খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ০৯ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          আমি মা হতে চলেছি, সংবাদটা শোনার পর থেকে সাহেবের মুখখানা ছিলো গম্ভীর। ক্লিনিক থেকে বাসা পর্যন্ত তার চোয়াল ছিলো কঠিন। এই কাঠিন্য তার চেহারাতেই সর্বদাই লেগে থেকে তবে সেদিনের কাঠিন্য যেন মাত্রাতিরিক্ত বেশি ছিলো। আমি রিক্সাতে তার পাশেই বসে ছিলাম। আমার হাত তার বড় বড় হাতের ফাঁকেই ছিলো। কিন্তু সাহেব একটা কথাও বলেন নি। শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 

আমার মা হবার খবরে সবথেকে খুশি বোধ হয় আমার শ্বাশুড়ি হয়েছিলেন। আমার উপর জমে থাকা সকল অসন্তোষগুলো ভুলে তিনি আমাকে সাদরে বুকে জড়িয়ে নিলেন। বহুদিন আমার উপর যে চাপা ক্ষোভগুলো ছিলো সেগুলো সেদিন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলো। তিনি শুধু বলছিলেন,
 "অবশেষে আমার বাড়ির বাড়িওয়ালা আসছে।"

মায়ের উৎসাহকে একেবারে পণ্ড করে তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
"এমন আদিখ্যেতা করার কিছু হয় নি।"

সাহেবের কথাটা আমার কানে উত্তপ্ত গলা শলাকার মতো লাগলো। বাসার গমগমে উত্তেজনা কেমন বিয়ে গেলো। মা ধমকের সুরে বললেন,
"এসব কি কথা মুহাইমিন? ঘরে এতো বড় সুখবর আর আদিখ্যেতা করবো না। তুই এখন দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যা। উনাদেরও জানা আমার বাড়িওয়ালা আসছে।"

সাহেবের কপালে তীব্র ভাঁজ, চোয়াল শক্ত। তিনি চ সূচক একখানা শব্দ করে বললেন,
"যন্ত্রণা! যতসব!"

আমার মনটা কেমন বসে গেলো। মস্তিষ্ক জুড়ে একটা কথাই ঘুরপাক খেতে লাগলো সাহেব খুশি নন। আমার সব আনন্দগুলো তেঁতো অনুভূতিতে নিঃশেষ হয়ে লাগলো। বারংবার একটা ভোঁতা ভয় আমাকে কাবু করলো, সাহেব বাচ্চাটি চান নি। 

আমি যখন ঘরে গেলাম তখন দেখলাম সাহেব জানালার কাছে সিগারেট ফুঁকছেন। ধোঁয়ায় ঘর একেবারে ভরে গেছে। আমার নি:শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিলো ওই গন্ধে। আমি প্রথমেই ফ্যান ছাড়লাম। ফ্যানের ক্যাচক্যাচে শব্দে নড়ে উঠলেন তিনি৷ একটু আড়চোখে তাকালেন আমার দিকে। তারপর হাতের সিগারেটটা পিষে ফেলে দিলেন। বিয়ের পর আমি তাকে ঘরে সিগারেট খেতে দেখি নি। সেদিন হঠাৎ করে কেন এমন ব্যতিক্রম আচারণ করছিলেন আমার মাথায় আসছিলো না। সাহেব আমার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই আমি তার শার্টের হাতাখানা টেনে ধরলাম। অবুঝ বাচ্চাদের মত শুধালাম,
 "আপনি খুশি হন নি?"

তিনি আমার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা সেদিন আমার ছিলো না। আজ হলে হয়তো বুঝতাম উনার ভেতর তখন কি চলছিলো! সাহেব আমার হাতটা ছাড়ালেন। গম্ভীর স্বরে আদেশ করলেন,
"বিশ্রাম কর!"

মা হবার খবরটি যখন আমি জানতে পেরেছি তখন আমার নয় সপ্তাহ চলে। আমার সন্তানের হার্টবিট চলে এসেছে। আল্ট্রাসোনোগ্রাম করা হলো পরের দিন। একটা বড় ডাক্তারের কাছে সাহেব আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে অনেক পরীক্ষা দিলেন। পরীক্ষার রিপোর্ট গুলো দেখে তাকে খানিকটা চিন্তিত লাগলো। কপালে ঘন ভাঁজ। মহিলার বয়স পয়তাল্লিশের কাছাকাছি। তিনি তার মোটা চশমাখানা খুলে বললেন,
 "বয়সটা একটু কম। ওজন কম। হিমোগ্লোবিন কম। বাচ্চার গ্রোথ তুলনামূলক কম। আমি শুধু বলবো, এখন তার যত্ন নিতে হবে। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।"

আমি আড়চোখে তাকালাম সাহেবের দিকে। তার মুখোভাব ধরতে পারলাম না। অনুভূতিশূন্য, ভাবলেশহীন চেহারা। মহিলা আমাকে কড়া সুরে আমাকে বললেন,
 "শোনো মেয়ে, তোমাকে সাবধান থাকতে হবে। লাফালাফি করা যাবে না। ছোটাছুটি করা যাবে না। মনে রাখবে তিন মাস পর্যন্ত বাচ্চা নষ্ট হবার চান্স থাকে। আর তোমার যেহেতু অপুষ্ট শরীর তাই তোমার ঝুঁকি বেশি।"

তারপর আমার সাহেবকে কড়া স্বরে বললেন,
 "সে না হয় বাচ্চা, তোমার তো বয়স কম না। কন্ট্রোল নেই নাকি? বাচ্চা আল্লাহর দান আমিও জানি। কিন্তু মায়ের বয়স আর শরীরের দিকেও তো খেয়াল রাখা উচিত ছিলো। জোশ এসেছে তাই বউকে মা বানিয়ে দিলাম এটা তো পুরুষত্ব না। এখন বউকে খাওয়াও, একটু মোটা কর। আর ভারী কাজ করতে দিবে না। আর ওকে দু ব্যাগ রক্ত দিতে হবে। ডোনার রেডি কর।"

সাহেব এই প্রথম শুধু ভ্রু কুচকে চোয়াল শক্ত করে বসে থাকলেন। ডাক্তার ম্যাডামের বকা খেয়েও তিনি রা করলেন না। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আমি তার হাত ধরে বললাম,
 "আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সুস্থ থাকবো!"

সাহেব আমার কথার উত্তর দিলেন না। সারাটা রাস্তা তিনি গম্ভীর হয়ে রইলেন। আমি তার হাতটা ধরে থাকলাম বটে কিন্তু তিনি আমার হাত ধরলেন না। গলির মুখে ঢুকতেই দেখলাম আমাদের বাড়ির সামনে রবি ভাই এবং ওয়ার্ড কমিশনার দাঁড়িয়ে আছেন। সাহেব রিক্সা থেকে নামতেই ওয়ার্ড কমিশনার এগিয়ে এলেন। রবি ভাইয়ের দিকে এক পলক আমি চাইলাম। উনার মুখের মানচিত্র পালটে গেছে। মুখের একপাশ ফুলে গেছে। চোখ খুলতে পারছেন না। কেমন কালচে হয়ে গেছে। ব্যান্ডেজ লাগানো ঠোঁটের কাছে। সাহেব সটান হয়ে দাঁড়ালেন রবি ভাইয়ের সামনে। ভ্রু কুঁচকে ভীষণ রাগী স্বরে ওয়ার্ড কমিশনারকে শুধালেন,
"রাব্বি ভাই, কি চাই? ভরদুপুরে এখন আমার বাসার সামনে কি কাজ?"

ওয়ার্ড কমিশনার রাব্বি আহসান দাপটে মানুষ। রাজনৈতিকভাবে তিনি বেশ ক্ষমতাধর। তার ক্ষমতার জোড় অনেক। সবাই তাকে ভয় পায়। অথচ রাব্বি আহসানের মুখ ছিলো কাচুমাচু। আমি অবাক হলাম তিনি কি সাহেবকে ভয় পাচ্ছেন? সাহেব পকেটে হাত গুঁজে নির্ভীক দাঁড়িয়ে আছেন। রাব্বি আহসান সাহেবের সামনে একটু নরম স্বরে বললেন,
"মুহাইমিন তুমি নাকি রবিকে মেরেছো?"
 "হ্যা, আমি যে ওকে মেরে ফেলি নি। আমার স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে। এখন আপনি বলুন রাব্বি ভাই আমার কি করা উচিত ছিলো? আপনি যদি আমাকে শাসাতে এসে থাকেন তো ভুল করছেন। ভুলে যাবেন না, ওয়ার্ড কমিশনার আপনি কিভাবে হয়েছেন।"

রাব্বি আহসান সাহেবের ঠান্ডা গলায় একটু নড়ে চড়ে উঠলেন। রবি ভাইয়ের গালে ঠাটিয়ে একটা চড় লাগালেন। ঘাড় ধরে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন,
 "ক্ষমা চা! বল মাফ করে দিন আপা!"

রবি ভাই তাই করলেন। তার চোখে মুখে তীব্র ভয়। আমি সাহেবের পেছনে লুকালাম। সাহেব আমার অস্বস্তি টের পেলেন হয়তো। তাই কড়া স্বরে বললেন,
 "এসব ন্যাকামি আমার ভালো লাগে না। শুধু আমার বউয়ের পঞ্চাশ কিলোতেও যেন তোমার এই ছাগল চামচা না থাকে।"

রবি ভাইয়ের মুখ অপমানে লাল হয়ে গিয়েছিলো। সাহেব খুব কড়া স্বরে বললেন,
 "আমার শ্বশুরমশাই খুব ছা-পোষা মানুষ, তাই তোমার এই চ্যালার হুমকিতে ভয় পেয়েছিলো। আমি মুহাইমিন সরকার৷ আমি যে এসব চুনোপুটিকে আমলেও তুলি না একটু বুঝিয়ে দিও। আমার বায়োডাটাটা ওকে পড়িয়ে নিও।"

রাব্বি আহসান প্লাস্টিকের হাসি মুখে ঝোলালেন৷ কড়া চোখে রবি ভাইয়ের দিকে তাকাতেই রবি ভাই মিয়ে গেলো। রাব্বি আহসান হাত কচলে বললেন,
"তুমি রাগ ফেলে দাও। আসলে গাধা তো, বুঝে নি। আমি কথা দিচ্ছি ভাবী কেন, রবি কোনো মেয়েকে আজ থেকে উত্ত্যক্ত করবে না।"
"মনে থাকলে ভালো হয়। নয়তো কৃপা করার জন্য আমি আছি।"

 আমি খুব অবাক হলাম। রাব্বি আহসানের মতো দাপুটে ক্ষমতাধর মানুষ কিনা সাহেবকে ভয় পাচ্ছে। অথচ সাহেব একজন মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী মানুষ। যার প্রতিদিনের রুটিন ঠিক সকাল আটটায় ঘর থেকে বের হওয়া আর আটটায় ঘরে ঢোকা। এই সামান্য মানুষকে কি না ওয়ার্ড কমিশনার সাহেব ভয় পান। এই কৌতূহলটা দমিয়েছে মিষ্টি আপু। তার থেকেই শোনা, ভার্সিটিতে থাকতে সাহেব রাজনীতি করতেন। উঁচু, লম্বা-- বিধায় তার দাপট আলাদা ছিলো। রাগী মানুষ বলে কেউ ঘাটাতো না। মারামারি তিনি বেশ করতেন। সেটাও একটা ভয়ের কারণ। বাবা অসুস্থ হবার পর থেকে তিনি এসব থেকে সরে যান। তবে কাউন্সিলর নির্বাচনে সেবার নাকি বেশ কাজ করেছিলেন। যেকারণে রাব্বি আহসান জয়ী হয়েছে। হয়তো এজন্যই তাকে সমীহ করেন কাউন্সিলর। সাহেবের সম্পর্কে এই নতুন তথ্য পেয়ে অনুভব করলাম, আমার সাহেব যেন তেন মানুষ না। উচ্চপর্যায়ের মানুষ। তাকে আমারও সমীহ করা উচিত। এখন থেকে একটু বেশি বেশি কৃপা করতে হবে। কৃপাধারী হুতুম আমার কাছে হলেও মুহাইমিন সরকারের নামের ভার অনেক। 

—————

ডাক্তারের কথা সাহেব বেশ মনোযোগ দিয়েই পালন করছেন। তিনি বাসার জন্য একটা বান্ধা কাজের মেয়ে ঠিক করলেন। নাম নুড়ির মা। নুড়ির মা বয়স্ক মানুষ। বয়সটা পঞ্চাশোর্ধ্ব। শ্বাশুড়ি মায়ের কাজের মানুষ খুব একটা পছন্দ নয়। একটা ছোটা ছিলো যিনি সকালে এসে একঘন্টা কাজ করে চলে যেতেন। কিন্তু সাহেব হুকুম করলেন, ঘরে এখন থেকে চব্বিশ ঘন্টা কাজ করার মানুষ থাকতে হবে। শ্বাশুড়ি মা তাতে আপত্তি জানালেন,
 "এতোক্ষণ রাখার কি দরকার? বউয়ের তো এখনো পেট ও বের হয় নি।"
 "হয় নি, হবে। বাচ্চার জন্য আদিখ্যেতা দেখাচ্ছিলে সেদিন এখনই সব ফুরিয়ে গেলো? বাচ্চা যদি চাও তবে সে যেন ঠিক মত পৃথিবীতে আসে সেটাও খেয়াল রাখো। আগে জানলে আমি ঝামেলা নিতাম না কাঁধে। কিন্তু এখন ঝামেলা যখন চলে এসেছে একটু কোঅপারেট কর। কৃপা করে আমার ভোগান্তি বাড়িও না। তোমার বাড়িওয়ালার মাকে সুস্থ রাখো। বাড়িওয়ালা সুস্থ থাকবে।"

সাহেবের কথায় মা আর কথা বলার সুযোগ পেলেন না। তবে আমার একটা কথা খুব কানে বাজলো, "ঝামেলা"। আমার বাচ্চা সাহেবের কাছে ঝামেলা? দোষ কি আমার? কৃপা চেয়ে চেয়ে তিনি কি ঝামেলাকে আনেন নি! আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। মা হবার কারণে বা হরমোনের গোলযোগে আমি কেমন অনুভূতিপ্রবণ হয়ে গেলাম। আমার হুটাহাট করে মন খারাপ হয়। কান্না পায়। রাগও উঠে। কিন্তু সেগুলো দেখানোর সুযোগ হয় না। সাহেবের শীতলতা আমাকে পীড়া দেয়। আমি সেই পীড়াটা কাউকে বোঝাতে পারি না। আমি জানি সাহেব আমাদের চারটে প্রাণীকে টানতে টানতে ক্লান্ত। তিনি সেই বিরক্তিটা প্রকাশ না করলেও তার ক্লান্তিটা ঠিক প্রকাশ পেত। কিন্তু তাই বলে নিজের সন্তানের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়াটা কি যৌক্তিক! আমি আমার পেটে দিকে চেয়ে থাকলাম৷ মনে মনে বললাম, 
"তুমি কষ্ট পেও না। তোমার বাবা মুখেই করলা, মনের দিক থেকে রসগোল্লা!"

আমাকে রক্ত দেওয়া হলো পরের সপ্তাহেই। সুঁই ফোঁটানোত সময় চোখমুখ খিঁচে বসে ছিলাম। রক্ত দিয়েছিলেন সাহেবের দুই কলিগ। প্রথম ব্যাগ রক্ত দিতে প্রায় চারঘন্টা লেগেছিলো। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিলোম। খাওয়াও নিষেধ। আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। আমার পাশে কঠিন মুখ বসে ছিলেন সাহেব। আমি তার দিকে চাইতেই তিনি আমার চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দিলেন। কড়া স্বরে বললেন,
 "কৃপা করে ঘুমালে ভালো হয়!"
 "না আমি ঘুমাবো না। আমার ঘুম আসছে না।"

আমি তার হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম। তার দিকে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে রইলাম। তিনি কপাল কুঁচকালেন। কঠিন গলায় ধমক দিয়ে বললেন,
"তাহলে আর কি তাল পারা হোক৷ বলো তো তাল গাছে তুলে দেই। যন্ত্রণা যতসব! আপদ আমার ঘাড়েই উঠে!"

আমি থমথমে চোখে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে অনেকক্ষণ। তারপর চোখ সরিয়ে নিলাম। আমার কান্না পাচ্ছিলো খুব। এতো বিশ্রী মানুষের সাথে কেন আমার বিয়ে হয়েছে সেটাই বারবার মনে হচ্ছিল। 

নুড়ির মা মহা আকাম করেছিলো। মহিলা মিঠা মিঠা কথায় চুরি করে আমাদের ঘর সাফ করে দিয়েছিলো। টের পেয়েছি, যখন মিষ্টি আপুর বিয়ের জন্য বানানো গহনা হারালো। মহিলা এর পর থেকে গায়েব। আমার শ্বাশুড়ির রাগ দেখে কে! এই প্রথম তিনি সঠিক ছিলেন আর সাহেব ভুল। তিনি সাহেবকে বেশ কথা শুনালেন,
 "বলেছিলাম, যারে তারে ঘরে ঢুকাস না। বউ প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছিস। বাচ্চা কি ওর একার হইছে? ওর বয়সে আমারও বাচ্চা হইছে। আমিও একটা বারোজনের সংসার টানছি। ন্যাকামির জায়গা থাকে না।"
 "শোনো মা, একটা কাজের মানুষ গেছে আমি আরেকটা রাখবো। এখানে এতো চিল্লাপাল্লার কিছু হয় নাই!"
 "আমি চিল্লাপাল্লা করছি!"
 "হ্যা করছো! বাচ্চাটা আমিও চাই নি। অহেতুক একটা ঝামেলা কাঁধে এসে পড়েছে। এমনেই একটা গ্যাদা বউ! নিজেকেই সামলাতে হিমসিম খায়। তার উপর অপুষ্ট। দু ব্যাগ রক্ত পর্যন্ত দিতে হয়েছে। ভুলটা আমার। আমার সতর্ক হতে হতো। গবেট তো আমি! নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল দিয়েছি। এমন সময়ে জেনেছি সে এবোরশন করানোর উপায় নেই। নয়তো আমি এই বাচ্চা নিতাম না। ওই গ্যাদা এই নয়মাস আসলেই পার করতে পারবে কি না সন্দেহ। এখনো চলাফেরায় কোনো ভারিক্কি নেই। লাফায়ে লাফায়ে সিড়ি থেকে নামে। আমি তো সারাক্ষণ সামনে পটের বিবি হয়ে থাকতে পারবো না। তাই আমি চাই না কোনো প্রকার রিস্ক হোক। সুতরাং আমি আবার কাজের মানুষ রাখবো। সবাই এক সমান না। তুমি পেরেছো বলে আমার গ্যাদাটাও পারবে সেটা ভাবাই বোকামি। তাই আমার উপর চলতে যেও না।"
 
মা একদম থমকে গেলেন। সেই সাথে আমিও। আমার মনটা বিষিয়ে গেলো সাহেবের রুক্ষ কথাগুলোয়। অব্যক্ত অভিমান জমলো বুকে। সেই সাথে ক্ষীণ রাগ। সেদিন সাহেব অফিসে যেতেই আমি ঘর ছাড়লাম। মাকে বললাম,
 "একটু মার ওখানে ঘুরে আসি।"
 "মুহাইমিন জানলে ঘর মাথায় করবে। ওর রাগ তো জানো!"
"আপনি আমার উপর দোষ দিয়ে দিয়েন। বলবেন অবাধ্য গ্যাদা কোনো কথা শুনে নি!"

—————

বাবার বাড়িতে যেতেই মা-বাবার যত্নের কোনো কমতি রইলো না। আমার মন দ্রবীভূত হলো। জমায়িত চাপা কষ্টগুলো চোখের জলের মতো বের হলো। আমি মাকে জড়িয়ে ঠিক কতটা সময় কাঁদলাম আমার স্মরণ নেই। মা আমার শুকনো মুখ দেখে বললেন,
 "তুই অনেক শুকিয়ে গেছোস? জামাই তোর যত্ন নেয় না?"

আমি ঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। যত্ন সে ঠিক নেই, কিন্তু আদর করেন না। ওই যত্নটা বড্ড রুক্ষ্ণ, প্রাণহীন লাগে। মায়ের যত্নে সেই দিনটা আমার খুব ভালো গিয়েছিলো। আমি শুকিয়ে গেছি বলে মা ঘন্টা দুই পর পর আমাকে খাওয়াতে লাগলেন। আমার অরুচিভাব হতো, বমি বমি লাগতো। খেতে পারতাম না। আমার অরুচি দেখে মা সব আমার প্রিয় খাবার রাঁধলেন। তারমধ্যে কিছু খুব একটা খেতে পারলাম না। এমনকি আমার প্রিয় কুমড়োর বড়িটাও অভক্তি লাগছিলো। বমি আসছিলো শুধু। খেলাম পান্তা ভাত আর শুটকি ভর্তা। শুটকি ভর্তা খেতেই যা একটু স্বাদ লাগছিলো। খাওয়া দাওয়া শেষে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় দিতেই ঘুমিয়ে গেলাম। সেই ঘুম ভাঙ্গলো রাত নয়টায়। তাও মা টেনে তুললেন, চিন্তিত স্বরে জানালেন,
 "জামাই এসেছে!"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp