সকাল থেকেই বৃষ্টি। এখন ভরদুপুর। বৃষ্টির পাশাপাশি হালকা রোদ উঠেছে। মৌমিতা খন্দকার সোফায় বসে পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনা খুব বেড়ে গেছে আজকাল।
খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রাখলেন তিনি। সোফায় হেলান দিলেন।
সুস্মিতা নিজের ঘরে খাটে বসে বই পড়ছে। সে ঠিক করে রেখেছিলো, ঈদের ছুটিতে অনেকগুলো বই পড়বে। ধার করা বইগুলোও ফেরত দেওয়া হয়নি কাউকে, এমন একটা দীর্ঘ অবসরের অপেক্ষায়। অথচ এখন বইয়ে মন বসছে না। একটা লাইন কয়েকবার করে পড়েও মাথায় ঢুকছে না। কেবল একটি প্রশ্ন ঘুরছে তার মনে, সেটার উত্তর না পেলে বোধহয় কোনো কাজেই মনোযোগী হতে পারবে না সে।
সমস্যাটা হলো, এই প্রশ্নের উত্তর যার কাছে আছে, তার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই সুস্মিতার। মানুষটার প্রতি তার অভিমান আছে এখনও। তবে কৌতূহলের পাল্লাটা একটু বেশিই ভারী।
বৃষ্টি থামার পরপরই সে ঘরের জানালাগুলো খুলে দিয়েছে। দমকা বাতাস এখনও থামেনি যদিও। মৌমিতা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তার উপস্থিতি টের পেতেই সুস্মিতা বইটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসলো। তার দিকে তাকিয়ে, ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকলেন মৌমিতা। মেয়েটা কি এখনও লুকোচুরি খেলছে?
“টেবিলের বইগুলো এলেমেলো কেন?”
সুস্মিতা পড়ার টেবিলের দিকে তাকায়, “ইফতারের পর গুছিয়ে রাখবো।”
মেয়ের কথায় তিনি ভরসা পেলেন না। হাতে আপাতত কোনো কাজ নেই। তাই তিনি নিজেই এগিয়ে এসে টেবিলের বইগুলো গোছাতে শুরু করলেন। সুস্মিতা বিব্রত ভঙ্গিতে বসে রইলো। একসময় সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। ভেজা সড়কের উপরে একটা গাড়ি যাচ্ছে। পুরোনো আমগাছটার পাতা থেকে পানি ঝরছে। বাতাসের ধাক্কায় সেই পানির ছিটে ফোঁটা হয়তো ঘরের ভেতরেও আসছে একটু আধটু। সুস্মিতা মাথা ঘোরালো, নিজের হাতের আঙুলে ওড়না প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বললো, “ছেলেটা কি তোমাকে ডায়েরি ফেরত দিয়েছিলো?”
মৌমিতার মাথায় কথাটা ভালোভাবে ঢোকেনি। তিনি বই গোছাতে ব্যস্ত, “কোন ছেলেটা?”
“বাদল।”
হাত থেকে বইটা পড়েই যাচ্ছিলো, মৌমিতা কোনোমতে সামলে নিলেন। অনেক দিন পর এভাবে অপ্রস্তুত হলেন তিনি। সুস্মিতা নিশ্চয়ই এখন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি হেসে মেয়ের দিকে তাকালেন, “এমনিতে তোমার বইগুলো আমি চিনি না। মলাটের উপর কার্টুন এঁকে রেখেছো। তার উপর গল্প উপন্যাসের বই-ই বেশি, পড়ার বইয়ের চেয়ে। নিজের টেবিল নিজেই গোছাও—”
“আমি তো সেটাই বললাম। ইফতারের পর গোছাবো।”
“আচ্ছা।”
“আম্মু? ডায়েরিটা কি এখন তোমার কাছে নেই?”
মৌমিতা ক্ষীণ কণ্ঠে কৈফিয়ত দিলেন, “আছে।”
সুস্মিতার আগ্রহ যেন এক লাফে অনেকখানি বেড়ে গেলো, নড়েচড়ে বসে বললো, “ছেলেটা তোমাকে খুঁজে পেয়েছিলো? কীভাবে?”
মৌমিতা আতঙ্ক বোধ করলেন। কোনোভাবে ধমক দিয়ে বা অন্যকিছু করে প্রসঙ্গটাকে ধামাচাপা দেয়া যায় না কি? বেশ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, “হ্যাঁ। আমাকে খুঁজে পেয়েছিলো। ডায়েরিটা ফেরত দিয়েছিলো।”
সুস্মিতা দ্বিগুণ উৎসাহে প্রশ্ন করে বসে, “ডায়েরিটা পড়েছিলো নাকি ছেলেটা? আচ্ছা, কীভাবে বুঝলো ওটা তোমার ডায়েরি? খুলে একটু দেখেছিলো, না? তোমার নামটা অন্তত দেখেছিলো। নাকি দেখেনি?”
মৌমিতা চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। সুস্মিতার কয়েক লাইন প্রশ্নের জবাবে কয়েকটা লাইন বলতে পারলে তিনি উত্তর দিতেন। কিন্তু এই কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে গেলে, মৌমিতাকে তার সমস্ত জীবন মেলে ধরতে হবে, সুস্মিতার সামনে।
হাতে কি সময় আছে? পৌনে একটা বাজে। নামাজ আগেই পড়ে নিয়েছেন। মৌমিতা যান্ত্রিক ভঙ্গিতে চেয়ারটা খাটের কাছে টানলেন, সেখানে বসতে গেলেই সুস্মিতা বাঁধা দেয়, “বিছানায় বসো আম্মু।”
সে দেয়াল ঘেঁষে বসলো, পা দুটো গুটিয়ে মাকে জায়গা করে দিলো। মৌমিতা বিছানায় উঠলেন, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলেন। তার সামনাসামনি দরজা। দুই ঘরের দরজা ভেদ করে পুরোনো আলমারির ডানপাশটা দেখা যাচ্ছে। বামপাশটা ঢেকে রেখেছে দরজায় ঝোলানো পাতলা পর্দা। সুস্মিতা নিষ্পাপ কৌতূহল নিয়ে বলে, “আম্মু বলো।”
প্রকৃতিও যেন আগ্রহ দেখায় এবার! বাইরে ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। বাতাসের দাপটে ঘরের পাতলা পর্দা উড়তে উড়তে সরে যায় কিছুটা। আলমারির বামপাশটা একটুখানি দৃশ্যমান হয়। মৌমিতা ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। আজ তিনি সত্যিই ঐ দুয়ার খুলতে যাচ্ছেন, যা গত ১৬ বছর ধরে তালাবদ্ধ।
—————
১৯৯১ সাল।
মফস্বল এলাকা, সদর, নাটোর।
রাত এখনও তেমন গভীর হয়নি। কেবল নয়টা বাজে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। টেবিলের উপর গরম ভাত আর তরকারি রাখা। খাবার থেকে ধোঁয়া উড়ছে এখনও। রাবেয়া খাতুন ডেকে উঠলেন, “মৌ, মার্জু? রিপন? খাবার দিয়েছি। খেতে আসো।”
রিপন এসে হাত ধুতে শুরু করলো। সে খেয়াল করলো, তার বড় বোন রাবেয়া বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। কান পেতে আছেন দরজার দিকে। রিপন চেয়ারে বসার পর মার্জিয়াও আসে খাওয়ার ঘরে। মৌমিতা এখনও খেতে না আসায় রাবেয়া মনে মনে বিরক্ত হলেন, তিনি ডেকে ওঠেন, “মৌ? খাবা না?”
মৌমিতার ঘর থেকে হাঁটার ধুপধাপ শব্দ আসে, সে দরজায় এসে দাঁড়ায়, “আব্বা আসেনি?”
রাবেয়ার অস্থির চোখ যায় দরজার দিকে, “না রে মৌ। বৃষ্টিটাও তো কমে না। কোথায় যে আটকে গেলো লোকটা।”
আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না রাবেয়া। মানুষটা আসলেই কোথাও আটকে গেছেন কিনা—বিষয়টা নিয়ে তার খুব চিন্তা হচ্ছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।
তিনি ভাবলেন, পাশের বাসার জুনায়েদকে একবার বলে দেখবেন, খোঁজ নিয়ে আসতে বলবেন। কিন্তু এই বৃষ্টিতে ছেলেটা তার কথা অনুযায়ী বাইরে যাবে কিনা, সেটাও ভাবনার বিষয়। তবু একবার বলে দেখা যাক। তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজা খুলতেই দেখলেন, মারুফ খন্দকার দাঁড়িয়ে আছেন। পুরো শরীর ভিজে গেছে তার। হাফহাতা শার্টটা থেকে পানি পড়ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। হয়তো দরজায় টোকা দিতেই যাচ্ছিলেন, তার আগেই রাবেয়া দরজা খুলেছেন। মারুফকে এই অবস্থায় দেখে তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “ছাতাটা নিয়ে যেতে বললাম, নিলেন না। এখন যদি জ্বর আসে? সেই তো আমাকেই সেবা করতে হবে!”
মারুফ খন্দকার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। চৌকাঠের উপর এসে দাঁড়ালেন, “গামছা দাও তো একটা।”
রাবেয়া গামছা আনতে ছুটলেন। রিপন দরজার দিকে তাকায়, “এতো দেরি হলো কেন, দুলাভাই?”
মারুফ বললেন, “রাস্তায় একটাও যানবাহন নেই। হেঁটে হেঁটে মোড় পর্যন্ত এলাম, ওখানে আবার দেখি, কয়েকটা লোক মিলে একটা ছেলেকে মারধর করছে। কী যেন চুরি করেছে, শুনলাম—”
“ছেলেটাকে কি উদ্ধার করতে পারলেন? নাকি দেখতে দেখতেই সময় চলে গেলো?”
মারুফ বিরক্ত হলেন। রিপন কখনও সোজা কথা বলতে পারে না। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ছে সে। ছোট ভাই যেন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য রাবেয়া তাকে নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। মারুফ এতে বিশেষ আপত্তি করেননি। ব্যবসাসহ নানান কাজে তিনি ব্যস্ত থাকেন। বাড়িতে কেবল স্ত্রী আর দুই মেয়েকে একা থাকতে হয়। সেখানে একজন নির্ভরযোগ্য পুরুষ মানুষ থাকলে তারও দুশ্চিন্তা কমে কিছুটা। তবে ইদানিং এই শ্যালককে তার ভালো লাগছে না। মেয়ে দুটোর সামনে অনায়াসে মারুফকে নিয়ে ইয়ার্কি করে। তাছাড়া ছেলেটা রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে। মারুফ এখন কেবল চোখ মুখ বুজে রিপনকে সহ্য করে যাচ্ছেন।
মার্জিয়া বলে উঠলো, “আব্বা, খেতে বসেন তাড়াতাড়ি। খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”
কাপড় বদলে মারুফ খাওয়ার ঘরে এলেন। রাবেয়া প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বড় মেয়েকে ডাকলেন, “মৌ, এখন খেতে আসো।”
মারুফ বলেন, “মৌ খায়নি?”
“না, এখনও খায়নি।”
মারুফ মাথা ঘুরিয়ে মেয়ের ঘরের দিকে তাকালেন, “মৌ মা?”
ঘরের দরজা লাগানো। মৌমিতা সাড়াও দিলো না। রাবেয়া গিয়ে ঐ ঘরের দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিলেন, দেখলেন, মেয়েটা পড়ার টেবিলে বসে আছে। কিছু একটা পড়ছে।
“অসময়ে পড়তে বসেছো কেন? খেয়ে পড়তে বসো। নাহলে পড়া মাথায় ঢুকবে না। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।”
মৌমিতা টেবিলের উপর মাথা রাখলো, “পেট ব্যথা করছে। একটু পরে খাবো।”
“না খেলে পেট ব্যথা কমবে না। এখনই আসো, তোমার আব্বাও খাচ্ছে এখন। একসাথে খাও।”
রাবেয়া ফিরে গেলেন। মারুফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “মৌ পরে খাবে।”
“কেন?”
মার্জিয়া দাঁড়িয়ে আছে মারুফের পেছনেই। রাবেয়া কিছু বলার আগেই সে বলে ওঠে, “আপার মন খারাপ, কাল থেকে। ডায়েরিটা নাকি হারিয়ে ফেলেছে।”
মারুফ কিছু বললেন না, তার ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে গেলো।
—————
মৌমিতা কখনও সামনের দিকের বেঞ্চে বসে না। তার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বেঞ্চের দেয়ালের দিকের আসনটা। আজ সেই দুটো জায়গাই দখল হয়ে গেছে। তাই সে পাঁচ নম্বর বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসেছে। এখানে অবশ্য জানালা আছে, বিরক্তি আসার সুযোগ নেই। সে গালে হাত দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
তামান্না এসেই তার পিঠ চাপড়ে বলে, “কী রে? আজকে এতো পেছনে বসেছিস?”
“আর কোনো জায়গা ফাঁকা নেই।”
“আয়, মাঝখানের সারিতে বসি আজকে। থার্ড বেঞ্চ ফাঁকা আছে।”
“আমি যাবো না। তুই যা।”
তামান্না গেলো না, মৌমিতার পাশেই ব্যাগ রেখে বসে পড়লো। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো, “তোর মন খারাপ নাকি?”
মৌমিতা গাল থেকে হাত নামিয়ে তামান্নার দিকে তাকায়, “না।”
“আজকে ক্লাস টেস্টের রেজাল্ট দিবে রে। আমি তো না পড়েই পরীক্ষা দিলাম। একটাও ঠিকঠাক লিখিনি। তোর কী অবস্থা? তুই তো ভালোই লিখেছিস।”
“উঁহু। ভালো হয়নি পরীক্ষা।”
“প্রতিবারই এভাবে বলিস। কিন্তু ভালোই তো হয়। এবারও হবে, দেখিস।”
ফলাফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত তামান্নাকে এটা বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়, মৌমিতার পরীক্ষাও খারাপ হতে পারে। তাই তার সাথে এখন তর্ক করে লাভ নেই।
মাধ্যমিকের বান্ধবীদের মধ্য থেকে কেবল তামান্নার সাথেই কথা হয় তার। বাকিরা কে কোথায় চলে গেছে—কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। কেউ বিয়ে করেছে, কেউ ঝরে গেছে, কেউ অন্য বিভাগে পড়ছে, আবার কারও কারও সাথে দেখা হলেও কথা হয় না। তামান্নার সাথেও তেমন কথা বলতে চায় না সে। তবু মেয়েটা গায়ে পড়ে কথা বলে। সবসময় তার পাশেই বসে। আর সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো, তামান্না মনে করে, মৌমিতার বিশাল কোনো প্রতিভা আছে, এবং একদিন সবাই তাকে চিনবে। এসব অতিরঞ্জিত আদিখ্যেতা মোটেও ভালো লাগে না মৌমিতার।
খন্দকারদের বাড়িটা শহরের এক মাথায়। মূল সড়ক থেকে একটু দূরে। একতলা পুরোনো বাড়িটার উপর দোচালা টিনের ছাদ। মারুফ খন্দকার প্রতিবছরই বাড়িটার কোনো না কোনো জায়গা সংস্কার করেন। সেজন্য প্রথম দেখায় এটাকে পুরোনো বাড়ি ভাবার জো নেই।
সামনে বিশাল একটা উঠোন। বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেহগনি গাছ। কামরাঙার গাছটা বাড়ির পেছনে ডালপালা ছড়িয়ে বেড়ে উঠেছে। চারপাশে বেশ কিছু ফুলের গাছ। পাশের বাড়িটা জহির মিঞার। তারপর তেমন বাড়িঘর নেই, কেবল গাছপালা। পেছনে আবাদি জমি।
মারুফ বাড়িতে এসেছেন দুপুরের খাবারের বিরতিতে। মার্জিয়াও কিছুক্ষণ আগেই স্কুল থেকে ফিরেছে। সে এবার নবম শ্রেণীতে উঠলো। রাবেয়ার ইচ্ছা ছিলো তাকে মানবিকে পড়াবেন। কিন্তু সে বিজ্ঞানে পড়তে আগ্রহী, মারুফ মেয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি খুবই তৎপর, এই বিষয়ে কোনো ছাড় দেন না। আজকে যে মৌমিতার কোনো একটা পরীক্ষার ফলাফল দিবে, এটাও তার ভালোভাবেই মনে আছে।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে মারুফ নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। হাতপাখাটা পাশেই পড়ে আছে। জানালা খোলা থাকায় বাতাস ঘরে আসছে, তাই হাতপাখার তেমন প্রয়োজন হচ্ছে না। ইদানিং লোডশেডিং বেড়ে গেছে খুব। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিদ্যুৎ সংকট প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে। বাজারের অবস্থাও ভালো না। বেচাকেনার কথা মনে পড়তেই মারুফ উঠে বসলেন, দোকানে যেতে হবে।
মূল শহরের কাছাকাছি মারুফের একটা কাপড়ের দোকান আছে, খন্দকার বস্ত্রবিতান। একে তো ব্যবসায় মন্দা চলছে, তার উপর দোকানের কর্মচারী ওসমান ভীষণ ফাঁকিবাজ। তার ভরসায় বেশিক্ষণ বসে থাকা উচিত হবে না। মারুফ দোকানের উদ্দেশ্যে বের হলেন। দরজার কাছে এসে দেখলেন, মৌমিতা কলেজ থেকে ফিরেছে। তার চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। মারুফ তবু উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রেজাল্ট কেমন হয়েছে মা?”
মৌমিতার মুখে ক্লান্তির পাশাপাশি একটু বিরক্তি দেখা যায়। সে তার আব্বাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢোকে, “আপনার খালি রেজাল্টের চিন্তা।”
মারুফকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না মৌমিতা। বড় বড় পা ফেলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা চাপিয়ে দিলো। মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বেরিয়ে গেলেন।
—————
কলেজ ছুটি হতে না হতেই বাদলরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তাদের পরিকল্পনা চলনবিল পর্যন্ত যাওয়ার। বৃষ্টি হলেই বিলের পানি বেড়ে যায়, এলাকায় পর্যটকদের ভিড় হয়। রাশেদের ভিড় পছন্দ নয়। সে চেয়েছিলো, কোনো এক নিরিবিলি দিনে এদিকে এসে ঘোরাঘুরি করবে। গতরাতের নামমাত্র বৃষ্টির কারণে চলনবিল পানিতে ভরে না উঠলেও মানুষের ভিড় ঠিকই হবে। আজ সেই কোলাহলের কথা ভেবেই সে যেতে চায়নি। তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে বাদলের সাইকেলের পেছনে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। আমজাদ কিছুক্ষণ পরপর থাকে খোঁটা দেয়। একসময় রাশেদ ধৈর্য হারিয়ে ফেললো।
“চুপ করেন তো আমজাদ ভাই। আজকে ওখানে গেলে দাঁড়ানোর জায়গাই পাবেন না, বলে দিলাম।”
আমজাদ হেসে উঠলো, “তুই ভিড় এতো ভয় পাস কেন? মানুষ কি তোকে ধরে খেয়ে ফেলবে?”
রাশেদ উত্তর দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে করতেই বাদল তার আগে বলে ওঠে, “কী জানি? নিজেকে যে কী মনে করে। মানুষ টিকিট কেটে ওনার মুখ দেখবে!”
রাশেদ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। তারপর চলন্ত সাইকেল থেকে নেমে গেলো। বাদল ব্রেক কষে পেছনে ঘোরে, “দেখলেন আমজাদ ভাই? সত্যি কথা বললে আর মানতে পারে না।”
রাশেদ রাগে ফেটে পড়লো, “তুই বাদ দে তো বাদল। তোকে কিছু বোঝানোর সাধ্য নাই আমার।”
“কী যে বলেন মহাশয়। বাদলেরই বা কী সাধ্য আছে আপনাকে বোঝার? আমি খুবই সাধারণ মানুষ। ক্ষমা করে দেন।”
আমজাদ শার্টে হাত মুছে আকাশের দিকে তাকায়, “কী রে, বৃষ্টি পড়ে নাকি?”
বাদল চুপ করে, হাতের পিঠে ছোট ছোট পানির ফোঁটা অনুভূত হচ্ছে। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামলো। রাশেদ বাদলের সাইকেলের পেছনে উঠে বসলো, “ঘুরিয়ে নে বাদল। আজকে আর কোথাও যাওয়া হবে না।”
আমজাদ সাইকেল ঘোরায়। বাদল আগের মতোই সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“বাদল?” রাশেদ তার পিঠে ধাক্কা দেয়, “এখানেই থাকবি নাকি?”
বাদল শান্তভাবে বলে, “বৃষ্টি তো থামতেও পারে!”
আমজাদ এতোক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে। বৃষ্টিতে জামাকাপড় ইতোমধ্যেই ভিজে জবজবে হয়ে গেছে তাদের। রাশেদ হতাশ হয়ে ভাঙা গলায় বলে ওঠে, “হায় আল্লাহ! কার পাল্লায় পড়লাম আমি!”
বাদল অবশেষে সাইকেলটা ঘুরিয়ে নেয়। যদিও ফেরার ইচ্ছে নেই। তার এখনও মনে হতে থাকে, বৃষ্টিটা যদি থেমে যায়, ফিরে যাওয়া বোকামি হবে। কিছুদিনের মধ্যেই পড়া নিয়ে ব্যস্ততা বাড়বে। তখন তো এভাবে কোথাও বেরিয়ে পড়া সম্ভব হবে না।
মাথার উপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে। ওদের ডাকাডাকিতে বৃষ্টির শব্দও চাপা পড়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। সাইকেল চলছে বাতাসের গতিতে, বৃষ্টির ফোঁটার সাথে ঠাণ্ডা বাতাস সূচের মতো বিঁধছে শরীরে। রাশেদ গুটিসুটি হয়ে বসে আকাশের দিকে তাকায়।
যাযাবর পাখিগুলো নীড়ে ফিরছে।
বিকেল চারটা বাজে।
ওরা হোস্টেলে ফেরার আগেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ, খাবারও শেষ। দোকান থেকে কিছু কিনে আনার উপায় নেই, এদিকে সব দোকান বন্ধ।
মাত্র দুইবার হাঁচি দেওয়ার পর রাশেদ আশঙ্কা করছে, আজ রাতে তার জ্বর আসবে। এই জ্বরের কারণে সে বেশ কয়েকদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারবে না। তারপর তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। সত্যি যদি এমন কিছু হয়, তাহলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার নিতে হবে বাদল আর আমজাদ ভাইকে। তবুও তাদের মধ্যে কোনো প্রকার ভীতি বা অনুশোচনা দেখতে পারছে না রাশেদ। নির্ঘাত ওরা দায়ভার এড়ানোর পরিকল্পনা করবে!
বাদল টেবিলের উপর পা তুলে বসে আছে। মেজাজটা খুবই খারাপ তার। ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। করার মতো কোনো কাজও খুঁজে পাচ্ছে না। দুপুরে সে কিছুই খায়নি। বৃষ্টিটা কমলে বাইরে গিয়ে কোনো খাবার কিনতে পারতো হোটেল থেকে। এভাবে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।
বাদল টেবিল থেকে পা নামালো। বইয়ের মাঝে রাখা নীল ডায়েরিটার উপর চোখ পড়লো তার। লাইব্রেরিতে এটা পাওয়ার পর নিজের পড়ার টেবিলেই তুলে রেখেছে বাদল। সে হাত বাড়িয়ে জিনিসটা টেনে নিলো। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে মলাটের দিকে তাকালো। সাধারণ একটা ডায়েরির উপর নীল রঙের মোটা কাপড় দিয়ে মলাট বানানো হয়েছে, মূল মলাটের সাথে তা সেলাই করে বেঁধে রাখা। সেটার উপর আবার ফুল পাতার নকশাও সেলাই করা হয়েছে। এতো যত্নের জিনিস কেউ ফেলে দিতে যাবে কেন?
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—“খবরদার, পড়বেন না!” বাদল এটা পড়ে হেসে ফেলে। বিড়বিড় করে বলে, “আচ্ছা পড়বো না।”
কিন্তু কথা অনুযায়ী কাজটা করতে পারলো না সে। পৃষ্ঠা ওল্টাতে শুরু করলো।
“মার্চ, ১৯৮৫:
আমার নাম মৌমিতা খন্দকার। আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। এই ডায়েরিটা আমাকে আব্বা দিয়েছেন গতকাল। আমি বুঝতে পারছিলাম না, এখানে কী লিখব। মাঝে আবার গল্প কবিতা লিখতেও ইচ্ছে করল। কিন্তু কিছুই লিখলাম না। আজ আব্বা বললেন, এখানে আমার সব না বলা কথা লিখে রাখতে। যেসব কথা আমি কাউকে বলি না, সেগুলো লিখতে বললেন। তাই আমি এটাই করতে যাচ্ছি, এই ডায়েরিটা এখন আমার ব্যক্তিগত দিনলিপি...”
বাদল ভ্রু কুঁচকে এতোদূর অবধি পড়লো। বুঝলো, সে পুরোদস্তুর একটা ব্যক্তিগত ডায়েরি কুড়িয়ে এনেছে। তাও আবার একটা মেয়ের, যার নাম মৌমিতা খন্দকার। একটা মেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়া ঠিক হবে কিনা, তা নিয়ে একটু দ্বিধা করলো বাদল। তারপর সোজা হয়ে বসলো। কোলের ওপর থেকে তুলে ডায়েরিটা টেবিলের উপর মেলে ধরলো। সাবধানে পাতা ওল্টালো। বাদলের জেদ আর কৌতূহলের কাছে নৈতিকতা সর্বদাই হেরে যায়, আজও ব্যতিক্রম হলো না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………