সময় থমকে গেছে, মূহূর্তটুকুর অস্তিত্ব যেন মনে-প্রাণে মিশে এক অন্যরকম রেশ তৈরি করে ফেলেছে। বাহিরে কোলাহলের আর্তচিৎকার আর নেই। শোনা যাচ্ছে না। ক্ষণিকের নিস্তব্ধতায় মেরিন স্পষ্ট তারফানের বুকের হাহাকার শুনলো। ধুকপুক! ধুকপুক! নিশ্বাসের ধীর আনাগোনায় স্বস্তি পাওয়া বদনের নরম হয়ে আসা টের পেল। এতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল তারফান? এতটা বেশি! মেরিন চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখলো। তারফান বেশ শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মিনিট পেরিয়ে গেছে— ছাড়ছে না। বুকের সঙ্গে পিষে ফেলেছে একদম। মেরিনের শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। দম বন্ধ হয়ে আসছে। উপরন্তু বেকায়দায় জড়িয়ে ধরেছে লোকটা। নিজের সমান সমান করে কাঁধে মুখ গুঁজে আছে। পায়ের পাতা জমিন ছুঁচ্ছে না। এভাবে থাকা যায়? অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে মেরিন ধীরে ধীরে আওড়ালো, ‘ছাড়ুন তারফান! আপনার না কপাল কেঁটে গেছে? এভাবে ঘঁষছেন কেন? ব্যথা পাচ্ছেন না?’
তারফান উত্তর দেয় না। লম্বা নিশ্বাস টেনে মেরিন মেরিন সুবাস নিজের মাঝে টেনে নেয়। মেরিন তারফানের বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘সরুন… লোকে দেখছে তারফান!’
তারফান ঢোক গিলে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিঁজায়। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ কাঁপে, ‘তোমাকে জড়িয়ে ধরার পর আমার ভয়টা আরও বেড়ে যাচ্ছে মেরিন। তোমার যদি কিছু হয়ে যেত?’ একটু থেমে পরপর ধমক দিয়ে ওঠে, ‘তুমি এখানে কি করতে এসেছো মেরিন? কেন এসেছো? এই রাস্তায় ঝামেলা জানো না? এত অবুঝ কেন তুমি?’
অন্যদিন হলে ধমক শুনে মেরিন হয়তো রেগে যেত, অভিমান করতো। এখন ঠিক অভিমান এলো না। ভেতর থেকে একটা ক্লান্ত নিশ্বাস ধীরেসুস্থে বেড়িয়ে এলো। একটুর জন্য স্থির হয়ে তারফানের চওড়া পিঠে হাত বুলালো সে। একবার, দু'বার। কোমলস্বরে বললো, ‘আমি ঠিক আছি। আপনি শান্ত হন।’
তারফান শান্ত হতে পারলো না। তার অস্থিরতা বুঝি এই মেয়ে বোঝে? কখনো বোঝার চেষ্টা করেছে? সাবধানে মেরিনকে নিচে নামিয়ে দিলো তারফান। ফোনে কল এসেছে। সেই তখন থেকে রিং বাজছে। ইখতিয়ারের কল। তারফান এবার কলটা ধরলো। মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে শুধালো, ‘বাহিরে সব ঠিকঠাক আছে? বেড়োতে পারবো?’
ওপাশ থেকে কিছু বলতেই কল কেটে প্যান্টের পকেটে মোবাইল ঢোকালো তারফান। পেছনে থাকা গুটিকয়েক অচেনা-অজানা, ভয়ে তটস্থ হওয়া লোকেদের দিকে চেয়ে বললো, ‘আপনারা এখন বেড়োতে পারবেন। মারামারি থেমে গেছে।’
মেরিন দেখলো, মানুষগুলো বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ও তাদের দিকে কোণা চোখে তাকাচ্ছে। তার অস্বস্তি বেড়ে গেল। মনে মনে হাজারটা গালাগাল করলো তারফানকে। অকপটে বললো, ‘আপনি একটা পাগল! এতগুলো মানুষ! এভাবে জড়িয়ে ধরার মানে আছে?’
‘আমি সত্যিই পাগল হয়ে যেতাম মেরিন। তখন তোমাকে জড়িয়ে না ধরলে আমার নিশ্বাস আটকে যেত।’
মেরিন আড়নয়নে তাকালো। কি নাটুকে লোক বাবারে বাবা! সিনেমার লাইন একেবারে ঠোঁটস্ত-মুখস্ত করে রেখেছে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘বাসায় যাবো কখন? আমার আর এখানে ভালো লাগছে না।’
জবাবে খুব গোপনে মেরিনের বাম হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুড়ে নেয় তারফান। অন্যহাতে মাথার এলোমেলো ঘোমটা সযত্নে গুছিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করে, ‘বাইকে যেতে পারবে না? ইখতিয়ারের বাইক এনেছি আমি।’
মেরিন সে প্রশ্নের উত্তর দিলো না। তারফানের কপালের ক্ষ ত আরেকটু গভীর হয়েছে। বোধকরি তার খসখসে কাঁধের জামায় উন্মাদের মতো কপাল ঘঁষার কারণেই। কাঁধের অংশকুটুতেও রক্ত লেগে গেছে। মেরিন অল্প নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘আগে ডাক্তারের কাছে যাবো। কপালে কি একটুও ব্যথা হচ্ছে না আপনার?’
দু'পক্ষের মা রা মা রি, কাটাকাটিতে রাস্তার এপাশ-ওপাশ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। করুণ ফুটপাতের অবস্থা। ওইযে? দূরেই বাইক পার্ক করে রেখেছে তারফান। সুদূর বাইকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তারফান নির্বিকার কণ্ঠে উত্তর দিলো, ‘হচ্ছে।’
‘আগে তাহলে ডাক্তারের কাছেই যাবো।’
‘কেন?’
‘কেন মানে? কপালে ব্যথা হচ্ছে বললেন! ব্যথা সাড়াতে হবে না?’
‘হবে।’ তারফান সুবোধ বালকের ন্যায় মেনে নেয়। মেরিনের হাত ধরে রাখা হাতটা আরও দৃঢ় করে। প্রচন্ড ঝড়ের পরে পরিবেশ যেমন নিরব হয়ে যায়? একটা তীব্র সুখ সুখ বাতাস ঘুরে বেড়ায়? সেই বাতাসের অল্পটুকু তারফান যেন ছুঁতে পারলো, ছুঁয়ে দিলো।
মেরিন তারফানের দিকে চেয়ে আবদার করলো, ‘ডাক্তার দেখানোর পর আমাকে পানিও কিনে দেবেন। আমার তখন ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল।’
‘আইসক্রিমও কিনে দেব, মেরিন। যা চাইবে সব কিনে দেব।’
মেরিন চোখ সরু করে তাকালো, ‘সত্যি?’
‘সত্যি।’
—————
বিয়ের আর দশ দিনের মতো আছে। আগামী ছাব্বিশ তারিখ শুক্রবার মেরিন আর তারফানের বিয়ে। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে না ব্যাপারটা? হচ্ছে! মেরিন রোজ রাতে ঘুমাতে গিয়ে ভয় পায়। চোখের পাতা ঘুমের আসরে ঢলে পরলেও জোর করে সিলিংএর দিকে চেয়ে থাকে। যদি ঘুম ভেঙে দেখে, সব স্বপ্ন ছিল? একটা ঘুটঘুটে কালো ধোঁয়াশায় আটকে ছিল মেরিন, তখন? বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হয় মেরিনের। ভেবে পায় না, ঠিক কবে থেকে সে তারফান ওয়াহাজকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিল? মনে নেই। শুরু থেকেই তারফান ওয়াহাজ মেরিনের চক্ষুশূল ছিল, আছে। মোটেও পছন্দ করতো না সে ওই নাকউঁচু লোকটাকে। তারপর হঠাৎ… বদলা দিনের বরষা থেমে হুট করে সূর্য উদয় হলো, দিন শেষে রাতে বিরাট এক ঘোরমাখা চাঁদ উঠলো। তারফানকে মন দিয়ে বসলো মেরিন। তারফানের চোখ, হাসি, ছোট ছোট আদুরে যত্নে গা ভাসিয়ে দিলো এত বিচ্ছিরি ভাবে!
বোঝা গেল আজ আর ঘুম হবে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে গিয়ে টের পেল, কলি-মিলি তাকে দু'দিক থেকে ঝাপটে ধরে ঘুমিয়ে আছে। বলা হয়নি, বিয়ে উপলক্ষে বড় চাচা তাদের সবাইকে বড় বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। ছোট চাচা আর গ্রাম থেকে কেয়ারটেকারও চলে এসেছেন। এখান থেকেই সব আয়োজন, আনন্দ-বিচ্ছেদের সূত্রপাত ঘটবে। মেরিন ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলি-মিলিকে আলতো হাতে ছাড়িয়ে উঠে বসলো। আকাশে চমৎকার একটা রুপালি চাঁদ উঠেছে। কিছুক্ষণ একাধারে চেয়ে থাকলে ভ্রম হয়, চাঁদ মিটিমিটি হাসছে। অথচ আশপাশে চাঁদের আহ্লাদে বড় হওয়া তারা নেই। বাকিসব ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেরিন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। তার আর তাহসিনের রুম একদম পাশাপাশি। বড় চাচার ছেলে তাহসিন আগে থেকে দাঁড়িয়ে ছিল। ফোনে কথা বলছে। সম্ভবত জাপানিজ ভাষায়। মেরিনকে দেখে ফোন কানে নিয়েই একটুকরো সোনালী হাসলো। তাসহিন বারান্দায় দেখে মেরিনের আর বারান্দায় যেতে ইচ্ছে হলো না। চাঁদ দেখার অসীম শ্লেষ মাটি চাপা দিয়ে ফের ঘরে চলে যেতে নিলেই তাহসিন কোমল, সুরেলা গলায় ঢাকলো, ‘ম্যারিন, চলে যাচ্ছো কেন?’
আবার ম্যারিন! মেরিন মুখ ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বড় চাচার এখানে আসার পর থেকে কলি-মিলি তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে। জাপানিজ ভাষায় কতকিছু যে বলে! মেরিন বোঝে না। ওদের সঙ্গে থাকলে অর্ধেকটা সময় মেরিনের গুগল ঘাটতে ঘাটতেই কেটে যায়। ক্লান্ত গলায় বললো, ‘আপনি বোধহয় ফোনে কথা বলছেন, ভাইয়া। আকি এখানে থেকে কি করবো? আপনি কথা বলুন।’
মেরিনের কথায় বিশেষ পাত্তা দিতে দেখা গেল না তাহসিনকে। কল কেটে ফোন টি-টেবিলে রাখলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে বললো, ‘তুমি অনেক তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলছো, ম্যারিন। আমি যে তোমার বিয়েতে আনন্দ করবো, তোমাকে তো আমি চিনিই না ভালো করে।’
ভাঙা ভাঙা বাংলা। মেরিনের বুঝতে সময় লাগলো। ভ্রু কুঁচকে আগাগোড়া ঠাওর করে বললো, ‘এমনিই মজা করবেন নাহয়। বিডির বিয়ে তো বোধহয় কখনো দেখেননি। এবার দেখবেন। সবার সঙ্গে আনন্দ করবেন।’
তাহসিন বিজ্ঞের ন্যায় মাথা দুলালো। দূরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে চেয়েই বাহু চুলকালো। পরনে তার হাতা কাটা গেঞ্জি, হাফ প্যান্ট। এখানে এত মশা! মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়েই প্রশ্ন করলো, ‘তোমার হাজবেন্ড কি বুড়ো, ম্যারিন?’
‘জি?’ মেরিন আশ্চর্য চোখে তাকালো। তার স্বামী বুড়ো! মানে কি?
তাহসিন কিটকিট করে হেসে বললো, ‘আমি শুনেছি বিডির মেয়েরা বুড়ো স্বামী বিয়ে করে। তোমার স্বামীর বয়স কত?’
মেরিন প্রশ্নের উত্তর দিলো না। কিছুপল তেঁত বিতৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে রইলো তাহসিনের পানে। এরপর জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার মা কি বুড়ো বাংলাদেশি বিয়ে করেছে? আমার বড় চাচা কি বুড়ো?’
তাহসিন নিষ্পাপ চাহনি এঁটে মাথা দু'পাশে নাড়োলো। নাতো! তার বাবা এখনো যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। তার মা আর বাবা বিয়ের সময় ম্যাড ফর ইচ আদার ছিলেন। সে বিয়ের ছবি দেখেছে তো!
মেরিন ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘আমার হাজবেন্ডও বুড়ো না। আমার জন্য পার্ফেক্ট। প্রচুর হ্যান্ডসাম, সুন্দর। আমাকে অনেক ভালোবাসে। তাই আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি জোয়ান, সুন্দর দেখে ছেলেকেই বিয়ে করছি।’
মেরিন আর দাঁড়ালো না সেখানে। চলে গেল। তাহসিন বোকা চোখ চেয়ে থাকতে থাকতে ভাবলো, সে এমন রেগে যাওয়ার মতো কি বলেছে? মেরিন রেগে গেল কেন?
—————
দেশজুড়ে ইমন তালুকদারের অধপতনের হৈ হৈ চলছে। ইতোমধ্যে তার সব ব্যবসা-কারবার, অবৈধ সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আপাতত তিনি গোপনে লুকিয়ে আছেন। পুলিশ তাকে খুঁজে না পেয়ে তার ভাই নক্ষত্র তালুকদারকে গ্রেফতার করেছেন। জনগণের মাঝে মহল গরম। যুবকদের তাজা রক্তে বয়ে বেড়ানো হিং স্র উত্তাপ তুখোড় হয়ে ইমন তালুকদারের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তারা। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনে বিধ্বস্তপ্রায় বাড়ির ফুটেজ সারাদেশের টিভিতে রিপিট টেলিকাস্ট হচ্ছে। কেউ কেউ আনন্দে আ ত্মহারা, কারো আবার মন খারাপ— দেশের যে কি হবে!
আকাশে আজ তারা নেই। অল্প সল্প গরমে খুব একটা খারাপ লাগছে না। এলাকার সবে এমপি হওয়া ইখতিয়ার আদিল, ডিরেক্টর তালহা হায়দার আর ডাক্তার তামজিদ স্পন্দন আজ অভাগা তারফান ওয়াহাজের ছোট্ট চিলেকোঠায় বিনা আমন্ত্রণে পার্টি করতে এসেছেন। হাতে জসিম চিপসের বান্ডিল, মোজো, ডাল ভাঁজা! কত কত খাবার! এসেই তারা আপটেঝাপটে বিছানা দখল করে নিয়েছে। ফলসরূপ, বিছানায় সুন্দর করে ছড়িয়ে রাখা চাদর বিচ্ছিরি ভাবে কুঁচকে গেছে। দেখতে বাজে লাগছে। মিনিটের মাঝেই গাপুসগুপুস করে চিপস খেয়ে ফেলেছে চকচকে মেঝেতে। তালহা মোজো খেয়ে ঢেকুর তুলছে। তামজিদ চিপস খেয়ে মশলা মাখা হাত চাদরে মুছছে। ইখতিয়ার এখন একটু ভদ্র আছে। সবে সবে এলাকার এমপি পদে নিযুক্ত হয়েছে সে। এখনই খাটাশের মতো আচরণ করলে হয়? সবকিছু দেখে তারফান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে। তামজিদ আর তার মধ্যে এই একটা অমিলই আছে। তারফান নাক কুঁচকে বললো, ‘একেকটা বস্তি জন্ম হয়েছিস!’
তালহা পরপর দুটো ঢেকুর তুলে বললো, ‘আমাদের জন্ম বস্তিতেই, ভুলে গেছিস?’
ইখতিয়ার, তামজিদ খিকখিক করে হাসলো। তারফান বিছানার অবশিষ্ট গুছিয়ে রাখা চাদরে বসে প্রশ্ন করলো, ‘তোরা এখানে এসেছিস কোন দু:খে?’
ইখতিয়ার বললো, ‘তিনটা সুখবর পেয়েছি আমরা। সেলিব্রেশন করবো না?’
‘কি সুখবর?’
‘ইমনের অধপতন। তোর আর মেরিনের বিয়ে। বোনাস হিসেবে হায়দারকে দেখতে পাবো।’
তামজিদ চিপস খেতে গিয়ে থমকালো। সময় নিয়ে, রয়েসয়ে বললো, ‘মেরিনকে কষ্ট দিবি না তারফান।’
তারফান ম্লান গলায় বললো, ‘দেখি!’
তালহা সন্দেহের চোখ তাকালো। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বললো, ‘দেখি কি! তারফান… মেরিন কিন্তু প্ল্যানের কোথাও ছিল না। তুই-ই রাখতে চাসনি!’
‘এখন আছে।’
সঙ্গে সঙ্গে চমকালো তালহা, তামজিদ, ইখতিয়ার। তালহা বাঁজখাই গলায় চেঁচালো, ‘কি করতে চাচ্ছিস তুই? আমাদের বলিসনি কেন?’
তারফান স্পষ্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘শুরু থেকেই আমাদের প্ল্যানের কোথাও ছিল না মেরিন। ওর সঙ্গে হায়দারের সূত্র আছে জেনেও আমি কখনো আগাইনি। দরকার ছিল না। কিন্তু এখন…’ বলতে বলতে থামলো তারফান। চোখ তুলে একে একে তিনজনের দিকে চেয়ে বললো, ‘মেরিন থাকলে হায়দারকে ধ্বংস করা সহজ হবে।’
তামজিদ ঠোঁট কামড়ে কিছু বলতে নিয়েও বলে না। তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছে, ‘হায়দার! হায়দার! হায়দারের ধ্বংস!’
ইখতিয়ার বলে, ‘তুই কি মেরিনকে বিয়ে করবি না? না করলে বল, আমি বিয়ে করে নেব। এমনিতেও মেরিনকে আমার পছন্দ ছিল। শা** তুই এসে ভাগ বসিয়ে নিয়েছিস। ফালতু!’
তামজিদ, তারফান সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য চোখ তাকালো ইখতিয়ারের দিকে। তারফান কুৎসিত ভাবে মুখ কুঁচকালো। বাজে একটা গালি দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো, ‘করবো বিয়ে।’
সময় গড়িয়ে রাত গভীর হলো। অমাবস্যা রাতের মতোন ঘন, দৃঢ়, গাঢ়। তালহা, তামজিদ আর ইখতিয়ার বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট পড়ার টেবিলে নিয়ন আলোর ল্যাম্প লাইট জ্বলছে। তারফান নিরবে হাতের ওয়ালেটের দিকে চেয়ে আছে। তালহা একবার বলেছিল, প্রেমিকেরা প্রেমিকার ছবি সবসময় ওয়ালেটে নিয়ে ঘুরে। তারফান মেরিনের প্রেমিক না। কখনো হওয়ার চেষ্টা করে নি। অথচ ঠিকই তালহার কথা শুনে সেদিন রাত্রিবেলা মেরিনের ছবি জোগাড় করে ওয়ালেটে গুঁজে রেখেছে। কখনো ওয়ালেট খুলে সেই ছবি দেখা হয়নি। আজ দেখতে মন চাইলো। ছোট্ট পাসপোর্ট সাইজ ছবি। সেখানে মেরিন খিলখিলিয়ে হাসছে। একরাশ চুল এসে গাল ছুঁচ্ছে। তারফান আনমনেই ছবিতে বুড়ো আঙুল একটু একটু করে বুলালো। গালের চুল সড়িয়ে দিতে চাইলো। সড়ছে না। সড়বে না। তারফান জানে।
ল্যাম্প লাইট বন্ধ করে ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল তারফান। বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো, ‘আমি তোমাকে কষ্ট দিতে তোমার কাছে এসেছি। তবুও স্বার্থপরের মতো তোমাকে চাওয়া কি আমার অপরাধ হবে? হোক! আমি তবুও তোমাকে নিজের করে চাইবো, মেরিন।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………