পদ্মজা - পর্ব ৫১ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          ভোর হয়েছে আর কতক্ষণই হলো! দুই ঘণ্টার মতো। এর মধ্যেই মেঘলা আকাশ বেয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে চারিদিকে। পূর্ণা আলগ ঘরের সামনে থাকা বারান্দার চেয়ারে মুখ ভার করে বসে আছে। তার গায়ে সোয়েটার, সোয়েটারের ওপরে তিন তিনটে কাঁথা। তবুও পাতলা ঠোঁট জোড়া ঠান্ডায় কাঁপছে। বসে থাকতে থাকতে একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। কোথাও যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। তার চেয়ে বরং আপার সঙ্গে আড্ডা দেয়া যাক। চৌকাঠে পা রাখতেই মৃদুলের কণ্ঠস্বর কানে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সে। মৃদুল কাঁপতে কাঁপতে হেঁটে আসছে। শরীর ভেজা। রানি আপা, রানি আপা বলে ডাকছে। কিন্তু এখানে তো রানি নেই। মৃদুল বারান্দায় পা রেখেই পূর্ণার মুখটা দেখতে পেল। তার দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মৃদুলের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই মেয়ের জন্যই তো এমন ঘটনা ঘটল। এখন ঠান্ডায় কাঁপতে হচ্ছে। সে দৃষ্টি সরিয়ে দাঁড়াল দূরে। শার্ট খুলে দড়িতে মেলে দিয়ে ডাকল, ‘কইরে রানি আপা। শীতে মইরা যাইতেছি। কাপড় নিয়ে আয়। ভেজা শরীর নিয়া ঘরে কেমনে ঢুকব?’

পূর্ণা কাঠখোট্টা গলায় বলল, ‘রানি আপা এইখানে নেই। অকারণে চেঁচাচ্ছেন।’

মৃদুল পূর্ণার স্বরেই পালটা জবাব দিল, ‘তোমারে কইছি আমার উত্তর দিতে? আমার ইচ্ছে হইলে আমি চেঁচাব। তোমার ভালা না লাগলে কানে ফাত্তর ঢুকায়া রাখো।’

পূর্ণা দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে তাকিয়ে থাকে। মৃদুল আড়চোখে পূর্ণাকে দেখে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বাতাস বেড়েছে। খালি গায়ে কাঁপুনি শুরু হয়। মৃদুলকে এভাবে কাঁপতে দেখে পূর্ণার মায়া হচ্ছে। সে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, ‘আমি আপনার কাপড় নিয়ে আসব?’

মৃদুল চোয়াল শক্ত রেখেই আবারও আড়চোখে তাকাল। কিন্তু উত্তর দিল না। সে সম্পূর্ণভাবে পূর্ণাকে উপেক্ষা করছে। পূর্ণা জবাবের আশায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে, এরপর চলে যায়। পূর্ণা চলে যেতেই মৃদুল শীতের তীব্রতায় মুখ দিয়ে ‘উউউউউউ’ জাতীয় শব্দ করে কাঁপতে থাকল। যতক্ষণ না প্যান্ট শুকাবে ঘরের ভেতর ঢুকতে পারবে না। তার ঘরে যাওয়ার পথে ধান ছড়ানো আছে। এদিক দিয়ে গেলে ধান ভিজে নষ্ট হবে। সহ্য করা ছাড়া আর উপায় নেই। কেউ যদি কাপড় দিয়ে যেত!

আলগ ঘরের পেছনে উত্তর দিকের বারান্দায় গিয়ে মগাকে পেল পূৰ্ণা। মগা ঝিমুচ্ছে। ‘মগা ভাইয়া?’

মগা তাকাল। পূর্ণা বলল, ‘মৃদুল ভাইয়ের ঘর কোনটা?’

মগা আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিল। পূর্ণা মৃদুলের ঘরে গিয়ে একটা লুঙ্গি আর শার্ট নিয়ে বেরিয়ে আসে। মৃদুল পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা শীতের কাতরতা বন্ধ করে দিল। পূর্ণা মৃদুলের চেয়ে এক হাত দূরে এসে দাঁড়াল। এগিয়ে দিল লুঙ্গি আর শার্ট। মৃদুল ঘুরে তাকাল। আর রাগ দেখানো সম্ভব নয়। রগে রগে ঠান্ডার তীব্রতা ঢুকে গেছে। রক্ত শীতল হয়ে এসেছে। সে পূর্ণার হাত থেকে নিজের কাপড় নিতে নিতে হৃদয় থমকে দেয়ার মতো একটা মায়াবী মুখশ্রী আবিষ্কার করল। টানা টানা চোখ, চোখের পাঁপড়িগুলো এত ঘন যে মনে হচ্ছে কোনো বিশাল বটবৃক্ষ ছায়া ফেলে রেখেছে, পাতলা ফিনফিনে ঠোঁট, ত্বকে তেলতেলে ভাব চকচক করছে। লম্বা এলো চুল বাতাসে উড়ছে। শ্যামবর্ণের মুখ এত আকর্ষণীয় হয়? কিছু সৌন্দর্য বোধহয় এভাবেই খুব কাছে থেকে চিনে নিতে হয়। মৃদুলের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে। সে আগে লুঙ্গি নিলো। পূর্ণা অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি দেখব না। আপনি পালটে ফেলুন।’

মৃদুল মোহময় কোনো টানে আবার ফিরে তাকাল। তবে মুখটা আর দেখতে পেল না। মায়াবী মুখটা অন্যদিকে ফিরে আছে। সে লুঙ্গি পালটে মিনমিনিয়ে বলল, ‘শার্টটা?’

পূর্ণা হেসে শার্ট এগিয়ে দিল। মৃদুলের এলোমেলো দৃষ্টি। হুট করেই বুকে ঝড়ো বাতাস বইছে। কী আশ্চর্য! পূর্ণা গর্বের সঙ্গে বলল, ‘আমাকে কালি বলে কষ্ট দিলেও আমি আপনার কষ্ট দেখতে পারিনি। আমি সবসময় মহৎ।’

অন্যসময় হলে হয়তো মৃদুলও পালটা জবাব দিত। কিন্তু এখন ইচ্ছে হচ্ছে না। মোটেও ইচ্ছে হচ্ছে না। পূর্ণা কিছু না বলে আলগ ঘরে ঢুকে যায়। মৃদুল দ্রুত পায়ে দুই পা এগিয়ে আসে। আবার পিছিয়ে যায়। আজকের দিনটা অন্যরকম লাগছে। আচ্ছা, দিনটা অন্যরকম নাকি অনুভূতি অন্যরকম?

—————

নিজেকে ধাতস্থ করার আগেই খলিল পদ্মজাকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দ্রুত দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন। পদ্মজা গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখের জল বিসর্জন হচ্ছে আঘাতের যন্ত্রণায়? নাকি কারো হাতে থাপ্পড় খাওয়ার অপমানে? কে জানে! খলিল কপাল কুঁচকে আরো কী কী যেন বলে চলে গেলেন। পদ্মজা ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সে আকস্মিক ঘটনাটি হজম করতে পারছে না। দিকদিশা হারিয়ে ফেলেছে।

ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ পেয়ে সংবিৎ ফিরল পদ্মজা, বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকাল। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো উচিত—তার মাথায় আসছে না। একটু দূরে চোখ পড়তেই দেখতে পেল লতিফাকে। পদ্মজাকে তাকাতে দেখেই লতিফা আড়াল হয়ে যায়। পদ্মজা সে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। এই তীব্র শীতে আবার বৃষ্টি হবে নাকি! ভাবতে ভাবতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে। পদ্মজার গা কেঁপে উঠল ঠান্ডার তীব্রতায়।

সাই সাই বাতাস বইছে। সুপারি গাছগুলো একবার ডানে দুলে পড়ছে তো আরেকবার বাঁয়ে। আলগ ঘরের পেছনের বারান্দায় গায়ে কাঁথা মুড়িয়ে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে মগা। পদ্মজা শাড়ির আঁচল ভালো করে টেনে ধরে শীত থেকে বাঁচতে। আবহাওয়ার অবস্থা ভালো না, তার মধ্যে বৃষ্টি আর বাতাস! সামান্য শাড়ির আঁচলে কী ঠান্ডার তীব্রতা আটকানো যায়!

ইচ্ছেও করছে না ঘরে যেতে। সে এদিক-ওদিক চেয়ে এক কোনায় একটা চেয়ার দেখতে পেল। চেয়ারটা আনার জন্য এগোল সে, আর তখনই নাকে একটা বিশ্রি বোটকা গন্ধ ধাক্কা দিল। সজাগ হয়ে উঠল পদ্মজার স্নায়ু। যত এগোচ্ছে গন্ধটা তীব্র হচ্ছে! সে সাবধানে এক পা এক পা করে ফেলছে। এরইমধ্যে আমিরের চেঁচামেচি কানে আসে। পদ্মজা থমকে যায়। উলটো ঘুরে বাইরে উঁকি দেয়। বাইরে ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে। প্রথমে দৃষ্টি কাড়ে আমিরের রাগী মুখশ্রী।

পদ্মজা সবকিছু ভুলে ছুটে নেমে যায় নিচ তলায়। বাইরে এসে দেখে, আমির তার চাচাকে মারছে! যেভাবে পারে কিল-ঘুসি দিচ্ছে। আমির এতটাই রেগে গিয়েছে যে নিজের আপন চাচাকে মারছে! মজিদ হাওলাদার, রিদওয়ান, আমিনা, রানি, সবাই আটকানোর চেষ্টা করছে। কেউ পারছে না। আমির খলিলকে ছেড়ে রিদওয়ানকে ধাক্কা মেরে কাদায় ফেলে দিল। আমিরের আচরণ উন্মাদের মতো। সে বিশ্রি গালিগালাজ করতে করতে রিদওয়ানের পেটে লাথি বসায়। রিদওয়ান কোঁকিয়ে উঠল। আমিনা আমিরকে কিল-থাপ্পড় মারছেন, তাতেও কাজ হচ্ছে না। এমন তো আমির নয়! পদ্মজা দৌড়ে আসে। আমিরকে চিৎকার করে বলল, ‘কী করছেন আপনি? পাগল হয়ে গেছেন? ছাড়ুন।’

আমির পদ্মজার জবাব দিল না, বরঞ্চ থাবা মেরে ধরল খলিলকে। খলিলের নাক বেয়ে রক্ত ঝরছে। সেই অবস্থায়ই শক্ত মুঠো করে মুখে আরেকটা ঘুসি মারল সে। রানি, আমিনা হাউমাউ করে কাঁদছে। মৃদুল, পূর্ণা, মগা, মদন—প্রত্যেকে দৌড়ে আসে। মৃদুল, পদ্মজা দুই হাতে আমিরকে টেনে সরাতে চায়। কেউই পারল না। আমিরের শরীরে যেন দানবের শক্তি ভর করেছে। সে কিছুতেই ক্লান্ত হচ্ছে না। মৃদুল দুই হাতে জাপটে ধরে আমিরকে দূরে সরিয়ে আনে। আমির হিংস্র বাঘের মতো হাত পা ছুড়তে ছুড়তে বলছে, ‘কুত্তার বাচ্চারা অনেক কিছু করেছিস, করতে দিয়েছি। আমার বউয়ের গায়ে হাত দেস কোন সাহসে? মৃদুল ছাড়। আমি ওদের আজরাইলের মুখ দেখিয়ে ছাড়ব। শুয়োরের বাচ্চা…’

মৃদুলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে গিয়ে রিদওয়ানকে ধরল আমির পদ্মজা হতভম্ব হয়ে পড়েছে! রিদওয়ান গতকাল তার কাঁধে হাত দিয়েছিল, আর আজ খলিল থাপ্পড়ে মেরেছে। এসব কে বলেছে আমিরকে? থাপ্পড়টা লতিফা দেখেছিল। তাহলে কী লতিফা বলেছে?

আমিনা পদ্মজার পায়ে লুটিয়ে পড়েন। পদ্মজা দ্রুত সরে যায়, ‘চাচি কী করছেন!’

আমিনা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘থামাও এই কামড়াকামড়ি। আল্লাহর দোহাই লাগে।’

পদ্মজা কী করবে বুঝতে পারছে না। আমির তার কোনো কথাই কানে নিচ্ছে না। এমন রাগ সে আগে কখনো দেখেনি! গুরুজনদের গায়ে হাত তোলার মতো রাগ আমিরের হতে পারে, এটা তার ধারণার বাইরে ছিল! পদ্মজা আমিরের সোয়েটার খামচে ধরে কণ্ঠ কঠিন করে বলল, ‘ছাড়ুন বলছি। ছাড়ুন।’

আমির তাও শুনল না। সে ধাক্কা মেরে পদ্মজাকে সরিয়ে দিল। দুই হাত দূরেই নারিকেল গাছ ছিল। সেখানে পড়লে নিশ্চিত কোনো অঘটন ঘটে যেত, অঘটন ঘটার পূর্বেই দুটো হাত পদ্মজাকে আঁকড়ে ধরে। পদ্মজা কৃতজ্ঞতার নজরে তাকাল। ফরিনাকে দেখতে পেল। ফরিনা এরকম ধস্তাধস্তি দেখেও চুপ করে আছেন, পদ্মজা অবাক হলো! থামানোর চেষ্টা পর্যন্ত করছেন না। পদ্মজা আবার আমিরকে থামানোর চেষ্টা করল, মৃদুল চেষ্টা করল। কিছুতেই কিছু হলো না। আমির খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, অনেক বছরের রাগ একসঙ্গে মিটিয়ে নিচ্ছে। পদ্মজা আমিরকে অনুরোধ করে সরে আসতে। সেই অনুরোধ আমিরের কর্ণকুহর অবধি পৌঁছেছে কি না সন্দেহ!

পদ্মজা অসহায় মুখ করে সরে যাবে, তখনই দুটি শক্তপোক্ত হাত আমিরকে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সেই হাতে খুব দামি ঘড়ি। হাতের মালিককে দেখার জন্য পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। পরক্ষণেই চমকে উঠল মুখটা দেখে! দীর্ঘ সময় পর আবার সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা। যে মানুষটি তার প্রথম ভালোবাসা না হলেও, প্রথম আবেগমাখা অনুভূতি ছিল…লিখন শাহ!

দূরে সরে দাঁড়াল পদ্মজা। মৃদুল, লিখন মিলে আমিরকে চেপে ধরে দূরে নিয়ে যেতে চাইল। আমির ছটফট করছে ছুটতে, তবে পারছে না। তীব্র রাগ নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে লিখনকে দেখে তার দৃষ্টি স্থির হলো, তবে থেকে গেল ছটফটানি। লিখন হেসে বলল, ‘এবার থামুন। অনেক শক্তি ফুরিয়েছেন।

আমির কিছু বলতে চাইল বটে, তবে তার আগেই রিদওয়ান ইট দিয়ে আমিরের ঘাড়ে আঘাত করে বসল সবার অগোচরে। আমির আর্তনাদ করে বসে পড়ে। লিখন রিদওয়ানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। পদ্মজা উৎকর্ণ হয়ে দৌড়ে আসে। আমিনা, রানি খলিল এবং রিদওয়ানকে নিয়ে দ্রুত আলগ ঘরে গয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। মজিদ মগাকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি গঞ্জে যা। বিপুল ডাক্তাররে নিয়ে আয়। আমার বাড়িতে এসব কী হচ্ছে!’

ফরিনা তখনো দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। এই ঘটনা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি! বরং এই ঘটনার জন্য তিনি খুশি! কী চলছে তার মনে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp