খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ০১ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          আমার সাহেব বড্ড রাগী। তার রাগ নাকের ডগায় থাকে। প্রচন্ড গম্ভীর একটা মানুষ। কথা বললেই মনে হয় ধমকাচ্ছেন। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে যমের মতো ভয় পায়। আমার ননদের ভাষ্য মতে আমার সাহেবের এক হুংকারে এখনো আমার ছোট দেবর প্যান্টে প্রসাব করে দেয়। একবার আমার ননদকে থাপ্পড় মেরেছিলো সে তিনদিন জ্বরে ভুগেছে। মাও তাকে মান্যি করে চলেন। তার কথার অবাধ্য তিনি হন না।।বিয়ের প্রথমদিন-ই এসব শুনে আমার গলা শুকিয়ে এসেছিলো। আমার শ্বাশুড়ি মা আমাকে খুব আস্তে করে বলেছিলেন,
 "ওকে রাগিও না। লঙ্কাকান্ড ঘটবে।" 

আমার হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো। ভয়ে, সংশয়ে, আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো। আমি শুধু মাথা নেড়েছিলাম। আমার বয়স তখন খুব কম। কেবল আঠারোর ঘরে পা রেখেছি কেবল। আঠারো বছরের মেয়েকে যদি এতো ভয়ঙ্কর মানবের কথা বলা হয় যার সাথে কিনা তার আমৃত্যুর বন্ধন, তার বুকে তীব্র আতঙ্ক জন্মানো বিস্ময়কর ঘটনা নয়। আমার বিয়েটাও হয়েছিলো আমার অমতে। ফলে অনিশ্চয়তার জোয়ারে আমি খাবি খেলাম।

 নিতান্ত সুন্দরী বলে পাড়ার অসভ্য ছেলেদের জ্বালাতনের শিকার হতে হয়েছিলো আমাকে। উত্যক্ত করতো তারা যখন তখন। কলেজে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেলো। আমার বাবা ছা-পোষা শ্রেণীর নিরীহ প্রাণী। তিনি আর সাহস করলেন না আমাকে বাড়িতে রাখার। পড়াশোনা তখন প্রায় বন্ধের পথে। আমাকে নিয়ে আত্মীয়রাও বিরক্ত। অবশেষে বড় চাচার অফিসে কর্মরত এক যুবকের সাথে এক শুক্রবার আমার বিয়ে হয়ে গেলো।

বয়সে আমার সাহেব আমার থেকে অনেক বড়। বেশ ভালো পদে চাকরিরত সে। আমাকে দেখতে এসেছিলেন শুধু আমার শ্বাশুড়ি আর খালা শ্বাশুড়ি। সাহেবের সাথে দেখা হয়েছিলো একেবারের বিয়ের দিন। বিবাহ কার্য শেষে যখন আমাকে তার পাশে এনে বসানো হলো তখন-ই আমি তাকে প্রথম দেখলাম। লম্বাদেহী, সুঠাম দেহের মানুষ। চোয়াল কঠিন, তীক্ষ্ণ রুক্ষ্ণ দৃষ্টি। কেমন একটা তাচ্ছিল্যভাব। আমি তখন কাঁদছিলাম। বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবতেই আমার চোখ থেকে পানি পড়ছিলো অক্লান্তভাবে। নাক টানছিলাম তখন ক্ষণে ক্ষণে। ফলে তিনি আমার দিকে একবার চাইলেন। তীক্ষ্ণ, ধাঁরালো দৃষ্টি। কপাল কিঞ্চিত কুঞ্চিত হলো যেন। একটু পর চ সূচক একটা আওয়াজ পেলাম। তার কি আমাকে ভালো লাগে নি? তিনি কি বিরক্ত? ছোট মস্তিষ্ক জুড়ে ঘিরে ধরলো নানা তিক্ত চিন্তা। আমার কান্না যেন বেড়ে গেলো। ভয়ে জবুথবু হয়ে বসে রইলাম। কোথায় আমাকে আশ্বস্ত করবেন। তা না, তিনি একটু পর উঠে চলে গেলেন। তার মুখে যেন তীব্র অবহেলা লক্ষ্য করলাম। 

আমার শ্বশুরবাড়ি খুব বড় নয়। মানুষ বলতে চারজন। আমার শ্বাশুড়ি, ননদ, ছোট দেবর আর আমার সাহেব। শ্বশুর মারা গেছেন বছর চারেক। ননদ এখন অনার্সে আর দেবর আমার থেকে ছোট। এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। আমার সাহেব যতটা খচ্চর, আমার শ্বশুরবাড়ির প্রতিটা প্রাণ ততটাই নমনীয়। ননদ আমার বড় হলেও আমাকে ভাবী বলেই সম্বোধন করলেন। আমি বললাম,
"আপু আমাকে কানন বলেই ডাকুন প্লিজ। ভাবি বললে অস্বস্তি লাগে।"

আমার ননদের নাম মিষ্টি। আমি তাকে মিষ্টি আপু বলেই ডাকি। তিনি হেসে বললেন,
 "ভাইয়া শুনলে আমার দাঁত ফেলে দিবেন।"

আমার হাসি গায়েব হয়ে গেলো। শ্বাশুড়ি মা যখন আমাদের বরণ করতে চাইলেন, আমার সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন,
"এসব দ্রুত শেষ কর। আমার সকালে অফিস আছে, ক্লান্ত লাগছে।"

শ্বাশুড়ি মা দ্রুত আমাকে মিষ্টি খাইয়ে বরণ করলেন। সাহেব তখন গটগট করে চলে গেলেন ভেতর ঘরে। আমার জন্য অপেক্ষাও করলেন না। আমার মনটা তীব্র অভিমানে আর অবহেলার প্রহারে থিতিয়ে গেলো। মা তখন আমাকে সতর্কবানী শুনিয়ে মিষ্টি আপুকে বললেন,
 "ওকে ঘরে নিয়ে যা। মুহাইমিন রেগে যাবে।"

আমার সাহেবের নাম মুহাইমিন। কিন্তু সেই নামে আমার কখনো ডাকাই হয় নি। আমি ডেকেছি, "সাহেব" বলেই। 

মিষ্টি আপু যখন আমাকে সিড়ি দিয়ে দোতালায় নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি আমাকে আমার সাহেবে রাগের দস্তুর শোনালেন। আমার ফ্যাকাশে ভয়ার্ত মুখ দেখে তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
 "তুমি চিন্তা করো না ভাবি, তোমাকে মারবে না।"

বললেই হলো? মেরে বসলে? একে কাঠির মতো দেহ, আমি তো হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকবো। কাঁপা কাঁপা পায়ে রয়েসয়ে ঘরে প্রবেশ করলাম। সাহেব তখন জানালার কাছে দাঁড়ানো। আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বলছে। আমার নুপুরের আওয়াজেই নাকি পায়ের শব্দে তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। কপালে তীব্র ভাঁজ। তার ভয়ংকর চাহনী দেখেই আমার গলা শুকিয়ে এলো। মনে হলো ছুটে পালাই। কিশোরী মনে পুরুষের অভিপ্রায় হয় নি তবে কখনো এমন ভয়ংকর রাগী মানবের সাথেও আমার জোট হবে জানা ছিলো না। আমি দৃষ্টি নামিয়ে ফেলতেই তিনি আমার চ সূচক শব্দ করলেন। রুক্ষ্ণ স্বরে শুধালেন,
 "সিগারেট খেলে কি সমস্যা হয়?"

আমি কেঁপে উঠলাম ভারী স্বরে। বুক ভারী হলো। ভয়ে গলার স্বর হারিয়ে গেলো। খুব কষ্টে মিনমিনিয়ে বললাম,
"ন...না"
 "স্পষ্ট করে কথা বলা যায় না? ম্যানম্যান করা আমার ভালো লাগে না।"

তার কথায় আবারো বুক ধক করে উঠলো। গলা কাঠ হয়ে গেলো। পারলে আমি ছুটে পালাই নিজের বাড়ি। কিন্তু উপায় কই? আমার সিগারেটের গন্ধ একেবারেই ভালো লাগে না। তবুও সে যেনো না রাগে তাই বললাম,
 "না।"

সাহেব আমার দিকে ভীষণ বিরক্তি নিয়ে চাইলেন। যেন মিথ্যেটা ধরে ফেলেছেন। তার রাগী মুখের দিকে তাকানোর সাহস হলো না। আমি মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি সিগারেটটা ফেলে দিলেন জানালা দিয়ে। তারপর জানালা আটকে দিলেন। তীব্র বেগে ফ্যান চলছে। বিছানার কাছে এসেই এক টানে নিজের গায়ের পাঞ্জাবি খুলে ফেললেন। উদোম শরীরখানা দেখতেই আমি জমে গেলাম। ওই যে বললাম, পুরুষের সান্নিধ্য আমার কখনো হয় নি। গালজোড়া গরম হয়ে গেলো। খেয়াল করলাম, আমার হাত ঘামছে। শাড়ির অংশ খামচে দাঁড়িয়ে রইলাম যেন আমি মূর্তি। সাহেব বিছানার বালিশ টানতে টানতে বললেন, 
"সং এর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে এখানে আসার কৃপা করলে ভালো হয়। আমার সকালে অফিস আছে। ফজরের আযানের সময় ভসভস করে ঘুমানো আমার অপছন্দ। আমি যেন বিছানা তখন টানটান দেখি।"

আমার ভীষণ কান্না পেলো। এমন খচ্চর রাগী পুরুষের সাথে আমার বিয়ে হলো কেন! এমন নিষ্ঠুর ভাগ্য? একটু সুন্দর করে কি বলা যায় না? আমার সন্দেহ হলো লোকটা বুঝি আমাকে পছন্দ করে না। তাইতো এমন দুরদুর করছে। দৃষ্টিতে তাচ্ছিল্যভাব, অবহেলা যেন আমি ঠিক বুঝলাম। আমি চোখের পানি আটকাতে পারলাম না। আমার এই এক সমস্যা, কাঁদলেই নাক বন্ধ হয়ে যায়। চোখের পানির আগে নাকের পানি পড়ে। নিঃশব্দে কাঁদার উপায় নেই। আমি নাক টানতেই তিনি আমার দিকে রাগী চোখে চাইলেন। কিছুসময় তাকিয়ে রইলেন। কোনো কথা বললেন না। তার দিকে না তাকিয়েও আমি ঠিক টের পেলাম তার ঠান্ডা দৃষ্টি। ভয় আমার দলা পাকালো ঠিক ছোট্ট বুকের মাঝখানে। একটু পরে তিনি লম্বা হয়ে শুলেন। পিঠ ফিরিয়ে চোখ বুজতে বুজতে বিরক্তি নিয়ে যেন বললেন,
 "যতসব!"

—————

রাতটা আমার নির্ঘুম কাটলো। আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। ফজরের আযানের একটু আগেই বাথরুমে ছুটলাম। যেন তিনি উঠে আমাকে না দেখেন বিছানায়। গোসল সেড়ে বের হতেই দেখলাম সাহেব উঠে পড়েছেন। শলার ঝাড়ু হাতে বিছানা ঠিক করছেন। তার স্বভাব চোখ খুলেই আগে বিছানা করা। এরপর হাতমুখ ধোঁয়া। আমি বাথরুম থেকে বের হতে দেখেই তিনি আমার দিকে তাকালেন। কিন্তু এবার একটু ভিন্ন ভঙ্গিতে। এই চাহনীতে তীক্ষ্ণতা থাকলেও বিরক্তি ছিলো ন, তাচ্ছিল্যভাব ছিলো না। কেমন গভীর চাহনী। বুক কাঁপিয়ে তোলা সেই দৃষ্টি। স্থির চোখে অনেকসময় দেখার পর তিনি কোনো কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। আমি গামছা নেড়ে দিলাম বারান্দায়। এখনো আযান দেয় নি। আকাশে আলো নেই। পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে না। কেমন নীরব একটা ভোর। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা আঁছড়াবো তখন দেখলাম, শাড়িটা ভীষণ এলোমেলো। কুচিগুলো অবিন্যস্ত হওয়ায় পেটের খানিকটা দেখা যাচ্ছে। গোসল করায় ব্লাউজ ভিজে পিঠে লেগে পিঠ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। শরীরের খাঁজগুলোও উন্মুক্ত। বুকের কাছটায় এলোমেলো করে বোতাম লাগিয়েছি। ইশ! লজ্জা পেলাম ভীষণ। আমার ইচ্ছে করলো কোথাও যেন লুকিয়ে যাই। তিনি কি ভাবলেন কে জানে। আমি শাড়িটা ঠিক করলাম খুব কষ্টে। এর মধ্যে তিনি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। আড়চোখে আমাকে দেখে কঠিন গলায় বললেন,
"আমি মসজিদে যাচ্ছি। নামায পড়া হয় যেন। এরপর ঘুমাতে ইচ্ছে করলে আপত্তি নেই। আর শাড়ি পরার মাথার দিব্যি কেউ দেয় নি। সমস্যা হলে এসব ন্যাকামি করার মানে নেই।"

বলেই বেরিয়ে গেলেন। আমি থ হয়ে চেয়ে রইলাম। তিনি আমার সাথে সরাসরি কথাও বলেন না। ফলে ঠাহর করতে পারলাম না, লোকটার মনের ভাব। সে কি মনের বিরুদ্ধে আমাকে বিয়ে করেছেন? সেই সাথে মনে হলো আমাত শ্বাশুড়ি মা তাকে ছোটবেলায় মধু খাওয়ান নি! একটা মানুষ এতো কষমার্কা কথা কি করে কেউ বলে? অন্তত বয়সে ছোট বলে একটু তো মায়া করতেই পারে! আমি কি তার মায়ার যোগ্য নই? 

—————

তিনি মসজিদ থেকে এসে দেখলেন আমি ভদ্র, লক্ষ্ণী বউয়ের মতো বিছানায় বসে আছি। মাথায় ঘোমটা টেনেছি। মা বলেছেন, বিয়ের পর শাড়ি পরাই মেয়েদের ধর্ম। তাই সাহেব রাগ করলেও শাড়ি আমি পরবোই। সাহেব পাঞ্জাবী খুলে একবার আমাকে দেখলেন। কিছুসময় তাকিয়ে থাকলেন কিন্তু কিছুই বললেন না। পাঞ্জাবি নেড়ে বিছানায় পা লম্বা করে শুলেন। তাকে শুতে দেখেই আমি একপ্রকার লাফিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি বিরক্তি নিয়ে শুধালেন,
 "কি হয়েছে?"

আমি কিছু বললাম না। মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইলাম। ফলে তার কপালে ভাঁজ তীব্র এবং ঘন হল। তিনি বিরক্তি নিয়ে বললেন,
"ধ্যাত!"

চোখে হাত দিলেন। তারপর ওভাবেই বললেন,
"একটু পরে চা বানাতে পারলে এককাপ চা বানিয়ে আনার কৃপা করলে ভালো হয়। মাথা ধরেছে। আমি ঠিক সাতটায় বের হব। নাস্তা যেন টেবিলে থাকে। আম্মার বয়স হয়েছে। তাই মিষ্টির সাথে রান্নাঘরের কাজ বুঝে নেওয়ার কৃপা করলে ভালো হয়।"

আমার সাথে আবার তৃতীয় পুরুষে কথা বলা। রাগ হলো কিন্তু সেই রাগ গিলে আমি মিনমিনিয়ে বললাম,
"আমি রান্না পারি না।"

 তিনি সাথে সাথে চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে কিছুসময় আমার ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকালেন। বিরক্ত হলেন কি না কে জানে! পরমুহূর্তেই ভারী এবং গম্ভীর গলায় বললেন,
"শিখতে তো দোষ নেই। রান্না না পারা কোনো ক্রেডিটের কাজ নয়। মিষ্টি পারে, মা পারে। শিখে নেওয়ার কৃপা করলে ভালো হয়।"

আমি মাথা নাড়ালাম। শ্বাশুড়ি মা বলেছেন, তার ছেলেকে না রাগাতে। তিনি আবার চোখের উপর হাত দিতে দিতে বললেন,
"সময় আছে এখনো দেড় ঘন্টা। ঘুমাতে চাইলে ঘুমাতে পারা যাবে।"

আমি নড়লাম না। তিনি যখন শান্ত হয়ে গেলেন, আমি আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমার বুকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা ফোঁস করে বের হলো। কেমন স্বস্তি লাগতে লাগলো যেন। পুরো তখন একেবারেই শান্ত। সবাই হয়তো ঘুমে। এই শান্ত পরিবেশে চিন্তাগুলো আরোও প্রগাঢ় হলো। এমন রাগী মানুষের সামনে দু দন্ড থাকতেই আমার হাঁসফাঁস লাগে। সারাটা জীবন কিভাবে কাটাবো? 

—————

সাহেব অফিসের জন্য বেড়িয়ে গেলে আমার দিনটা সরল হয়ে গেলো। মিষ্টি আপু আর মায়ের পেছন পেছন ঘুরে দিন কাটলো। আমাদের বাড়িটাকে ঠিক বিয়ে বাড়ি, বিয়ে বাড়ি মনে হলো না। সাহেবের অপছন্দ বিধায় বিয়েটা খুব সাদামাটা হয়েছিলো। আত্মীয়ারা এসেছিলেন তবে খুব একটা না। আশেপাশে তেমন আত্মীয়াও নেই আমাদের। শউধু খালা শ্বাশুড়ি। এটা অবশ্য ভালোই হলো। সবার সামনে সং শেষে মুখদর্শনের ঝামেলা নেই। ফলে আমার দিনটা খুব স্বাধারণভাবেই কাটলো। মনে হলো বাসাতেই আছি। একসাথে সবাই দুপুরের খাবার খেলাম। বিকালের পর আমি নিজে চা বানালাম। রান্না না পারলেও এটা আমি ভালো পারি। চা হাতে আমি, মিষ্টি আপু আর শ্বাশুড়ি মা গল্পের আসর জমালাম মায়ের ঘরে। মিষ্টি আপু রসিক মানুষ। খুব সুন্দত করে সে নানা গল্প বুনেন। খুব সাদামাটা সেই গল্প, কিন্তু ইচ্ছে করে শুনি আর শুনি। সে গল্পে ছিলো তাদের কথা, তাদের গ্রামের কথা আর কিছু কিছু সাহেবের কথা। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। 

রাত আটটা বাজতেই মিলিটারি ক্যাম্পের মতো আমাদের ঘর সতর্ক হয়ে উঠলো। গল্পের আসর ভাঙ্গলো। আমার দেবর মাহমুদ সারাদিন টো টো করে ছুটলেও ঘড়ির কাটা আটটার ঘরে যেতেই সে বই খুলে বসলো। মিষ্টি আপু ছুটলেন ভাত বসাতে। সাহেবের গরম ভাত খাবার অভ্যাস। মাও সতর্ক হয়ে গেলেন। নিজের অপরিপাটি ঘর গুছিয়ে ফেললেন।আমিও হাত লাগালাম। আমার সাহেব ঠিক আটটা পনেরোতে ঢুকলেন বাসায়। গলার টাইটা ঢিলে করে জুতা খুলতে খুলতেই আদেশ করলেন,
 "মিষ্টি গরম পানি দে। আমি গোসল করবো।"

মিষ্টি আপু দ্রুত ছুট দিলেন রান্নাঘরে। গরম পানি বসালেন সাথে সাথেই। আমি তার ব্যাগটা হাতে নিতেই যাব অমনি তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
 "দরকার নেই। মিষ্টির থেকে পানিটা নিয়ে ঘরে এনে দেওয়ার কৃপা করলে ভালো হয়।"

বলেই হনহনিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেলেন। সাহেবের ভয়ে আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ছুটে গেলাম রান্নাঘরে। মিষ্টি আপু ভাতের ফ্যান গালছিলেন। আমাকে বললেন,
 "ওই যে পানি। হয়ে গেছে।"

বিশাল হাড়ি ভর্তি পানি। খুব কষ্টে তা নামালাম কাপড় দিয়ে। কোনো মতে জীর্ণশরীরে তা টেনে আনলাম ঘর অবধি। ঘরে ঢুকতেই সাহেবের হুংকার কানে এলো। ফোনে কাকে যেন শাসাচ্ছেন,
"এক কথা কয়শত বার বলতে হয় শুনি? বাসার আসার পর আমি অফিস সংক্রান্ত কোনো কথা শুনতে চাই না। কেন ফোন করা হয়েছে?"

তার হুংকার ছড়িয়ে গেছে ঘরময়। সেই সাথে আমার বুক কেঁপে উঠেছে এমন ভারী ধমকের সুরে। না জানি অপরপাশের লোকের কি অবস্থা? আমি কোনো মতে গরম পানির পাতিলটা নিয়ে বাথরুমে গেলাম। সাহেব তখন ফোনে শাসাচ্ছেন। আমি পানিটা ঢালতেই যাব অমনি কঠিন গলা কানে এলো,
"কি করছো?"

আমি চমকে উঠলাম। গরম পানির পাতিলটা হাত থেকে ফসকে গেলো। সেই সাথে টগটগে গরম পানি ছিটকে পায়ে পড়লো। তীব্র জ্বলন আর ব্যথায় চিৎকার করে উঠলাম আমি। প্রায় সাথে সাথেই আমার পা লাল হয়ে উঠলো। পোড়া মাংসের অসহ্য ব্যথায় আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। সাহেব ছুটে এলেন তক্ষুনি, ধমকে উঠে বললেন,
"বালতি নিয়ে গেলেই তো হত! মিষ্টি ঢেলে দিত!"

আমি কাটা মুরগীর মতো ছটফট করছি। তিনি দ্রুত আমার পায়ে ঠান্ডা পানি ঢালতে লাগলেন। তবুও আমার জ্বলা কমে না। আমার চিৎকারে মা, মিষ্টি আপু, আর আমার দেবর মাহমুদ ছুটে এলো ঘরে। মা অস্থির গলায় বললেন,
"চামড়া উঠে গেলো নাকি? আহারে বাচ্চা মেয়ে। কি করে হলো এগুলো?"

আমি ব্যাথায় ছটফট করছি। সাহেব আমার পায়ে পানি ঢালছেন। কিন্তু পায়ের অবস্থা খুব খারাপ। ফলে কিছু না বলেই তিনি আমাকে কোলে তুলে নিলেন। হুংকার দিয়ে বললেন,
 "সরো সবাই। আমি ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।"

আমাকে দেখে মিষ্টি আপু অপরাধে থিতু হলেন। এদিকে ব্যথা, যন্ত্রণায় আমি কাতর। শক্ত করে সাহেবের গলা ধরে আমি তার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছিলাম। আমার কান্না দেখে তিনি বিরক্তি নিয়ে কঠিন গলায় বললেন,
"সামান্য পানি ঢালতে যে পা পুড়ায় সে আবার করবে সংসার। যতসব! "

কঠিন গলায় কথাটা বললেও খুব যত্নে আমাকে কোলে করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন সাহেব। পুরোটা রাস্তা আমি তার কোলে ছিলাম। হাসপাতালের করিডোরেও আমাকে কোলে নিয়ে হেটেছিলেন। ডাক্তার যখন আমার ড্রেসিং করছিলেন, তার মুখ ছিলো কঠিন। ঝলসে যাওয়া পায়ের দিকে চেয়ে রাগে তার কপালে তীব্র ভাঁজ পড়ছিলো। অথচ আমার হাত ছিলো তার হাতের ফাঁকে। শক্ত ছিলো সেই বাঁধন। আমি ব্যথায় তাকে খামচে ধরছিলাম। নখে বিদ্ধ হচ্ছিলো তার চামড়া। ফলে তার মুখশ্রীতে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছিলো। অথচ তিনি আমার হাত ছাড়লেন না। তার এমন দ্বিমুখী অদ্ভূত আচরণে আমি দ্বিধান্বিত, যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে সে কি আমার খোঁপার গোলাপ নাকি কাঁটা?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp