ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১৬ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
“অরুণাভ, আস্তে কথা বল পত্র শুনতে পাবে।”

“শুনুক, কি আসে যায়! তোকে আমি বারবার বলেছি এই মেয়ের থেকে দূরে থাকবি। তুই উল্টো এই মেয়েকে গলায় ঝুলিয়ে ঘুরছিস? ঘুরছিস ভালো কথা, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতেই পারিস। কথা হলো, আমাদের ফ্যামিলির মাঝে বাইরের মেয়েকে এখানে কেন এনেছিস?”

টুটুল আড়চোখে পত্রলেখার দিকে তাকায়। মাঠের দিকে চেয়ে আছে। তবে সে বুঝতে পারে মেয়েটা সব শুনে নিয়েছে। আরে, অরুণাভ শোনানোর জন্যই বলেছে। বন্ধুর উপর রাগ হয় টুটুলের।

“আনিকাও তো ওর ফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছে। আচ্ছা ভুল হয়েছে আমার, ক্ষমা করে দে। আর হ্যাঁ? পত্র বন্ধু হয় আমার। খুব ভালো বন্ধু, গার্লফ্রেন্ড না।”

‘খুব ভালো বন্ধু’ কথাটায় জোর দিয়ে বলে টুটুল। অরুণাভের হিংসুটে মন কুট কুট করে। রাগ গিয়ে জমে পত্রলেখার উপর। মেয়েটা তাঁর বন্ধুকে ছিনিয়ে নিতে চাইছে! ডাঈনী কোথাকার! সে দাঁত কটমট করে বলে,

“খুব ভালো বন্ধু তাই না? ভালো খুব ভালো। আমারও খুব ভালো একটা বন্ধু আছে বুঝলি? মোহনলাল নাম ওঁর।”

টুটুল অদ্ভুত চোখে চায়। এই ছেলের ছেলেমানুষী যাবে না! সে হেসে ফেলল, “থাকতেই পারে ইটস নর্মাল! তোর মতো হিংসুটে না আমি যে কেঁদেকুটে চোখ ফুলিয়ে নিবো।”

অরুণাভ টুটুলের দিকে তাকায়, তো তাঁকে ডিঙিয়ে পত্রলেখা দিকে। নিজের ক্রোধকে সংবরন করে বলে, “দেখ টুটুল, কেউ যদি ঘুনাক্ষরেও টের পায় ওই মেয়ে বর্ষা চৌধুরীর সাথে রিলেটেড। কি হবে বুঝতে পারছিস? এমনিতেই আম্মু আমার সাথে কথা বলছে না। আব্বুর সাথেও হয়তো ঝামেলা চলছে। তুই প্লিজ ওই মেয়েটার সাথে মিশিস না। প্লিজ ইয়ার?”

টুটুলের কপালে ভাঁজ পড়ে, “আশ্চর্য! তোর সমস্যা তুই মিশবি না। আমাকে কেন নিষেধ করছিস? তুই সবসময় বেশি বেশি করিস। আমি কার সাথে মিশবো, না মিশবো– এটা আমার ব্যাপার। সবসময় তোর কথামতো চলতে হবে? এটা দিনদিন খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে! তুই আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু তাই সহ্য করি। কিন্তু সবসময় আমার লাইফে নাক গলালে আমি তোর সাথে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবো না।”

টুটুল রাগের মাথায় গড়গড়িয়ে বলে। অনেক দিনের জমানো চাঁপা রাগ আজ বেরিয়ে এসেছে। অরুণাভ কথা বলার ভাষা খুঁজে পায় না। এতোটা ক্ষোভ? ব্যথিত চোখে বন্ধুর রাগে লাল মুখপানে তাকায়! নিভে যাওয়া কণ্ঠে বলে,

“এমনটা বলতে পারলি?”

“হ্যাঁ পারলাম। পত্রলেখা আমার গেস্ট। আর তুই তাঁকে অপমান করলি। তুই কথাগুলো একান্তে বলতে পারতি।”

“আমি কাউকে অপমান করি নি। এই মেয়ে বারবার ইনডিরেক্টলি আমার জীবনে ওই মহিলাকে টেনে আনছে। না সেদিন আমার বলের সামনে এসে নাক ফাটাতো, না ওকে হসপিটাল নিয়ে যেতাম, না ওই মহিলার মুখোমুখি হতে হতো। এই মেয়ের সাথেই দেখা করার জন্য তুই আমাকে ওই বাড়িতে যেতে এপ্রোচ করেছিস। তুই যদি জোরাজুরি না করতি আমি হয়তো যেতামই না। ওই বুড়ি মরুক বাঁচুক আমার কি! এই মেয়ে আব্বুর সাথেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। আব্বু আমাকে সন্দেহ করছে ভাবছে, আমার হয়তো ওর সাথে যোগাযোগ আছে। আবার তোর সাথে চিপকে থাকছে। তুই দেখেনিস এই মেয়েটা অনেক বড় একটা ঝামেলা ক্রিয়েট করবে।”

টুটুল পত্রলেখার দিকে তাকায়। কথাগুলো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতোও না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুই বেশি বেশি ভাবিস। যাহ্ তোর কোচ ডাকছে!”

অরুণাভ কিছু সময় বন্ধুর মুখপানে চেয়ে রইলো অপলক। তারপর আলগোছে উঠে চলে যায়। টুটুল ভাবনায় বুঁদ হয়।

পত্রলেখা সবার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় চোখ ভিজে উঠতে চায়। টুটুল যখন বলল ওঁরা মিরপুরে অরুণাভের খেলা দেখতে আসবে, সে অনেকটা ছ্যাঁচড়ামো করেই ওদের সাথে যাওয়ার কথা বলে। ভাবেও নি এর জন্য টুটুলকে কথা শুনতে হবে। এখন টুটুলের চোখে চোখ মেলাবে কি করে? তাকে বাঁচাতেই বুঝি টুটুল ফোন আসার বাহানায় চলে গেলো।

“বউ কথা কও!”

পত্রলেখার পাশে তাকায়। প্রহরকে ওড়না ধরে টানাটানি করতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। 

“তুমি সত্যিই কথা বলতে পারো না?”

পত্রলেখা ডানে বামে মাথা নাড়লো। প্রহর চোখ পিটপিট করে বলল, “তোমার মাম্মাম তোমাকে কথা বলা শেখায় নি?”

পত্রলেখার মন খারাপের মাঝেও হাসি পায়। কি সুন্দর তোতা পাখির মতো ফরফর করে। সে এবারও না বোঝালো। প্রহর উপচেপড়া হাসি দিয়ে বলল, 

“তুমি মন খারাপ কোরো না। আমি তোমাকে শেখাবো কিভাবে কথা বলতে হয়। আমি অনেক অনেক কথা বলতে পারি।”

পত্রলেখার চাহনি ছল ছল হয়। যদি সত্যিই কেউ তাঁকে কথা বলা শেখাতে পারতো! সেও হয়তো এই তোতাপাখির মতো ফরফর করতো।

“তোমার চোখে কি পোকা পড়েছে?”

পত্রলেখা মাথা নাড়লো। প্রহর চোখ ছোট ছোট বানিয়ে বলে, “তাহলে চোখে পানি কোত্থেকে এলো? এ্যাঁই তুমি কি কাঁদছো?”

পত্রলেখা আবারও মাথা দোলায়। প্রহর চোখ পিটপিট করে। তাঁর বউ দেখছি সত্যিই কথা বলতে পারে না। এখন তাঁর কি হবে? আচ্ছা মানুষ কথা না বলে কি করে থাকতে পারে? পেট ফুলে যায় না? তাঁর ছোট্ট মনে অনেক প্রশ্ন হিজিবিজি করে। 

“পাপা বলে কেউ কাঁদলে তাঁকে আদর করে দিতে হয়। আমি কি তোমাকে আদর করে দিবো?”

পত্রলেখা বাঁকা চোখে চায়। প্রহর হঠাৎ ফিসফিস করে বলে, “মাম্মাম কাঁদলে পাপাও আদর করে দেয়। তখন মাম্মাম আর কাঁদে না, হাসে। মাম্মামকে হাসলে অনেক প্রিটি লাগে।”

পত্রলেখার গাল ভারী হয়। প্রহর আবারও ওড়না ধরে টানে, “তুমি নিচু হলে আমি তোমাকে আদর করে দিতে পারি।”

পত্রলেখা মাথা নাড়ে। প্রহর সন্দিহান কণ্ঠে বলে, “তোমার আদর চাই না?”

পত্রলেখা না বোঝায়। প্রহর মুখ কালো করে প্রশ্ন করে, “কেন চাই না?”

পত্রলেখা দুই হাতে মুখ ঢেকে লজ্জা পাওয়ার ভান করে। প্রহর নিমিষেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। হাসলো পত্রলেখাও, শব্দহীন। তাঁর জীবনে শব্দমালা নেই।

—————

আনিকা আর তুবা কলেজ জীবন থেকেই বেস্ট ফ্রেন্ড। বর্তমানে একই ভার্সিটিতে একই বিষয়ে ভর্তি আছে তাঁরা। দুজনের মধ্যে বেশ ভাব। একে অপরের খুঁটিনাটি সব জানা তাদের। অরুণাভের বিষয়টি সম্পর্কেও অবগত সে। দুই বান্ধবী বাকি সবার থেকে দূরত্ব মেপে সিরিয়াস আলোচনায় মত্ত আছে।

“তুই বলেছিলি ভাইয়া ক্রিকেটার! কিন্তু তাঁকে ক্রিকেটার কম হেল্পিং হ্যান্ড বেশি মনে হচ্ছে।”

তুবার কথায় আনিকার হাস্যোজ্জ্বল মুখে আঁধার নামে। চোখ পড়ে ২২ গজ মাঠে জরুরি বক্স হাতে নিয়ে দৌড়াতে থাকা অরুণাভের উপর। গায়ে কমলা রঙের স্টাফ পোশাক। মাঠের সেন্টারে উইকেটের পেছনে দাঁড়ানো কিপারের কাছে থামলো সে। জরুরি বক্স খুলে পানির বোতল বের করে দেয়। শুধু বের করে না, বোতলের ছিপি অবদি খুলে দিলো। কিপার হেলমেট খুলে পানি খাওয়া শুরু করলে অরুণাভ তোয়ালে দিয়ে তাঁর কপালে, ঘারের ঘাম মুছে দিতে লাগলো। সাথে কিছু শলা পরামর্শ যা কোচ শিখিয়ে দিয়েছে। 

“ভাই এভাবে অন্যের পা চেটে ক্যারিয়ার সেট করবে নাকি! সো সিল্লি ইয়ার!”

তুবার কথায় আনিকার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। হাসার চেষ্টা করে বলে, “তুই খেলা দেখিস না তাই সিলি লাগছে। এটা খুব কমন! সবাই করে এমনটা। আর এখানে খারাপ কিছু নেই তো!”

“খারাপের কথা বলছি না। কিন্তু এভাবে স্টাফদের মতো পানি বহন করা, অন্যের ঘাম মুছে দেওয়া! তুই-ই ভাব বয়ফ্রেন্ড তো আমার না, তোর!”

ভোরের ক্রিকেট খেলা আনিকার এমনিতেই পছন্দ না। বান্ধবীর কথায় নেতিবাচক মনোভাব আরও জোরালো হয়। তুবা বলে, 

“তুই বললি অনেক ভালো খেলে, অথচ ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগেই পাত্তা পাচ্ছে না। ন্যাশনাল টিমে আদৌ টিকবে তো? এখন ওলিতে গলিতে ক্রিকেটারের ছড়াছড়ি। তাছাড়াও ভালো ভালো ক্রিকেটার দলে টিকতে পারছে না। বিশ বছরের হ্যাংলা পাতলা ছেলে কি ঘাস কাটবে?”

"না টিকলে না টিকবে। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।"

"মাথাব্যথা নেই বললে তো হবে না আনিকা। হি'জ ইয়্যুর বয়ফ্রেন্ড। সে কি করলো, না‌ করলো তোকে দেখতে হবে না? তুই কি যেন তেন ছেলেকে লাইফ পার্টনার বানাবি নাকি?"

"না পেঁচিয়ে ঝেড়ে কাশ!"

তুবা এবার নড়েচড়ে বসলো। বলল, "তুই হিরাকে পায়ে ঠেলে তামার দিকে ঝুঁকছিস আনিকা। তৈমুর নেওয়াজকে দেখ? ল'তে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে। এখন ভিনদেশে পারি জমাবে লয়ের উপর কোর্স করতে। শেখান থেকে বিডিতে ফিরে এলে সে যেকোনো সুপ্রিম কোর্টে ভালো পদে নিয়োগ পাবে। ক্যারিয়ার পুরোই সেট।"

"তুই আম্মুর মতো কথা বলছিস! তোকে এসব আম্মু বলতে বলেছে নিশ্চয়ই!"

ধরা পড়ে যুবার মুখ পানসুটে হয়ে আসতে চায়। তবে সে দমলো না। পূর্বের মতো দৃঢ় স্বরে বলল, "বলেছে, আর ভুল কিছু বলে নি। তুই একটু ডিপলি ভেবে দেখ আনিকা।‌ অরুণাভ আর তৈমুরকে একসাথে বসিয়ে ভেবে দেখ। অরুণাভ হ্যাংলা পাতলা বাচ্চা ছেলে। না আছে ম্যাচিউরিটি, না আছে ব্যক্তিত্বের ধার। পার্সোনালি আমার তাঁকে পছন্দ না। এখনও বাচ্চা বাচ্চা হাবভাব। পুরুষ পুরুষ ভাইব আসে না তাঁর মধ্যে। তাঁর সাথে প্রেম? তোর কাছ থেকে অন্তত এটা আশা করিনি। আমরা ফ্রেন্ড রা কিন্তু আগেই বলেছিলাম রিলেশনে মাস না। তোর সাথে যাচ্ছে না ওকে। তুই শুনলি না। ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটা একটা সাধারণ ছেলের সাথে রিলেশনে গেছে, যার কোনো ব্যাক্তিত্বই নেই। পাপা’স বয়, ইমোশনালফুল।”

অপমানে আনিকার মুখটা রক্তিম হয়ে গেছে। তুবা আরও বলল, "তৈমুর নেওয়াজের ছবি যখন দেখালি তখন আমরা ফ্রেন্ডরা কেমন রিয়্যাকশন দিয়েছিলাম মনে আছে? ইয়ার, হি’ পার্ফেক্ট। লম্বা-চওড়া, পেশীবহুল পেটানো শরীর, মাসেলস, স্মোকি আইস, শ্যামলা গড়ন; দেখেই মনে হয় তাগড়া পুরুষ আছে বটে, ব্যাক্তিত্বে ভরপুর।‌ পুরুষালি একটা ভাইব আসে। বান্দা পুরাই আগুন।”

আনিকা কিছু বললো না। তুবা আনিকার মুখ দেখে বুঝলো, আনিকা কিছুটা হলেও তার কথায় প্রভাবিত হয়েছে। সে খুশি মনে নিজ আলাপ দীর্ঘ করতে লাগলো। 

“আনিকা থিংক প্র্যাকটিক্যালি! অরুণাভ ইম্যাচিউর, এখন তোকে ভালোলাগছে। আজ থেকে দশ বারো বছর পর তোকে ভালো লাগবে না। তোরা প্রায় সমবয়সীদের মতোই। আফটার থার্টি সে পুরুষ মানুষ ধীরে ধীরে সুন্দর হবে, আর তোর হবে বিপরীত। হয়তো দুই একটা বাচ্চা আসবে, চেহারা ভেঙে যাবে, মুটিয়ে যাবি। তোর গ্লো নাই হয়ে যাবে। তখন তোকে তাঁর ভালো লাগবে না। সে আফসোস করবে। তখন কি হবে?”

দোটানায় পড়ে রইলো আনিকা। মায়ের কথাগুলো বিষ মনে হলেও তুবার কথাগুলো তাঁর কাছে খারাপ লাগছে না। সত্যিই তো বলছে তুবা! একটা কথাও ফেলে দেবার মতো নয়। তৈমুর নেওয়াজ সব দিক দিয়ে পার্ফেক্ট আছে। দেখতে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম, ব্যক্তিত্ববান, ক্যারিয়ার ভালো, তাঁর পেছনে লাড্ডু। ফ্যামিলিও নির্ভেজা। বাবা মায়ের একটাই সন্তান। ওর বাবা মাকে দেখেও টিপিক্যাল মাইন্ডের মনে হয় নি। কোনো বাজে রেকর্ড নেই তৈমুরের, সিগারেট অবদি খায় না। আনিকা আর ভাবতে পারে না। মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। কি এক দোটানায় পড়লো সে! অরুআভের ব্যাপারে তাঁর আরও বেশি ভাবা উচিত ছিলো।

—————

খেলা শেষে হোটেলে ফিরেছে সব খেলোয়াড়। জয়ের উল্লাস উদযাপন করতে কোচ বলেছে সবাই একসাথে নৈশভোজ করবে। অরুণাভ সে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করবে না। সে কোচকে অনেক কষ্টে মানিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য লাগেজ গোছাচ্ছে। মোহন তা দেখে গাল ফুলিয়ে বসেছে।

"বাডি, তুই কতটা নিষ্ঠুর! তোর বাড়িতে একবার ইনভাইটও করলি না।"

"আমার বাড়িতে বিয়ে লাগে নি যে তোকে ইনভাইট করবো।"

"ফর্মালিটিজ মেইনটেইন করে বলতে পারতি, আমার বাড়িতে চল মোহনলাল। আমি কি ‘না’ করতাম?"

অরুণাভ হাসলো। লাগেজে কাপড় ভরতে ভরতে বলল, "সেইজন্যই বলি নি।"

"প্লিজ বাডি, ইনভাইট মি। আই ওয়ান্ট টু সি ইয়্যুর হোম, প্লিজ প্লিজ?"

মোহন অনুনয় বিনয় করে। অরুণাভের নরম মন গলে গেলো, "আচ্ছা লাগেজ গুছিয়ে নে। তবে শর্ত একটাই আম্মুর সাথে কোনো প্রকার ফ্লার্টগিরি চলবে না। তাঁকে আন্টি বলে ডাকতে হবে।"

'তোর শর্তে হিসি করে দিলাম' মনে মনে বলে মোহনলাল। ইমোশনাল হওয়ার ভান করে চোখ পিটপিটায়। দুই হাতে বন্ধুকে জড়িয়ে গালে চুমু দিয়ে বলে, "তুই কতো ভালো রে অরুণাভ। আই লাভ ইয়্যু বাডি।"

অরুণাভ তেলে পড়া পেঁয়াজ কুঁচির মতো ছ্যাত করে উঠলো। এক ধাক্কায় বন্ধুকে সরিয়ে দেয়। টি শার্ট টেনে গাল মুছে ভর্ৎসনার সুরে বলল, "বাইঞ্চোত তোর ঠোঁট আমি কুঁচি কুঁচি করে কাটবো।"

মোহন হু হা সুরে হাসতে হাসতে লাগেজ গোছাতে শুরু করে। এটা ওটা বলে বন্ধুকে বিরক্ত করতে ভুলে না। এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করে,

"পাতাবাহার কি পছন্দ করে?"

অরুণাভ কটমটে দৃষ্টি ক্ষেপন করে বলে, "এটা কিন্তু কথা ছিলো না।"

"আরে চেতিস ক্যান বা*ল! নর্মালি জিজ্ঞেস করছি। বল কি পছন্দ করে?"

অরুণাভ বিরক্ত মাখা কন্ঠে বলে, "পছন্দ বলতে?"

"মানে সবচেয়ে বেশি ইন্টারেস্ট কিসের প্রতি? এমন কোনো পছন্দ আছে কি যা পেলে সে খুব খুশি হয়ে যায়। লাইক শাড়ি, চুড়ি, ঝুমকা... মেয়েদের দূর্বলতা থাকে না?"

"হুম হুঁ!"

"তো পাতাবাহারের দূর্বলতা কি?" মোহন অতি আগ্রহের সাথে জানতে চাইলো।

"অরুণ সরকার!" 

জবাব মনপ্রসু হলো না‌ মোহনের। মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলো, "বুইড়া ব্যাটার প্রতি আবার কিসের দূর্বলতা! যত্তসব ঢং।"

অরুণাভ কান খাঁড়া করে বলে, "কি বললি?"

মোহন হে হে সুরে হেসে বলে , "কিছু না তো! এই ভাবছিলাম আঙ্কেল কত্তো লাকি। বাড়ি গিয়ে তাঁর কপালে কপাল ঘঁষে দিবো বুঝলি!"

দুই বন্ধু ঠোকরা ঠুকরি করতে করতে নিচে নেমে আসে। পার্কিং জোনে অপেক্ষায় তাঁর ভাই বোনেরা। অরুণাভ ডিকিতে লাগেজ দুটো রেখে দিলো। আনিকাকে ইশারা করে পেছনে বসতে। আনিকা ইশারা বুঝেও ঘারত্যাড়ামি করে মাঝের সিটে গিয়ে বান্ধবীর পাশে বসলো। অরুণাভ দাঁত কটমট করে চাইলো ক্ষণ। বন্ধু মোহন কে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে তুবার পাশে বসা অরুণিতাকে বলল,

"ভাবুক চড়ুই ওলাফকে নিয়ে পেছনে এসো। আর রূপ, নয়নকে নিয়ে মাঝে আয়। আমরা তিন ভাইবোন পেছনে বসবো।"
 
অরুণিতা ঘুমন্ত প্রহরকে কোলে নিয়ে এসে বসলো। তাঁরও চোখদুটো ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। রূপ, নয়ন সামনে গিয়ে বসলে অরুণাভ পেছনে এসে বসে। গাড়ি চলতে শুরু করলে ফ্রন্ট সিটে বসা মোহন পেছনে ফিরে বলল,

“টুটুল কোথায়? ওর সাথের ওই বোবা মেয়েটা!”

“ওঁরা খেলা দেখতে বোর হচ্ছিল তাই খেলা শেষ হওয়ার আগেই চলে গেছে।”

রূপ হামি তুলতে তুলতে জবাব দেয়। সাথে ড্রাইভারকে লাইট নিভিয়ে দিতে বলে। অরুণাভ জানালায় মাথা ঠেকায়। টুটুল যে তাঁর উপর রাগ করে চলে গেছে বুঝতে বাকি নেই। মোহন সামনে ফিরে বলে,

“কতসুন্দর দেখতে মেয়েটা, অথচ বোবা। বেচারির জন্য মায়াই লাগে!”

—————

বাড়ি ফিরতে ফিরতে তাদের ভালোই রাত হয়ে যায়। আলস্য কাটিয়ে সবাই গাড়ি থেকে আস্তেধীরে নেমে পড়ে। অরুণাভ ঘুমন্ত প্রহরকে কোলে নিয়ে রূপকে বলে,

“ভাবনাকে ডেকে দে তো! ঘুমিয়ে পড়েছে!”

রূপক অরুণিতার বাহু ঠেলে ডাকে, “এ মোটু? উঠ না? মোটু? এই অরু মোটু? মরে টরে গেলি নাকি! মোটুর বাচ্চা উঠ না?”

অরুণাভ চলেই যাচ্ছিলো। রূপকের সম্বোধনে ফিরে আসে। বড়সড় ধমক দিয়ে বলে, “এ কেমন সম্বোধন? এভাবে বলে ছোট বোনকে?”

রূপক দাঁত দেখিয়ে আমতা আমতা করে বলে, “আদর করে মোটু ডাকি।”

“মনে কষ্ট দেয় এমন আদর দরকার নেই। খারাপ লাগে ওঁর। আরেকবার ডাকতে শুনলে কান গরম করে দিবো। ওলাফকে নে, আমি ভাবনাকে ডাকছি।”

রূপক প্রহরকে নিলো। অরুণাভ বোনকে ডাকে। অরুণিতা নড়েচড়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঘুম ভাঙে না। অগত্যা কোলে তুলে নিতে উদ্যত হয়। রূপক বাঁধা দেয়,

“আরে ভাই, পারবে না। নিজেকে দেখো? ফুঁ দিলে উড়ে যাবা। তোমার থেকে অরু ভারী আছে।”

“আমার হাতে মার না খেলে তোর ভালো লাগে না, নাহ? মায়ের কাছে তো নাদান শিশু!”

অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলে অরুণিতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। অরুণিতা ঘুমের ঘোরেই ভাইয়ের গলা জড়িয়ে কাঁধে মুখ ঠেকায়। রূপক টিপ্পনী কেটে বলে, “দেখো মুখ থুবড়ে পড়ো না যেন!”

“মুখ তো তোর ভাঙবো! আগে হাঁট!”

ধমকে মুখ মুচড়ে আগে হাঁটে রূপক। অরুণাভ বোনের ঘুমন্ত মুখপানে চায়। আব্বু ভুল বলে না, মেয়েরা একটু দ্রুতই বড় হয়ে যায়। এই তো সেদিন সাদা তোয়ালে মোড়ানো চড়ুই খানা কোলে নিয়ে চুমু খেয়েছিল। সেই চড়ুই কত্ত বড় হয়ে গেছে! সে বোনের কপালের একপাশে স্নেহ ঢেলে চুমু দেয়। কানে কানে ফিসফিস করে বলে,

“আই লাইভ ইয়্যু ভাবুক চড়ুই, মোর দ্যান ওলাফ।”

অরুণিতার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে। তারমানে ঘুম ছুটে গেছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অরুণাভ ছোটবেলার মতো গোল গোল ঘোরায় তাঁকে। সেই সেকেলে গান গুনগুনিয়ে গায়,

ফুলোকা, তারো কা, সাবকা কেহনা হেয়!
এক হাজারো মে, মেরি বেহনা হেয়!
সারি উমার উস্কে সাঙ রেহনা হেয়!
হুম হুঁ হুঁ হুম হুঁ হুম….

অরুণিতা তবুও চোখ মেলে তাকাল না। একটু ভয় ভয়ে গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পড়ে গেলে কোমড় ভাঙবে যে! রূপক সামনে থেকে বলল, 

“ভাইয়া, এই রাত দুপুরে তোমার ভাঙা রেডিও ওফ রাখো। কাকপক্ষীর ঘুম ছুটে গেলে রক্ষে নেই।”

অরুণাভের ইচ্ছে করে পেছন থেকে পশ্চাতে লাথি লাগাতে। সে রূপকের ভাগ্য প্রসন্ন প্রহর তাঁর কোলে। ঘরে ঢুকে দেখে সবাই ড্রয়িংরুমেই বসে আছে। অরুণাভ সেদিকে না গিয়ে বোনকে নিয়ে দোতলায় চলে যায়। অরুণ সরকার একবার পিছু ডেকে বলে, “ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি?”

“হ্যাঁ আব্বু। ডাকলাম উঠলোই না। ঘুমটা একটু বেশিই গভীর তো!”

অরুণিতা চিমটি কাটে ভাইয়ের গলায়। অরুণাভ হেসে ধীমান কণ্ঠে বলে, “যতই গাম্ভীর্যের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখো, আমাদের কিউট, ঢঙ্গী ভাবনা বেরিয়েই আসে কিন্তু!”

অরুণিতা চোখ খুললো। ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো, “আমার ওয়েট কত বল তো ব্রো?”

“হবে, ফোরটি ফাইভ ওর ফিফটিন?”

“নোপ, সিক্সটি প্লাস।”

“কি বলো!”

“হ্যাঁ!”

“তেমন ওয়েট ফিল হচ্ছে না কিন্তু!”

অরুণিতা হাসলো। দুষ্টুমির সুরে বলল, “তা তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্রো!”

অরুতাভ পায়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। অনেক কষ্টে অরুণিতার ঘর অবদি গিয়ে বিছানায় নামিয়ে দেয়। তারপর নিজেই চিৎপটাং হয়ে হাঁপাতে থাকে। অরুণিতা তার হাল দেখে গম্ভীর ভাব ছিঁড়ে খিলখিলিয়ে হেসে দিলো। অরুণাভ রীতিমতো হাপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল, “তুমি আমার থেকেও বেশি হিংসুটে ভাবুক চড়ুই। তফাত আমার গুলো প্রকাশ পায়, তোমার গুলো ধরা খুব কঠিন। ওলাফ তো আমাদের দুজনেরই ভাই তাই না? ছোট্ট আদুরে ভাই।”

অরুণিচতার হাসি যেমন হুট করে এসেছিল তেমনি ভাবে গায়েব হলো। গম্ভীর অবতারে ফিরে এসে বলল, “আমি কাউকে হিংসা করি না ব্রো। বাট হি স্টোল এভরিথিং ফর মি। মায় পাপা, মায় মাম্মাম, মায় ভাইটুস, মায় টয়েস, মায় রুম, মায় এভরিথিং! এভরিওয়ান রিমেমবার দা ফাস্ট ওয়ান, এন্ড দা লাস্ট ওয়ান বাট ফরগট মিডল ওয়ান।”

অরুণাভ সোজা হয়ে বসে। অবাক চিত্তে বলে, “ভাবুক চড়ুই ওলাফ তোমার ছোট ভাই। ও কেন ছিনিয়ে নিবে? আমরা সবাই তো এক। যা কিছু সব আমাদেরই তো।”

“একটা ছেলে, একটা মেয়ে! হ্যাপি ফ্যামিলি। আমরা সবাই হ্যাপি ছিলাম, তাই না? ওকে আনার কি প্রয়োজন ছিলো পাপা-মাম্মামের?”

অরুণাভ হাসে বোনের বাচ্চামো কথায়। মনে হলো সাতবছরের সেই অভিমানী ভাবনা। যে প্রহরের আগমন খবর পেয়ে ভাইয়ের ঘরে এসে অনেক কেঁদেছিল। অরুণাভ উঠে এসে একহাতে বোনের গাল চেপে ধরে। অপরহাতে কাঁধ জড়িয়ে বুকে টেনে নেয়। 

“ছিলো তো! আমার একটা ভাইয়ের প্রয়োজন ছিলো। একটা বোন, একটা ভাই আর একটা পঁচা আমি। হ্যাপি ফ্যামিলি!”

“তাহলে তো আমারও একটা বোন লাগবে।”

“সেটা মাম্মামকে গিয়ে বলো!”

অরুণাভ হাসতে হাসতে জবাব দিলো। অরুণিতা কিছু সময় চুপ থেকে বলে, “নেভার, আমার আর কোনো বোন বা ভাই চাই না। দিজ ডেইজ, আই ফাইন্ড কমফোর্ট ইন রিমাইন্ডিং মাইসেলফ দ্যাট আই’ম মায় পাপা’স ওনলি ওয়ান ডটার।”

অরুণাভ হেসে বোনের গাল এদিকে ওদিক ঘুরিয়ে আদুরে গলায় বলে, “আমাদের দুই ভাইয়ের একমাত্র বোন। ইয়্যু নো না, আমরা দুই ভাই আমাদের আদরের বোনটির উপর জান হারাই।”

“নাআআ, এ আমি বিশ্বাস করি না!”

অরুণিতা ভাইয়ের বুক থেকে মাথা তুলে নাটকীয় গলায় বলে। অরুণাভ তাঁর গালে আদুরে চুমু দিলো। অরুণিতা মিষ্টি করে হাসলো। মেদযুক্ত গালে ভাঁজ পড়ে গর্ত সৃষ্টি হতে দেখা যায়। টোল ছিলো? 

মেয়ের ঘরের সামনে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে অরুণ সরকার। ছেলে মেয়ের কথোপকথন শুনছিলো এতক্ষণ। সব শুনে বুকের ব্যাথা আরেকটু বেড়ে যায়। এখন তো পাতাবাহারের মতো তাঁরও দুশ্চিন্তা হচ্ছে। ঢেকে রাখার বিষয় তো না! আজ বাদে কাল জানবেই। জানলে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?

—————

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ডিসেম্বরের শীতে উষ্ণ কম্বলকে বিদায় জানিয়ে অরুণাভ বিছানা ছাড়ে। ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ফিরে গায়ে হুডি জড়ায়। শর্টসের উপরেই টাওজার তুলে নেয়। সাদা কেডস পরে বেরিয়ে পরে। মূল ফটক খোলাই ছিলো। সে বেরিয়ে আসতেই বাবাকে দেখতে পায়। হাঁটতে বেরুচ্ছে। অরুণাভ এগিয়ে গিয়ে বলে,

“রেস হয়ে যাক? আমি জিতলে তোমার এটিএম কার্ড একদিনের জন্য আমার।”

অরুণ সরকার আড়চোখে ছেলের দিকে তাকায়, “আর হেরে গেলে?”

“তুমি তো জিতে যাবে। সেই খুশিতে দুইদিনের জন্য দিয়ে দিও এটিএম কার্ড।”

“নাইস জোকস!” 

অরুণ সরকার হাসি বিহীন মুখে বলে হাত ঘড়িতে চোখ বুলায়। মূল ফটকের দিকে তাকায় বারংবার। অরুণাভ ব্যায়াম করে শরীর গরম করার চেষ্টা করে। বলে,

“কার জন্য অপেক্ষা করছো? চল যাই, দেরি হয়ে…!”

“হেয় বয়েস, আ’ম রেডি। লেটস গো!”

তৃতীয় ব্যক্তির গলায় অরুণাভের কথা অসমাপ্ত রয়ে গেল। চমকিত দৃষ্টিতে ঘুরে দাঁড়ায় অরুণাভ। বোন অরুণিতাকে দেখে, তো নজর ফিরিয়ে বাবাকে দেখে। দুজন সেম আউটফিট। সেম টাওজার, সেম হুডি, সেম কেডস। যেন মেলায় ঘুরতে যাওয়া দুই বান্ধবী! অরুণাভের হাসি পায়। 

“ব্রো, হোয়াট হ্যাপেন্ড? হুয়াই আর ইয়্যু স্মাইলিং লাইক দ্যাট? অ্যাম আই লুক উইয়ার্ড?”

“নোও.. ইয়্যু লুক কিউট, ওলসো ইয়্যুর পাপা।”

বলেই হাসিতে ফেটে পড়ে অরুণাভ। অরুণিতার গোমড়া মুখ কালো হয়ে আসে। সে বাবার দিকে তাকায় অভিযোগের দৃষ্টিতে। অরুণ সরকার এগিয়ে এসে হুডির টুপি মেয়ের মাথায় তুলে দেয়। হুডির চেন গলা অবদি তুলে দিয়ে বলে,

“পাছে লোকে কতকিছু বলে, ওদের কথায় কান দিতে নেই। লেটস গোঁ সোনা?”

অরুণিতা মাথা নাড়ে। বাবা মেয়ে ধীর গতিতে দৌড়াতে শুরু করে। অরুণাভ মুখ মুচড়ে পিছু দৌড়ায়। একসময় তাদের ছেড়ে আগে চলে যায়। কয়েক রাউন্ড দ্রুত গতিতে দৌড়ে ঘুরে আবারও ফিরে আসে। গতি কমিয়ে অরুণিতার পাশে দৌঁড়ায়!

“কত দিন হলো চলছে?”

“তিনদিন!”

“ওয়াও সাচ আ লং টাইম। কিপ ইট আপ ভাবুক চড়ুই। বায় দা ওয়ে কতদিন চলবে?”

ভাইয়ের মজা বুঝতে পারে অরুণিতা। এর আগেও অনেকবার ওজন কমাবে বলে জিমে ভর্তি হয়েছিল। হয়েছিল অবদিই থেমে ছিলো। কখনো যাওয়া হয় নি। বাবার সাথে প্রতিদিন হাঁটতে বের হবার পণ করলেও, দুদিন যায়। তারপর আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এবারই তিনদিনের রেকর্ড গড়লো সে। এসব দৌড় ঝাপ, ব্যায়াম, যোগা, জিম তার পোষায় না। তাঁর তো ডাইনিং ভরা খাবারে পোষায়। সে ফোঁস ফোঁস করে বলে উঠলো, “যতদিন তোমার মতো পাটকাঠি না হয়ে যাচ্ছি ততদিন!”

অরুণাভ দাঁড়িয়ে পড়ে। হাঁটুতে ভর দিয়ে হাপায় কতক্ষণ। অরুণিতা আর অরুণ সরকার আগে চলে গেছে। অরুণাভ কপাল ঘঁষে আবারও ছুট লাগায়। অরুণিতার পাশে এসে বলে,

“আমি পাটকাঠি?”

“ব্রো, ঘরে ফিরে যাও, আর আয়নায় নিজেকে দেখে বুঝে নাও তুমি পাটকাঠি নাকি কৃষ্ণ নগরীর মন্ত্রী মশাই।”

অরুণাভের মুখটা চুপসে যায়। নিজ মেদহীন পেটের দিকে তাকায়। ‘ফিট এন্ড ফাইন’ হেলথের কোনো কদরই নাই দেখছি। মনে মনে বিড়বিড় করে অরুণাভ বোনকে বলে, “আমি কৃষ্ণ নগরীর মন্ত্রী মশাই, আর তুমি গোপাল ভাঁড়!”

অরুণিতা বাবার দিকে চেপে গিয়ে অভিযোগের সুরে ডাকলো, “পাপা তোমার ছেলেকে চুপচাপ দৌড়াতে বলো না।”

অরুণ সরকার ছেলের দিকে ফিরে শক্ত গলায় বলল, “রাস্তা বদলাও?”

“আব্বু আমি…”

“যাও?”

অরুণাভ গোমড়া মুখ বানিয়ে অন্য রাস্তায় চলে যায়। অরুণিতা বাবার দিকে তাকিয়ে দাম্ভিক ভরা সেই হাসিটি হাসে। 

“পাপা, বিয়ে কবে খাচ্ছি?”

অরুণ সরকার অবাক হয়ে বলে, “কার বিয়ে?”

“তোমার বড় ছেলের!”

অরুণ সরকার বাঁকা চোখে তাকায় মেয়ের দিকে। নিশ্চয়ই ভাইয়ে কান পড়িয়ে পাঠিয়েছে। সে গম্ভীর সুরে বলল, “বিয়ে কোনো ছেলেখেলা না চড়ুই সোনা। বিয়ে মানে দায়িত্ব, সমঝোতা,। বিয়ে মানে ত্যাগ, ধৈর্যশীলতা, নিজেকে অন্য কারো হাতে সঁপে দেওয়া। তোমার ভাই এখনও ইম্যাচুয়ার, তোমার মাম্মামের থেকেও বেশি আবেগপ্রবণ। সংসারে পা দেওয়ার মতো ম্যাচিউরিটি তাঁর আসে নি।”

অরুণিতা ধৈর্যসহকারে শুনলো। আগ্রহের সাথে বলল,

“তৈমুর নেওয়াজের সাথে তো আনিপুর বিয়ে হচ্ছে না। তাহলে ব্রো আর আনিপুর ব্যপারটার একটা মীমাংসা করা উচিত না? চাচিমণি আবার কোন ছেলে ধরে আনে মেয়ের জন্য!”

“মীমাংস হবে না। আরিয়ান, রুবি সাফ সাফ বলে দিয়েছে তাঁরা এই সম্পর্ক মানবে না।”

অরুণিতার কপালে বিরক্তের ভাজ, “পাপা, চাচিমণি ব্রো’কে দেখতে পারে না কেন? আমার আর প্রহরের সাথে তো ভালো বিহেভ করে।”

“তোমার ব্রো মানুষটা খুব ভালো তো! আর ভালো মানুষদের মানুষ একটু কমই দেখতে পারে।”

অরুণ সরকারের খোঁচা বুঝতে পারে অরুণিতা। সে জেদি সুরে বলল, “ওনারা না মানলো, আনিপু তো রাজি। কোর্ট ম্যারিজ করিয়ে রাখো। মেয়ে পেয়ারি হলে একদিন ঠিকই মানবে।”

অরুণ সরকার হাসলো মেয়ের কথায়। শান্ত গলায় বলল, “তোমার আনিপু, আর ব্রো কারোরই ভিত মজবুত না। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তাঁকে বলে দিও, ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে। সবকিছুর একটা সঠিক সময় থাকে। সময় আসলে, ভাগ্যে লেখা থাকলে সব হবে। আর হ্যাঁ, বিয়ে বিয়ে করে যেন আমার মাথা না খায়। এতো বেহায়া ছেলে আমি বাপের জন্মে দেখিনি। বিয়ের বয়সও হয় নি বিয়ে বিয়ে বলে বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছে।”

অরুণিতা আর কিছু বললো না। সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। পাপার সাথে সেও সহমত। এতো জলদি বিয়ে করা উচিত হবে না। দুপক্ষকেই সময় দেওয়া উচিত। তাঁরা আরেকটু পথ আগাতেই অরুণাভকে আসতে দেখা যায়। তাদের দেখেই রাস্তা পাল্টাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অরুণ সরকার থামালো তাঁকে,

“ওয়ে ফোর টোয়েন্টি? বেলা অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি চলো। নাকি ফোর টোয়েন্টি করে ঘুরে বেড়ানোর ফন্দি এঁটেছো?”

“জিরো সিভিক সেন্স পিপল! বাড়িতে ডাকে বলে ভরা বাজারেও ডাকতে হবে? আমার কি প্রেসটিজ বলে কিছু নেই? ভবিষ্যত সেলিব্রিটি আমি। কিছু সম্মান তো আমিও ডিজার্ভ করি।”

অরুণাভ বিড়বিড় করতে করতে ফিরে আসে। বাবার উদ্দেশ্যে থমথমে মুখে বলে, “ভরা বাজারে ফোর টোয়েন্টি বলেই যখন ডাকবে, মহিষ জবাই করে পুরো কলোনিকে নিমন্তন্ন দিয়ে অরুণাভ নামকরণ কেন করেছিলে শুনি?”

“স্বভাবে এমন ফোর টোয়েন্টি হবে জানলে কখনোই করতাম না। মহিষের পুরা টাকাই লস” 

অরুণ সরকার পাল্টা জবাব দিতে ভুলে না। অরুণাভ ভোঁতা মুখে বলে, “দিস ইজ নট ফেয়ার আব্বু। লিটারেলি তুমি আমাকে অপমান করছো! আমার মতো বাধ্য ছেলে এ যুগে পাবে?”

“না না, তুমি তো এক পিসই!”

অরুণ সরকারের পাল্টা ধাওয়া। অরুণাভ মুখে কুলুপ এঁটে নিলো। ভুলে গিয়েছিল ভদ্রলোক তাঁ..র বাপ, সে নয়। অরুণাভ বোনের পাশে এসে কনুই দিয়ে খোঁচা দিলো। অরুণিতা প্রশ্নভাজন দৃষ্টিতে তাকালে অরুণাভ ফিসফিসিয়ে বলে,

“কাজ হলো?”

অরুণিতা না বোধক মাথা নেড়ে ভাইয়ের মতোই ফিসফাস করে বলল, “ব্রো, পাপা বলেছে, বিয়ে বিয়ে করে যেন তাঁর মাথা না খাও। এতো বেহায়া ছেলে সে বাপের জন্মে দেখেনি। বিয়ের বয়সও হয় নি তোমার অথচ বিয়ে বিয়ে বলে বাড়ি মাথায় তুলে রেখেছো। শেম অন ইয়্যু!”

অরুণাভ আবারও থেমে যায়।‌ হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপায়। আব্বু তাঁর পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা কেন করছে না! ধ্যা*ত্তেরিকি!

—————

পাতা আর রুবি ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলো। দুজনেই নীরব কাজ করে যাচ্ছে। যা বড্ড বেমানান লাগছে। কেননা দুই জায়ের মধ্যকার বাচ্চা আর সাংসারিক আলাপ কখনো ফুরাতেই চাইতো না। একসাথে পার্লার যাওয়া, শপিং করা, ঘুরতে যাওয়া, বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ মধুর ছিল। দিন রাত মিলিয়ে দুজন একে অপরের সাথে এতোটা জুড়ে থাকতো যে একে অপরকে খুব ভালো বান্ধবী হিসেবেই মনে করতো। সেই মধুমাখা সম্পর্কে হুট করেই নীরাবতা ছেয়ে যাওয়া ভাবনার বিষয়। 

"হেয় বিউটিফুল লেডিস, ক্যান আই হেল্প ইয়্যু?"

মোহনলালের কথায় পাতা, রুবি তাঁর দিকে তাকালো। অরুণাভের চেয়ে কিছুটা স্বাস্থ্যবান, গোলগাল চেহারার শ্যাম গড়নের ছেলেটা যখন চব্বিশ পাটি দেখিয়ে হাসে, ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চাও বলে দিবে এই ছেলে প্রচুর বাঁদরামি জানে। যেহেতু অরুণাভের বন্ধু সে, রুবি তাঁকে অরুণাভের মতোই উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেদের কাতারে ফেলে চুপ থাকলো। পাতা মুচকি হেসে বলল,

"কেন নয়!"

"তাহলে আমি প্লেট লাগিয়ে দিচ্ছি কেমন?" মোহন অতি আগ্রহের সাথে ধোঁয়া প্লেট হাতে নেয়। পাতা তাঁর হাত থেকে প্লেট ছিনিয়ে নিয়ে বলে, 

"তুমি সকালের নাশতা খেয়ে নিয়ে আমাদের হেল্প করো! সকালে কি খাও বলো?"

"আপনি ভালোবেসে যাই খাওয়াবেন তাই খাবো, ম্যাম।" মোহন অতিমাত্রায় ভদ্র সাজার চেষ্টা করে।

পাতা ভ্র কুঁচকে বলে, "ম্যাম কাকে বলছো? আন্টি ডাকলে চলবে। ম্যাম ট্যাম ডাকতে হবে না।"

মোহন তার ভুবন ভোলানো হাসিটা দিয়ে বলল, "আপনাকে আন্টি ডাকার আগে আমার মাথায় নারিকেল পড়ুক। টু বি ওনেস্ট, স্টিল আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় আপনি অরুণাভের মা, আপনার তিনটে বাচ্চা আছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ওই লোকটাকে আপনার হাসবেন্ড মানতে!"

এরকম প্রশংসা মেয়েরা একটু বেশিই পছন্দ করে। কিন্তু কখনো স্বীকার করবে না। উল্টো আরেকটু প্রশংসা পাওয়ার লোভে বলবে, কি যে বলো না। বয়স হয়েছে হ্যান ত্যান! পাতাও তার ব্যতিক্রম নয়। সেও বলল,

"কি সব কথাবার্তা মোহন!"

পাতার মুখে নিজের নাম শুনে মোহনের চোখের তারায়, তারা চমকালো। কাতর স্বরে বলল, "আরেকবার বলুন?"

"কি বলবো?" পাতা হাসতে হাসতে বলল। 

"আমার নামটা আবার বলুন। আপনার মুখে ভারী মিষ্টি লাগে শুনতে। এতো সুন্দর করে আমাকে কেউ ডাকে নি ম্যাম! তাছাড়াও প্রথম সাক্ষাতে আপনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে আমি মাথায় শ্যাম্পু করা তো দূরের কথা, পানি অব্দি ঢালি নি। শুধু আপনার ছোঁয়া উঠে যাবে তাই।"

রুবি মোহনের আপাদমস্ততকে চোখ বুলিয়ে নেয়। পাতা মুখে হাত দিয়ে হা হওয়া মুখ ঢেকে রাখে কতক্ষণ। তারপর হঠাৎ করেই খিলখিল হাসিতে লুটিয়ে পড়ে। হাসতে হাসতে কোটরে জল জমেছে। মোহন চোখ পিটপিট করে তাঁকেই দেখে। 

“তাই তো বলি হঠাৎ কাল রাত থেকে মরা ইঁদুর পঁচে যাওয়ার মতো বাজে গন্ধ কোত্থেকে আসছে!”

হঠাৎ পুরুষালি ভরাট কণ্ঠে পাতা, মোহন ড্রয়িংরুমের দিকে তাকায়। অরুণ সরকার হনহনিয়ে উপরে চলে যাচ্ছে। পাতা মনে মনে মুখ ভেঙায়। বুড়োর জ্বলে, হুঁ! 

অরুণিতা এগিয়ে এসে ডাইনিং টেবিলের প্রতিটি পদের উপর চোখ বোলায়। খাবার দেখেই ক্ষুধার্ত তনুমন ফুরফুরে হয়ে ওঠে। সে চেয়ার টেনে বসে। প্লেট উল্টে পরোটার বোলে পরোটা নিয়ে চিবোতে শুরু করে। বড্ড ক্ষুধা লেগেছে।

“আম্মু, ফ্রেশ হয়ে এসে খেতে বস।”

পাতা হতাশ সুরে বলে। অরুণিতার গম্ভীর চাহনি খাবারে আঁটকে। আবার ফ্রেশ! অরুণাভ হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এসে মায়ের আঁচলে ঘর্মাক্ত মুখ মুছতে মুছতে বলল, “আম্মু, পাপা কি পারি দেড় ঘণ্টা দৌড়ে শরীরে যতোটুকু ক্যালরি লস করেছে; মোড়ে চায়ের দোকানে তিন চামচ চিনি দেওয়া দুধ চায়ে, ঘিয়ে ভাজা ব্রেড ডুবিয়ে খেয়ে দশগুন বেশি ক্যালরি গ্রহণ করে এসেছে। এখন আবার তেল চিপচিপে পরোটা! ও না কি ডায়েট করবে, আবার জিমেও যাবে।”

অরুণিতা রাগলো না। আপনমনে খেয়ে চললো। পাতার হাসিমুখে একটু ভাটা পড়েছে অরুণাভের আগমনে। অরুণাভ তা খেয়াল করে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো তাঁর। মায়ের আঁচল ছেড়ে বন্ধুর পাশে এসে দাঁড়ায়। 

—————

পাতা ম্লান মুখে কাপড় ইস্ত্রি করছিলো। প্রহর তাঁর পাশে বসেই পটর পটর কথা বলে যাচ্ছিলো। রকেটের গতিতে চলা তাঁর মুখ এক সেকেন্ডের জন্যেও জিরোয় না। একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। 

“মাম্মাম, টুটুল ভাইয়া আমাকে বউ দিয়ে আবার বউ নিয়ে গেলো কেন? আমার কি বউয়ের জন্য বুকের ভেতর আঁকুপাঁকু করে না? আমার কি কষ্ট হয় না?”

পাতা বিরক্ত মুখে বলে, “কখন থেকে বউ বউ লাগিয়েছিস! আরেকবার বউ শব্দটা উচ্চারণ কর, তোর মুখে আমি টেপ লাগিয়ে দিবো।”

“মাম্মাম, বউ…”

“একদম চুপ?”

“আমার কথা তো শোন..”

“চুপ করতে বললাম না তোকে? কখন থেকে মাথা খাচ্ছিস! যা বের হ রুম থেকে।”

শেষ বেলায় দক্ষিণা কোণে বর্ষার কালো মেঘেরা চোখ পাকাচ্ছে। বিনা গর্জনে গগন চিরে এই তো এক ফোঁটা জল নেমে আসে ধরনীতে। পাতা করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছেলের দিকে। তারপর দুই হাত মেলে আদুরে গলায় ডাকে,

“ও লে লে আমার বাবাটা! আসো আদর করে দিবো।”

প্রহর ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দিল। পাতা দুহাতে জড়িয়ে বুকে আগলে নেয় তাঁকে। ভেজা গাল মুছে দিয়ে বলে, “মাম্মাম স্যরি তো! আসলে মাথা ব্যথা করছে। তুমি কখন থেকে বকবক করে যাচ্ছিলে। তাই একটু রেগে গিয়েছিলাম।”

প্রহরের কান্না শেষ। সে মায়ের দুগালে হাত রেখে দুঃখি ভাব মিশিয়ে বলে, “তোমার মাথা ব্যথা করছে মাম্মাম? আমি টিপে দিই?”

পাতার সমস্ত মলিনতা গায়েব হয়ে যায়। ছেলেকে আদরে চুমুতে ভরিয়ে দেয়। আদরের পর্ব শেষ হলে প্রহর মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে কপালে ছোট ছোট আঙুল চালিয়ে টিপে দেয়। পাতা আরাম পায়। প্রহর কপাল টিপতে টিপতে আস্তে আস্তে চুলের খোঁপা খুলে দেয়। তাঁর কিছু মনে পড়ে। সে ছুটে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তেলের বোতল এনে হাতের তালুতে ঢালে। তারপর দুহাতে ঘঁষে মায়ের মাথায় লাগিয়ে দেয়। সে দেখেছে, পাপা মাম্মামের মাথায় এভাবেই তেল দেয়। পাতা মুচকি হাসলো,

“তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, প্রহর?”

“বউকে”

পাতা ঘার বাঁকিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। প্রহর জিভ কামড়ে ধরে। তড়িঘড়ি নিজেকে সুধরে নিয়ে বলে, “মাম্মামকে।”

“সত্যি বলছো, নাকি মিথ্যা?”

“ওহ্ হো মাম্মাম! মিথ্যে তো মিথ্যুক বলে। আমি তো মিথ্যুক নই, আমি সত্যুক। আমি তাই সত্যিই বলেছি।”

“সত্যুক না সত্যবাদী হবে ওটা।”

“কেন? মিথ্যে বললে মিথ্যুক, সত্য বললে সত্যুক কেন হবে না?”

“আমি জানি না।” পাতা আত্নসমর্পন করে। নইলে তাঁকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে। 

প্রহর বলল, “বড়রা তো সব জানে। তাহলে তুমি কেন জানো না?"

পাতাকে কিছু বলতে হয় না আর। তাঁকে বাঁচাতে কেউ দরজা খটখটায়। পাতা হাঁফ ছাড়লো। দরজার দিকে তাকাতেই অরুণাভকে চোখে পড়লো।

“ওলাফ, রূপ তোমাকে ডাকছে। একটু শুনে আসো তো সোনা ভাইটি?”

অরুণাভের কথায় প্রহর চিন্তিত মুখে বলে, “কিন্তু আমি তো মাম্মামের মাথা টিপে দিচ্ছি। মাম্মারে মাথা ব্যথা করছিল তাই।”

“আমি আছি তো আম্মুর কাছে। তুমি যাও!”

“আচ্ছা ঠিকাছে ভাইটুস।”

প্রহর চলে যায়। অরুণাভ হালকা করে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে প্রহর যেখানে একটু আগে বসেছিল সেখানে বসলো। হাতের তালুতে তেল ঢেলে দুই হাতের তালুতে ঘঁষে নেয়। তারপর মাথায় ম্যাসাজ করে দেয়। পাতা মূর্তির মতো বসে থাকে। চোখ মুখ বেশ থমথমে। নিজেকে শক্ত রাখে। অরুণাভ একটু সময় নিয়ে কাতর স্বরে ডাকলো,

“আম্মু?”

পাতা চোখ খিচে নেয়। সেই বুক কাঁপানো ডাক। প্রথমবার গাড়িতে বসে যখন ডেকেছিল পাতা বুকটায় একই ধাক্কা অনুভব করেছিল।

“ও আম্মু?”

নাহ্ বড্ড জ্বালা হলো তো। এভাবে ডাকলে তো পাতা নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।

“কথা বলবে না আমার সাথে?” অরুণাভ বিমর্ষ সুরে বলল। গলা কাঁপছিল তাঁর।

পাতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমার মা কেমন আছে? এরপর আর দেখা করো নি? ফোনে কথা হয় নিশ্চয়ই?”

অরুণাভের মুখটা ম্লান হয়ে আসে। চোখ দুটো নিমিষেই টলমল করে ওঠে। সে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “আমার মা, আমার আম্মু, আমার জান তো তুমিই। আমি আর কাউকেই চিনি না। তুমি প্লিজ ওসব কথা বলিও না। আমার অনেক কষ্ট হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে।”

“আমারও।” পাতার গলাও কেঁপে উঠলো।

অরুণাভ হুট করেই মাকে ছেড়ে বিছানা থেকে নামলো। মেঝেতে বসে মায়ের দুই পা বুকে জড়িয়ে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। অস্পষ্ট শব্দমালা জুড়ে বলে, “আম্মু, ভোর অনেক স্যরি। আর হবে না। প্লিজ কথা বলো আমার সাথে! তুমি কথা না বললে আমার কিছুই ভালো লাগে না। প্লিজ আম্মু, প্লিজ? তুমি এভাবে বললে আমি তো মরেই যাবো।”

পাতা কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো বসে থাকে। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে তার বোধগম্য হলো না। বিশ বছরের ছেলে এভাবে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে পারে? বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে উঠলো, মাতৃমণ ডুকরে কেঁদে উঠলো। স্নেহমাখা হাত অজান্তেই ঘন কালো চুলের ভাঁজে স্নেহ বিলি দিচ্ছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp