সকাল ৮টা। সবাই খাবার টেবিলে বসেছে। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে আসলো বাইকের তীব্র আওয়াজ— মনে হচ্ছে কেউ খুব জোরে ব্রেক কষেছে।
হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকল অভ্র।
আশপাশ না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি পেরিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
তার বাম হাত থেকে টুপটুপ করে রক্ত পড়ছে।
মেঝে জুড়ে সরু একটা রেখা তৈরি হয়েছে—যেদিক দিয়ে হেঁটে গেছে, সেদিকেই রক্তের ফোঁটা ছড়িয়ে আছে।
বাড়ির কেউ ডাক দেয়ার সুযোগটুকু ও পেলো না।
ঠিক তখনই রেডি হয়ে নিচে নামার জন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছিল রাহা। হঠাৎ করেই সামনের মানুষটাকে দেখে থমকে যায়।
দুই দিন পর অভ্রকে এই অবস্থায় দেখে তার বুক ধক করে উঠল।
সোজা নজর গেলো কাটা হাতটার দিকে, দেখেই
নিজ মনে বিড়বিড় করতে লাগলো—
“এই লোকটা আবার সকাল সকাল মারপিট করে এসেছে হয়তো!
এ নাকি ইনভেস্টর! আমার বা*লের ইনভেস্টর।
গুণ্ডা বললেই তো ঠিক হতো। যখনই দেখি হাত চলতেই থাকে।”
ওই অবস্থায় রুমে কি করছে—দেখার জন্য এগিয়ে গেল রাহা।
কাঁপা কাঁপা পায়ে দরজার সামনে দাঁড়াল।
দরজার হাতল ধরে টান দিতেই।
দরজা লক।
তবে রাহাও কম না—আন্দাজে পিন দিতে লাগল একের পর এক। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে আঙুলটা সেন্সরে ছোঁয়াতেই—
ক্লিক!
দরজা খুলে গেল।
রাহা থমকে গেল—
“এইটা আবার কিভাবে সম্ভব,,!
“আমি…! আমার ফিঙ্গারপ্রিন্ট?”
অভ্র আগেই রাহার আঙুলের ছাপ সেট করে রেখেছিল। তার বিশ্বাস ছিল—এই পাগলি একদিন না একদিন আসবেই।
দরজা কিছুটা ফাঁকা করে আস্তে করে মাথা ঢোকাতেই—
হঠাৎ হেঁচকা টানে তাকে ভিতরে নিয়ে দরজার সঙ্গে চেপে ধরল অভ্র।
রাহা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।
অভ্র থেমে গেল।
তার অপ্সরীকে এত কাছ থেকে দেখছে—দুই দিন পর। কিজে শান্তি লাগছে।
ঘুম ভাঙা মুখ, কলেজ ড্রেস, দুই পাশে বিনুনি…
একদম ছোট্ট, নির্ভেজাল একটা মেয়ে।
যাকে দেখে মনে হয়—দেখতেই যেতে ইচ্ছে করে।
জগতের আর কিছুর দেখার প্রয়োজন নেই।
অভ্রর উষ্ণ শ্বাস ছড়িয়ে পড়ছে রাহার মুখে।
কিছুক্ষণ পর কোনো নড়াচড়া না পেয়ে রাহা চোখ খুলল। খুলেই দেখলো অভ্রের নগ্ন বুক।
দেখেই একটা শুকনো ঢোগ গিললো।
মনে হলো যেন ডুবে যাচ্ছে কোথাও… বের হতে ইচ্ছে করছে না।
অভ্রের ভেজা চুলের পানি ভিজিয়ে দিচ্ছে তার কপাল।
ঠোঁটে দুষ্টু হাসি এনে অভ্র ফিসফিস করে বলল—
“কি … আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকবেন, ম্যাডাম?”
ধড়মড় করে বাস্তবে ফিরল রাহা।
ভয়, লজ্জা—সব একসাথে এসে ভিড় করল।
চোখ নামিয়ে ফেলল।
— ক.. কই?
— এই যে… একটু আগেই তো।
অভ্র আরও ঝুঁকে—
“খুব ভালো লাগছে,তাই না..! এভাবে দেখতে?
বললেই তো পারতেন… আপনার জন্য সারাদিন এভাবেই থাকতে পারি।”
— ছিঃ! কি সব বলছেন! অসভ্য লোক… সরুন।
— আমি কেন সরবো?
আপনি আমার রুমে এসেছেন, না আমি আপনার রুমে গিয়েছি?
রাহা থেমে গেল।
কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
— আ.. আমি তো…
— কি আপনি তো?
— আমার একটা দরকারি জিনিস ছিল… নিতে এসেছি।
— ওহ! কি জিনিস, ফেইরি টেইল?
ফেইরি টেইল সম্বোধনে রাহা চোখ ছোট ছোট করে তাকায় অভ্রের পানে।
ঘোরের মধ্যে থেকেই বলে
“আপনাকে বলা যাবে না।”
— আমার রুমে আপনার জিনিস? একটু অদ্ভুত না?
— বাড়ি তো একই…
অভ্র সরে দাঁড়াল।
“নিন, খুঁজে নিন আপনার জিনিস।”
রাহা তো বিপদে পড়ল—
এখানে তো তার কিছুই নেই!
তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টাল—
“আপনার হাতে কি হয়েছে? এত রক্ত কেন?
আর দুই দিন কোথায় ছিলেন?”
প্রশ্নগুলো শুনে অভ্রর ভিতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে গেল।
সে খুশি হলো—
তার অপ্সরা তাকে খুঁজেছে।
— এসব জেনে কি করবেন, মিসেস?
— সরি! আমি মিস, মিসেস না।
— মিসেস হতে কতক্ষণ… এত খোঁজ নিচ্ছেন যে..!
ঠোঁট কামড়ে একটু ঝুঁকে বলল—
“মিস করছিলেন, মনে হয়?”
রাহা চোখ তুলে সোজা বলে দিল—
“আমার বয়েই গেছে আপনাকে মিস করতে।”
— বাড়ির সবাই চিন্তা করছিল, তাই জিজ্ঞেস করলাম।
— আর আপনার চিন্তা হচ্ছিল না জান?
— না।
— মিথ্যা।
— না, সত্যি।
— না, মিথ্যা।
— সত্যি!
রাহা বলেই নিজেই থমকে গেল।
অভ্র তখনো তাকিয়ে আছে তার দিকেই।
হালকা চোখ টিপে দিল।
— যান! অসভ্য লোক!
ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল রাহা।
অভ্র নিচে তাকাল নিজের কাটা হাতে।
হালকা হাসল।
“ধন্যবাদ…”
মনে মনে বলল সে।
এই আঘাতটার কারণেই তো—
তার প্রেয়সী আজ নিজে থেকে তার কাছে এসেছে।
গতরাতে পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে পড়তেই অনেকটা ড্রিংকস করেছে।
নিজের বাংলো বাড়িতেই ছিল।
রাগ, কষ্ট, অপরাধবোধ—সব মিলিয়ে
হাতে থাকা গ্লাসটা মুঠ করে চেপে ধরেছিল। কাঁচ ভেঙে হাত কেটে যায়। সারারাত সেইভাবেই ছিল ক্ষতটা। আজ সকালে বাইক চালাতে গিয়ে আবার তাজা হয়ে যায়।আর তাই রক্ত ঝরছিল।
—————
তিনদিন পর বাড়িতে ফিরলেন আসান খান।
আজ তার মেজাজটা বেশ ফুরফুরে—চোখেমুখে সন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট। কারণও আছে; ইমপোর্টের ডিলে তিনি দারুণ লাভ করেছেন।
ফিরেই তিনি জানালেন, আগামীকাল একটা ছোট্ট সাকসেস পার্টি রাখবেন—তার সব বিজনেস পার্টনার, বড় বড় ইনভেস্টর আর হাতে গোনা কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তাদের পরিবারকে নিয়ে। আর সেটাও হবে নিজের বাড়িতেই।
আমান খানকে বিষয়টা জানালে তিনি একটুও দ্বিমত করলেন না। বরং ছোট ভাইয়ের সাফল্যে তার মুখেও গর্বের হাসি ফুটে উঠল।
সেই অনুযায়ী বাড়িতে শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি।
আয়োজনটা ছোট হলেও, তাতে যেন কোনো কমতি না থাকে—সবার মধ্যেই একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করছে।
বাড়ির সবাই আসান খানের সাফল্যে সত্যিই খুশি।
আর অন্যদিকে, রাহা, শিফা, আয়রা আর জায়রা বসে গেছে নিজেদের নিয়ে—পার্টিতে কে কী পরবে, সেটা নিয়েই চলছে জমজমাট আলোচনা।
শেষমেশ তারা ঠিক করল—যেহেতু বাইরে গেলে শাড়ি পরা হয় না বললেই চলে, তাই এবার সবাই শাড়িই পরবে। একরকম শাড়ি নিলে দেখতে আরও সুন্দর লাগবে—এই সিদ্ধান্তেই একমত হলো তারা।
বিকেল হতেই তারা বেরিয়ে পড়ল।
গাড়ি থামল Bashundhara Shopping Mall-এর সামনে।
বাড়ির তিন বউ আর চার মেয়ে—সবাই মিলে যেন একদম রঙিন একটা দল।
এক দোকান থেকে আরেক দোকান—ঘুরে ঘুরে, দেখেশুনে, মিলিয়ে মিলিয়ে অবশেষে তারা নিজেদের জন্য শাড়ি সিলেক্ট করল।
রঙ, ডিজাইন, কাজ—সবকিছুতেই ছিল একটা মিল, কিন্তু তবুও প্রত্যেকের পছন্দে ছিল আলাদা আলাদা ছোঁয়া।
শাড়িগুলো হাতে নিয়ে সবার মুখেই তখন তৃপ্তির হাসি—আগামীকালের পার্টির জন্য যেন তারা আরও একটু বেশি করে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
পার্টির আগের সন্ধ্যাটা যেন এক আলাদা রঙে রাঙানো।
বাড়ির বউদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে অফ-হোয়াইট জামদানি শাড়ি—নরম, সূক্ষ্ম আর রাজকীয়। শাড়ির গায়ে হালকা সোনালি কাজ, কোথাও ফুলেল নকশা, কোথাও জালের মতো বুনন। আলো পড়তেই শাড়িগুলো যেন মৃদু ঝলমল করে ওঠে—চোখে লাগে না, কিন্তু নজর আটকে যায়। সাথে সিম্পল গোল্ড জুয়েলারি আর পরিপাটি খোঁপা—সব মিলিয়ে তাদের লুকটা একদম মার্জিত, শান্ত অথচ ভীষণ আভিজাত্যে ভরা।
আর মেয়েদের জন্য রয়্যাল ব্লু—গভীর, আকর্ষণীয় আর একদম পার্টির মতো গ্ল্যামারাস।
রাহার শাড়িটা অর্গাঞ্জা—হালকা, ফ্লোয়ি, যেন বাতাসেই ভেসে যায়। পুরো শাড়িতে ছোট ছোট সিলভার কাজ ছড়ানো, আলো পড়লে তারাগুলোর মতো ঝিকমিক করে।
শিফারটা সিল্ক—গাঢ় রয়্যাল ব্লু রঙের ওপর মোটা গোল্ডেন বর্ডার, একদম রিচ আর এলিগেন্ট।
আর দুজনেরটাই এমনভাবে বেছে নেওয়া, যাতে পাশাপাশি দাঁড়ালে একসাথে মিলেও যায়, আবার আলাদাও লাগে।
সব মিলিয়ে—এক পাশে অফ-হোয়াইটের কোমল আভিজাত্য, আরেক পাশে রয়্যাল ব্লুর গাঢ় সৌন্দর্য—দুইয়ের কনট্রাস্টে পুরো দলটাই যেন একসাথে আরও বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই ছোট দুটো মুখ একদম গোমড়া।
আয়রা আর জায়রা—দুজনেই বড়দের মতো শাড়ি পরার জন্য কতটা এক্সাইটেড ছিল! বারবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করছিল নিজেদের—রয়্যাল ব্লু শাড়িতে ঠিক রাহা আপুদের মতো লাগবে…
কিন্তু শেষমেশ তাদের মা, নাজিরা বেগম, একদমই রাজি হলেন না।
তার বদলে তিনি কিনে দিলেন দুটো রয়্যাল ব্লু লেহেঙ্গা—নরম কাপড়ে তৈরি, হালকা এমব্রয়ডারি, ঘেরটা সুন্দরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে নিঃসন্দেহে খুবই সুন্দর… বরং তাদের বয়সের সাথে আরও বেশি মানানসই।
তবুও, সেটা যেন তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না।
দুজনেই মুখ ফুলিয়ে এক কোণায় বসে আছে—
চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান।
আয়রা নিচু গলায় বলল,
— “আমরাও যদি শাড়ি পরতাম… কত সুন্দর লাগত, না?”
জায়রা ঠোঁট বাঁকিয়ে মাথা নাড়ল,
— “হ্যাঁ… আপুদের মতো…”
রাহা আর শিফা ওদের ওই গোমড়া মুখ দেখে আর থাকতে পারল না।
হেসে হেসে এগিয়ে এসে দুজনেই আলতো করে আয়রা আর জায়রার গালে হামি দিল।
রাহা নরম গলায় বলল—
— “আরেকটু বড় হ তোরা… তখন না হয় শাড়ি পড়বি, ঠিক আছে?”
তারপর একটু দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে যোগ করল—
— “না হলে এমন কর… তোদের এই সুন্দর সুন্দর লেহেঙ্গাগুলো আমাদের দিয়ে দে। তোরা এই বড় বড় কাপড়ের শাড়ি নিয়ে নে! আমার তো এখনই দম বন্ধ হয়ে আসছে!”
কথাটা বলেই শিফার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারা করল সে।
শিফা বুঝে নিয়ে সাথে সাথেই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
— “হুম্, ঠিক ঠিক! আমি তো একদম সামলাতেই পারছি না… এত বড় শাড়ি! কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে!”
আয়রা আর জায়রা প্রথমে ঠোঁট ফুলিয়েই রাখল, কিন্তু একটু পরেই নিজেদের অজান্তেই হেসে ফেলল। না না দরকার নাই আমাদের লেহেঙ্গাই ঠিক আছে বাবা।
ছোট ছোট সেই হাসির মাঝেই ধীরে ধীরে আবার জমে উঠল তাদের উচ্ছ্বাস।
—————
টানা চার ঘণ্টা শপিং শেষে সবাই যখন বাড়ি ফিরল, তখন যেন শরীরের প্রতিটা হাড়ে ক্লান্তি জমে আছে।
হাতে ভর্তি শপিং ব্যাগ, মুখে ঘাম মাখা অবসাদ—তবুও চোখেমুখে লুকানো আনন্দটা স্পষ্ট।
ড্রয়িংরুমে ঢুকেই কেউ সোফায় ঢলে পড়ল, কেউ জুতো খুলে হাঁফ ছাড়ল—
— “উফফ… আর পারছি না!”
— “এত শাড়ি দেখতে হবে, কে জানত!”
আয়রা আর জায়রা নিজেদের লেহেঙ্গার ব্যাগ আঁকড়ে ধরেই বসে আছে—মুখে এখন আর আগের মতো অভিমান নেই, বরং একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে খুশি।
রাহা ব্যাগগুলো এক পাশে রেখে মাথা ঝাঁকিয়ে চুল ঠিক করল,
আর শিফা ক্লান্ত গলায় বলল—
— “কালকে কিন্তু সবাইকে একদম ফ্রেশ থাকতে হবে… আজকেই রেস্ট নাও!” ছোট আব্বুর সাকসেস পার্ট বলে কথা।
সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের শাড়িগুলো গুছিয়ে রাখছে—
অফ-হোয়াইট জামদানিগুলো যেন এখনো আলো ছড়াচ্ছে, আর পাশে রাখা রয়্যাল ব্লু শাড়িগুলো গভীর নীল আভায় আরও মোহনীয় লাগছে।
আমান খান পড়বেন অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি সাথে কটি। আর আসান খান পড়বেন অফ হোয়াইট স্যুট।
আমান খান সাথী বেগমকে বললেন,
ইভান যেন পার্টিতে থাকে।
সাথী বেগমও ভাসুরকে ভদ্রভাবে উত্তর দিলেন—
তিনি জানিয়ে দেবেন।
—————
শিফার হঠাৎ করেই মনে পড়ল—তার একটা প্রেজেন্টেশন আছে।
মানব দেহের টিস্যু (Tissue) নিয়ে… তাদের কাজ সম্পর্কে।
সবগুলোই মোটামুটি বুঝেছে, কিন্তু একটা জায়গায় এসে বারবার আটকে যাচ্ছে।
অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না।
হঠাৎই তার মাথায় এলো—ইভান ভাইয়ার কথা।
সে তো নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিতে পারবে।
কিন্তু এখন দ্বিধা… যাবে, নাকি যাবে না?
তবুও নিজেকে বোঝাল—আজকের মধ্যে না বুঝলে কাল পার্টি, পরশুই প্রেজেন্টেশন আর বুঝাই হবে না।
আর দেরি করা ঠিক হবে না।
“যাই… জিজ্ঞেস করে আসি।”
ধীর পায়ে ইভানের রুমের দিকে এগোতে লাগল সে।
প্রতিটা কদমে বুকের ভেতরটা কেমন ধুপধুপ করছে।
দরজার সামনে গিয়ে একটু থেমে, তারপর হালকা নক করল—
“ইভান ভাইয়া… আছেন?”
ভিতর থেকে ভেসে এলো শান্ত গলা—
“জি, আসো।”
শিফা ভিতরে ঢুকেই দেখল, ইভান কারও সঙ্গে কথা বলছে।
ঠোঁটে হালকা হাসি, চোখে এক ধরনের কোমলতা।
ইভান তাকে বসতে ইশারা করে বারান্দার দিকে চলে গেল,
হাত তুলে বুঝিয়ে দিল—“পাঁচ মিনিট।”
শিফা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
মনে মনে ভাবল—
হয়তো তার প্রিয় মানুষটাই হবে…
নাহলে এমন করে রুমের বাইরে চলে যেতো না।
কোনো এক অজানা কারণে শিফার মনটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
ঠিক কেন এমন লাগছে—সে নিজেও বুঝতে পারল না।
একটু আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু এখন বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
চোখ দুটো অকারণেই নরম হয়ে এলো।
নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—
“এতো কিছু না… এমনি লাগছে।”
ইভান রুমে ফিরে এসে সরাসরি শিফার দিকে তাকাল।
“কি হয়েছে শিফা? বলো।”
শিফা একটু দ্বিধা নিয়ে বলল,
“আসলে ভাইয়া… আমার প্রেজেন্টেশনের একটা পার্ট বুঝতে পারছি না। পরশু প্রেজেন্টেশন, একটু বুঝিয়ে দিলে ভালো হতো।”
ইভান হালকা হাসল,
“অবশ্যই। কোন পার্ট?”
“প্রাণী টিস্যুর শেষের পার্ট… তাদের কাজটা।”
“ওহ, এটা তো সহজ,” ইভান বলল।
“এখানে বসো।”
সে সামনে একটা বই খুলে শিফাকে বসতে ইশারা করল। তারপর ধীরে ধীরে বোঝাতে শুরু করল—
“প্রাণী টিস্যুর শেষের অংশে বলা হয়েছে স্নায়ুটিস্যু বা নার্ভটিস্যুর কথা। এটা আমাদের দেহে উদ্দীপনার সাড়া দিয়ে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এই টিস্যুর মূল একক হলো স্নায়ুকোষ বা নিউরন। আমাদের মস্তিষ্ক অসংখ্য নিউরন দিয়ে গঠিত।”
ইভান একের পর এক করে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে লাগল।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সে পুরো টপিকটা বুঝিয়ে দিল।
শিফা শুধু চুপচাপ শুনছিল।
চোখে কোনো বিরক্তি নেই, বরং একটা গভীর মুগ্ধতা।
যেন পড়াশোনার চেয়েও বেশি কিছু তাকে টেনে ধরেছে সেই মুহূর্তে…
ইভান বইটা বন্ধ করল, স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলল,
“এবার বুঝতে পেরেছ তো?”
শিফা একটু দেরিতে মাথা নাড়ল।
“জি… বুঝেছি।”
কিন্তু কেন জানি, এই ‘বুঝেছি’ শব্দটার ভেতরেও আরেকটা অজানা অনুভূতি লুকিয়ে রইল।
ইভান স্বাভাবিকভাবে বইটা সরিয়ে রাখল,
আর শিফা আস্তে করে উঠে দাঁড়াল।
“ধন্যবাদ ভাইয়া।”
ইভান শুধু মাথা নাড়ল,
“আর কিছু লাগলে বলবে।”
শিফা দরজার দিকে এগোতে গিয়ে একবার থামল। পেছন ফিরে তাকাল—
ইভান তখন আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে।
অদ্ভুত একটা অনুভূতি বুকের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
না খুশি, না দুঃখ—একটা মাঝামাঝি টান, যেটা সে ঠিক নাম দিতে পারছে না।
দরজা খুলতেই হালকা বাতাস মুখে লাগল।
শিফা বুঝতে পারল না, আজকের এই ছোট্ট মুহূর্তটা কেন মনে এতটা জায়গা করে নিচ্ছে।
হয়তো সত্যিই…
কোথাও শুরু হয়ে যাচ্ছে এমন কিছু,
যার শুরুটা খুব সাধারণ হলেও, শেষটা আর আগের মতো থাকবে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………