“ছে…ছে.. ছেড়ে দিন… প্লিজ, লাগছে আমার”
ভুল হয়ে গেছে। আর কখনও হবে না।
কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে তার হাত ধরে রাখা লোকটির পানে তাকিয়ে বলল রাহা।
কথাটি বলার সাথে সাথে, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি দাঁতে দাঁত পিষে, নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, আর অন্য হাত দিয়ে তৎক্ষণাৎ..
ঠাসসসস…….
“গালে হাত দিয়ে সাথে সাথেই জোরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে রাহা। নরম গালে এতো শক্ত থাপ্পড় খেয়েও অজ্ঞান হয়নি —এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় বিস্ময়।”
রাহার দুই বান্ধবী অবন্তিকা ও সাফা। তাদের প্রাণ প্রিয় বান্ধবীকে থাপ্পড় খেতে দেখে দূর থেকে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল—সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষের দিকে…হুশ ফিরতেই দৌড়ে এলো রাহার কাছে।
ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে, সামনে দাঁড়ানো লোকটির পানে তাকালো তারা তিনজন। এ যেনো কোনো মানুষ নয়, এক হিংস্র বাঘ তাদের সামনে দাঁড়ানো। এখনই তাদের কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। আতঙ্কে তারা চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকালো।
লোকটির চোখ দু’টি ভয়াবহ রক্তিম আভায় ভরে উঠেছে। রাহার যে হাতটি সে চেপে ধরেছিল, সেখানে এখন স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের দাগ বসে আছে।
রাস্তার চারদিকে নিস্তব্ধতা। ভরদুপুর—মানুষজনের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।
হঠাৎ করেই এক রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এলো—
“গো। রাইট নাউ।”
তিনজনই চমকে কেঁপে উঠল। কেউ নড়ছে না দেখে আবারও গর্জে উঠল—
“আই সেড, গেট লস্ট। ড্যাম ইট।”
কথাটি শ্রবণ হওয়ার সাথে সাথে অবন্তিকা আর সাফা মিলে রাহা কে ধরে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। আর যেতে যেতে, মনে মনে একশো একটা গালি দিতে ভুলল না।
“শালা, তুই সুন্দর হলেই কি… তোর বউ হবে কালো লুচনির মতো। তখন তোরা দুজন মিলে গাইবি—
‘সাদা সাদা কালা কালা, রঙ জমেছে সাদা কালা।’
হবি তুই দীর্ঘ টাকলা, অল্প কয়দিনে..”।
বলতে বলতেই ওর মুখে একটা বিদ্রূপাত্মক ভেংচি দিলো। রাগটা এখনো কমেনি। আজ পর্যন্ত কেউ তার গায়ে একটা ফুলের টোকাও দেয়নি, অথচ সেই লোকটা সরাসরি থাপ্পড় মেরে দিলো। তাও কোনো কথা না শুনেই।
অন্যদিকে লোকটি তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে এক রহস্যময় হাসি দিল।
তার সাথে থাকা দুইজন দেহরক্ষী—বা বলা চলে ভাইয়ের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু—জিজ্ঞেস করল,
“কিরে, মেয়েটাকে শুধু শুধু মারলি কেন?”
সে শান্ত গলায় শুধু একটাই উত্তর দিল—
“এজ মাই উইশ। নো মোর টক।”
তাদের ও কি আর করার বসের কথার উপর তো কোনো কথা বলা যাবে না। তারাও তিনজন গাড়িতে উঠে বসতেই ধোঁয়া উড়িয়ে কালো মার্সিডিজ টি
নিজ গন্তব্যের দিকে চলতে থাকলো।
—————
এদিকে তিনজন বদের হাড্ডি আইসক্রিম পার্লারে গিয়ে বসে পড়ল। একটু ঠান্ডা হওয়া দরকার—যা তাদের সাথে ঘটে গেছে, তা যেন এখনো মাথার ভেতর ঘুরছে।
তিনজনই যেন কোনো ঘোরের মধ্যে আছে। রাহার গাল আর হাত এখনো লাল হয়ে আছে। রাহা এক বোতল পানি নিয়ে আগে মুখটা ধুয়ে নিলো। এমনি অনেক গরম তারপর থাপ্পড় খাওয়া কম কিসে।
একটু ফ্যানের নিচে বসেই অবন্তিকার চোখে চোখ পড়তেই….!
হঠাৎ করে রাহা বলে উঠল .
“অবন্তিকার বাচ্চা আআআআআ….
তোর ডেয়ার এর মায়রে সালাম।”
কুত্তি, তোর জন্যই আজ প্রথমবার লাইফে মার খেলাম! নিকুচি করি তোর ট্রিটের। তোর ট্রিট তোকেই গরুর গোবর মিশিয়ে খাওয়াবো। আর কোনো ডেয়ার ছিল না, শালী!
এটাই কেনো বলাতে গেলি..? তোর জন্য আমার গালের রফা-দফা শেষ!
বলেই নেকা কান্না জুড়ে দিল রাহা। এদিকে দোকানের কয়েকজন কাস্টমার তাদের দিকেই বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে কি যে শুরু করেছে এরা..!
অবন্তিকা বলে উঠলো...
“আমি কি জানতাম নাকি দোস্ত যে ওই বজ্জাত লোকটা এই সামান্য কোথায় এতো টা রিয়েক্ট করবে।”
অবন্তিকার কথা শেষ না হতেই সাফা বলল, “যা হয়েছে হয়েছে, এখন চুপ কর।”
জিভ দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে শয়তানি হাসি দিয়ে আবারও বলতে লাগলো…
“একটা জিনিস কিন্তু আমি খেয়াল করেছি…”
রাহা ভেজা চোখেই সুধালো, “কি…?”
-এই, ওয়েট ওয়েট…
তৎক্ষণাৎ রাহা আর অবন্তিকা ভ্রু কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর একসঙ্গে সাফার দিকে ঘুরে গেল।
সাফা শান্তভাবে বলল, “ইয়েস…”
রাহা আর অবন্তিকা মাথা নেড়ে একসঙ্গে বলল, “নো, নো… এটা হতে পারে না।”
আবারও সাফা জোর দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এটাই।”
ঠিক তখনই বাকি দুইজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল—
“নোওওওওওওওওওওওওওওওওও!”
রাফা বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“বাঁশ খাওয়ার জন্য আর কেউকে পেলি না? এই খাটাসটাকেই?”
বলেই সে রাগে গজগজ করতে করতে আইসক্রিম খেতে লাগল।
অন্যদিকে অবন্তিকা শান্ত স্বরে বলল,
“যাই বলিস, লোকটা কিন্তু অনেক হ্যান্ডসাম রে দোস্ত। শার্টের উপর দিয়েই তো পুরুষালি মাসল দেখা যাচ্ছিল। ব্ল্যাক শার্ট আর প্যান্টে একদম নায়কের মতো লাগছিলো । তোর সাথে কিন্তু হেব্বি মানাবে রে”
রাফা তৎক্ষণাৎ তেতে উঠে বলল,
“বালের নায়ক! আমি মার খেয়ে শকে আছি, আর তোরা ওই খাটাসটার বডি নিয়ে পড়ে আছিস!”
তারপর বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“থাক, আমি বাড়ি যাই। আম্মু বলেছিল আজ তাড়াতাড়ি ফিরতে—কেউ নাকি আসবে। ওই লোকটার জন্যই দেরি হলো। তাও ভালো, অচেনা মানুষের হাতেই মার খেয়েছি…” আর কেউ দেখেও নি। আমার মানসম্মান এখনও আছে।
বান্ধবীদের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলো রাহা। বাড়িতে ঢুকার সময় তার কেমন যেন অনুভূতি হচ্ছিলো যা আগে কখনো হয়নি।
এতো কিছু সাত পাঁচ না ভেবে গেট পেরিয়ে বড় হল রুমে ঢুকে সবাইকে বসে থাকতে দেখে।
কিন্তু তার চোখ গিয়ে ঠেকলো সবার কেন্দ্র বিন্দুতে যেখানে সেই লোকটি বসেছিলো।
যখন সেই লোকটিকে দেখতে পায় …মনে হয় আকাশ টা তার উপর ভেঙে পড়েছে।তার তো বেহাল দশা, মুখ হা হয়ে যায়।
আর তৎক্ষণাৎ চিৎকার দিয়ে উঠে…
“আআআআআআআআআআআ”
মুহুর্তে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়...।
·
·
·
চলবে……………………………………………………