পদ্মজা - পর্ব ৩৪ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          বাইরে বিকেলের সোনালি রোদ, মন মাতানো বাতাস। লম্বা বারান্দা পেরিয়ে নুরজাহানের ঘরের দিকে যাচ্ছে পদ্মজা। বাতাসের দমকায় সামনের কিছু চুল অবাধ্য হয়ে উড়ছে। এতে সে খুব বিরক্ত বোধ করছে। তার এক হাতে দই অন্য হাতে পিঠা। চুল সরাতেও পারছে না। তখন কোথেকে উড়ে এলো আমির। এক আঙুলে উড়ন্ত চুলগুলো পদ্মজার কানে গুঁজে দিয়ে আবার উড়ে চলে গেল। চমৎকার করে হাসল পদ্মজা। আমিরের চলে যাওয়া দেখে মনে মনে বলল, ‘কী চমৎকার মানুষ আপনি!’

নুরজাহানের ঘরের সামনে এসে দেখে, দরজা ভেজানো। পদ্মজা অনুমতি না নিয়ে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে তার চোখের আকৃতি গোল গোল হয়ে যায়। পালঙ্কে ভুরি ভুরি সোনার অলংকার জ্বলজ্বল করছে। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য! পদ্মজাকে দেখে নুরজাহান অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তা পদ্মজার দৃষ্টিগোচর হলো। নুরজাহান ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন, ‘তুমি এইনে কেরে আইছো? আমি কইছি আইতে?’

নুরজাহানের ধমকে থতমত খেয়ে গেল পদ্মজা। বিচলিত ভঙ্গিতে দইয়ের মগ, পিঠার থালা টেবিলের উপর রেখে বলল, ‘আম্মা বললেন দই, পিঠা দিয়ে যেতে।’

‘তোমার হউরি কইলেই হইব? আমি কইছি? আমারে না কইয়া আমার ঘরে আওন মানা হেইডা তোমার হউরি জানে না?’

‘মাফ করবেন।’ মাথা নত করে বলল পদ্মজা।

‘যাও, বাড়াইয়া যাও।’

পদ্মজা চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল। সে ভাবছে, ছোটো কারণে এত ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া কেন দেখালেন তিনি? মাথায় ঢুকছে না।

পদ্মজা আনমনে হেঁটে নিজের ঘরে চলে আসে। এই বাড়িতে আসার পর থেকে কী কী হয়েছে সব ভাবছে। প্রথম রাতে কেউ একজন তার ঘরে এসেছিল, নোংরা স্পর্শ করেছে। সেটা যে আমির নয় সে শতভাগ নিশ্চিত 1 এরপর ভোরে রানিকে দেখল চোরের মতো বাড়ির পেছনের জঙ্গলে ঢুকতে। রুম্পা ভাবির সঙ্গে দেখা হলো, তিনি শুরুতে স্বাভাবিক ছিলেন। শেষে গিয়ে পাগলামি শুরু করলেন। দরজার ওপাশে কেউ ছিল। পদ্মজা ভ্রুকুটি করে মুখে ‘চ’ কারান্ত শব্দ করল। সব ঝাপসা লাগছে।

ফরিনা বলেছিলেন দই-পিঠা দিয়েই রান্নাঘরে যেতে। পদ্মজা বেমালুম সে কথা ভুলে গিয়েছে। যখন মনে পড়ল কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়। সে দ্রুত আঁচল টেনে মাথা ঘুরে ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। এসে দেখে ফরিনা ও আমিনা মাছ কাটছেন। পদ্মজা পা টিপে টিপে রান্নাঘরে ঢুকে। ভয়ে বুক কাঁপছে। কখন না কঠিন কথা শোনানো শুরু করে দেন।

‘অহন আওনের সময় হইছে তোমার? আছিলা কই?’ বললেন ফরিনা।

‘ঘরে।’ নতজানু হয়ে বলল পদ্মজা।

‘আমির তো বাইরে বাড়াইয়া গেছে অনেকক্ষণ হইল। তুমি ঘরে কী করতাছিলা? স্বামী বাড়িত থাকলে ঘরে থাহন লাগে। নাইলে বউদের খালি রান্ধাঘরে শোভা পায়। এই কথা কী তোমার মায় কয় নাই?’

চুলার থেকে কিছুটা দূরত্বে কয়েকটা বেগুন পড়ে আছে। এখানে আসার পর থেকে সে দেখছে প্রতিদিন বেগুন ভাজা করা হয়। পদ্মজা দা নিয়ে বসে বেগুন হাতে নিতেই ফরিনা বললেন, ‘বেগুন লইছো কেরে?’

‘আজ ভাজবেন না?’

‘জাফর আর হের বউ তো গেলোই গা। এহন কার লাইগা করাম? আর কেউ বেগুন খায় না।’

পদ্মজা বেগুন রেখে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, ‘কী করব?’

ফরিনা চোখ-মুখ কুঁচকে মাছ কাটছেন। যেন পদ্মজার উপস্থিতি তিনি নিতে পারছেন না। অনেকক্ষণ পর কাঠ কাঠ গলায় পদ্মজার প্রশ্নের জবাব দিলেন, ‘ঘরে গিয়া বইয়া থাহো।’

পদ্মজার চোখ দুটি জলে ছলছল করে ওঠে। ঢোক গিলে বলল, ‘আর হবে না।’

‘তোমারে কইছে না এইহান থাইকা যাইতে? যাও না কেরে? যতদিন আমরা আছি তোমরা বউরা রান্ধাঘরের দায়িত্ব লইতে আইবা না।’ আমিনার কণ্ঠে বিদ্রুপ।

পদ্মজা আমিনার কথায় আহত হলো। সে কখন দায়িত্ব নিতে চেয়েছে? আমিনার কথা শুনে ফরিনা চোখ গরম করে বললেন, ‘আমার ছেড়ার বউরে আমি মারাম, কাটাম, বকাম। তোমরা কোনোদিন হের লগে উঁচু গলায় কথা কইবা না। বউ, তুমি ঘরে যাও।’

পদ্মজার সামনে এভাবে অপমানিত হয়ে আমিনা পাথর হয়ে যান। তিনি সেই শুরু থেকে ফরিনাকে ভয় পান। তাই আর টু শব্দ করলেন না। পদ্মজা ফরিনার দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। মনে হচ্ছে এই মানুষটারও দুই রূপ আছে। এই বাড়ির প্রায় সবাইকে তার মুখোশধারী মনে হচ্ছে। কেউ ভালো, কিন্তু খারাপের অভিনয় করে। আর কেউ আসলে শয়তান, কিন্তু ভালোর অভিনয় করে। কিন্তু কেন? কীসের এত ছলনা!

কে ভালো? আর কে শয়তান?

‘খাড়াইয়া আছো কেন? যাও, ঘরে যাও।’

‘গিয়ে কী করব আম্মা? কোনো সাহায্য লাগলে বলুন না।’ পদ্মজা কাজে সাহায্য করার জন্য রীতিমতো অনুরোধ করছে। কিন্তু ফরিনার এক কথা, ‘তোমারে যাইতে কইছি। যাও তুমি, ঘরে যাও।’

পদ্মজা আর কথা বাড়াল না, ধীর পায়ে জায়গা ত্যাগ করল। এদিক- ওদিক হেঁটে ভাবতে লাগল—কার ঘরে যাবে। লাবণ্যের কথা মনে হতেই এগিয়ে গেল সেদিকে, বিকেলে টিভি দেখে মেয়েটা; নিশ্চয়ই এখনও দেখছে। লাবণ্যের ঘরে ঢুকতেই লিখন শাহর কন্ঠ শ্রবণপথে প্রবেশ করে। পদ্মজা টিভির দিকে তাকাল। লিখন শাহ অভিনীত ছায়াছবি চলছে। পদ্মজা চলে যেতে ঘুরে দাঁড়াল। লাবণ্য ডাকল, ‘ওই ছেমড়ি যাস কই? এইদিকে আয়।’

পদ্মজা লাবণ্যর পাশের পালঙ্কে বসল। লাবণ্য দুই হাতে পদ্মজার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সারাদিন দাভাইয়ের সঙ্গে থাকস কেন? আমার ঘরে একবার উঁকি দিতে পারস না?’

‘তোর দাভাই আমাকে না ছাড়লে আমি কী করব?

‘ঘুসি মেরে সরাইয়া দিবি।’

‘হ্যাঁ, এরপর আমাকে তুলে আছাড় মারবে।’

‘দাভাইকে ডরাস?’

‘একটুও না।’

‘সত্যি?’

‘মিথ্যে বলব কেন?’

‘একদিন রাগ দেখলে এরপর ঠিকই ডরাইবি।’

‘আমি রাগতেই দেব না।’

লাবণ্য হাসল। টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লিখন শাহর মতো মানুষরে ফিরাইয়া দেওনের সাহস খালি তোরই আছে। আমার জীবনেও হইত না।’

পদ্মজা কিছু বলল না। লাবণ্যই বলে যাচ্ছে, ‘এই ছবিটা আমি এহন নিয়া ছয়বার দেখছি। লিখন শাহ তার নায়িকারে অনেক পছন্দ করে। কিন্তু নায়িকা পছন্দ করে অন্য জনরে, তারে বিয়া করে। বিয়ার অনেক বছর পর লিখন শাহর প্রেমে পড়ে নায়িকা। ততদিনে দেরি হয়ে যায়। লিখন শাহ মরে যায়। এই হইলো কাহিনি। আইচ্ছা পদ্মজা, যদি এমন তোর সঙ্গেও হয়?’

পদ্মজা আঁতকে উঠে বলল, ‘যাহ কী বলছিস! বিয়ের আগে ভাবতাম যার সঙ্গে বিয়ে হবে তাকেই ভালোবাসব। কিন্তু এখন আমার তোর ভাইকেই দরকার।’

‘ও বাবা! লাইলি আসছে। যাহ, আমি মজা করছি। আমি কেন চাইব আমার ভাইয়ের বউ অন্যজনরে পছন্দ করুক। লিখন শাহ আমার। শয়নে স্বপনে তার লগে আমি সংসার পাতি।’

পদ্মজা হাসল। লাবণ্যর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘আব্বাকে বল, লিখন শাহকে ধরে এনে তোর গলায় ঝুলিয়ে দিবে।’

‘বিয়া এমনেও দিয়া দিব। কয়দিন পর মেট্রিকের ফল। আমি যে ফেল করাম এই খবর আমি তো জানি, পুরা গেরামও জানে।’

‘কিছু হবে না। পাশ করবি। রানি আপা কোথায়?’

‘কী জানি কই বইয়া রইছে। চুপ থাক এহন। টিভি দেখ। দেখ, কেমনে কানতাছে লিখন শাহ। এই জায়গাটা আমি যতবার দেহি আমার কাঁনতে মনে চায়,’ বলতে বলতে লাবণ্য কাঁদতে শুরু করল। ওড়নার আঁচল দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়ে টিভির দিকে তাকাল পদ্মজা। দৃশ্যে চলছে, লিখন শাহ ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে। তার ঘোলা সুন্দর চোখ দুটি আরো ঘোলা হয়ে উঠেছে, ভাংচুর করছে ঘরের জিনিসপত্র। তার মা-বোন-ছোটো ভাই ভয়ে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। এক টুকরো কাচ ঢুকে পড়ল লিখন শাহর পায়ে, আর্তনাদ করে ফ্লোরে বসে পড়ল সে। তার মা দৌড়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলামি থামাতে বলল। লিখন শাহ আর্তনাদ করে বলছে, ‘তুলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আম্মা। আমি কী নিয়ে বাঁচব? কেন তুলি আমাকে ভালোবাসল না? আমি তো সত্যি ভালোবেসে ছিলাম।’

পদ্মজা বাকিটা শুনল না। মনোযোগ সরিয়ে নিলো। তার কানে বাজছে, ‘পদ্মজার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আম্মা। আমি কী নিয়ে বাঁচব? কেন পদ্মজা আমাকে ভালোবাসল না? আমি তো সত্যি ভালোবেসেছিলাম।’

চোখের কোনায় অশ্রু জমল পদ্মজার। সে অশ্রু আড়াল করে লাবণ্যকে বলল, ‘তুই দেখ। আমি যাই।’

লাবণ্যের কানে পদ্মজার কথা ঢুকল না। সে টিভি দেখছে আর ঠোঁট ভেঙে কাঁদছে। পদ্মজা আর কিছু না বলে উঠে যায়। দরজার সামনে আমিরকে দেখতে পেয়ে ধক করে উঠল তার বুক। পরে মনে হলো, সে তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে এত চমকানোর কী আছে? আমির কাগজে মোড়ানো কিছু একটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘরে, রান্নাঘরে কোথাও পেলাম না। মনে হলো লাবণ্যর ঘরেই আছো। টিভি দেখছিলে নাকি?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp