হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ১৮ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          শারমিন আরার মাথা দপদপ করে জ্বলছে। রুম অন্ধকার করে শুয়ে আছেন। দিনা কয়েকবার কথা বলতে এসে কড়া ধমক খেয়েছে। রহিমন বুয়া এসে তার দুঃখের কথা শুনিয়ে গেছে। আগে রাতের বেলা নিজের বাসায় যাওয়ার আগে স্বামী-সন্তানের জন্য বক্স ভর্তি খাবার নিয়ে যেত। নতুন বৌয়ের এই জুলুম সে মোটেও মেনে নিতে পারছে না।
শারমিন আরা বাড়ির একটা পাতা নড়লেও খবর রাখেন, এ ঘটনা জানবেন না তা হয় নাকি? তাও রহিমনকে পুরো ঘটনা বলতে বললেন।

রহিমন সুযোগ মতো প্রাণ খুলে আয়নার দুর্ব্যবহারের কথা বলে দিল। নতুন বৌ তার কাছে ভাত-তরকারির হিসাব চেয়েছে। মাহিরের জন্য রাতের খাবার ঠিক মতো থাকেনা কেন তা নিয়ে রহিমনকে ধরেছে। মাহির তো নিশ্চয়ই অফিসে খেয়ে নেয়। এতোদিন তো এসব নিয়ে কোনো কথা উঠেনি। সব আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা! রুইয়ের ভালো পিসটা কি এখন গুরুজন, রামিন, দিনা-মিনাকে রেখে ওনার জন্য তুলে রাখতে হবে?

শারমিন আরা বেশিক্ষণ শুনতে পারলেন না। কর্কশ স্বরে বললেন, আমাকে মহাভারত শুনিয়ে লাভ কি? যার কথা পারলে তাকে বলো। জাহান্নামে যাক এই সংসার!

রহিমন ভেবেছিল শারমিন আরা হয় আয়নাকে ঝাড়ি মেরে সোজা করবে অতবা রান্নায় আনাচের পরিমান বাড়িয়ে দিবে। দুটোর কিছুই হলো না।

শারমিন আরার মাথা ব্যাথার সূত্রপাত রামিনের থেকে। এই নষ্ট ছেলে তার জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সব সময় কোন না কোন ভাবে জোগাড় করলেও এই নতুন জেদ মেটানো উনার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। সেদিনের পর মনসুর সাহেবের ব্যবসা আর কোনোদিনই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেনি। এখনতো শুধু চলার জন্য চলছে কোনোরকম। মাহির আগে বেতনের পুরো খামটাই তার বেডরুমের টেবিলে রেখে যেত। এখন সেটাও বদলে গেছে। সব ঝামেলা তার জন্যই আসে!

এইসবের মধ্যে আয়নার রামিনের সাথে বাড়াবাড়ির ব্যাপার তার কানে এসেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো তার ছেলে এ নিয়ে তার কাছে বিচার দিতে আসেনি, উল্টো চেঁচামিচি বন্ধ করে উদাসীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ এর জের ধরে এই গ্রামের মেয়েটাকে জন্মের মতো সিধা করে দিতে পারতেন। কতো বড়ো সাহস তার ছেলেকে যা-তা বলতে আসে!

কোনোকিছুই তার মন মতো হচ্ছে না। সবাই কেমন বিয়ের ব্যাপারটা সহজভাবে মেনে নিয়েছে। গৃহপ্রবেশের সাথে সাথে সারা বাড়ির আবহাওয়াটাই পাল্টে গেল! শেষ এমন হয়েছিল মায়মুনার সময়। এরা একেক বার আসে আর শারমিন আরার আয়ত্ত, আধিপত্যে ঘুণ ধরিয়ে দেয় সহজেই! না পরিশ্রম করেই সব পেয়ে যায় তারা। হ্যামিলনের ইঁদুরদের মতো সবাইকে বশ করে নেয় পলকেই।

—————

আয়না কুলসুম বেগমের জন্য একটা ডেলিভ্যারি পাঠিয়েছিল। সেটা পেয়েছে কিনা খবর নিতে কল করাই তার কাল হলো! 

বকাঝকা করতে করতে আয়নার কান তিনি ঝালাপালা করে দিলেন। টাকাপয়সার মূল্য নিয়ে গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞান দিলেন। মাহিরের স্ত্রীভাগ্যের জন্য হা-হুতাশ করলেন।

আয়না বলল, তোমার আফজাল মেম্বারের নতুন ভাইরাল ভিডিও দেখলাম। সাংবাদিককে মারতে যাওয়ায় সবাই পাকরাও করেছেন। এর আগে দেখলাম দিনমজুরের সাথে দুর্ব্যবহারের ভিডিও। এই নিয়ে মনে হয় সাতবার হলো? এতো এতো ধরা খাচ্ছে কিভাবে?

কুলসুম বেগম ইতস্তত বোধ করলেন। কামিনীকে বললেন দরজা লাগিয়ে দিতে, তাদের বাপ শুনলে রাগারাগি করবে, এমনিতেই মনমেজাজ ভালো থাকে না। কামিনী কথামতো কাজ করে মায়ের কাছে বসল, আপা কি বলবে তা সে শুনতে চায়।

কুলসুম বেগম তাও ফিসফিস করে বলল, আর বলিস না কপালে ভাটা পড়লে যা হয়। ঢাকার কোন বড় সাংবাদিকের মদদে নাকি এইসব করতেছে। কিন্তু কোনো শত্রুতার নামগন্ধ নাই। বিরোধীপক্ষ তো খুশি, ওরা আগুনে আরো ঘি ঢালতেছে। এখন কেউই আর ভয়-টয় পায় না। আফজাল ভাইয়ের অবস্থা ভালো না। মেয়ে বিয়ে দিবে কেম্নে কে জানে!

-আর তোমার স্বামীর কি খবর? তাকে ধরে না কেমনে? তারা তো এক সাপের দুই মাথা।

-এমনে বলে বাপরে?

-আসল কথা বলো তো!

-তোর আব্বারে কেউ কিছু বলে না। আগের মতোই আছে। ওনার কোনো সমস্যা হয় নাই। কেন হবে? উনি কি অন্যায় করে নাকি?

আয়না হাসল খুব। কুলসুম বেগম বলতে লাগল, চুপ কর। তোর বাপরে নিয়ে চিন্তার কিছু নাই। সে আফজাল ভাইয়ের জন্য রাগ আর কি! ওইসব নিয়া দৌড়াদৌড়ি করে। 

-তাহলে আর লাভ কি?

-জালিম মাইয়া একটা!

আয়না আর কথা বাড়াল না। আফজাল মেম্বার ভালোমতো খোঁজ করতে পারেনি। তার সাথে শত্রুতা তো অনেকের আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে শুধু একজনেরই টিএন চ্যানেলের ম্যানেজার শাকিলের সাথে বন্ধুত্ব আছে। ভদ্রলোকের নাম মাহির আহমেদ, সম্পর্কে আয়নার আইনস্বীকৃত স্বামী। নম্র ও মার্জিত ব্যবহারের মাহিরের মনেও যে প্রতিশোধপরায়ণতা আছে কে জানতো? 
প্রায় ১০০ কিলো দূরে থেকেও আফজাল মেম্বারকে পথে নামিয়ে ফেলেছে প্রায়। কিন্তু আবার খুব সন্তপর্ণে রফিক সরকারকে তোপ থেকে সরিয়েও নিচ্ছে। কিন্তু কেন? আয়নার জন্য? 

—————

রাত বেশ গভীর হয়েছে। আয়না ঘড়ির কাটার দিকে নজর রাখতে রাখতে কাজ করছে। এরকম দেরি হলে মাহির সবসময় কল দিয়ে জানিয়ে রাখে, দুশ্চিন্তা করতে বারন করে। আজ এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজে নেই। কয়েকটা শার্ট তুলে হাতে নিতেই তার ফোন বেজে উঠল। আননোন নম্বর দেখে আয়না কল রিসিভ করল না। কিন্তু কয়েকবার বেজে উঠতেই তার মন কেন যেন অশান্ত হলো। সে কয়েক পলক থেমে ফোন কানে ধরল,
হ্যালো,হ্যালো? আপনি কি মাহির আহমেদ সাহেবের ওয়াইফ বলছেন?

চকিত ​আয়না শক্ত হয়ে বসল, কে বলছেন?
-শফিকুল। ওনার কলিগ। একটু মাহির সাহেবের পরিবারের কাউকে দিন।

ভদ্রলোকের গলার স্বরে অস্থিরতা আয়নার মনেও সংক্রমিত হলো। সে বলল, 
জি, বলছি। বলুন কী হয়েছে?

​-ভাবী মাহির ভাই একটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। মহিপালের মেইন রোডে। আমরা ওনাকে নিয়ে এখন হাসপাতালে যাচ্ছি। আপনি একটু দ্রুত আসার ব্যবস্থা করেন।

​লোকটা হাসপাতালের নাম আর জায়গার কথা বলে কলটা কেটে দিল। আয়না ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল। তার কান দুটো ভোঁ ভোঁ করছে। সে কয়েকবার লম্বা শ্বাস নিল, কথাগুলো এখনো কানে অস্পষ্ট বাজছে। যেন অনেক দূর থেকে কেউ বলছে, যেন আয়না একটা দুঃস্বপ্ন দেখছে।

নিজেকে সামলাতে সে আর কয়েকটা মুহুর্ত নেয়। তারপর হন্তদন্ত করে চিলেকোঠা থেকে বের হয়। ​সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় তার পায়ের শব্দে দিনা আর মিনা একসাথেই মুখ তুলে তাকাল। আয়নার মুখ তখন অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে।
​কী হয়েছে? এই রাতে আবার কোথায় যাচ্ছো?
মিনা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
​আয়না সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে রেলিংটা শক্ত করে ধরল,
মাহিরের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে গেছে ওনাকে।

প্রথমবারে বোধহয় কেউ কথাটা বুঝল না। কেমন শূন্যে দৃষ্টিতে তারদিকে তাকিয়ে রইল। আয়না সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দৃঢ় স্বরে কথাটা আরেকবার বলল।

​খবরটা শোনার পর মিনা ম্যাগাজিনটা কোলের ওপর রেখে অবিশ্বাসের সুরে বলল, “অ্যাক্সিডেন্ট? কে বলল? 
-কলিগ! কলিগ ফোন দিয়েছিল।
তুমি কি মাহির ভাইকে ফোন দিয়েছিলে? এসব তো আজকাল ফেক কলও হয়।

আয়না কল দিয়ে দেখে মাহিরের ফোন বন্ধ। শারমিন আরা বললেন, কাজে ব্যস্ত হয়তো। 

আয়না ক্ষীণ স্বরে বলল, সে ফোন বন্ধ করে না কখনো। করে না যাতে কোনো ইমারজেন্সি হলে সবাই তার সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

মনসুর সাহেব বললেন, আয়না অস্থির হয়ো না। খবর নিয়ে দেখি আমরা আগে। রাত-বিরেতে বের হওয়া কোনো কাজের কথা না।

​-সম্ভব না। অফিসের লোক কল করেছিল। আমি যাচ্ছি।
আয়না দরজার দিকে পা বাড়াল। ​রামিন এতক্ষণ ডাইনিং টেবিলের ওপাশে বসে এক হাতে পানির গ্লাস নিয়ে অন্য হাতে ফোন টিপছিল। সে গ্লাসটা সশব্দে নামিয়ে রেখে বলল, আরে দাঁড়ান। এখন এই রাত-দুপুরে একলা যাবেন নাকি? আগে তো কনফার্ম হতে হবে। 

​আয়না দরজার কাছে গিয়ে থামল। সে পেছন ফিরে ওদের দিকে তাকাল। ওদের চোখেমুখে কোনো উদ্বেগ নেই। যেন আয়না অবেলায় বাড়াবাড়ি করতে এসেছে। আয়না আর একটা কথাও বলল না। সে ড্রয়ার থেকে মেইন গেইটের চাবিটা নিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

​ওর এই জেদ দেখে রামিন গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল, উফ! আচ্ছা দাঁড়ান। একা গেলে আবার পরে মাহির ভাই চিল্লাবে আমার ওপর।

​বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল ওরা দুজন। মেইন রোডে কোনো রিকশা নেই। রাত গভীর হওয়ায় রাস্তাঘাট একদম শুনশান। রামিন পকেটে হাত দিয়ে ফোন টিপছে, উবার খোঁজার চেষ্টা করছে। আয়নার মনে হয় তার পায়ের নিচের মাটিটা কাঁপছে। এক একটা সেকেন্ড যেন এক একটা ঘন্টার মতো বড় হয়ে ধরা দিচ্ছে।

​অবশেষে একটা খালি রিকশা পাওয়া গেল। তিন গুণ ভাড়া ঠিক করে রিকশায় ওঠার পর রামিন একপাশে চুপচাপ বসে রইল।কিন্তু আয়নার মাথার ভেতর তখন প্রলয় চলছে।
​সে সব সময় নিজেকে খুব সংযত আর ধীরস্থির রাখতে পছন্দ করে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই তার মাথা ঠান্ডা থাকে। কিন্তু আজ কেন জানি সব কিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। রিকশার চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা তার কানের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছে।

​সে নিজেকে প্রশ্ন করল আজ মাহিরের যদি বড় কিছু হয়ে যায়? আজ যখন মাহির যখন ঘর থেকে বের হয়ে গেল, তখন আয়না কেন একবারও পেছন থেকে ডাকল না? কেন একটু ভালো করে কথা বলল না?

​তার মনে পড়ল মাহিরের সেই ক্লান্ত চোখ দুটো। সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করে এসে লোকটা যখন তার কাছে নিঃশব্দে একটু প্রশান্তি চায়, তখন আয়না তাকে একরাশ অবজ্ঞা আর দূরত্ব ছাড়া আর কিছু কি দিয়েছে কখনো?
​-কেন এমন করলাম আমি?

আয়না নিজের কোলের ওপর রাখা হাত দুটো শক্ত করে মুঠোর ভেতর চাপল। তার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে। তার গাম্ভীর্য আজ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। আয়না অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, একটু তাড়াতাড়ি চালান না ভাই!

​রামিন অবাক হয়ে আয়নার দিকে তাকাল। সে কোনোদিন আয়নাকে এভাবে অস্থির হতে দেখেনি। আয়না বুঝতে পারল সে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। তার চোখের কোণটা জ্বালা করছে। কিন্তু সে এখন কাঁদতে পারবে না। তাকে শক্ত থাকতে হবে। অথচ মনের কোণে একটা ভয় বারবার ফিসফিস করে বলছে, যদি কথা বলার আর সুযোগই না পাওয়া যায়?

—————

​হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ঢোকার পর আয়না দিগভ্রান্তের মতো হাঁটতে লাগল। করিডোরের ধবধবে সাদা বাতিগুলো চোখে বিঁধছে। মাহিরের অফিসের দুজন লোক করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কিভাবে যেন তারা আয়না ও রামিনকে চিনতে পারল, তারপর তারা এগিয়ে এল। একজনের শার্টের হাতায় জমাট বাঁধা রক্তের দাগ। এগুলো কি মাহিরের!

​-ভাবী, ভেতরে যান। ডক্টর কেবল ড্রেসিং শেষ করল।

​আয়না জেনারেল ওয়ার্ডের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে মাহির শুয়ে আছে। কপালে চওড়া সাদা ব্যান্ডেজ, নাকে অক্সিজেনের মাস্ক। স্যালাইনের পাইপটা ওর হাতের ওপর দিয়ে গিয়ে স্ট্যান্ডে ঝুলে আছে। সকালের প্রানবন্ত মানুষটদ এখন একদম নিস্তেজ।

​আয়না ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মাহিরের মুখটা ফ্যাকাসে, ঠোঁট দুটো সামান্য শুকিয়ে আছে। আয়নার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে গেল। 
​রামিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে দিনার সাথে কথা বলছে। আয়না স্পষ্ট শুনতে পেল রামিন নিচু গলায় বলছে,
আরে না, কপাল ফেটেছে শুধু। অত সিরিয়াস কিছু না। 

​আয়না মাহিরের ঠান্ডা আঙুলগুলো নিজের হাতের ভেতর নিল। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তাকে কামড়াতে শুরু করল। ​আয়না মাহিরের কপালে হাত রাখল। ব্যথায় মাহিরের ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে আছে। 

-আমি অফিস থেকে... ফোন করেছিলাম। নাম শফিক।
​সে একবার আড়চোখে রামিনের দিকে তাকাল, তারপর আবার আয়নার দিকে ফিরল,
আসলে... আজ মাহির ভাই তো রেগুলার টাইমেই বের হয়েছিল। আমি একটু লেট হয়ে যাই অফিসে... কাজ ছিল। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। আমি যেই রাস্তাটা দিয়ে ফিরি, উনিও ওই পথেই আসেন। মোড়টা ঘোরার সময় দেখি... উনি রাস্তার ঠিক মাঝখানে রক্তাক্ত পড়ে আছেন। ব্যাগ একপাশে পড়ে ছিল। তখন আমি কিছু না ভেবেই একটা সিএনজি ডেকে সরাসরি এখানে নিয়ে আসি।

​কথাগুলো খুব সোজাসাপ্টা। কোনো নাটক নেই, কোনো অতিরঞ্জন নেই। তবুও আয়নার মনে হলো, প্রতিটি শব্দ যেন তার কানে আলাদা আলাদা করে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
​-কতক্ষণ... ওই অবস্থায় পড়ে ছিলেন?
 আয়না খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।

​শফিক একটু অস্বস্তিতে পড়ল। হাতের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, ঠিক বলতে পারব না... কিন্তু বেশি সময় হওয়ার কথা না। রাস্তাটা রাত বারোটার পর ফাঁকাই থাকে।
​রামিন এবার একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কেউ ছিল না আশেপাশে?
​-ছিল... কিন্তু
শফিক হালকা কাঁধ ঝাঁকাল,
এইসব ক্ষেত্রে তো সবাই একটু দূরেই থাকে। পুলিশি ঝামেলা বা হাসপাতাালে টেনে আনার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না।

​আয়না আর কিছু বলল না। সে শুধু ভাবল, মাহির একা ওই পিচঢালা রাস্তার ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, আর মানুষ দূর থেকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। তার ভেতরটা অকারণে রি রি করে উঠল।

ওয়ার্ডের ডিউটি ডাক্তার এগিয়ে এলেন। হাতে একটা ক্লিপবোর্ড। ফাইলটা একবার দেখে নিয়ে খুব নির্লিপ্ত গলায় বললেন পেশেন্টের মাথায় একটা ইনজুরি হয়েছে, মাইল্ড কনকাশন। সেন্সলেস ছিল। কিছুটা ব্লাড লস হয়েছে। চিন্তার তেমন কিছু নেই, তবে চব্বিশ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখতে হবে।

​তিনি মাহিরের হাতের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন,
ডান হাতে ফ্র্যাকচার আছে, সিম্পল টাইপ। সকালে প্লাস্টার করে দেওয়া হবে। শরীরে মেইনলি রিবে কিছু ব্রুইজ আছে, তবে ইন্টারনাল কোনো ইনজুরি আমরা এখনো পাইনি।
​রামিন পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, সিরিয়াস কিছু হওয়ার ভয় আছে?

​-এই মুহূর্তে না। তবে মাথায় চোট পাওয়ায় চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের নজর রাখতে হবে।

 ডাক্তার এবার সরাসরি আয়নার দিকে তাকালেন, ওয়াইফ? আপনি কি ওনার সাথে থাকবেন?
​-জি।

​-ভালো। পেশেন্টের জ্ঞান ফেরার পর কিছুটা কনফিউজড থাকতে পারে। অসংলগ্ন কথা বলতে পারে, ভয় পাবেন না। কোনো সমস্যা হলে নার্সকে জানাবেন।

​ডাক্তার চলে যাচ্ছিলেন, এমন সময় একজন ইন্টার্ন এসে ফাইলটা ধরল, স্যার, ওনার ব্লাড প্রেসারটা কিন্তু একটু হাই ছিল। ওনার বয়স অনুযায়ী রিডিংটা বেশ উদ্বেগজনক।

​ডাক্তার ফাইলটা আবার টেনে নিলেন। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললেন, হুম... অতিরিক্ত স্ট্রেস। এই বয়সে এমন প্রেসার মানে হলো সে মেন্টালি অনেক প্রেসারে আছে। ফ্যামিলি মেম্বারদের উচিত ওনাকে একটু শান্তিতে রাখা।

​একটা ছোট্ট বিরতি। আয়না পাথরের মতো দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনল। ​ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ওয়ার্ডে এক ধরণের নিস্তব্ধতা নেমে এল। রামিন একবার মাহিরের দিকে তাকাল, তারপর খুব অস্বস্তি নিয়ে আয়নার দিকে। আজকের পুরো ঘটনায় সে নিজেকে খুব অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে। প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসি থেকে যাবতীয় ঔষধ ও স্যালাইন কিনে আনলো।

​-আপনি চাইলে আমি থাকতে পারি।

রামিন একটু নিচু গলায় বলল। আয়না ওর দিকে তাকাল না। মাহিরের বিছানার পাশের ছোট্ট কাঠের টুলটার দিকে হাত বাড়াল।
​-না প্রয়োজন নেই। তুমি যাও।

​স্বর একদম শান্ত, কিন্তু এতটা কঠোর শোনায় যে রামিন আর তর্ক করার সাহস পেল না। এই প্রথম সে বুঝতে পারল, এই বাড়ির নতুন বউকে সে যতটা হালকা ভাবে নিয়েছিল, মেয়েটা আসলেই ততটা সহজ নয়।
​-ঠিক আছে।
রামিন ঘড়ি দেখে বলল, আমি সকালে আসব। যা যা লাগবে, সব নিয়ে আসব তখন।

​আয়না কোনো উত্তর দিল না। রামিন আর একবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।
​রাত আরও গভীর হলো। ওয়ার্ডের বিশৃঙ্খল শব্দগুলো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, শুধু সুর বদলেছে। আয়না টুলটা টেনে মাহিরের একদম পাশে বসল।

​এত কাছ থেকে সে কোনোদিন মাহিরকে দেখেছে কি? গতকাল এই লোকটাই তো টাইম লিমিট নিয়ে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে আয়নার ওপর দাপট দেখিয়েছিল, আর এখন সে কেমন অসহায় হয়ে শুয়ে আছে। মাহিরের ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে আয়নার মনে হলো এই মানুষটা দিনভর আসলে কীসের পেছনে ছোটে? নিজের জন্য সে কবে শেষবার এক কাপ চা শান্তিতে খেয়েছে?

​ভাবনাটা অসহ্য হয়ে উঠল। আয়না খুব ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকে এল। এক মুহূর্ত দ্বিধা করল সে, তারপর খুব আলতো করে নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো মাহিরের হাতের অনড় আঙুলগুলোর ওপর রাখল।

​শক্ত করে ধরা নয়। কেবল একটু ছোঁয়া। ​সে শুধু একটু নিশ্চিত হতে চাইল যে এই অবিন্যস্ত নিশ্বাসের নিচে প্রাণটা এখনো ধুকপুক করছে তো? লোকটা বেঁচে আছে তো?
​আঙুলের ডগায় মাহিরের শরীরের উষ্ণতা পেতেই আয়নার বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা যেন গলতে শুরু করল। সে হাত সরাল না। ওইভাবেই বসে রইল। হাসপাতালের সেই আধো-অন্ধকারে সে এক দৃষ্টিতে মাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল।

​বাইরে রাত কাটতে লাগল, আর আয়না প্রথমবারের মতো মাহিরের নিঃশ্বাসের শব্দের সাথে নিজের হৃৎস্পন্দন মেলাতে শুরু করল।

—————

রাতের শেষ প্রহর বিদায় নিয়েছে।
ওয়ার্ডের ভেতরকার সেই অস্থির গুঞ্জন এখন কিছুটা থিতু হয়ে এসেছে। আয়না টুলে বসে থাকতে থাকতে কখন যে নিজের অজান্তেই ঝিমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি। 
অবসাদে তার মাথাটা সামান্য সামনের দিকে নুয়ে এসেছে। ডান হাতটা এখনো মাহিরের বিছানার ওপর রাখা ঠিক যেখানে একটু আগে সে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছিল।
ঠিক তখনই একটা খুব নিচু, কভাঙা ভাঙা গলা তার কানে এল।

-আয়না! তুমি এখানে কেন?

আয়নার চোখের পাতা খুলতে এক সেকেন্ড সময় লাগল। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে দিশেহারা বোধ করল; জায়গাটা কোথায়, কেন সে এখানে, কী হচ্ছে সবকিছু যেন গোলমাল হয়ে গেল। পরক্ষণেই পূর্ণ চৈতন্য ফিরে আসতেই সে চোখ তুলে তাকালো।

মাহির চোখ দুটো মেলে সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি বেশ পরিষ্কার, কিন্তু চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
-কী? 

আয়নার কণ্ঠস্বর ঘুমের রেশ ধরে এখনো কিছুটা ভারী হয়ে আছে।

-তুমি এখানে কেন?

 মাহির আবার জিজ্ঞেস করল। এবার শব্দগুলো আরও ধীরে উচ্চারিত হলো, কিন্তু স্বরটা আগের চেয়েও অনেকটা কঠিন

-কেমন লাগছে তোমার? পানি খাবে একটু?

-না!

আয়না এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসল। তার তন্দ্রার রেশ এক নিমেষে উধাও। সে এক মুহূর্তের জন্য মাহিরের চোখের দিকে শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল, তোমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল…

-কে বলেছে তোমাকে?

মাহির মাঝপথেই তার কথা কেটে দিল। আয়না থমকে গেল। একটু দমে গিয়ে বলল, অফিস থেকে…

-কে?
 এবার প্রশ্নটা সোজাসুজি তীরের মতো ধেয়ে এল।
আয়না অফিসের সেই ছেলেটির নাম বলল। মাহির চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত লম্বা নিঃশ্বাস নিল। তারপর প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে গজগজ করে উঠল, ওর কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই?

আয়না কোনো উত্তর দিল না। মাহির আবার চোখ খুলে তার দিকে তাকাল,
এটা কিছুই না। জাস্ট একটা সামান্য ইনজুরি। এইটার জন্য তোমাকে মাঝরাতে হাসপাতালে আসতে হবে?

মাহিরের গলায় স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠছে, কিন্তু সেই বিরক্তির নিচে চাপা উত্তঅস্থিরতা আয়নার কান এড়াল না।

আয়না কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি…

-কীভাবে এসেছ? একা? এই সুনশান রোড দিয়ে?
 মাহির আবারও তাকে থামিয়ে দিল।

আয়নার গলার স্বর এবার সামান্য দৃঢ় হলো, না তো।

-তবে কার সাথে?
 মাহির থামল না। প্রশ্নগুলো সে এমনভাবে ছুড়ছে যেন কোনো আসামীকে জেরা করছে।
-রামিন এসেছিল। আচ্ছা এখন কি এসব প্রশ্ন করার সময়? তোমার কি কোথাও ব্যথা হচ্ছে? 

ও কোথায়?
 মাহির সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।
আয়না নিস্পৃহ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, চলে গেছে।
এক সেকেন্ডের জন্য মাহিরের মুখের কঠিন রেখাগুলো বদলে গেল। চোখের মণিটা সামান্য কাঁপল, মানে?

-আমি বলেছি ওকে চলে যেতে। আমিই থাকবো তাই।

সে এক মুহূর্তের জন্য জেনারেল ওয়ার্ডের সেই অস্বস্তিকর জীর্ণ পরিবেশটার দিকে তাকিয়ে দেখল। তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে একাকার হয়ে গেল।

-এই জায়গাটা দেখেছ তুমি? এখানে বসে ছিলে সারারাত? 

আয়না এবার আর দমে গেল না। সে স্থির গলায় বলল, বেশি ভাবছো তুমি! কোনো জায়গার প্রিন্সেস নই আমি। 

মাহির সপাটে কেটে দিল, তুমি কিছুই ঠিকমতো ভাবছ না।

মাহিরের নিঃশ্বাস এবার কিছুটা দ্রুত আর ভারী হয়ে উঠেছে। যন্ত্রণার চেয়েও যেন একটা অজানা দুশ্চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে খাচ্ছে।
-রাতে এভাবে কেন আসতে গেলে? যদি বিপদ হতো?

তার একের পর এক প্রশ্ন আয়নার ওপর আছড়ে পড়ছে।

আয়নার ভেতরে এতক্ষণ যে ভয় আর উদ্বেগ দলা পাকিয়ে ছিল, সেটা ধীরে ধীরে অন্য এক অনুভূতির সাথে মিশতে শুরু করল। সে খুব ধীরে শান্তভাবে বলল, আমিই আসতে চেয়েছি।

আয়না এবার সরাসরি মাহিরের চোখের গভীরে তাকাল। তার কণ্ঠে আর কোনো দ্বিধা নেই। তুমি হাসপাতালে ভর্তি, আমি কী করে বাড়িতে থাকতাম?

মাহির আবারও একরোখা ভঙ্গিতে বলল আমার জন্য! আমার জন্য এত হুলুস্থুল করার মতো কিছু হয়নি।

শব্দটা আয়নার কানে গিয়ে বিধল। তার চোখে এক পলকের জন্য একটা ভিন্ন আভা খেলে গেল। সে পাল্টা কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সংবরণ করল। ঠোঁট কামড়ে সে চুপ করে রইল।
মাহির এবার একটু বালিশের সাথে গা এলিয়ে সোজা হয়ে শুতে গেল, কিন্তু নড়াচড়া করতেই ব্যথায় মুখটা কুঁচকে উঠল তার। যন্ত্রণায় কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল, তবুও সে মুখ খুলল না। সে কয়েক মুহূর্ত থেমে রইল, যেন মনে মনে কোনো একটা লড়াইয়ে হেরে গিয়ে নতুন শব্দ খুঁজছে।
তারপর বেশ কিছুক্ষণ পর, নিচু স্বরে কিন্তু খুব স্পষ্টভাবে বলল, 
নিজেকে এভাবে কখনো ঝুঁকিতে ফেলবে না। কখখনো না।

একটা অদ্ভুত নীরবতা ঘরটাকে গ্রাস করল। প্রথমবার মাহিরের সেই কর্কশ স্বরটা পুরোপুরি বদলে গেল না ঠিকই, কিন্তু সেই কঠোর আবরণের নিচ থেকে আসল কথাটার সুর বেরিয়ে এল।
আয়না আর কোনো কথা বলল না। সে কেবল তাকিয়ে রইল মাহিরের দিকে। এই সেই মানুষটা যে কয়েক মুহূর্ত আগেও তাকে প্রায় বকছিল, সেই মানুষটাই এখন তাকে নিজের অস্তিত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কথাগুলো বলছে। মাহিরের শব্দগুলো রুক্ষ হতে পারে, কিন্তু সেই শব্দের পেছনের অর্থটা আয়নার কাছে একদম জলজ্যান্ত হয়ে ধরা দিল। সে খুব আস্তে, প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল, তো আর কার জন্য হুলস্থূল করবো আমি? 
 
মাহির এবার একদম চুপ হয়ে গেল, সে চোখ সরিয়ে নিল। কোনো উত্তর দিল না। আয়না চট করে উঠে চলে গেল। মাহির চিন্তিত হয়ে সে পথে তাকিয়ে রইল। সত্যি চলে গেছে মেয়েটা? একা একা! 
আসলেই আর আসবে না? টনটনে ব্যাথায় শরীর অসাড় হয়ে আসে। মাথা ঝিমঝিম করে। কেন এতো কথা এক নাগাড়ে বলতে গেল সে! 

তবে আয়না চলে যায়নি। ডাক্তার ডাকতে গিয়েছিল। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে সে, যতক্ষণ ডাক্তার মাহিরের চেকআপ করে। মাহির শত চেষ্টা করেও তার সাথে দৃষ্টি মেলাতে পারে না। আয়নার মুখে মেঘ জমেছে। সে যখন চলে যেতে উদ্যত হয় তখন মাহিরের করুণ স্বর শোনা যায়, 
ভয় পেয়েছিলে আয়না? কিছু হয়নি তো আমার, দেখো? রাগ করে না সোনা! যেওনা প্লিজ! একটু তাকাও আমার দিকে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp