বাসন্তী ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক মাখছেন। প্রেমা-প্রান্ত বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে। তারা দুজন বাসন্তীকে মেনে নিয়েছে। বাসন্তীর কথাবার্তা আর চালচলন আলাদা, যা ছোটো দুটি মনকে আনন্দ দেয়। তারা আগ্রহভরে বাসন্তীর কথা শোনে। লিপস্টিক লাগানো শেষ হলে বাসন্তী প্রেমাকে বললেন, ‘তুমি লাগাইবা? ‘
বাসন্তীর আরো কাছে ঘেঁষে বসল প্রেমা। বাসন্তী প্রেমার ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক গাঢ় করে ঘষে দিয়ে প্রান্তকে বললেন, ‘তুমিও লাগাইবা আব্বা?’
‘জি,’ বলল প্রান্ত। প্রেমাকে লিপস্টিকে সুন্দর লাগছে। তাই তারও ইচ্ছে করছে ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে।
বাসন্তী প্রান্তর ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়ার জন্য উঁবু হোন। পূৰ্ণা বেশ অনেকক্ষণ ধরে এসব দেখছে। এই মহিলাকে সে একটুও সহ্য করতে পারে না। মহিলার উপস্থিতি অসহনীয় যন্ত্রণা দেয়। এক তো সৎ মা, বাপের আরেক বউ। তার ওপর এই বয়সেও এত সাজগোজ করে! প্রান্তকে লিপস্টিক দিচ্ছে দেখে তার গা পিত্তি জ্বলে উঠল। ঘর থেকে দপদপ করে পা ফেলে ছুটে আসে। প্রান্তকে টেনেহিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘তোর হিজরা সাজার ইচ্ছে হচ্ছে কেন? কতবার বলেছি এই বজ্জাত মহিলার কাছে না ঘেঁষতে?
পূর্ণাকে বাসন্তী ভয় পান। মেয়েটা খিটখিটে, বদমেজাজি। হেমলতা বলেছেন, সেদিনের দুর্ঘটনার পর থেকে পূর্ণা এমন হয়ে গেছে। হুটহাট রেগে যায়, কথা শোনে না। পদ্মজা যাওয়ার পর থেকে আরো বিগড়ে গেছে। এজন্য তিনি যথাসম্ভব পূর্ণাকে এড়িয়ে চলেন। তবুও এসে আক্রমণ করে বসে। গত দুই সপ্তাহে মেয়েটা তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তিনি কাটা কাটা গলায় পূর্ণাকে বললেন, ‘এই ছিক্ষা পাইছ তুমি? গুরুজনদের সঙ্গে এমনে কথা কও!
‘আপনি চুপ থাকেন। খারাপ মহিলা। বুড়া হয়ে গেছে এখনও রং-ঢং করে।’ চোখ-মুখ বিকৃত করে বলে পূর্ণা।
কথা মাটিতে পড়ার আগে তীব্র থাপ্পড়ে মাটিতে উলটে পড়ল সে। চোখের দৃষ্টি গরম করে ফিরে তাকাল, কে মেরেছে দেখার জন্য! দেখল হেমলতাকে! হেমলতা অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছেন, চোখের দৃষ্টি দিয়েই পূর্ণাকে পুড়িয়ে ফেলবেন। পূর্ণার চোখ শিথিল হয়ে আসে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। হেমলতা বললেন, ‘নিজেকে সংশোধন কর। এখনও সময় আছে।’
পূর্ণা নতজানু অবস্থায় বলল, ‘আমি এই মহিলাকে সহ্য করতে পারি না আম্মা।’
‘করতে হবে। উনার এই বাড়িতে অধিকার আছে।’
‘আমি খুন করব এই মহিলাকে।’ রাগে তার শরীর কাঁপছে।
পূর্ণার অবস্থা দেখে হেমলতা অসহায়বোধ করছেন। পূর্ণা কেন এমন হলো? তিনি কি এক মেয়ের শূন্যতার শোক কাটাতে গিয়ে আরেক মেয়েকে সময় দিচ্ছেন না? বুঝিয়ে-শুনিয়ে পূর্ণাকে আবার আগের মতো করতে হবে। তিনি কণ্ঠ নরম করে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এরপর পূর্ণা যা বলল তাতে তিনি আর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। পূর্ণা বাসন্তীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বেশ্যার মেয়ে বেশ্যাই হয়। আর বেশ্যার সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে ঘেন্না লাগে আমার।’
এই কথা শুনে রাগে-দুঃখে হেমলতা শরীর কাঁপতে শুরু করে। তিনি ছুটে যান বাঁশ বাগানের দিকে। বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ফিরে আসেন। রাগান্বিত হেমলতাকে কঞ্চি হাতে দেখে বাসন্তী দ্রুত পূর্ণাকে আগলে দাঁড়ান। হেমলতাকে অনুরোধ করে বললেন, ‘এত বড়ো ছেড়িডারে মাইরো না। ছোটো মানুছ, বুঝে না।’
‘আপা আপনি সরেন। ও খুব বেড়ে গেছে।’
বাসন্তীর স্পর্শ পূর্ণার ভালো লাগছে না। সে ঠেলে তাকে সরিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পূর্ণার পিঠে বাড়ি দিলেন। পূৰ্ণা আর্তনাদ করে শুয়ে পড়ল। হেমলতা আবার মারার জন্য উদ্যত হতেই বাসন্তী পূর্ণাকে আগলে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে বললেন, ‘যুবতি ছেড়িদের এমনে মারতে নাই। আর মাইরো না। আজকে ছাইড়া দাও।’
প্রেমা-প্রান্ত ভয়ে গুটিয়ে গেছে। হেমলতার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। তিনি বাঁশের কঞ্চি ফেলে লাহাড়ি ঘরে চলে গেলেন। বারান্দায় বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে মোর্শেদের ওপর ক্ষেপে গেলেন। মোর্শেদ চিৎকার করে বাসন্তীর সম্পর্কে সব বলেছে বলেই তো পূর্ণা জেনেছে। তাই এখন পূর্ণা কারো অতীত নিয়ে আঘাত করার সুযোগ পাচ্ছে। মোড়ল বাড়ির ছোটো সংসারটা কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে!
হেমলতা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে নিশ্বাস নেন। সব কষ্ট, যন্ত্রণা যদি উড়ে যেত! সব যদি আগের মতো হতো। সব কঠিন মানুষেরাই কী জীবনের এক অংশে এসে এমন দুর্বল হয়ে পড়ে? কোনো দিশা খুঁজে পায় না?
—————
আমির বিছানায় বসে উপন্যাস পড়ছে। ছয়দিন পর পদ্মজার মেট্রিকের ফলাফল। এরপরই ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। যদিও ফরিনা বেগম এই সিদ্ধান্তে রাজি নন। কিন্তু আমির মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সে পদ্মজাকে রাজধানীতে নিয়েই যাবে। পদ্মজার কথা মনে হতেই আমির বই রেখে গোসলখানার দরজার দিকে তাকাল। তার ঘরের সঙ্গে আগে গোসলখানা ছিল না। পদ্মজার জন্য করা হয়েছে। সে বই রেখে সেদিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখনি পদ্মজা চিৎকার করে উঠল। আমির দৌড়ে ভেতরে ঢুকল দরজা ঠেলে। পদ্মজা শাড়ি দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে, কাঁপছে কিছুটা। আমির দ্রুত কাছে এসে বলল, ‘কী হয়েছে?’
‘ওখানে, ওখানে কে যেন ছিল। আ…আমাকে দেখছিল।’
পদ্মজার ইঙ্গিত অনুসরণ করে আমির সেদিকে তাকাল। গোসলখানার ডান দেয়ালের একটা ইট সরানো। সকালে তো সরানো ছিল না! পদ্মজা কাঁদতে থাকল। কাপড় পালটাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ে দেয়ালে। আর তখনই দুটি চোখ দেখতে পায়। সে তাকাতেই সরে গেল চোখ দুটি! পদ্মজার পিলে চমকে ওঠে। আমির পদ্মজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘শুকনো কাপড় পরে আসো। কেঁদো না।’
কথা শেষ করেই সে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার তাড়া দেখে মনে হলো, অজ্ঞাত আগন্তুক হয়তো আমিরের পরিচিত! সে অবগত মানুষটি সম্পর্কে! পদ্মজা দ্রুত কাপড় পরে আমিরকে খুঁজতে থাকল।
আমির সোজা রিদওয়ানের ঘরের দিকে যায়। রিদওয়ান পানি পান করছিল। আমির গিয়ে রিদওয়ানের বুকের শার্ট খামচে ধরে চিৎকার করে বলল, ‘তোকে সাবধান করেছিলাম। দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছিলাম।’
‘শার্ট ছাড়।’
‘ছাড়ব না। কী করবি? তুই আমার বউয়ের দিকে কু-নজর দিবি আর আমি ছেড়ে দেব?’
‘প্রমাণ আছে তোর কাছে?’
‘কুত্তার বাচ্চা প্রমাণ লাগবে? আমি জানি না?’
‘আমির মুখ সামলা। গালাগালি করবি না। ‘
‘করব। কী করবি তুই?’
‘আবার বলছি, শার্ট ছাড়।’
রিদওয়ানের নাকে-মুখে ঘুসি মেরে বসল আমির। টাল সামলাতে না পেরে পালঙ্কের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল রিদওয়ান। দুজনের চিৎকার, চেঁচামিচি শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এলো রিদওয়ানের ঘরে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………