ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ১০ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          সজলের চিৎকার শুনে সিনথিয়া একবার পিছনে তাকিয়ে আবার হাঁটা শুরু করল। ওর চোখ থেকে অনর্গল জল ঝরছে। ও কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসে সজলকে কোলে তুলে নিল। ও শত খারাপ হলেও একটা বাচ্চাকে এমন অনিশ্চয়তায় মধ্যে রেখে যেতে পারবে না। সজলকে কোলে নিয়ে চুমু খেয়ে বলল,
'বাবা, কেউ না জানুক তুমি তো জানো আমি তোমায় কত ভালোবাসি! আজ তোমায় কষ্ট দিলাম বলে মাফ করে দিও। কিন্তু আমি নিরুপায়। তোমার খালামনি খারাপ, স্বার্থপর কিন্তু তোমায় অনেক ভালোবাসে।'

সিনথিয়া সজলকে কোলে নিয়ে দরজা খুলল। সীমা হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে দেখল সিনথিয়ার কোলে সজল। সীমা ভয়ে ভয়ে বলল,
'ওর কোনো ক্ষতি করিস না।'

সিনথিয়া ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
'ও তোর একার ছেলে না আমারও ছেলে। তুই ওকে একা কেবল ভালোবাসিস না। আমিও ওকে ভালোবাসি।'

সিনথিয়া সজলকে সীমার কোলে দিয়ে বলল,
'খেয়াল রাখিস ওর। আমি আমার পথে চললাম। বেঁচে থাকলে দেখা হবে।'

সিনথিয়া চলে গেল। সীমা ক্রন্দনরত সজলকে থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সিনথিয়ার যাওয়া নিয়ে আর ঘাটাল না। যেন সিনথিয়া ওর মন থেকে উঠে গেছে।

—————

বাড়ি থেকে বের হয়ে সিনথিয়া কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে ওর বান্ধবী হেনাকে কল করল,
'হেনা।'
বিরক্তি কণ্ঠে হেনা বলল,
'বল।'
সিনথিয়া অনেকটা আদেশের সুরে বলল,
'আমি তোর বাড়ি গিয়ে কদিন থাকব।'
'কেন?'
'বাড়ি এসে বলছি।'

হেনা কীভাবে ওকে এড়িয়ে যাবে ভেবে পেল না! কীভাবে নিষেধ করবে চিন্তা করতে লাগল। তবে হেনা কিছু বলার আগেই সিনথিয়া বলল,
'আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।'
'কেন?'
'ফোনে বলতে পারব না। বাড়ি এসে বলছি।'
'আচ্ছা আয়।'

হেনা ভেবেছিল ওকে না করবে, কিন্তু সিনথিয়াকে ওর বাড়ি থেকে কেন বের করে দিয়েছে তা জানার জন্যও ওকে একদিন বাড়িতে থাকতে দিবে। তারপর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে হারামজাদীকে। হেনাও তো ওর থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগে আছে। সে কারণেই তো কথার হেল্প করেছে। কথা যা বলেছে করেছে। কথার থেকে কিছু টাকা নিলেও ওর মূল উদ্দেশ্য ছিল সিনথিয়ার সর্বনাশ।

সিনথিয়াকে আসতে বলে হেনা ওর বড়ো ভাই হাসানের রুমে গেল। হাসান তখন ঘুমে বিভোর। হেনা তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
'ভাইয়া তুই কবে সুস্থ হবি? সিনথিয়া তোর জীবনটা নষ্ট করে দিলো। আমি ওকে কী শাস্তি দিব জানি না, কিন্তু তোকে সুস্থ করবই। কথা বলেছে তোকে রিহ্যাবে পাঠিয়ে সুস্থ করার সকল দায়িত্ব ওর। তুই সুস্থ হলে আমাদের পরিবার আবার ভালো থাকবে। তুই দ্রুত সুস্থ হ ভাই।'

ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কত সময় চলে গেল জানে না হেনা। হাসান ওদের একমাত্র ভাই। ওর বাবা প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। ওদের তিন ভাইবোনকে যথেষ্ট আদর্শ মেনে বড়ো করেছিন তিনি। হাসানকে নিয়ে পুরো পরিবার স্বপ্ন দেখত। হাসান লেখাপড়ায় চমৎকার ছিল। গ্রাজুয়েশন শেষ করে মোটামুটি একটা চাকরি পেয়েছিল। পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ হলে আরও ভালো চাকরি পেত। কাজ করেও বিসিএস এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেক পরিশ্রমী ছেলে ও। ও যখন চাকরি করা শুরু করল তখন থেকে ওদের পরিবারে অভাব ছিল না।

তারপর হাসানের জীবনে একদিন সিনথিয়া আসল আর সব ওলট পালট করে দিল। সিনথিয়া হাসানের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ওর কাছে অনেক ডিমান্ড করত। পরিবার সামলে হাসানের পক্ষে সে চাহিদা পূরন করা সবসময় সম্ভব হতো না। তাও হাসান চেষ্টা করত। কারণ ও সিনথিয়াকে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসতো। কিন্তু সিনথিয়া তো সুযোগ সন্ধানী মেয়ে। যখন দেখল হাসান ওর উচ্চাকাঙ্খা পূরণ করতে পারছে না, তখন হাসানের সাথে খুবই বাজে ব্যবহার করে ওকে ছেড়ে দেয়।

তারপরও হাসান অনেক চেষ্টা করেছিল সিনথিয়াকে ফেরানোর তবে সিনথিয়া তখন ইরফানের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তারপরই হাসান নেশায় জড়িয়ে পড়ে। নেশার ঘোরে নিজের দুঃখ ভুলতে চাইতো। দুঃখ ভুলতে পেরেছে কি না জানে না ও, কিন্তু বিপথে চলে গিয়েছে। নেশায় ডুবে থাকার কারণে জব চলে গেছে। পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। 

হাসানের চাকরি যাওয়ার কারণে ওদের পরিবার চালাতে এখন বেশ ভালোই কষ্ট হয়। হেনার বাবা হাফিজ উদ্দিন আর কয়টাকা বেতন পায়! হাসান ক্লাস এইট থেকে বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়িয়ে ওর বাবাকে হেল্প করত। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে কোচিং এবং প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে বেশ ভালো পরিমাণের টাকা বাবাকে দিত। যাতে সংসার বেশ স্বচ্ছলভাবে চলতো। কিন্তু এখন খুবই টানাটানি চলে ওদের সংসারে। পরের বছর হাফিজ উদ্দিন অবসর নিবেন তখন সংসার কীভাবে চলবে সে চিন্তায় তিনি ঘুমাতে পারেন না। 

হেনা, হেমার বিয়ে দিতে হবে। কী দিয়ে কী করবেন ভেবে পান না! ছেলেটা সুস্থ থাকলে তার এত চিন্তা করতে হতো না। তার ছেলের এই অবস্থার জন্য যে দায়ী তাকে তিনি প্রতিনিত অভিশাপ দেন। সিনথিয়াকে এ ঘরের প্রতিটি মানুষ অভিশাপ দেয়। পারলে খুণ করে ফেলে এমন ঘৃণা করে ওকে। 

হেনা ওর সাথে বন্ধুত্ব রেখেছে এ কারণে যাতে সুযোগ বুঝে সিনথিয়াকে একটা শিক্ষা দিতে পারে। 

হেনা রুম বের হয়ে দেখল হেমা ওর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হেমা বলল,
'সিনথিয়া এখানে কেন?'
'এসেছে?'
'হ্যাঁ। ড্রয়িং রুমে বসে আছে। তুই ওকে এখানে আসতে বলেছিস কেন?'
'ওর খুব বিপদ।'
'তো আমরা কী করব?'

হেনা রহস্যময় হেসে বলল,
'আমরা ওর বিপদকে আর একটু বাড়িয়ে দিব।'
'বুঝলাম না।'
এবারও বাঁকা হেসে হেনা বলল,
'আজ ওর জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন যাবে।'
'আমাকে ঘন্টাখানিক সময় দে।'

হেমা বিরক্ত হয়ে চলে গেল। হেনা সিনথিয়াকে রুমে নিয়ে আসল। রুমে এনে বিস্তারিত শুনল। সব শুনে হেনা কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলল 
'যেমন কর্ম তেমন ফল। তোর সাথে এমন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না।'

সিনথিয়া অবাক হয়ে বলল,
'এসব কী বলিস?'
'ভুল কিছু বললাম কী? এত পাপ করেছিস তার শাস্তি কি পাবি না?'
'মানে...!'
'ন্যাকামি করিস না। মানে যেন তুই জানিস না। এত বেশ্যামি আর বেহায়াপানা করলে তুই কী ভাবিস শাস্তি তোর হবে না?'

বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে সিনথিয়া বলল,
'কে শাস্তি দিবে আমায়?'
'আল্লাহ দিবে শাস্তি। সাথে যাদের সাথে অন্যায় করেছি তারা দিবে।'
সিনথিয়া বেশ রুষ্ট কণ্ঠে বলল,
'আমাকে শাস্তি দেওয়ার মুরোদ কারও নেই।'

কথাটা বলার সাথে সাথে হেনা কষে সিনথিয়ার গালে পর পর কয়েকটা চড় মারল। সিনথিয়া ধাতস্থ হওয়ার আগে আরও কয়েকটা চড় মারল। হতভম্ব বিস্মিত সিনথিয়া হেনার পানে তাকিয়ে রইল। হেনা বলল,
'তোকে আমাদের শাস্তি দেওয়া বাকি। আজ যদি তোকে এখানে মেরে ফেলি কেউ জানবে তোর কথা?

সিনথিয়া বেশ ভীত হলো। সত্যি তো ও এখানে এসেছে কেউ জানে না। ওরা মেরে ফেললে কেউ জানবে না। ভীত সিনথিয়া চারপাশে তাকাতে লাগল। ওর ভয় আরও বাড়তে হেনা বেশ ভয়ংকর ভঙ্গিতে হেসে বলল,
'আমাদের পরিবারটা ধ্বংসের অন্যতম কারণ তুই। আমার ভাইয়ার জীবন নষ্ট করেছিস। তোকে এত সহজে ছেড়ে দিব ভেবেছিস? ভাইয়ার ঐ অবস্থার পরও আমি তোর সাথে কেন ছিলাম জানিস? জাস্ট একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। তোকে শায়েস্তা করার। তোকে আঘাত করার একটা সুযোগ।'

সিনথিয়া ভীত তবুও রাগে গজগজ করতে বলল,
'তুই আমার কিছু করতে পারবি না।'
হেনা হেসে সিনথিয়ার গালে আরও কয়েকটা চড় বসাল। হতভম্ব ভান কাটিয়ে ওঠার আগেই পেটে একটা লাথি বসাল হেনা। ব্যথায় কুকরে গেল সিনথিয়া। হেনা ওর চুলের মুঠি ধরে পাশের দেয়ালে মাথায় ঠুকে আঘাত করল। সিনথিয়ার মাথা তখন ভনভন করছে। হেনা বলল,
'নিজের এই সুন্দর চেহারা দিয়ে বহু পুরুষের জীবন নষ্ট করেছিস। আজ তোর চেহারাই আমি নষ্ট করে দিব।'

হেনা কিছু করার আগেই সিনথিয়া ওকে ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। আর দ্রুত মূল দরজা খুলে ওদের বাড়ি থেকে চলে গেল। ওর ব্যাগ, মোবাইল, যাবতীয় যা জিনিস সাথে এনেছিল সব হেনাদের বাড়িই রেখে আসল। সেসব খেয়াল না করে ছুটতে লাগল প্রাণপণে।

রাস্তার লোক তাকিয়ে দেখছে এই ভর দুপুরে অতি সুন্দরী এক রমনী রাস্তা দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটছে। অনেকটা পথ ছোটার পর যখন বুঝল হেনা ওকে অনুসরণ করছে না তখন থেমে হাঁপাতে লাগল। 

গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গিয়েছে। পানি খাওয়া দরকার। পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে ঢুকে পানি খেল। তারপর কিছুদূর এসে রাস্তায় বসে কাঁদতে লাগল। সব লোক তাদের আসল রঙ দেখাচ্ছে। কাউকে ছাড়বে না সিনথিয়া। সবাইকে দেখে নিবে। আগে নিজে একটু গুছিয়ে নিক। তারপর সবাইকে তার প্রাপ্য শাস্তি বুঝিয়ে দিবে।

এখন ভাবনা, কোথায় যাবে? হাতে না আছে টাকা না আছে ফোন। টাকা আর ফোন ছাড়া এখন কীভাবে চলবে?

সিনথিয়ার মনে পড়ল নিহাদের কথা। নিহাদের কাছে তো যেতে পারে। নিহাদ নিশ্চয়ই ওকে ফেলে দিবে না।

সিনথিয়া হেঁটে হেঁটে ভার্সিটির দিকে রওনা হলো। আজ এ সময় নিহাদের ক্লাস আছে। ভার্সিটি এখান থেকে তেমন দূরে না।

সিনথিয়া একটা রেস্টুরেন্টের ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে একটু পরিপাটি করল। মুখ ধুয়ে চুলটা ঠিক করল। আয়নার নিজের চেহারা দেখে খানিক চমকালো দুই গালেই চড়ের দাগ। ঠোঁটও হালকা কেটে গেছে। পানি লাগায় সেখানটা জ্বলছে খুব। দাগ লুকাতে সিল্কি চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে গালের দুইপাশে খানিক টেনে দিল। এখন দাগটা বোঝা যাচ্ছে না তেমন।

আধাঘন্টার মতো লাগল ভার্সিটিতে পৌঁছাতে। বেশ হাঁপিয়ে গেল ও। গতকাল রাতের পর তো আর কিছুই খায়নি। শরীরটাও কাঁপছে। 

ভার্সিটিতে নিহাদকে না পেয়ে হতাশ হলো খুব। তবে এখানে পরিচিত বন্ধুদের অভাব নেই। তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা ধার নিয়ে নিহাদের বাড়ির উদ্দেশ্য বের হলো। ভাবল হয় আজ নিহাদ ওকে আপন করবে নয়তো নিহাদের সংসার ভাঙবে।

সিনথিয়ার বাড়ি পর্যন্ত যেতে হলো না। ভার্সিটির গেটেই দেখা হলো নিহাদের সাথে। নিহাদকে দেখে লাজুক হাসার চেষ্টা করল। নিহাদ,তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চলে যেতে থাকলে সিনথিয়া ওকে ডাকল,
'স্যার...!'

নিহাদ দাঁড়িয়ে ওর দিকে ঘুরে বলল,
'বলো...!'
'কিছু কথা ছিল।'
'জলদি বলো আমার সময় নেই।'
'আমাকে বিয়ে করবেন কবে?'
'তোমাকে বিয়ে করার কথা ছিল না কি?'
'না মানে। কথার সাথে আপনার তো ছাড়াছাড়ি হবে।'
'হচ্ছে নাকি? কে বলল? এই তো সকালে একসাথে নাস্তা করে হেসে খেলে আসলাম। তাহলে...! তোমায় কে বলল আমাদের ছাড়াছাড়ি হবে?'

সিনথিয়া কী বলবে ভেবে পেল না। কাল থেকে এত ধাক্কা খাচ্ছে যে কথা যেন সব কোথায় হারিয়ে গেছে। বলল,
'আমার সাথে যে সেদিন...!'

নিহাদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
'সেদিনের সব তুমিই ভালো জানো। তোমার পরিকল্পনায় ছোট্ট ভুল ছিল। তুমি কথাকে চিনতে পারোনি। ও ভেঙে যাবে তা-ও মচকাবে না। আর জীবন থাকতে আমায় ছাড়বে না। ও ছাড়লেও আমি ওকে ছাড়ব না।যতদিন নিঃশ্বাস চলবে কথাই আমি কথারই থাকব। কথাকে হারানোর ভয়টাই আমাকে দিয়ে একটা জঘন্য অন্যায় করিয়েছে। তার জন্য আমি যে কোনো শাস্তি ভোগ করতে প্রস্তুত৷ আর তুমি যদি জীবিত থাকতে চাও তাহলে আর কখনো আমার চোখে সামনে পড়ো না। এরপর যেদিন তুমি আমার সাথে কথা বলতে আসবে আমি তোমায় খুন করবো মনে রেখো।'

সিনথিয়া তাও নির্লজ্জের মতো শান্ত কণ্ঠে বলল,
'আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমার একটা থাকার ব্যবস্থা করে দিন।'
'তুমি ব্রথেলে যাও। ওটাই তোমার থাকার সঠিক জায়গা।'

এত কথা শোনার পর কোনো মানুষের মুখ থেকে কথা বের হয় না। কিন্তু সিনথিয়ার বের হলো। ও বলল,
'জবা চৌধুরীকে আপনি আমাদের বাসায় পাঠিয়েছিলেন?'
'কে জবা চৌধুরী?'
'আপনি জবা চৌধুরীকে চিনেন না?'
'না।'
'তার হ্যাজবেন্ড ইরফান চৌধুরীকে চিনেন?'
নিহাদ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
'ইরফান চৌধুরী? জয়নুল আবেদিনের জামাই?'
'জি।'
'হ্যাঁ চিনি। আমাদের ব্যবসায়ী সম্পর্ক। কিন্তু তার ওয়াইফকে তেমন চিনি না। নামও জানি না।'

সিনথিয়া এবার দ্বিধায় পড়ে গেল। ইরফানের মতে নিহাদ স্যার জবা চৌধুরীকে সব বলেছে। কিন্তু নিহাদ স্যার কী করে জানল আমার সাথে ইরফানের রিলেশন। তার তো জানার কথা না। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। 

সিনথিয়া নিজেও জানে না কথা আড়ালে বসে ওদের নিয়ে কত বড়ো চাল চেলেছে। যাতে সাপও মরেছে লাঠিও ভাঙেনি। সিনথিয়া অসহায় বোধ করল। চেহারায় অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,
'স্যার আমাকে কয়দিন থাকার ব্যবস্থা করে দিন।'
'গো টু হেল। ওটাই তোমার উপযুক্ত স্থান।'

নিহাদ আর দাঁড়াল না। চলে গেল।

—————

জবা রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছে। ওর চাল চলনে একটা রাজকীয় আর আভিজাত্যের ছাপ বরাবরই প্রকাশ পায়। ইরফান অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে ওর অপর পাশের সোফায় বসে আছে। জবা রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে বলল,
'সিনথিয়া ব্যতিত আর কোন কোন মেয়ের সাথে শুয়েছো তুমি ইরফান।'
'আর কারও সাথে না।'
'তুমি বললেই তো আমি বিশ্বাস করব না। তোমাকে আমার ভালো করে চেনা হয়ে গেছে।'
'সত্যি বলছি। তুমি ব্যতিত আমি কাউকে ভালোবাসি না। সিনথিয়া আমাকে ট্রাপে ফেলেছে। আমি ভ্রমের মধ্যে ছিলাম।'

জবা হাসল। রক্ত হিম করে দেওয়া ঠান্ডা হাসি। ইরফান জবার এ হাসিকে চিনে। ও জানে জবা ওর সাথে এখন ভালো কিছু করবে না। ও চাইলেও জবাকে ছাড়তে পারবে না। সে পথ জবা রাখেনি। প্রথমত জবাকে সত্যি খুব ভালোবাসে ও। তাছাড়া জবাকে ছাড়া মানে ও পথের ভিখারি হয়ে যাওয়া। সাথে পঞ্চাশ কোটি টাকার দেনা মাথায়। দেনাদাররা ওকে খুন করে ফেলবে। এখন যে ভাবেই হোক জবাকে মানিয়ে সাথে থাকতে হবে।

এত বছরের করা পরিকল্পনা কী ভুলে পন্ড হলো ও বুখতে পারছে না! সিনথিয়ার সাথে ওর সম্পর্কের বিষয়টি জবা কীভাবে জানল সেটা ও বুঝতে পারছে না! এ বিষয়টা জবা জানার পর এখন ওর পরিকল্পনা আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। রাগে ইরফানের গা থরথর করে কাঁপছে। মন চাচ্ছে এখননি সিনথিয়া গলা টিপে মেরে ফেলতে। কিন্তু সেটা সম্ভব না। নিহাদের বিষয়ে যা জেনেছে তা-ও শিওর না। শিওর না হয়ে কারও ক্ষতি করা যায় না। তবে ওর এখন জবাকে তোষামদ করে চলতে হবে। জবাকে আবার নিজের হাতে আনতে হবে।

ইরফান জবার হাত ধরে বলল,
'একবার ক্ষমা করে দেখো। আমি পাল্টে যাব। তোমায় আর অভিযোগ করার সুযোগ দিব না।'

জবা এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ও ইরফানকে নিয়ে ভাবছে না। ইরফানকে কীভাবে শায়েস্তা করবে তা ও জানে। তবে ও ভাবছে নিহাদ সাহেবের স্ত্রী কথা কেন আমাকে ইরফান এসব খবর দিল....! তার সাথে সিনথিয়া কিংবা ইরফানের কী সম্পর্ক?'

হুট করে কিছু মনে পড়ে রহস্যময় হাসল জবা। ও বোধহয় বুঝতে পেরেছে কথা কেন ওকে এসব খবর দিয়েছে?

জবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
'তোমায় ভালোবাসার অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তুমি আমায় শব্দহীন মৃত্যু দন্ড দিলে!
কেন ইরফান? তোমায় ভালোবেসে এতটাই অন্যায় করেছিলাম আমি? এই প্রতারণাই কি আমার প্রাপ্য ছিল?'
'আমায় ক্ষমা করো।'

'ক্ষমা চাইলেই সব ঠিক হয় না।
কিছু ভুল শুধু শাস্তি দিয়েই শেষ হয়। বিশ্বাস ভাঙার শব্দ শোনা যায় না৷ কিন্তু সেটা পুরো জীবন ধ্বংস করে দেয়। যেমনটা তুমি আমার জীবন ধ্বংস করলে। 

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল ইরফান। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এখন কিছু বলা শ্রেয়ও মনে হচ্ছে না। যখন বলার মতো কিছুই থাকে না, তখন চুপ থাকাই শ্রেয়। এত বছরে প্রথম ইরফানের হিসাবে গড়বড় হয়েছে। নিহাদ এসব কেন করল বুঝতে পারছে না! আদৌ করেছে কি না তা ও শিওর না!

নিহাদের এসব করে কোনো লাভ নেই। লাভ ছাড়া মানুষ কোনো কাজ করে না। ওদের ব্যবসায়ীক সম্পর্ক বেশ ভালো। তবে সিনথিয়ার ফোনে একবার ও নিহাদের সাথে ওর অন্তরঙ্গ ছবি দেখেছিল ইরফান। সে থেকেই আইডিয়া করেছে এসব নিহাদ করতে পারে। কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী ভেবে শাস্তি দিতে ইরফান পারে না।

জবা চুপ করে উঠে গেল। জীবনে দ্বিতীয়বার আজ ওর এত একা লাগছে। শেষবার একা লেগেছিল, কিশোরী বয়সে যখন শুনেছিল ফারিস অন্যকাউকে ভালোবাসে তখন এত একা লেগেছিল। তখন মনে হয়েছিল জীবন বুঝি এখানেই শেষ। তারপর ইরফান ওর জীবনে আসল। জীবনে নতুন রঙ আসল। ভেবেছিল আর কখনো একাকিত্ব ওকে ছুঁয়ে দিতে পারবে না। তবে আজ নিজের স্বামীর প্রতারণার কথা জানার পর এমন একা লাগছে। জবা ভাবছে,
'শেষ পর্যন্ত সবাই একা হয়ে যায়। কেউ কারও না। প্রয়োজন শেষ, সম্পর্ক শেষ। সব শেষ।'

রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। নিজেকে কেমন ভেঙে চুড়ে বিধস্ত হয়ে যাওয়া মানুষ মনে হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এত ধনী হওয়ার পরও আজ নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। কী লাভ এত সম্পদ দিয়ে! এত সুন্দরী হয়ে, যে নিজের স্বামীকেই ধরে রাখতে পারে না।'

সারাদিন সারারাত জবার এমন করেই গেল। বিছানায় শুয়ে অনর্গল চোখের জল নিসৃত করে। এমন করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে ফজরের আযান শুনে ঘুম ভাঙল। কেমন অস্থির, বিধস্ত, দুর্বল লাগছে ওর নিজেকে। মনে হচ্ছিল মরে যাবে। বেঁচে থাকার কিছু নেই জীবনে।

পরোক্ষণে জবা ভাবল,
'আমি কেন ঐ সব মেয়েদের মতো ভাবছি, যাদের জীবন বলতে স্বামী ছাড়া কিছু নেই। আমি তো তেমন না। আমার তো বেঁচে থাকার অনেক অবলম্বন আছে। আমার জারা, বাবা মা, আমার কাজ, সোস্যাল ওয়ার্ক। আমি তো অবসর সময় কাটানোরই সময় পাই না। তাহলে আমি কেন ঐ প্রতারকটার জন্য দুঃখবিলাস করে সময় কাটাব? হোয়াই? এমন তো নয় আমি কোনো অসহায় মেয়ে। আমার এত অ্যাচিভমেন্ট কেবল একটা প্রতারকের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না। প্রতারণা ইরফান করেছে। শাস্তি ইরফান সিনথিয়া পাবে। আমি কেন নিজেকে শাস্তি দিব? কিসের অপরাধে আমি নিজেকে কষ্ট দিব? আমি তো অন্যায় করিনি। ভালো আমি বেসেছি ঠকিয়েছে ও। তাহলে আমি কেন মরব? আমি তো মারব। প্রতারককে তার যোগ্য জবাব দিব।'

জবা উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ ভিজল। নিজের সকল আত্মগ্লানি একাকিত্ব পানির সাথে ভাসিয়ে দিল। তারপর বের হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে বলল,
'গেট রেডি জবা। তোমাকে প্রতারকদের শাস্তি দিতে হবে। আর এমন শাস্তি দিবে যে তোমার উদাহরণ অন্য মেয়েরা দিবে।'

জবা ফজরের নামাজ পড়ে অনেকটা সময় নিয়ে যত্ন করে তৈরি হলো। নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেই বেশ মুগ্ধ হলো। সাদা রঙের জরজেট শাড়িতে সোনালী পাড়। তাতে ছোটো ছোটো সোনালী পাথর বসানো। শাড়িটায় জবাকে চমৎকার লাগছে। কপালে সোনালী একটা টিপ পড়ল। এক হাতে ঘড়ি অন্য হাতে হীরার দামি চুড়ি। শরীরে দামি সুঘ্রাণ মাখল। তারপ নিচে নেমে দেখল ইরফান সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে। মোহময়ী এ জবাকে দেখে ইরফান ছোট্ট একটা ধাক্কা খেল। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বলল,
'গুড মর্নিং জান।'
ইরফানের কথা বলার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল যেন কিছুই হয়নি। জবা কোনো প্রতিত্তোরে না করে প্লেটে নাস্তা দিতে বলল। খাদিজা কাল থেকে সব দেখছে কিন্তু কিছু বলতে পারছে না।

জবা খাদিজার সাথেও কথা বলছে না। কারণ জবা জেনেছে খাদিজা আগেই ইরফান সিনথিয়া সম্পর্কে সব জানত। সব জেনেও জবাকে সে কিছু বলেনি। জবা ভেবেছিল তার জীবনটা ঠিক করে দিবে, কিন্তু এখন তার সাথে কথা বলারও রুচি হচ্ছে না।

খাদিজা জবার প্লেটে নাস্তা তুলে দিতে নিলে জবা হাত তুলে না করল। খাদিজা দমে গেল। জবা নাস্তা করে চা খেয়ে বলল,
'ইরফান তোমার সাথে আমি অফিসে যাব।'

ইরফান কিঞ্চিৎ অবাক হলো। ইরফানকে দায়িত্ব দেওয়ার পর জবা সকালে তেমন অফিস যায় না। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া যায় না। যখন বোর্ড মিটিং থাকে তখনই যায়। এছাড়া সকল কাজ বাড়ি বসে বা ফোনে করে।

ইরফান বলল,
'আজ তো কোনো বোর্ড মিটিং নেই। তাহলে এত সকালে অফিস যাবে?'
'এখন থেকে প্রতিদিনই আমি অফিস যাব। তাছাড়া আজ দুপুরে বোর্ড মিটিং আছে। সকল বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের আমি ইনফর্ম করে দিয়েছি। তারা সময় মতো চলে আসবে।'

'বোর্ড মিটিং! কিসের জন্য?'
জবা শীতল কণ্ঠে বলল,
'কোম্পানির সকল দায়িত্ব আমি নিজের হাতে নিব। তোমাকে কোম্পানি থেকে বেদখল করা হবে। আপাতত কাজ বুঝে নিতে তোমাকে মাস দুই কোম্পানিতে থাকতে হবে। সব কাজ বুঝে গুছিয়ে নিয়ে তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে।'

ইরফান খানিক চটে গিয়ে বলল,
'বেদখল করবে? কেন?'
তাচ্ছিল্য হেসে জবা বলল,
'কেন?'
'আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তুমি প্রফেশনে টানতে পারো না। এই কোম্পানিতে আমি আমার জীবনের দশ বছর দিয়েছি। তুমি চাইলেই আমাকে এভাবে বের করতে পারো না।'

'পারি। আমি অনেক কিছুই পারি। এবং তা করবোও। তাছাড়া কোম্পানি আমার ব্যক্তিগত। সো এ কোম্পানির যে কোনো সিদ্ধান্ত আমি কাউকে জিজ্ঞেস না করেই নিতে পারি। তুমি বাঁধা দিতে পারো না। এ কোম্পানি আমার নামে তোমাকে কেবল দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।'

ইরফান চায়ের কাপ ফ্লোরে ছুড়ে মারল। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল কাপটা। ইরফান খানিক শব্দ করে বলল,
'এই কোম্পানির জন্য আমি পঞ্চাশ কোটি টাকা লোন করেছি। যার মধ্যে কিছু টাকা মাফিয়া টাইপ লোকদের থেকে নেওয়া। আমাকে কোম্পানি থেকে বাদ দিলে তারা টাকা না পেয়ে আমাকে মেরে ফেলবে।'

ইরফানের অবস্থা দেখে জবা কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। ও গ্রিন টি তে চুমুক বসাল৷ তারপর কাপের উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল,
'যে কাপটা ভাঙলে সে কাপ সেটটা লাস্ট ইয়ার আমি চীন থেকে এনেছিলাম। বাংলাদেশী টাকায় যার মূল্য পয়তাল্লিশ হাজার টাকা। যেহেতু একটা কাপ ভেঙে সেটটা কানা করেছো তো পুরো সেটটার দাম দিয়ে বাকি পাঁচটা কাপ তুমি নিয়ে নিও।'

জবার কথায় হতভম্ব ইরফান স্তব্ধ হয়ে ওর পানে তাকিয়ে রইল। জবাকে ও আগে থেকেই ভয় পেলেও জবার চোখে ওর জন্য সীমাহীন ভালোবাসা ছিল। এখন সে চোখে কেবল রাগ আর ঘৃণা এখন এ জবাকে ও আরও ভয় পাচ্ছে। ভীষণ ভয়।

জবা উঠে টিকলিকে ডেকে বলল,
'টিকলি জায়গাটা পরিষ্কার কর।'

—————

জবার বাসার কলিং বেল বাজল। 
টিকলি দরজা খুলে দেখল সিনথিয়া বিধস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp