালার গ্রিলগুলো এতটাই হিম হয়ে থাকে যে হাত দিলে মনে হয় বরফ ছোঁয়া লাগছে। ছাদ থেকে ভেসে আসে হাড়কাঁপানো বাতাস। প্রকৃতিতে ঋতু বদলায়নি, কিন্তু তার মেজাজ বদলেছে। বাতাস এখন থমথমে ও ভারী। মেঘেরা এখন আর ছন্নছাড়া নয়, বরং নিরেট সীসার পাতের মতো আকাশের গায়ে সেঁটে আছে। রোদ ওঠে দেরিতে, আর যখন ওঠে, তখন তার ম্লান আলোয় শহর অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ডুবতো থাকে। এই সব চিন্তাধারা এসে স্থির হয় একবিন্দুতে - এই প্রাণহীন শহর আয়নার পছন্দ হয়নি। 

তাও সময় থেমে থাকেনি।
​এই একুশ দিনে আয়নার প্রতিদিনের রুটিনটাও একটা ঘড়ির কাঁটার মতো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা পড়ে গেছে। প্রথম কয়েকটা দিন সে খুব ভোরে জেগে উঠত। মাহিরের অফিস যাওয়ার আগে তার নাস্তা বা চায়ের তদারকি করার একটা যান্ত্রিক তাগিদ ছিল তার ভেতর। এখন আর তা করা হয় না।

​আয়না চোখ মেলে পাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। মাহিরের বালিশটা তার জায়গা থেকে একটুও নড়েনি। মাহির এমনই, সে খুব গুছিয়ে ঘুমায়। বালিশের ভাঁজ পর্যন্ত নষ্ট হয় না। আয়না হাত বাড়িয়ে পাশের সেই খালি জায়গাটা ছুঁয়ে দেখে। বিছানার সেই অংশটা এখন একদম ঠান্ডা, মাহিরের শরীরের অবশিষ্ট উত্তাপটুকুও মাঘের শীত শুষে নিয়েছে।

​প্রতিদিনের মতো আজও আয়না বিছানা ছেড়ে নামল। তার পরনে একটা মোটা চাদর। সে ধীর পায়ে বাথরুমে গিয়ে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। ফ্রেশ হয়ে সে টেবিলটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাহিরের দেওয়া নতুন আলমারিটা ঘরের কোণায় এক নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। কাপড় পাল্টে আয়না জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে দিল। কুয়াশার আস্তরণ কিছুটা পাতলা হয়েছে, কিন্তু রোদ ওঠার নাম নেই। সে এক কাপ চা বানাল নিজের ছোট ইলেকট্রিক কেটলিতে। মাহির গত সপ্তাহে এটি তার জন্য নিয়ে এসেছে যাতে তাকে বারবার নিচে নামতে না হয়। চা শেষ করে আয়না চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল। এখন তাকে নিচে নামতে হবে।

​নিচের ডাইনিং টেবিলে বসে মিনি ও দিনা পড়ছে। মিনি ও দিনা দু'জন যমজ। মিনি তাকে দেখে হেসে দিল। বইয়ের পেছনে মুখ লুকিয়ে ইশারায় কথা বলল। দিনা ফিরেও তাকাল না। প্রথম দিন দিনার সাথে তার দেখা হয়নি, সে বান্ধবীর জন্মদিন উপলক্ষে বাইরে ছিল। জমজ অলিখিত নিয়মানুযায়ী মিনি ও দিনা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। তাও আয়না দিনার বিতৃষ্ণার তেমন কারণ খুঁজে পায় না।

​রহিমন বুয়া গজগজ করতে করতে একটা ট্রেতে করে চা-নাস্তা নিয়ে এসে আয়নার হাতে ধরিয়ে দিল। মিনি আগে দাদীকে নাস্তা দিয়ে আসত, কয়েকদিন ধরে আয়নাকে তা করতে হচ্ছে। সাহেরা বানু সকালের জলখাবার বিছানাতেই সারেন।

 আয়নাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি মহা বিরক্ত হওয়ার মতো বললেন, কয়টা বাজে? আমি না খাইয়া বেহুঁশ হইলেও তো কারো টনক নড়তো না। এই হইলো জীবন।

​আয়না খাবার এগিয়ে দিয়ে বলল, দশ মিনিট এদিক-সেদিক হলে কেউ জ্ঞান হারায় না দাদী।

-"হ! তুমি তো সব জানো। জ্ঞানের ভান্ডার তুইলা আনছে আমার সাধাসিধা নাতি।

-খুব সাধাসিধা!

-একদম ঠেস দিয়া কথা বলবা না নাতবৌ। লাখে একটা আমার মাহির।

-আমি দ্বিমতটা করলাম কোথায়? আপনি খেয়ে নিন আগে। ঔষধের সময় চলে যাচ্ছে।

-সবসময় সোয়ামীর কথা মতো চলবা। হাজারবার বলছি। তারে মহব্বত করবা, সেবা করবা তাইলেই দেখবা তোমারে মাথায় তুইলা রাখবে সে।

​সাহেরা বানুর 'সংসার ১০১' কোর্স আয়না দ্বিতীয় দিন থেকেই করছে। বৃদ্ধা এ যাবতকালের সব কৌশল তাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। নিজের জ্ঞানে তাঁর সন্দেহ নেই, তবে ছাত্রীটি অত্যাধিক অপদার্থ।

 সাহেরা বানু মনে মনে গাল দেন আয়নার দাদীকে। সেই বুড়ি নির্ঘাত জন্মের পর নাতনির মুখে মধু দেয়নি। মিষ্টি কী জিনিস নিজে জানে না দেখেই আবার সাহেরা বানুর পেছনে পড়েছে। জান দিয়ে যুদ্ধ করেও তিনি চায়ে চিনির পরিমাণ বাড়াতে পারছেন না। রাগে-দুঃখে চা খাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন, এতে একটা মানুষও কিছু বলল না আর এই পাষাণীরও হৃদয় নড়ল না।

​চিনি ছাড়া চা খেতে খেতে তিনি বললেন, হুদাই পাষাণী কই না তোমারে। কই থেইকা যে নিয়ে আসছে মাহির!

-নিশিখালি। কেন এনেছে সেটা উনি ফিরলে ওনাকেই জিজ্ঞাসা করবেন।

-খালি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। এর জন্যই বড় বউয়ের সাথে মিলমিশ হইতেছে না।

-সেটা ওনার কল্যাণেই হচ্ছে না। উনি পছন্দ না করলে আমি শুধু শুধু বিরক্ত করব কেন?

-এইগুলা খালি কও কেন? কেমন ধারার কথা এইসব! এইটা তোমার সংসার না?

​আয়না কোনো উত্তর দিল না। সাহেরা বানু বললেন, মাহির কি খাইয়া গেছে?

-ভোরবেলা চলে গিয়েছিল।
সাহেরা বানু কড়া কথা বলতে গিয়েও বললেন না। ওনার হতাশ লাগছে। আজকালকার মেয়েরা এমন হলো কেন!

-আজকে তার পছন্দের তরকারি রাইন্ধো, কেমন?
আয়না মাথা নাড়ল।

-জানো তো কী ভালা পায়?

আয়না চুপ করে থেকে বলল, সবই তো খায়। বিশেষ পছন্দ নেই তেমন।

সাহেরা বানুর মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। আয়না আবার বলল, এবং রান্নাঘরে যাওয়া আমার জন্য নিষেধ। চাচী রাগ করেন।

সাহেরা বানু শক্ত গলায় বললেন, "নাতবৌ তুমি যাও তো যাও।

-ঔষধ দিবো না?

-নাহ। তুমি বরং বিষ দাও আমারে। পাষাণী কোনহানকার!

—————

​আয়না মোটেই বাড়িয়ে বলেনি। শারমিন আরা নিজের সংসার নিয়ে প্রচণ্ড অধিকারপ্রবণ। সামান্য মশলার কৌটা অদলবদল হলেও চূড়ান্ত বিরক্ত হন। রহিমন বুয়া প্রায় সাত বছর ধরে কাজ করেও সবটা আয়ত্ত করতে পারেনি।

​বিয়ের দ্বিতীয় দিন। আয়না তখন এ বাড়ির নিয়মকানুন বুঝে ওঠার চেষ্টা করার নিয়ত করেছে। সেদিন খুব ভোরে সে রান্নাঘরে গিয়েছিল; ভেবেছিল ছোটখাটো কোনো কাজে সাহায্য করে শুরু করবে। কিন্তু পা রাখতেই দেখল শারমিন আরা চুলার পাড়ে দাঁড়িয়ে রহিমনকে ধমকাচ্ছেন। আয়না ঘরে ঢুকতেই তিনি একবার আড়চোখে তাকালেন, কিন্তু কোনো সম্ভাষণ করলেন না। 

আয়না সালাম জানিয়ে বলেছিল, চাচী, আমি কি এই সবজিগুলো কেটে দেব?

​শারমিন আরা কোনো উত্তর দিলেন না। আয়না কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কাজে হাত দিল। মিনিট পাঁচেক পর শারমিন আরা পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থেমে গেলেন। তিনি আয়নার দিকে তাকালেন না, বরং রহিমন বুয়ার দিকে ঝুঁকে কর্কশ স্বরে বললেন, 
রহিমন, চোখ কি ফেলে রেখেছিস? এই ঢাউস সাইজের আলু দিয়ে কি তোর বাপের বাড়ির রান্না করবি? পাতে যদি এমন বেঢপ সবজি পড়ে, তবে ওই থালা কি তোর মাথায় ভাঙবে? সবাই জমিদারি কায়দায় কাজ করতে চায়, অথচ কাটার শ্রী নেই।

​আয়না দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে আসে। সংসার করতে এসে ধৈর্য পরীক্ষা দিতে হয়নি এমন নারী বাংলার বুকে বিরল বটে।

​তারপর প্রথম সপ্তাহের শেষে একদিন আয়না দেখেছিল ডাইনিং টেবিলের টেবিলক্লথটায় দাগ লেগে ময়লা হয়ে আছে। 

সে নিজ উদ্যোগে সেটা পাল্টে নতুন একটা বিছিয়েছিল। ভেবেছিল, অন্তত এই ছোট কাজটুকুতে কারো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু শারমিন আরা বিকেলে ড্রয়িংরুম থেকে ফিরেই মিনির ওপর চড়াও হলেন। আয়না পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও তিনি তার দিকে তাকালেন না।

​-মিনি! আমাকে চোখে ধরে না? এতো সাহস কোথা থেকে আসে? এই সস্তা রঙের কাপড় টেবিলের ওপর কে বিছালো? রুচি কি সব বাজারে বিক্রি করে এসেছে? আমার অনুমতি ছাড়া বদলানোর কথা মাথায় আসে কীভাবে! সব দেখি নিজের ঘর মনে করে যা খুশি তাই করা শুরু করেছে!

​আয়না বুঝতে পারে তাকে বাইরের মানুষ আর রুচিহীন হিসেবে প্রমাণ করার কোনো সুযোগই শারমিন আরা হাতছাড়া করেন না।

 তিনি হয়তো প্রতিবারই কিছু প্রতিউত্তর আশা করেন। আয়নার চেহারায় সহজাত কাঠিন্য আছে। শারমিন আরা নিজের অর্ধেক জীবন সংসার করার পর এতটুকু চিনতে পেরেছেন যে, গ্রামে থেকেছে দেখে তথাকথিত নরম মাটির মতো মেয়ে সে নয়। প্রতিবাদ, তর্ক বা বেয়াদবি করলে তিনি মোটেই অবাক হবেন না। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। বেশ খানিকটা কড়া কথা মেয়েটা ভাবলেশহীন হয়ে হজম করে নিল। চোখেমুখে কোনো আহত ভাব ফুটে উঠল না।

​আয়না এরপর থেকে নিজ প্রয়োজন ছাড়া দোতলায় নামা বন্ধ করেছে। সংসারের কাজে সহযোগিতা না করতে হলে তার জন্য বরং ভালো, নিজের কাজে সে মনোনিবেশ করতে পারবে। এই সংসারকে নিজের করে নেওয়ার তেমন তাগিদ তার কাছে নেই।

​তাও কীভাবে কীভাবে যেন দাদীকে খাবার দেওয়ার দায়িত্বটা মিনি তাকে স্থানান্তর করে দিল। 

মিনি ও দিনা দুজনই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। এখন অ্যাডমিশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাত-দিন দরজা বন্ধ করে পড়ার বদলে মিনির মন পড়ে থাকে নতুন সদস্যের সাথে গল্প করার প্রতি। কিসের আর গল্প! মিনি একাই বকবক করে যায়। দশ বাক্যের বিনিময়ে আয়না একবার মুখ খোলে। এতেই মিনির ভালো লাগে। সে একটুও দমে যায় না। এক অজানা কৌতুহল ও মায়া তাকে গ্রাস করেছে। তাকে আর দাদীকে ছাড়া আর একটা মানুষও নতুন বউয়ের সাথে দুটো কথা বলে না। এটা কি ঠিক! 

মিনি কেন এত সময় ব্যয় করে এটা নিয়েও তার মা তাকে খুব কড়া করে বকে দিয়েছেন অনেকবার। মিনি আড়ালে লুকিয়ে-টুকিয়ে বেশি যেত কিন্তু তার ঘরের শত্রু বিভীষণ সব মাকে বলে দিয়েছে। দিনা দিনা দিনা! মিনির ইচ্ছে করে ওর সব চুল ছিঁড়ে নিতে। একদম সহ্য করতে পারে না সে নতুন ভাবীকে। তাদের মা শারমিন আরার মতো সেও শুধু রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে।

—————

এইতো ​সেদিন বিকেলে ম্লান আলো চিলেকোঠার মেঝেতে এসে পড়েছে। আয়না নিজের কয়েকটা সুতির শাড়ি ভাঁজ করে রাখছিল। ঘরটা একদম নিস্তব্ধ, কেবল তার পদচারণা ছাড়া আর কিছু নেই। 

তখন মাহির ঘরে ঢুকল। অন্যান্য দিন মাহির ঘরে ঢুকে সরাসরি হাত-মুখ ধুতে চলে যায় অথবা টেবিলে গিয়ে বসে। কিন্তু আজ সে দরজার কাছে এসে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতে ছোট একটা নীল মখমলের বাক্স। মাহিরের চেহারায় এক ধরণের অস্বাভাবিক আড়ষ্টতা। সে যেন কোনো একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে ঢুকেছে।

 আয়না আড়চোখে দেখল, মাহির কয়েকবার পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে আর বের করছে। সে সরাসরি আয়নার দিকে তাকাতে পারছে না, আবার দৃষ্টি সরিয়েও নিতে পারছে না।
​খানিকটা সময় পর মাহির ধীরপায়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। গলা পরিষ্কার করে নিয়ে খুব যান্ত্রিক স্বরে বলল, আয়না, একটু শুনবে?

​আয়না হাতের শাড়িটা বিছানায় রেখে ঘুরে দাঁড়াল। মাহিরের এই আড়ষ্ট গম্ভীর ভঙ্গি তাকে কিছুটা অবাক করল। সে বলল, বলো? চা খাবে?

​মাহির হাত বাড়িয়ে সেই ছোট বাক্সটা টেবিলের ওপর রাখল, এটা তোমার জন্য।

মাহিরের গলার স্বর বেশ নিচু। আয়না বাক্সটার দিকে তাকিয়ে আবার মাহিরের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে একরাশ প্রশ্ন। মাহির এবার একটু দ্রুত কথা বলতে শুরু করল, যেন কথাগুলো আগে থেকেই মুখস্থ করে এসেছে।

​-আসলে আমাদের বিয়ের পর তোমাকে আমার পক্ষ থেকে কিছু দেওয়া হয়নি। আমি জানি আমাদের বিয়েটার পরিস্থিতি তবুও... আমি গয়নাগাটি নিয়ে খুব নলেজেবল নই, আর খুব ভারী কিছু দেওয়ার জন্য সেরকম তৈরিও নই। এটা একদম সাধারণ একটা সোনার আংটি। পছন্দ হবে কি না জানি না।

​জান চলে গেলেও নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতা মাহির আয়নার সামনে মুখে আনতে পারে না। যতই সে বাস্তবতা নিয়ে সতর্ক করে নিয়ে আসুক না কেন মেয়েটাকে, সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা সবসময় সহজ হয় না। 

আয়না বিস্মিত হলো, আলতো করে বাক্সটা খুলল। ভেতরে খুব সরু একটা সোনার ব্যান্ড, যার মাঝখানে ছোট একটা নকশা করা। আংটিটা দেখতে ক্ল্যাসি হলেও একদম ছিমছাম। আয়না এক মুহূর্ত সেটার দিকে তাকিয়ে থেকে মাহিরের দিকে চাইল।

​-এসবের আসলে কোনো দরকার ছিল না।

আয়না খুব শান্তভাবে বলল, যেভাবে আমাদের বিয়েটা হলো, সেখানে এসব লৌকিকতা না থাকলেও আমি কিছু মনে করতাম না। তুমি এখন খামাখা টাকা খরচ করতে গেলে কেন?

​মাহির হঠাৎ আয়নার কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এক ধরণের বিষণ্ণতা খেলা করছে। সে আর্দ্র স্বরে বলল, 

এটা আমি কিনে আনিনি আয়না। এটা আমার মায়ের আংটি। মার খুব প্রিয় ছিল এটা। এতদিন এটা আমার আলমারির ড্রয়ারে তালাবন্ধ ছিল। আজ সকালে হঠাৎ মনে হলো, এটা এখন তোমার হাতেই থাকা উচিত।

​আয়না থমকে গেল। আংটিটার গুরুত্ব মুহূর্তেই কয়েকগুণ বেড়ে গেল তার কাছে। সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়ল।

-না, তাহলে এটা আমি নিতে পারব না। এটা তোমার মায়ের প্রিয়, শেষ স্মৃতি। নিশ্চয়ই তোমার কাছে এটার আবেগ অনেক বেশি। আমার মতো মানুষকে এমন অমূল্য জিনিস দিয়ে তোমার মায়ের স্মৃতিকে ছোট করবে না। এটা তোমার। তোমার কাছেই রাখো।

​মাহির এক মুহূর্ত থমকাল। তারপর দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, 
না, আমি চাই এটা তোমার কাছেই থাকুক। আমি তোমাকে এটা দিয়েছি মানে এটার ওপর এখন তোমারই অধিকার। আয়নাকে অস্বস্তিতে পড়তে দেখে সে বুঝিয়ে বলল, 

এই আংটিটাকে আমার আমানত ভাবতে পারো। আয়না, তুমি এটাকে রাখলে আমি শান্তি পাব।

​আয়না মাহিরের জেদ দেখে আর কথা বাড়াল না। সে ভাবল আংটিটা নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দেবে। সে হাত বাড়িয়ে খুব সহজভাবে বলল, ঠিক আছে, দাও তবে। আমি সাবধানে রাখব।

​আয়না হয়তো আশা করেছিল মাহির আংটিটা তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে নামিয়ে দেবে। কিন্তু মাহির নড়ল না। সে কয়েক সেকেন্ড আয়নার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব অস্ফুট স্বরে বলল, 
ইউ আর সো স্ট্রেঞ্জ!

​আয়না অবাক হলো, কিছুই বুঝল না। মাহির একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আয়নার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মাহিরের হাতের তালুটা বেশ গরম, আর আয়নার হাতটা শীতল হয়ে আছে। মাহির খুব মনোযোগ দিয়ে আয়নার অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু আংটিটা অর্ধেকটা পথ যেতেই মাহিরের আঙুলগুলো জমে গেল।

​আয়নার হাতের ওপর এখনো বিয়ের মেহেদির হালকা লালচে দাগ লেগে আছে। আর সেই নকশাগুলোর ঠিক মাঝখানে স্পষ্ট করে ক্যালিগ্রাফি স্টাইলে ইংরেজি বর্ণে ছোট্ট করে লেখা একটি নাম— রাজীব। 

মাহির যেন পাথর হয়ে গেল। তার চোখের মণি স্থির হয়ে রইল সেই নামটার ওপর। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে তার ধারালো চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল। সে অবিশ্বাস্য চোখে একবার নামটার দিকে আর একবার আয়নার দিকে তাকাতে লাগল।

​আয়না দেখল মাহির একদম থমকে গেছে। সে কোনো কারণ খুঁজে পেল না। বরং খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, ওটা রাজীবের নাম। বিয়ের আগের দিন আমাদের বাড়ির সবাই মিলে মেহেদি দিয়েছিল তো, তাই ওর নামটাই লেখা হয়েছিল। অর্গানিক মেহেদির রঙটা বেশ গাঢ় ছিল, তাই এখনো পুরোপুরি ওঠেনি।

​আয়নার এই স্বাভাবিক ভঙ্গিটা মাহিরের ভেতর যেন আগ্নেয়গিরি জ্বালিয়ে দিল। আয়নাকে সে নিজের রোষের কারণ ঠিকমতো বলতে পারল না। কেমন সংকোচ হতে লাগল। কিন্তু ভেতরকার তপ্ত অনুভূতি মোটেই কমল না। হয়তো সম্পর্কের জোরে অধিকারবোধ জন্ম নিতে শুরু করেছে। 

সে কয়েকবার বিদঘুটে নামটা মোছার হাস্যকর চেষ্টা করল। আয়না মাহিরকে তুচ্ছ বিষয়ে চিন্তিত দেখে অবাক হলো। এ আর এমন কী! কিন্তু ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর। সে ভ্রু কুঁচকে আয়নার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। বিরক্তিতে তার কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। আয়নার হঠাৎ ইচ্ছে করল হাত লাগিয়ে ললাটরেখা সরল করে দিতে, কিন্তু বুদ্ধিমতী মেয়ের মতো সে এই ইচ্ছা সন্তর্পণে দমন করল।

​মাহির আবারো কয়েকবার বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আয়নার হাতের তালু ঘষে দিল। এতে কিছু বদলালো না। আয়না তার অদ্ভুত কার্যক্রম দেখতে লাগল। হাত যে টান দিয়ে নিয়ে নেবে সে উপায়ও নেই! ভদ্রলোক বেশ গম্ভীর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘষতে ঘষতে নাজুক শীতল ত্বকে উষ্ণতা ছড়িয়ে যাওয়ার পরেও মাহিরের মনোবাসনা পূরণ হয় না, আর না হয় তার ধৈর্যের অন্ত। আয়না হতাশ সুরে বলে, এভাবে হাত ঘষলে কোনো লাভ নেই, মাহির।

-রঙ উঠবে না? কী করলে উঠবে তবে?

-এক্ষুনি উঠানো কি খুব প্রয়োজন? সময়ের সাথে যাক।

-জি। তোমার হাতে অন্য কারো নাম দেখে আমার প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে, আয়না।

​আয়না সে কথা শুনে যেন বিষম খেল। অকপটে এইসব কথা হুটহাট কী করে বলে ফেলে মাহির? আর কেনই বা বলে? এমনটা কি হওয়ার ছিল নাকি!

​তারপরেও অনেকদিন মাহির এ নিয়ে নিজের শান্ত বিচক্ষণ স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করেছিল। রঙ পুরোপুরি যাওয়ার পরই বোধহয় তার স্বস্তি এসেছিল। 

আজকাল আয়না মাহিরের কথা তেমনভাবে ভাবে না। লোকটা নেহাৎ ভদ্রলোক। অপ্রীতিকর কোনো কিছুতে আয়নাকে পড়তে দেয়নি। প্রতিনিয়ত তার স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। আয়না নিজেও তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কোনোভাবেই সে মাহিরকে পাল্টা ভালো রাখার সুযোগ পায় না। নিজেকে নিয়ে প্রচণ্ড অন্তর্মুখী সে। মানুষের মাঝে যেন ছায়ার মতো বিচরণ করে। আয়না নিজেও তার তৈরি দেয়াল ভাঙতে আগ্রহী নয়। যতটুকু দরকার ততটুকু তো করবে আয়না!

​সে রাতের ঘটনার পর থেকে খানিক সংকোচ কাজ করে তার মাঝে, অথচ মাহির কেমন স্বাভাবিক ছিল। আয়নার আদ্যোপান্ত জেনে নিয়ে তার সামনে তুলে ধরেও এমন করেছিল যেন কিছুই করেনি সে। আয়না অতসব ভাবতে চায় না। ল্যাপটপ খুলে কাজ নিয়ে বসবে এমন সময় সিঁড়িতে পদচারণার শব্দ শোনা যায়। এরকম ভারী শব্দের মালিক আয়নার গৃহস্বামী ছাড়া আর কেউ নয়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp