খান বাড়ির ভেতরটা যেন আজ রাজপ্রাসাদ। চারদিকে রাজকীয় সাজসজ্জা— হলরুমের ঠিক মাঝখানে ঝুলছে দৃষ্টিনন্দন এক ঝাড়বাতি, যার নরম আলোয় ঝলমল করছে ঘরের প্রতিটি কোণা।
পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরেই এমন সাজানো পরিবেশ দেখে রাহার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে খুশির ঝিলিক। কিছুক্ষণ পর শিফাও ভার্সিটি থেকে এসে পৌঁছায়। রাহা আগেই তার দুই প্রিয় বান্ধবী—সাফা আর অবন্তিকাকে আসতে বলেছে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, তাদের বন্ধনটা যেন আপন বোনের মতোই। ছোটবেলা থেকে একসাথেই বড় হয়েছে তারা। সাফা আর অবন্তিকার মায়েরাও রাহাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই একটু বিশ্রাম নেয়। তারপরই শুরু হয় প্রস্তুতির ব্যস্ততা। কারণ অতিথিরা আসতে আর বেশি দেরি নেই—তাদের আপ্যায়নের দায়িত্বও তো আছে।
তার ওপর বাড়ির মেয়েদের প্রস্তুতি! কখন যে শেষ হবে, সেটা কেউই ঠিক করে বলতে পারে না
—————
সন্ধ্যে ঠিক ৬টা। একে একে অতিথিরা এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
আমান খান আর আসান খান নিজে দাঁড়িয়ে সবাইকে রিসিভ করছেন। ভেতরে ঢুকতেই সবাইকে ওয়েলকাম ড্রিংকস আর সুন্দর ফুলের তোড়া দিয়ে আপ্যায়ন করা হচ্ছে।
ঠিক তখনই বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে অভ্র—সাথে তার দুই ছায়া, জারিফ আর জায়ান।
অভ্রকে দেখেই আমান খানের ভ্রু কুঁচকে যায়। অন্যদিকে আসান খান হালকা হাসি মুখে ভাতিজাকে বরণ করে নেন—শেষ পর্যন্ত বাড়ির একমাত্র ছেলে, আবার বড় ইনভেস্টরও।
আমান খানের সেই কঠিন মুখভঙ্গি দেখে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে অভ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার সামনে।
তারপর বড় করে সালাম দিয়ে বলে—
— “আসসালামু আলাইকুম…”
কিছুটা ঝুঁকে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে যোগ করে—
— “জেঠা শশুড়…”
— “চুপ করো, বেয়াদপ ছেলে!” আমান খান গর্জে ওঠেন নিচু স্বরে।
অভ্র থামে না—
— “চুপ করবো কেনো? গেস্টদের সাথে এ কেমন ব্যবহার, চেয়ারম্যান সাহেব?”
তারপর হালকা হেসে বলে,
— “শ্বশুরবাড়িতে কিন্তু দাওয়াত পেয়েই এসেছি। বিনা দাওয়াতে এই জিহাদ খান অভ্র কোথাও যায় না।”
বলেই পাশের ওয়েটারের ট্রে থেকে একটা ওয়াইনের গ্লাস তুলে নিয়ে এক চুমুক দেয়। ঠোঁটে সেই চেনা হাসি রেখে ভেতরের দিকে হাঁটা দেয়।
পেছনে দাঁড়িয়ে আমান খান কিছুক্ষণ বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকেন—ছেলের কথাগুলো যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।
ভেতরে ঢুকতেই তার মা এগিয়ে আসেন—
— “বাবা, এসেছিস?”
অভ্র হালকা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে—
— “আমাকে তো আসতেই হতো… আফটার অল, মাই ইন-ল’স হাউস।”
বলেই আর দাঁড়ায় না, অন্যদিকে চলে যায়।
অভ্রর কথা শুনে আফসানা বেগম যেন হঠাৎই বিষম খেয়ে বসেন। কাশতে কাশতে তার অবস্থা বেহাল।
সাথী বেগম তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে এসে তাকে ধরেন।
— “আরে আপা, কি হলো হঠাৎ? কোথা থেকে এমন কাশি উঠলো…
বলতে বলতে মাথায় হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে চাপড়ে দেন।
আফসানা বেগম কষ্ট করে কাশির ফাঁকে বিড়বিড় করে বলেন—
— “মা যখন হয়ে যায় জেঠি শাশুড়ি… বিষম না খেয়ে উপায় আছে নাকি…”
এদিকে অভ্র নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে—অপেক্ষা করছে তার সেই প্রিয় “ফেইরি টেইল”-এর জন্য।
এর মধ্যেই ইভান, সাফা আর অবন্তিকাও এসে পৌঁছায়।
ইভানের পরনে সি-গ্রিন কালারের স্যুট—যেটা তার উপস্থিতিতে আলাদা একটা অ্যাটিটিউড আর আকর্ষণ যোগ করেছে।
সাফা বাড়ির তিন বউকে একসাথে দেখেই দু’হাত তুলে বলে ওঠে—
— “মাশাআল্লাহ! আরে আরে… এই তিন নায়িকা কোত্থেকে আসলো?”
চোখ বড় বড় করে আবার বলে—
— “ববিতা, শাবানা, কবরী—একদম পারফেক্ট! থু থু… নজর যেনো না লাগে!”
অবন্তিকাও হেসে সায় দেয়—
— “একদম ঠিক বলছিস!”
আফসানা বেগম হালকা লজ্জা মেশানো হাসি দিয়ে বলেন—
— “চুপ কর, কী যে বলিস তোরা…”
অবন্তিকা দুষ্টু চোখে তাকিয়ে আবার বলে—
— “তা বড় আব্বু… আর ছোট আব্বু ঠিক আছে তো? তোমাদের দেখে আবার বেহুঁশ টেহুঁশ হয়ে যায়নি তো?”
বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে সে।
হাসি-ঠাট্টায় চারপাশ জমে উঠলেও, এক কোণে দাঁড়িয়ে সাথী বেগমের মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসে।
আজ যদি তার স্বামী বেঁচে থাকতেন… এই আনন্দটা যেনো আরও কতগুণ বেড়ে যেতো। মানুষটা চলে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন জীবনের সব রঙ মুছে গেছে।
একটা নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে নিজেকেই বোঝায়—
আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। তিনি তো উত্তম পরিকল্পনাকারী…
চোখ তুলে সামনে তাকাতেই আফসানা বেগমের চোখে চোখ পড়ে।
সাথী বেগম ঠোঁটে হালকা হাসি টানেন—
বড় জা হয়তো তার মনের কষ্টটা বুঝে ফেলেছেন।
কিন্তু কী বলবেন তিনি?
কীভাবে সান্ত্বনা দেবেন…
যেখানে এই অবস্থার পেছনে তার নিজের ছেলেই জড়িত—
এই কঠিন সত্যটা কি চিরদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব?
—————
রাহা সবাইকে যে নামে ডাকে, সাফা আর অবন্তিকাও ঠিক সেই নামেই ডাকে। আর বাড়ির লোকজনও তাদের ঠিক রাহার মতোই, নিজের মেয়ে ভেবে আদর করে।
— “যা দুষ্টুরা… পাজী হয়েছিস অনেক! মার খাবি কিন্তু বলে দিলাম…”
হাসতে হাসতেই শাসন করল কেউ একজন।
সাফা আর অবন্তিকার হাসিতে পুরো পরিবেশটা হালকা হয়ে উঠেছিল। ঠিক তখনই একটু দূর থেকে জারিফ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে—চোখে কেমন তীক্ষ্ণ একটা দৃষ্টি।
হঠাৎ সামনে তাকাতেই অবন্তিকার চোখে পড়ে সেই দৃষ্টি।
মুহূর্তেই তার হাসি থেমে যায়।
জারিফ ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবে—
এটা আবার কেমন মেয়ে! এভাবে হেসে গড়িয়ে পড়ার কী আছে?
মেয়েরা সত্যিই অদ্ভুত…
সাফা কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে—
— “এই, তোর আবার কী হলো?”
— “কিছু না…” সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় অবন্তিকা।
— “চল, রাহার কাছে যাই।”
হাঁটতে হাঁটতেও অবন্তিকা একবার ফিরে তাকায়—
জারিফ এখনও একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে।
এক ঝলক চোখাচোখি হতেই সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়… তারপর আর না তাকিয়েই সাফার সাথে এগিয়ে যায়।
—————
অভ্র হলরুমের একপাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ইনভেস্টরের সাথে কথাবার্তায় ব্যস্ত ছিল। ঠিক তখনই দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো—আইজান শিকদার মাহাদী। সাথে তার বাবা-মা আর ছোট বোন ।
অভ্রর চোখ হঠাৎই স্থির হয়ে যায় তার ওপর।
আসান খান এগিয়ে গিয়ে মাহাদীর বাবা, মিস্টার আরাফ শিকদারের সাথে করমর্দন করে জড়িয়ে ধরলেন—
— “কিরে বন্ধু, এই তোর আসার সময় হলো?”
হাসতে হাসতেই উত্তর আসে—
— “আরে, তোর ভাবির একটু কাজ ছিল, তাই দেরি হয়ে গেল।”
এরপর আমান খান আর বাড়ির বউরাও সৌজন্য বিনিময় করে তাদের বসতে বলেন।
এইসবের মাঝেই মাহাদীর চোখ পড়ে অভ্রর দিকে—
দেখে, অভ্র অনেকক্ষণ ধরেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
হালকা হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে মাহাদী হাত বাড়ায়—
হ্যান্ডশেক করার জন্য।
অভ্রও ধীরে হাত তোলে…
কিন্তু মাঝপথেই সেটা ঘুরিয়ে নিয়ে চুলের পাশ দিয়ে চালিয়ে দেয়।
মাহাদী একটু থেমে গিয়ে হাত গুটিয়ে নেয়।
— “ওয়েলকাম, মিস্টার এংরি ম্যান…”
মাহাদীর ঠোঁটে হালকা ব্যঙ্গমিশ্রিত হাসি।
অভ্র চোখ সরু করে তাকায়—
— “তুই এখানে কেনো?”
— “আমার তো এখানে আসতেই হতো…”
— “বেশি বাড়াবাড়ি করিস না, মাহাদী। ফল ভালো হবে না।”
মাহাদীর কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে লুকানো চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট—
— “আমি আমার সীমানার মধ্যেই আছি।”
একটু থেমে, চোখে চোখ রেখে বলে—
— “শেষ বাজিমাত কিন্তু আমি জিতবো।”
অভ্রর ঠোঁট বাঁকা হয়ে ওঠে—
— “দেখা যাবে… সময় হোক।”
—————
পার্টিতে এলাকার সেই চেয়ারম্যানের পরিবারও এসেছে—আইরিনের পরিবার । তাদের সাথে আমান খানদের বেশ ভালো পারিবারিক সম্পর্ক।
অভ্রকে দেখামাত্রই আবারও যেন মনে মনে হোঁচট খেল আইরিন।
চোখ সরাতে পারছে না সে।
আইরিনকে অভ্রের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই মাহাদী চুপচাপ সরে গেল অন্যদিকে।
তার চোখে এখন শুধু একজনই—তার সেই “শুভ্র পরি”।
মনে মনে অনেক আগেই ঠিক করে ফেলেছে, তাকে ছাড়া আর কাউকে সে দেখবেই না।
ওদিকে আইরিন এগিয়ে আসতেই অভ্রর গম্ভীর মুখটা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
রয়েল ব্লু স্যুট, ভেতরে সাদা শার্ট—পুরো উপস্থিতিটাই যেন আলাদা একটা আকর্ষণ ছড়াচ্ছে। যে কেউ এক নজরেই মুগ্ধ হতে বাধ্য।
আইরিনের পরনে স্লিভলেস ব্ল্যাক গাউন—ফিটিংটা বেশ টাইট, সবকিছুই স্পষ্ট ফুটে উঠছে।
নিজের মতো করে সাজলেও, তার চোখে-মুখে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস মিশে আছে।
অভ্র একবারও তার দিকে তাকালো না।
আইরিন যখন হাত বাড়িয়ে তার বাহু ছুঁতে যাবে—
হঠাৎই অভ্র ঠান্ডা কিন্তু কড়া গলায় বলে উঠল—
—“ডোন্ট টাচ মি… স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মি।”
আইরিন থমকে গেল।
এক মুহূর্তে যেন সবকিছু বদলে গেল তার জন্য।
যাকে পেতে সবাই ব্যাকুল, সেই অভ্রই তাকে এভাবে সরিয়ে দিল!
কিছুটা সামলে নিয়ে আইরিন ঠোঁটে মেকি হাসি দিল
চোখের ভেতরের জিদ টা ফুটে উঠলেও প্রকাশ পেতে দিলো না।
তখনই সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলো শিফা আর রাহা।
অভ্রের কাছে মেয়েটিকে দেখে তার দৃষ্টি সরু হয়ে গেলো।
মেয়েটির হাত তখনও অভ্রের বাহুর কাছাকাছি।
এটি দেখেই রাহার চোখে রাগের আভাস ভেসে উঠল।
হাত দিয়ে চেপে ধরলো শাড়ির এক সাইড।
মুখটা গম্ভীর করলেও পরক্ষণে পার্টিতে এতো গেস্ট দেখে মুখে হাসি টানলো।
আইরিন মেকি হাসি দিয়ে হাত নামিয়ে।
মনে মনে বলল—কোনো ব্যাপার না।
অভ্রের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলো।
অভ্র তার অপ্সরা কে দেখে এতো টাই মুগ্ধ যে দিন দুনিয়া সব ভুলে তাকিয়ে রইলো।
সবার নজর গেলো তাদের দিকে।
রয়েল ব্লু শাড়িতে যেন চারিদিক আলো ছড়াচ্ছে তারা। এতো পরিমাণ প্রিটি লাগছে, যা প্রকাশ করা দুঃসহ। চুল গুলো হালকা কার্ল করা। কপালের মাঝখানে একটা সাদা পাথরের টিপ।
চোখে কাজল দেয়ায় চোখ গুলো টানা টানা লাগছে। যতই প্রশংসা করা হোক, ততই কম মনে হবে।
অভ্রর আরেকপাশে হেঁটে এসে দাঁড়ালো মাহাদী।
তারও যেন পলক পড়ছেই না।
তখনই বলল—
— “ওয়াও, ড্যাম বিউটিফুল!”
— “আই এম জাস্ট ফিদা।”
বলেই বুকে হাত দিয়ে ঘষতে লাগলো।
অভ্র তখনই বলল—
— “ডোন্ট ডেয়ার” ,চোখ উপড়ে ফেলব একদম। আমার জিনিসে নজর দিলে সেটা আমি বরদাস্ত করব না, বলে দিলাম। মনে রাখবি।”
বলেই চলে গেলো।
নজর আর কি দিব… সেটা তো নয় বছর আগেই দিয়ে ফেলেছি। এতো সহজেই ছেড়ে দিবো কি করে ব্রো।
“আই অ্যাম কমপ্লিটলি ইন লাভ উইথ হার।”
মাহাদী টুপ করে সামনে চলে গেলো। একদম রাহার সামনে
রাহা তো ঘাবড়ে গেল।এই বান্দা এখানেও চলে এসেছে…!
মাহাদী তো ডিরেক্ট গিয়েই বলে ফেলো—
“নীল নীল নীলাঞ্জনা...
চোখ দু’টো টানা টানা...
কপালের টিপ যেন জোনাকির দীপ
আমি প্রেমে পরেছি তুমি কর না মানা”
রাহা ভ্রু একটু কুঁচকে আছে, ঠোঁট সামান্য চাপা—যেন এমন কথা সে একদমই আশা করেনি।
হালকা বিরক্ত গলায় বলে উঠল—
— “চুপ করুন,মেহেদী পাতা।
অসভ্য ছেলে মানুষ।”
বলেই সেখান থেকে সরে গেলো।
মাহাদী এক পলক তাকিয়ে হালকা হাসল, তারপর শান্ত গলায় বলল—
— “সভ্য করে দিও… ঠিক তুমি যেমনটা চাও, তেমনটাই হয়ে যাব শুভ্র পরি।”
এইদিকে ইভানও যেন শিফার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে।
তার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়—এই রূপকে কীভাবে প্রকাশ করবে, সেটা যেন সে বুঝে উঠতে পারছে না।
ইভানের সেই চাহনি যেন কারও হৃদয়ে নীরব ঢেউ তুলে দিল।
নিচে নামতেই বাড়ির সবাইসহ উপস্থিত অনেকে তাদের প্রশংসায় ভরিয়ে দিল।
একসময় ভিড় একটু কমে এলে সবাই ধীরে ধীরে সরে যায়, আর তারা এক পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে।
তখনই ইভান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে শিফার দিকে।
তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, শুধু একটা স্থিরতা আর মুগ্ধতা মিশে আছে।
শিফা তাকে আসতে দেখে একটু থমকে যায়, চোখ নামিয়ে নেয় আগের মতোই লজ্জায়।
ইভান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ধীরে বলল—
— “একদম ব্লু অর্কিডের মতো লাগছে তোমাকে, শিফা।”
শিফা থমকে গেল।
চোখ নামিয়ে নিলো, গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল। এমন তুলনা সে আগে কখনও শোনেনি। নিজের ভেতরের লাজুকতাটা যেন আর লুকাতে পারছে না।
ইভানও আর বেশি কিছু বলল না। হালকা হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, যেন কথা বাড়ালে পরিবেশটা আরও অস্বস্তিকর হয়ে যাবে।
শিফা একা দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি—লজ্জা, আনন্দ আর একটু না বলা বিস্ময় মিশে আছে।
সে ধীরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল, তারপর রাহা আর সাফার দিকে এগিয়ে গেল।
—————
পার্টিতে সবাই বেশ আনন্দেই সময় কাটাচ্ছে, কিন্তু এক জোড়া চোখ শুধু খুঁজে চলেছে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকেই
যদিও ভেতরে একটু রাগ জমে ছিল, তবুও তাকে ছাড়া যেন মনটা স্থির হতে চাইছে না।
খাওয়ার জন্য সবাইকে ডাকাডাকি শুরু হলে রাহা লক্ষ্য করে অভ্রকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
সে চারপাশে চোখ বুলিয়ে অস্থির হয়ে যায়।
— “কোথায় গেলো মানুষটা? একটু আগে তো এখানেই ছিল…”
শিফাকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে—
— “ওকে উপরে যেতে দেখেছি।”
রাহা একটু থেমে বলে—
— “তোমরা যাও, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি। গরম লাগছে।”
সাফা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে—
— “এসির মধ্যেও গরম লাগছে তোর?”
রাহা হঠাৎ বলে ফেলে—
— “আরে, শাড়ি পরেছি তো… অভ্যস্ত না তাই।”
— শাড়ি তো আমিও পরেছি। আমার তো গরম লাগছে না।
— “উফ আপু, আমার লাগছে”…
— “ঠিক আছে যা।”
বলেই রাহা দ্রুত উপরের দিকে এগিয়ে যায়।
সোজা চলে যায় অভ্রর রুমের দিকে।
আজ আর কোনো দ্বিধা নেই তার মধ্যে।
দরজা খুলেই সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ে সে।
ভেতরে ঢুকেই মুহূর্তে থমকে যায় রাহা… টাশকি খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে।
কাউচের উপর অভ্র আয়েশি ভঙ্গিতে বসে ড্রিংকস করছে। পা দুটো সামনের কাঁচের টেবিলের ওপর তুলে রেখেছে।
সামনের কাঁচের টেবিলে ছড়িয়ে আছে দেশি-বিদেশি নামী দামী ব্র্যান্ডের এলকোহল।
এই দৃশ্যটা দেখে রাহা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়।
তার মুখে কোনো কথা নেই—শুধু বিস্ময় আর অস্বস্তির নীরবতা।
অভ্র মাথা তুলে নেশাটে দৃষ্টিতে ফট করে রাহার দিকে তাকায়।
সেই দৃষ্টি দেখে রাহার এতক্ষণ জমে থাকা সাহস মুহূর্তেই ফুঁস করে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
অভ্রের চোখের সাদা অংশ লালচে হয়ে গেছে।
তাকে ভীষণ ভাঙা আর অস্থির লাগছে।
হালকা বাদামী চোখজোড়া আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
রাহাকে দেখেই ঠোঁটের কোণে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে হাত দুটো টানটান করে শব্দ তুলে ফুটায়। ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি নিয়ে এগিয়ে আছে রাহার দিক
তাকে দেখে মনে হচ্ছিল এতক্ষণ সে শুধু রাহার আসার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
অবশেষে তার দেখা মিলল।
অভ্রের এই অবস্থায় দেখে রাহার প্রাণ যায় যায় ভাব। তার মনে হচ্ছে এখন এখানে থাকা ঠিক হবে না। পালাতে পারলে বাঁচি।
যেই না ভয়ে উল্টো দিকে ঘুরে এক পা ফেলতে গেল, ঠিক তখনই শাড়ির আঁচলে টান পড়ে আর তার পা থমকে যায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………