চোখের পাতায় ঘুমের রেশ লেগে ছিলো, আমার মস্তিষ্কও তখন অকেজো। সাহেব আসার খবরটা ঠিক ধারণ করতে পারলাম না। ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে তাকতে মা আমার মাথায় হালকা করে গাট্টা মেরে বললো,
"তোর বর আসছে পাগলী!"
যখন অনুধাবণ করলাম তখন আবার চাঁপা সেই অভিমানের ভোঁতা যন্ত্রণা চড়াও হলো। আমি কঠিনমুখে বসে থাকলাম। আমার হেলদোল না দেখে মা খুব বিরক্ত হলেন। কঠিন স্বরে বললেন,
"উঠ!"
"মাথাটা ঘুরাচ্ছে। তুমি যাও আমি পরে যাব।"
মাথা ঘুরানোর কথা শুনতেই মা খানিকটা ছাড় দিলেন। নরম গলায় বললেন,
"আচ্ছা, তুই বিশ্রাম কর।"
মা চলে গেলেন। আমি বসে থাকলাম আমার ঘরে। আমার দৃঢ় প্রতীজ্ঞা ওই বাড়িতে যাবো না৷ কি দরকার কারো বোঝা হওয়া। মা হবার অনুভূতিটা আমার জীবনের সবথেকে প্রিয় অনুভূতি৷ আগে শুধু শুনতাম, মাতৃত্ব নারীর পূর্ণতা। কথাটা আমি টের পেলাম যখন আমার ভেতর একটি প্রাণ এলো। এই প্রাণের জন্য আমি পৃথিবীর বিরুদ্ধেও যেতে পারি। এমনকি সাহেবেরও। আমার সন্তানকে কেউ তাচ্ছিল্য করবে, অবহেলা করবে সেটা আমি মুখ বুজে সহ্য করবো এমনটা ভাবলে সে ভুল। আমি মন শক্ত করলাম। বারবার নিজেকে শাসালাম,
"সাহেব বললেই ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে যাবি না।"
মিনিট পাচেকের মধ্যেই আমার ঘরে সাহেব ঢুকলেন। বিধ্বস্ত তার অবস্থা। টাই ঢিলে হয়ে গলায় ঝুলছে। চুলগুলো এলোমেলো। পরিপাটি ইস্ত্রী করা শার্টটা কুঁচকে গেছে৷ কপালে ঘাম লেপ্টে আছে। খুব ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মুখ। ঘরে ঢুকেই তিনি তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে চাইলেন। সেই চাহনীতে আমি গা করলাম না। অন্যদিকে মুখ করে বসে রইলাম। তার তীক্ষ্ণ চাহনী আমার গায়ে সুঁচের মতো ফুটছে। তবুও আমি অনড়। তিনি একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। আমার পড়ার টেবিলের চেয়ারটা টেনে বসলেন হাত পা ছেড়ে। মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ শ্বাস ফেললেন। আমি আড়চোখে তাকে দেখছি। ভাবখানা এমন যেন আমাকে না দেখতে পেয়ে তার শ্বাস আটকে গিয়েছিলো। ঢং। সামনে থাকলে সারাটাক্ষণ আপদ, যন্ত্রণা, বোঝা বলেন আর এখন ঢং করছেন যেন তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। আমার আরোও বেশি রাগ লাগলো। ফলে চোখ সরিয়ে নিলাম। তিনি একটু জিরিয়ে নিলেন যেন। তারপর এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। গম্ভীর স্বরে শুধালেন,
"আমাকে না জানিয়ে একা একা এখানে আসার কারণ কি?"
আমি একবার তার কঠিন মুখের দিকে চাইলাম। তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বললাম,
"আমার ইচ্ছে।"
"ইচ্ছে! এই টিংটিঙ্গে শরীর নিয়ে ফড়িং এর মতো লাফাতে লাফাতে বাপের বাড়ি এসে এখন ইচ্ছে দেখানো হচ্ছে? মানে একটু শান্তি আমাকে দেওয়া যায় না? সবসময় একটা ফাতরামি করতেই হবে!"
"শান্তি-ই তো দিলাম! আর কি চান আপনি?"
"একা একা এখানে এসে আমাকে শান্তি দেওয়া হয়েছে? খুব কৃপা করা হয়েছে! অবাধ্য গ্যাদা একটা! জামা কাপড় গুছিয়ে এবার কৃপা করে আমার সাথে চললে ভালো হয়। শান্তি দিচ্ছে। যন্ত্রণা! যতসব!"
আমি তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালাম। আমার ভেতরটা রাগে, অভিমানে, ভোঁতা যন্ত্রণায় তেঁতো হয়ে উঠলো। সাহেবের এই তিক্ত কথাগুলো নেবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললাম। হরমোনের গলযোগ বা আমার জমে থাকা ক্ষোভ কিছু একটা হয়তো মাত্রা ছাড়ালো। চিৎকার করে উঠলাম মুহূর্তেই,
"যন্ত্রণা যখন কে বলেছে আমাকে নিতে আসতে? আমি বলেছি? আমি তো আপনার ঘাড়ে চেপে বসেছি। এখন আমার বাচ্চাও। তা বাপু এতো যন্ত্রণা আপনাকে আর নিতে হবে না। আমি আপনার সাথে ফিরছি না। আমি কোনো সংসার করবো না আপনার সাথে। আমার বাচ্চা তো আপনার জন্য একটা আপদ, ঝামেলা, বোঝা। নিতে হবে না ওর দায়িত্ব। আমি-ই পালবো আমার বাচ্চা। তাও একা। আপনি এখনই চলে যাবেন! এখন-ই"
আমার চোখে দাও দাও করে জ্বলছিলো ক্ষোভের আগুণ। আমার এমন রুদ্রমূর্তি রুপে সাহেব যেন একটু হলেও চমকালেন। তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিলো। কিন্তু তিনি তার মুখে প্রকাশ করলেন না। জলদগম্ভীর কণ্ঠে শুধালেন,
"যাওয়া হবে না?"
"না!"
"কেন?"
"যে আমার সন্তানকে মূল্য দেয় না সেই মানুষের কাছে আমি থাকবো না। আপনি চামার একটা।"
"আমি চামার?"
"হ্যা, চামারের থেকেও অধম। ছোটলোকেরাও তার বাচ্চাদের জন্য প্রাণ দিয়ে দেয়। আর আপনি আমার সাথে যে ব্যবহার করেছেন, অসম্ভব আপনার সাথে থাকা। বলি বাচ্চাটা কি আমি অন্যের সাথে শুয়ে এনেছি? এটা তো আপনার ই বাচ্চা। একটুখানি মায়া হয় না আপনার? পাষন্ড কোথাকার। অনুভূতিশূণ্য চামার আপনি।"
আমি জ্বলজ্বলে চোখে তার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললাম। রাগে আমার গা কাঁপছে। চোখে জমেছে অশ্রু। কণ্ঠ কাঁপছে, রাগে নয়। অভিমানের সেই ভোঁতা যন্ত্রণায়। সাহেবের কপালের শিরা দপদপ করছে। তিনি আমার বলা কথাগুলোয় শুধু আঘাত ই পান নি, প্রচন্ড রেগেও গেছেন। কিন্তু সেই রাগটা তিনি প্রকাশ করলেন না। বরং মেঘের মতো ভারী কণ্ঠে বললেন,
"যে আসে নি তার প্রতি আমার কোনো মায়া নেই, বরং যে আছে তার চিন্তায় আমি আধামরা হয়ে যাচ্ছি। যাকে এখনো দেখি-ই নি তার জন্য যে আমার সামনে ফড়িং এর মতো লাফায়ে বেড়ায় তাকে তো হারাতে পারবো না। এই মেয়ে বয়স কত তোমার? গ্যাদা একটা! মা হওয়া কি বুঝো তুমি? এই নয়মাসে যেকোনো কিছু হতে পারে। শুধু নয়মাসে না, ডেলিভারির সময় হতে পারে৷ ডেলিভারির পর হতে পারে। শরীরে নেই রক্ত, খাওয়া দাওয়া করতে পারে না। কিছু খেলে বমি করে, আসছে মা হতে৷ সকালে ক্লান্ত মুখটা দেখলে আমার বুকে ব্যথা হয়। অপরাধী মনে হয়। এই আমার পেয়ারার কিছু হয়ে গেলে আমি কি করবো? কোথায় পাবো তাকে? এটা কি সত্যিকারের পেয়ারা যে গেলাম আর কিনে আনলাম। এটা আমার নিজস্ব পেয়ারা। কোনো ধারণা আছে প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত আমার কেমন কাটে। রাস্তায় যখন ভিড়মি খেয়ে উল্টে যেতে দেখলাম আমার মনে হলো আমার দুনিয়া উলটে গেছে। ছাগল কোথাকার! দিনরাত একটু ঠুন্না মারতে পারতাম। তাও তো পারি না। যন্ত্রণা! যতসব!"
আমার রাগ পড়লো না তার কথায়। উলটো রেগে বললাম,
"আমি যদি এতোই গ্যাদা হই তাহলে কৃপা কৃপা করে আমার কাছে আসা হত কেন? মনে ছিলো না এর ফলাফল একটা জীবন হতে পারে? বুইড়া চামার একটা। রাতের বেলা হলে তো হুশ থাকতো না যন্ত্রণা, যতসব।"
"তখন কি জানতাম যে গ্যাদার গর্ভ এতো দূর্বল। গ্যাদা এতো দূর্বল। একেবারের মতো হারানোর অবস্থা হবে আমার। জানলে ত্রিসীমানাতেও আসতাম না।"
"জানলে কি আমাকে মিটসেফে সাজিয়ে রাখতেন?"
তিনি ঝুঁকে এলেন। আমার মুখখানা নিজের হাতে নিয়ে ঠোঁট ছুঁলেন আমার অশ্রুসিক্ত চোখে। সএই স্পর্শে আমি কেঁপে উঠলাম। তিনি আমার চোখে চোখ রেখে নরম সুরে বললেন,
"হ্যা, তাই করতাম। পারলে আমার পেয়ারাকে আমি মিটসেফে তুলে রাখতাম।"
আমি তার দিকে টলমলে চোখে তাকিয়ে আছি। তার কঠিন মুখখানা আর কঠিন লাগলো না। তিনি অগণিত চুমু খেলেন আমার মুখে। তার বেপরোয়া, উষ্ণ ছোঁয়াগুলো আমার জমে থাকা অভিমান, রাগগুলোকে একটু একটু করে গলিয়ে দিলো। চোখে জমলো অবাধ অশ্রু। আমি ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে লাগলাম। আগুনের তাপে যেমন মোম গলে যায় আমিও সাহেবের আলিঙ্গনে নির্লজ্জের মতো গলে গেলাম। সাহেব আমার মুখখানা আজলায় ভরে সেই প্রথমবার নরম গলায় নিজের কথা বললেন,
"আমার অনুভূতিগুলো জড়ো। আলগা দরদ আসে না। আমার চিন্তা-চেতনাগুলো শুধু আমার সামনে থাকা মানুষদের ঘিরে। যাদের প্রতিনিয়ত চোখের সামনে দেখি আমি শুধু তাদেরকেই চাই। তাই আমার কাছে বাচ্চা থেকে আমার গ্যাদা পেয়ারাটা বেশি জরুরি। বোঝা গেছে কথাটা?"
আমি কাঁদতে কাঁদতে দলা পাকানো স্বরে বললাম,
"আমি যখন বেশি জরুরি তাহলে আমার সাথে এমন আচরণ করেন কেন? জানেন শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মানসিক যন্ত্রণা বেশি ভোগায়? আমার শরীর খারাপের জন্য আপনিও দায়ী। আপনি আমাকে প্রচুর মানসিক কষ্ট দেন। আপনি আমাকে ভালবাসেন না। আমি সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু আপনি যখন আমার বাচ্চাকে যন্ত্রণা, বোঝা, ঝামেলা, আপদ বলেন আমার বুকে হাহাকার হয়। আপনাকে তখন বিষ লাগে। আমি মোটেই সহ্য করবো না কেউ আমার বাচ্চাকে অবহেলা করলে। এটা কি রাস্তার বাচ্চা? ও আমার বাচ্চা! মুহাইমিন সরকারের বাচ্চা। আমি যাব না আপনার সাথে। করব না আপনার ঘর। আমি যদি মরে যাই আপনি তো আমার বাচ্চাকে রাস্তায় ফেলে দেবেন।"
তিনি আমার অভিযোগগুলো খুব শান্তভাবে শুনলেন। রাগ দেখালেন না। সেই প্রথম তিনি এতোটা শান্ত ছিলেন। আমাদের এগারোমাসের সাংসারিক জীবনে সেই প্রথম তিনি আমাকে তার সামনে মেলতে দিলেন। আমার কথা শেষে তিনি আমার চোখ মুছে দিতে দিতে বললেন,
"তাহলে মরো না। সুস্থ থাকো। আমার কাছে থাকো।"
"কেন থাকবো? ওই বিশ্রী কথাগুলো শোনার জন্য?"
"আচ্ছা আর বলবো না। অভ্যাস হয়ে গেছে। মুখ থেকে বেরিয়ে যায়।"
"আর কখনো বলবেন না যে আপনি আমার বাচ্চাকে চান না! সময় থাকলে এবোরশন করাতেন! এসব কথা আমার পীড়া দেয়। ইচ্ছে করে আপনাকে খুন করে ফেলতে। পাষন্ড।"
সাহেব ফোঁশ করে একটা নিশ্বাস ছাড়লেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন,
"আচ্ছা, আর বলবো না। এবার কৃপা করে যাওয়া যাক?"
"না!"
"কেন?"
"আমার মায়ের বাসায় ভালো লাগছে। আমি আজ যাব না। আপনার উপর আমার রাগ পড়ে নি। আমার ওই বাড়িতে এখন যেতে ভালো লাগছে না। আমার শরীরের সাথে সাথে আমার মনটার যত্ন নিন। আমি সুস্থ থাকবো!"
সাহেবের নরম সত্তা উবে গিয়ে তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন। মনে মনে হয়তো আমাকে অনেক কথা শুনাতে চাইলেন কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে তা গিলে নিলেন। শুধু বিড়বিড় করলেন,
"একটু আহ্লাদ দিলেই মাথায় উঠে নেত্য করা শুরু হয়েছে। যন্ত্রণা, যতসব!"
আমি তার দিকে চোখ বড় বড় করে বললাম,
"আবার!"
আমার শাসানো দেখে সাহেব হতভম্ব হলেন। মুহাইমিন সরকারের থেকে চৌদ্দ বছরের ছোট গ্যাদা কি না তাকে শাসাচ্ছে। আমিও সেই সুযোগ ছাড়লাম না। তাকে বাগে পাওয়া তো চারটে খানি কথা না। তিনি চোখ ছোট ছোট করে ধাঁরালো চোখে তাকিয়ে রইলেন। আমি সেই দৃষ্টিকে মোটেই পাত্তা দিলাম না। এটুকু তো জানি, কোথাও না কোথাও পরিবারের সবার মতো আমি সাহেবের চরম দূর্বলতা।
সাহেব বাধ্য হলেন সেদিন আমাদের বাড়ি থাকতে। রাতে আমি শুটকি ভর্তা দিয়ে দু তিন লোকমাই খেতে পারলাম। বেশি খেলেই গা গুলায়৷ সাহেব সেটা আড়চোখে দেখলেন। যেহেতু কথা দিয়েছেন তাই কিছু বলতে পারলেন না। রাতে ঘুমাতে খুব যন্ত্রণা হলো। এপাশ ওপাশ করেও আমার ঘুম এলো না। সাহেব আমার চোখের উপর হাত রেখে ঢেকে দিলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,
"ঘুমাও।"
"ঘুম আসছে না। দুপুরে অনেক ঘুমিয়েছি।"
"তাহলে চোর পাহারা দাও!"
"আপনি এমন কেন? চামার! একটু ভালোবাসার কথা বলতে পারেন না?"
"নকটামি আমার ভালো লাগে না।"
"কি ভালো লাগে শুনি?"
"বলা যাবে না।"
"কেন?"
"গ্যাদাদের এতো জানতে নেই।"
"মা হতে যাচ্ছি আমি!"
সাহেব মৃদু হাসলেন। অতঃপর আমার গালে একটা কামড় দিয়ে বললেন,
"মা হলেই কেউ বড় হয় না। গতরে আর বয়সে হতে হয়। পেয়ারার মাথা ভর্তি শুধু পোঁকাই। বাড়ি গেলে পরিষ্কার করে দিব!"
সাহেবের সাথে কথা বলতে বলতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম টের পাই নি। তবে সাহেবের হয়তো ঘুম এলো না। তিনি সারারাত শুধু আমাকেই দেখলেন। নীরব, নিশ্চুপ, শান্ত দৃষ্টিতে।
—————
প্রেগ্ন্যান্সির যাত্রাটা আমার জন্য খুব কঠিন ছিলো। আমার শরীর আমার কল্পনা থেকেও দূর্বল ছিলো। শ্বাসকষ্ট নামক ব্যধি আমাকে কাবু করলো। অথচ এই রোগটি আগে ছিলো না আমার। ঘুমাতে পারতাম না। পেট একটু বাড়ার সাথে সাথে ক্লান্তি বাড়লো, শরীর আরোও দূর্বল হলো। বাচ্চার গ্রোথ ছিলো কম। পেটে ব্যাথা হত। আমি খেতে পারতাম না। আমার অরুচি হত, বমি হত। এমন কি পানি খেলেও বমি করতাম। একটা সময় কলের কাছে বসে থাকতাম ক্লান্ত শরীর নিয়ে। সেটাকে টেনে তোলার ক্ষমতাও ছিলো না। মিষ্টি আপু আর সাহেব ছিলেন আমার একমাত্র ভরসা। সাহেবের ঘুম কেড়ে নিলাম আমি। দেখা যেত প্রায় রাত তার জেগে থাকতে হত। তখন ছিলো জৈষ্ঠ্যের গরম। বিদ্যুৎ থাকতো না রাতে। আমি ছটফট করতাম। সাহেব আমাকে তালপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। তিনি টু শব্দ করতেন না। কপালে থাকতো প্রগাঢ় ভাঁজ। সেই ভাঁজের অর্থ আমার জানা ছিলো না। খুঁজতেও চাইতাম না। মুড়ির মতো ঔষধ খাওয়ার পর এতো কিছু আর ভালো লাগতো না। বাবার বাড়িতে আমাকে যা কথা সাহেব দিয়েছিলেন তা তিনি রাখলেন। একটি বারের জন্য ঝামেলা, আপদ, যন্ত্রণা এসব শব্দ ব্যবহার করলেন না। খুব আহ্লাদ করতেন তাও না। কিন্তু চেষ্টা করতেন যেন আমার কোনো অসুবিধা না হয়। আমার কাজ করা নিষেধ ছিলো। সিড়ি বাইতে পারতাম না বলে আমাকে নিয়ে তিনি নিচের ছোট ঘরটাতে চলে এলেন। এই ঘরটা আমার ঘরের মত সুন্দর না। খুব ছোট। আমি একটু জেদ করে বলেছিলাম,
"এই পঁচা ঘরে আমি থাকবো না।"
"ডাক্তার সিঁড়ি বাইতে মানা করেছে। শ্বাসকষ্টে তো প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়!"
"আপনি কোলে করে উঠাবেন, নামাবেন!"
সাহেব আমার দিকে চরমক বিরক্তি নিয়ে চাইলেন। বিড়বিড় করে বললেন,
"নকটামি যতসব!"
আমার হাসি পেতো উনার রাগী মুখটা দেখে। তবে মাঝে মাঝে একটু মায়াও হতো। তখন তার কোলে চড়ে বসতাম। নির্লজ্জের মতো তাকে চুমু খেতাম। তিনি কিছু বলতেন না। আমার চুমু খেতেন। আমার বাচ্চামোতে তিনি যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
এর মধ্যে বাসায় অনেককিছু পরিবর্তন হলো। মাহমুদ ইন্টার পরীক্ষা দিলো। অদ্ভূত হলেও সত্য সে পাঁচ বিষয়ে লেটার পেলো। সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে আর্মিতে দিবেন। যে ছেলে ইন্টারে বখতে পারে সে ভার্সিটিতেও ভেসে যাবে। কড়া নিয়মের মধ্যে থাকলে তার জীবন ভিন্ন হবে। আর্মিতে ভর্তি হওয়া চারটে খানে কথা না। মাহমুদের দৈহিক উচ্চতা বা ওজন ঠিক থাকলেও শারীরিক কসরত করার ক্ষমতা বেশি ছিলো না। একদিন দৌড়ে সে তিনদিন বেহুশ থাকতো। মা তার ছোট ছেলের ল্যাদাপ্যাদা হাল দেখে খুব চিন্তিত হলেন। সে আমার থেকে ছোট, অথচ তার প্রতি সাহেব লোহার মতো কঠিন। সাহেব অবশ্য তাতে খুব একটা গা করেন নি। মায়ের মতের বিরুদ্ধে মাহমুদকে একপ্রকার কাঠির মতো সোজা করে রাখলেন৷ তৈরি করলেন আর্মির কঠিন পরীক্ষার জন্য। আর্মিতে ভর্তি হতে হলে মানসিক এবং দৈহিক সকল প্রকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মাহমুদকে তিনি তিন মাসের মধ্যে সেভাবেই তৈরি করলেন। মাহমুদের ইচ্ছে ছিলো ক্রিকেটার হবার। সে খুব ভালো অপেনার হবার যোগ্যতা রাখতো। কিন্তু সাহেবের ভয়ে কখনো বলেই নি। আজ যখন তাকে জিজ্ঞেস করি,
"কি কর্ণেল সাহেব! তামিমদের দেখে আফসোস হয় নাকি? আজকে আপনিও কিন্তু সেলেব্রিটি হতে পারতেন!"
মাহমুদ হেসে বলে,
"রাখো তো ভাবি! নাসিরের মতো হয়তো অকেজো কোথাও পরে থাকতাম। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে স্যালুট পাওয়াটাও মন্দ লাগে না। তবে হ্যা! ওই জীবনে ভাইয়াকে খুব গাল্লাতাম। একবার তো চেয়েছিলাম পালিয়ে চলে আসি। অমানবিক সেই যাত্রা! উফফ!"
মা হয়তো একারণেই তার ছেলের জন্য কাঁদতেন। ছেলে যখন বহুমাস পর ফিরত, তিনি পাগলের মতো করতেন যেন ছেলেটা তার একটু যত্ন পায়। সেই ল্যাদাপ্যাদা মাহমুদ এখন কর্ণেল। তার ক্যান্টনমেন্টে গেলে আমাদের শাহী আপ্যায়ন করা হয়। যদিও সাহেব যান না। তার ভালো লাগে না। তিনি দূর থেকেই তার ভাই বোনদের সুখ দেখেন। মুখে না প্রকাশ করলেও তিনি যে আনন্দ পান সেটা বোঝা যায়।
গল্পে ফিরি, আমার গর্ভাবস্থায় আরোও একটি ঘটনা ঘটে। তা হলো মিষ্টি আপুর বিয়ে। মিষ্টি আপুর রেজাল্ট বের হতেই মা এবং আমার খালা শ্বাশুড়ি উঠে পড়ে লাগেন তার বিয়ের জন্য। মিষ্টির আপুর রঙ চাপা। একারণে তার বিয়ে দেবার এতো তাড়া। এবার অবশ্য একটা বড় ঘরের ভালো ছেলে আনা হলো। ছেলের নাম শাহনেওয়াজ। শাহনেওয়াজ সাহেব মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত ভালো। তিনি মিষ্টি আপুকে তার মতোই পছন্দ করলেন। মিষ্টি আপুর থেকে আট বছর বড় ছিলেন তিনি। সাহেব এবার আপত্তি করতে পারলেন না। কারণ মিষ্টি আপু বলেছিলেন, তিনি চাকরি করবেন না। তার ভালো লাগে না।
পাত্রপক্ষ এলেন এক বৃহস্পতিবার বিকালে। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। সাহেব আমাকে লাফালাফি করতে বারণ করেছেন। সেকারণে কিছুই আমার করা হয় নি। আমার পেট তখন বাড়ন্ত। সাত মাস চলমান। শরীরটা প্রচন্ড দূর্বল। মাঝে মাঝে পেটে ব্যাথায় অস্থির হয়ে যাই। মাঝে মাঝে পেট শক্ত হয়ে আসে। ডাক্তার আমাকে একটুর জন্য বেড রেস্ট দেন নি। তবুও আমার উৎসাহের কমতি রইলো না। সেই বাড়ন্ত পেটের উপর শাড়ি জড়িয়েছিলাম। সাহেব বিরক্ত নিয়ে আমার দিয়ে চাইছিলেন। একবার তো বলেই দিলেন,
"যার বিয়ে তার হুশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই!"
"ভালো হয়েছে। বিয়ে কি প্রতিদিন হয়? আপনার মতো মানুষ বুঝবে কি করে হুতুম?"
"বেশি উড়া হচ্ছে না?"
"কি করবেন উড়লে? আমার বডিগার্ড আসছে বুঝলেন!"
সাহেব আর কিছু বললেন না। পাত্রপক্ষ চলে এসেছে। মিষ্টি আপুকে সেদিন খুব মিষ্টি লাগছিলো। শুধু মুখটা ছিলো মলিন। যেন চাপা বিষাদ তাকে কাবু করে ফেলেছে। ওবাড়ির মা, চাচী, ফুপুর সাথে শাহনেওয়াজ সাহেবও সেদিন এসেছিলেন। তিনি আগামী শুক্রবার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। মা রাজী হয়ে গেলেন। সাহেব কিছু বলতে চাইলেন। কারণ খুব তাড়াহুড়ো হচ্ছিলো। কিন্তু মায়ের সামনে সুযোগ পেলেন না। শাহনেওয়াজ সাহেব বললেন,
"আমার খুব আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ে ভালো লাগে না। তাই ভাইজান আপনি খুব একটা প্যারা নিয়েন না।"
অবশেষে ঠিক হলো মিষ্টি আপুর বিয়ে হবে শুক্রবার। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে আমার হাতে একটা চিঠি পড়লো। চিঠিটা ছিলো মিষ্টি আপুর। আদনান ভাইকে লেখা এক পাতার একটা চিঠি, যার প্রথম বাক্য,
"আমাকে ক্ষমা করবেন আদনান ভাই"
·
·
·
চলবে……………………………………………………