জবার সকল কথা শুনে ফারিস বলল,
'এখন কী করবি?'
'আমি যাকে ভালোবাসি, সে আমাকে ভালোবাসবে না তা আমি অকপটে মেনে নিব। পূর্বেও নিয়েছি৷ আমার যাকে ভালো লাগে, তার আমাকে ভালো লাগবে এটা জরুরি নয়। কিন্তু আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করে আমার ইগো, আমার আত্মসম্মানে আঘাত করবে তা মানব না। একতরফা ভালোবেসে মন ভাঙলে, সে ব্যথা একটা সময় পর সয়ে যায়। সে অনুভূতি আমি জানি। কিন্তু ভালোবেসে অভিনয় করবে সে ব্যথা আমি কী করে মানব? সেধে যখন ভালোবেসেছিল তাহলে প্রতারণা কেন করল? শাস্তি দিব ভয়ংকর শাস্তি। ভালোবাসা না পেলে মেনে নেওয়া যা। কিন্তু প্রতারণা? ওটার শাস্তি হয়। ভয়ংকর শাস্তি।"
ফারিস খানিক ভয় পেয়ে বলল,
'আবার ভুল কিছু করিস না জবা।'
'ভুলকে সঠিক করতে ভুল কিছু তো করতেই হয়। ডোন্ট ওরি অন্যায় কিছু করব না। আমি ওদের আঘাতটা এমনভাবে দিব যে, না কাউকে বলতে পারবে, না নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে।'
'আমার কোনো হেল্প লাগবে?'
'নো। একা চলতে বাবা আমায় ছোটোবেলা থেকেই শিখিয়েছেন।'
ফারিস হতাশ হলো খানিক। তবে জবার সাহস দৃঢ়তা দেখে ভালো লাগল।
জবা বাইরের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল,
'ভালোবাসায় প্রত্যাখান হওয়া এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। জীবনে প্রথম যাকে ভালোবাসলাম সেও প্রত্যাখান করল। তারপর ইরফান জীবনে আসল সে চরম ধোঁকা দিল।'
ফারিস বেশ অবাক হয়ে বলল,
'প্রত্যাখান! তোকে প্রত্যাখান করার সাহস কার ছিল?'
জবা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
'কাঁটা ঘায়ে লবন দিচ্ছেন?'
ফারিস খানিক তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
'কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া হওয়ার হলে বলতাম প্রতারক প্রতারিত হয়েছে। সেটা তো বলিনি।'
জবাও অনেক বিস্মিত হয়ে বলল,
'আমি প্রতারক?'
'বাদ দে।'
'বাদ কেন দিব? কথা যখন বলেছেন তখন পুরোটা বলুন। আধা আধি কথা কিংবা পেটে রেখে কথা আমার বরাবরই অপছন্দ।'
'পুরোটা জেনেও যখন শুনবি তখন শোন, তুই বলেছিলি আমাকে ভালোবাসিস। আমার বাবা-মা আর তোর বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে তোকে বিয়ে ঠিক করতে। আমি কথা বললাম, বিয়ে ঠিক করলাম। ভাবলাম তোর গ্রাজুয়েশন শেষ করে বিয়ে করব আমরা। আর তুই কী করলি? আমার সাথে প্রতারণা করে ইরফানের সাথে প্রেম করে বিয়ে করলি। তাও পরিবারকে না জানিয়ে। এখন বল প্রতারক প্রতারিত হবে না? এটাই প্রকৃতির নিয়ম নয় কি?'
জবা এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ফারিসের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
'আপনি যা বলছেন তা সত্যি?'
'১০০%। বিশ্বাস না হলে আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করিস।'
'তার প্রয়োজন নেই। আপনি বললেই বিশ্বাস করব। আমি একটা কথা জানতে চাই আপনি নিশাকে ভালোবেসে আমাকে কেন বিয়ে করতে চেয়েছিলেন?'
'নিশা! কে নিশা?'
'আপনার প্রেমিকা।'
ফারিস অবাক হয়ে বলল,
'যখন থেকে ভালোবাসা অনুভূতি অনুভব করেছি তখন থেকে তোকে ভালোবেসেছি। তাহলে নিশাটা আবার কে?'
জবা আরও বেশি অবাক হয়ে বলল,
'আপনাকে আমি ভালোবাসতাম সে কথা আমি সরাসরি ফুপিকে বলেছিলাম। এও বলেছিলাম, আমার বাবার সাথে কথা বলে আমাদের বিয়ে ঠিক করে রাখতে। ফুপিই তখন বলেছিলেন আপনি নিশা নামের এক মেয়েকে ভালোবাসেন। তাকেই বিয়ে করবেন। আমাকে বোনের নজর ব্যতিত অন্য নজরে দেখা সম্ভব নয়।
সে কথা জানার পর আমি অনেক ভেঙে পড়েছিলাম। স্বাভাবিক হতে কত সময় লেগেছে তা চিন্তাও করতে পারবেন না। তারপর ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর আমার জীবনে ইরফান আসে। আমি ঐ মেয়েদের মতো না যারা একজনার বিরহে নিজের জীবন নষ্ট করে ভেঙে চুড়ে সব থামিয়ে দেয়। আই লাভ মাই সেল্ফ। তো আমি মুভ অন করেছি। আপনি নিশাকে ভালো না বাসলে, আমি ছাড়া কাউকে ভালো না বাসলে, ফুপি কেন আমাকে বলেছিলেন, আপনি নিশা নামের একটা মেয়েকে ভালোবাসতেন?'
জবা ফারিস চূড়ান্ত অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনার মনে একই প্রশ্ন কিন্তু উত্তর যার কাছে জানতে চাইবে সে এ পৃথিবীতে নেই।
জবার জীবনে আবার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নঝড় আসল। আবার ভিতরটা উথাল পাতাল হলো। তবে এবারের প্রশ্নের উত্তর কার কাছে খুঁজবে জানে না ও। আর এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভই কী?
জবা নিঃশব্দে প্রস্থান করল। ফারিস হতভম্ব, বিস্মিত ভঙ্গিতে চেয়ে রইল। বেশ তো ছিল জবার প্রতারণা মেনে নিয়ে। ভালোই ছিল মনের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে। এটা ভেবে ভালো ছিল জবা প্রতারণা করেছে। জবাকে ঘৃণা করতে না পারলেও একরাশ অভিমান অভিযোগ পুষে রেখেছিল ওর প্রতি। এখন কী করবে ও? জবা ওকে ঠকায়নি এ কথা জানার পর কীভাবে শান্তিতে থাকবে ও! কার কাছে জানতে চাইবে এ প্রশ্নের উত্তর? যার কাছে উত্তর ছিল সে দূরে বহু দূরে। তবে কি ফারিসের জীবনের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নের উত্তরটা প্রশ্ন হয়েই থেকে যাবে সারাজীবন?
—————
খাদিজা ভয়ার্ত চোখে জবার দিকে তাকিয়ে আছে। জবাকে বেশ ভালো করেই চিনে ও। প্রায় পাঁচ বছর যাবত এ বাড়িতে আছে ও। জানে জবার নেচার কেমন। জবার দুই পাশে বসে আছে ওর পোষা কুকুর হিটলার আর চেংগিস খান। এরা খুবই ভয়ংকর প্রজাতির কুকুর। খাদিজা এদের প্রচণ্ড ভয় পায়। ভুলেও কখনো কাছে যায়নি।
জবার হাতে ওর পিস্তল৷ রুমাল দিয়ে সেটা মুছতে মুছতে বলল,
'আপা জানো হিটলার আর চেংগিস খান আমার এতটাই প্রভুভক্ত যে ওদের আমি বললে ওরা যে কাউকে হত্যা করতে পারবে। ওদের দাঁত দেখেছে? কাউকে ছিড়ে টুকরো করে খেতে ওদের বেশি সময় লাগবে না। আর আমার হাতের এ গানটা লাইসেন্স করা। আমি এটা দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য কাউকে মারলে তার জন্য আমার শাস্তি হবে না। তাছাড়া আমার বাবার আর আমার প্রচুর টাকা। এ দেশে টাকার জোড়ে বাঘেরও মুখ খোলানো যায়। তো এখন যা জিজ্ঞেস করব তার উত্তর সত্যি কথা বলে দিবেন।'
খাদিজা কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল,
'আচ্ছা।'
'শুনলাম এই বুড়ো বয়সে আপনি নাকি পেট বাঁধিয়েছেন? তা বাচ্চার বাবা আপনার ধর্ম ভাই ইরফান নয় তো?'
'নাউজুবিল্লাহ্। আস্তাগফিরুল্লাহ্।'
'কথা শুনলে মনে হয় সতীর মা মহা সতী। অথচ সবার অগোচরে পেট বাঁধিয়েছেন। কে বাচ্চার বাবা? আপনার সেই স্বামী? যে চোরের মতো আসত?'
খাদিজা মাথা নিচু করে ফেলল। জবা বলল,
'আপনার কাহিনি জানার আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কিন্তু আপনি এ বাড়িতে আসার সপ্তাহ খানিক পর থেকেই আমি সব জানতাম। সব জেনেও আমি আপনাকে কিছু বুঝতে দেইনি। তখন আমার আপনাকে সত্যি অসহায় মনে হয়েছিল বলে।
এখন কথা হচ্ছে, আপনি যার সাথে যা খুশি করুন গিয়ে। সেটা আমার দেখার বিষয় না। তবে এটা আমার বাড়ি৷ কোনো পতিতালয় নয় যে চোরের মতো দালালরা আমার বাড়ি এসে আমার বাড়ির মেয়েদের সাথে শুয়ে যাবে। আপনার অর্থব স্বামীর প্রতি আপনার যখন এতই প্রেম তখন তার কাছে গিয়ে থাকুন। আমার বাড়িতে আমি আর কোনো নোংরামি সহ্য করব না।'
খাদিজা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
'আমার কথা শোনো।'
'কোনো দরকার নেই। পুরো দুনিয়ার সামনে আপনি যে ধার্মিক হওয়ার নাটক করেন তা বন্ধ করুন। আর আগে নিজের নাম পাল্টে রাখুন। এত সুন্দর পবিত্র নামটার তো বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আপনার সেই ভীতু কাপুরুষ স্বামীকে কল করুন। সে এসে আপনাকে নিয়ে যাক। এ বাড়িতে আমি আর কোনো রকম নোংরামো বরদাস্ত করব না।'
খাদিজা কান্নাভেজা কণ্ঠে বলল,
'ও আসবে না।'
'কেন?'
'যখন থেকে শুনেছে আমি আবার মা হবো ও তখন থেকে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আমার কলও রিসিভ করে না।'
জবা হেসে বলল,
'ভ্রমর মধু খেয়ে উড়াল দিয়েছে? এটা তো আগেই বোঝা উচিত ছিল। যে লোক রাতে চোরের মতো লুকিয়ে স্ত্রীর কাছে আসে সে আর কত ভালো হবে। সে যদি সত্যি আপনাকে ভালোবাসতো৷ বা আপনাকে আবার ফিরে পেতে চাইত, তাহলে রাতে চোর লম্পটের মতো না এসে দিনের আলোয় এসে সবার সামনে আপনাকে নিয়ে যেত। সবাইকে এত জ্ঞান দেন নিজের আবেগে জ্ঞান কাজ করেনি? না কি শরীরে গরম বেশি ছিল?'
খাদিজা নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগল। জবা হাসল৷ বিদ্রুপের হাসি৷ বলল,
'এখন ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে লাভ নেই। কালকের মধ্যে এ বাড়ি থেকে বিদায় হবেন।'
'কোথায় যাব আমি?'
'যে লাঙ্গে পেট বাধিয়েছে তার কাছে যান।'
'ও তো আবার আমায় ধোঁকা দিয়ে পালিয়েছে।'
'আর আপনার বড়ো মেয়েদের কী খবর?'
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল খাদিজা। বলল,
'একজন এবার এইচএসসি দিলো। আরেকজন টেনে পড়ে। ছোটো ছেলেটা ফাইবে পড়ে।'
'তো তাদের কাছে যান?'
'ওদের কাছে গিয়েও লাভ নেই। ওরাই তো ওদের দাদা দাদির উপর নির্ভর করে আছে। আমাকে কী তারা রাখবে।'
'এসব লঙ্গের সাথে শোয়ার সময় মনে ছিল না। এখন যেখানে খুশি যান। আই ডোন্ট কেয়ার।'
'প্লিজ জবা।'
'আপনার স্বামী পরকীয়া করে আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল পাঁচ বছর আগে। ইরফান আপনাকে আমার বাড়ি নিয়ে আসল। আমি আশ্রয় দিলাম। উপকারের ভালোই প্রতিদান দিলেন। যেই মেয়েটা আপনাকে এত সম্মান করল, যত্ন নিলো, তার স্বামী দিনের পর দিন পরকীয়া করছে। সেটা জেনেও আপনি তাকে কিছু জানাননি। কাজটা কী ঠিক করেছেন? কী করিনি আপনার জন্য আপা? যখন যা চেয়েছেন দিয়েছি। আপনার সকল কথা মেনেছি। আপনার অসুস্থতায় আমি নিজ হাতে আপনার সেবা করেছি। অথচ আপনি আমার সাথে এমন করলেন।'
খাদিজা জবার পায়ের কাছে বসে বলল,
'আমি জানি, আমি ভুল করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো বোন, আমি ইরফানকে অনেক বলেছি এ পাপ না করতে। এ পথ থেকে ফিরে আসতে। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি।'
'ইরফানকে নিষেধ করার পাশাপাশি আপনার কি উচিত ছিল না আমাকে জানানো। হয়তো আগে থেকে জানলে ইরফান এতটা নোংরা হতে পারত না। ওকে আগে থেকে আমি শিক্ষা দিয়ে ঠিক করতে পারতাম। এখন আমি কী করব? আপনার ধারণা এতকিছুর পরও ওর সাথে আমি সংসার করব?'
'তুমি ওকে ছেড়ে দিবে?'
হাসল জবা। বলল,
'এত সহজে না। সংসার না করা আর ছেড়ে দেওয়া দুটো আলাদা বিষয়। একই বাড়ি থাকলেই যে সংসার করতে হবে এমন নয়। তবে বেঁচে থাকতে ওকে আমি মৃত্যু যন্ত্রণা দিব। যে যন্ত্রণা আমি পাচ্ছি। তার একশগুণ ফিরিয়ে দিব। এত কথা আপনাকে কেন বলছি? আপনি কালকের মধ্যে আমার বাড়ি ছাড়বেন।'
'কোথায় যাব আমি?'
'তা তো আমার বলার কথা না আপা? আকাম করার আগে আপনার ভাবা উচিত ছিল।'
'আমাকে আর কয়টা দিন থাকতে দাও। আমি নিজের একটা ব্যবস্থা করছি। তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না আমি বিপদে পড়ি?'
জবা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,
'এক সপ্তাহ। এর বেশি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।'
'আচ্ছা।'
—————
সময়ের ব্যবধানে পরিচিত নিয়ম কানুন এবং বেঁচে থাকার গল্পগুলো পাল্টে যায়।
সন্ধ্যার পর থেকে কথার শরীরটা প্রচণ্ড খারাপ। বেশ কয়েকবার বমি করে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। নিহাদ ওর পাশে বসে আছে। হঠাৎ কথার এত বমি হওয়ার কারণ কেউ ধরতে পারছে না। কথা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।
নিহাদ পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, 'কথা!'
খুব আস্তে করে কথা বলল, 'হুম।'
'এখন কেমন লাগছে?'
'একটু ভালো।'
'আরেকটু লেবুর শরবত দিব?'
'নাহ।'
'তাহলে কিছু খাবে?'
'নাহ।'
'হঠাৎ এত বমি করছো কেন?'
'কথা নিশ্চুপ।'
প্রশ্নটা করে নিহাদ কিছু সময় চুপ থেকে বলল, 'গত দুই মাস যাবত তোমার সাইকেল ঠিক নেই। কথা, আর ইউ প্রেগন্যান্ট?'
কথা খানিকটা চমকে উঠল। তারপরও নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল,
'না।'
'টেস্ট করিয়েছিলে?'
'হ্যাঁ।'
'রেজাল্ট কি?'
'নেগেটিভ।'
নিহাদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'হসপিটালে গিয়ে একবার চেকাপ করাবে?'
'কোনো প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক আছি। তাছাড়া তুমিই বলেছিলে গ্রাজুয়েশনের আগে বাচ্চা নিবে না।'
'কদিন যাবত তোমার শরীরটা খারাপ লাগছে দেখে বললাম।'
কথা মনে মনে বলল, 'আমি তোমাকে বলব না আমাদের সন্তানের কথা। একদম বলব না। তোমাকে শাস্তি দিব কঠিন শাস্তি। তোমাকে সেদিন জানাব যেদিন এ ভ্রুনটাকে আমি এবরশন করে ফেলে দিব। কোনো চরিত্রহীন লোক আমার সন্তানের বাবা হতে পারবে না। এ সন্তানকে আমি পৃথিবীতে আসতেই দিব না।'
কথা ঘুমাচ্ছে। নিহাদ ওর পাশে আধশোয়া অবস্থায় বালিশে হেলান দিয়ে বসে ওর মাথায় হাত বুলাচ্ছে। কথা আজ নিহাদকে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু সন্ধ্যার পর ওর শরীরটা এত খারাপ হলো যে, বলার মতো অবস্থায় ছিল না।
কথার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিহাদ ওর মুখটার দিকে তাকালো। ছোট্ট একটা মুখ। উজ্জ্বল শ্যামলা গড়নের মেয়েটার চেহারায় রাজ্যের সব মায়া এসে ভীর করে আছে। কথার চোখের পাপড়ি এতটাই ঘন যে, নিচের দিকে তাকালে মনে হয়, চোখ বন্ধ করে আছে। সচারাচার মেয়েদের চোখের পাপড়ি এত লম্বা আর ঘন হয় না।
কথার চোখের পাপড়ি ঘন, ধনুকের মতো চিকন বাঁকা ভ্রু জোড়া। দেখলেই মায়া লাগে। গাল বেশি ফোলা না, আবার বেশি চুপসানোও না, একদম নিখুঁত সুন্দর। শরীরের যে অংশটা ঠিক যতটুকু হলে সুন্দর দেখায়, ঠিক তেমন দেখতে কথা। কথা লম্বাও বেশ। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। নিহাদ পাঁচ দশ।
নিহাদ নিচু হয়ে কথার গালে চুমু খেয়ে বিড়বিড় করে বলল, 'কী দরকার ছিল এতটা মায়াবি হওয়ার? আমার মন তোমাতে এমনভাবে পড়েছে যে, তোমাকে হারিয়ে ফেলতে পারি ভাবতেই দমটা বেরিয়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে। বুকের ভিতরটা ভেঙে চুরমার হচ্ছে। নিঃশ্বাসটাও গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে।
আমাদের সম্পর্কটা কি আদৌ আগের মতো স্বাভাবিক হবে কথা? হয়তো হবে না। আমি অন্যায়টাই তেমন করেছি। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি। তবুও চাইবো তুমি আমায় ক্ষমা করে, শুধু একটা সুযোগ দাও, যাতে করে আমি নিজেকে আবার আগের মতো ভালো মানুষ হিসাবো গড়ে তুলতে পারি।
তুমি ক্ষমা না করলে আমি সত্যি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না। এমনিও আমি কখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। সারাজীবন অনুশোচনার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হবো। তবুও তোমার একটু ক্ষমা সে আগুনে একটু হলেও পানির কাজ করবে।
আমি সত্যি দুর্বল মনের পুরুষ কথা। সবসময় ভয়ে থাকি। কিছুমাস যাবত বেশি ভয়ে থাকতাম তোমাকে হারানোর। সে ভয়টাই আমাকে দিয়ে সবচেয়ে নোংরা কাজটা করিয়েছে। এখন বিভিন্ন উপায় মাথায় আসছে। কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, সেসব উপায় মাথায় আসছে, কিন্তু তখন আমার একদম মাথা ব্ল্যাংক হয়েছিল।
মনে হচ্ছিল আমি ব্যাটারি চালিত পুতুল, যার চাবিটা সিনথিয়ার কাছে। ও যেমন খুশি আমাকে নাচাচ্ছে। এখন মাথায় হাজারটা উপায় আসছে। ওর খারাপ পরিকল্পনা থেকে বাঁচার এত এত পথ আসছে অথচ তখন কোনো উপায় মাথায় আসেনি। এ জন্য বোধ হয় বলে চোর গেলে বুদ্ধি হয়। আমার অবস্থাটাও তেমন হয়েছে। কথা প্লিজ তুমি আমাকে ছেড়ে যাবার কথা ভেব না।'
কথা এতক্ষণ নিহাদের বিড়বিড় করে বলা সব কথাই শুনছিল। কথা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
'তোমাকে ছেড়ে যাব কি না জানি না। তবে তোমাকে ক্ষমাও করব না। তোমাকে এমন শাস্তি দিব, ইতিপূর্বে কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে দিয়েছে বলে মনে হয় না।'
নিহাদ অসহায় চোখে কথার দিকে তাকাল। কথা অপরদিকে ঘুরেই বলতে লাগল, 'খুব কী দরকার ছিল এমনটা হওয়ার? অন্য কোনোভাবে কি সিনথিয়াকে হ্যান্ডেল করা যেত না? তুমি শিক্ষক, অন্যকে বুদ্ধি বিতরণ করো, তবে তোমার মাথায় কেন এ সমস্যা সমাধানের বুদ্ধি আসল না?'
নিহাদ চুপ করে রইল। কথা বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গেল। চোখে মুখে বেশি করে পানির ঝাপটা দিয়ে বের হয়ে মুখ মুছল। তারপর টেবিলে রাখা এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল, 'বারান্দায় যাবে?'
নিহাদ শুকনো মুখে বলল, 'চলো।'
বারান্দায় বেতের চেয়ারে দুজনেই চুপচাপ বসল। কিছুটা সময় নীরবতায় কাটানোর পর কথা বলল, 'আজকের এ চাঁদনী রাতে, তোমার আমার মাঝে দেয়াল না থাকলে বলতাম, নিহাদ চা খাবে? তোমার হাতে হাত রেখে কাঁধে মাথা রেখে চাঁদনী উপভোগ করতাম। তারপর তোমায় মুগ্ধময় ভালোবাসায় সিক্ত হতে চাইতাম, কিন্তু আফসোস এমন স্বাভাবিক ভালোবাসার রাত আমাদের জীবনে আর আসবে কি না আমি জানি না।'
নিহাদ মাথা নিচু করে বলল, 'তুমি চাইলে আবার সব স্বাভাবিক হবে। আমি স্বাভাবিক করব।'
হাসল কথা। তাচ্ছিল্য ভরা সে হাসি। কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটানোর পর কথা বলল, 'এখন বলো সিনথিয়া কী নিয়ে তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল? আর কেমনভাবে ব্ল্যাকমেইল করছিল যে তুমি ওর সাথে বিছানায় চলে গেলে?'
নিহাদ ঢোক গিলল। তারপর বলল,'তোমার শরীরটা কেমন লাগছে এখন?'
'ভালো।'
'এসব এখন বলা কী জরুরি?'
'কেন?'
'তোমার শরীরটা ভালো নেই।'
'চিন্তা করো না, সেদিন তোমাকে আর সিনথিয়াকে ঐ অবস্থায় দেখেও যদি সুস্থ থাকতে পারি তবে আজ তোমার কথা শুনেও সুস্থ থাকতে পারব। আমার সহ্য শক্তি দেখে আমি নিজেই অবাক। তোমাকে কী বলবো? তুমি বলো?'
নিহাদ তারপর কথাকে সব কথা খুলে বলল। নিহাদ-কথা-সিনথিয়ার সকল কথা জানতে হলে পড়তে হবে "অমানিশায় আলো" বইটা।
নিহাদের কথা শুনে কথা একধ্যানে কিছুক্ষণ নিহাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তাচ্ছিল্য কণ্ঠে হাসতে লাগল। বেশ শব্দ করে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে এবার কথা শব্দ করে কান্না করতে লাগল। দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল। নিহাদ অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। কথা কান্না করতেই রইল।
কান্না করতে করতে কথা নিহাদের টি-শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, 'তুমি এতটা বোকা কি করে হতে পারলে? কেন করলে আমার সাথে এমন? কেন ভাঙলে আমার বিশ্বাস? মানলাম প্রথমবার তুমি নিজের অবচেতন মনে ভুল করে ফেলেছিলে, কিন্তু তুমি বিষয়টা আমার সাথে শেয়ার করতে, আমি বিশ্বাস করে নিতাম। তোমাকে সিনথিয়ার হাত থেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম। তা-ও তুমি স্ব-ইচ্ছায় কেন গেলে ওর কাছে?'
নিহাদের কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল। আটকানো কণ্ঠে বলল, 'অনেকবার বলতে চেষ্টা করেছিলাম। আকার ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তুমি বোঝোনি।'
'এত বছর যাবত অন্ধের মতো তোমায় বিশ্বাস করেছি, তাহলে তোমার এ ধরণের কথা আকার ইঙ্গিতে কীভাবে বুঝব?'
'তোমাকে জিজ্ঞেসও করেছিলাম আমার কোনো ভুল ক্ষমা করতে পারবে কি না? তুমি না বলেছিলে। তোমার এ ধরণের কথায় আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম।'
'ভয় পেয়ে কী হলো? সবকিছু কী আগের মতো হলো? সেই তো সবকিছু খারাপের চেয়েও নিকৃষ্ট, খারাপ হলো।'
নিহাদ মাথা নিচু করে রইল। কথা ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
'আমি তোমাকে বললাম তোমার ভুল ক্ষমা করব না, ওমনি তুমি মেনে নিলা আমার কথা? চার বছরে এই চিনেছো তুমি আমায়? এই আস্থা তোমার, আমার প্রতি? এই বিশ্বস্ততা তোমার, আমাদের সম্পর্কে প্রতি? যদি সম্পর্কে আস্থা, বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা না-ই থাকে তবে সেটা কেমন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক? সেটা কেমন ভালোবাসার সম্পর্ক? নিহাদ তুমি কেন বললে না?'
কথা কান্নায় ভেঙে পড়ল। অনেকটা সময় মুখ চেপে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। কিছুক্ষণ পর কথা চোখ মুছে বলল,
'আসলে তুমি আমাকে কখনও বিশ্বাসই করোনি। তোমার আমার সম্পর্কে কখনও বিশ্বাস, আস্তা, ভরসা ছিলই না। থাকলে তোমার সমস্যাটার কথাটা তুমি সর্বপ্রথম আমাকে জানাতে। তাতে আমি তোমায় ভুল বুঝি, নাকি সঠিক বুঝি তার তোয়াক্কা করতে না। তুমি নিজের কাছে সৎ থাকতে। আমাদের সম্পর্ককে সৎ রাখতে। আর আমাকে সেসব কথা না বললেও, অন্তত অন্য মেয়ের সাথে বিছানায় যেতে না।
আসলে তোমারও একটা নতুন শরীরের দরকার ছিল। আমার শরীরটা তো এখন পুরাতন হয়ে গেছে। তাছাড়া আমি তো শ্যামলা, কালো, কিন্তু সিনথিয়া দুধের মতো ফর্সা, চেহারা সুন্দর, স্মার্ট, সব দিকে থেকে পারফেক্ট। এমন মেয়েকে বেড পার্টনার করতে কোন ছেলে চাইবে না! তুমিও ওর রূপে মুগ্ধ ছিলে, ও তো নিজেই পতিতা, তোমার সাথে শুতে চাইত। তুমিও চান্স পেয়ে গেলে। চান্স পেলে কেউ তা হাতছাড়া করে? তুমিও হাতছাড়া করোনি।'
কথার কথাগুলো নিহাদের যেমন খারাপ লাগছিল তেমন রাগ লাগছিল। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
'কথা তুমি লিমিটের বাইরে কথা বলছো। আমি বারবার করে বলেছি সেদিন কী হয়েছিল? তাছাড়া তুমি নিজ চোখে দেখেছো সব। সেদিন বেডে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না।'
কথা তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
'কে কেমন পারফমেন্স করছে সেটা বিষয়টা না। মজা তোমরা দুজনেই নিছো। এমন তো নয় যে তোমার ইমিশন হয়নি? আচ্ছা সেদিন প্রটেকশন নিয়েছিলে নাকি কদিন পর সিনথিয়া বলবে তোমার বাচ্চা ওর পেটে!'
নিহাদ হতভম্ব হয়ে কথার কথা শুনছিল। কথা এত খোলামেলা কাঁচা কথা বলতে পারে, নিহাদের তা ধারণা ছিল না। কথা আবার বলল,
'ও যখন থেকে তোমাকে ব্ল্যাকমেইল করছিল, তোমাকে বলছিল, তাকে বিয়ে করতে নয়তো পরোকিয়া সম্পর্ক করতে তোমার তখনই বোঝা উচিত ছিল ও কোন মাপের বেশ্যা। তুমি একটু চিন্তা পর্যন্ত করলে না? নাকি ওর রূপ দেখে তোমারও ওকে একবার ভোগ করার ইচ্ছা জেগেছিল?'
নিহাদের এবার প্রচণ্ড রাগ চেপে গেল। বারান্দায় রাখা টেবিলটার উপর জোরে ঘুষি মারল। টেবিলটা কাঁচের হলে হয়তো ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। কাঠের টেবিল ভাঙেনি ঠিকই তবে টেবিলের উপর রাখা কাঁচের শোপিচটা পড়ে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
কথাও রাগ করে জেদি কণ্ঠে বলল,
'এই রাগ আমার সাথে না দেখিয়ে সেদিন যদি সিনথিয়ার সাথে দেখাতে তাহলে আজ তুমি আমার কাছে পিওর মানুষ হতে। লোকে বলে পুরুষ রাগে হয় বাদশা আর নারী রাগে হয় বেশ্যা। তবে তুমি কেন পুরুষ বেশ্যা হলে? খরবদার পৌরষত্ব আমার সাথে দেখাবে না। যখন সিনথিয়ার সাথে দেখানোর ছিল তখন বিড়াল হয়ে গেছিলে কেন? অবশ্য পৌরষত্ব তো দেখিয়েছ বিছানায়। সিনথিয়া সেদিন তোমার বিছানার টাইমিং এর বেশ প্রশংসা করছিল। অবশ্য প্রশংসা তো করবেই, তুমি বিছানায় কতটা পারদর্শী তা আমার চেয়ে ভালো কে জানে?'
নিহাদ বেশ রাগ করে বলল,
'কথা, রাগে তুমি কী বলছো তুমি জানো না! বস্তির মেয়েদের মতো কথা বলছো।'
কথা রাগের মাথায় নিহাদের টি-শাটের কলার ধরে গায়ের জোরে টান দিলো। টি-শার্টের কয়েকটা বোতাম ছিড়ে নিচে পড়ে গেল, সেখান থেকে বেশ খানিকটা ছুলেও গেল।
কথা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
'বস্তির লোকরাও কারও সাথে বিছানায় যাবার আগে হাজারবার ভাবে। তুমি একজন শিক্ষক হয়ে কেন ভাবলে না? বস্তির লোকেরা অর্থের অভাবে বস্তিতে থাকে, তাদের শিক্ষা দিক্ষা কম, হয়তো শিক্ষার অভাবে তাদের কথা বলার ধরণ কিছুটা নিম্ন কিন্তু তারা যখন তখন যে কারও বিছানায় যায় না।
আমি বস্তির মেয়ে হলে তুমি যার সাথে বিছানায় গিয়েছিলে সে একজন পতিতা। পতিতাটা শুধু তোমার সাথেই শোয়নি আরও কয়েকটা ছেলের সাথে শুয়েছিল। সেসব ছেলের সাথে এখনও তার সম্পর্ক চলছে। তাকে ছাড়ার চেষ্টা করছে পতিতাটা, কিন্তু তোমার কাছ থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স না পেয়ে নিজের সম্পর্ক ছাড়বে না। তুমি তাকে হ্যাঁ বললে সে তোমার হয়ে যাবে। যা-ও গিয়ে পতিতাটাকে হ্যাঁ বলে দাও। অমন সুন্দর রমনী জীবনে পাবে না। দরকার হলে বিয়ে করে, সারাজীবন নিজের কোলে বসিয়ে রাখো।'
রাগে নিহাদের শরীর কাঁপছে। ভাবল, এখানে থাকলে কথাকে উল্টা পাল্টা কিছু বলে ফেলবে। তাই ও রাগ করে সেখান থেকে চলে গেল। ও বুঝল, কথাকে এখন কিছু বলা না বলা সমান। এখন যা-ই বলবে কথা সেটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে। নিহাদ রুমে গিয়ে বসে রইল। রাত দুটোর বেশি না বাজলে নিহাদ এতক্ষণে বাইরে চলে যেত। এত রাতে বাইরে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তাছাড়া ওর বাবা মা দেখলে বিষয়টা ঠিক হবে না। তাই চুপ করে বিছানায় বসে রইল।
রাগে কথার গা থেকেও আগুন বের হচ্ছে। চুপ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। ও মনে মনে বলল,
'আমার এত রাগ লাগছে কেন? এত রাগ লাগার তো কথা না? আমি তো ঠান্ডা মাথায় নিহাদের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। তাহলে হুট করে এত রাগ চেপে গেল কেন?'
পরক্ষণে ওর মনে পড়ল, ওর শরীরে বর্তমানে ছোট্ট একটা প্রাণের বসবাস। তার কারণে শরীরের হরমোনে বড় ধরণের পরিবর্তন হচ্ছে। যে পরিবর্তন কথার ব্রেইন সহজে নিতে পারছে না। হুটহাট রাগ চেপে যায়। হুট করে মন ভালো হয়ে যায়। এই কান্না পায় তো এই হাসি। এ সময় মেয়েরা সবচেয়ে বেশি কাছে চায় তার স্বামীকে। কথা সেটা তো পাচ্ছেই না বরং নিহাদকে নিয়ে রাগে দুঃখে আধা পাগল হওয়ার মতো অবস্থা ওর।
বারান্দায় চেয়ারে বসেই শব্দ করে কাঁদতে লাগল। এ সময় এত মানসিক চাপ, এত মানসিক ধকল নতে পারছে না ও। মাথাটা তীব্র যন্ত্রণায় ভোতা হয়ে আছে। কান্নার দরুন কথার বারবার হিচকি। কথা মনে মন বলল,
'এত কেন কষ্ট হচ্ছে আমার? নিহাদ তো বারবার বলছে কেন এসব হয়েছিল। তা-ও কেন আমার মন ওকে মাফ করতে পারছে না?'
কথার কান্নার বেগ বাড়তেই রইল। এমনি ওর মাথা ব্যথার সমস্যা, তারমধ্যে এত কান্নার দরুণ ওর মাথা এত যন্ত্রণা হচ্ছে যেন ফেঁটে যাবে। দপদপ করছে মাথাটা। কথা মাথা চেপে ধরে কাঁদতে লাগল।
নিহাদ অনেকক্ষণ বসে রইল। কথার কান্না আর সহ্য করতে না পেরে ওর কাছে আসল। দেখল কথা বাইরের দিকে তাকিয়ে অর্নগল কেঁদেই যাচ্ছে। নিহাদ, কথার হাত ধরে বলল,
'ঘরে চলো।'
কথা ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল। নিহাদ আবার হাত ধরল। কথা আবার ছাড়িয়ে নিল। এবার নিহাদ হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে কথার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল,
'প্লিজ কথা, একটাবার ক্ষমা করে দাও। ভুল করেছি, পাপ করেছি, মহা অন্যায় করেছি তুুমি আমাকে যা খুশি শাস্তি দাও। তা-ও নিজেকে কষ্ট দিও না। প্লিজ কথা।'
নিহাদ কথার পা জড়িয়ে ধরেছে। বিষয়টা ও নিতে পারল না। বরাবরই বাঙালী মেয়েরা স্বামীর ক্ষেত্রে একটু বেশি আবেগী। কথাও তার বিপরীত নয়। কথা নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে নিহাদকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। নিহাদের কপালে, গালে, চোখে অসংখ্য চুমুতে ভরিয়ে দিতে লাগল। আর কাঁদতে কাঁদকে বলতে লাগল,
'আমি তোমায় প্রচন্ড ভালোবাসি। সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসি। যতটা ভালোবাসি কষ্টও ততটা হচ্ছে। বিশ্বাস করো তোমাকে ক্ষমা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এত দ্রুত এত সহজে ক্ষমা করতে পারব না আমি।'
নিহাদ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
'তোমার আমাকে ক্ষমা করতে হবে না। তুমি আমাকে যতখুশি শাস্তি দাও, তা-ও নিজেকে সুস্থ রাখো।'
দুজনেই দুজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অঝোড়ে কাঁদতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর নিহাদ দাঁড়িয়ে কথাকে কোলে তুলে নিলো। কপালে চুমু এঁকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও শুয়ে ওকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল। অনেকক্ষণ কান্না করার কারণে কথা কিছুক্ষণ পর পর কেঁপে কেঁপে উঠছে আর নিহাদ আরও ভালোবেসে ওকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিচ্ছে।
নিহাদ-কথা-সিনথিয়ার সকল কথা জানতে হলে পড়তে হবে "অমানিশায় আলো" বইটা। আপনার পছন্দের যে কোনো বুকশপে বইটি পেয়ে যাবেন।
—————
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে ঠিক করছে জবা। সাজাচ্ছে আয়োজন করে, খুব যত্ন করে সময় নিয়ে। এমনি তো কম সুন্দরী নয় ও। তবুও মার্জিত সাজ ওর ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
জবা আজ আকাশের রঙে সেজেছে। হালকা নীল শাড়ি। শাড়ির পাড়ে চিকন করে সোনালী পার্লসের কাজ করা। এক হাতে দামি ঘড়ি অন্য হাতে হীরার দু গাছা চুড়ি। নাকে জ্বলজ্বল করছে হীরার ছোট্ট চিকন নথ। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। চুল খোলা।
শরীরে উপচে পড়া সৌন্দর্য আর চোখে প্রখর আত্মবিশ্বাস। ওর চোখে যেন আগুন জ্বলছে। যে আগুণে ও দোষীদের জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিবে।
আয়নায় নিজেকে দেখে বাঁকা হেসে বলল,
'ইরফান ভেবেছিল আমি ভেঙে পড়ব, কিন্তু ও জানে না আমি ভেঙে পড়ার দলে না ভেঙে ফেলার দলে। আমি ভাঙিনি, আমি বদলেছি।
আমি ভেঙে পড়িনি। হিসাব রাখা শুরু করেছি। ভুল মানুষকে ভালোবাসা পাপ না,
কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি না দেওয়া পাপ। সবাই ক্ষমা করে না, কেউ কেউ হিসাব রাখে। আমি হিসাব রেখেছি এবং শাস্তিও দিব।'
চায়ের মগ হাতে ইরফান দাঁড়িয়ে আছে ওর গোলাপ বাগানে। জবা বাড়ি নেই। কিছুক্ষণ আগে বেড়িয়েছে। জবাকে এত চমৎকার লাগছিল যে ইরফান নতুন করে ওর প্রেমে পড়েছে আজ। কিন্তু জবা ওকে বিশ্বাস করবে না। সে বিশ্বাস ও ভেঙে দিয়েছে।
ইরফান মনে মনে বলল,
'একবার ভেবেছিলাম আমার প্রতারণা জানলে ও ভেঙে পড়বে কাঁদবে। কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম ও জবা। She didn’t cry, she planned. কিন্তু ওর পরিকল্পনা ধরতে পারছি না। এখনও আমাকে এ বাড়িতে রেখেছে। সম্পত্তি থেকে বেদখল করা কিংবা শারীরিক আঘাত করা ওর মূল পরিকল্পনা নয়। ওর মূল পরিকল্পনা আরও ভয়াবহ।
বিয়ের আগে ওকে আমি চিনতে ভুল করেছিলাম৷ যদি জানতাম সহজ সরল মুখের পিছনে এক ভয়ংকর বাঘিনী লুকিয়ে আছে, তাহলে আমি কখনো বিয়ে করতাম না। ও শুধু চালাক নয়, ভয়ংকরও বটে। ওকে টেক্কা দেওয়া আমার মতো কয়েকটা ইরফানের কাজ নয়৷ এখনই নিজেকে কেমন হেরে যাওয়া মানুষ মনে হচ্ছে। আমি কী আদৌও কখনো জবার সাথে বুদ্ধিতে জিততে পারব?'
—————
হেনা বসে আছে সিনথিয়াদের বাড়ির বসার ঘরে। কিছুক্ষণ আগেই ও এসেছে। ওকে দেখে সিনথিয়ার মা নিলুফা বেগম বললেন,
'কেমন আছো?'
'আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?'
'এই তো আল্লাহ রাখছে কোনো রকম।'
হেনা ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বেশ চকিত হলো। সিনথিয়া তারই রূপ গুণ পেয়েছে হয়তো, কিন্তু চরিত্র পায়নি৷ এত সুন্দরী মহিলার চোখের নিচটা কুচকুচে কালো হয়ে আছে। চোখে মুখে বির্মষতা আর কষ্টের ছাপ। এগুলো যে তার ছোটো মেয়ের কারণ বোঝা যাচ্ছে।'
হেনা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আন্টি আপনার এ অবস্থা কেন? শরীর ঠিক আছে তো?'
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন,
'আর শরীর। বেঁচে আছি এই অনেক।'
'ওহ। সিনথিয়ার কোনো খবর জানেন?'
'না। আর জানতেও চাই না। তুমি ওর খোঁজে আসলে যেতে পারো।'
'আমি ওর খোঁজে আসিনি। এসেছি আপনাদের আমানত ফেরত দিতে।'
'বুঝলাম না।'
'সিনথিয়া যেদিন আপনাদের বাড়ি ছাড়ে সেদিন আমার বাসায় গিয়েছিল। তারপর আমার সাথেও কিছু বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়। তখন ও ওর ব্যাগপত্র রেখে চলে যায়। পরে আমি ব্যাগ খুললে অনেক গয়না ও টাকা পাই। এসব দেখে বুঝতে পেরেছিলাম আপনাদের। তাই নিয়ে এলাম। সরি এতদিন বিভিন্ন ঝামেলায় আমি আসতে পারিনি।'
ফস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল নিলুফা বেগম। বলল,
'ভেবেছিলাম আর পাব না৷ কিন্তু তুমি বড়ো উপকার করলে মা। তুমিও তো রাখতে পারতে?'
'পরের জিনিসে লোভ করা আমার বাবা মা শেখায়নি আমাদের। এতদিন আমার ভাইটা খুবই অসুস্থ ছিল। সে কারণে আসতে পারিনি। আপনাদের কারও ফোন নাম্বারও জানতাম না যে কল করে বলবো।'
'তোমার এত এক্সপ্লেনেশন দিতে হবে না মা। এসব পাওয়ার আশা আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপরও পেয়েছি তাতেই খুশি। তুমি বসো আমি চা নাস্তা নিয়ে আসি।'
'আজ না আন্টি। আমার কাজ আছে। আসি।'
'আচ্ছা।'
হেনা চলে যেতেই নিলুফা আনমনে চোখের জল মুছল। তার মেয়েটা কতগুলো মানুষের জীবন নষ্ট করেছে।
—————
মন্ত্রী এহসান সাহেবের স্ত্রী রত্না আজ মিরাজের সাথে পালিয়ে গেছে। মন্ত্রী সাহেব তাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছে সারা শহরে। সাথে জবার বাড়ি আসল তিনি নিজে। তার ধারণা রত্মাকে পালানোর জন্য জবাই সাহায্য করেছে।
জবার বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে আছেন তিনি। কিছুটা ভীত লাগছে তাকে। কয়েকদিন আগেই জবা ডিএসপি এর নাক ফাঁটিয়েছিল কোনো কারণে। যে মেয়ে ডিএসপি এর নাক ফাঁটাতে পারে তার কাছে মন্ত্রী কিছু না।
জবা এহসান সাহেবকে দেখে বলল,
'জি বলুন মন্ত্রী সাহেব।'
'আমার স্ত্রী রত্না কোথায়?'
'সরি..! আমি কী করে বলব? আমার সাথে তার কী সম্পর্ক?'
'গত এক মাসে রত্না তিন বার আপনার সাথে দেখা করেছিল।'
'তো?'
'তো আপনি কিছু জানেন?'
'মন্ত্রী সাহেব কিছুদিন আগে আমি মেগাস্টার সাকিবখানের সাথে দেখা করেছি। এখন যদি আপনি আমাকে সাকিব খান কার সাথে ডেটিং চ্যাটিং করে তা তো আমি বলতে পারব না৷ রাইট?'
'লাস্ট ইয়ার আমি আমেরিকা গিয়ে হলিউড সুপারহিরো ক্যাপ্টেন আমেরিকা মানে ক্রিস ইভান্সের সাথে দেখা করেছিলাম, হাগ করেছিলাম। শুনেছি তার ডজন খানিক গার্লফ্রেন্ড আছে। এখন আপনি আমাকে তাদের কথা জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই আমি বলতে পারব না। আপনার ওয়াইফ আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল বলেই যে আমি জানব সে কোথায় এটা তো কথা না তাই না?'
এহসান সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। জবার সাথে তিনি কথায় পারবেন না জানেন৷ এই মেয়েটার সামনে তার নিজেকে খুব হেয় প্রতিপন্ন মনে হয়। কেমন পাহাড়ের মতো অটল, ঝর্ণার মতো নির্ভীক। কথার তেজে যে কাউকে দাবিয়ে রাখতে পারে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………