ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১৫ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
“একটা হলে ভালো হয়, দুটোর বেশি আর নয়– পরিবার পরিকল্পনার এই স্লোগানটা শুনিস নি তুই? ভাই, তিনটে আছেই; চার নাম্বার আনার খুব দরকার ছিলো? তাও এই বয়সে? ফুটবল টিম বানাবি নাকি, হুম?”

অরুণ সরকার শ্লেষ ভরা চোখে ডাক্তারের দিকে তাকালো। গাইনোকোলজিস্ট ডা. তিথি চৌধুরী তাঁর এককালীন স্কুল ফ্রেন্ড। বড্ড ভুল হয়েছে পাতাবাহারকে এর কাছে এনে। সে আড়চোখে পাশে বসা মানবীর দিকে তাকালো। মুখটা বড্ড থমথমে। 

“রিপোর্ট কি এসেছে সেটা ক্লিয়ার কর। এটা মজার বিষয় মোটেই না।”

অরুণের চাপা স্বরের ধমকে তিথির হাসি বিস্তার লাভ করলো। রিপোর্ট বাড়িয়ে বলল, “তুই নিজেই দেখ! ভাবী প্রেগন্যান্ট, তিন মাস চলছে।”

পাতা কালবিলম্ব না করে টেবিলের উপর থেকে পার্স আর মোবাইলটা হাতে নিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। তাঁর হিলের খটখট শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিথি অবাক কণ্ঠে বলল, “এভাবে চলে গেলো কেন? আমি তো যা বলার তোকেই বলছিলাম।”

অরুণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে রিপোর্টে চোখ ফিরিয়ে আনে। বলে, “ব্যাপারটা নিয়ে ক’দিন খুব আপসেট আছে। কিছু মনে করিস না তিথি।”

পাতার আচরণে একটু রাগ হলেও তিথি বুঝতে দিলো না। হাসিমুখে বলল, “ব্যাপাটা একটু লজ্জারই। কিন্তু তুই যে নির্লজ্জ! বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে। ওদের সামনে কোন মুখে যাবি? বেক্কেল!”

অরুণ কিছু বললো না। তিথি নিচু কণ্ঠে বলল, “চাইলে এবরশন করাতে পারিস।”

“আর ইয়্যু আউট ওফ ইয়্যুর মাইন্ড? হাউ কুড ইয়্যু সে দ্যাট তিথি!”

“সো ইউ’আর প্ল্যানিং টু রেইজ আ বেবি ইন দিস এজ? প্রহর ছোট হলেও অরুণিতা, অরুণাভ যথেষ্ট বড় হয়ে গেছে। এই স্টেজে বেবি… অরুণ পাতার কথা একবার ভাব! ওই বেচারি কিভাবে সহ্য করবে? বাড়ন্ত পেট নিয়ে সে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে, দেবর, ননদ, পাড়া প্রতিবেশীদের সামনে যাবে কিভাবে?”

অরুণ তাৎক্ষণিক জবাব দিলো না। একটু ভেবেচিন্তে বলল, “সে অলরেডি আমাদের মাঝে এসে গেছে। এখন আর এসব বলে লাভ আছে? তুই ডাক্তার মানুষ। কই সাহস দিবি, তা-না করে এবরশনের কথা বলছিস। তোরা ডাক্তাররা এত কসাই কেন রে? একটা প্রাণকে দুনিয়া দেখার আগেই মেরে ফেলার পরিকল্পনা করিস! গজব পড়বে তোদের উপর।”

অরুণের ফর্সা চোখ মুখ রাগে লাল হয়ে এসেছে। তিথি ক্লান্ত স্বরে বলল, “পেট তোর ফুলবে না অরুণ। আমাদের সমাজের মানুষ গুলো খুবই লো মেন্টালিটির। তাদের অন্যের ব্যাপারে নাক গলাতেই হবে, খিল্লি উড়াতেই হবে। তাঁরা নিজেদের আনন্দ মুহূর্তেও ওতটা আনন্দ উপলব্ধ করে না যতটা অন্যকে নিচু দেখিয়ে পায়। আমার এক পেসেন্ট আছে। দুটো মেয়ে আছে তাঁর। একটার বিয়ে হয়ে গেছে আরেকটা ভার্সিটির স্টুডেন্ট। তো ছেলের আশায় আরেকবার বেবি প্ল্যানিং করে। বেবি ক্যারি করলে পাড়া পড়শী যেন হাতে ঈদের চাঁদ পেয়ে যায়। মহিলা ঘর থেকেই বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ঘরেও যে অশান্তি! তাঁর মেয়ে দুটো মাকে যা নয় তাই বলে অপমান করে। যে মেয়ের বিয়ে হয়েছে সে কি বলে জানিস? এবরশন না করালে মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। শেষ মেষ বেচারি এবরশন করাতে বাধ্য হয়। কত কাঁদছিল মহিলাটি।”

অরুণ সরকার টেবিলের কনুই ঠেস দিয়ে চোখ ডলে। ক্লান্ত লাগে, বুকটায় জ্বালাপোড়া করে। মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের ভেতর ঝিঁঝিঁ পোকার দল আক্রমণ করেছে।

“অরুণ, আর ইয়্যু ওকে?”

“ইয়াহ্!”

“নো, ইয়্যু আর নট!”

“আ’ম ফাইন, উঠছি তিথি। পাতার ওভাবে চলে যাওয়ায় কিছু মনে করিস না যেন। বাচ্চা মেয়ে…”

“বাচ্চা মেয়ে?” মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কৌতুকপূর্ণ স্বরে প্রশ্ন করে তিথি। ভ্রু যুগলে দুষ্টু নাচোন। 

অরুণ মৃদু অধর বাঁকিয়ে বলে, “তোর সাথে তুলনা করলে বাচ্চাই তো! তিথি বুড়ি ডাকলে ক্ষেপতিস না? তিথি সত্যিই বুড়ি হয়ে গেছে!”

“ইন মায় মাইন্ড, আ’ম যাস্ট সিক্সটিন।”

অরুণ রিপোর্ট দিয়ে তিথির মাথায় মেরে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। তিথি মুচকি হাসে। হারিয়ে যাওয়া যৌবন যদি ফিরে পাওয়া যেতো!

অরুণ লম্বা লম্বা পা ফেলে পার্কিং লটে পৌঁছায়। পাতা গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখ ফুলে আছে। আঁখি পল্লব ভেজা, কোটরে এখনো পানি টলমল করছে। অরুণ বলার মতো ভাষা পেলো না। ডোরলক খুলে গাড়িতে বসে। ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে দিতেই পাতা এসে বসলো। অরুণ গাড়ি পার্কিং লট থেকে রাস্তায় আনে। আড়চোখে পাতার কান্নাভেজা মুখ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হাতটা নিশপিশ করে, মাথায় স্নেহের বুলিয়ে দিতে চায়। কিন্তু কিসের জড়তা এসে বাঁধা দেয়। 

“আমাদের দেরি হচ্ছিলো বলে বাচ্চারা মিরপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। আমরা সরাসরি সেখানেই যাই?”

পাতা উইন্ড্রস্ক্রিণে নজর স্থীর রেখে বলে, “আমার শরীর খারাপ লাগছে, যাবো না। রিকশায় তুলে দিন, আমি বাড়ি ফিরবো।”

অরুণের নিশপিশ করা হাত সুযোগ পেয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে পাতার কপাল, গলা ছুঁয়ে দেয়। উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে, “খুব বেশি খারাপ লাগছে? বমি বমি ভাব হচ্ছে কি…”

পাতার ক্রোধভরা চাহনিতে অরুণ নিজেকে সংযত করে। গম্ভীর গলায় বলে, “একবার চেকাপ করে গেলেই হতো। গাড়ি ঘুরাই?”

“বাড়ি যাবো আমি।”

পাতার দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলো। অরুণ আর কিছু বললো না। গম্ভীর মুখে গাড়ি চালানোয় মনোনিবেশ করে। পাতা একবার বলল, “আমাকে রিকশায় তুলে দিন, আর আপনি মিরপুর যান।”

“আমিও যাবো না।”

পাতা কতক্ষণ গম্ভীর মুখপানে চেয়ে রইলো। এখনি বলে দিবে কি? পাতা গলায় চিবুক ছুঁইয়ে নজর ঝুঁকে নেয়। আঁচল সরিয়ে পেটে হাত রেখে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “আমি এবরশন করার কথা ভাবছি। এই বয়সে এসে আমি হাসির খোরাক হতে চাই না।”

“তাই নিষ্পাপ প্রাণীটিকে মেরে ফেলতে চাইছো। খুব ভালো সীদ্ধান্ত পাতাবাহার। তুমি যদি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারো আমার কোনো আপত্তি নেই।”

অরুণ সরকার অতি শান্ত সুরে প্রত্যুত্তর করলো। পাতার চোখ ছেপে বড় বড় অশ্রু ফোঁটা গাল, চিবুক ছুঁইয়ে গলার গর্তে এসে জমায়েত হয়। অরুণ সরকার হাত বাড়িয়ে গাল মুছে দিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে নমনীয় সুরে বলল, 

“সব ঠিক হয়ে যাবে, কেঁদো না।”

নিছক সান্ত্বনা! এছাড়া যে আর কিছুই করার নেই। পাতা কিছুই বললো না। কান্নাও থামালো না। লোক জানাজানি হলে কি হবে? লোকের কথা ছাড়ো; যখন ভোর, অরু জানবে তাদের মুখোমুখি কি করে হবে? শুধু অরু থাকলেও না হয় মানা যেতো। কিন্তু ভোর? ছেলে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে আর মা প্রেগন্যান্ট! এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছুই নেই। পাতা আর ভাবতে পারে না। দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ‌ সব ভুল তাঁর! 

—————

“পত্র, তোমার দাদু বাড়িতে কথা হয়েছে আমার। ওনারা তোমাকে নিতে খুব আগ্রহ প্রকাশ করছে। বিশেষ করে তোমার দাদাজান। তুমি কি ওখানে যেতে চাও?”

পত্রলেখা সমান তালে দুহাত কচলাতে লাগলো। ভি–আকৃতির চিবুক গলায় লেগে আছে। পপী চৌধুরী মেয়ের চিবুক ধরে মুখখানি উঁচু করে। স্নেহের সুরে বলে, “নিজের ভালো থাকাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না, পত্র। আমি দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে মা। অনেক আগেই এ সংসারে তোমাকে আনতে পারতাম। কারিম খুবই ভালো মনের মানুষ। ও তোমাকে নিজ সন্তানের মতোই ভালোবাসা দিতো। কিন্তু কবিরের মা মানুষটা দুমুখো সাপ। তোমার জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিতো। এ কদিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছো সে কেমন ধারার? আর জারিফ একটা মানসিক রোগী। মেয়েদের সহ্যই করতে পারে না। সেই মেয়ে ওর মা, বোন, ভাতিজি যেই হোক। আমার পুষ্পর দশ বছর হলো। কোলে নেওয়া তো দূর, কখনো ডাকেও নি। একবার ঈদে সালামী চাইতে গিয়েছিল। এমন জোরে ধমক দিয়েছে বাচ্চা মেয়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছে। মা বোনদেরও দুই আনার সম্মান দেয় না। নেশাপানি গিলে, গাঁজা খায়। দুইবার রিহ্যাবের পাঠানো হয়েছিল। সুধরেছে কিনা ওই ভালো জানে। কেউ দেখতে পারে না ওকে।"

পত্রলেখা আগ্রহ নিয়ে সবটা শুনলো। কথাগুলো সে টুটুলের কাছেও শুনেছে। পপী চৌধুরী আরও বললেন,

“জারিফ তোমাকে ভিন্ন চোখে দেখে তা হয়তো বুঝতে পেয়েছো। বাড়ির কম বেশি সবাই খুশি, মেয়ে বিদ্বেষী ছেলে বিয়ের কথা বলেছে। খুশি হবে না? ওঁরা চাইছে যত দ্রুত সম্ভব কথা আগাক। আমার শ্বাশুড়ি কারিমের কাছে প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু কারিম মানা করেছে। আরে তোদের কি জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়েছে? কোন আক্কেলে আমার মেয়ের সাথে আমারই দেবরের বিয়ের কথা বলিস? কারিম শুনিয়েছেও কয়েক কথা। এখন আমার ভয় করছে, জারিফ উল্টোপাল্টা কিছু করে না বসে! পত্র, মা আমার। আমি কি বলছি বুঝতে পারছো?”

পত্রলেখার অবাক হবার পালা। জল এতোদূর গড়িয়েছে? এই জারিফ মোল্লা নিঃসন্দেহে মেন্টাল। মেন্টাল মোল্লা নাম রেখে সে ভুল কিছু করে নি।

“পত্র, দেখো, আমি তোমার এবেলায় সুখ দিতে পারিনি। আমি জানি ভাইজান-ভাবী তোমার সাথে খারাপ আচরণ করে নি। আবার তোমাকে কখনো ভালোবেসে বুকেও আগলে নেয় নি। তুমি একাই বড় হয়েছে। ভালোবাসা, স্নেহ, পরিবারের সুখ কি তা তুমি জানোই না। তাই আমি চাই তোমাকে সুখী পরিবারে পাঠাতে। একটা বিশ্বস্ত হাতে তোমাকে তুলে দিতে। যে তোমাকে বুঝবে, সর্বস্ব দিয়ে আগলে রাখবে, তোমাকে সম্মান করবে। তোমাকে সুখে রাখার জন্য সে সব করবে। যেখানে তুমি আপন পরিবার পাবে। পত্র, অনেকেই সহানুভূতি দেখিয়ে তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে, অনেকে তোমার রূপের মোহে পড়ে। আমি চাইলে তোমাকে তাদের হাতেই দিয়ে দায়িত্ব মুক্ত হতে পারতাম। কিন্তু তুমি তো শুধু আমার দায়িত্ব নও। আমার মেয়ে, যে আমাকে প্রথম মাতৃত্বের স্বাদ দিয়েছিল। হয়তো আমি ভালো মা নই, কিন্তু আমি খারাপ মাও হতে চাই না, পত্র। আমি আমার সোনা বাচ্চাটাকে খুব ভালোবাসি।”

পত্রলেখা নীরব কান্নায় বুঁদ হয়। পপী মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। আদর করে বলে, “তোমার দাদাজান তোমাকে আফগানিস্তান পাঠাতে বলছে। কিন্তু আমি তোমাকে পাঠাতে চাই না। আবার আমি তোমাকে এই বাড়িতেও রাখতে ভয় পাচ্ছি। জারিফের ভয়! আমি বর্ষা আপার সাথে কথা বলে ওদের সাথে যদি একটা বন্দোবস্ত করে দিই? থাকবে ওদের সাথে? নাকি গার্লস হোস্টেলে থাকবে?”

পত্রলেখা বিষন্ন চোখে না বোধক মাথা নাড়ে। ইশারায় বোঝায় সে এই বাড়িতেই থাকতে চায়, মায়ের কাছে। এখানে তাঁর একমাত্র বন্ধু টুটুল আছে, কারিম আঙ্কেলের স্নেহমাখা হাত আছে, যা পুষ্পের মতো তাঁর মাথাতেও স্নেহ মেখে দেয়। পুষ্পর দাদি, আর মেন্টাল মোল্লা বাদে বাড়ির বাকি সবাইও ভালো আছে। সে সবসময় চাইতো মায়ের কাছাকাছি থাকতে। কিন্তু মা তাঁকে নিতে চাইতো না। সে রাগারাগী করতো, জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো। তখন নানু বুঝিয়ে বলতো মায়ের পরিস্থিতি। সেও বুঝতে পারতো কিছু কিছু। আবার খারাপ লাগা কাজ করতো, অঢেল অভিমান হতো। কিন্তু মা প্রতি সপ্তাহ অন্তর অন্তর তাঁর সাথে দেখা করতে এসে তারজন্য অনেক উপহার আনতো তখন সব অভিমান ভেঙে চুরমার হতো। তাঁকে সময় দিতো, ঘুরতে নিয়ে যেতো, শপিং করিয়ে দিতো, তাঁর সাথে বসে কার্টুন দেখতো, তার সমস্ত দরকার পূরণ করতো। শুধু বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয় নি কখনো। পত্রলেখার মনে নেই শেষ কবে মায়ের সাথে ঘুমিয়েছে। 

পপী চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যান। পত্রকে এ বাড়িতে রাখা সম্ভব নয়। জারিফ মোল্লাকে চিনে সে। ওঁর যা চাই, তা পেতে যা কিছু করতে পারে। কিছু একটা তো করতেই হবে।

পত্রলেখা চেয়ার টেনে বসে। নোটবুক টেনে নিয়ে কলম আঁকিবুঁকিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

—————

জারিফ মোল্লা বাগান পরিচর্যা করছিলো। হঠাৎ চোখ পড়ে বাগানের বেড়া ঘেঁষে দাঁড়ানো মানবীর উপর। জারিফ মোল্লা চোখ ফেরাতে পারে না। এ কি সত্যিই মানবী, নাকি আসমান থেকে নেমে আসা কোনো হুর পরী! অফ হোয়াইট লেগিংসের সাথে সেম কালারের শর্ট কামিজ। রঙ বেরঙের জর্জেট ওড়না বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। ভাসা ভাসা চোখ দুটো হাসছে, হাসছে গোলাপী রঙের ছোঁয়া পাওয়া অধরজোড়াও। তাঁর হাসিতে জারিফ মোল্লার মন-ই-মন ফাগুনের দোলা লাগে। প্রথমবার মেয়েটাকে হাসতে দেখলো সে। তুড়ি বাজানোর শব্দে জারিফের সয়ংবিৎ ফিরলো। নিজ অপ্রস্তুত ভাব গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে বলল,

“ভা*তার ম*রছে তোর? সাদা ছাড়া আর রঙ চোখে পড়ে না?”

পত্রলেখা মুচকি হেসে মাথা দোলালো।জারিফ এবার বাঁকা চোখে তাকালো। পত্রলেখার হাতে কফির মগ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি তো কফি চাই নি! আচ্ছা এনেছিস যখন দে!”

পত্রলেখা কফি দেয়। তাঁর মুখজুড়ে ঝলমলে হাসি। জারিফ কফির মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে তাঁকেই লক্ষ্য করে যায়। হাবভাব তো সুবিধার না! পাখি আজ স্বেচ্ছায় তাঁর আঙিনায়? আবার হাসছেও! মেয়ে মানুষের হাসি তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিন্তু পত্রলেখার হাসি তেমনটা করছে না। মেয়েটা কি জাদুটোনা জানে? সে হঠাৎ কি মনে করেন বলল,

“আমার মেয়ে মানুষ পছন্দ না, কিন্তু তোকে কেন জানি ভালো লেগে গেছে। তুই কথা বলতে পারিস না, এজন্য একটু বেশিই ভালো লেগেছে। তোর মা তো রাজি না। অবশ্য তাঁর মতামতের ধার এই জারিফ মোল্লা ধারে না। তোকে ভালো লেগেছে মানে তুই এই মোল্লার। আমার অনুগত হয়ে থাকবি রানীর মতো রাখবো। সব সুখ পায়ের তলায় ফেলে দিবো। আর ঘারত্যাড়ামি করবি তো জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিবো। যাহ ঘরে যাহ্!

পত্রলেখা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে , যায় না। জারিফ কাস্তে হাতে সন্দিহান সুরে বলে, “তোর হাবভাব ভালো ঠেকছে না বোবা সুন্দরী! কি চাই?”

পত্রলেখা শুভ্র গোলাপের দিকে ইশারা করে, তাঁর গোলাপ চাই। জারিফ কপালে বিরক্তের রেখা। এই মেয়ের সব সাদা চাই। সে সাদা গোলাপের পরিবর্তে লাল গোলাপের ডাল কেটে কাঁটা ছাঁটাই করে পত্রলেখাকে দিলো। পত্রলেখার মুখের হাসি ঘুচে গেলো। লাল গোলাপ ছিঁড়ে ফেলে আবারও শুভ্র গোলাপের দিকে ইশারা করে। জারিফ মোল্লা মেজাজ চটে যায়। কাঁচি পত্রলেখার দিকে তাক করে ধমকে বলে,

“আমার সাথে বিটলামি করিস? আমি যেটা দিবো সেটাই তোকে নিতে হবে। এখন থেকে তোর লাইফ বাট রুলস আমার, বুঝতে পেরেছিস?’

পত্রলেখা নিজেই বাগানের ভেতরে চলে আসে। মোল্লার হাত থেকে কাস্তে ছিনিয়ে গোটা তিনেক শুভ্র গোলাপ কেটে নেয়। তারপর গোলাপ তিনটে একসাথে করে খোঁপায় গুঁজে নিয়ে ভুবন ভোলানো হাসি দেয়। কিছু মনে পড়ায় কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজকৃত কাগজ বের করে মোল্লার হাতে দেয়। জারিফ যারপরনাই অবাক হয়। 

“লাভ লেটার?”

বলতে না বলতেই কাগজের উপরের লেখা চোখে পড়ে। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘হুমকি পত্র’! জারিফ কপালে ভাঁজ ফুটিয়ে ভাঁজ কৃত কাগজ খুলে দেখে। মহারানী পত্র বিশাল বড় পত্র লিখেছে! 

অ-শ্রদ্ধেয় মেন্টাল মোল্লা,
চোখ বড় -------------

সম্বোধনে চোখের আকার বড় হয় জারিফের। আগুন ঝরা দৃষ্টি ফেলে পত্রলেখার উপর। পত্রলেখা মিষ্টি করে একটা হাসি উপহার দিয়ে পড়তে ইশারা করে। জারিফ দাঁত কিড়মিড় করে পড়া শুরু করে,

অ-শ্রদ্ধেয় মেন্টাল মোল্লা,
চোখ বড় বড় করার কিছুই নেই। নামটা আপনার সাথে মানানসই। চিঠিখানা চোখ খুলে পড়ুন, পড়ে ঘিলুতে তুলে রাখুন। লজ্জা করে না? ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে হলেও আমি আপনার ভাতিজি লাগি। তাঁকে আপনি খারাপ নজরে দেখেন? আপনার চোখে আমি মরিচ ডলে দিবো। আমাকে অসহায় ভেবে ভুল করবেন না। আরেকটা কথা শুনুন। আমার মন–বাড়ির একজন মানুষ আছে। He's everything to me. নসীবে থাকলে আমি একদিন তাঁর বউ হবো।

 আপনার জন্য যদি আমাকে, আমার মাকে কোনো প্রকার প্রবলেমে পড়তে হয়, আল্লাহ পাকের কসম বিষ খাইয়ে মারবো আপনাকে। তারপর জেলের ঘানি টানবো। 

ইতি 
পত্রলেখা মুবিন পাঠান

পুনশ্চ: চিঠিখানা পড়ার সাথে সাথে ছিঁড়ে ফেলার অনুরোধ। কফিতে তেলাপোকা মারার বিষ ছিলো। আপনি মরলে এই চিঠি আমাকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। যদিও না মরার চান্স বেশি। আর মরলে তো আলহামদুলিল্লাহ! 

জারিফ মোল্লা তড়িৎ গতিতে নজর তুলে। সামনে পত্রলেখা নেই! কোথায় গেলো? ইতি উতি তাকাতেই রাস্তায় চোখ পড়ে। টুটুলের বাইকে বসে পত্রলেখা। শা শা গতিতে বাইকটি চোখের আড়াল হয়। জারিফ মোল্লা হাতের চিঠি মুচড়ে কঠিন চোখ বানায়। এই ছোকরাই কি পত্রলেখার মনের মানুষ? একান্তে দেখা করতে হচ্ছে যে! তবে এই মুহূর্তে পেট খালি করা আবশ্যক। কি জানি বদ মেয়েটার বিশ্বাস নেই।

—————

“মেন্টাল মোল্লার সাথে বেশ হাসছিলে! কাহিনী কি পত্র? ভালোটালো বেসে ফেলো নি তো আবার?”

পত্রলেখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লো। টুটুল লুকিং গ্লাসে পত্রলেখাকে উদাসীন হতে দেখে প্রশ্ন করলো, “মন খারাপ নাকি?”

পত্রলেখা মাথা দোলালো। মনটা একটু বেশিই খারাপ। মন বলছে মায়ের কাছে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে এসেছে। 

“তোমরা মেয়েরা তো দেখোই গুড লুড। বান্দা গুড লুকিং হলে সাত খুন মাফ। মেন্টাল মোল্লা দেখতে কিন্তু মারাত্মক হ্যান্ডসাম। জানো তুমি? এলাকার সব মেয়েদের ড্রিম বয় ওই মেন্টাল মোল্লা। মোল্লা সাহেব অবশ্য কাউকে পাত্তাই দেয় না। কোনো মেয়ে ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসলেও মেয়ের বাপের কাছে নালিশ করে আসবে, আপনার মেয়ের চরিত্রে ঘাপলা আছে। সময় থাকতে সুধরে নিন। নয়তো আমাকে বলুন চড়িয়ে গাল লাল করে দিবো।”

পত্রলেখা মিষ্টি করে হাসলো। হাসলো টুটুলও, “পুরাই রেড ফ্ল্যাগ। ওর থেকে সাবধান পত্রলেখা।”

বাইক নিয়ে সরকার বাড়ির গেটে ঢুকিয়ে টুটুল ফিসফিসিয়ে বলল, “এই হলো অরুণাভের বাড়ি। শা*লার কি ভাগ্য দেখছো? সাথে ভাগ্য করে একটা বাপ জুটিয়েছে! এমন বাপ আমি আমার বাপের জন্মে দেখিনি। আমি ভেবেছি আঙ্কেলকে ভালো দেখে কোনো মিউজিয়ামে ডোনেট করে দিবো।”

বাইক থেকে নামে পত্রলেখা। বাড়ির আঙিনায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। মনে হলো চারদিকে সবুজের মেলা বসেছে। সে মুগ্ধ হয়ে যায় এই মনোরম পরিবেশ দেখে। কোনো পার্ক অপেক্ষা কম লাগছে না। 

“চলো ভেতরে যাই। ওঁরা হয়তো আমাদের অপেক্ষা করছে।”

টুটুলের কথায় পত্রলেখা নোটবুক কলম বের করে কিছু লিখলো। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে গুঁজে তারপর পুকুর ধারের দিকে চলে গেলো। গাছের সাথে বাঁধানো ঝুলন্ত দোলনায় দোল না খেলে সে মরেই যাবে।

টুটুল অগত্য একাই ভেতরে গেলো। মূল ফটক খোলাই ছিলো। সম্মুখেই বাড়ির ছোট কর্তা পায়চারি করছে। কপালে তাঁর দুনিয়ার চিন্তা ভর জমিয়েছে। টুটুল হেসে বলল,

“আরে ওলাফ যে! কি হয়েছে তোমার? মুখটা পেঁচার মতো বানিয়েছো কেন?”

প্রহর পায়চারি থামিয়ে দেয়। দুঃখি দুঃখি মুখ বানিয়ে বলে, “পাপা, আমাকে বোকা বানিয়ে আম্মুকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছে। এখনো আসছে না। এখন আমাকে কে রেডি করে দিবে?”

“এটা তো ভারী অন্যায় হয়েছে তোমার সাথে।”

“হয় নি বলো?”

“আলবাৎ হয়েছে।”

“আলবাত কি টুটুল ভাইয়া?”

টুটুল হাসে। শুরু হয়ে গেলো জনাবের! এখন কি বলবে? এই ছেলের সাথে কথা বলেও শান্তি নেই। সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “ওলাফ তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে!”

“ওয়াও, আই লাভ সারপ্রাইজ!”

প্রহর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। টুটুলের বাহু ঝাঁকিয়ে বলে, “বলো না কি সারপ্রাইজ?”

“লাল টুকটুক বউ!”

প্রহরের গোলগোল চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। মুখে হাসিরা দোলা খাচ্ছে। সে চোখ বড় বড় করে বিড়বিড় করে, “ওয়াও, লাল টুকটুক বউ।”

“তোমার চাই?”

“চাই তো! কোথায় আমার বউ?”

টুটুল হেসে প্রহরের গাল জোড়া টেনে টেনে বলল, “বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, খুঁজে নাও তোমার লাল টুকটুকে বউকে!”

প্রহর এক মিনিটও দেরি করে না। নাচতে নাচতে বুকে খুঁজতে চলে আসে বাড়ির বাইরে। কিন্তু একি? কোথায় তাঁর লাল টুকটুকে বউ? দূরদূরান্ত অবদি কোনো মানুষই চোখে পড়ছে না। আব্বুর মতো টুটুল ভাইয়াও কি তাকে বোকা বানালো? প্রহরের মুখটা কালো হয়ে আসে। চোখ জমে নোনাজল। দুই হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে সে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। হঠাৎই মন বলল, পুকুর ঘাটের দোলনায় কেউ আছে। প্রহর চোখ ডলা বন্ধ করে সেদিকে এগিয়ে যায়। একটু পরেই কালো মেঘ জমা মুখজুড়ে রৌদ্দুরেরা হাতছানি দেয়। মিটিমিটি হেসে বলল,

“ওহ্ হো হোও! আমি তো ভাগটুসের আগেই বউ পেয়ে গেলাম। আল্লাহ তুমি আমাকে কত্ত ভালোবাসো! আমিও তোমাকে ভালোবাসি। এখন তুমি আমার ভাইটুসকেও একটা বউ দিয়ে দাও কেমন? নইলে আমার বউ দেখে ভাইটুসের কষ্ট হবে। আমি চাই না ভাইটুস কষ্ট হোক। প্লিজ আল্লাহ প্লিজ?”

পত্রলেখা দোলনায় হারিয়ে গেছে। পুকুরের টলমলে পানিতে প্রতিবার যখন তাঁর প্রতিচ্ছবি দেখছে মনকা নেচেকুদে উঠছে। খালি পায়ে মাটিতে চাপ প্রয়োগ করে পত্রলেখার দোল খাওয়ার গতি বাড়ায়। ইশ্ কেউ যদি ধাক্কা দিয়ে সাহায্য করতো?
 
“হ্যালো, বউ!”

পত্রলেখা সচকিত ভঙ্গিতে পাশে তাকায়। দোলনার রশি নড়ে এলোমেলো দুলতে থাকে। ফলাফল স্বরূপ গাছের সাথে বারি খায়। ব্যথায় অদ্ভুত গোঁ গোঁ শব্দে গুঙিয়ে ওঠে। 

প্রহর মুখে হাত চাপা দিয়ে বড় বড় করে তাকালো। দোলনা থামতেই সে ছুটে যায় পত্রলেখার কাছে। বাহু ধরে কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “তোমার লেগেছে, বউ?”

পত্রলেখা মাথা দোলাতেই নিয়েছিল, কিন্তু বউ সম্বোধনে টাশকি খেয়ে যায়। প্রহরের পেটে আঙুলের খোঁচা মেরে হাতের মুঠি চক্রাকারে ঘুরিয়ে বোঝায় ‘তুমি কে?’ প্রহর চোখ পিটপিট করে চাইলো। তারপর লাজুক হেসে চট করে পত্রলেখার ঠোঁটে চুমু খেয়ে দুহাতে মুখ লুকিয়ে বলল,

“তুমি আমার লাল টুকটুকে বউ, আর আমি তোমার বর।”

পত্রলেখা দোলনা উল্টে মুখ থুবড়ে পড়েছে এবার। ব্যথা পেলেও তা অনুভব করতে পারলো না। সে আপাদত কোমায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি বিচ্ছু ছেলে! চেনা নেই জানা নেই বউ বলছে, আবার চুমু খাচ্ছে। তাও ডিরেক্ট ঠোঁটে! তাঁর স্বামীর হকে ভাগ বসিয়েছে! পত্রলেখা উঠে দাঁড়ালো। গায়ের ময়লা ঝেড়ে চোখে মুখে রাগী রাগী ভাব ফুটিয়ে তুললো, চোখ রাঙিয়ে শাসালো। প্রহর আঙুলের ফাঁকে তাকায়। একটু ঘাবড়ায় বৈ কি। মিনমিনে সুরে বলে, 

“তুমি কি ড্রাকুলা?”

পত্রলেখার চাহনি সুক্ষ্ম হয়। ড্যানিম ডাঙ্গারিস পোশাক পরা প্রহরকে উপরনিচ পর্যবেক্ষণ করে। ভেতরে ফুল হাতার সাদা শার্ট। এলোমেলো চুল কপাল ঢেকে রেখেছে। কে এই বাচ্চাটা?

“বউ?”

প্রহর কয়েকবার মিষ্টি করে ডাকলো। কিন্তু পত্রলেখার তরফ থেকে ভ্রু কুঁচকানো ছাড়া কোনো সাঁড়া না পেয়ে গাল ফুলিয়ে বলে,

আতা গাছে তোতা পাখি 
ডালিম গাছে মৌ!
এতো ডাকি তবু কথা
কও না কেন বউ?

 মিষ্টি মিষ্টি গলায় ছড়া শুনে পত্রলেখা হেসে ফেললো। প্রহর আরও কিছু বলতে নেয় তখনই তাকে ডাকতে ডাকতে উপস্থিত হয় অরুণিতা সরকার। বাবার মতো গম্ভীর সুরে বলে,

“ওলাফ, হোয়াট আর ইয়্যু ডুয়িং হেয়ার? আ’ম লুকিং ফর ইয়্যু। হু ইজ সি?”

অজ্ঞাত রমনীকে দেখে প্রশ্ন করে সে। ওলাফ লাজুক হাসলো, “সি’জ মায় লাল টুকটুক বউ। টুটুল ভাইয়া এনেছে আমার জন্য। মাম্মামের মতো সুন্দর, তাই না বলো?”

অরুণিতা সুক্ষ্ম চোখে একবার পাঁচ বছরের ভাইটির দিকে তাকায়, পরপরই পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে ভদ্রসুলভ কণ্ঠে বলে, “হ্যালো, ডু ইয়্যু নো টুটুল ভাইয়া?”

পত্রলেখা মাথা দোলায়। নাক সিকায় তুলে রাখা গোমড়া মুখো, কিছুটা অরুণ সরকারের মতো দেখতে, স্বাস্থ্যবান মেয়েটিকে পত্রলেখা চিনতে পারে। অরুণাভের ছোট বোনটি। কিন্তু এই বিচ্ছুটা কে? প্রহরের দিকে তাকায় সে।

“হাউ আর ইয়্যু রিলেটেড টু টুটুল ভাইয়া?”

অরুণিতার প্রশ্নে পত্রলেখা ছোট ছোট চোখে চায়। নোট বুক বের করে ইংরেজি অক্ষরে লিখে দেখায়,

“FRIEND”

অরুণিতা ভাবার সময় পায় না, রূপক সরকার এসে হাজির। সে অরুণিতাকে চাঁপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে, “টুটুল ভাইয়ার বন্ধু, পত্রলেখা পাঠান। সি’জ মিউট, কথা বলতে পারে না। সুন্দর না দেখতে? ভাবছি পটিয়ে তোর ভাবী বানাবো।”

অরুণিতার উদ্দেশ্যে কথা ফুরোলে রূপক পত্রলেখার দিকে ফিরে চাঞ্চল্যকর কণ্ঠে বলে, “হ্যালো আপু। কেমন আছেন? আমি রূপক সরকার, গোমড়া মুখের মেয়েটা অরুণিতা আর এই হলো সবচেয়ে ছোট প্রহর।”

পত্রলেখা হাত নাড়িয়ে হাই বোঝায়। রূপক বলে, “বাইরে কেন? বাড়ির ভেতরে চলুন না?”

পত্রলেখা চারপাশে চোখ বুলিয়ে মিষ্টি হেসে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখায়। রূপ, অরুণিতা বুঝতে পারে বাড়ির বাইরের পরিবেশ তাকে বেশি আকর্ষণ করছে। সবাইকেই করে। অরুণিতা খপ করে প্রহরের হাত ধরে বলে, 

“তোমরা কথা বলো, আমি এটাকে ড্রেসআপ করিয়ে আনছি।”

প্রহর যেতে চায় না। পত্রলেখার দিকে কাঁদো কাঁদো চোখে চায়। অরুণিতা একটা ধমক লাগায় , তারপর টেনে হিচরে নিয়ে যায়। পত্রলেখা প্রহরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিলো। প্রহরের কাঁদো কাঁদো চোখ দুটো নিমিষেই বড় বড় হয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে, “ওয়াও, সি’জ সো প্রিটি! লাইক মাম্মাম!”

—————

ডাগআউটে কোচ, স্টাফ আর খেলোয়াড়দের ভিড়ে বসে দুই আঙুলের চাপে বাদামের খোসা ছাড়ায় অরুণাভ। বেশকিছু দানা জমলে দুই হাতের তালুতে ঘঁষে বাদামের গায়ে জড়ানো লালচেকার আবরণ ছাড়ায়। ফুঁ দিয়ে সেগুলো উড়িয়ে মুঠো ভরা বাদাম কোচের হাতে দেয়। কোচ মঈনুল হোসেন বাদাম মুখে নেয়। অরুণাভের ভোঁতা মুখ দেখে ঠোঁট টিপে হাসেন। ছেলেটাকে যেমন ভেবেছিলেন, আদোতে তেমন না। খুব সাধারণ একটা ছেলে। উচ্চবিত্ত পরিবারের হয়েও পোশাক পরিচ্ছদে সাধারণের ছাপ, সাধারণ চলাফেরা, মিশুক স্বভাবটা একটু বেশিই নজরকাড়ে। সবার সাথে সুন্দর করে কথা বলবে, আবার মজাও করবে। অথচ প্রথমে অহংকারী ভেবে অপছন্দের তালিকায় ফেলে দিয়েছিল সে। তবে ছেলেটার মাথায় একটা ছিঁট আছে।

“একজন খেলায়াড়ের জন্য ক্রিকেট শুধু খেলা বা প্যাশন হলে চলবে না। ক্রিকেট হতে হবে ইমোশন, হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা। যখন মাঠে নামবি নিজেকে সঁপে দিবি বাইশ গজের পিচে। তোর আন্ডার নাইন্টিনের সব খেলা আমি দেখেছি।‌ খারাপ খেলিস না। কিন্তু একটু বেশিই কনফিডেন্ট রাখিস, যার জন্য অনেকবার মুখ থুবড়ে পড়েছিস। মনে আছে, এশিয়া কাপের সেমিফাইনালের বোলারের স্লেজিংয়ের শিকার হয়ে মারমুখো ব্যাটিংয়ের জন্য শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফিরেছিলি? অথচ সেদিন উচিত ছিলো ঠান্ডা মাথায় স্ট্রাইক করে যাওয়া। সেখান থেকে শিক্ষা না নিয়ে তুই বারবার একই ভুল করিস অরু। সবসময় মারমুখো ব্যাটিং বা বলিং দলের জন্য ক্ষতি বয়ে আনে। এমনিতে তো কুল থাকিস, কিন্তু যখন কুল থাকার কথা সেখানে রেগে মেগে সব বিগড়ে দিস। ইয়্যু সুড লার্ন হাউ টু কাম!”

“তো শিখিয়ে দিলেই পারেন! চা আন, কফি আন, পানি দে, চিকেন চান্দুরি খাবো, বাদাম ছিলে দে, বাতাস কর, শুয়ের লেস বেঁধে দে, কোনটা বাদ রেখেছেন? পা অবদি টিপিয়েছেন। এখন চুমু খাওয়া বাকি। কোচ আই থিংক ইয়্যু ফরগেট দ্যাট আ’ম নট ইয়্যুর ওয়াইফ! ডোন্ট মাইন্ড, যাস্ট কিডিং!”

অরুণাভ মুখ ফসকে অনেক কিছুই বলে দেয়। সাথে আফসোসও হয়। মঈনুল হোসেন কতক্ষণ ভস্ম করা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অরুণাভ মুখ গোমড়া করে বলল, “স্যরি কোচ!”

মঈনুল হোসেন বাঁকা চোখে পেছনে দর্শক সারিতে বসা এক রমনীর দিকে তাকায়। অরুণাভকে খোঁচা দিয়ে বলে, “চোয়ালে দাঁড়ি উঠে ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারলো না, এরমধ্যে গার্লফ্রেন্ড বানিয়েছিস! ব্রাভো অরু ব্রাভো!”

অরুণাভ নীলাশার দিকে তাকিয়ে বলে, “গার্লফ্রেন্ড না, সে আমার সিনিয়র। টেলিভিশনে ছোটখাটো পর্দায় কাজ করে। সাব্বির ভাইয়ের সুন টু বি গার্লফ্রেন্ড।”

“আমাদের সাব্বির?”

“জি কোচ, ইটস্ সিক্রেট। জানাজানি হলে সাব্বির ভাইয়া আমাকে কিমা বানাবে।”

“তোর নেই গার্লফ্রেন্ড?”

অরুণাভ কোচের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠোট উল্টিয়ে বলে, “না কোচ! আমি এখনো বাচ্চা ছেলে।”

মঈনুল হোসেন মুখ বাঁকালেন। বললেন, “এসেছে কুড়ি বছরের বাপের দুধ খাওয়া বাচ্চা ছেলে! শোন অরু, এসব প্রেম ভালোবাসায় জড়াস না। ভালোবাসা নিছক অভিনয় ছাড়া কিছুই না। সুখের পুকুর দেখিয়ে আগুনের মহাসাগরে ফেলে দিবে। সত্যিকারের ভালবাসা একদিন ঠিকই পূর্ণতা পায়—এটা পুরাই বাজে কথা। ভালোবাসা যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই দিতে জানে না। তুই যত লয়্যাল থাকবি অপরপক্ষ ততই বেঈমান বেরুবে—এটা শতভাগ সঠিক। বিষ মানুষকে সাথে সাথে মেরে ফেললেও ভালোবাসা মানুষকে আস্তে আস্তে মারে। তাই ক্যারিয়ারে ফোকাস কর। শুধু ক্রিকেটকে ভালোবাস। 

অরুণাভের খুব করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ছ্যাঁকা খাইছো নি মাম্মা?’ কিন্তু গুরুজন বলে মুখ টিপে হেসে পেটের কথা পেটেই রেখে দেয়। কোচ মঈনুল হোসেন প্রেম ভালোবাসা নিয়ে বকরবকর করেই যাচ্ছে। অরুণাভ বাদাম ছিলে নিজ মুখে পুরে। কোচের এ প্রসঙ্গ বিরক্ত লাগায় প্রসঙ্গ বদলাতে বলল,

“কোচ, আমাকে কবে মাঠে নামাবেন? ওলরেডি তিনটে ম্যাচ হয়ে গেছে।”

“সময় আসুক। শুনিসনি ওস্তাদের মার শেষ রাতে! ততদিন তুই আমার খেদমত করে যা।”

অরুণাভ মনে মনে কোচের গুষ্টির দফারফা করে প্লাস্টিকের হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ে।মিনিট পাঁচেক পর কেউ কাঁধে হাত রাখে। অরুণাভ পিছু ফিরে দেখে তারই এক টিমমেট চৈতন্য কুমার। সে বলল,

“কিছু বলবে চৈতন্য দা?”

“তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে কেউ!”

অরুণাভ চমকালো না। নিশ্চয়ই আব্বু এসেছে।

“কোথায় আব্বু?” 

চৈতন্য মিটমিট করে হেসে বলল, “আঙ্কেল না, তোমার ভাই বোনেরা এসেছে। ওই তো গ্যালারিতে, East Upper, Block B, R5”

অরুণাভ ঘার ঘুরিয়ে পশ্চিম দিকে ব্লক–বি’র দিকে তাকায়। আরে পুরো পল্টন এসেছে দেখছি। অরুণাভ কোচকে বলে সেদিকে চলে যায়। 

গায়ে লাল জার্সি, মাথায় সাদা ক্যাপ, পায়ে স্পোর্টস শু, মুখে সাদা মাস্ক, চোখে কমলা শেডের রোদ চশমা। প্রহর চিনতে এক সেকেন্ড সময় নেয় না। দুই হাত নাড়িয়ে গলা ফাটিয়ে ডাকে,

“ভা….ইটু….স!”

শান্ত গ্যালারি আকস্মিক তাঁর চিৎকার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। গ্যালারি ভর্তি মানুষের মাঝে চাঁপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সবাই হাসছে, ড্রোন ক্যামেরা তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। জায়ান্ট স্ক্রিনে তাঁর হাসিমাখা মুখ। ম্যাচের হোস্ট তাঁর কথাই বলছে। অরুণাভ হেসে এগিয়ে যায়। ছুটন্ত প্রহরকে বগলদাবা করে শূন্যে দোল দেয়।

“হেয় লিটল বাডি! আই মিসড ইয়্যু সো মাচ। ডিড ইয়্যু মিডড মি?”

প্রহর দুই হাত প্রসারিত করে বলে, “এত্তো এত্তো মিসড ইয়্যু ভাইটুস!”

“সো সুইট ওফ ইয়্যু ওলাফ।”

জায়ান্ট স্ক্রিণে এবার দুই ভাইয়ের ভালোবাসা মাখা মুহূর্ত। অরুণাভ প্রহরকে সেদিকে তাকাতে ইশারা করে। স্ক্রিনে নিজেকে দেখেই লজ্জা পায় প্রহর। দুই হাতে মুখ ঢেকে নেয়। স্ক্রিনে মাঠের দৃশ্য ফিরে এলে অরুণাভ ভাইকে কোলে নিয়ে বাকি সবার সাথে দেখা করে, হাই হ্যালো করে। আনিকা, আনিকার বেস্ট ফ্রেন্ড তুবা, রূপ, ভাবুক চড়ুই, নয়ন, টুটুল আর… অরুণাভ নামটা মনে করতে পারে না। প দিয়ে কিছু ছিলো হয়তো। সে ওতশত না ভেবে আনিকার দিকে ফিরে তাকালো। চোখাচোখি হতেই ঠোঁট চেপে হাসলো ক্ষণ। বাম গালে গর্তের মতো কিছু সৃষ্টি হলো। টোল ছিলো? 

 আনিকার বান্ধবী তুবা কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে দুষ্টু হাসে। আনিকা তুবাকে নীরবে শাসিয়ে অরুণাভের উদ্দেশ্যে বলে,

“তুই খেলছিস না?”

“খেললে মাঠে থাকতাম না?” প্রহরকে নামিয়ে দিয়ে আনিকার প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন করে অরুণাভ।

আনিকা মন খারাপের রেশ ধরে বলল, “তোর খেলা সরাসরি দেখবো বলে এলাম।”

“আমাকে জানিয়ে আসবি না তোরা?”

“সারপ্রাইজ দিবো ভেবেছিলাম।”

“আচ্ছা বাদ দে! আর কেউ আসে নি? বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে একা এসেছিস? আব্বু আসতে দিলো? ড্রাইভ কে করেছে?”

“চাচ্চু , চাচি মনিরও আসার কথা ছিলো। চাচি মনির শরীর খারাপ লাগায় ওনারা আসা ক্যান্সেল করেছে। তাই আমরাই চলে এলাম। ড্রাইভার আঙ্কেল ছিলো সাথে।”

অরুণাভ ঠোঁট চোখা করে ‘ওহ্ আচ্ছা’ বলল। মনটা খচখচ করলো, আম্মুর সত্যিই শরীর খারাপ নাকি তাঁর কাছে না আসার বাহানা! 

“পাবলিকের গালি খেতে না চাইলে বসে পড় সবাই! টিকিট কেটেছিস কি?”

“না গেইটম্যান তো তোর শ্বশুর লাগে তাই ঢুকতে দিলো।”

টুটুল দাঁত কেলিয়ে বলল। অরুণাভ শব্দহীন ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু শব্দ গুচ্ছ উচ্চারণ করলো। টুটুল জিভ কামড়ে হাসে। ধীমান স্বরে পত্রলেখার কানে কানে বলে, “পত্র, তোমার ওকে কোনদিক দিয়ে ইনোসেন্ট লাগে? মিচকে শয়তান একটা।”

টুটুল পত্রলেখাকে বসতে ইশারা করে। পত্রলেখা বসে। তবে তাঁর শান্ত চাহনি অরুণাভ আর আনিকাতে নিবদ্ধ। দু'জনে পাশাপাশি বসে ফিসফিস করে কথা বলছে। দুজনের মুখেই লাজুক হাসি বিদ্যমান। দুজনকে একসাথে বেশ মানায়। 

অরুণাভ কথা বলার ফাঁকে আনিকার হাতটা মুঠোয় ভরে নেয়। আনিকা আঁতকে উঠে হাত ছাড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। চাঁপা স্বরে বলে, “ভোর, হাত ছাড়! কেউ দেখে নিবে!”

“নিলো দেখে, সমস্যা কি?” অরুণাভা আনিকর চাপ প্রয়োগ করে ভাবলেশহীন ভাবে বলে। 

আনিকা লাজুক মুখে আশেপাশে তাকায়।‌কেউ দেখছে না। তবুও ভয় হয় তাঁর। আকুতি ভরা কণ্ঠে বলে, “ছাড় না ভাই?”

অরুণাভ বাঁকা চোখে চেয়ে বলে,‌ “ভাই?”

“হ্যাঁ ভাই! আপাদত তুই আমার ভাই হস। বাকিটা বিয়ের পর দেখা যাবে।”

“আই প্রমিজড মায়সেলফ, বিয়ের পর ভাই ডাকলে তোর এই বিনুনি আমি কেটে দিবো।”

আনিকা বিনুনি সামনে এনে বলে, “বিয়ের পর এই বিনুনি তোর গলার ফাঁস হবে মিলিয়ে নিস। আমার কথা পাই টু পাই মেনে চলতে হবে। কোনো ইতি উতি চলবে না। আমি উঠতে বসলে উঠবি, খেতে বললে খাবি, ঘুমোতে বললে ঘুমাবি!”

“যো হুকুম মেরে জানেমান!”

আনিকা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতেই বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, “আই মিসড ইয়্যু বাডি!”

“মি ঠ্যু!”

“লায়ার, একটিবার যোগাযোগও করিস না।”

“সব জায়গা থেকে আমাকে ব্লক করে রাখা হয়েছে। আমি কি কবুতরের পায়ে চিঠিপত্র পাঠাবো? আশ্চর্য মেয়ে মানুষ তোরা! কিছু হলো না, ব্লক মারা শুরু!”

আনিকা গাল ফুলিয়ে বলে, “ইয়্যু হার্ট মি!”

“ইয়্যু ঠ্যু!”

“আমার হাত ছাড়!”

“পারলে ছাড়িয়ে নি।”

বলেই অরুণাভ আরেকটু শক্ত করে ধরে। আনিকা টলমল চোখে তাকায়। অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলে, “ন্যাকা কোথাকার!”

“তুই আমাকে ন্যাকা বললি?”

“বললাম।”

“তুই একটা ইমোশনাল ফুল, মাথামোটা, বেকুব।”

“থ্যাংক ইয়ু!”

“ভো…র!”

“কালা না আমি। ঠিকঠাক শুনতে পাই। চেঁচাস না।”

“তুই আমাকে বিরক্ত করছিস!”

“করছি।”

“ঝগরা করছিস!”

“হ্যাঁ করছি!”

“উফফ! এতো অসহ্য কেন তুই?”

অরুণাভ আনিকার হাত ছেড়ে বিনুনি টেনে হাসলো। আনিকা ফোঁস ফোঁস করে বলে, “আই হেইট ইয়্যু পঁচা ভোর!”

“আই হেইট ইয়্যু ঠু পঁচা আনিবুড়ি!”

মুখ ভেঙিয়ে বলে অরুণাভ। আনিকা রাগী রাগী ভাব দেখাতে নিয়েও হেসে দেয়। অরুণাভ বিনুনিতে লেগে থাকা নয়নতারা ফুল আনিকার কানে গুঁজে দিয়ে বলল,

“লাল গাউনে সুন্দর লাগছে তোকে!”

আনিকা শাণিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এটা বেবি পিংক, লাল না। কালার ব্লাইন্ড কোথাকার!”

অরুণাভ আনিকার শিফনের ওড়না হাতে নিয়ে ঘুরে ফিরে দেখে। ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, “লালই তো লাগছে। পিংক শুনেছি কিন্তু বেবি পিংক আবার কোন কালার ভাই? থাক বাদ দে। তোকে সব কালারেই পেত.. আই মিন সুন্দর লাগে!”

আনিকা কোণা দৃষ্টিতে ভোল পাল্টে নেয় অরুণাভ। আনিকা অদূরে বসে থাকা রমনীকে দেখিয়ে বলে, “ওইটা এখানে কি করছে?”

অরুণাভ নীলাশা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে, “গিভ হার সাম রেসপেক্ট, সিনিয়র সে।”

“দরদ উথলে উথলে পড়ছে তাই না?”

“পরা অস্বাভাবিক কিছু না!”

অরুণাভের জবাবে আনিকা ছ্যাঁত করে ওঠে। অরুণাভ হেসে বলে, “আরে, সাব্বির ভাইয়ের সুন টু বি গার্লফ্রেন্ড।”

“আর ওই পত্রলেখা পাঠান?”

আনিকা এবার পত্রলেখার দিকে ইশারা করলো। অরুণাভ সেদিকে তাকায়। টুটুল আর ওলাফের মাঝে বসে খেলা দেখছে। হাতে তাঁর পপকর্ণের ঠোঙা!

“টুটুলের গার্লফ্রেন্ড মেবি!”

“মেবি?”

“মেবি ওর মেবি নট। একচুয়ালি আই ডোন্ট নো।”

আনিকা এবার সন্দিহান সুরে বলে, “টুটুল তোর জানে জিগার। আর তুই জানিস না? সত্যি করে বল কাহিনী কি?”

অরুণাভ তপ্ত শ্বাস ফেলে। আনিকা যদি কোনোভাবে জেনে যায় পত্রলেখা ওই মহিলার রিলেটিভ, এ নিয়ে আবার হাঙ্গা বাঁধাবে। কথা শোনাবে নিশ্চিত। তাই সে ভেবেচিন্তে বলল, “আমি তো খেলাধুলায় ব্যস্ত ছিলাম। ওর সাথে সেভাবে কথা হয় নি। যাস্ট ফ্রেন্ড হয় মনে হয়।”

“মেয়েটা খুব সুন্দর দেখতে চাই না!”

“হ্যাঁ খুব সুন্দর!”

অরুণাভ সহজ সরল মনেই বলেছিল। কিন্তু আনিকার চাহনিতে দমে প্রতিরোধ্য কণ্ঠে বলে, “আমি তোর কথায় কথা মিলিয়েছি। উল্টোপাল্টা ভাবলে আমার কিছু করার নাই! তুইই বলেছিলি হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলাতে।

“তুই বলতে পারতি, সুন্দর কিন্তু তোর মতো নয়।”

“আচ্ছা বলছি, পত্রলেখা সুন্দর কিন্তু তোর মতো আগুন সুন্দরী না। ইয়্যু আর দা মোস্ট বিউটিফুল ওমেন ইন দা ওয়ার্ল্ড। হ্যাপি?”

আনিকা মুখ ভাঙায়। কিছু সময় চুপ থেকে বলে, “কেন জানি না, বাট ওর সৌন্দর্য দেখে আমার হিংসা হচ্ছে। প্রচুর!”

অরুণাভ মাথায় চাটা মেরে বলে, “এটাই মেয়েদের সমস্যা। তাঁরা নিজের চেয়ে সুন্দরী মেয়েদের সহ্য করতে পারে না।”

“তারমানে বলতে চাইছিস ওই মেয়ে আমার থেকে বেশি সুন্দরী?” আনিকা ঝগরুটে সুর তুলে।

অরুণাভ কপাল চাপড়ে বলল, “ওরে আল্লাহ, তুমি এদের কোন জমিনের মাটি দিয়ে বানিয়েছো?”

আনিকা মুখ মুচড়ে আবারও পত্রলেখার দিকে তাকায়। অরুণাভকে বলে, “এই মেয়ের সাথে তোর কোনো চক্কর নেই তো?”

“পাগল তুই আনি?”

 অরুণাভ এবার রেগে যায়। তাও যে সে রাগ না। এই ভরসা তাঁর প্রতি? আনি কি করে এমন প্রশ্ন করতে পারে? সে কি অরুণাভকে চিনে না? পত্রলেখার সাথে চক্কর থাকলে সে আনির জন্য গৃহযুদ্ধ শুরু করে দেয়? চাচিমণির হাতে ডাবাং মার্কা চড় খায়? 

“পাগল না তাই বলছি! বাপ দাদাদের মতো তোর মন তো অনেক বড়। বলা যায় না সে মনে আরও রমনীদের আনাগোনা আছে।”

আনিকার কথার জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করে না অরুণাভ। স্বাভাবিক মুখটা গম্ভীর আদলে গড়ে নিয়ে উঠে যায় আসন ছেড়ে। মেয়েটা মায়ের মতোই ঠেস দিয়ে কথা বলতে জানে। সে অরুণিতার পাশের খালী আসনে বসে হাসার চেষ্টা করে বলে,

“ভাবুক চড়ুই?”

“ইয়েস ব্রো?”

“মন খারাপ কেন?”

“সেরকম কিছু না।”

অরুণাভ বোনের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। ধীমান স্বরে প্রশ্ন করে,“আম্মুর কি হয়েছে রে?”

“জানি না, কদিন হলো আপসেট থাকে। কাল রাতে পাপার সাথে মেবি ঝগড়া হয়েছে। রাতে প্রহরকে নিয়ে আমার ঘরে ছিলো।”

“ঝগড়া হয়েছে! কি নিয়ে?”

“আই ডোন্ট নো। আসলে ঝগড়া নাকি সেটাও সিওর হয়ে বলতে পারছি না। দুজন নর্মাল কথাবার্তা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দুজনের মাঝে থমথমে একটা ভাব আছে। বিশেষ করে মাম্মাম।” 

অরুণাভের বুকটায় জ্বালাপোড়া করে। আম্মু কি তার ব্যাপারটা নিয়ে আব্বুর সাথে ঝগড়া করেছে? মনে হচ্ছে তেমন কিছুই! আম্মুর সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp