খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ০৫ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          সাহেবের গাঢ় স্বর আমার কানে যেতেই আমার সারাশরীরময় অদ্ভূত শিহরণ বয়ে গেলো। তার পেশীবহুল হাতটা আমার কোমরে ঘুরছে। আরেক হাত আমার ঘাড়ের পেছনে। তার চোখের দৃষ্টি গভীর। অন্ধকার ঘর। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে ক্ষুদ্র সময়ের জন্য আলোকিত হচ্ছে ঘর। কারেন্ট চলে গেছে। ফ্যানটাও চলছে না। বাহিরে শুরু হয়েছে তীব্র ঝড়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে কাঁপছে দেওয়ালগুলো। ঘরের পর্দাটা বেপরোয়া উড়ছে। এই ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ তার গভীর চোখে চোখ রাখতেই বুক ধক করে উঠলো। যে চোখে রাগের বদলে ছিলো আমাকে কাছে পাবার তৃষ্ণা। আমি দাঁত নিয়ে ঠোঁট চেপে খুব আস্তে বললাম,
 "আমি না গ্যাদা? গ্যাদা মানুষের কাছে কৃপা চাইতে লজ্জা করে না?"

আমার কথায় সাহেবের রাগার কথা। কঠিন চোখে তাকানোর কথা। অথচ তার মুখশ্রী ছিলো শান্ত। ঘরের আলোআঁধারী মায়ায় সেই শান্ত মুখখানা অপার্থিব লাগছিলো। কাঁটা কাঁটা চেহারার, তীক্ষ্ণ চোখের মানুষটি অত্যন্ত সুদর্শন। হয়তো কোথাও না কোথাও এমন পুরুষের স্বপ্নই সব কিশোরী দেখে। এমন পুরুষ সৃষ্টিকর্তা আমার নসিবে লিখেছেন। আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে রইলাম। তিনি একহাতে আমার চোখ ঢেকে আমাকে বুকের সাথে মিশিয়ে ফেললেন। আমাদের মধ্যকার দূরত্ব একেবারেই নেই। এতোটাই কাছে যে একেবারে অপরের হৃদস্পন্দনটুকু শুনছি। কারটা বেশি স্পন্দিত হচ্ছে জানি না। হয়তো আমার। তিনি আমার গালে, নাকে, গলায় ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বললেন,
 "বাপের বাড়িতে আসার পর থেকে দেখছি পেয়ারার মুখে খই, মুড়ি সব ফুটেছে! বাড়িতে তো চোখ তো তোলার জন্য কাঁপাকাঁপি শুরু হয়!"

পেয়ারা নামটা শুনতেই আমার মেজাজ চটকালো। এমন আবেদনময়ী রাতে স্বামীরা বুঝি পেয়ারা বকে ডাকে? আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। তিনি একবিন্দু সরলেন না। শুধু আমার চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। ফলে আমি কপালে তীব্র ভাঁজ ফেলে অত্যন্ত রাগী স্বরে বললাম,
 "আমার বাড়িতে আপনাকে তোয়াক্কা করবো কেন! আর আমার নাম পেয়ারা না। আপনি আরেকবার আমাকে পেয়ারা বলে ডাকলে কিন্তু খুব খারাপ হবে!"

তিনি গা করলেন না। বরং ঘাড়টা একহাতে নিজের টেনে নিয়ে আমার গলায় মুখ গুঁজলেন। গাঢ় স্বরে বললেন,
"তা কি বলে ডাকবো? ফুল! দেখি তো গন্ধ আছে নাকি?"

বলেই গলায় গন্ধ শুকলেন। অতঃপর বেলাগাম চুমু খেলেন। আমার গা কাঁটা দিলো সেই এলোমেলো গাঢ় স্পর্শে। বুকের ভেতর দামামা বাঁজতে লাগলো। কেমন অসাড় হয়ে গেলাম তার ভারী শরীরের নিচে। ছোট্ট হাতে তাকে আবারও ঠেলতে গেলে তিনি খপ করে এক হাতের বাঁধনে বাঁধলেন আমার দু হাত। শক্ত করে আঁটকে রাখলেন তা। আরেক হাত এখনো আমার ঘাড়ের পেছনে৷ তার উন্মত্ত তান্ডবে আমার শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে গেলো। একটা সময় সাহেব নিজেই তা ফেলে দিলেন মেঝেতে। অপ। অপরিচিত এক অনুভূতিতে আমার মস্তিষ্ক ঝাপসা হয়ে গেলো। আমি বুঝলাম সাহেবকে বাঁধা দেবার কোনো সুযোগ আজ নেই। সাহেব কানের কাছে জোরে একটা কামড় দিয়ে খুব আস্তে বললেন,
 "একটা টকমিষ্টি গন্ধ আছে বটে তবে তাকে ফুল বলা যায় না। অনেকটা পেয়ারার মতো।"

কামড়ের আমার কান জ্বলছে। রাগী চোখে তার দিকে তাকাতেই তিনি বিপরীত প্রগাঢ় চোখে আমার দিকে চাইলেন। সেই গভীর চাহনীতে আমার রাগ গুড়োগুড়ো হয়ে গেলো। আলোআঁধারীর মায়াখেলায় নাকি আমার আমার চোখের বিভ্রম, আমার মনে হলো সাহেবের ঠোঁট হাসছিলো সামান্য! আমি সম্মোহিত হয়ে দেখছিলাম তাকে। তিনি আমার চোখে গভীর চুমু খেলে বললেন,
 "বলেছি না এভাবে না দেখতে!"
"আমার স্বামী আমি দেখবো না তো কি পাশের বাড়ির ভাবি দেখবে?"

কথা শেষ করতে পারলাম না তার পূর্বেই আমার ঠোঁটজোড়া তার পুরু ঠোঁটের আয়ত্ত্বে চলে গেলো। কথাগুলো আর প্রকাশিত হলো না। পুরু ঠোঁটের বেপরোয়া চুমুতে আমি মিয়ে গেলাম। সাহেবের উষ্ণ নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে আমার দেহজুড়ে। তীব্র লজ্জায় আমার দিগ্বিদিকশুণ্য অবস্থা। তার পুরুষালী উষ্ণ চুম্বনগুলো ক্রমশ মাতাল হতে লাগলো। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। সেই সাথে নাক বন্ধ। এবার নাক টানলেও সাহেবের মধ্যে ভ্রুক্ষেপ হলো না। শুধু তীব্র আবেদনময়ী মুহূর্তে তিনি আমার অশ্রুসিক্ত চোখে চুমু এঁকে বললেন,
 "কষ্ট হচ্ছে?"

তার শান্ত চোখে আমি আমাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খার সাথে আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্নতাও অনুভব করলাম। আমি দুহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরলাম। অপরিচিত, অচেনা অনুভূতির জোয়ারে ভাসালাম নিজেকে। নিগূঢ় রাতে ছোট্ট ঘরে আমাদের দাম্পত্য জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সেরাতের পর থেকে সাহেবের রাগগুলো আমাকে ভীত করলো না। কৃপাধারী হুতুমের সাথে আমার সমীকরণটা ভিন্নরুপ নিলো। 

—————

বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় আমি কেঁদেকেটে একসার হলাম। মাও কাঁদলেন আমার সাথে। চোখের পানি নাকের পানি সব এক হলো আমার। সাহেব তীব্র বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তার কঠিন রাগী দৃষ্টিতে আমি বুড়ো আঙ্গুল দেখালাম। আমার হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমার সব কিছু ফেলে আবার অচেনা ঘরে যাবো আমি। আমার বাবা সাহেবের হাতটা ধরে আকুল স্বরে বললেন,
"জামাই, আমার মেয়েটা খুব বাচ্চা। ভুল করলে মনে রেখো না কিছু। শাসন করে, আদর করে শুধরিয়ে নিও। আমার একমাত্র মেয়ে বাবা। আর শেষ সম্বল ও।"

তিনি বাবার হাত ধরে দৃঢ় স্বরে বললেন,
 "আমি তো বেঁচে আছি। চিন্তা করবেন না।"

রিক্সাতে উঠেও আমার কান্না থামলো না। সাহেব কঠিন চোখে আমার দিকে চাইলেন। তার চোখের দৃষ্টি বলছে, এখনই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবেন। কিন্তু তিনি তেমন কিছু করলেন না। বরং মুখখানা অন্যদিকে সরিয়ে বিরক্ত নিয়ে বললেন,
 "যন্ত্রণা, যতসব!"

আমি তার টিপ্পনীকে পাত্তা দিলাম না। বরং তার সুঠাম বাহু জড়িয়ে ধরলাম। মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগলাম। তিনি আমাকে সরিয়ে দিলেন না। আর স্বভাবরুপী খচ্চরামির জন্য জড়িয়েও ধরলেন না। যেন সব আদর শুধু রাতের ভাগেই। দিনের বেলা তিনি কংক্রিটের মানব। 

—————

দেখতে দেখতে আমার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো। সময়ের কাঁটার সাথে দিনগুলো ট্রেনের গতিতে ক্যালেন্ডার থেকে খসে পড়ছিলো। প্রথম পরীক্ষার দিন সাহেব আমাকে নিজে নিয়ে গেলেন। কলেজের গেটে নামিয়ে কঠিন গলায় বললেন,
 "পরীক্ষা শেষ হলেই বাড়ি যাওয়া যেন হয়। আমি খোঁজ নিব। যদি শুনি ঘুরঘুর করা হয়েছে তো পেয়ারা থেকে পেয়ারা মাখা হতে সময় লাগবে না।"

আমি মাথা দোলালাম। এই পাগলকে কিভাবে বুঝাই আমার কোনো ঘুরঘুর করার যায়গা নেই। অহেতুক চিন্তা করে। তিনি চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ফিরে চাইলেন। আমার হাতটা টেনে ধরলেন। অনামিকা আঙ্গুলের দিকে কিছুসময় তাকিয়ে কড়া স্বরে আদেশ করলেন,
 "কোনো ছেলে যদি আজেবাজে প্রস্তাব দেয় তাহলে কৃপা করে আঙ্গুলটা দেখিয়ে দিলে ভালো হয়।"

আমার অনামিকা আঙ্গুলে তখন জ্বলজ্বল করছিলো সোনার আংটি। এই আংটিটা তিনি বাবার বাসা থেকে আসার পর কিনে দিয়েছিলেন। ভাববেন না সাহেব আংটিটা নিজ হাতে পড়িয়ে দিয়েছেন। গল্পটা এমন ছিলো, যে বাড়ি থেকে ফেরার পরদিন অফিস থেকে ফিরে এসেই তিনি আমাকে আদেশ করলেন,
 "এক কাপ নিয়ে ঘরে আসলে ভালো হয়!"

আমি ব্যাগ নেবার জন্য হাত বাড়াতেই তিনি বাঁধা দিলেন। কড়া স্বরে বললেন,
 "আহ! ঘরে আসা চাই দ্রুত!"

বলেই বড় বড় পা ফেলে চলে গিয়েছিলেন। আমি সময় নষ্ট না করে দ্রুত তার জন্য চা বানালাম। বলে রাখি আমার সাহেবের চা বিশেষ চা। বেশি দুধের কড়া চা। তাতে চিনির বদলে দিতে হয় এক চিমটি লবন। শুধু শুধুই কি তিনি এতো নোনতা! যেমন হুতুম লবাসবা, তার খাবারও তেমন লবাসবা। আমি তার পছন্দমত চা নিয়ে হাজির হলাম। তিনি ফুল পিডে ফ্যান ছেড়ে বসে ছিলেন খাটের উপর। প্রচন্ড ক্লান্ত দেখালো তাকে। গলার টাইটা ঢিলে হলে ঝুলছে। ঘামে শার্টটা একেবারে গায়ের সাথে লেগে গেছে। আমি চায়ের কাপ আগাতেই তিনি পকেট থেকে একটা কৌটা বের করে খাটের উপর রাখলেন। তারপর আমার হাত থেকে চাটা নিয়ে চুমুক দিলেন। একটা আত্মতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকালেন। আমি তখন কৌটার দিকে হাপুস নয়নে চেয়ে আছি। তিনি নিরুত্তাপ ভারী স্বরে বললেন,
 "পছন্দ হোক বা না হোক আঙ্গুলে যেন সারাজীবন থাকে।"

আমি কৌটা খুলতেই দেখলাম তাতে একটি সোনার আংটি। খুব সাধারণ একটা আংটি। কোনো কারুকাজ নেই তাতে। তবে খুব মনোযোগ দিলে দেখা যায় তার ভেতরে দুটো অক্ষর লেখা "M" "K"। আমাদের নামের প্রথম অক্ষর খোদাই করা। কিন্তু তাও খুব আঁড়ালে। আংটিটা আমার খুব পছন্দ হলো। কিন্তু হতাশ হলাম, ইশ! কি হত যদি তিনি নিজ হাতে পরিয়ে দিতেন! হয়তো নিজ হাতে পরালে তার অহংকারের পাঁচিলে ফাঁটল ধরতো! তবে তখন না বুঝলেও আমার আর সন্দেহ রইলো না যে তিনি এই আংটির মাধ্যমে একেবারে আমার উপর নিজের সিলমোহর মেরে দিয়েছেন। তাই তো কলেজের গেটে আদেশ করেছেন যেন সবাইকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেই। আমি মিটিমিটি হাসলাম৷ তারপর তাকে খেঁপিয়ে দিয়ে বললাম,
"একেবারে কপালে খোঁদাই করে দিলেই তো পারেন। তাহলে আর হাত উঁচাতে হবে না!"

তিনি আমার কথায় আমার দিকে সরু দৃষ্টিতে চাইলেন। কপালে তীব্র ভাঁজ। সাহেবের ধাঁরালো সেই দৃষ্টির মর্মার্থ বুঝতে পেরেই আমি তাড়াহুড়ো করে বললাম,
"দেরি হচ্ছে, গেলাম।"

বলেই ছুট লাগালাম। দাঁড়িয়ে থাকলে আর পরীক্ষা দেওয়া লাগবে না। সাহেব তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাকে বধ করতেন। 

আমার মাঝের এই পরিবর্তন দেখে আমি নিজেও মাখে মাঝে অবাক হতাম। যে আমি কি না এই বদরাগী সাহেবের ভয়ে তটস্থ থাকতাম সেই আমি এখন তার সাথে ফাজলামি করি, মুখে মুখে কথা বলি, তাকে খোঁচা মারি। সেই সাথে ধীরে ধীরে আমার পছন্দ অপছন্দগুলোও বলি। তিনি মাঝে মাঝে রাগী চোখে তাকান, মাঝে মাঝে ধমকও দেন আবার অপ্রকাশিত ভাবে আমার পছন্দের মূল্য দেন। তিনি ধমকালেও ধীরে ধীরে আমার আর ভয় লাগতো না। সাহেবের প্রতি ভয়টা কোথাও যেন হাওয়া হয়ে গেছে। ফানুসের মতো। বরং তাকে একটু একটু করে আমার তাকে ভালো লাগতে শুরু হল। তিনি অফিস থেকে আসার পর থেকে আমি কারণে অকারণে তার সামনে ঘুরঘুর করতাম। মাঝে মাঝে চা বানিয়ে সামনে বসতাম যেন গল্প করতে পারি। মাঝে মাঝে গল্প হত, মাঝে মাঝে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতাম। তিনি কখনো কখনো ভ্রু নাঁচিয়ে শুধান,
 "কি?"

আমি তখন নির্লজ্জভাবে আমার কথাগুলো তাকে বলতাম। তিনি শুনতেন। কখনো বকতেন, কখনো বলতেন, "যন্ত্রণা, যতসব!" আবার কখনো নীরব শ্রোতা হতেন। তবে তার কথাগুলো শোনা হয় না। আমি যদি তাকে শুধাই,
 "আজ কি হয়েছে?"

সাহেব ভ্রু কুঁচকে এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলতেন,
 "প্রেসিডেন্ট বুশ এসেছিলো। বলেছেন, "আপনার বউ পেয়ারার মাথায় পোঁকা ধরেছে, একটু পরিষ্কার করুন!"। যতসব"

তখন খুব আফসোস হতো! সাহেবের কি আমাকে বলার মতো কিছুই নেই। নাকি তার মনের কথা শোনার যোগ্যতা আমার নেই। মাঝে মাঝে বয়সের এই বিস্তার পার্থক্যটাকে দোষাতে ইচ্ছে করতো। হয়তো সেই পার্তক্যটার জন্যই সাহেব তার মনের কথাগুলো বলত পারতেন না৷ সমবয়সী হলে হয়তো খুব সুন্দর ভাবে তার মনটা পড়তে পারতাম। 

—————

ঘর সামলানো আর পড়াশোনা করা যে কতটা কঠিন আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। এক দিকে আমার টেস্ট পরীক্ষা, অন্যদিকে ঘর। প্রতিদিন দুপুরের রান্নাটা মিষ্টি আপু করতেন। কিন্তু রাতের খাবারের সময় আমি এবং সে একসাথে রান্না করতাম। সাহেবের একেবারেই ঠান্ডা খাবার পছন্দ ছিলো না। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যার পর খাবার রান্না করতে হত। আমি তখন টুকটাক রান্না শিখেছিলাম। কিন্তু হয় নুন দিতে ভুলে যেতাম নয় কাঁচামরিচ। মিষ্টি আপু আমাকে ধীরে ধীরে শুধরে দিতেন। প্রথম যখন সাহেব আমার রান্না খেয়েছিলেন তিনি হতাশ গলায় বলেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে রাধুনীর পুরষ্কারটা যেন আমাকে দেওয়া হয়। অথচ আমার পুরো রান্নাটা তিনি গোগ্রাসে গিলেছেন। শ্বাশুড়ি মা তাকে খোঁচা মেরে বলেছিলেন,
"তা খাচ্ছিস কেন?"
 "এখন কেউ রান্নায় কলাগাছ হলে কি আমি উপোস দিব? খাবার গুলো তো আমার ই পরিশ্রমের টাকায়। নষ্ট হবে না!"

শ্বাশুড়ি মা আর ঘাটালেন না। আমার রান্না আর এখন আগের মতো নেই, যে খায় সেই প্রশংসা করে। কিন্তু আমার সাহেবের প্রশংসা এখনো পাই নি। তবে একটা বিষয় বেশ বুঝি, তিনি আমার রান্না ছাড়া খেতে পারেন না। যতটা তৃপ্তির সাথে তিনি বাড়িতে খান, সেই তৃপ্তি আমি অন্য কোথাও খাওয়ার জন্য দেখি না। রেস্টুরেন্টে দামী খাবার খেয়ে এলেও তিনি ঘুমানোর আগে বলবেন,
"কৃপা করে একটু ভাত ভাঁজি করে দিলে খেয়ে ঘুমাতে পারতাম।"

নাটক বললেই হয়,
 "কানন আমার তোমার রান্না ছাড়া পেট ভরে না!"

এখন ভাবলেই হাসি পায়। সেই সময় ঘরের সব কাজ করে রাতে পড়তে আমার খুব কষ্ট হত। পরীক্ষা দিয়ে ঘর সামলানো আমার কাছে একটা বিভীষিকা। শুধু বাবার বাড়ির কথা মনে পড়তো। নিজের বাড়িতে আমার খাওয়ার চিন্তা করতে হত না। আমি পড়তাম, মা এসে আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন। রাতে আমাকে চা করে দিতেন। শ্বশুরবাড়িতে সেই ছাড় নেই। রাতে পড়ার টেবিলে আমি ঘুমে ঢুলে পড়তাম। আমার সাহেব একটু পর পর আমার মাথায় টোকা দিতেন। আমি যতক্ষণ জাগতাম তার কাজ ছিলো আমার সামনে খাইস্টা বাসার স্যারদের মতো বসে থাকা আর আমার মাথায় টোকা দেওয়া। কখনো কখনো আদেশ করতেন,
 "চা খাব। কৃপা করে চা বানিয়ে আনলে ভালো হয়।"
"এখন?"

আমি হাই তুলতে তুলতে শুধাতাম। তিনি কঠিন চোখে তাকিয়ে বলতেন,
"ঘুম ফেলে রাত জাগছি, চা খেলে আমার আরাম লাগবে! অহেতুক প্রশ্ন করে অলসের মতো বসে থাকা আমার অপছন্দ। কৃপা করে উঠে চা বানালে ভালো হয়!"

যেন আমি মাথার দিব্যি দিয়েছি রাত জাগতে! অসহ্য লোক! দয়ামায়াহীন কংক্রিট। আমি রেগে মেগে টেবিল ছাড়তাম। অনীহা নিয়ে চা বানাতাম। এক কাপ তার জন্য আর এক কাপ আমার জন্য। চা বানানোর তালে আমার ঘুম কেটে যেতো। চা খেয়ে আবার পড়তে বসতাম। এভাবেই টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো। আশ্চর্যজনক হলেও আমি খুব ভালোভাবেই পাশ করলাম। যখন খুশি মনে সেই রেজাল্ট শুনালাম সাহেবকে। তিনি আমার খুশি মোটেই পাত্তা না দিয়ে বললেন,
 "অংকে তো একেবারেই কলাগাছের মতো অবস্থা! আমার বাচ্চাকাচ্চারা তো অংকে ফেল করবে এক একটা। কালকে থেকে কোচিং এ ভর্তি করে দেওয়া হবে। তিন মাসে যদি একটু শুধরায়!"

হায়ারম্যাথ আমার কঠিন লাগে তাই একটু খারাপ হয়েছিলো কিন্তু বাকিগুলোয় তো ভালো করেছি! তার প্রশংসা করা যায় না! কৃপাধারী হুতুম একটা! যন্ত্রণা যতসব। 

—————

অংক কোচিং এ যেতাম বিকালে। কলেজ থেকে এসে খেয়ে, সব গুছিয়ে আমি বের হতাম পড়তে। একটা রিক্সা ঠিক করা ছিলো। ওই সময়ে সাহেব থাকতেন অফিসে। আমি একা একা কোথাও যাব তার অপছন্দ। এক দিন ফেরার পথে দেখলাম আমার দেবর মাহমুদ আর তার "আয় আয়" সংঘ পুরানো মন্দিরের কোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। মাহমুদের সিগারেট খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। সাহেব নিজে সিগারেট খেলেও আমার বিয়ের পর থেকে তিনি ঘরে সিগারেট খেতেন না। আমি অপছন্দ করি বিষয়টা যেন আঁচ করেছিলেন। ফলে ঘরে সিগারেট খাওয়ায় একটা অমীমাংসিত নিষেধাজ্ঞা ছিলো। মাহমুদের সাথে আমার চোখাচোখি হতেই সে একটু অস্বস্তিবোধ করলো। দ্রুত সিগারেট ফেলে পায়ে পিষে ফেললো। আমি তখন রিক্সায় ছিলাম। আমার রিক্সা পার তাকে পার হতেই দেখলাম তার সংকুচিত মুখখানা। 

মাহমুদের এই সময় ফিজিক্স কোচিং। এটা বলেই সে গত মাসে হাজার টাকা নিয়েছে সাহেবের কাছে। অচ সে কোচিং এ যায় নি। সে টো টো করে ঘুরছে আর সিগারেট টানছে। সেই ঘটনার সাক্ষী আমি। সেদিন খুব দ্রুত বাড়ি এলো সে। আমি তখন মিষ্টি আপুর ঘরে আড্ডা দিচ্ছিলাম। মাহমুদ ঘরে উঁকি দিতেই মিষ্টি আপু বললেন,
 "কিরে চোরের মতো উঁকি দিচ্ছিস কেন?"

মাহমুদ মিথ্যে বলায় সেরা। সে সুন্দর বললো,
 "ভাবীর কাছে এলাম, একটা বই লাগতো। ভাবী একটু বইটা দাও।"

মাহমুদ আমার থেকে এক বছর ছোট। আমরা একই কলেজে পড়ি। তাই মিষ্টি আপু সন্দেহ করলেন না। আমি বের হতেই মাহমুদ আঁকুতি করে বললো,
 "ভাবী ভাইকে বলো না কিছু। আমি আজকেই শুধু কোচিং ফাঁকি দিয়েছি।"

ডাহা মিথ্যে! আমার ধারণা মাহমুদ কখনো কোচিং এ যায় না। সে টাকা নিয়ে ক্রিকেট ব্যাট কিনে। তার পড়াশোনা ভালো লাগে না। তবে মিথ্যে বলে টাকা নেওয়া, বন্ধুদের সাথে টো টো করা বিষয়টা ভালো নয়। সাহেব দিনরাত পরিশ্রম করেন শুধু আমাদের ভালো রাখার জন্য। আমাকে না বললেও আমি জানি তিনি পারতে রিক্সা চড়েন না। প্রতিদিন বাসে চড়ে অফিস যান। টাকা বাঁচান। যেন আমরা চারটে প্রাণী আরামে থাকি। আমি বিয়ের পর থেকে সাহেবকে নিজের জন্য কিছু কিনতেও দেখি নি। অথচ আমাদের কিছু লাগলে তিনি কার্পণ্য করেন না। তাই সেই মানুষটিকে আমার ঠকাতে মন মানলো না। আমি কঠিন স্বরে বললাম,
 "আমি তাকে মিথ্যে বলতে পারি না।"
 "মিথ্যে বলার কি দরকার, তুমি বলবেই না। আমি কথা দিচ্ছি আমি আর এমন করবো না। ভাইকে তুমি চিনো না। আমার চামড়া তুলে লবন লাগিয়ে শুটকি মাছ করে দিবে। এবারের জন্য তুমি সামলে নাও প্লিজ।"
 "তুমি উনাকে ঠকাচ্ছো কেন? উনি জানতে পেলে কষ্ট পাবেন। আর আমি জেনেও তাকে জানাই নি জানলে আরোও রাগ করবেন।"
"বললাম তো এই শেষ বার। প্লিজ ভাবী। আমাকে ভাই মেরে ফেলবে। ভাইয়ের রাগ তুমি দেখো নি!"

মাহমুদের কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না। কৃপাধারী হুতুম রাগী কিন্তু সেই রাগের সীমা আমার জানা ছিলো না। তবুও মাহমুদের ভীত, সন্ত্রস্ত মুখ দেখে বাধ্য হয়েই বিষয়টা চেপে গেলাম। সতর্ক করলাম, "এই যেন শেষ হয়!"

কিন্তু আমি চাঁপিয়ে রাখলেও বিষয়টা চাঁপা রইলো না। একদিন ছয়টার দিকে ঘরে চলে এলেন সাহেব। মাহমুদ তখনও ফিরে নি। তিনি কারোর সাথে কথা বললেন না। বসার ঘরে থমথমে মুখে বসে রইলেন। আমার হাত পা কেমন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিলো। অশুভ একটা ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম। মাহমুদ ফিরলো আযানের সময়। সাহেবকে দেখেই সে ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সাহেব ঠান্ডা গলায় শুধালেন,
 "কোচিং কেমন চলে? ফিজিক্স স্যার ভালো করে পড়াচ্ছে তো?"

মাহমুদের মিথ্যের জোর সেদিন দূর্বল হয়ে গেলো। সাহেবের ঠান্ডা গলায় তার অবস্থা বেগতিক। পৃষ্ঠার মতো সাদা মুখে আমতা আমতা করে বললো,
 "ভালো"
"ব্যাগটা দেখি। উনার খাতাপত্র দেখবো।"

মাহমুদের অবস্থা আরোও চুপসে গেলো। সাহেব তার ভয়ে জড়ো হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকালো না। তিনি ছো মেরে ব্যাগটা নিলো। ব্যাগে কোনো বই খাতা নেই। পাওয়া গেলো সিগারেট আর গাঁজার একটা পুটলি। সাহেব আরোও হিম শীতল গলায় বললেন,
 "কোচিং এর নামে তাহলে এটা হচ্ছে তোর ফিজিক্স পড়া!"

মা হয়তো আন্দাজ করলেন নিজের ছেলের রাগ। তিনি বুঝালেন,
 "ছোট মানুষ ভুল করে ফেলেছে!"
 "ছোট মানুষ! আমার থেকে মিথ্যে বলে কোচিং এর নামে টাকা নিয়ে গাঁজা কেনা ছোটমানুষী ভুল!"

সাহেবের রুদ্রকণ্ঠে বাড়ি কেঁপে উঠলো। মাহমুদের অবস্থা একেবারে পাটকাঠির মতো হলো। সাহেব কঠিন স্বরে বললেন,
 "আজ থেকে ওর পড়াশোনা বন্ধ। আমি একটা টাকা দিব না। তোমার ছেলে রাস্তায় ভিক্ষে করবে নাকি রিক্সা চালাবে আমি সেই দায় নিব না। লায় দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছি। এবার মাথা থেকে নামাবো৷"

সাহেব যা বলেন তাই বেদবাক্য। ফলে সাহেবের কঠিন শাস্তিতে মাহমুদ তার পায়ে ধরলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো,
 "ভাইয়া আর হবে না। ক্ষমা করে দাও!"

মাও বুঝাতে লাগলেন। মাহমুদকে এখন বেশি কড়াকড়ি করলে সে আরোও খারাপ হবে বলে তার ধারণা। কিন্তু সাহেব অনড়। একটা সময় মাহমুদ ক্লান্ত হয়ে গেলো। তখন তার রাগ প্রকাশ পেলো আমার উপর। তার ধারণা হলো আমি সাহেবকে বলেছি। শে চিৎকার করে উঠলো,
"শান্তি হয়েছে! এই সব তোমার পরিকল্পনা। ইচ্ছে করে এমন করেছো, তাই না? নিজে তো ঠিক পড়াশোনা করছো! আমারটা বন্ধ করে দেওয়ার ধান্দা। তুমি ইচ্ছে করে ভাইকে বলেছো শয়তান মেয়ে!"

অথচ আমি কিছুই বলি নি। আমি তব্দা খেয়ে গেলাম। মাহমুদ আরোও অকথ্য কথা বলতে শুরুই করেছিলো অমনি শক্ত হাতের প্রকান্ড চড় তার গালে বসিয়ে দিলেন সাহেব। সেই চড়ে ঘর কেঁপে উঠলো। মাহমুদ টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো। তার ঠোঁট দাঁতে লেগে কেটে টপটপ করে রক্ত বের হতে লাগলো। রক্তে তার নীল গেঞ্জি ভিজে গেলো। মা অবিশ্বাস্য চোখে তাকালেন সাহেবের দিকে। আমিও ভীত চোখে সাহেবের দিকে তাকালাম। তিনি কাঁপছেন রাগে। তাকে ভয়ংকর দেখাচ্ছিলো। তার চোখের দিকে তাকাতেই আমি ভয়ে সংকুচিত হয়ে গেলাম। যে ভয়টা এতোদিন হারিয়ে গিয়েছিলো, কোথা থেকে এসে আবার ঘাটি জমালো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp