পবনপত্র - পর্ব ০৩ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          দ্বিতীয়বার কলিংবেলের শব্দ হতেই সৌম্য গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। সুস্মিতা হাসিমুখে ভেতরে ঢুকলো। তার হাতে থাকা শপিং ব্যাগের দিকে তাকিয়ে সৌম্য জিজ্ঞেস করে, “কী কিনেছো?”

“ঈদের দিন দেখিস।”

সুস্মিতার মনটা এখন বেশ ফুরফুরে লাগছে। তার খিদে পেয়েছে। সে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে তার মাকে ডাকলো। রান্নাঘরে কেউ নেই। কাজের বুয়া গতকাল ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে। সুস্মিতা ঠিক করলো, আজকে থেকে আম্মুকে সে বাড়ির কাজে সাহায্য করবে। তার আম্মুটা সারাদিন একা একা কাজ করেন। একটা মানুষের পক্ষে সবদিক সামাল দেওয়া নিঃসন্দেহে ভীষণ কষ্টকর।
সুস্মিতা নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো, দরজার সামনে দাঁড়াতেই সে দৃশ্যটা দেখে। মৌমিতা খাটে বসে আছেন, হাতে ধূসর মলাটের ডায়েরি। মেয়েটা বুঝে উঠলো না, কী প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। সে বিভ্রান্ত হয়ে ঘরে ঢোকে। মায়ের সামনে গিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মৌমিতা মাথা তুলে তার দিকে তাকালেন, যান্ত্রিক স্বরে বলে উঠলেন, “আদিব কে?”

সুস্মিতা উত্তর দিলো না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। সামনে বসে থাকা মানুষটার প্রতি তার কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। ডায়েরিটা যদি তিনি পড়ে থাকেন, তবে এই প্রশ্নের উত্তর তার অজানা থাকার কথা নয়। নামটা যেহেতু জেনেছেন, সবকিছুই পড়ে ফেলেছেন নিশ্চয়ই? এই প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। মৌমিতা কেবল মেয়েকে এতোটুকুই বুঝিয়ে দিলেন যে তার সবচেয়ে গোপন কথাগুলো আর গোপন নেই। তিনি ঘর থেকে চলে যাওয়ার পরেও, সুস্মিতা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো।

খাবারের আয়োজন খুবই সামান্য। মাছ দিয়ে আলু পটলের ঝোল তরকারি আর ছোট মাছ ভর্তা। সৌম্য তার আব্বুর পাশেই খেতে বসেছে। চারজন সাধারণত একসাথেই খেতে বসে। সুস্মিতা আজ অনুপস্থিত। মৌমিতা চেয়ারে বসেননি, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সুজয় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “সুস্মিতা কোথায়? ও খাবে না?”

মৌমিতা কোনো জবাব না দিয়েই মেয়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ঘরটা অন্ধকার। সুস্মিতা বিছানায় শুয়ে আছে দেয়ালের দিকে মুখ করে। বাহির থেকে আসার পর কাপড়ও বদলায়নি। তার বিস্ময় কাটেনি এখনও। সে যখনই স্বাভাবিক হতে চাইলো, তখনই একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে গেলো। তার আম্মু এটা নিয়ে আর একটা কথাও বলেননি।

আম্মুকে সুস্মিতা পুরোপুরি বোঝে না। যখন থেকে সে বুঝতে শিখেছে, মৌমিতাকে কখনোই কাঁদতে দেখেনি। পরিস্থিতি যেমনই হোক, যতো ঝড় ঝাপটাই আসুক, তার মায়ের চোখে এক ফোঁটা পানিও আসেনি কোনোদিন। ছোটবেলায় সে ভাবতো, আম্মু খুবই শক্তিশালী একটা মানুষ। কিন্তু আজকাল সেই মানুষটিকে কেবল একটা অনুভূতিশূন্য পাথরের মূর্তি ছাড়া কিছুই মনে হয় না। মানুষটা যে কী চায়, তার দুর্বলতা কী, কিছুই জানে না সুস্মিতা।
ডায়েরিটা পড়ার পর কেমন লেগেছিলো আম্মুর? যদি মেয়ের প্রতি রাগ করে থাকেন, তাহলে ধমক দিলেন না কেন? যদি সহানুভূতি জন্মে থাকে, মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন না কেন?

“উঠো তো মা, খেতে আসো। খেয়ে ঘুমাও।”

মায়ের নরম কণ্ঠে সুস্মিতা চমকে যায়। চোখ ভিজে ওঠে সহসা। সে বালিশের ভেতর মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকে। মৌমিতা আরেকবার ডাকলেন, “সুস্মিতা? ওঠো।”

মেয়ের ওঠার কোনো লক্ষণ না দেখে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পা ফেলার শব্দে সুস্মিতা বুঝলো, আম্মু চলে গেছেন। তার চোখ বেয়ে গড়গড় করে পানি ঝরতে লাগলো। সে ভেবে রেখেছিলো, মৌমিতা আর একবার ডাকলেই সে উঠে বসবে। তারপর খেতে যাবে। পেটটা একেবারে ফাঁকা হয়ে আছে যেন। চোখ মুছে শুয়ে রইলো মেয়েটা। চোখে ঘুম না থাকলেও সে ভীষণ ক্লান্ত। ঘুমানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তার এখন।

মৌমিতা ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর বিছানার দিকে এগিয়ে এলেন, হাতে খাবারের প্লেট। সুস্মিতার পায়ের কাছে গিয়ে বসলেন তিনি, “ওঠো তো দেখি মা। আজকে আম্মু খাওয়াবে তোমাকে।”

সুস্মিতা উঠলো না। বিকৃত স্বরে বলে উঠলো, “আমাকে 'মা' বলে ডাকবে না!”

মৌমিতা তার মুখের দিকে তাকালেন, মেয়েটা এখনও মুখ ঢেকে কাঁদছে। তিনি নিচুস্বরে বললেন, “পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালিরাই সন্তানকে মা বলে ডাকে। তবে তোমার যদি ভালো না লাগে, আমি আর ওভাবে ডাকবো না।”

কিছুক্ষণ দু'জনই চুপ করে থাকে। মৌমিতা মেয়ের গায়ে হাত রাখলেন, কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “তোমার বয়সটা এরকমই। এই বয়সে সামান্য একটা ব্যাপার অনেক গুরুতর মনে হয়। আবার অনেক বড় বড় ব্যাপার চোখেই পড়ে না। অল্প বয়সের এসব সম্পর্ক এমনিতেও টেকে না। আর, প্রথমবার তো সবাই ভুল করে। একসময় তোমার নিজেরই মনে হবে—”

“আমি ওটার জন্য মন খারাপ করিনি।” সুস্মিতার গলায় অভিমান স্পষ্ট, “তুমি আমার ডায়েরি পড়লে কেন? পড়ার আগে জিজ্ঞেসও করোনি, কিছুই বলোনি।”

মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। মেয়ের ডায়েরি পড়ার জন্য অনুমতি লাগবে কেন? পর মুহূর্তেই উপলব্ধি করলেন, কাজটা আসলেই উচিত হয়নি। কিছু কথা গোপন থাকতে হয়। কিছু ব্যাপার নিয়ে কথা শোনানোর চেয়ে, নিজে থেকে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়া ভালো। মৌমিতা মানলেন, তিনি ভুল করেছেন। তবে সন্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো বাড়াবাড়ি তিনি করতে চাইলেন না। মেয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন, “ওঠো মা, একটু খাও।”

সুস্মিতা উঠে বসলো। তার খিদে সহ্যসীমা অতিক্রম করেছে। তবু অভিমান যায়নি, “এতোগুলো খাবো না।”

মৌমিতা ভাত মাখতে মাখতে বললেন, “তোমার ডায়েরিটা আগে আমার ছিলো। তোমার নানাভাই আমাকে দিয়েছিলেন ওটা—”

“কিন্তু এখন তো ওটা আমার, না? ভেতরের লেখাগুলো তো আমার।”

মৌমিতা এই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না, মেয়ের মুখের কাছে খাবার তুলে বললেন, “তুমি তবু অনেক ভদ্র একটা মেয়ে। আমি কী করেছিলাম জানো? আমার একটা ডায়েরি ছিলো, এরকমই। ওখানে আমি নিজের ব্যক্তিগত অনেককিছুই লিখে রাখতাম।”

সুস্মিতা তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে মুখে খাবার নিয়ে, মনোযোগ দিয়ে নিজের জামার নকশার উপরে আঙুল ঘোরাচ্ছে।

“বিকেল চারটায় একটা টিউশন ক্লাসে যেতাম। তখন আমার বয়স তোমার থেকেও বেশি, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। তবু এমন বোকার মতো একটা কাজ করলাম।
সেদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় ছয়টা বেজে গেলো। ভাবলাম, সবাই বুঝি খুব দুশ্চিন্তা করছে আমায় নিয়ে। এসে দেখি, সেরকম কিছুই না। বাড়িতে আমি আসলে তেমন পাত্তাই পেতাম না।”

সুস্মিতা মুখের সামনে থেকে মায়ের হাত সরিয়ে বললো, “উঁহু, আর খাবো না।”

“আরেকটু খাও। সেহরিতে নাহয় কম খেও।”

মৌমিতা বুঝতে পারলেন, সুস্মিতার ভালোই খিদে পেয়েছে। অযথাই জোর দেখাচ্ছে মেয়েটা।

“এতো দেরি করে ফিরলাম, তবু কেউ চিন্তা করেনি। মনটা একটু খারাপই হলো।
তারপর আরও কী হলো, জানো? ঘরে ঢুকে দেখি, আব্বা আমার ডায়েরিতে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পড়ছেন। আমাকে দেখেই ডায়েরিটা বন্ধ করে টেবিলে রাখলেন। তারপর খুব গম্ভীরভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমার মাথা একেবারে বিগড়ে গেলো। পরেরদিন আমি ডায়েরিটা নিয়েই কলেজে গেলাম। আমাদের কলেজে একটা লাইব্রেরি ছিলো। এক কোণে বড় একটা ডাস্টবিন ছিলো। ওখানে কেবল শুকনো ময়লাগুলো ফেলা হতো। আরকি কাগজ, কলম–এসবই। আমি আমার ডায়েরিটা ঐ ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম।”

“কী!”

সুস্মিতার গলায় খাবার আটকে গেলো। সে টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে, কয়েক ঢোক গিলে আবার মুখ মুছলো, “আর কোনো জায়গা ছিলো না? কেউ যদি চুরি করতো, কী হতো? তাও আবার পার্সোনাল ডায়েরি।”

মৌমিতা খাবার মাখতে মাখতে মুচকি হাসলেন, “আমার মাথা তখন কাজ করেনি। পরে যখন বুঝলাম এতো বড় বোকামি হয়েছে, ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। অনেক খুঁজেও আর পাইনি ডায়েরিটা।”

সুস্মিতা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই সাবধানী মানুষটা যে এমন অবিবেচকের মতো কাজ করতে পারে, এটা সে কল্পনাও করেনি। মৌমিতা আরেক লোকমা খাবার হাতে তুলতেই সে মাথা নেড়ে বললো, “খাবো না আর।”

মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেললেন, “ডায়েরিটা কে নিয়েছিলো জানো?”

“কে নিয়েছিলো?”

“পুরো ভাতটা খাও, তাহলে বলবো।”

উপায়ন্তর না দেখে সুস্মিতা মায়ের এই শিশুতোষ প্রস্তাবে রাজি হয়। ছোটবেলা থেকেই তার গল্প শুনে খাওয়ার অভ্যেস। আজ যেন সেই পুরোনো দিনগুলোরই এক টুকরো জীবন্ত হয়ে ফিরে এলো। একটা বয়সের পর থেকে ঐ রাজা-রানী আর রাক্ষসের গল্প তার ভালো লাগতো না। মৌমিতা তখন বানিয়ে বানিয়ে একই গল্প বারবার শোনাতেন। তিনি বরাবরই ভীষণ সতর্ক। নিজের জীবন নিয়ে কোনো প্রকার গল্প বলতেন না। সুস্মিতা তাই আজ আগ্রহ দমন করলো না আর। এই সুযোগে যদি আম্মুর ভেতরটাতে একটু উঁকি দেয়া যায়!

—————

১৯৯১, নাটোর।

ভাদ্র মাসের কটকটে রোদ। কলেজের মাঠে শিক্ষার্থীদের লম্বা লাইন। ফরম পূরণের কাজ চলছে। প্রতিযোগিতার ফরম পূরণের এই প্রক্রিয়া তিনদিন ধরে চলবে। আজ দ্বিতীয় দিন। দায়িত্বরত শিক্ষক ফারুক আলি সারি সারি শিক্ষার্থীর দিকে তাকালেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ আর ফরম পূরণ করতে গেলে দুপুর গড়িয়ে যাবে। তিনি লাইনের মাঝামাঝি গিয়ে দাঁড়ালেন, উচ্চস্বরে বললেন, “তোমরা কালকে আসো। আজকে হবে না।”

মেয়েদের মধ্যে থেকে বেশিরভাগই ব্যস্ত হয়ে বিদায় নিলো। ছেলেদের লাইনের মাঝামাঝি প্রায় সবাই চলে গেলো। স্যার দেখলেন, পেছনের দিকে দুটো ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জায়গা ফাঁকা হতেই তারা এসে সামনে দাঁড়ায়। ফারুক স্যার কয়েক পা এগিয়ে সামনের ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ফরম তুলেছো?”

ছেলেটা বলে, “তুলতে পারিনি এখনও। সেজন্যই দাঁড়িয়ে আছি।”

“নাম দাওনি?”

“না।”

“তাহলে তো আরও দেরি হবে। তোমরা এক কাজ করো, কালকে এসো। আজকে থাকলে কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।”

“অপেক্ষা করতে পারবো স্যার। আমি হোস্টেলে থাকি, দেরি হলেও সমস্যা নাই।”

ফারুক কপাল কুঁচকে হাতে থাকা খাতাটা মুখের কাছে তুললেন, “নাম বলো।”

“বাদল।”

“পুরো নাম বলো।”

ছেলেটা একটা ছোট শ্বাস ফেলে, তারপর জোর দিয়ে বলে, “শুধু বাদল লেখেন।”

স্যার আর তর্ক করলেন না। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন তিনি। পেছনের জনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমার নাম?”

“রাশেদ ভূঁইয়া।”

স্যার চলে গেলেন। রাশেদ ভীষণ বিরক্ত হলো। সামনে থাকা ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বললো, “কতোক্ষণ ধরে দাঁড়ায় আছি। আরও অনেকক্ষণ দাঁড়ায় থাকা লাগবে। কালকে আসলেই ভালো হতো।”

অন্যজন কোনো কথা বললো না। দ্বিতীয় বর্ষের একটা ছেলে এদিকে আসছে, বাদল সেদিকেই তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা কাছে এসে বাদলের কাঁধে সজোরে চাপড় মেরে বললো, “তোর খালি উল্টাপাল্টা কাজ। কালকে নাম দিলেই হতো। আজকে আমার একটা দরকারি কাজ ছিলো।”

রাশেদ বলে উঠলো, “ক্ষমা করেন আমজাদ ভাই। আমি আর কোনো দরখাস্ত লিখতে পারবো না। বাদল লিখুক এইবার।”

আমজাদ নাক মুখ কুঁচকায়, “বাদলের হাতের লেখা ভালো না।”

বাদল ঘুরে আমজাদের দিকে তাকায়, “নিজের কাজ নিজে করেন। প্রতিদিন এতো ঝামেলা কেমনে করেন আপনি? আবার কে অভিযোগ করলো?”

“ঐ যে সুরাইয়া। আমি নাকি ওকে বিরক্ত করি। সেদিন দেখি উঁচু স্যান্ডেল পরে খটখট করে হেঁটে যাচ্ছে। কী বিশ্রি সাউন্ড হচ্ছে! আমি বললাম, ঐভাবে হাইট্টো না, কুকুরে দাবড়াইবো।”

“হাঁটার স্টাইল দেখে আবার কুকুর দাবড়ায় নাকি?”

“তুই চল তো, আমাকে একটা দরখাস্ত লিখে দে এখন। কুত্তা নিয়ে পরে গবেষণা করিস।”

“আমি লিখবো না কিছু, হাত ব্যথা।”

আমজাদ দুই হাতে ওদের দু'জনের ঘাড় জড়িয়ে বললো, “বিরিয়ানি খাওয়াবো যদি লিখে দেস। এইবারই শেষ, আর লেখা লাগবে না কোনোদিন। কথা দিলাম।”

পুরোনো ভবনটা ফাঁকা। নিচতলার কয়েকটা শ্রেণিকক্ষে তালা ঝুলছে। দোতলায় বিরাট একটা লাইব্রেরি। সেখানে ঢুকতেই বাদল হনহন করে বাকিদের থেকে কয়েক পা এগিয়ে গেলো। একেবারে কিনারার দিকে, জানালার পাশের আসনটা দখল করলো। সে লাইব্রেরিতে তেমন আসে না। আর যখন আসে, এখানেই বসে।

আমজাদ, বাদল আর রাশেদ হলের একই কক্ষে থাকে। ঐ কক্ষে দুইজন পরীক্ষার্থীও ছিলো। এইচএসসির পর থেকে তাদের আসন দুটো ফাঁকা পড়ে আছে। কারণ বাকি তিনজনের সাথে থাকার আগ্রহ নেই কারও। আমজাদের বেশ দুর্নাম আছে এলাকায়। কয়েক মাস আগে তো একটুর জন্য ছাড়পত্র থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার নামে প্রায়ই অভিযোগ আসে। তার জুনিয়র রুমমেটরাও কম যায় না। অল্প সময়েই বাদল সফলভাবে নিজের দুর্নাম রটিয়েছে। তারা খুব শীঘ্রই আমজাদকে ছাড়িয়ে যাবে বলেই আশা করা যাচ্ছে!

ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে আমজাদ বাদলের দিকে তা এগিয়ে দেয়, “আস্তে আস্তে লিখবি। একদম সুন্দর করে—”

“একটা মাত্র কাগজ? খসড়া করা লাগবে।”

আমজাদ তার ব্যাগ থেকে বিভিন্ন আকৃতির কাগজ বের করে দিলো। বাদল বেছে বেছে একটা কাগজ নেয়, তারপর সেখানে দ্রুতগতিতে লিখতে শুরু করে। আমজাদ খুব বিরক্ত হয়ে বলতে থাকে, “আস্তে রে, আস্তে। কাগজ ছিঁড়ে ফেলবি নাকি? ধুরো, তোর লেখা তো বোঝাই যাচ্ছে না!”

বাদল লেখা থামিয়ে আমজাদের দিকে তাকায়, গম্ভীরভাবে বলে, “এটা খসড়া।”

“এতো বিশ্রি খসড়া! রাশেদ তুই নে তো, তুই লিখে দে।”

“আমার লেখা শেষ। দেখেন।” বাদল কাগজটা আমজাদের দিকে এগিয়ে দেয়। সে খসড়াটা হাতে নিয়ে পড়তে থাকে, “সবিনয় নিবেদন, আমি আপনার কলেজের একজন অনিয়মিত ছাত্র। আমি আমার কাজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। ধুর বাল! ক্ষমাপ্রার্থী হবো কেন? তুই লিখবি, যে ঐ মেয়ে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।”

বাদল ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলে, “এই খসড়া বাতিল?”

“হ্যাঁ।”

নাক-মুখ কুঁচকে আমজাদের হাত থেকে বাদল ছোঁ মেরে কাগজটা নেয়, সেটাকে দুমড়ে মুচড়ে ডাস্টবিনে ছোঁড়ে। তারপর আরেকটা কাগজে ক্ষিপ্রগতিতে লিখতে শুরু করে। এই খসড়াও আমজাদের পছন্দ হয় না। বাদল এটাকেও একইভাবে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে। দরখাস্ত লেখা হয় না, তবে কাগজের ব্যাপক অপচয় হয়। এক সময় আমজাদ চেঁচিয়ে ওঠে, “আমার ঐ নোটটা কোথায়?”

রাশেদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে, “কোন নোট?”

“হোস্টেলের যে একটা হিসাব ছিলো? কোন মাসে কতো টাকা লাগলো, সব লেখা ছিলো ওখানে।”

“ওটা তো বাদল একটু আগেই ফেলে দিলো।”

আমজাদ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই হঠাৎ বাদলের শার্টের কলার ধরে তাকে টেনে তুললো, “তোকে কাজ করতে দেওয়াই ভুল হয়েছে। লেখা লাগবে না। তুই নোট খুঁজে দে আমাকে।”

ছেলেটা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শার্ট ঠিক করে। কোনো প্রকার দ্বিরুক্তি না করে ডাস্টবিনের দিকে হেঁটে যায় চুপচাপ।
আমজাদ ভাইয়ের আচরণে যে সে ব্যথিত হয়েছে—এই ব্যাপারটা পুরোপুরি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলো। ভুলটা তো তার নিজেরই ছিলো। সিনিয়র ভাই এসেছে সাহায্য চাইতে। অথচ ব্যাপারটাকে বাদল গুরুত্বই দেয়নি। আমজাদ যে এতোক্ষণ ধরে সহ্য করেছে, সেটাই বড় কথা।

গরমে পুরো শরীর ঘেমে গেছে।
এতো রকমের কাগজের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট কাগজ খুঁজে বের করা কষ্টকর। বাদল তবু একটার পর একটা কাগজ হাতড়ে যাচ্ছে। রাশেদ কাছে এসে বললো, “আমি দেখি, তুই সর।”

বাদল তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। দায়িত্ব যখন তাকে দেওয়া হয়েছে, কাজটা সে করবেই। একা। মাঝখানে কাউকে ঢুকতে দিবে না। সাহায্য করতে দিবে না। রাশেদ তার বন্ধুকে বেশ ভালোভাবে চেনে। এখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।

বাদল একটা কাগজ দেখিয়ে বললো, “এটা নাকি?”

আমজাদের চোখ চকচক করে ওঠে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই।”

বাদল নোটখানি হস্তান্তর করে আবার ডাস্টবিনের দিকে তাকায়। খবরের কাগজে সযত্নে মোড়ানো একটা বই পড়ে আছে সেখানে। সাবধানে বইটা তুললো সে। ভ্রু কুঁচকে পত্রিকার মোড়ক সরালো। বই নয়, একটা ডায়েরি। নীল রঙের মলাটে সেলাইয়ের কারুকাজ। আমজাদ সেটা দেখে বলে ওঠে, “ওমা! কে জানি আবার ডায়েরি ফেলে দিয়েছে কলেজের ডাস্টবিনে।”

রাশেদ আবার এগিয়ে আসে বাদলের দিকে, নিচুস্বরে বলে, “কার না কার জিনিস। ফেলে দে।”

ডায়েরিটা ফেললো না বাদল। উল্টেপাল্টে মনোযোগ দিয়ে দেখলো। তারপর কারও অনুমতি ছাড়াই জিনিসটা ব্যাগে পুরে ফেললো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp