ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি,
উড়োচিঠি বাকি আর নেই।
জানা অজানার ভিড়ে কেন তবু
বারবার খুঁজি তোমাকেই?
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দুই ঘণ্টার সাধনা এই চারটা লাইন। কিন্তু এই জঘন্য জিনিস লিখতেই কি মৌ নিজের দুইটা ঘণ্টা নষ্ট করে ফেললো?
চোখ-মুখ কুঁচকে মৌমিতা টান দিয়ে কাগজটা ছিঁড়ে নিলো খাতা থেকে, তবে কাগজটা ছিঁড়তে মন চাইলো না। সে জানালার বাইরে তাকায়। কী সুন্দর বাতাস!
ফুপুদের এই দোতলা বাড়িটা মৌমিতার পছন্দ হয়েছে। বিশেষ করে এই ঘরটা।
ঘরটা তার ফুপাতো বোন রিতার। বেশ গোছানো, পরিপাটি একটা ঘর, জানালার পাশে পড়ার টেবিল; বিছানার পাশেও আরেকটা জানালা। চারদিক থেকে আলো আসছে।
রিতা খাওয়ার ঘরে, বড়দের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। সে বয়সে মৌমিতার চেয়ে খুব বেশি বড় নয়। তবু বড়দের সাথে কীভাবে যেন মিশে যায়। মানুষ এতোটা সামাজিক হয় কীভাবে?
মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেলে। তারপর হাতে থাকা কাগজটা ভাঁজ করতে থাকে... কাগজের উড়োজাহাজ বানিয়ে ফেলে। সেটাকে ঘরের ভেতর উড়িয়ে দিয়ে শিশুসুলভ আগ্রহে তাকিয়ে থাকে। পরমুহূর্তেই নিজের উপর চরম বিরক্ত হয় সে।
কে বলবে, এই মেয়েটা এবার মেট্রিক পাশ করেছে?
মৌমিতা কাগজের বিমানটা খপ করে ধরে ফেললো। তারপর সেটাকে ছুঁড়লো জানালার বাইরে।
বিকেলের শান্ত, নির্জন রাস্তা। একটা ছেলে একাকী হেঁটে যাচ্ছে। মৌমিতার দুর্ভাগ্য, তার কাগজের প্লেন এতো বিশাল ফাঁকা রাস্তা ছেড়ে ঐ ছেলেটার মাথাতেই গিয়ে ঠোকর খেয়ে মাটিতে পড়লো! মৌমিতা শ্বাস আটকে চেয়ে চেয়ে দেখলো, ছেলেটা শুষ্ক সড়ক থেকে কাগজের টুকরোটা তুলে নিচ্ছে।
জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার অবাধ্য হৃদযন্ত্র লাফাতে শুরু করলো। ছেলেটা যদি কাগজের ভাঁজ খুলে লেখাটা পড়ে ফেলে? যদি পেছনে ঘুরে তাকে দেখে ফেলে?
ছেলেটা পেছনে ঘুরলো। মৌমিতা এক লাফে লুকিয়ে পড়লো দেয়ালের আড়ালে। তার মনে হলো, ছেলেটা তার ভীষণ চেনা, কোথায় যেন দেখা হয়েছে তাদের।
মৌমিতা ধীরে ধীরে আবার উঁকি দিতেই যাচ্ছিলো, তখনই খাওয়ার ঘর থেকে আওয়াজ এলো, “মৌ মা?”
মৌমিতা সটান দাঁড়িয়ে পড়লো, “জ্বী আব্বা!”
“চলো মা, আমরা এখন বের হই।”
—————
জুলাই, ২০১৫ সাল।
রমজান মাস।
রাজধানী। বনানীর একটি ভবনের চতুর্থ তলায়, দক্ষিণ দিকের দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটি, সুস্মিতা বিনতে মাহফুজ। দরজার পাশেই দেয়ালে ঝুলছে একটা নামফলক—‘মাহফুজ কুঞ্জ’। দরজায় ঝুলছে তালা।
সুস্মিতা খুব বিরক্ত হয়ে ব্যাগে চাবি খুঁজছে, তার পরনের স্কুল ইউনিফর্ম ঘামে ভিজে গেছে। মেয়েটার গলা যেন শুকিয়ে কাঠ, এদিকে ইফতারের আরও অনেক দেরি।
ব্যাগের সামনের পকেটে অবশেষে চাবিটা পাওয়া গেলো। নিজের স্মৃতিশক্তিকে ধিক্কার জানায় সুস্মিতা!
বাড়িতে আর কেউ নেই। মূল দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে, সুস্মিতা ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে নিজের ঘরে আসে। ভেতরে ভ্যাপসা গরম। জানালা দুটো খুলে দিয়ে ফ্যানের সুইচ চালু করলো সে। ফ্যানটা খটখট শব্দ করে সর্বোচ্চ গতিতে ঘুরতে থাকে। ঘর্মাক্ত শরীরে বাতাস লাগতেই মেয়েটা একটু কেঁপে ওঠে। মাথা থেকে স্কার্ফ খুলতে খুলতে নিজের ঘরে চোখ বুলিয়ে নেয়। ঘরটা যথেষ্ট অগোছালো।
বিছানার উপর অপরিচ্ছন্ন আর সদ্য ধুয়ে রাখা জামাকাপড় একাকার হয়ে পড়ে আছে। বালিশটা চেয়ারের উপরে, বালিশের জায়গায় পড়ে আছে একটা বই। মেঝের উপর একটা কালো পেনসিল পড়ে আছে, যা সুস্মিতা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে খুঁজছিলো।
কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তার চোখ পড়লো টেবিলে রাখা ধূসর মলাটের ডায়েরিটার উপর। আজকে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা এখনই লিপিবদ্ধ করতে হবে, তবে যদি মনটা একটু হালকা হয়।
সুস্মিতা দুইহাতে চোখ মুছে, চেয়ারের উপর থেকে বালিশটা সরিয়ে রাখে। চেয়ারে বসে ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকে।
ডায়েরিটা অনেক পুরাতন। সুস্মিতার ১৪ বছরের এই জীবনের অনেক ঘটনাই লেখা আছে এখানে। এই ডায়েরি সুস্মিতাকে তার মা দিয়েছিলেন। এমনকি, সুস্মিতা যেদিন জন্ম নেয়, সেদিনই তার মা এই ডায়েরির প্রথম লাইনটা লিখেছিলেন—
“আজকে আমার মেয়ের জন্মদিন।”
এরপর থেকে ডায়েরিটা সুস্মিতার। তার মা এতে আর কিছু লেখেননি।
সুস্মিতা লম্বা শ্বাস ফেলে কলমটা হাতে নেয়া মাত্রই কলিংবেল বেজে ওঠে। সে হন্তদন্ত করে ডায়েরিটা কোনোমতে বইয়ের আড়ালে চাপা দেয়, তারপর দরজা খুলতে যায়।
“কখন এসেছো?” দরজা খুলতেই প্রশ্ন করলেন সুস্মিতার মা মৌমিতা খন্দকার। সুস্মিতা নিচুস্বরে উত্তর দিলো, “কিছুক্ষণ আগেই।”
মৌমিতা ভেতরে এলেন। দরজা লাগাতে লাগাতে বললেন, “গোসল করো, যাও।”
তিনি ঘুরে তাকালে দেখতে পারেন, সুস্মিতা ইতোমধ্যে নিজের ঘরে চলে গেছে।
—————
ঘড়িতে প্রায় দেড়টা বাজে।
মৌমিতা বারান্দার দড়িতে ভেজা কাপড় গুলো ঝুলিয়ে দিলেন। বেশ রোদ উঠেছে, বারান্দার উত্তপ্ত মেঝেতে পা রাখাই যাচ্ছে না। এমন সময়ে ফোনটা বেজে উঠলো। মৌমিতা ঘরে এসে টেবিল থেকে ফোন তুলে কানের কাছে ধরলেন।
“আসসালামু আলাইকুম আপা। কী খবর তোমার?”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।” মৌমিতা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “আছি আলহামদুলিল্লাহ। তোর কী অবস্থা মার্জু? তোরা নাকি ঈদে নাটোরে যাবি, শুনলাম।”
“হ্যাঁ। তামিম হওয়ার পর থেকে তো যাওয়াই হয়নি। আম্মার সাথে দেখা হয় না প্রায় এক বছর হবে। সেজন্য ভাবলাম, ঈদ ওখানেই করবো।”
“ভালো বুদ্ধি। যা তাহলে। পেছনের বাগানটার যে কী অবস্থা... যাওয়ার পর ফোন দিবি আমাকে।”
“এবার তোমরাও আসো আপা। সবাই না থাকলে ভালো লাগবে না। সুস্মিতা আর সৌম্যকেও দেখি না কতোদিন হলো—”
“ঈদের পরে যাবো, ইনশাআল্লাহ।”
“উঁহু। ঈদের আগেই আসো। একটাবার বাপের বাড়িতে ঈদ করলে কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে? তোমার কলেজও তো ছুটি, না? নাকি ডাক্তার সাহেব ঝামেলা করবে?”
মৌমিতা হেসে ফেলেন, “না না, সুজয় ঝামেলা করবে না। আমিই বলছিলাম—”
“আপা, প্লিজ। সবাইকে নিয়ে এবার বাড়িতে আসো। আমি একা একা কী করবো ওখানে? আম্মার সাথেও দেখা হবে... তুমি আসবা কিন্তু সবাইকে নিয়ে। এটাই ফাইনাল।”
“আহা, মার্জিয়া—”
ফোন কেটে গেলো। মৌমিতা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ঘর থেকে বের হলেন। সুস্মিতার ঘরের দরজাটা খোলা। সে চেয়ারে বসে একমনে কিছু একটা লিখে যাচ্ছে। তার গায়ে এখনও ঘামে ভেজা স্কুলের পোশাক। মৌমিতা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এখনও গোসল করোনি কেন?”
সুস্মিতা ঠাস করে ডায়েরিটা বন্ধ করলো, পেছনে ঘুরে বললো, “হ্যাঁ, যাচ্ছি।”
মৌমিতা আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইলেন, আশেপাশে তাকিয়ে বেশ বিরক্ত হলেন, “ঘরের কী অবস্থা করে রেখেছো? এতো বড় মেয়ে, ঘরটা একটু ভালো করে গুছিয়ে রাখতে পারে না।”
সুস্মিতা উঠে দাঁড়ালো। মৌমিতা আবার বলেন, “গোসলে যাও।”
“যাচ্ছি।”
সুস্মিতা গোসলে যায় না। টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েই অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৌমিতা খাটের উপরে ছড়িয়ে থাকা কাপড়চোপড় গুছিয়ে দিতে দিতে বললেন, “ঈদ কোথায় করতে চাও? তোমার খালামণি ফোন দিয়ে বললো, ওরা সবাই এবার নাটোরে যাচ্ছে। তোমার ইচ্ছা কী?”
সুস্মিতা বলে ওঠে, “ওগুলো রাখো তো আম্মু, আমি গোছাচ্ছি।”
মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন মৌমিতা। কিছু একটা বলতে যাবেন, তখনই দরজায় শব্দ হলো।
সৌম্য এসেছে। কলিংবেল থাকা সত্ত্বেও ছেলেটা দরজায় তবলা বাজাবেই। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বাড়িতে ঢোকার পর তার প্রথম কাজটা হলো, কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে সেটাকে সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলা। তার নিশানা বেশিরভাগ সময়ই ব্যর্থ হয়। সে কেবল স্কুল ব্যাগের সাহায্যেই দুইটা ফুলদানি আর টেবিলের উপরের কাচ একবার ভেঙে ফেলেছে। তবুও তাকে এই ব্যাগ ছোঁড়াছুঁড়ি থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি। আজ অবশ্য সৌম্য কোনো গণ্ডগোল করলো না। আজকে সে বাড়ি ফিরতে একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে। মৌমিতা এটা নিয়ে বকাবকি করলেন না। কেননা ঈদের আগে এটাই ছিলো শেষ ক্লাস। আর তাছাড়াও, রমজান মাসে ছেলেটার লাফালাফি এমনিতেই কমে যায়। তাই বকাবকির পরিমাণও কমানো হয়।
“ঈদ কোথায় করবা এবার? তোমার খালামণিরা নাটোরে যাচ্ছে।”
“নাটোরে?” সৌম্য একটু ভেবে বললো, “তাহলে আমরাও ওখানেই যাই? নানাবাড়িতে তো কখনও ঈদ করা হয়নি। একবার তো করাই যায়।”
“তোমার আপুকে জিজ্ঞেস করো তো, সে কী চায়—”
“না, আপুকে তুমি বলো।”
সৌম্য অনীহা দেখালো। ঘরে ঢোকার আগে ব্যাগ খুলে সোফার দিকে ছুঁড়লো। কিন্তু সেটা গিয়ে মেঝের উপর পড়লো।
ইফতারের পর সৌম্য মসজিদে গেছে। প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলো, কিন্তু ছেলেটা এখনও ফিরলো না। মৌমিতা পায়চারি করতে করতে সৌম্যর ঘরে ঢুকলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, ছেলেটা বাসায় ফিরলেই এবার ভালোমতো বকা দিবেন! ইদানিং একটু বেশিই বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে সে। কালকেই ঘরটা পরিষ্কার করা হলো, কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভাইবোনের ঘরই যেন আস্তাকুঁড়ে পরিণত হয়েছে। কয়েকটা দিন ঠিকভাবে শাসন না করায় দুইজনই মাথায় চড়ে নাচতে শুরু করেছে। মৌমিতা সামনে তাকালেন। সৌম্যর পড়ার টেবিলের উপর, কালো কালির মার্কারে লেখা—
“নাম: সৌম্য ইবনে মাহফুজ
শখ: ক্রিকেট খেলা।
পিতার নাম: মাহফুজুর রহমান সুজয়
পেশা: নিউরোলজিস্ট
শখ: বউয়ের বকাবকি থেকে বাবুদের রক্ষা করা।
মাতার নাম: মৌমিতা খন্দকার
পেশা: কলেজের অধ্যাপক
শখ: নিয়মিত নিউজ পেপার আর বই পড়া।
বোনের নাম: সুস্মিতা বিনতে মাহফুজ
শখ: ফ্রিজ থেকে আঙ্গুর চুরি করে খাওয়া এবং ছোট ভাইকে নির্যাতন করা।”
মৌমিতা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হেসে ফেললেন। দেয়ালে দাগ দিতে ওদের হাজারবার নিষেধ করা হয়েছে। এদিকে সৌম্য পুরো বংশপরিচয় লিখে রেখেছে দেয়ালে।
সুস্মিতা আর সৌম্য পুরোপুরি বিপরীত স্বভাবের। একজন পৃথিবী উল্টে গেলেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে, আর অন্যজন নিজেই লাফাতে লাফাতে পৃথিবী উল্টে দেবে।
মৌমিতা রান্নাঘরে ঢুকলেন। চাল ধুয়ে ভাত বসালেন। বাসন মাজতে মাজতে ভাবলেন, নাটোরে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে সুজয়ের সাথে কথা বলবেন। সুজয় অবশ্য কোনো কিছুতে সরাসরি আপত্তি জানান না। তবু, মৌমিতার শাশুড়ি যদি ঈদে ঢাকায় আসার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে এবারও কোথাও যাওয়া হবে না।
কপালের উপরের ছোট ছোট চুলগুলো চোখে মুখে লেপ্টে যাচ্ছে। মৌমিতা বিরক্ত হয়ে কয়েকবার সরানোর চেষ্টা করলেন। তার দুই হাত আপাতত ব্যস্ত। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তিনি মুখ ঘুরিয়ে উচ্চস্বরে ডেকে ওঠেন, “সুস্মিতা? সুস্মিতা?”
কেউ সাড়া দিলো না। মৌমিতা আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। ভেজা হাতে মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরালেন, বিড়বিড় করে বললেন, “এত্তো বড় একটা মেয়ে। একটা কাজেও লাগে না। নিজের কাজগুলোই ঠিকমতো করে না, তার উপর—”
মাথাটা একটু বেশিই ব্যথা করছে। ভেতরে যেন কেউ ঢোল বাজাচ্ছে। মৌমিতা সরু চোখে দরজার দিকে তাকালেন, ঢোলটা আদতে ওখানে বাজছে! সৌম্য চলে এসেছে।
—————
সুজয় বাড়িতে ফিরলেন রাত নয়টার দিকে। মৌমিতা তাকে বারবার বলেছেন রমজান মাসে যেন এবার ছুটিটা তিনি তাড়াতাড়ি নেন। সেটা সম্ভব না হলেও, অন্তত ইফতারের আগে যেন বাড়িতে ফেরেন। সুজয়ও প্রতিবার মাথা নেড়ে বলেছেন, “আচ্ছা।” তবে এখন পর্যন্ত কথাটা রাখতে পারেননি।
মৌমিতাকে দেখে মনে হলো, ভীষণ রেগে আছেন। সুজয় তাকে আগ বাড়িয়ে কিছু বললেন না।
সৌম্য সোফায় বসে টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছে। সুজয় পাশে এসে বসলেন। সৌম্য ফিসফিস করে বললো, “আজকেও তুমি ফেইল। দেখো, কয়টা বাজে—”
সুজয় ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকান, “ফেইল কেন? গতকাল এসেছিলাম রাত এগারোটায়। আর আজকে রাত আটটায়—”
“এহ্! নয়টায়।”
“তবু, গতকালের হিসেবে তো পাশ হয়।”
“উঁহু, ফেইল।”
সুজয় এদিক ওদিক তাকালেন, “সুস্মিতা কোথায়? পড়াশোনা করছে?”
“নাহ। গোসল করে।”
“এতো রাতে?”
“মৌমিতা খন্দকারের মেয়ে বলে কথা!”
মৌমিতা সুইচে চাপ দিতেই ঘরটা আলোকিত হয়। সুস্মিতা কিছুই গোছায়নি। যেটা যেভাবে ছিলো, সেভাবেই পড়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি পড়ার টেবিলটার দিকে এগিয়ে গেলেন। খাটের উপর থেকে বইটা নিলেন, পড়ার বই নয়, গল্পের বই! সেটা টেবিলের নিচের তাকে রেখে দিলেন। তার চোখ পড়লো ডায়েরিটার উপর। ধূসর মলাটের ডায়েরি। আগে অবশ্য মলাটটা রূপালি ছিলো। সময়ের সাথে সাথে উজ্জ্বলতা কমে গেছে। মৌমিতা খুব সাবধানে ডায়েরির পাতা ওল্টালেন। দ্বিতীয় পাতার এককোণে একটা মেঘ আঁকা, কালো কালিতে। মৌমিতার হাতটা কেঁপে উঠলো। অনেকক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন।
বাথরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ হলো। মৌমিতা ডায়েরিটা বন্ধ করে মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সুস্মিতার ঘর, আর মৌমিতাদের ঘর মুখোমুখি। ঐ ঘর থেকে মৌমিতার ঘরের পুরোনো আলমারিটা সোজাসুজি দেখা যায়। মৌমিতা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আলমারির দিকে তাকালেন। ডানপাশের অংশে সুজয়ের কিছু ফাইলপত্র রয়েছে, মৌমিতার গয়নাসহ আরও বেশকিছু জিনিস রয়েছে। তবে আলমারির বামপাশ কখনোই খোলা হয় না। সুস্মিতা আর সৌম্য ছোটবেলায় এই বিষয়টা নিয়ে খুব কৌতূহলী ছিলো। এখন তাদের আর আগ্রহ কাজ করে না। অবশ্য তারা জানে না, এই পুরোনো কাঠের আলমারির বামপাশটা তাদের মায়ের একটা ক্ষত বহন করে যাচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে।
মৌমিতা বিছানায় বসলেন। তার মনের আকাশে এই মুহূর্তে একটা মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। কালো কালিতে আঁকা, ধূসর মলাটে বন্দী একটা মেঘ। আর কিছু পুরোনো স্মৃতি।
২৪ বছর আগের কোনো একটা দিন।
কলেজের পুরোনো লাইব্রেরি। সেটারই এক কোণে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে কলেজপড়ুয়া মৌমিতা। লাইব্রেরি মোটামুটি ফাঁকা, চুপচাপ। জানালার ঐ পাশ থেকে বৃষ্টির শব্দ আসছে কেবল।
নীরবতা ভেদ করে কেউ বলে উঠলো, “এই যে আপু? এটা আমার জায়গা।”
মৌমিতা বই থেকে মুখ তুলে সামনে তাকায়। ছেলেটাও বেশ আগ্রহ সহকারে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বয়স কতো হতে পারে ছেলেটার? মৌমিতা সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো। নিশ্চয়ই প্রথম বর্ষে, আগে তো এই ছেলেকে সে কখনও দেখেনি। অবশ্য মৌমিতা কাউকেই সেভাবে দেখে না, চেনে না। চিনলেও মনে রাখে না।
“আপু, আপনি অন্য কোথাও গিয়ে পড়েন। এই জায়গা ছাড়া আমার পড়া হয় না।”
ছেলেটা হাসিমুখে কথাগুলো বলে, গালে টোল পড়ে। মৌমিতা তার কথায় পাত্তা না দিয়ে আবার বইয়ের দিকে তাকালো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উপেক্ষিত মানুষটা আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। ধীরে ধীরে তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে যায়। ছেলেটা পাশের টেবিল থেকে শব্দ করে একটা চেয়ার টেনে আনলো। তারপর মৌমিতার সামনেই বসে পড়লো। মৌমিতা কেবল এক ঝলক তাকায় তার দিকে। ক্ষোভ প্রকাশের ঐ ব্যর্থ, অথচ কোলাহলপূর্ণ চেষ্টা দেখে মেয়েটা বেশ মজা পেয়েছিলো সেদিন!
তখন সে এই ছেলেটাকে চিনতো না, চেনার চেষ্টাও করেনি। কিন্তু পরবর্তীতে খুব অদ্ভুত একটা কারণে তাদের পরিচয় হয়েছিলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………