আড়ালে আবডালে শুধুই তুই - পর্ব ০৪ - রাহা ইসলাম - ধারাবাহিক গল্প

আড়ালে আবডালে শুধুই তুই
রাত ১১টা ৩০ মিনিট.....

কেউ একজন খুব ধীরে ধীরে রাহার রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল… পায়ের শব্দ প্রায় নেই বললেই চলে—অভ্যস্ত নিঃশব্দ পদচারণা।

ঘরের ভেতর মৃদু অন্ধকার। জানালার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে পরেছে রাহার মুখে।
নরম আলোয় তার ঘুমন্ত মুখ আরও শান্ত, আরও নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে একদম স্লিপিং বিউটি, ঘুমের মধ্যেও তার মায়াবী মুখটা যেন আরও মায়াময় হয়ে উঠেছে।

- অভ্র দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।
চোখ দুটো সরাসরি গিয়ে পড়লো বিছানায় শুয়ে থাকা রাহার দিকে। এক পা… দুই পা…
ধীরপায়ে এগিয়ে এলো। চাঁদের আলোয় তার ছায়া লম্বা হয়ে মেঝেতে পড়ছে—
আর সেই ছায়াটা ধীরে ধীরে গিয়ে মিশে গেলো রাহার বিছানার পাশে। রাহা গভীর ঘুমে। কিছুই টের পাচ্ছে না। অভ্র বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
তার চোখের দৃষ্টি আগের মতো রাগী না—বরং সেখানে আছে অদ্ভুত এক গভীরতা, কষ্ট, আর যেন চাপা কোনো অনুভূতি।

— ধীরে ধীরে হাত বাড়াতে লাগলো সে...
এক মুহূর্ত থামিয়ে নিল— 
মনে হলো—নিজের সাথেই লড়াই করছে।
তারপরও নিজেকে দমিয়ে রাখতে না পেরে খুব আস্তে করে রাহার কপালের কাছ থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিলো।
 রাহা হালকা নড়ে উঠল,
অভ্র মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিলো। চোখের দৃষ্টি আবার কঠিন হয়ে উঠলো।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বললো—

“এতটা বেয়াদব হয়েছিস তুই…?”

কথাটায় রাগ ছিলো—
হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বলল..

“আই লাভ ইউ… হুহ!”।

“অচেনা একটা ছেলেকে আই লাভ ইউ বলা তাই না।যদি আমি না হয়ে অন্য কেউ হত।
ওহ্ গড....
তাই তো থাপ্পড় দিয়েছি। নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”

আরোও কিছুক্ষণ মুখের আদলে তাকিয়ে থেকে পুরোনো কিছু স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল।
 পরক্ষণেই নিজেই যেন তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠলো,
 কিন্তু সেই হাসিটা চোখে পৌঁছালো না।
“ তুই কিছুই জানিস না জান, কিছুই না ”।

একটু ঝুঁকে এলো রাহার দিকে—
মনে হলো কিছু বলতে চায়, কিন্তু বললো না।
তার ভিতরে এতো কথা লুকানো যে কয়েক মাস কেটে গেলোও যেনো ফুরাবে না।
৯ টা বছর সে তার প্রাণ ভোমরার থেকে দূরে ছিলো 
এক মুহূর্তের জন্য তাকে দেখা দেয়নি।

হঠাৎ করেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
চোখে আবার সেই কঠোরতা।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আর বলল,

“আমি সশরীরে তোর সামনে উপস্থিত হয়েছি। আজ থেকে তোর প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস আমার নামেই আবদ্ধ থাকবে। এতদিন অনেক সুযোগ পেয়েছিস, এখন আর নয়।
আমি তোকে খুঁজে নেব না—তুই নিজেই আমাকে খুঁজবি, তুই নিজেই আমার কাছে চলে আসবি, আসতেই হবে। আমি তোকে আসতে বাধ্য করব।
আমি তোকে ধরা দেবো না জান। যেদিন তুই মিনতি করবি, স্বেচ্ছায় আমার কাছে আসবি—সেদিনই তোকে নিজের করে গ্রহণ করব।”

আবারও একটু নুয়ে খুব আস্তে করে কানের কাছে গিয়ে বলল..

“ আমার রাজ্যের গুপ্ত সাম্রাজ্যের একমাত্র সম্রাজ্ঞী তুই। আজকের এই দিনেই তোর আগমন হয়েছিল পৃথিবীতে। আর সেই থেকেই তুই আমার বেঁচে থাকার কারণ। তোর জন্যই এই ‘আমি’টা বেঁচে আছে, তোর জন্যই আমি সবকিছু। আমি সবসময় তোর দাস হয়ে আছি—
আর থাকবোও, আজীবন।
শুভ জন্মদিন, জান।” 

এটা বলেই পাশে একটা ছোট্ট গিফটবিক্স সাথে একটা চিরকুট রেখে আর এক মুহূর্তও না থেকে ঘুরে দাঁড়ালো।
দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা খুলে আবারও একবার ফিরে তাকালো—
ঘুমন্ত মেয়েটির পানে। তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল।

দরজাটা আবার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
রুম আবার আগের মতো নিস্তব্ধ। শুধু হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে।

আর রাহা—সে কিছুই টের পেলো না।
কিন্তু তার অজান্তেই—তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টা ঠিক তার পাশ দিয়েই হেঁটে গেল..।

—————

রাত ১২টা....

হঠাৎ করেই রাহার ঘুম ভেঙে গেল।
মনে হলো—কেউ যেন ছিলো। এই রুমেই, ঠিক তার পাশে। আরপরিচিত পারফিউম এর ঘ্রাণ ও কিছুটা পাচ্ছিল। খুব চেনা চেনা লাগলো। কোথায় যেন পেয়েছিল এই মুহূর্তে মনে করতে পারছিল না।
চোখ মেলে তাকিয়ে আশে পাশে নজর বুলালো। কিন্তু কিছুই ঠেকলো না নজরে।
শোয়া থেকে উঠে বসতেই চোখ গেলো পাশের টেবিলের উপর রাখা একটা চকচকে বক্সের উপর। অন্ধকার ঘরে পড়ন্ত চাঁদের আলোতে বারবার ঝিলিক দিয়ে উঠছে। সেটা হাতে নিতেই, হৃদপিণ্ডটা অকারণেই দ্রুত ধুকপুক করছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। কিন্তু কেন যেন বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করছে। বক্সটা নিয়ে আবারও বিছানায় গিয়ে বসলো।

ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল—
দরজাটা অল্প খোলা।
রাহা ভ্রু কুঁচকালো।
“আমি কি দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছিলাম…?”

মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না।
ঠিক তখনই—
পর্দাটা হালকা নড়ে উঠলো।রাহার বুক ধক করে উঠল।

“কে..কে আছে…?”কাঁপা গলায় বলল সে।
কোনো উত্তর নেই। শুধু বাতাসের শব্দ।

তখনই একটা ছায়া হয়তো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল

রাহা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো।
পা দুটো ঠান্ডা হয়ে আছে—তবুও এগোলো।
এক পা..দুই পা…
পর্দার কাছে গিয়ে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল—
কেউ নেই।
সে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“আমি বোধহয় বেশি ভাবছি…” নিজেকেই বলল সে।
তারপর গিয়ে দরজাটা ভালোকরে চাপিয়ে দিলো। 

রাহা কখনও দরজা লক করে ঘুমায় না। কেননা তার রুমে তেমন কেউ আসে না। শুধু চাপিয়ে রাখে।

 বিছানায় বসে যেই বক্সটা খুলতে যাবে 
ঠিক তখনই—

পিছন থেকে শিফা জড়িয়ে ধরলো।

রাহা প্রায় লাফিয়ে উঠল।

“কে,, কে?”

“এই তুই ঘুমাসনি এখনো?” অবাক হয়ে বলল সে।

রাহা যেন প্রাণ ফিরে পেল।

“তুমি! আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম…।

শিফা জড়িয়ে ধরেই বলল,

“শুভ জন্মদিন বনু আমার।
“ভয় পাস কেন? চল নিচে—১২টা বাজে। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে!”

রাহা কিছুটা দ্বিধায় পড়ল।

“আপু, কেউ কি আমার রুমে এসেছিল?”

শিফা থমকে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল—

“না তো,কে আসবে?

তোর রুমে আমি, মা, মেজো আম্মু আর ছোট আম্মু, আয়রা, জায়রা ছাড়া তো কেউ আসে না।”

“আমার মনে হলো…”

“আরে ধুর! তুই বেশি ভাবছিস। চল নিচে।”

রাহা আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার মনে সন্দেহটা থেকেই গেল। আর গিফট বক্সটার কোথাও ভুলে গেলো। বিছানায় রয়ে গেলো সেটা..।

—————

নিচতলায় নামতেই—
হঠাৎ সব লাইট নিভে গেল। পুরো বাড়ি অন্ধকার।
রাহা থেমে গেল।

“আপু ?”

কোনো উত্তর নেই।

– পাশেই তো ছিলো। কোথায় গেলো.!

চারপাশ নিস্তব্ধ। ঠিক তখনই—
“৩… ২… ১…!”
হঠাৎ করেই সব লাইট জ্বলে উঠলো—
“হ্যাপি বার্থডে!!! 

সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো।
রাহা চমকে উঠে তারপর হালকা হাসলো।
চারপাশে সবাই—আফসানা বেগম, আমান খান, আহসান খান, নাজিরা বেগম, রাহার মা তার শিফা আপু আর বাচ্চারা। সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু উপস্থিত নেই একজন।
আর তারা আশাও রাখেনি কেনোনা তার উপস্থিতি একদম অসম্ভব।

কেক টেবিলের উপর।
মোমবাতির আলোয় ঝলমল করছে।
শিফা এসে তাকে আবারও জড়িয়ে ধরলো—
“হ্যাপি বার্থডে, পাগলি!”সবাই উইশ করলো।

রাহার মনটা কিছুটা হালকা হলো।
কিন্তু, তার চোখ হঠাৎ করেই থেমে গেল সিঁড়ির দিকে।সেখানে—
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কেউ একজন।
উপরে,দোতলার ছায়ায়।
সবাই হাসছে, কথা বলছে কেউ খেয়ালই করছে না। কিন্তু রাহা দেখছে, স্পষ্ট দেখছে।

অভ্র ভাই…!

অভ্র ভাই এখানে..! আর এখনও দাঁড়িয়ে আছে..?
চোখ কচলে আবারও তাকালো । এটা সত্যি ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে..! তাহলে এখানে আসছে না কেনো..? মনে মনে কথা গুলো ভাবতে ভাবতে সে আবারও তাকালো।

অভ্র ও সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে একনজরে তাকিয়ে আছে রাহার দিকে। না কোনো হাসি। না কোনো অভিব্যক্তি। শুধু তাকিয়ে আছে অদ্ভুতভাবে।

রাহা শুকনো ঢোক গিললো।
কেউকে যে কিছু বলবে কোনো কথাও বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে।

এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখে চোখ পড়লো।
পরমুহূর্তেই অভ্র ধীরে ধীরে সরে গেল অন্ধকারের ভেতর।
অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন সে কখনো ছিলই না…

তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে—
“ওই ছায়াটা, তাহলে সত্যিই ছিলো…?”

– সবাই কেক কাটায় ব্যস্ত…
“কাট কাট কাট!” উইশ কর! উইশ কর!”
হাসি, শব্দ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। রাহা কেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার মন নেই এখানে। তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে।
অভ্র ভাই…আর ওই ছায়াটা…!

—“এই! কি হলো? কেক কাট!” শিফা ধাক্কা দিয়ে বলল।

রাহা চমকে উঠল।
হালকা হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করে উইশ করল।
কিন্তু তার মনের ভিতরে একটাই কথা—
“ উনি নিচে না এসে ওখানে কেনো দাঁড়িয়ে ছিলো।?”

কেক কেটে সবাই রাহাকে খাইয়ে দিলো।
আর রাহা ও সবাইকে খাইয়ে দিলো। সবাই গিফট দিলো। গিফট পেলে তো এই মেয়ে যা খুশি হয়।
প্রতিবছর রাত ১২ টায় সবাইমিলে তাকে সারপ্রাইজ দেয় সাথে গিফট তো আছেই। আর পরেরদিন বড় করে উদযাপন করে।
চেয়ারম্যান সাহেবের ভাতিজি বলে কথা। 

সকালে অনেক মেহমান আসবে। অনেক কাজ আছে তাদের এই ভেবে সবাই ঘুমোতে চলে গেলো।
রাহা ও নিজের রুমে যাওয়ার সময়,
তার কেনো যেনো একটা অজানা টান তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আরেকদিক। এতো ধীরে ধীরে পা ফেলছে তার নিজের পায়ের শব্দই তার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে।

দোতলায় উঠে চারপাশে তাকালো— দেখছে দক্ষিণ দিকের ঘরে আলো জ্বলছে। 
অভ্র ভাই এখনও জেগে আছেন..!

 দরজা অল্প খোলা দেখতে পেল।
ভিতর থেকে হালকা আলো বের হচ্ছে। রাহার বুক ধকধক করছে। সে ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল।
হাত বাড়িয়ে ঠেলতেই—
দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। ভিতরে ঢুকেই থমকে গেল সে।

রুমটা একদম অন্যরকম। একদম শেষের রুম ছিলো এটা। সবসময় তালা দেওয়া থাকতো। কালকে রাহা দেখেছিলো এটা পরিষ্কার করতে। ভেবেছে পরিষ্কার করার পর এসে একবার দেখে যাবে। আর আজ সারাদিন যা যা হলো তাই এইদিক আসতেই পারেনি।

রুমটা সাউন্ডপ্রুফ। ডিজিটাল লক সিস্টেম। ফিঙ্গারপ্রিন্ট নয়তো পিন লাগে ঢুকতে। কিন্তু কোনো লক করা ছিলো না আজকে, আশ্চর্য্য।

 রুমের দেয়ালে সাদা কালো কম্বিনেশনে রং করা।
লাক্সারিয়াস বেড। সাথে এটাচড ছোট টেবিল। পাশেই খুবই বড় থাই দিয়ে সেট করা ট্রান্সপারেন্ট দরজা। যা একদম সিলিং থেকে ফ্লোর পর্যন্ত লাগানো। রাহা বুজলো সেটা ক্লোজেট।

পুরো ঘরটা একটা প্রখর ব্যক্তিত্বের ভাব বহন করছে। রাহা নজর বুলাতে বুলাতে হঠাৎ দেখতে পায় টেবিলের উপর—
একটা পুরনো ফটো ফ্রেম।

রাহা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
ফ্রেমটা হাতে তুলে নিতেই তার চোখ বড় হয়ে গেল।
ছবিতে—
একটা ছোট ছেলে হাসছে একদম নিষ্পাপভাবে।
তার পাশে একটা ছোট মেয়ে।
মেয়েটা হেসে ছেলেটার হাত ধরে আছে।

রাহার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“এই মেয়েটা...আমি…?”আমার মতো লাগছে।!

হাত কেঁপে উঠল তার।
ঠিক তখনই—

পেছন থেকে ঠান্ডা একটা কণ্ঠ—
“ছবিটা যেখানে ছিল, সেখানে রাখ।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp